নালন্দা ,আলোন্দা বুদ্ধগয়া, আ গয়া

অন্ধকার আমাকে নিয়ে ছুটে চলেছে অস্পষ্টালোক ভেদ করে তামসভ্রমণে। মাঝে মাঝে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ,তার বর্ণমালায় ফুটে উঠছে রাজগৃহ। কোথাও তো বৃষ্টির দেখা নেই।তবে এই আলো?এই ডিসেম্বরে ঠান্ডা যথেষ্টই। চারপাশ সাড়া শব্দহীন, অন্তত আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। চলেছি বক্তিয়ারপুর। সেখান থেকে রাজগীর।
সবে দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে।এরকম এক সন্ধ্যায় প্রতীক এবং সংযুক্তা এসে রাজগীর,নালন্দা বুদ্ধগয়া, গয়া যাওয়ার কথা বললো। শুনে মনটা পনেরো বছর পিছনে ফিরে গেল।২০০৭ সাল। প্রথম যখন রাজগীর নালন্দা বুদ্ধগয়া গেছিলাম। অন্যমনস্কভাবেই হ্যাঁ বলে দিলাম। মনে পড়ে গেল নালন্দায় এক ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে আচার্য শীলভদ্র আমাকে আমার বাসগৃহ এবং চৌচির প্রকোষ্ঠ দেখিয়ে কীভাবে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন।
ভোর সাড়ে চারটেয় ট্রেন আমাদের বখতিয়ারপুর স্টেশনে পৌঁছে দিল। সেখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে রাজগীর। এছাড়া একটু অপেক্ষা করলে বাস এবং ট্রেনও আছে রাজগীর যাওয়ার। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেস হয়ে জল খাবার খেয়ে একটা গাড়ি ভাড়া করা হয়। যা আমাদের প্রথমে পাওয়াপুরী তারপর নালন্দা নিয়ে গেল। এই দ্বিতীয় ভ্রমণে যাওয়া হয়নি বিহার শরীফ। বখতিয়ারপুরের দিকে যেতে ১২ কিলোমিটার দূরে বিহারশরীফ। জনশ্রুতি এখানে এসে স্বয়ং বুদ্ধদেব বেশ কয়েক বছর বসবাস করেছিলেন।
প্রথমে গেলাম পাওয়া পুরী,জৈনদের পবিত্র তীর্থস্থান এই জল মন্দিরটি ৷বিশাল সরোবরের মধ্যে এই মন্দির।চারপাশে অজস্র পাখি জলের মধ্যে।এরপর চলে গেলাম নালন্দা ৷সেই নালন্দা যেখানে গতবার বারীনদা এবং প্রণবদার সাথে গেছিলাম এবং দেখা হয়েছিল শ্রী অতীশ দীপঙ্কর এর সাথে।ভাঙা প্রকোষ্ঠে ঘুরে ঘুরে উনি কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।
জানিনা এবার কী হবে।বিভিন্ন ভগ্নস্তুপ পেরিয়ে এ ধার ওধার ঘুরছি হঠাৎ এক অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে এক মহিলা অবয়ব সাৎ করে সরে গেল ৷ কে?তাকে খুঁজতে খুঁজতে একটু এগোতেই হঠাৎ পিছনে শুনলাম খিল খিল হাসির শব্দ৷ঘুরে দেখি এগিয়ে আসছে এক তরুণী lচারপাশে অল্প অন্ধকার হয়ে এসেছে ৷কাছে এসে বলল,কিগো চিনতে পারলে না ?ভালো করে তাকিয়ে দেখি, লাবণ্য !বললাম ,তুমি এখানে ?বলল আমি তো তোমার সাথে সাথেই থাকি ৷গতবার যখন তুমি বুদ্ধগয়া, নালন্দা এসেছিলে- তখন তো বুদ্ধগয়ায় আমাকে চিনতেই পারোনি। বলেছিলাম ``আমিই সুজাতা, বুদ্ধদেবকে পায়েস খাইয়েছিলাম ৷ “বলে সে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল ৷ কেমন নির্বাক বিমূঢ় হয়ে গেলাম ৷ শর্মিলার ডাকে এই জগতে ফিরে এলাম। কতক্ষণ পর কে জানে?
পরদিন টাঙা নিয়ে ঘুরতে গেলাম মণিয়ার মঠ,সোণভান্ডার,রোপ ওয়ে চড়ে সপ্তপর্ণী পাহাড়ের উপর শান্তিস্তুপ, গূধ্রকূট পাহাড়, বিম্বিসারের জেল,স্বর্ণভান্ডার, জয় প্রকাশ নারায়ণ উদ্যান , বেণুবন , ঘোড়া কাটোরা এবং অনেকগুলো সিঁড়ি উঠে পাহাড়ের ঢালে উষ্ণ জলের প্রস্রবণ।অনেক সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল।হঠাৎ শুনি খুব হইচই । দেখি প্রচুর লোক লস্কর নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করতে করতে এগিয়ে আসছেন এক মহিলা, যাকে আলাদা করে চেনা যায় ।পাশ থেকে কে যেন বলল- : “উনি রাজ্যশ্রী , মহারাজ হর্ষবর্ধনের বড় বোন, বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে বেরিয়েছেন ৷ “ আমি খুবই অবাক হলাম। কেননা মৃদুল ও রাজ্যশ্রী তো আমার সাথে একই ট্রেনে রাজগীর এসেছেন।রাতে ফিরে এলাম হোটেলে। এছাড়া আছে সারা দিনের সাফারি পার্ক ভ্রমণ রাজগীরে।
কাল চলে যাব বুদ্ধগয়া।
বুদ্ধগয়ায় ঢোকার মুখে পুলিশ আটকে দিলো। গাড়ি নিয়ে শহরে প্রবেশ নিষেধ। শহরে দলাই লামা এসেছেন। জলখাবার খেয়ে আমরা রাজগীর থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম। গাড়িতে ঘণ্টা তিনেকের একটু বেশি সময় লাগলো, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে প্রতিবছর দলাইলামা আসেন বুদ্ধগয়ায়। মাসখানেক থাকেন এবং প্রার্থনাসভায় যোগ দেন। এই সময় সারা পৃথিবীর বৌদ্ধ ধর্মের মানুষরা এখানে এসে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এবং প্রার্থনাসভায় যোগদানের চেষ্টা করেন।
সমস্ত শহর জুড়ে অজস্র হোটেল বছরে চারবার, মোটামুটি তিন মাস অন্তর কোন না কোনও বৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। ডিসে-জানু বাদে বৈশাখ মাসের বুদ্ধ জয়ন্তীতেও প্রচুর লোকসমাগম হয় এখানে। মূল মহাবোধি মন্দির থেকে দেড়-দু কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেট্টা বুদ্ধের মনাস্ট্রি। তারই পিছনে হোটেল মেট্টা বুদ্ধাতে আমরা ছিলাম। শহরের ভেতরে বা মন্দিরের কাছাকাছি হোটেলে তখন ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা। মনাস্ট্রির পাশেই ফুজিয়া গ্রীন রেস্তোরাঁ। আমরা সেখানেই খেতাম। খাবারের মান খুবই ভালো। এছাড়া কমবেশি তিন কিলোমিটার ব্যাপী এই শহরে অলিতে গলিতে খাবারের দোকান।
গরমকালটা এড়িয়ে এই শহরে ভ্রমণ খুবই আরামদায়ক। অবশ্য সারা বছরই লোকজন আসেন এখানে। শীতকাল ভালোই ঠাণ্ডা। এবার ডিসেম্বরে গিয়ে দেখি সারা শহর জুড়ে উৎসবের আবহাওয়া। কেউ হারিয়ে যেতে চাইলে এটা উৎকৃষ্ট সময়। প্রথমবার যখন গরমকালে এসেছিলাম, সেবার জাদুঘর খুঁজতে যাওয়ার নাম করে হারিয়ে গেছিলো আমার এক সঙ্গী বারীন ঘোষাল। এখানে এলে বোধহয় সব মায়া ত্যাগ করে বুদ্ধদেবের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায়। তাই এসব ঘটতে থাকে হয়তো।
এখানে আসার সবচে সহজ উপায়, ভারতবর্ষের যে কোনও প্রান্ত থেকে গয়া শহরে চলে আসা। তারপর অটোরিক্সা ধরে বুদ্ধগয়ায়। বাস এবং মিনিবাসও চলে এই রাস্তায়, তবে নিয়মিত সময় ধরে একথা বলা চলে না। আর গয়ায় এলে বহু মানুষই তাদের পূর্বপুরুষের স্বর্গপ্রাপ্তির কামনায় পিণ্ডদান করেন। এ ব্যাপারে অত্যন্ত ভরসাযোগ্য ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ তো আছেই।
সন্ধে হয়ে আসছে আর আমি বহুদূর থেকে শুনতে পাচ্ছি কারোর উদাত্তগলায় – বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই মূল মহাবোধি মন্দিরের দিকে। সেখানে আছে সেই পিপুল বৃক্ষ যার তলায় বসে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। যে দিব্যজ্ঞান বা বোধিলাভ আজও আলোকিত করে চলেছে পৃথিবীতে। মূল মন্দিরের সামনে আসতেই মনে পড়ে যায় সেই যাত্রার কথা। সম্রাট অশোকের আদেশে ঐ পিপুল গাছের চারা নিয়ে সম্রাটপুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সঙ্ঘমিত্রা পৌঁছেছিলেন শ্রীলঙ্কায় এবং সঙ্গে আমিও গেছিলাম। সে এক দীর্ঘ যাত্রাপথ, যার বিবরণ অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে বিবৃত করা যেতে পারে। সেই যাত্রাপথেই তো পরিচয় হয়েছিল বৌদ্ধধর্ম প্রচারক প্রণবানন্দ তথা প্রনব কুমার দে-র সাথে।
মহাবোধি টেম্পল এর সামনে পৌঁছে দেখি বিভিন্ন দেশের মানুষজন গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছেন। মহিলার সংখ্যাই বেশি। প্রচুর ভিড়, ওই ভিড়ের মধ্যেই কে যেন আমার হাত ধরে নাচের বৃত্তে টেনে নিলো। তাকিয়ে দেখি লাবণ্য। খুব সামান্যই অবাক হলাম। কেন জানি না মন বলছিলো ওকে এখানেই খুঁজে পাবে। সাধারন মানুষ থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বহু সেলিব্রিটি সেই নাচে অংশ নিয়েছেন। আমি আজ পর্যন্ত কোথাও কোনও আসরে গিয়ে নাচে অংশগ্রহণ করিনি। তবে এখানে আমার কি ভূমিকা! তাকিয়ে দেখি সামনে লালচে আলোয় সেজে ওঠা মহাবোধি মন্দিরের চূড়াটি আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে।





















Comments