অবিশ্বাস্য ওই সৃষ্টি এখনও সম্ভ্রম জাগায়

"ছেলেবেলার পানের ডাবর থেকে লাফিয়ে-ওঠা কেয়াখয়েরের উল্লাস নিয়ে
বাতাস বুনছে বীজানুহীন অভ্যর্থনা।
টর্চের আলো ঘোরে উত্তরে। ওটা কি?
ঝড়ে উলটোনো মহান বটের মাথামুন্ডুহীণ আধখানা।
টর্চের আলো ঘোরে দক্ষিণে। ওটা কি?
ভূল স্রোতের ফাঁদে-পড়া নদীর অকাল-ধ্বস।"
পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা পড়তে পড়তে মনটা চলে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন আগের একটা সকালে। অন্ধকার একটা ঘর, দেওয়ালে টর্চের ইতিউতি আলো, কিছু ছবি, কিছু লেখা, কিছু চিরে যাওয়ার দাগ আর সব মিলিয়ে এক আশ্চর্য্য কৌতূহল।বাইরে আলো। সূর্যের আলোর তেজ। চারিদিকে রুক্ষ পাহাড় তার রস বিসর্জন দিয়ে শুধু রূপেই মোহিত করে রেখেছে আমাদের। ব্যালকনি থেকে সেটাই দেখছিলাম। নীচে ব্যাঘ্র সদৃশ দুই সারমেয়র বলিষ্ঠ পদচারণা আর সবুজ থেকে ধুসরে পা দেওয়া আমরা। হঠাৎই ফোন জামাইবাবুর, একটু এসো। গেলাম আর তারপরই দেখলাম সেই আশ্চর্য্য জগৎ। এতক্ষণে নামটাই বলতে ভুলে গিয়েছি, এই দেখুন কি অবস্থা। নতুন ঝকঝকে এক monestery এর পাশে কাদামাটি রঙের এক পুরনো monestery, যাবো তার ভেতরেই।
রূপ দেখে যেমন মন বোঝা যায়না তেমনি বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যাবে না কেমন করে একটা পুরো ইতিহাসকে আগলে রেখে দিয়েছে এই ঘরগুলো। ইতিহাস শুধু নয় ভূগোল, বিজ্ঞান , সংস্কৃতির এক আধার যে আধারে কেটে যায় আঁধার, টর্চের আলোয়। পর্যটকদের হাতের টর্চ তখন দেওয়ালে খেলা করছে। আলোকরশ্মির নৃত্য ভঙ্গিমায় দেওয়ালে ফুটে উঠছে একের পর এক মুহুর্ত, কিসের ?? হিমালয়ের অজন্তা তখন পেঁয়াজের খোসার মত একে একে উন্মোচিত করছে নিজেকে। 996 A D তে তৈরী হওয়া মাটির তৈরী এই monestery তে আছে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বছরের পর বছর ধরে। আছে ভূমিকম্পে অটল থাকার শক্তি, আছে প্রকৃতিগতভাবে চরম ভাবাপন্ন জায়গায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। কোথায়??
সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় 3050 মিটার উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা, Tabo monestery তে আর সেখানেই দেখলাম প্রকৃতির এই খেয়াল। সিমলা থেকে সারাহান হয়ে যখন কল্পা পৌঁছালাম তখন আমরা শ্রান্ত, ক্লান্ত। দেড় দিন ধ্বসে আটকে থেকে মাঝে মাঝে ভেবে নিচ্ছি সেইদিন সকালে যদি 15মিনিট আগে বেরোতাম সারাহান থেকে তাহলে কি হতো? জীবন মৃত্যুর মাঝে কি মাত্র 15 মিনিটের প্রভেদ থাকতো নাকি আমরা পারতাম ধ্বসে যাওয়া পাহাড়ের ওপর প্রান্তে পৌঁছে যেতে। সময়ের ধারাপাত কি এতটাই সোজা যে তার পাতায় লেখা যায় জীবনের অঙ্ক। ওপর থেকে পাথর গুলো পড়ছে আর তলিয়ে যাচ্ছে নীচের বয়ে যাওয়া নদীতে, হয়তো ভেসেও যাবে কোনোদিন। এভাবেই নিয়তির ডাকে আমাদের পথচলা, প্রকৃতির টানে বারবার বেরিয়ে গিয়ে এভাবেই ফিরে আসা ।
গিয়েছিলাম হিমালয়ের অজন্তায়। চিরপরিচিত সিমলার রাজকীয়তা, Indian Institute of Advance studies এর ঐতিহ্য,স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের দূরদর্শিতা , জাখু মন্দিরের বাঁদরের চঞ্চলতা সব দেখে , সারাহানের ভিমাকালী মন্দিরের গুরুগম্ভীর পরিবেশ, কাঠের কারুকার্য দেখে এগোতে গিয়েই সেই বিপত্তি, একটা বড় পাহাড় নেমে এলো সামনে। তারপর দীর্ঘ বিরতি, 36 ঘণ্টা পর রাতের অন্ধকারে শ্রান্ত ক্লান্ত ভয়ার্ত কিছু মানুষের একচিলতে জায়গা দিয়ে যাওয়া, আতঙ্ক আর আনন্দের সংমিশ্রণ । পরদিন অবশ্য নতুন প্রভাত এলো কিন্নর কৈলাশ পর্বতের মাথায় সোনার রঙে, মেঘের চাদরে ক্ষণে ক্ষণে মুখ লুকালো সে। নববধূর সলাজ হাসি যেন তার চোখে মুখে আবার কখনো সে চপলা, কখনো যেন গম্ভীর পুজারিনী। আবার বিষাদগ্রস্তা কখনো সে বৃষ্টি ধারায় সিঞ্চিত করে নিজেকে।
আর পরদিন ই খাব সঙ্গম, নাকো হয়ে তাবো, সেই অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা হিমাচলের অজন্তার দিকে যার কথা দিয়েই শুরু করেছি এই সফরনামা। মাঝে giu monestery, যেখানে এখনও আছেন জীবন্ত এক মানুষ, মমি হয়ে ( লোককথা অনুযায়ী)। রুক্ষ পর্বতগাত্র, বাদামী হলুদ রঙের খেলায় ধূসর মনের অবগাহন সেখানে। কোথায়? কি মনাষ্ট্রির আনাচে কানাচে তখন শুধুই বিস্ময়ের খেলা। কয়েকটা দেশলাই বাক্স একসাথে টাঙানো আছে নাকি মৌচাক? প্রকৃতির সৃষ্টি নাকি মানুষের? হ্যাঁ মানুষেরই। বিজ্ঞান এতটাই উন্নত ছিল তখন যে অবিশ্বাস্য ওই সৃষ্টি এখনও সম্ভ্রম জাগায়।
এরপর কাজা, গতানুগতিক কমিক , হিক্কিম, ল্যাংজা গ্রাম, পৃথিবীর উচ্চতম post অফিস আর ল্যাংযা গ্রামের অবস্থান, তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ যার মাথায় আর ভগবান পদ্মসম্ভব যার পাহারাদার, বহুদূর দেখতে পান তিনি, আমরাও দেখতে পাই ওনাকে বহুদূর থেকে। পথ এগিয়ে যায় পথের খোঁজে আর আমরাও এগিয়ে চলি বুভুক্ষু মন নিয়ে তৃষ্ণা মেটাতে, প্রকৃতির রূপ রস আস্বাদন করতে । একদিকে রুক্ষ পাহাড় একদিকে বহু নীচে খরস্রোতা নদী, পাশে ভেসে আসা গাড়ির ধ্বংসাবশেষ, মনটা কি চলে গেলো অন্যদিকে?
জীবন মৃত্যুর দোলাচলে দুলতে দুলতেই পার হয়ে এলাম কুনজুম পাস, কুন্জুম মাতার মন্দিরে প্রণাম করে। আর দেখলাম পুরো ভূগোল বইয়ের পাতা গুলো উঠে এসেছে প্রকৃতির ক্যানভাসে।
এরপর চন্দ্রতাল । প্রকৃতির আর এক বিস্ময়, পান্না সবুজ জল আর সূর্যের আলোর সাথে রং পরিবর্তনের এক অদ্ভুত সমাহার। স্থির হয়ে যেতে হয় এখানে এসে যেন সময় থমকে থাকে। ঠান্ডা হাওয়া , তিরতির করে বয়ে যাওয়া নদীর উৎসমুখ মনে করিয়ে দেয় সেই ছোট্টবেলার আঁকার খাতা, একটা তিনকোনা বাড়ি, পেছনে পাহাড়, সামনে নদী , খালি বাড়ী আর নৌকার অভাব বাকী সব সেই ছোট্টবেলার পাতা আজ শিহরিত করে ।
"বিস্ময়ে তাই জাগে"
সেই ঘোর নিয়েই ফেরার পালা আবার ইট কাঠের জগতে। সাদা কালো জঞ্জালে ভরা মিথ্যের শহর আমার নয়, তবু সেই লাল নীল সংসারেই ফিরে আসা, আবার প্রতিদিনের দিন গুজরান, হেঁটে দেখা কলকাতা, ঘরের মায়ায়। মন পড়ে থাকে সেই অচিনপুরে, সেই গ্রামগুলো যারা বছরের অনেকটা সময় থাকে বিচ্ছিন্ন বাকী পৃথিবী থেকে, তাদের গাঁও এর বাইরে জগৎ আছে বলেই তারা জানে না। সরল মনে জিজ্ঞেস করে তোমরা কোন গাঁও থেকে এসেছো? সেই জগতে ফেরার ইচ্ছেতেই আবার ঘরে ফেরা, আবার যাবার আশায়।
পথ নির্দেশ : সিমলা - সারাহান - কল্পা - তাবো - কাজা - চন্দ্রতাল - মানালি
Hotel Details:
Shimla - Hotel Bridge view regency
Sarahan - Hotel Snow View
Tabo - Tiger Den
Kalpa: Rakpa Regency
Kaza - Kunzum spiti inn
Losar - Atithi International
Manali- Hotel ceader



























Comments