একটি অতীত-ভ্রমণ অথবা স্মৃতিকথা (দীঘা)

একটি লাগাম-ছাড়া ঘোড়া সমুদ্রের তীর ধরে মৃদুগতিতে হাঁটছিল। যেন ওর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, অথবা সমুদ্রের বিশালতার সামনে ওর গতি থমকে যাচ্ছিল। আমি ক্যানন এর ক্যামেরা হাতে তখন ফোকাস করতে চাইছিলাম ঘোড়ার দিকে, অথবা সমুদ্রের দিকে, অথবা ঘোড়াসহ সমুদ্রের দিকে। এটা দীঘার বেশ নির্জন একটা ঘাট৷ লোকজন কম, তাই বলে নেই এমন তো নয়। আমি ছবির ফ্রেমে শুধু ঘোড়া আর সমুদ্রই চাইছিলাম, আর খালি সেখানে একটা পাগলাটে ধরনের লম্বা লোক সবুজ ফুলহাতা জামা আর খয়েরি ফুলপ্যান্ট পরা… সে বারবার চলে আসছিল। একটু টলছিল ও লোকটা। কিন্তু এত রোগা যে মনে হচ্ছিল সমুদ্রের হাওয়ায় ও টাল সামলাতে পারছে না… অমনই টলতে টলতে একসময় সে ডিফ্রেম হল। আর, আমি ছবিখানি তুলতে পারলাম। এত সময় নিয়ে তুলেছিলাম ছবিটি যে বাড়ির লোকজন অধৈর্য্য হচ্ছিল, তবু, শেষমেশ সে ছবি উঠল। বাড়ির বড়রা পরে ছবি দেখে খুব ঠাট্টাকরে বলেছিলেন দার্শনিক ছবি, কেউ আবার সচেতন পরামর্শ দিয়েছিলেন, এমন একলা একলা ভাবের ছবি তোলো কেন! দেখে কেমন দু:খু হয়! ছবি তুলেছিলাম ২০০৩ সালের ১৪ ই আগষ্ট, সম্ভবত।
সেবার আমরা ১৩ ই আগষ্টের ভয়াবহতাকে ভুলতে চাইছিলাম। " আমরা " শব্দটা এখন ব্যবহার করা ঠিক হল না, কারণ এখন আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছে প্রায় আড়াই বছর। তো সে যাইহোক, ঠিক আগের বছরেই তখনকার প্রিয়জনকে নিয়ে যমে মানুষে টানাটানি গেছে, যার সূত্রপাত ছিল ১৩ ই আগষ্ট। তো ১৩ ই আগষ্টকে ভুলতে চেয়ে ঠিক করলাম আমরা বেড়াতে বেরিয়ে পড়বো। আমরা আমাদের বেড়াতে যাওয়ার পুঁজিটুকু নিয়ে যথেচ্ছ আনন্দ করতে চাইছিলাম, মানে বেশ সমুদ্রের ধারে থাকবো, বারান্দা থেকে চোখ খুললেই সমুদ্র দেখবো, যেমন খুশি ঘুরবো… এমন আর কি! একটু আয়েশী বেড়ানো চাইছিলাম। অথচ সুবিশাল পুঁজিও নয়, সুতরাং গন্তব্য দীঘা।
তখন দুজনের বয়স পঁচিশ আর আমাদের ছেলে রোদ্দুর মাত্র চার বছুরে। অনভিজ্ঞ এবং আনাড়ি তিনজন, লোকজনের উপদেশে বাসে চেপে দীঘা যাওয়ার প্ল্যান করে খুব নাকাল হয়েছিলাম। আগষ্টের ভ্যাপসা গরম, তার মধ্যে বাসে রাজ্যের মালপত্র উঠতে শুরু করল কাঁথির বেশ একটু আগে থেকেই, গায়ের পাশে লোকজন ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে রোদ্দুরের জন্য আলাদা সিটের টিকিট কাটা হয় নি ওই উপদেশের কারণেই… তার মধ্যেই সামনের সিটের দুটি পরিবার তাদের দুই ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিল, তারা দুধ খেয়ে বমি করে দিল…বমির গন্ধে তখন আমার তীব্র বমি পাচ্ছে, যাহোক করে মন অন্যদিকে নিয়ে গিয়ে সামলাতে চাইছি… এর মধ্যে বাসটা অতিরিক্ত লাভের আশায় ৬/৭ কিলোমিটার ঘুরিয়ে নিয়ে তবে দীঘায় এনে ফেলল! বাস থেকে নামতে পেরেই নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছিল।
আমাদের ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার হলিডে হোম বুক করা ছিল। বুকিং এর সময় যথারীতি যেমন সবাই বলে, সমুদ্রের ধারে… তেমনই বলেছিলেন কেউ একজন! "সমুদ্রের ধার" মানে বিভিন্ন জনের কাছে যে বিভিন্ন মানে হয়, সে ও এইসময়ের অভিজ্ঞতা। দেখলাম "সমুদ্রের ধারে" বলতে দেখলাম তিনি বুঝিয়েছেন হাঁটা পথে মাত্র ১৫ মি…ধারেই তো হল! তো সেই সমুদ্রের ধারের হলিডে হোমে প্রায় দুপুর দেড়টায় পৌঁছে শুনলাম, এইমাত্র কারেন্ট গেল, প্রতিদিনের কারেন্ট অফ এর দুইঘন্টা কোটা পূরণ করতে। ভটভট করে জেনারেটর বেজে উঠল কিন্তু আমাদের দোতলার ঘরে ফ্যান চলল না, কারণ সেটি তিনতলার মানুষজনদের জন্য সংরক্ষিত। তখন বেড়াতে আসার আনন্দ মাথায় উঠেছে। চান করে উঠেও দরদর করে ঘামছি। আশপাশে কোনো খাওয়ার হোটেল নেই, আগে থেকে বলা নেই বলে ওরা খাবার দিতেও পারবে না। ছেলেকে একটু দুধ খাওয়াবো বলে গরম জল করতে গিয়ে দেখলাম বাসনের উপর আরশোলা হেঁটে বেড়াচ্ছে। খানিকটা রাগ দেখালাম প্রাক্তন বরের উপর। তখন আবার আমি কথায় কথায় রেগে যাই। যাইহোক, বেরিয়ে পড়ে, একটা ভ্যান পাওয়া গেল, তাতে করেই চললুম খেতে। ভ্যানদাদা "বিবেকানন্দ হোটেল" নামে একটা হোটেলে নামিয়ে বললেন, "এদের খাবার খুব ভাল"। খেতে বসে কথায় কথায় জানা গেল, এদের সমুদ্রমুখী ঘরও আছে। খাবার অর্ডার করে আমরা সে ঘর দেখে এলাম। খুবই সুন্দর ঘর, সাজানো গোছানো, টিভি, রিমোট ব্যালকনি স্টাইলের বড় জানালা, সব ই আছে। ব্যালকনি থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। রোদ্দুরকে কোলে নিয়ে সমুদ্র দেখাতে গেলাম, সে বেচারি বললে খিদে পেয়েছে খুব! যাইহোক, আমরা সেই ঘর বুক করে খেতে বসলাম। খেয়েদেয়ে পেটকে শান্ত করে এবার আমরা সমুদ্রের দিকে চললাম। সেদিন ছিল মেঘলা দিন, আর, সমুদ্রের হাওয়ায় সব ক্লান্তি দূরে চলে যাচ্ছিল। ভরা কোটাল হলেও তখন ভাটার সময়, ফলে বাঁধানো বিচের নীচে বালির বিচ বেশ খানিকটা বেরিয়ে এসেছে। আমরা বেশ সন্তর্পণে সেই পাথুরে বোল্ডার পেরিয়ে বালির বিচ এ নেমে পড়লাম।
রোদ্দুর প্রথমবার সমুদ্র দেখছে। ও এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে কেমন করে নিজেকে প্রকাশ করে, সে নিয়ে আমার কৌতুহল উৎসাহ দুইই ছিল তুঙ্গে। ও ছিল ওর বাবার কোলে, আর আমি ক্যামেরা তাক করে ছিলাম রোদ্দুরের মুখের উপর। বালির বিচে নেমে রোদ্দুরের বাবা ওকে কোল থেকে নামিয়ে দিল, আর ও দুই হাত দিয়ে বাবার হাত আঁকড়ে ধরে ভয় আর আনন্দ মেশা বিস্ময়ের চোখে সমুদ্রের দিকে তাকাল। আমার ক্যামেরা ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যামেরার বোতামে চাপ দিল। জীবনে যত ছবি তুলেছি আজ পর্যন্ত, আনাড়ি হাতে তোলা ওই ছবিটি আমার জীবনে এখনো পর্যন্ত তোলা শ্রেষ্ঠ ছবি। রোদ্দুরের পা ছুঁয়ে গেল সমুদ্রের নোনা ঢেউ, ও শিউরে উঠে বাবার হাত আরেকটু আঁকড়ে ধরল। বিস্ময়, ভয় আর আনন্দ একসাথে মিশে শিশুর মুখ যে কী আসামান্য হয়ে ওঠে তা আমি ছবিতে ধরে রাখতে পেরেছি, এ আমার নিভৃত আনন্দ।
এই বিচ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সেদিন প্রায় নিউ দীঘার কাছাকাছি চলে গেছিলাম। খানিক দূরে একটা ইঁটের তৈরি মিনারের মতো অংশ ভেঙে পড়েছিল, আমি মনে মনে কি ভেবে নিয়েছিলাম, ওটা নিশ্চয়ই অনেককাল আগের ভাঙা বাতিঘর? না কি কেউ বলছিল, এমন কথা, আজ আর লিখতে বসে মনে পড়ছে না। বাতিঘরের ছবি আলাদা করে তোলা হয় নি। তখন আসলে সেভাবে দেখার চোখ ও তৈরি হয় নি। হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটা সমুদ্রের ছবি তুলেছিলাম, লোকজন চান করছে সে সময়, বিচ খুব একটা ফাঁকা নয়। এর মধ্যে একটা ফ্রেম পেয়েছিলাম, একটা কাক, একটা মানুষ আর দূরে একটা জেলেনৌকো। একটু ফাঁকা পেয়ে আরো কিছু সমুদ্র এবং ঢেউ…
এরপর হলিডে হোমটিতে ফেরার জন্য আমরা একটি ভ্যানে উঠে পড়ি, কারণ ফিরে আবার" বিবেকানন্দ নিবাস" এ চেক ইন করার কথা আমাদের। এই ভ্যানচড়ার সময় দারুণ মজার একটা ব্যাপার হয়েছিল। হলিডে হোমটি ছিল সমুদ্রতল থেকে বেশ একটু উঁচুতে, একটা ছোট চড়াই পেরোতে হত। ভ্যানদাদা চড়াইতে ওঠবার ঠিক আগে বাজিয়ে দিলেন দালের মেহেন্দি। তখন " তুডুক তুড়ুক তুন তা রা রা " তে ভারত ভাসছে… সে গানের তালে তালে জোরসে প্যাডেল চালিয়ে ভ্যানদাদা অক্লেশে চড়াই পার করে ফেললেন। আমাদের দক্ষিণবঙ্গে হাজার ফুট কল বসানোর সময় বা ছাদ পেটানোর সময়, বিশেষ সুরের গান আমি শুনেছিলাম, কিন্তু দালের মেহেন্দিকে এভাবে শ্রমগীতি রূপে ব্যবহার করতে দেখে আমি বেশ অবাক হয়ে গেছিলাম। এবং সত্যিই, "তুড়ুক তুড়ুক তুন…" এর সাথে সাথে ভ্যানদাদার পা যেভাবে ওঠানামা করছিল, সে এক আশ্চর্যের বিষয়…একেবারে মাপে মাপে, তালে তালে, অই গানের লয়ের সাথে একভাবে…
আমরা বাক্সপেটরা নিয়ে এবার বিবেকানন্দ লজে চলে এলাম। ফেরার সময়, সেই হলিডে হোমের জঙ্গুলে সবুজ রাস্তা থেকে রোদ্দুর ছুটে আসছে দেখে দারুণ একটা ছবি নিয়েছিলাম। বিবেকানন্দ নিবাসের জানালা থেকে ভোরের সমুদ্র দেখা যায়। কিন্তু দেখা গেলে কি হবে আমাদের মন কি আর তখন ঘরে বন্দী থাকতে চায়? ৫টা বাজতেই আমরা ছুটে গেলাম সমুদ্র সৈকতে, তখনো চায়ের দোকানের আঁচে অল্প ধোঁয়া উঠছে, চা চাপাতে সময় যাবে আরো অন্ততঃ মিনিট দশেক। রাতের জোয়ারে বালির বিচ তখনো ঢাকা। বাঁধানো চানের ঘাটে বোল্ডারগুলিকে ছুঁয়ে দিচ্ছে ঢেউ। আমরা সেখানে গিয়ে বসলাম। সেই সময় দীঘার বিচ পাথর আর বোল্ডার দিয়ে বাঁধানো ছিল। নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর ওল্ড দীঘাতে চানের ঘাট ছিল। বাকি পাড় গুলি বড় বড় পাথর ফেলে বাঁধানো ছিল। চানের ঘাটের একধারে থাকত বোল্ডার, যেগুলি অনেকটা সিমেন্টের বাঁধানো বসার জায়গার মতো দেখতে। এই বাঁধানো জায়গার আড়ালে বসে চান করার নিয়ম, যাতে ঢেউয়ের টানে কেউ ভেসে না যায়। আর একধার ঢালাই করা ঢালু অংশ, এই অংশ কেন তৈরি হয়েছিল, আমার মাথায় ঢোকে নি, কারণ এটা বেশ বিপদজনক ব্যবস্থা। ঢালু এবং ক্ষেত্রবিশেষে পিছল ও! যাইহোক, মেঘলা দিনে সূর্য উঠল না। সমুদ্রে সূর্যোদয় দেখা হল না আমাদের। আমরা তখন হাঁটতে লাগলাম, বোল্ডার পেরিয়ে রাস্তা ধরে হেঁটে আমরা পরের চানের ঘাটে গিয়ে দেখি সেই ঘোড়া… যার কথা শুরুতেই বলেছি। ও প্রথমে ঠিক আমাদের মতো করে সমুদ্রে পা ভেজাচ্ছিল, ওর মুখ ছিল সমুদ্রের উলটো দিকে। সেই ছবি নিয়েছিলাম একটা। তারপর, কি মনে করে সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে ও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, একলা বিরহীর মতো…অপার সমুদ্র সবাইকেই হয়ত দার্শনিক করে। ওর ছবি তো নিলামই, ছেলেকে ওর পাশে রেখেও একটা ছবি নিয়েছিলাম।
এতক্ষণে চা পাওয়া গেল, অথবা ঘোড়া ও সমুদ্রের এমন বিরল ছবি তুলব বলেই চা দেরী করে পেলাম। সে যাইহোক, আমরা চা পেলাম, কচুরি ঘুগনি ডিমসেদ্দ পেলাম। পেট ভরে জলখাবার খেয়ে চলে এলাম বাসায়, ক্যামেরা রেখে আবার আমরা ঝাঁপাতে যাচ্ছি সমুদ্রে, তখন আবার বালির বিচ দেখা দিয়েছে যে…
তবে খুব একটা আনন্দ করে চান করা গেল না, কারণ রোদ্দুর ঢেউয়ের ধাক্কায় একবার পড়ে গিয়ে বেশ ভয় পেয়ে কান্নাকাটি জুড়ল। দুপুরের খাবার আমরা ঘরেই দিতে বলেছিলাম। বিবেকানন্দ লজে সে ব্যবস্থা ছিল। বেশ ভালো কোয়ালিটির মাছ খাইয়েছে ওরা। বিশেষত পমফ্রেট। ওরা আমাদের বারবার বারণ করে দিয়েছিল বিচের মাছভাজা না খেতে। বাচ্চাকে তো একেবারেই দিতে মানা করেছিল। আমরা মেনেছিলাম ওদের এই উপদেশ। আসলে তখন ছোট্ট দম্পতিকে দেখে সবারই হয়ত ইচ্ছে হত যত্ন নেওয়ার! ওদেরই উপদেশে আমরা আরেক ভ্যানদাদাকে নিয়ে পরদিন চলে গেলাম শঙ্করপুর। বড় বড় জেলে নৌকো, মাছ ধরার ট্রলার এই এত্ত সামনে থেকে দেখে আমি তো অবাক! ঝুড়ি ঝুড়ি মাছ আসছে, শনশন বরফ গুদামে চলে যাচ্ছে! তার মধ্যেই এক মাছদাদাকে থামিয়ে এক ঝুড়ি পমফ্রেট মাছের ছবি নিলাম। সেই ভ্যানদাদা আমাদের মাত্র ১২০ টাকায় এককেজি বেশ বড় বড় মাছ কিনে দিলেন শুধু নয়, দীঘায় ফিরে সেই মাছ না পোড়া তেলে ভেজে দেওয়ার বন্দোবস্ত ও করে দিলেন। বললেন, সঙ্গে বাচ্ছা আছে, সব জায়গার তেল ভালো নয়। আমরা সেদিন মাছভাজা ও চা সহযোগে দারুণ একটা জলখাবার খেলাম।
সেদিন বিকেলবেলা সমুদ্রের কাছে যেতেই দেখি লোকজন ঘোড়ায় চড়ে সৈকতে ঘুরছে। দেখেই রোদ্দুর ঝুলে পড়ল। তখন আমি নতুন মা, খুব ভয় পাচ্ছিলাম, যদি কিছু হয়। শেষ পর্যন্ত ঘোড়া চালকদের আশ্বাসবাণীতে আমি ওকে ছাড়লাম। রোদ্দুরকে নিয়ে ওরা কয়েক পাক ঘোরালো, তারপর নামিয়ে যখন দিল, রোদ্দুরের মনে তখন বিশ্বজয়ের আনন্দ। আমিও ক্যামেরা নিয়ে ক্লিক। ওর নিষ্কলুষ আনন্দ ধরা আছে সেই ছবিটিতে। খুব আনন্দ পেয়েছিলাম এই ছবি তুলে।
সমুদ্র সৈকতে সন্ধ্যা মানে জমজমাট ব্যাপার। প্রচুর খাওয়া দাওয়া প্রচুর লোকজন। মাছভাজার গন্ধে উথালপাথাল বাতাস। আর তীরের দারুণ সব ঝলমলে দোকানপাট। বিকেল থেকে সন্ধ্যা ঘনায়, বিচে জ্বলে ওঠে হাজার রঙের আলো। তার মধ্যেই দেখি সন্ধ্যা বেলাতেও কেউ একজন দার্শনিকের মতো স্থির হয়ে বসে নির্লিপ্ত ভাবে চান করছে। ঠিক চান করছে বলা যায় না, যেন সমুদ্রের কাছে এসে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে, আর ঢেউ এসে ইচ্ছেমতো তাকে ভেজাচ্ছে। হাজার বাঁশির প্যাঁ পো, মেলার মতো শোরগোল, কিছুতেই তার কিচ্ছু এসে যাচ্ছে না…
সন্ধ্যার সৈকতে আমার প্রিয় বিষয় হাওয়া। ওই হাওয়ার জন্যই যেন আসা। হৃদয়ের ভিতর পর্যন্ত ঠান্ডা করা এই হাওয়া, এর তুলনা কোথাও নেই। এই হাওয়ার সঙ্গে কুটুর কুটুর করে চলতে থাকত ঝালমুড়ি, পাপড়ি চাট, লেবু চা, মেশিন ঘোরানো রঙদার ঝুরো কুল্ফি… ছেলের বায়নার খেলনাপাতি, রঙিন আলোর লাঠি, লন্ঠন, ঘূর্ণি…আমার মুক্তোমালা, তরমুজের দানার হার… সবকিছু যেন রেখায় রেখায় সাজানো, একটার পর একটা, অবিশ্রান্ত ঢেউ।
রাতের খাবার আমরা হোটেলে খেয়েই ঢুকতাম। পরদিন চলে যাবো, ইচ্ছে হল রোদ্দুরকে চিলি চিকেন খাওয়ানো হোক। চার বছরের ছেলেকে তখনো ভরসা করে বাইরের খাবার খুব একটা দিই নি, এই ক দিনে ওর বরাদ্দ ছিল ভাত মাখন আলুসেদ্দ আর মাছভাজা। সেদিন নিয়ম ভাঙা হল। রোদ্দুর প্রথমবার চিলি চিলেন খেয়ে সেই অসাধারণ মন্তব্যটি করেছিল, " ঝাল, কিন্তু ভালো"। "ভালো" শব্দটিকে এত ভালো করে বলেছিল, চোখের অভিব্যক্তি দিয়ে, "ভালো"র "লো" এর উপর জোর দিয়ে, যে আমরা খুব হাসছিলাম। ও নাকের জলে চোখের জলে হয়ে যাচ্ছিল, তবু চিলি চিকেন খাচ্ছিল। দুধে মুখে মসলার স্বাদ হয়ত এতটাই ভালো লাগার হয়। আক্ষেপ হয়, সেই সময়ের ছবি তুলি নি বলে।
পরেরদিন আমাদের ফেরার পালা। আমরা আর বাসে চড়ার ভুল করি নি। ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছিল। ফেরার আগে একবার ওখানকার বাজারে ঢুঁ মারলাম। দীঘা এসে কাজুবাদাম নেবো না তাও কি হয়! আর কিনেছিলাম, তাঁতে বোনা মাদুর। বেশ অন্য রকম ছিল, এখন যে মাদুরগুলিতে দীঘার বাজার ছেয়ে গেছে, তেমন নয়, একটু মোটা সুতোয় অন্যরকম নক্সা তোলা। আর কিনেছিলাম ঝিনুকের চামচ এবং ঝিনুক বসানো আয়না। এইটুকু মাত্র কেনাকাটিতেই বিভিন্ন বিতর্কিত বিশেষণ ভাগ্যে জুটেছিল! সময় গেলে সেসব তো আর মনে থাকে না, মনের মধ্যে ঝলমল করে সেইসময়ের আনন্দটুকুই। বেড়ানোর আনন্দ আসলে আমাদের বেঁচে থাকার পুঁজি। সেটুকু নিয়েই পথচলা… আবার বেড়াতে যাওয়ার আকুতি হয়ত সেইজন্যই।
বিবেকানন্দ নিবাস, মালিকানা বদলের কারণে, শুনেছিলাম তার নাম পাল্টেছে। প্রায় ২০ বছর আগের হোটেলের রসিদ ইত্যাদি সব হারিয়ে গিয়েছে, যেজন্য সেই তথ্যাদি দেওয়া গেল না। আর দিতে পারলেও খুব একটা লাভ হত না। ২০ বছর কম সময় নয়। হোটেলটি ছিল একেবারেই সমুদ্রের কাছাকাছি। তবে যেটুকু মনে আছে, তা হল এদের ব্যবহার। অসম্ভব আন্তরিক এবং ঘরোয়া ব্যবহার পেয়েছিলাম। রান্না বেশ ভালো ছিল, বিশেষত খুব ভালো মাছ খাইয়েছিলেন এঁরা। শঙ্করপুর বেড়াতে যেতে সাহায্য করেছিলেন। এতবছর পর সেই প্রবাদের মতো, সত্যি সত্যিই তাদেএ আন্তরিক ব্যবহারটুকু মনে রয়ে গেছে।



























Comments