মানস জঙ্গল ভ্রমণ পর্ব-২ ( এক অপার বিস্ময় ও রহস্যময়তা)... হাতির চোখে জল!

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

প্রথম ও এই পর্ব বাঁশবাড়ি রেঞ্জ

৩১ ডিসেম্বর -২০২২

-দিদি আমি কাল তোর সাথে বসবো

- হ্যাঁ বোনি

চির পথের সঙ্গী এভাবেই বিস্ময় লুকিয়ে রাখে। সে নতুনকে সাজিয়ে রাখে, আগামীকে আকর্ষণীয় করার জন্য। আমরাও সেই নতুনের খোঁজে পথ হাঁটি। পথ তৈরির প্রয়োজনে যে শ্রমতাঁত, তাতে কত চাকা ঘুরে যায়।

ভোর সাড়ে পাঁচটায় চা রেডি। আমরা তৈরি হয়ে মিঠাইকে গরম জামা কাপড় পরিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় গায়ে কম্বল জড়িয়ে পাঁজাকোলা ক'রে মামমামের কোলে শুইয়ে দিলাম। 'সে আমার ছোটো বোন / বড় আদরের...' - মনে পড়া স্বাভাবিক। ড্রাইভারের পাশের সিটে ওরা বসবে কাচ তুলে। ঠাণ্ডা ততক্ষণে জ্যাকেট জামা পেরিয়ে চামড়ায় ঢুকে পড়েছে। আমরা তার মধ্যেও ছুটছি, ভ্রমণ এমনই বা নে সা অথব নেশা। সা লাগছে প্রকৃতির।

আমরা আবার মানসের গেট পেরিয়ে ভেতরে। বাঁশবাড়ি রেঞ্জে।

'এত ভোরে জঙ্গল!' মা যেন 'কেমন' শব্দের মন পেরিয়ে 'কে?' ব'লে উঠলো। মুর + নূর = ময়ূর। এর মধ্যেই ওয়াইল্ড বাফেলো দেখে হাতিময় হোলাম আমরা। ওই রাস্তা হাতির, আমাদের নয়। গতকাল ৩০.১২.২২ ছিলো রাইনো-ডে। আজ ২০২২ এর শেষ দিনের নাম, আমাদের কাছে এলিফেন্ট-ডে। কেন? বলছি। জঙ্গলের প্রতি মুহূর্ত রহস্যের, সেখানে কোনো জং নেই। রঙ রঙ রঙ। রাস্তার বাঁদিকে দুটো বাইসন আমাদের বাই করছে না ওয়েলকাম ভাবতে ভাবতে পঙ্কজ বললো - 'স্যার কোন দিক থেকে ছবি নেবেন? ' ছবি, হ্যাঁ ছবিই তো। এই পথ চলতি পথেই বাঁদিক ডানদিকে উঁকি দিচ্ছে সম্বর, বার্কিং প্রজাতির হরিণ। আহা! এ আনন্দ নাভি খসার, এ আনন্দ সা নি ধা পা'র।

আমার দিদি আর ঋতু যতবারই জঙ্গল গ্যাছে হাতির হ আর ত থেকে বঞ্চিত হয়েছে, আসলে যা হোতো, আর যা হোলো তা ওদের চমকে চ ক'রে দিয়েছে। পরপর দুবার দুটো হাতির দল। ভাবা যায়! দিদিকে বললাম 'কি রে হজম হবে তো!'। 'চুপ কর ভাই' ব'লে এমন তাকালো যেন হাতির অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসেছে। ওদের দেখে আমি বুঝলাম - কী আনন্দ ওরা পেয়েছে। আমিও পেয়েছি। এক ছাড়িয়ে অনেক। এরই মধ্যে দলের প্রতিনিধিস্থানীয় একটি হাতি এই আবেগ টের পেয়ে আমাদের সাফারি গাড়িকে তাড়া করতে শুরু করলো। আমাদের সারথিও টান দিলো স্পিডে। বিস্ময়ের পর বিস্ময় যে অপেক্ষা করছে পথে, এ যে আমাদের অপেক্ষায় ছিলো।

আমাদের সামনের গাড়িটা সম্বর হরিণের ছবি তুলতে গিয়ে দ্যাখে নি, তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে বাইসন। আমার চোখ তখন সম্বর ছেড়ে গড়বড়ের দিকে। বাইসন এগিয়ে আসছে শিং উঁচিয়ে সামনের গাড়ির দিকে, আমরা ঠিক তার পিছনে। ওর যা চেহারা, আমি ভাবছি, আমাকে বাগে পেলে ওকে গুঁতোতে হবে না, শুধু নাড়ালেই হবে, শিং শিং...সামনের গাড়ির বন্দুকধারী বন্দুক উঁচিয়ে ধরতে, তবে সে পিছিয়ে জঙ্গলে ঢুকলো। সে এক নাটকীয় পরিস্থিতি। কোনো মতে বাইসনকে বাই ক'রে, শনশন ক'রে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম প্রতিমুহূর্ত রহস্যময়। তখন আমার উত্তেজনা চরমে। বললাম- 'পঙ্কজ, ক্যাপড লেঙ্গুর আমাকে দ্যাখাতেই হবে'। পঙ্কজ খুবই ভালো ছেলে, আমাকে সে দেখিয়ে ছাড়লো, মানসের জঙ্গলের এই বিশেষ প্রাণীকে। সে প্রাণী শিমুলগাছ থেকে উঁকি দিচ্ছে। তাদের নাগাল পাওয়াই মুশকিল। কী ফুর্তি! ওদের দেখবো ব'লে এত দূর এসেছি, কোনো গুরুত্ব নেই!

ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট, তারপর দুপুরের লাঞ্চ ক'রে তৃতীয়বার সাফারির জন্য প্রস্তুত। বাঁশবাড়ির এবার অন্যদিক। হ্যাঁ এই ফাঁকে ব'লে নিই রাইনো কটেজে নদীর বিভিন্নরকম ছোটো ছোটো মাছ ভেজে যে ভাবে পরিবেশন করছে, মুখে লেগে থাকার মতো।

দুপুর ২টো ১৫, আমরা বেরোলাম পঙ্কজের সাথে, সাফারি গাড়িতে।শুরুতেই এক অভাবনীয় দৃশ্য। সৌন্দর্য প্রদর্শনের কম্পিটিশন চলছে নায়িকার সামনে। পেখম তুলছে আর ছুটতে ছুটতে নামাচ্ছে 'দোদুল দুলিছে'। 'নাও এবার এগোও পঙ্কজ', আসলে সবাই কেমন সৌন্দর্যের শিকার। আমরা তো মানুষ, আমরাই তো শিকারি... এই ঔদ্ধত্য কবে থামবে আমাদের?

-টুকি

-কে?

-আমি সম্বর হরিণ।

-ভাই অমন আড়াল কেন?

- আড়ালে তো তোমরা, জঙ্গল আমাদের।

- আমাদেরও

- তবে আর কি, গাছ কাটো

বেঁকীনদীর ধার ধ'রে উঠে যেখানে পৌঁছলাম, সে দৃশ্য অকল্পনীয়। ছোটো মাঝারি বড় মিলিয়ে সে প্রায় ১০ - ১২ জনের একটি হস্তী পরিবার। নানান কার্যকলাপ তাদের৷ গভীর আলোচনা থেকে স্বান্তনা, খুনসুটি থেকে প্রেম, কত কিছু যে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ঠিক নেই। সে জীবন-অভিনয় এত কাছে ঘটছে, তবুও মনে হচ্ছে ওই পৃথিবী আলাদা। আহা! সার্থক এ জীবন। আবার কিছুটা এগোনো। কেষ্টার মতো 'শুনবো হাতির হাঁচি' আমি বলি নি, তবে হাতির চোখে জল দেখেছি। যাই হোক, কিছুদূর এগিয়ে দেখলাম গভীর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা কিছু হাতি ফেরার পথ ধরেছে। এরপর সেই মানসনদী। সন্ধ্যা নামছে ওই ছোট্ট পাখির ডানায় ভর ক'রে। দূরের পাহাড়, গোধূলি আর ঊষার মধ্যবর্তী অন্ধকারে নিশ্চুপ হতে তৈরি। ফেরার সময় একদল সম্বর হরিণ অন্ধকারে মিশে গ্যালো। অন্ধকার এবার প্রশস্ত হচ্ছে, ফেরার পথ ধ'রে কোথাও হারিয়ে যেতে চাও? হারিয়ে যাবে!

গাড়ির পাশেই ডালভাঙার শব্দ। ঋতু যে দিকটায় পরিবর্তন দেখছে সে দিকেই কাস্তেচাঁদ আলোর নিচে, বললাম 'ওই দ্যাখো'। 'কী?' ঘুরে দ্যাখে পাঁচ হাত দূরে একটা বুনো হাতি চাঁদের আলোয় ডাল-পাতায় মগ্ন। সেই চমক কাটিয়ে উঠতেই দিদি বললো - 'ওই দ্যাখ!'। তাই তো আমাদের রাস্তার বাঁদিকে মিশে আছে প্রায় ১০/১২টা কালো কালো পাথর। ও গুলো নড়ছে? আরে ওগুলো বাইসন, সেই সাথেই ডানদিকে আরেক চমক একদল হাতি নীলচে আলোয় ফিরতি পথ। এই মোহময় অভাবনীয় দৃশ্যপট চিরকাল স্মৃতিবোনা হয়ে থাকবে। যেন অপার্থিব মায়াময় সেই জগতের দর্শক হয়ে আমরা ধন্য। ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি খুব একটা তুলি না, তাই সে ছবি আমি তুলি নি, সে স্মৃতিজাগানিয়া হয়ে ভেতরেই থাক। এগিয়ে চললাম আবার। আচ্ছা ভাবুন তো, যদি দ্যাখেন, একটি পাতাঝরা গাছের দুটো ডালে দুটো হর্নবিল ব'সে আছে সন্ধ্যার অন্ধকার মেখে। হ্যাঁ আমরা দেখেছি। এতকিছু, উপচে পড়বে না তো! রাতে ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন দিয়ে শেষ করলাম ২০২২ এর শেষ দিন। ৩১ এ ডিসেম্বর।

পরবর্তী পর্ব - মানস জঙ্গলের এক অপার রহস্যময় রেঞ্জ, পানবাড়ি।

ক্রমশ...

প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

About Author
&
Photographer

লেখক : সব্যসাচী হাজরা

লেখালিখি :  শূন্য দশক

ভালোবাসা : কবিতাপাঠ, ভ্রমণ,  ছবি তোলা, গান গাওয়া , শ্রুতিনাটক

আলোকচিত্রী: সব্যসাচী হাজরা

লেখালিখি :  শূন্য দশক

ভালোবাসা : কবিতাপাঠ, ভ্রমণ,  ছবি তোলা, গান গাওয়া , শ্রুতিনাটক

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget