স্পিতি জার্নি (প্রথম ভাগ)

A journey of a thousand miles
begins with a single step.
Lao Tzu
ভ্রমণ আসে। পায়ে পায়ে প্রজাপতি। অল্প অল্প কাঁপে তার বর্ণমালা। রং যেন পাহাড়ি ফুলের ঘ্রাণ। পায়ে পায়ে উঠি। উঠি আর
বরফের শব্দ পাতলা হয়ে আসে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ঘন্টা জেগে থাকে দূরে। পার্বত্য এক চরাচর অমোঘ হয়ে থাকে বাঙালি পর্বতসন্তানের সান্নিধ্যে। মিশে থাকে সখ্যতা। ভালোবাসা। কান্না। ফেলে আসার ঘোর বিষাদ। ভ্রমণ হয়ে ওঠে আধ্যাত্ম অনুভব। হিমালয় হয়ে ওঠেন স্বয়ংসম্পূর্ণ যোগমার্গ। কাহিনী একটাই। তবু যেন তা স্পিতি নামের কোনো নদীবাঁক। তবু যেন তাতে কল্পা নামের এক চিঠি ভেসে যায়।
পর্ব-০ (প্রণবকুমার দে। পাহাড়ু)
গম্ভীর কন্ঠস্বর। বাজখাঁই নয়। বরং, প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ এক অভিযাত্রী যেন ধ্যানগম্ভীর অন্ধকার হাতড়ে করে চলেছেন আলোর সন্ধান। প্রাথমিক ফোনালাপের এক বয়সদূরত্ব মুহূর্তে যেন কাটিয়ে দিলেন হিমালয়। প্রণবদা শিশু হয়ে উঠলেন। আমি ফোনে প্রথম শুনলাম, হিমালয় কাউকে এরকম আশীর্বাদ কীভাবে করতে পারে। ফোনেই বুঝতে পারছিলাম, হিমালয় শব্দটা বলতে গিয়ে যেভাবে প্রণবদা বারবার হ ও ম এর মাঝে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, হিম শব্দের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই নিঃশ্বাস অর্জন করতে গেলে বহু পথ হাঁটতে হয়। শুনছিলাম হিমালয় ঘিরে প্রণবদার অদ্ভুত, অত্যাশ্চর্য ও প্রায় অসম্ভব কিছু অভিজ্ঞতার কথা। ধীরে ধীরে ফোনালাপ ও আলাপ গভীর হল। ফোনেই প্রণবদা সমস্ত খুঁটিনাটি বলে দিচ্ছিলেন। কীভাবে যাব। কোথায় থাকব। স্পিতিতে কোথায় কার বাড়ি, তা অব্দি গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন প্রণবদা।
তখন আর আপনি নয় অবশ্য। ততদিনে আপনি থেকে তুমি।
শূন্য ছেড়ে আবার ফিরে যাই প্রথম পর্বে।
পর্ব-১ (বহরমপুর থেকে চন্ডীগড় হয়ে শিমলা) ২৪/০৯/২০২১
পায়ে পায়ে প্রজাপতি। অতএব বেরোনো। এবারের গন্তব্য স্পিতি ভ্যালি। গন্তব্য শব্দটা আদ্যন্ত ভুল। এ চলাটুকুই স্পিতি ভ্যালি। স্পিতি তো ফুরোয় না। অতএব গোছগাছ চলছিল। রুকস্যাক কেনা। নতুন শীতের পোশাক কিনে আনা। খাবারদাবার, ক্যামেরা ইত্যাদি। খসড়া চলছে। সাথে প্যাকিং। আমি ও আমার দুই সফরসঙ্গী। আমার স্ত্রী রিশিয়া ও ভাই জিত। তিনজনের টিম। প্লেনের টিকিট কাটা হল। এই প্রথম এত দূরের পথ পাড়ি দিচ্ছি। বুক দুরুদুরু।
আচমকা এক দুপুর। প্রণবদার ফোন। “আমাকে সাথে নিবি, যদি কিছু মনে না করিস?” আমার গলা ধরে এসেছিল এই ফোনে। কিন্তু খুব শান্তভাবে বলেছিলাম, “অবশ্যই। তুমি গেলে আমাদের খুব ভালো লাগবে।’’ মন তখন ডিগবাজি খাচ্ছে সুদূর পার্বত্য অঞ্চলের এক নীল আকাশে। প্রণবদা! প্রণবদা যাবে আমাদের সাথে! হিমালয়ের বরপুত্র যাবে আমাদের সাথে! তখনই বুঝেছিলাম, এই ভ্রমণ আশীর্বাদ হয়ে নামতে চলেছে আমার জীবন ও যাপনে।
অতএব, আমি ও আমার তিন সফরসঙ্গী। আমার স্ত্রী রিশিয়া, ভাই জিত, ও প্রণবদা।
আবার বুক দুরুদুরু। এবার বুকে অল্প মেঘ। যাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই প্রণবদা বলছিল, হিমাচলে বৃষ্টি হচ্ছে প্রবল(যারা জানেন না, তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, হিমাচল প্রদেশেরই একটি জেলা স্পিতি। বাকি খুঁটিনাটি চলতে চলতে বলব) পাহাড়ে বৃষ্টির ভরসা নেই। আমার মনখারাপে প্রণবদার সান্ত্বনা। “কিছু ভাবিস না। পাহাড়ে মনখারাপ করতে নেই। হিমালয় যতটুকু দেয়, ততটুকুই”। মন কি আর শান্ত হয়? মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল, ওই তীব্র নীল আকাশ যদি না পাই? যদি রাস্তা ধসে বন্ধ হয়ে যায়? যদি মেঘের ভ্রুকুটি ঘিরে ধরে বরফশুভ্র পর্বতের চূড়াগুলো? প্রাণপণে ঈশ্বরকে ডাকছি। সব শান্ত করে দাও। দাও না গো। দেখতে দাও না গো আমাকে। রাখতে দাও না বুকের ভেতরে একটুকরো রৌদ্রজ্জ্বল মঠ। বারবার প্রণবদাকে জিজ্ঞেস করছি। আবহাওয়া ঠিক হবে তো? যেরকম নীল আকাশ চাইছি, পাব তো? প্রণবদা আবার। “কিছু ভাবিস না। পাহাড়ে মনখারাপ করতে নেই। হিমালয় যতটুকু দেয়, ততটুকুই”।
যেদিন যাত্রা শুরু, আমরা যেদিন বহরমপুর থেকে বেরোব, সেদিন প্রণবদা শিমলা পৌঁছে গেছে। শিমলায় প্রবল বৃষ্টি। আশংকা তীব্র হচ্ছে আমারও। কী জানি কী আছে কপালে। যাই হোক, লাফিয়ে পড়লাম এবার। গোছগাছ করে বাড়ি থেকে বেরোনো। রিশিয়ার দাদা (রাজদীপ ভৌমিক) ও সুজয়দা (দাদার বন্ধু) আমাদের সারারাত ড্রাইভ করে পৌঁছে দিল দমদম এয়ারপোর্ট। (বহরমপুর থেকে কোলকাতা যাওয়ার পথে চাকদা থেকে গাড়িতে উঠেছিল জিত) ভোরবেলা ফ্লাইট। আমি বসলাম উইন্ডো সিটে। জীবনের প্রথম ফ্লাইট। পাখির চোখে পৃথিবী দেখা। আমার মনে তখন শিশুর বিস্ম্বয়। পায়ের নিচে আকাশ। ওপরেও। দুই আকাশ কেমন মিশে গেছে। আর অজস্র ডিঙির মত সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে এদিক ওদিক। মহাকাশ ও আকাশের প্রয়াগ বোধহয় একেই বলে। আমার মস্তিষ্কে মহাপৃথিবীর ছায়া।
মাঝে দিল্লিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফ্লাইট চেঞ্জ করে আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই চণ্ডীগড়। দূরে পাহাড়ের সারি। সাজানোগোছানো ছিমছাম শহর চণ্ডীগড়। এয়ারপোর্টের বাইরেই নিজের গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আমাদের আরেক সফরসঙ্গী। আমাদের জুগনুদা। হাসিখুশি ও সদালাপী মানুষ জুগনু রাকা। এনার নম্বর দিয়েছিল উমাদা(কবি উমাপদ কর। উমাদা স্পিতি গিয়েছে আগেই। উমাদার থেকেই পাওয়া জুগনুদার নম্বর। সেখান থেকেই যোগাযোগ)
জুগনুদার গাড়িতেই পথে খাওয়াদাওয়া সেরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। এলাম শিমলা। সামনাসামনি প্রথম দেখা প্রণবদার সাথে। প্রণবদার বন্ধুর হোটেল।
বৃষ্টি তখন একদম থেমে গেছে। পড়ন্ত রোদের আলো খেলা করছে আমাদের চোখেমুখে।
পড়ন্ত রোদের আলোয় উদ্ভাসিত শিমলা। আকাশে একটি দুটি করে তারা উঠছে।
আর, আমাদের কোলে তুলে পড়ন্ত রোদেই হাসছেন হিমালয়।
পর্ব-২ (শিমলা থেকে কল্পা) ২৫/০৯/২০২১
পথশ্রমের ক্লান্তিতে ঘুমোলাম অকাতরে। পরের দিন সকাল ৯.৩০ নাগাদ বেরোলাম ২২২ কিমি দূরে কল্পার উদ্দেশ্যে। শরীর একদম ঝরঝরে। আমরা চারজন। সামনের সিটে প্রণবদা। মাঝে আমি আর রিশিয়া। পেছনে জিত। (পুরো জার্নিতেই এটা আমাদের কম্বিনেশন ছিল) গাড়িতে চলছে গাইডের গান। গুনগুণিয়ে গাইছেন জুগনুদা। আজ ফির জিনে কি তমন্না হ্যায়। উজ্জ্বল রোদে ঝকঝক করছে দূরের পাহাড়শ্রেণি। সবুজ আর নীলের অপূর্ব মিশ্রণ। প্রণবদা একের পর এক অভিজ্ঞতা বলছে গল্পের মত করে। মাঝে নারকান্ডায় সামান্য প্রাতরাশ সেরে আবার রওনা। দূরে অল্প অল্প বরফে ঢাকা পাহাড়। জুগনুদা বলছে “ওহি তো জানা হ্যায় জি’’। গল্প চলে। ভ্রমণে বেলা গড়ায়। পরিবর্তিত হতে থাকে পাহাড়ের রূপ। কখনও ঝরনাধারা, পাহাড়ি গাভীর দল ঢাল বেয়ে নেমে আসে। কখনও অল্প মেঘ এসে ঢেকে দেয় উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়া। কিন্নর জেলায় প্রবেশের আগে দুপুরের খাবার। ছবি তোলা। এখানে পাহাড় আরও উঁচু। কী যেন এক অচিন দেশে প্রবেশ করছি। রাস্তা এখানে বিপজ্জনক। কখনও খাদের তলা দিয়ে, কখনও হুমড়ি খেয়ে থাকা কোনো প্রকান্ড পাথরের নিচ দিয়ে গাড়ি চলছে। জুগনুদার হাত অসাধারণ। গান বাজছে “অভি জিন্দা হু তো জি লেনে দো”।
ধীরে ধীরে সবুজ কমে আসে। এইতো এবার। এবার সেই দেশের কাছাকাছি। যাকে স্বপ্নে লালন করেছি। গাড়ির কাচে মাথা রেখে ধীর দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে যাচ্ছি। হঠাৎ প্রণবদা দেখালো, “ওই বাঁকটা পেরিয়েই কিন্নর কৈলাস দেখতে পাবি”। বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলোয় পাহাড়ে তখন চলছে রঙের খেলা। ধূসর পাহাড়ের মাথায় বরফ জমে আছে। গেরুয়া সন্ন্যাসীর মত ধ্যানমগ্ন দেখাচ্ছে কিন্নর কৈলাসকে। যুগ যুগ ধরে এভাবেই এক অশেষ আরাধনায় হিমালয় দাঁড়িয়ে আছেন। রেকংপিও পেরিয়ে অবশেষে কল্পা। গল্পে হাসিতে আড্ডায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। দীর্ঘ যাত্রার পর পেলাম নভ নেগির সান্নিধ্য। পাহাড়ি মানুষের হৃদয়ে আরও কত পাহাড় যে জমে আছে। সে পাহাড়ের ভার নেই। আলিঙ্গনে গলে যায় যেন কত যুগের বরফ। গাড়ি যেখানে থামল, কিছুটা হেঁটে আরও নিচে গিয়ে নভ নেগিজির গেস্টহাউস। ছোট্ট এক বাগান। ফুলের মতই ফুটে আছে শিশু দুই পাহাড়ি কুকুর। প্রণবদার আশীর্বাদেই অসাধারণ এই জায়গায় থাকার সুযোগ। গল্পে গল্পে সন্ধে পেরিয়ে রাত। প্রণবদা একের পর এক বলে যাচ্ছে সাধুসন্ন্যাসী এবং বিপদ তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়া অভিযাত্রীদের কথা। কথার ফাঁকেই খাওয়াদাওয়া। ঠান্ডা প্রবল এখানে। হু হু করে বইছে হিমালয়ের হিমেল হাওয়া। নক্ষত্রখচিত রাত। ধীরে ধীরে ঘুম নামে দুচোখে।
পরেরদিনও রইলাম কল্পাতেই। রোগি ভিলেজ, সুইসাইড পয়েন্ট, (জানি না সুইসাইড পয়েন্ট কেন দর্শনীয় স্থান হিসেবে গণ্য হয়) প্রাচীন চামুন্ডা মন্দির ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান কল্পার আশেপাশে রয়েছে। চামুণ্ডা মন্দিরের পাশেই দেখলাম শান্ত এক প্রাইমারি স্কুল। প্রণবদা আমাদের সাথে আসেনি। নভ নেগিজির সাথে হিমাচল প্রদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পাহাড়ি মানুষের জনজীবনের গল্পে মত্ত। অগত্যা আমরা তিনমূর্তি। আমি রিশিয়া জিত। আর আমাদের দুর্গের মত ঘিরে রেখেছে হিমালয়। কিন্নর কৈলাস সহ একের পর এক বরফস্নাত শৃঙ্গ। মন ভরে না। চোখও ভরে না। নিস্তব্ধতার নিজস্ব অভিঘাত আছে। নিজস্ব তরঙ্গ। সে ঢেউ সবাই পায় না। আর সে ঢেউ পেলে বাউল সুর ভেসে আসে হিমালয়ের হৃদিঝরনায়। পাহাড় এমন এক ক্ষত, যার কাছে বারবার শুধু ফিরে আসতে হয়।
পর্ব-৩ ( কল্পা থেকে কানাম। নভ নেগিজির বাড়ি) ২৭/০৯/২০২১
কল্পায় পুরো একদিন কাটিয়ে এবার কানাম গ্রামে এলাম। নভ নেগিজির নিজস্ব বাসভবন। প্রণবদার আশীর্বাদেই এখানে থাকার সুযোগ হল। নভ নেগিজির বাড়িটি এমন স্থানে, যা একইসাথে স্বর্গীয় ও বিপজ্জনক। কানাম গ্রামে পৌঁছালাম যখন, সূর্য তখন প্রায় মধ্যগগনে। দূরে ঝকঝক করছে গগনচুম্বী হিমালয়। ঘন নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ ভাসছে খন্ড খন্ড। শান্ত এক পার্বত্য গ্রাম এই কানাম। কয়েকঘর বসতি, অল্প চাষের জমি, আপেলবাগান এবং অতি প্রাচীন এক মনাস্ট্রি রয়েছে। আর আছেন স্বয়ং হিমালয়। নভ নেগিজির বাড়িতে ছিলেন ওনার স্ত্রী এবং মেয়ে ডেজুম। পাহাড়ি মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনার কথা যতই বলা যায়, ততই যেন কম। এখানে খেলাম চিলগোজা। এক ধরনের স্থানীয় বাদাম। সাথে আলমন্ড, আখরোট। আর অসাধারণ ডেজুমের আঁকার হাত। বাড়ির দেওয়াল যেন শিশুনির্মিত এক স্থাপত্য।
দুপুরের খাওয়া শেষে এলাম নেগিজির বাড়ির পেছন দিকটায়। বাড়ির পেছনেই কয়েক হাজার ফুট গভীর খাদ। সামনে সুউচ্চ পর্বতরাজি। অনেক অনেক নিচে সুতোর মত বয়ে চলেছে শতদ্রু নদী। প্রকৃতি মহাধ্যানস্থ। কীভাবে পাহাড়ি মানুষেরা যুগ যুগ ধরে এই প্রতিকূল পরিবেশে বাস করছে, ভাবছিলাম! নেগিজি দূরে আঙুল দেখালেন ‘‘উস পাহাড় কে উসপার তিব্বত হ্যায়।’’ শান্ত হয়ে বসে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। এ ধ্যান ফুরোয় না। ফুরোবার নয়। বিকেলে গেলাম কানাম মনাস্ট্রি। পাথর ও কাঠের কাজের অপূর্ব স্থাপত্য। সুদূর অতীতে যেভাবে বানানো হয়েছিল, এখনও অবিকল সেরকমই আছে। সামান্য কিছু সংস্কার হয়তো। মঠ প্রাঙ্গণে সাতরঙা বৌদ্ধ পতাকা উড়ছে। কোন সুদূর অতীতে এক মাহেন্দ্রক্ষণে এই মঠ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ভেতরে ঢুকলাম। এখনও তানজ্যুর ও কানজ্যুরের হাজার বছরের প্রাচীন পৃষ্ঠার গন্ধ ভেসে আছে গোটা ঘরে। স্বল্প দীপালোকে আলোকিত অন্ধকার এবং বাদ্যসহ বৌদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণে আমরা তখন জাতকসম। পূর্বজন্ম হয়তো ঘটছিল মাথার খুব কাছেই। এখনও হয়তো সিদ্ধার্থর পায়ের ছাপ ঘটছে খুব কাছেই। যুগ যুগ ধরে হে আমার জন্ম, হে আমার মৃত্যু, তুমি কীভাবে বারবার ঘটে চলেছো আর এই ঘটমানতার মহাবিস্ময়ে আবিষ্ট করে রাখছ আমাকে। আমাদের এই জীবন নিজেই এক ভ্রমণ। মৃত্যুও ভ্রমণ। যেন ভ্রমণ ছাড়া আর কিছু নেই এ মহাবিশ্বে।
পাহাড়ে তখন সূর্যাস্তের সোনালি রঙ।
ধীরপায়ে সন্ধে নামছে কানামে।
পর্ব-৪ (কানাম থেকে নাকো)২৮/০৯/২১
রাত্রি কাটল গল্পে গল্পে। নেগিজির পরিবারের সহজ সরল অনাবিল আতিথেয়তা এবং বউদির হাতে বানানো সুস্বাদু খাবারের আমেজে। পরদিন সকালে বিদায় নেওয়ার আগে আমাদের চোখে জল। কী জানি কবে আসব আবার। কত মানুষ কত মানুষকে এভাবেই পথে ফেলে রেখে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগোয়। ছেড়ে যাওয়ার বিষাদ এবং সামনের পথের উত্তেজনাই এই চলার পথে অক্সিজেন যোগায় হয়তো। যুগযুগ ধরে এভাবেই হাঁটতে হাঁটতেই বুঝি প্রকৃত সন্ন্যাস নেওয়া।
এবার গন্তব্য নাকো। কানাম ছেড়ে যত এগোতে থাকলাম, ধীরে ধীরে গাছের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যেতে থাকল। আর ততই চোখের সামনে খুলে যেতে থাকল একটা নতুন গ্রহ। যেন চাঁদে এসেছি হঠাৎ। যেন মঙ্গলের মাটি। রুক্ষ পাথুরে আর পর্বতের মাথায় বরফ পড়ে আছে। গাড়িতে তখন বিভিন্ন গল্প আর হরেক কিসিমের আড্ডা। বক্তা প্রণবদা। শ্রোতা আমরা তিন। কখনও জুগনুজি মজা করছেন। ধীরে ধীরে গাড়ি এগোয় খাব ব্রিজের কাছে। সাময়িক বিরতি ও ছবি তোলার পালা। খাব ব্রিজকেই স্পিতির প্রবেশপথ বলা হয়। যদিও নাকো কিন্তু আপার কিন্নর জেলারই অংশ। তবু এখানকার ভূপ্রকৃতি স্পিতি জেলার মতই। খাব ব্রিজের পাশেই স্পিতি নদী এবং শতদ্রু নদীর সঙ্গমস্থল। এবার থেকে আমরা স্পিতি নদীকে পাশে রেখেই উঠব।
খাব ব্রিজের পর গাছপালা একেবারেই কমে এল। যেন চাঁদে ঘুরে বেড়াচ্ছি। চারিদিকে এক অপার নিস্তব্ধতা। এক মহাশূন্যতা আমাকে গ্রাস করল হঠাৎ। এই শান্ত সুবিশাল নীলাকাশ, তার নিচে এই মহাবিস্তৃত পর্বতমালা, তারও নিচে আমি, সবটা যেন কোন এক আলোমাখা এক নাভিকেন্দ্রে জড়িয়ে আছে। সুদূর অতীতে এক মহাসমুদ্র, তার থেকেই হিমালয়, আমি সেই সমুদ্রেও মাছ হয়ে ছিলাম কি? কিংবা তারও আগে? জড়বস্তু হয়ে, চাঁদের আলো হয়ে, বরফ হয়ে ঝরেছিলাম কি এখানেই এক অচেনা পাথরের গায়ে? এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা আমাকে এমন ভাবেই গ্রাস করল, এরপর থেকে বাকিপথ ভ্রমণকালে আমি খুব বেশি কথা আর বলতে পারিনি। কেমন বোবাভাব এসে ঘিরে ধরে রেখেছিল আমাকে। তার সূত্রপাত হয় এভাবেই। এখানেই।
নাকো পৌঁছে তাশিজির হোমস্টেতে উঠলাম। উমাদা আগেই বলেছিল তাশিজির কথা। কোনোভাবেই আমাকে নিজের মালপত্র বইতে দেবেন না। হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিলেন। “হমে দিজিয়ে।’’ কী বলব! মনে হল ভাই এসেছে দাদার কাছে। পরিষ্কার ছিমছাম হোমস্টে। স্নান করে ফ্রেশ হলাম। হোমস্টের বারান্দা থেকে নাকো লেকের কিছুটা, এবং নয়নাভিরাম হিমালয় তার শাখাপ্রশাখা মেলে অনন্ত অব্দি ছড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পরেই দেখতে গেলাম নাকো লেক। প্রণবদা বহুবার এসেছে। বলল তোরা ঘুরে আয়। আমি একটু বসি। জল অনেক কমে এসেছে এখন। তবু সৌন্দর্যে ভাঁটা পড়েছে কই? চারপাশে গাছপালার বৃত্ত। নীল আকাশের ছায়া পড়ে আছে লেকের জলে। পুরো লেকটা পায়ে হেঁটে ঘুরলাম। বসলাম কিছুক্ষণ। তারপর লাঞ্চ। পরিপাটি তিব্বতি কায়দায়। তিব্বতি পাত্রে। এবং শুনলাম এখানকার সমস্ত হোমস্টেতেই এভাবে খাওয়ার ব্যবস্থা। লাঞ্চ সেরে দুপুরে গেলাম নাকো গ্রামটা ঘুরে দেখতে। সমস্ত স্থানীয় বাড়িই তিব্বতি ধাঁচে নির্মিত। মাটি এবং ওপরে কাঠ। সাদা ও লাল রঙের দেওয়াল। শীতকালে পুরো অঞ্চল বরফে ঢেকে যায়। চাষবাসও তখন বন্ধ। তাই এখন থেকেই খাদ্য মজুত করে রাখা। কী অমানুষিক পরিশ্রম করে এখানে বেঁচে আছে মানুষ! তবু মুখের হাসিটি অক্ষুণ্ণ রেখেছে। মুখের অজস্র রেখায় রেখান্বিত আছে হিমালয়েরই ধ্যানস্থ গিরিখাত যেন। আর আমরা সমতলের মানুষেরা? সামান্য এক কিলোমিটার হাঁটলেই গাড়ি বা টুকটুক খুঁজি। হাসি পেয়ে গেল নিজের ওপরেই। গ্রামের এক ধারে নাকো মনাস্ট্রি। শতাব্দীপ্রাচীন। ঝকঝক করছে রোদে। স্থানীয় মানুষেরা কীসের পুজো করছেন। আরাধনার ব্যপ্তি এবং স্তবের গাম্ভীর্য আমাকেও কোথায় হারিয়ে নিয়ে গেল।
হোমস্টেতে ফেরার পথেই উলটো দিকের এক রাস্তা দিয়ে উঠলাম নাকো টপে। রিশিয়া, আমার স্ত্রী আর গেল না। আমরাই গেলাম বাকিরা। আমি জিত আর জুগনুদা। পাকদণ্ডী পাথুরে পথ। জুগনুদা অনায়াসে উঠছে। আমরা দুলতে দুলতে। তবে ওঠার পরের দৃশ্য ভাষায় কহতব্য নয়। পাখির চোখ দিয়ে নাকো লেক দেখাচ্ছে পাখির ডিমের মত। হিমালয় ১৮০ ডিগ্রি ঘিরে গ্রাস করছেন আমাদের। শুধু একটা বিশাল ঘন্টা। তার চারপাশে অজস্র বৌদ্ধ পতাকা আর ছোট ছোট পাথরের ওপর পাথর সাজানো স্তূপ। মানুষের প্রার্থনা এখানে শান্ত হয়ে আছে। এক অদ্ভুত চুম্বকীয় শক্তি আমাকে গ্রাস করল। কেন জানি না, হঠাৎ বাড়ির কথা ভেসে উঠল একবার। ফেরার আগ্রহে নয়। এমনিই। যেন খুব কাছেই কোথাও মা এসে দাঁড়িয়ে আছে।
এই তবে মহাকরুণার স্পর্শ? ক্ষণেক পাই। পেয়ে হারাই। খুঁজে ফিরি বারবার।
খ্যাপার পরশপাথর যেন।
পর্ব-৫ (নাকো থেকে টাবো হয়ে ডানকার) ২৯/০৯/২১
পরদিন খুব সকালে বেরোলাম নাকো থেকে। গন্তব্য গ্যু মনাস্ট্রি ও টাবো মনাস্ট্রি হয়ে ডানকার ভিলেজ। তাশিজির আপ্যায়ন হয়ে রইল সারাজীবনের সম্বল। বারবার ভাবছিলাম, স্পিতি আবার আসব। থাকব এখানেই। স্পিতিতে যেকটা হোমস্টেতে থেকেছি, ফেরার পরে সবার কথাই খুব মনে পড়ে। এখনও। যেন গতজন্মের আত্মীয় এঁরা সবাই।
নাকো থেকে কিছুটা যাওয়ার পরেই স্পিতি জেলা অফিশিয়ালি শুরু হয়ে যায়। মাথা গাড়ির কাচে ঠেকিয়ে শুধু দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম হিমালয়ের বিশাল রূপ। যেন অঘোরের বিরাট জটাজাল বিস্তৃত হয়ে আছে নীল আকাশের নিচেই। তাকে জড়িয়ে বইছে স্পিতি নদী। প্রকৃতিকে দেখার মাঝেই কিছুক্ষণ পরে পৌঁছে গেলাম গ্যু মনাস্ট্রি। প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো মমি এবং গ্যু মনাস্ট্রি দেখে ফের এগিয়ে চললাম টাবোর পথে। প্রকৃতি এখানে নিস্তব্ধ। ছোট ছোট কিছু গ্রাম মাঝেমধ্যে। কিছুটা সবুজ। কিছু গাছপালা। আগত শীতের অপেক্ষায় হলুদ তাদের পাতা। পাতা ঝরছে। বাদবাকি পুরোটাই ধূসর, ন্যাড়া এবং মাইলের পর মাইল শুধু ফাঁকা। এই শূন্যস্থান ও আমাদের ভেতরের শূন্যতা এখানে বৃত্তে মিশে গেল।
টাবো পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে প্রায় দুপুর। এটি দেশের ওল্ডেস্ট মনাস্ট্রি। ৯৯৬ সালে বৌদ্ধ শ্রমণ রিনচেন জানপো এটি প্রতিষ্ঠা করেন। মনাস্ট্রির ভেতরে খালি পায়ে, মাথা সামান্য নিচু করে ঢুকতে হয়। নত এমনিও হতে হবে। হতেই হবে। মাটির তৈরি এই মনাস্ট্রির ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। কারণ মোবাইল বা ক্যামেরার আলোয় মাটির তৈরি দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলির ক্ষতি হতে পারে। টর্চের আলোয় ফ্রেসকো এবং থাঙ্কার কাজ দেখাচ্ছিল প্রণবদা। অবাক বিস্ময়ে শুধু দেখে যাচ্ছিলাম, মানুষের ভেতরের শিল্পবোধ ও আধ্যাত্মিকতা কতটা গভীর হলে এই কাজ নির্মিত হতে পারে। বৌদ্ধ ও তারাদেবীর নানা রূপ এখানে মিশে আছে। কোথাও মিশরের লিপির মত আঁকা। কোন সুদূর অতীতের গুপ্ত সাধনার সংকেত বহন করছে। তারাদেবীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে কখনও কালী, কখনও করালী। মিশে আছে। সব মিশে আছে। বৌদ্ধ কোনো ছবিতে শ্যাম হয়েছেন। তন্ত্রের জন্ম যে বৌদ্ধ মতেই, এখানে এসে তা অনুভব করা যায়। মানুষের সাধনা মানুষের সাধনায় মিশে আরেক মানুষের সাধনায় প্রতিফলিত হয়। সাধনা নিজেই এক পাহাড়ি নদী। কোথা থেকে কোথায় ছড়িয়েছে এই মঠ। টাবো থেকে মুর্শিদাবাদ সব একই সুতোয় গাঁথা। একই শিল্পীর অন্যমনস্ক পথে ভ্রমণ যেন। মনে হচ্ছিল আমি ৯৯৬ সালের এক শ্রমণ। আমার হাত পা হৃদপিণ্ড কিছু নেই। কিচ্ছু না। শুধু চোখ, মন, আর মস্তিষ্ক জেগে আছে কত অসংখ্য ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি ও ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে। কানের কান, চোখের চোখ, মাথার মাথা হয়ে। নিজে বহুবার এসেছে, তবুও দেখাতে দেখাতে আনন্দে ও শ্রদ্ধায় বিহ্বল হয়ে পড়েছিল প্রণবদা। যেন এবারেই প্রথম।
ডানকার পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল। ডানকারের ভূমিরূপ অদ্ভুত। যেন পাহাড়ের মাটি ফুঁড়ে কিছু প্রদীপের গাছা বেরিয়ে এসেছে। হিমালয়কে সন্ধ্যারতি করবে বলে। যেন বিশাল কিছু আঙুল। সমুদ্র যখন পাহাড় হয়ে গেল, এঁরা শেষবার যেন আঙুল তুলে আকাশকে কিছু বলতে চেয়েছিল। ১৩০০০ ফুট উচ্চতায় এক অসাধারণ গ্রাম ডানকার। সুর্যাস্তের আলোয় ঝুলে আছে। এখানে এসে উঠলাম “ইয়ে মা হো” হোমস্টেতে। পরিষ্কার ছিমছাম ঘরগুলি। নিখুঁত তিব্বতী কায়দায় বানানো। বেশ কিছু ছবি তুললাম এখানে। মনাস্ট্রি গেলাম। ডানকারের মনাস্ট্রিটা একদম এক উঁচু পাহাড়ের ধারে। এক পা ফসকালো মানেই নিচে হাজার হাজার ফুটের খাদ। সুতোর মত বইছে স্পিতি নদী। আরেকটু দূরে দেখা যায় পিন নদী। এক উঁচু পাথরের ওপর বসলাম তিনজনে। আমি রিশিয়া আর জিত। প্রণবদা, বহুবার দেখেছে, তাই এলো না। স্বপ্নের এক সফর চলছে আমাদের। কিছুক্ষণ বসে আবার নেমে এসে এলাম হোমস্টেতে। সন্ধে কাটল গল্পে গানে। সাথে স্পিতির বিখ্যাত আপেল। যারা খাননি, এর স্বর্গীয় স্বাদ তারা বুঝবেন না। আপেল আমি খাই না এমনিতে। হোমস্টের গৃহকর্ত্রী জোর করে খাওয়ালেন আমাকে। “খা লো বেটা। অগর তুমহারে মা ইয়াহা হোতে তো ওহ ভি এয়সে হি খিলাতে”। এরপর আর কথা হয় না। চোখে জল লুকিয়ে, আমার এই মাকে নীরবে প্রণাম জানিয়ে আমি বেরিয়ে এসেছিলাম ঘরের বাইরে। একা। কত অসংখ্য ছায়াপথ দেখা যাচ্ছে। আকাশের ওপর যেন হালকা সবুজ এক নক্ষত্রখচিত মায়াজাল। ঝাপসা চোখ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। কত তারা। কত অসংখ্য তারা গো। পূর্বপুরুষ, হে আমার পূর্বপুরুষ, আমাকে আশীর্বাদ করো।
জ্যাকেটে রাখা মোবাইলে তখন বাজছেন রবীন্দ্রনাথ।
“তোমারো অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই’’
এই ধাওয়া। কোন আকাশের কোন অসীমে এই ধেয়ে যাওয়া। জন্মমৃত্যু নিয়ে অসংখ্যবার শুধু ধেয়ে যাওয়া।
এই দেহ আদপেই এক মহাকাশযান।
পর্ব-৬ (ডানকার থেকে পিন ভ্যালি। মুদ ভিলেজ) ৩০/০৯/২১
পরের গন্তব্য পিন ভ্যালি। পিন ভ্যালির শেষ গ্রাম মুদ। সকালে বেরোলাম। লালুং মনাস্ট্রি গেলাম প্রথমে। ২০০ বছরের পুরনো উইলো গাছ (রিনচেন জানপো এটি বসিয়েছিলেন মঠের মাটিতে) এবং চারমাথা বুদ্ধমুর্তি এখানে বিশেষ দর্শনীয়। অপার্থিব নিস্তব্ধতা চারপাশে। পাহাড় এখানে দুর্গের মত ঘিরে রেখেছে মনাস্ট্রিকে। এ প্রসঙ্গে বলি, স্পিতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ন্যাড়া পাহাড়ের গায়ে অজস্র যুগ ধরে বয়ে যাওয়া হাওয়ায় তৈরি কারুকার্য দেখা যায়, মনে হয় আদিম কারো মুখ যেন ছাঁচে বসানো। কেউ যেন এই অপার্থিব জগতে আমাদের ওপর তার স্নেহদৃষ্টি রেখেছেন সদাসর্বদা। লালুং মনাস্ট্রির পাশে এক পাহাড়ে হঠাৎ যেন মনে হল সিদ্ধার্থ বুদ্ধের মুখ। প্রশান্তি নেমে আসে এভাবেও!
এরপর এলো পিন নদী। অগস্ত্য ব্রিজ পেরিয়ে এবার পিন নদীকে সাক্ষী রেখে এগোনো ১২৫০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত মুদ ভিলেজের দিকে। পিন ভ্যালি স্পিতির বাকি সমস্ত অঞ্চল থেকে ভূপ্রকৃতিগত ভাবে আলাদা। এখানে পাহাড়ের রঙ কখনও লাল, কখনও পিঙ্গল, কখনও এমনকি গোলাপী আবার কখনও ঘোর ইস্পাতবর্ণ। একটা পাহাড়ের মাথা দেখে মনে হল, হাওয়া যেন যুগ যুগ ধরে সস্নেহে চিরুণি দিয়ে আঁচড়ে দিয়েছে। সমস্ত পাহাড়ের মাথায় অল্পবিস্তর বরফ পড়ে আছে। বেলা গড়ায় গাড়িতেই। গল্পে গল্পে। প্রণবদা একের পর এক ঘটনা বলে যাচ্ছে অভিজ্ঞতার ঝুলি উজাড় করে। আমরা নীরব শ্রোতা। আর আমি তো সেই নাকো থেকেই নীরব হয়ে গেছি।
মুদ ভিলেজ পৌঁছে উঠলাম নামখা হোমস্টেতে। খাওয়াদাওয়া হল তারা হোমস্টেতে। প্রচন্ড হাওয়া বইছে চারিদিকে। একদম বরফ ভেঙে নেমে আসা ঠান্ডা হাওয়া। নাকেমুখে গরম কাপড় জড়িয়ে নিলাম। নয়তো শরীর শুকিয়ে রক্ত পড়তে পারে। আশ্চর্য বাঙালি, এর মধ্যেও দেখলাম রিশিয়া অবলীলায় স্নান সেরে নিল। বিকেলের দিকে ঘুরে দেখলাম মুদ ভিলেজ। সূর্যাস্তে কী অসাধারণ লাগছিল দূরের পাহাড়গুলো। ক্লান্ত এক পাহাড়ি গাভী তখন ঢাল বেয়ে নেমে আসছে ঘরের দিকে।
বারবার এই নেমে আসা। বারবার এই একই সূর্যাস্ত। তবু নির্নিমেষ চেয়ে থাকা।
দ্বিতীয় ভাগ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।



























Comments