আবার বাংলাদেশ,আমার বাংলাদেশ

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

বাংলাদেশ।অনেকের স্মৃতিতে জেগে থাকা পূর্ব বাংলা।আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র।১৯৪৭ এ দেশভাগের আগে অখণ্ড বাংলা।পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম।সবুজের মাঝে লাল সূর্য নিয়ে এক নতুন পতাকার উড়ান।৬৮ হাজার গ্রাম দিয়ে মোড়া বাংলাদেশ। সেই দেশের প্রতি বরাবরের একটা টান অনুভব করি। ২০১০ সালে আমি প্রথম বাংলাদেশ ভ্রমণে যাই। তারপর অনেকবার গিয়েছি।

সম্প্রতি আবার ঘুরে এলাম বাংলাদেশ।১১ দিনের এই যাত্রায় এবারে সঙ্গী ছিল কবি সৈকত সেন ও কবি অম্বরিশ ঘোষ। এই ভ্রমণ ছিল নিতান্তই ভ্রমণ।দেশ দেখা।নুতন মানুষের সঙ্গ পাওয়া।আর লেখা পড়া নিয়েই থাকি বলে সারা বাংলাদেশ জুড়েই নিজস্ব এক বন্ধুবৃত্ত,অন্তরের মানুষেরা তো রয়েছেই। কবিতা,আড্ডা,ভ্রমণের ভেতর সহজেই ঢুকে পড়েছিল।

 

২০১০ থেকে ২০২২।মাঝখানে শুয়ে আছে ১২ বছর। এই ১২ বছরে অনেক বদলে গেছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বড় সংকট দেখলাম নদীমাতৃক বাংলাদেশে প্রায় সব নদীই নাব্যতা হারিয়েছে অনেকটা। ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীরে সদরঘাট।২০১০ সালে দেখেছিলাম এই বুড়িগঙ্গা পারের অপরূপ সৌন্দর্য। আর এবারে কি ভীষন দূষণ,জঞ্জালের স্তূপ এই সদরঘাটে। ঢাকার সুপ্রসিদ্ধ রিক্সার ভিড়ে পুরনো ঢাকায় ভয়াবহ রকমের জ্যাম।যানজট ঢাকার মস্ত বড় সমস্যা। সেই সমস্যা এখন আরো বেড়েছে।

এবারের সফরে দেখলাম সারা দেশ জুড়ে বেশ সবুজায়ন।উন্নত হয়েছে গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাট। গ্রামাঞ্চলে নারীদের নানান প্রকল্পে যুক্ত হতে দেখেছি।আয় রোজগার বেড়েছে।স্বনির্ভরতা এসেছে। গ্রামাঞ্চলে এন জি ও গুলির তৎপরতা বেশ গতি পেয়েছে। আর্থিক স্বনির্ভরতার বিকাশ হয়েছে। ঢাকা টাঙ্গাইল চট্টগ্রাম রংপুর কক্সবাজার সবখানেই দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্তারের নানান কর্মকাণ্ড চলছে। সরকারী উদ্যোগে ঘটা করে আয়োজিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু মুজিব শতবর্ষ। কিন্তু এই ১২ বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি দেশের সচেতন যুবশক্তির আস্থা এবারের ভ্রমণে কিছুটা কম বলেই মনে হলো।

ঢাকায় ফরিদ ছিপাতুল্লাহ,অরবিন্দ চক্রবর্তী,মাসুদুর রহমান দের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম বাংলা ভাষার বাইরেও ইংরেজির প্রভাব বাড়ছে। বাংলা চ্যানেল গুলির জায়গায় ভারতীয় চ্যানেলের সিরিয়াল এখন অনেক জনপ্রিয়। ২০১০ সালে দেখেছিলাম সারা বাংলাদেশে সমস্ত সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা,সমস্ত মাইলফলক বাংলায় লেখা।

এবারে কিন্তু অনেক বদল দেখলাম।ঢাকা,টাঙ্গাইল,রংপুরে অনেক বিপণি সাইনবোর্ড মাইল ফলক কিন্তু বাংলা নয়।পুরোটাই ইংরেজিতে লেখা। যে দেশ বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছে সেই দেশে কি বাংলা গুরুত্ব হারাচ্ছে!বিষয় টি কিন্তু আমাকে ভাবিয়েছে।মহানগর ঢাকায় একটা নুতন প্রজন্ম লক্ষ্য করেছি যারা পশ্চিমী জীবন যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে।এই বদলগুলি খুব করেই দেখলাম এবারের ভ্রমণ পর্বে। গ্রামাঞ্চলে মোবাইল টাওয়ার এর ডিস কেবলের তেজস্ক্রিয়তার জন্য দেখলাম পাখি কমে গেছে।

 

এবারে কক্সবাজার,ঢাকা,টাঙ্গাইল,রংপুর,পাটগ্রাম ছিল ভ্রমণ ভূগোল।ভ্রমণ পরিধি জুড়ে,শহর গ্রাম গঞ্জ,ইতিহাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে গড়িয়েছে ভ্রমণ।কত কত দৃশ্যের ভেতর ঢুকে যে পড়েছি! এবারে দেখেছি এক পালটে যাওয়া বাংলাদেশ। গোটা দেশ জুড়ে উন্নয়নের ছোঁয়া।আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে। সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণ শেষ। ঢাকায় দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে মেট্রো রেলের কাজ। ঢাকায় ১২০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। মহিপুরে চালু হয়ে গেছে তিস্তার নুতন ব্রিজ।শেখ হাসিনা সেতু। উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি বিকাশ হচ্ছে।ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি চর্চা বিস্তারিত হয়েছে। সারা দেশের সব জেলাতেই,কিছু কিছু উপজেলাতে সাহিত্য চর্চা,ভাষা চর্চা, জ্ঞান চর্চা সিরিয়াস ভাবেই হচ্ছে। পাঠক বাড়ছে।অন্য ধারার সংস্কৃতি চর্চা প্রাধান্য পাচ্ছে।লক্ষণীয় ভাবে প্রসারিত হচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকিত বাংলাদেশ বই পড়ুন আন্দোলন।

ঢাকায় পাঠক সমাবেশ,বাতিঘর,বেঙ্গল বুকস এর মতন গ্রন্থ বিপণন কেন্দ্র গুলিতে সবসময় ক্রেতা ও পাঠকদের সমাবেশ থাকে। এখানে নিজের মনের মত বই পড়তে পাবার সুযোগ রয়েছে। লিটিল ম্যাগাজিনের ছেলে মেয়েরা এই খানে নিজেদের মতবিনিময় করে থাকে। এভাবেই একটা মুক্তমনা নুতন প্রজন্ম গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। সঙ্গীত,চিত্রকলা,গ্রুপ থিয়েটার নিয়ে নিত্য নুতন কাজ হচ্ছে। রংপুরে দেখেছি বইবাড়ি।আইডিয়া পাঠাগার। আইডিয়ার উদ্যোগে "ভ্রমণ আড্ডা" আয়োজিত হচ্ছে।ইতিহাস বিজড়িত জনপদে দল বেঁধে ভ্রমণ এবং সেখানকার কবি লেখকদের সঙ্গে সাহিত্য আড্ডার আয়োজন থাকে। আমি এমন একটি আড্ডায় ছিলাম।বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবী চৌধুরানী চরিত্রটি আসলে ছিলেন রংপুরের পীরগাছার "মন্থনা এস্টেটের" জমিদার জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী।১৭৮৩ র রংপুর কৃষক বিদ্রোহের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।নুরুলদিনের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের কুচবিহার,জলপাইগুড়িতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায়ের জমিদারবাড়িতে বিদ্রোহীদের বৈঠক আর পরিকল্পনা নির্মিত হত। রতিরাম দাসের লেখা "জাগগান" বইতে এই শিবচন্দ্রের কথা আছে। আর এই কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে সৈ়য়দ শামসুল হকের লেখা  একটি বই রয়েছে।"নুরুলদিনের সারাজীবন"।দেবী চৌধুরানীর জমিদারবাড়ি এবং ইটাকুমারীর সেই জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে এবারে আমরাও সেই ভ্রমণ আড্ডায় অংশ নিতে পেরেছি। নুতন এক অর্জন এটা আমার জীবনে। কবিতা,সাহিত্য,লোকসঙ্গীতের পাশাপাশি আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে রচিত প্রবন্ধ শুনবার সুযোগ মিলেছে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে রংপুরের তাজহাট রাজবাড়ীর ভ্রমণ আড্ডায়।উঠে এসেছে বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা গল্প।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত। ভারি মনোরম এই সৈকত জুড়ে। ইনানী সি বিচ থেকে দূরে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি চোখ জুড়িয়ে দেয়। মৎসজিবীরা জীবনের ঝুকি নিয়েই জীবন যাপন করেন। টেকনাফ থেকে দেখা যায় মায়ানমার।পূর্বতন বার্মা দেশ। কত কত রকমের পেশার মানুষ এই অঞ্চলে। আবার অপরাধপ্রবন,মাদক পাচারের করিডোর এই মায়ানমার সীমান্ত অঞ্চল। কিন্তু সৈকত সি বিচ গুলি পর্যটকদের ফেলে যাওয়া আবর্জনায় ভর্তি।এগুলি পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার। ইনানী সি বিচ,হিমছড়ি,টেকনাফ এই কেন্দ্রগুলোতে যদি স্থানীয় ইতিহাসের বর্ণনা লিখবার ব্যবস্থা থাকতো তাহলে পর্যটকদের উপকার হয়। সারা বাংলাদেশ জুড়ে অসংখ্য জমিদারবাড়ি,রাজবাড়ী ছড়িয়ে রয়েছে। স্থাপত্য শিল্পের মনোরম নিদর্শন এই সব বাড়িগুলো। বাংলাদেশের জমিদার ও রাজবাড়িগুলি নিয়ে গবেষণা হওয়া জরুরি।বৃহৎ গ্রন্থ রচিত হওয়া প্রয়োজন।অবিভক্ত বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এই রাজা জমিদারদের অবদান উল্লেখ্যনীয়। কিন্তু সামান্য কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব জমিদারবাড়ি বিলুপ্তির পথে। এবার টাঙ্গাইলের মাহেরা জমিদার বাড়ি,করটিয়া জমিদারবাড়ি সুসংরক্ষিত দেখলেও ইতিহাস প্রসিদ্ধ সন্তোষের রাজবাড়ী ধ্বংসের মুখে। একই অবস্থা দিনাজপুর রাজবাড়ীর।

 

মহেশখালির নিলয় রফিক,ঢাকার মাসুদুর রহমান,তৌফিক জহুর,টাঙ্গাইলের মাহমুদ কামাল,শেরপুরের জ্যোতি পোদ্দার, রংপুরের সাকিল মাসুদের সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। জেনেছি এবং নিজেও অনুভব করতে পেরেছি সারা দেশ জুড়ে একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে।

ঢাকাতে তিনদিন ছিলাম।সকাল থেকে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো দফায় দফায় আড্ডা। ঢাকা বনেদি শহর।স্মৃতির শহর।ইতিহাস ইতিকথা উড়ে বেড়ানো শহর। রাজপথ জুড়ে গর্জে ওঠা মিছিলের শহর।

৫২,৬৯,৭১,৯০ পেরিয়ে কিছু আগের শাহবাগের আন্দোলনের স্বাক্ষী। কখনো ইসিজি চত্বর,কখনো শাহবাগ,কখনো বেঙ্গল বুকস,কখনো পাঠক সমাবেশ,কখনো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার,কখনো মুহম্মদপুর,কখনো নীলক্ষেত,কখনো কনকর্ড জুড়ে জুড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চলতো। সাহিত্য নাটক লিটিল ম্যাগাজিন নুতন প্রজন্ম সঙ্গীত জরুরী বইপত্র নিয়ে কথা চলতো।আমি শিখেছি অনেক আমার উজ্জ্বল বন্ধুদের কাছ থেকে।

একটা নুতন দিক চোখে পড়লো এবার।একটা বিজ্ঞানমনষ্ক,মুক্তচিন্তার,স্বাধীনতার চেতনা বহনকারী,ঝকঝকে নুতন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে সারা বাংলাদেশে।যাদের হাতেই এক নুতন আগামী গড়ে উঠবে হয়তো।

ভ্রমণ আমার কাছে মানুষ দেখবার এক মস্ত পরিসর। ভ্রমণ আসলে জায়মান এক বিস্তারের মত। প্রতিটি ভ্রমণ এক নুতন পটভূমির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর এভাবেই হয়তো অগণন সব দৃশ্যের জন্ম হয়।

 

 

About Author
&
Photographer

লেখক : সুবীর সরকার

৯০ দশকের কবি ও গদ্যকার।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

যাপনচিত্র, টাইগার প্রজেক্ট, চর্যাপদের হরিণ, জ্যোৎস্নাগিটার, বিবাহবাজনা, হিলকার্ট রোডের মাস্তান, তন্ত্রপুস্তক, বাদ্যকরের জার্নাল, নির্বাচিত কবিতা

গদ্যগ্রন্থ :

শোলকগাথা, আমার আব্বাসউদ্দীন, বান বরিসা ধান সরিষা, লোকপুরান

আলোকচিত্রী: সুবীর সরকার

৯০ দশকের কবি ও গদ্যকার।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

যাপনচিত্র, টাইগার প্রজেক্ট, চর্যাপদের হরিণ, জ্যোৎস্নাগিটার, বিবাহবাজনা, হিলকার্ট রোডের মাস্তান, তন্ত্রপুস্তক, বাদ্যকরের জার্নাল, নির্বাচিত কবিতা

গদ্যগ্রন্থ :

শোলকগাথা, আমার আব্বাসউদ্দীন, বান বরিসা ধান সরিষা, লোকপুরান

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget