পুরী পরিক্রমা

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

পুরীর জগন্নাথ মন্দির ও তাঁর ইতিহাস

কথায় বলে না যে উঠল বাই তো কটক(থুড়ি পুরী) যাই! পুরী ভ্রমণ বাঙালির যেন মাছভাত। কথায় কথায় একজন ভ্রমণপিপাসু বাঙালি পুরী ঘুরতে চলে যেতে পারে কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই। তবে আমি প্রথমবার এলাম পুরীতে সপরিবারে।এর আগে কখনো বেড়াতে আসিনি ওড়িশাতে।তবে হ্যাঁ ২০০৬ সালে চেন্নাইতে বাবার চিকিত্সা করতে যাবার সময় ভুবনেশ্বরের উপর দিয়েই গিয়েছিলাম মনে আছে।যাওয়া ও আসা দুবারেই রাতের ওড়িশাকে চিনেছিলাম মাঝে মাঝে অন্ধকার টিলা দেখে।

এবার দিনের আলোয় তাদের শরীরে সভ্যতার দেগে যাওয়া ক্ষতচিহ্নগুলোকেও দেখতে পেলাম।বৃষ্টির জলে ভেসে যাচ্ছে অবশিষ্ট মৃত্তিকা রক্তপ্রবাহের মত।ভেসে ভেসে নিশ্চয়ই সমুদ্রেই মিশবে শেষে চৈতন্যপ্রবাহের মতো ! তিনভাগ পৃথিবীতে একভাগের একটু একটু করে মিশে যাবে। মিশে যেতে যেতে কি সব জল হয়ে যাবে একদিন? খুলে যাবে সব রহস্যের দরজা! নাকি ফিরে আসবে নোয়ার নৌকা? যদি তাই হয় তবে তার আগে আমি রেখে যেতে চাই আমার অক্ষত চটিজোড়া মন্দির থেকে অনেকদূরে।ভেঙে ফেলে যেতে চাই আমারই বিষ দাঁত নদী ও সাগরের সঙ্গম থেকে অনেক আগে। মহামানব বুদ্ধের দন্তের মতো আমার সেই বিষদাঁত সংরক্ষিত করবে না কোনও রাজকন্যা।

তার আগে একবার দেখে যেতে চাই বঙ্গোপসাগরের নীল ঢেউয়ের ফেনিল তরঙ্গ কীভাবে নীলাচলের চৌকাঠ ছুঁয়ে যায়! দেখে যেতে চাই জগন্নাথের বাস্তব অস্তিত্বকে, ছুঁয়ে যেতে চাই তাকে ঘিরে থাকা নানা মিথ্‌। সেই পরিকল্পনা মতোই আমি ও শিখা দুই কন্যা সন্তানকে বগলদাবা করে বেড়িয়ে পড়ি। ২০১৯ এর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের কোনও এক শারদ প্রাতে হরিদ্বার থেকে দিল্লি তারপর দিল্লি থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে ভুবনেশ্বর। অনেকেই ভাবতে পারেন বাঙালি আবার হরিদ্বারে কেন? হ্যাঁ চাকুরীসূত্রে হরিদ্বারে থাকি। সেবার আমরা ঠিক করি দুর্গাপুজোয় শিলিগুড়ির বাড়িতে না গিয়ে পুরী যাব বেড়াতে। তবে তীর্থ ভ্রমণের চাইতে পুরীর সমুদ্র দেখার আকর্ষণই বেশি টেনেছিল। বেড়াতে যাবার কথা এলেই আমার মন শুধু পাহাড় পাহাড় করে। সমুদ্রে যাওয়া হয়নি কখনো। যেকোনো তীর্থস্থানের ভিড় ও ভণ্ডামো আমার নাপসন্দ। তার ওপর থাকে নানা ঠকবাজের কলাকৃতি। তবে এবারে ভুবনেশ্বর থেকেই তাদের পাল্লায় পড়ে গেলাম।ট্রেনে বসেই ওলা ক্যাব বুক করেছিলাম ভুবনেশ্বর থেকে পুরীর জন্য। যথা সময়ে স্টেশনের বাইরে এসে বউবাচ্চা নিয়ে অপেক্ষা করছি ট্যাক্সির জন্য। অনেকবার ফোনাফুনির পরে তিনি এলেন এবং এসেই টালবাহানা করতে লাগলেন। সময় তখন বিকেল চারটে সাড়ে-চারটে হবে। ট্যাক্সি ড্রাইভারের কথামতো এইসময় পুরীতে যেতে অনেক ট্র্যাফিক জ্যাম পেরিয়ে যেতে আসতে তার রাত হয়ে যাবে। যদি যেতে চাই তবে চুক্তির চেয়ে বেশি টাকা দিতে হবে। যাই হোক একপ্রস্থ তর্কাতর্কির পর ট্যাক্সিতে না যাওয়াই সেফ মনে হল। ফের স্টেশনেই ঢুকে গেলাম এই আশায় যদি কোনও লোকাল ট্রেন পাই তাতে করেই চলে যাবো, এক-সওয়া ঘণ্টারই তো পথ।

শরতের আকাশে পশ্চিম প্রান্তে তখন সূর্য ঢলে পড়ে দিগন্ত ছুঁই ছুঁই করছে। সবুজের পর সবুজ ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে জলাশয়-গাছপালা- গ্রাম সব ছুটে যাচ্ছে আমাদের বিপরীতে। মাঝে মাঝে মুণ্ডহীন নারকেল গাছ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। মাসছয়েক আগে ওড়িশার উপকূল দিয়ে বয়ে গেছে ফণী নামক সাইক্লোন ঝড়। সেই মহাপ্রলয়ের ছাপ এখনও স্পষ্ট! ব্রহ্মাণ্ডের নীলঘন বনে সাদা পেঁজাতুলো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে এলোমেলো । এদিকে বিকেলের ট্রেন আমাদের নিয়ে যাচ্ছে বালুকাবেলার দিকে। টিকিট কাটার পনের-কুড়ি মিনিটের মধ্যেই হাওড়া থেকে আসা ধৌলি এক্সপ্রেস ট্রেনটি পেয়ে গেছিলাম। জেনারেল কামরা হলেও ভিড় একটু হালকা হয়ে গেছিলো ভুবনেশ্বরে। কলকাতার বোনের বাড়ি থেকে ঘুরে ফিরছিল একটি ওড়িয়া পরিবার। তাদের পাশে বসেই হিন্দি বাংলা মিশিয়ে গল্প করতে করতে যখন পুরী ষ্টেশনে পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধে ছটা।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের জানলা খুলতেই এক আশ্চর্য মন্দির তার রহস্যময় ধ্বজা নাড়িয়ে যেন ডাকছে কাউকে! গ্র্যান্ড রোডে অবস্থিত হোটেল শ্রীহরি গ্র্যান্ড থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বেই জগন্নাথ মন্দির। এ যেন শুধু এক মন্দির নয়, সাদা-মেরুন বেলে পাথরের তৈরি মঠ বাড়িটি শুধু বিষ্ণুর নবম অবতারের( কিছু কিছু ওড়িয়া ভাষার পুরাণ গ্রন্থে বিতর্কিতভাবে বিষ্ণুর নবম অবতার বুদ্ধের পরিবর্তে জগন্নাথদেবকে উল্লেখ করা হয়েছে) পীঠস্থান নয়, এ যেন হাজার বছরের এক ইতিহাস জানলার ওপারে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে!

আমরা হাঁটছি মন্দির চত্বরে সাথে সাথে ইতিহাস হাঁটছে আমাদের পায়ে পায়ে। ভক্তির চেয়ে আমার মনে তখন নানা জিজ্ঞাসা আর বিস্ময়। এই পাথরের পরে পাথর বসেছে কোন শিল্পীর জাদুহাতে! ভক্তদের স্তুতি, পাণ্ডাদের ক্যাওস, সুমধুর ঘণ্টাধ্বনির ঘনঘটার মাঝেও শুনতে পাচ্ছি হাজার বছর পথ পেরিয়ে আসা হাজার ছেনি আর বাটালির শিল্পসম্মত আঘাতধ্বনি; যতটুকু আঘাত পেলে একটি পাথর কথা বলে ওঠে, একজন কারিগর শিল্পী হয়ে ওঠে। তার কারুকার্য, তার গঠন প্রণালী, তার অস্তিত্ব ভক্তকে যেমন আবেগ তাড়িত করে তেমন নাস্তিককেও অবাক করে দেয়! একটি মন্দির শুধু তো কোনও দেবতার স্থান নয়, নয় শুধু কোনও পুরোহিত গোষ্ঠীর জীবিকার মাধ্যম, নয় কোনও রাজার প্রতিপত্তি প্রদর্শনের নিদর্শন! হাজার হাজার শ্রমিক, শিল্পী ও কারিগরের খণ্ড খণ্ড ক্ষুধা ও অখণ্ডিত কারুবাসনার এক পূর্ণ রূপ যেন এই মন্দির! এই আমরা ও আরও হাজারো ভক্ত-দর্শক হিন্দু তকমার বলে বলীয়ান হয়ে মন্দিরের সিংহ-দুয়ার পার করে গর্ভগৃহের দিকে যাবার অনুমতি পেয়েছি।তাঁকেছুঁয়ে দেখবার, তাঁর শরীরে কান পেতে তাঁর ভাষা শুনবার, শেষে চোখ বন্ধ করে তাঁর আবহমানতাকে অনুভব করবার সৌভাগ্য করেছি। অথচ অহিন্দুরা যখন যখন প্রচেষ্টা করেছে এই বেড়া টপকাবার তারা বাঁধা পেয়েছে, হয়েছে অপমানিত। এই প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে রাস্কিন বন্ডের সাথে মুসৌরিতে তাঁর বাসায় এক সাক্ষাতের কথা। সেদিন কথা প্রসঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা বলেছিল। তাঁর পালিত নেওয়া ভারতীয় হিন্দু পরিবারের সাথে পুরীর জগন্নাথ দর্শন করতে আসার গল্প। সেসময় সবাই মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি পেলেও শুধু জন্মসূত্রে ইংরেজ বলে বণ্ডকে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিকেও বিবাহসূত্রে অহিন্দু হওয়াতে জগন্নাথ দর্শনে বাঁধা দিয়েছিল মন্দির কমিটি! এই যে আমি যে কিনা ধর্মীয় আচারে আস্থাহীন, দেবতাদের প্রতি তীব্র সন্দিহান হয়েও শুধু হিন্দু হওয়ার জন্য প্রবেশ করতে পেরে একেবারেই গর্বিত নই। বরঞ্চ কষ্ট হয় মহান হিন্দু ধর্মের এই সঙ্কীর্ণতা দেখে। তবে এই নিয়মের পিছনে নাকি কারণ আছে। বলা হয় জগন্নাথ মন্দিরের প্রায় হাজার বছরের ইতিহাসে নাকি কম করে আঠারোবার বহিঃশত্রু বিভিন্ন রাজা ও মুসলিম শাসক দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। সেই থেকেই নাকি অহিন্দুদের প্রবেশে এই নিষেধাজ্ঞা।

এবার আসা যাক লিখিত ইতিহাসের কথায়। জগন্নাথের বর্তমান মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পূর্বগঙ্গা রাজবংশের প্রথম রাজা অনন্তবর্মণ ছোড়গঙ্গা। ১১৩৪-১১৩৫ খ্রিষ্টাব্দের একটি শিলালিপি থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। এ কথাও বলা হয় যে অনন্তবর্মণ প্রথমে শৈব ছিলেন। উৎকল রাজ্য জয় করবার পরে নাকি তিনি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। হ্যাঁ হিন্দু ধর্মের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন মত ও ধর্মাবলম্বী আছে। শৈব, বৈষ্ণ, শাক্ত, অদ্বৈত ইত্যাদি আলাদা আলাদা মত ও দর্শনের ভিত্তিতে গড়ে উঠলেও সবেতেই ছিল আর্য ব্রাহ্মণ্য প্রথার প্রতিপত্তি। সবই ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মেরই শাখা হিসেবে ধরা হয়।একমাত্র বৌদ্ধধর্মই প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে সর্বপ্রথম এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক অন্য ধারার ধর্ম হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ায় ভারতের বুকে! প্রায় একই সময়ে প্রবর্তিত হয় জৈন ধর্ম এবং আরও পরে শিখ ধর্ম।

সময়টা তখন ২৬১ খৃষ্টপূর্ব, সম্রাট অশোক এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে কলিঙ্গ জয় করলেন। বলা হয় এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষের প্রাণ যায় ও দেড় লক্ষের মতো আহত হয়, ভুবনেশ্বরের কাছেই ধৌলির দয়া নদী দিয়ে বয়ে গেছিল রক্তের ধারা! যুদ্ধের এই ভয়াবহতা, এই অমানবিকতা রাজার মনে দয়া ও করুণার সঞ্চার করে। চণ্ডাল অশোক বৌদ্ধ ধর্মের শরণাপন্ন হয়ে রূপান্তরিত হল দয়ালু অশোকে। তারপর থেকেই কলিঙ্গ প্রদেশে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক অশোকের এই পরিবর্তনকে তাঁর রাজ্য শাসন প্রণালীর রাজনৈতিক চতুরতা হিসেবেও দেখেন। যাই হোক পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে উৎকল তথা কলিঙ্গ প্রদেশের বিভিন্ন শিল্পকলা ও স্থাপত্যে বৌদ্ধ ও জৈন সংস্কৃতির প্রভাব ও নিদর্শন চোখে পড়ে।কিছু কিছু গবেষকের মত বর্তমান জগন্নাথ মন্দিরের জায়গায় নাকি পূর্বে একটি বৌদ্ধ মঠ ছিল।

এত বিতর্কে গিয়ে কী লাভ! মঠ হোক বা মন্দির এর গর্ভগৃহে যার অধিষ্ঠান তিনি তো জগন্নাথ; জগতের নাথ;তিনিই সৃষ্টির সার! তবে তিনি কোন্‌ নাথ? বিষ্ণু না মহেশ্বর এই বিতর্ক হিন্দু ধর্মের আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকলেও, সকলের দ্বারা আলাদা আলাদা রীতিতে পূজিত হলেও তিনি ও তাঁর মন্দির সকলের কাছে একইরকম জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ! ভারতে বিষ্ণুর চারধামের একটি এই জগন্নাথধাম।তবেবাকি হিন্দু দেবতার সাথে জগন্নাথের অনেক অমিল আছে- চেহারায় ও গঠনে। এখানে বিষ্ণুর কৃষ্ণকায় জগন্নাথরূপী বিগ্রহের সাথে পূজিত হন তাঁর বড় ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাও। মাটির মূর্তির বদলে জগন্নাথের বিগ্রহ সর্বদাই কাঠের তৈরি হয়। এইসব দেখেশুনে ও গবেষণা করে অনেক পণ্ডিতেরা মতপোষণ করেছেন যে জগন্নাথ আসলে ওড়িশার প্রাচীন আদিবাসী দেবতা। ওড়িশার প্রাচীন আদিবাসী শবর জনজাতিরা বৃক্ষকে দেবতারুপে পূজা করতেন যাকে তারা জগনাত বলে ডাকতেন। তা থেকেই পরবর্তীতে জগন্নাথ এর উৎপত্তি। মজার ব্যাপার হল এখনো পুরীর মন্দিরে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের পাশাপাশি শবর দৈতাপতিরাও ( অব্রাহ্মণ পুরোহিত) জগন্নাথের সেবা করে থাকেন।

সেই যে সকালে জগন্নাথ দর্শন দিয়ে শুরু হয়েছিল পুরীর মন্দির পরিক্রমা দুপুরে তা গুণ্ডিচা মন্দির হয়ে সন্ধ্যায় শেষ হয়েছিল কোনার্কের সূর্য মন্দিরে। মন্দিরের পর মন্দির, মন্দিরের ভেতরে মন্দির আর তাদের ইতিহাস! এই গগনচুম্বী মন্দির ও তাদের প্রবল ইতিহাসকে ছাপিয়ে কিছু কটু বর্তমানও থাকে! প্রতিটি মন্দিরেই পুরোহিতদের জোর করে পুজো বা বলা ভালো একপ্রকার ছলকপট করে টাকা হাতানোর খপ্পরে পড়তে হয়েছে।যাই হোক এটা নতুন কিছু নয়।তীর্থস্থানখ্যাত জায়গায় ঘুরতে গিয়ে এরকম অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছে।এর ফলে যে আধ্যাত্মিক ভাব নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করি তা মুহূর্তেই বিনাশ হয়ে যায়।তবে এবারে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছি বা বলা ভালো সত্যি সত্যিই বিব্রত বোধ করেছি। যেই দেখেছে যে আমার দুই সন্তানের দুজনেই কন্যাসন্তান সেই মন্ত্রের মতো আশীষ বচন দিতে শুরু করেছে পুরোহিতেরা- ‘জগন্নাথ তোমাদের পুত্রসন্তান দিক,এই পুজো দাও,এই ভোগের টাকা দাও… ইত্যাদি ইত্যাদি।’ হাজার হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস ও যুগে যুগে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের মহিমায় মহিমান্বিত সেইসব মন্দিরের বাতাসে তখন কিছু কিছু মানুষের লোভ, কামনা, বাসনা, ঈর্ষা, সঙ্কীর্ণতা ও অজ্ঞানতার সুরও(?) ভেসে বেড়াতে দেখেছিলাম!

ঢেউয়ের ভ্রম, সফেন সন্ধ্যা ও জোনাকিবাজার

দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রনীল আর নীলাকাশ আলাদা কি? নাকি তারা একই। শুধু ঢেউয়ের ভ্রম নাকি সফেন মায়া দুটি করে রেখেছে তাদের। নীলাচলের অদৃশ্য টিলার ওপর কোনও ময়ূর দেখিনি তবে আকাশ অংশত মেঘলা ছিল। কীভাবে একটি দিন কুসুম হয়ে রাত্রির সমুদ্রে ঝাঁপ দেয় তা দেখব বলে বিকেল পাঁচটা থেকেই বসে আছি সৈকতে। আর এদিকে নরমসরম সূর্যও লুকোচুরি খেলছে। আমরাও ছাড়ছি না। স্বর্গদ্বার থেকে পিছু নিতে নিতে পশ্চিমে লাইটহাউস পর্যন্ত চলে গেলাম আমাদের আদিম চিত্রকরের লাইভ পেইন্টিং দেখব বলে। না আজ আর রং খেলল না।

সৃজা খেলছে অদ্রিজা খেলছে! সোনালী বালির বুকে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা মুক্তোর মতো সাদা শামুকের খোল কুড়িয়ে পেয়ে ওরা তো অবাক! মুঠো ভরে ভরে সেই রহস্য আমাদের সামনে এনে খুলে দেখাচ্ছে আশ্চর্য চোখে! চেয়ারে হেলান দিয়ে আমি আর শিখা দেখছি। সমুদ্রসঙ্গীত, শিশুর অবাক, আর আকাশের অনন্ত আশ এতো কোনও বিভ্রম নয়! এতো চিরন্তন এক ছবি! মুহূর্তটুকু শুধু চিনে নিতে পারার অপেক্ষা! তাঁকে নাম দিতে পারো গোল্ডেন বিচ্‌, স্বর্গদ্বার, চন্দ্রভাগা বিচ, অথবা চিল্কা হ্রদ ও বঙ্গোপসাগরের মাঝে রাজহংস দ্বীপের কোনও অনামি নির্জন বিচ্‌!

 এই মুহূর্তেরও আবার কত রূপ কত রং সময়ে সময়ে বদলায়! এই সন্ধ্যায় লাইট হাউসের সামনে বসে আছি এখানে মানুষের ভিড়ভাট্টা হইহট্টগোল একটু কম। অথচ এই সমুদ্রের ধার ধরে ধরে স্বর্গদ্বারে গেলে সেখানে এখন লোকে লোকারণ্য! তারপরেই গোল্ডেন বিচ্‌! সোনালী বালিকণার কারণেই বোধহয় এই নাম। দুপুরেই সেখানে আমরা প্রথমবার সমুদ্রের ঢেউ গায়ে মেখেছি। দেখেছি কত কত নারী পুরুষেরা ভাসতে ভাসতে দূরে গেল আবার ঢেউ তাদের ফিরিয়ে দিয়ে গেল! কতো লোকজন শুধু একটু স্রোতে ভাসবে বলেই না পুরী ভ্রমণে আসে! মহাসমুদ্রের এক পাড়ে এও এক জীবনসমুদ্রের খেলা! আমাদের স্নান তেমন জমেনি! সৃজা আর অদ্রিজার ভাঙ্গা-গড়ার খেলাতেই বেশি মন ছিল! সমুদ্রের গর্জন থেকে নিরাপদ দূরে বালির ঘরবাড়ি গড়ছে আর ভাঙছে! এখানে শরতেও ভীষণ ভ্যাপসা গরম। শিখাকে বলি ডাবের জল খাও। সে ডাবের জল খায়! দেখো কত মাছের দোকান; চিংড়ি, কাঁকড়া, পারশে, পম্‌ফ্রেট, টুনা…। তাজা তাজা মাছ কেটে মশলা মাখিয়ে রেখেছে! শুধু পর্যটকের রহস্যচোখের ইশারার অপেক্ষায়, ইশারা পেলেই তারা লাফ দিয়ে ফুটন্ত তেলে ডুবে যাবে আবার সুস্বাদু আহার হয়ে ভেসে উঠবে! শিশুদের জন্য আছে হরেকরকম ফেরিওয়ালা!

এদিকে স্বর্গদ্বার বিচের যে দোকানপাটগুলি দিনের রৌদ্রতাপ থেকে গা বাঁচাতে নীল প্লাস্টিক মুড়ে পড়ে ছিলো তারা বিকেল হতেই অবগুণ্ঠন খুলে ফেলে মেলে ধরেছে জীবনের বাহারি যাপন! একটি মানব জীবনের জন্য যাকিছু প্রয়োজন প্রায় সব উপাদানই দোকানে দোকানে সেজে উঠেছে এখানে।হরেকরকম খাবারের দোকানতোআছেই। আছে কটকী জামাকাপড়ের দোকান- সেখানে ঝুলছে এখানকার জনপ্রিয় প্রিন্টেড বা কারুকাজ করা সুতির কুর্তি, চুড়িদার, ফতুয়া,পাজামা,গামছা, লুঙ্গি! শঙ্খের দোকানে সারি সারি শঙ্খ সাজিয়ে রাখা, কড়ি দিয়ে সাজানো আয়না থেকে শামুকের খোল দিয়ে বানানো নানা দেবতার মূর্তি অথবা ঝুড়ি মাথায় কোনও আদিবাসী রমণী সাজানো রাখা আছে কাঠের চৌকিতে। কোনও দোকানের শেড থেকে ঝুলে আছে চিনা প্লাস্টিকের খেলনা থেকে মোবাইলের কভার। আছে অ্যালমুনিয়ামের হাড়ি আছে কাঠের জগন্নাথ-গৌড়-নিতাই,এসবকিছুই সাজানো রয়েছে এই বাজারে! রোজহাজার হাজার পর্যটক এই সান্ধ্য বাজারে পরিবার-বন্ধু-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কেনাকাটা করে।আর এসব থেকে একটু দূরে স্বর্গদ্বারের বিখ্যাত শ্মশানে জীবনের লীলা সাঙ্গ করে কেউ কেউ একমুঠো ছাই হয়ে যাবে অথবা কেউ কেউ স্বর্গপ্রাপ্ত হবে! কারো চলে যাওয়াতে জীবন তো আর থেমে থাকে না! দূরে বসেই দেখতে পাচ্ছি স্বর্গদ্বার বিচের আলোমালা জোনাকির ভিড়ের মতো জ্বলে উঠেছে!

এদিকে লাইটহাউস বিচে মেরিনড্রাইভ রোডের পথবাতি থেকে যতটুকু আলো আসলে সমুদ্র সৈকত মোহময় হয়ে ওঠে ঠিক ততটুকুই আলো এসে সোনালী বালিতে চিক চিক করছে। আকাশের এক কোণে চেয়ার নিয়ে বসে আছে নবমীর নধর চাঁদ- কুহক জোছনা তার পৃথিবীর বাথটাবে ঢেউকে জড়িয়ে ধরে নেমেছে আজ অনন্ত স্নানে! সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যের সন্তানেরা, চাঁদের সন্তানেরা সেই বায়বীয় আদরের ছাঁটে ভিজছে, ভিজে চলেছে। এই তো স্বর্গ! এই তো স্বর্গীয় সন্ধ্যা। এই স্বর্গ ছেড়ে এই সন্ধ্যা ছেড়ে এই জোনাকিবাজার ছেড়ে আমাদেরও চলে যেতে হবে কাল আপন ঘরে!

জগন্নাথকে ঘিরে কিছু মিথ্‌ ও তাদের বাস্তব অস্তিত্ব

আলো-আঁধারি ফুঁড়ে এক প্রকৃতির সন্তানকে হেঁটে হেঁটে সমুদ্রের দিকে যেতে দেখলাম। এক হাতে তার একটি মলিন হয়তোবা সাদা; আঁধারে মলিন দেখাচ্ছে কাপড়ের পুঁটুলি অন্য হাতে একটি ঘটি।একটু নির্জনে গিয়ে সমুদ্রের সামনে হাঁটু মুড়ে বসলেন। তারপর পুঁটুলিটা রেখে ঘটি হাতে সমুদ্রে নেমে গেল। দূর থেকে দেখে মনে হল যেন একটি শরীর সাগরে মিলাল, মিলিয়ে গিয়ে আবার উঠে এল অনন্ত সমুদ্র থেকে একঘটি সমুদ্র তুলে নিয়ে। তারপর সমুদ্রের নোনাজলে সিক্ত বালি দিয়ে মণ্ডের মতন তিনটি অবয়ব বানালেন। তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পুঁটুলিটা খুলতে লাগলেন। বসার ভঙ্গিটি আমাদের দেখা ঠিক পুরোহিতের বসার ভঙ্গির মতো নয়। পুঁটলি থেকে কলা, নারিকেল সহ পুজার কিছু উপাচার মণ্ড তিনটির সামনে সাজিয়ে রাখলেন। মণ্ডগুলোকে তেল সিঁদুর দিয়ে সাজিয়ে দিল- দূর থেকে দেখে ঠিক তাই মনে হল। কৌতূহলে কাছে যেতে মন চায়, কিন্তু বিবেক বলল, কারো ব্যক্তিগত আরাধনাই হোক বা উপাসনাই হোক কাছে গিয়ে তার নির্জনতা কিংবা মগ্নতা ভগ্ন করা উচিত নয়। তাই দূর থেকেই দেখছি প্রদীপ জলে উঠল, তারপর ধূপের সরু ধোয়া বাতাসে মিলাল। শরতের এই নবমী নিশিতে এই পৃথিবীলোকের একজন লোক সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে কার উপাসনা করছে? তিনি কি প্রকৃতিরই উপাসনা করছেন। ইনিই কি সেই স্কন্ধপুরাণে বর্ণিত শবর জনগোষ্ঠীর গোষ্ঠীপতি বিশ্ববসু! ওড়িশার সেই আদিম জনজাতি শবর গোষ্ঠী যারা প্রকৃতির উপাসক ছিল, তারা বৃক্ষ, পাহাড়, নদী, সমুদ্রকে দেবতারূপে পূজা করতেন।

এবার পুরাণে বর্ণিত সেই গল্পে আসা যাক। সত্য যুগে মালব্য রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন একসময় খবর পেলেন যে ওদ্র প্রদেশের( ওড়িশার প্রাচীন নাম) শবর গোষ্ঠীপতি বিশ্ববসুর কাছে ভগবান বিষ্ণু সশরীরে পূজিত হচ্ছেন। এদিকে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিষ্ণুর উপাসক হয়েও তার দর্শন পাচ্ছেন না। খবর শুনে উতলা রাজা তার এক চর বিদ্যাপতিকে খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠালেন সেখানে। ব্রাহ্মণ পূজারী বিদ্যাপতি ভ্রমণ করতে করতে ওদ্র প্রদেশের নীলাচলে পৌঁছলেন। এদিকে পথের ক্লান্তিতে অসুস্থ বিদ্যাপতিকে নীলাচলের শবর গোষ্ঠীপতি বিশ্ববসু তার বাসস্থানে আশ্রয় দিলেন। তারই মধ্যে বিদ্যাপতি ও বিশ্ববসুর একমাত্র কন্যা ললিতার মধ্যে প্রণয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।বিদ্যাপতি তার আসল পরিচয় ও নীলাচলে আসার সত্য গোপন রেখে সেখানেই সংসার পাতলেন। কিন্তু বিদ্যাপতি তার উদ্দেশ্য ভুলল না। সে লুকিয়ে লুকিয়ে তার অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে লাগল কিন্তু কিছুতেই নীলমাধবের সন্ধান পেল না। তবে সে লক্ষ করল তার শ্বশুর বিশ্ববসু রোজ সন্ধ্যায় একা একা কোথায় যেন বেরিয়ে যায় আর ফেরে গভীর রাতে। স্ত্রী ললিতাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল আসল সত্য- যে জঙ্গলের কোনো গোপন গুহায় নীলমাধবের পূজা করতে যায় বিশ্ববসু। বিদ্যাপতির চোখদুটো চকচক করে উঠল- অবশেষে তার পরিশ্রমের ফল মিলতে চলেছে। সে শ্বশুরের কাছে বায়না ধরল নীলমাধবের দর্শন করার জন্য। প্রথমে রাজি না হলেও বারংবার জোরাজুরিতে শেষে রাজি হল বিশ্ববসু। তবে একটি শর্ত দিল যে নীলমাধরের দর্শনের সময়টুকু বাদে বাকি যাওয়া- আসার সময় বিদ্যাপতির চোখ বাঁধা থাকবে। বিদ্যাপতি কিছুতেই এই বহু প্রতীক্ষিত সুযোগ হারাতে চাইল না। সে রাজি হয়ে গেল। তবে চতুর বিদ্যাপতি একটি থলেতে সর্ষের দানা নিয়ে নিল ও যাবার সময় গোপনে তা পথের মধ্যে মাঝে মাঝে ছড়িয়ে দিতে দিতে গেল। কিছুদিন পরে সেই সর্ষে দানা থেকে গজানো গাছের সূত্র ধরে ধরে বিদ্যাপতি একদিন পৌঁছে গেল নীলমাধবের গুহায়, কেউ টেরও পেল না।দর্শন করে আসার পর দেশভ্রমণের নাম করে বিদ্যাপতি বেড়িয়ে পড়ল মালব্য রাজ্যের উদ্যেশে। সেখানে পৌঁছে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে সমস্ত ঘটনা বলতেই রাজা সৈন্য সামন্ত নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল নীলমাধবকে এনে রাজপ্রাসাদে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য। কিন্তু নীলাচলে পৌঁছে দেখল নীলমাধব আর সেখানে নেই । ক্রুদ্ধ রাজা শবর গোষ্ঠপতিকে বন্দী বানাল। সাথে সাথে ভগবান বিষ্ণুর দৈববাণী ভেসে এল যে একটি দারুবৃক্ষ রূপে সাগরের জলে ভেসে উঠবেন ভগবান বিষ্ণু। রাজা যেন তা থেকে বিগ্রহ বানিয়ে পূজা করেন।রাজা ছুটে গেল সমুদ্র তীরে এবং গিয়ে দেখল সত্য সত্যই একটি কাঠ ভেসে উঠেছে সমুদ্রের ঢেউয়ে। তবে হাজারো লোক-লস্কর দিয়েও সেই কাঠ তীরে তোলা গেল না। আবার দৈববাণী হল- যে বিশ্ববসুর সহায়তা ছাড়া এই কাঠ তোলা যাবে না কিছুতেই। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিশ্ববসুকে সসম্মানে মুক্ত করে তার সহায়তায় সেই দারুবৃক্ষকে সমুদ্র থেকে তুলে আনল। তারপর রাজা আরও একবার দৈববাণী শুনল- যে ভগবান বিশ্বকর্মা একজন মিস্ত্রীর রূপ ধরে এসে সেই কাঠ থেকে বিষ্ণুর বিগ্রহ বানাবেন। সেই কথামতো কিছুদিন পরে এক বৃদ্ধ কারিগর এসে হাজির হল রাজার কাছে ও ২১ দিনের মধ্যে বিগ্রহ তৈরি করে দেবে বলে প্রস্তাব দিল। তবে শর্ত একটাই-একটি বদ্ধ ঘরে কারিগর একাই মূর্তি গড়ার কাজ করবেন আর সেই সময়ের মধ্যে কেউ যেন সেই ঘরের দরজা খোলার চেষ্টা না করে। রাজা রাজি হয়ে গেল। সেই বৃদ্ধ কারিগর কাজ শুরু করলেন। বদ্ধ ঘর থেকে ছেনি বাটালির ঠুক-ঠাক আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। এভাবে পনেরদিন কেটে যাবার পর আর কোনও সাড়াশব্দ আসে না বদ্ধ দরজার ওপার থেকে। রানীর সন্দেহ হল। কৌতূহলবশত রাজাকে সেই কথা বলতেই রাজা দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখল কারিগর উধাও। পড়ে আছে শুধু তাঁর গড়া অর্ধসমাপ্ত,হাত-পা বিহীন তিনটি বিগ্রহ ও একটি সুদর্শন চক্র! রাজা বুঝতে পারল তিনি সময়ের আগে দরজা খুলে ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে। যাই হোক তৎক্ষণাৎ আবার এক দৈববাণী হল যাতে বিষ্ণু রাজাকে অভয় দিয়ে বললেন এই অসমাপ্ত বিগ্রহকেই সিল্কের পোশাকে সাজিয়ে মহাবেদিতে প্রতিষ্ঠা করতে। এই রূপেই তিনি পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে( পুরীধামের প্রাচীন নাম) ভক্তের দ্বারা পূজিত হতে চান এবং এটাই তাঁর ইচ্ছে!

এভাবেই নীলাচলের এক আদিবাসী অনার্য দেবতাকে আর্য ভগবানের রূপ দিয়ে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য প্রথার প্রবর্তন করা হল। অথবা বলা ভাল সময়ের সাথে শাসকের পরিবর্তনের সাথে সাথে এক আদি ভারতীয় দেবতার বিবর্তন হল। এও এক আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বের ইতিহাস, এও এক  আর্যদের ষড়যন্ত্রের কাছে অনার্যদের পরাজয়ের ইতিহাস।

পুরাণের কাহিনীকে,যেখানে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আর্যদের মহিমাম্বিত করে দেখানো হয়েছে আধার করে ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শনকে ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গবেষক ও ঐতিহাসিকেরা আমাদের সামনে গল্প-মিথের বাইরেও এক সত্যকে তুলে ধরেন। আমাদের সেদিকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়াও দরকার। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই লড়াইকে ধর্মযুদ্ধ বলে চালালেও এর পিছনে ছিল বহিরাগত আর্যদের বিস্তারবাদী ও প্রভুত্ববাদী সমাজের এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের ফলেই ভারতীয় আদিম জনজাতিরা নিজেরই ভূমিতে ক্রমশ প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর জাতিতে পরিণত হয়ে পড়েছে। অরণ্য ও প্রকৃতির উপাসক, ধারক ও সংরক্ষক আদিবাসী জনজাতীদের উপর আক্রমণ করে তাদেরই ভূমি থেকে বিতাড়িত করে আর্য শাসকেরা সেখানে কৃষিভূমির বিস্তার করেছে রাজস্ব ও সম্পদ বৃদ্ধির লোভে। পরাজিত, বন্দি আদিবাসীদের শ্রমকে ব্যবহার করেছে নিজেদের সেবা ও স্বার্থের কাজে বদলে ভূমিপুত্ররা পেয়েছে প্রভুদের তিরস্কার ও ঘৃণাদৃষ্টি! এভাবে ভারতের সার্বিক ও মূল পরম্পরা, সংস্কৃতি যার ভিত্তি ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক, সমানাধিকার, প্রকৃতি ও মনুষ্যেতর প্রাণীর সঙ্গে সহ অস্তিত্বের ভাবনা তা ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত হয়েছে আর্যদের ব্রাহ্মণ্যবাদী পরম্পরা ও সংস্কৃতির দ্বারা। আর তারই অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে মনুবাদ তথা বর্ণব্যবস্থা যা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতায় এক অভিশাপরূপে কোথাও কোথাও আজও বর্তমান।এই অভিশাপের ফলেই আজও ওড়িশার শবর জনজাতিরা বিপন্নপ্রায়। ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতি ও শবর ললিতার বংশধর শবর দৈতাপতিরা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রভুর সেবার অধিকার পেয়েছে, স্বাধীন ভারতবর্ষে জাতিবৈষম্য আইনত অপরাধ হিসেবে সংবিধানে মান্যতা পেয়েছে তারপরেও অধিকাংশ শবর জনজাতিরা সমাজের কাছে অস্পৃশ্য, অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। আধুনিক সভ্যতার উন্নয়ন ও শিক্ষার আলো থেকে শত যোজন দূরে তারা আজও ভারতের আনাচে-কানাচে পাহাড়-অরণ্যকে আঁকড়ে ধরে কোনোমতে নিজস্ব গৌরবে বেঁচেবর্তে আছে। তবে শবর সহ অন্যান্য আদিবাসীদের এই বেঁচে থাকবার স্বপ্ন কতদিন টিকে থাকবে বলা মুশকিল। পুঁজিবাদী উন্নয়নের রথের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে অরণ্য থেকে পাহাড়। বর্তমান ভারতে তার সাথে যোগ দিয়েছে বহুত্ববাদী ধর্মের ধ্বজাধারী রাজনৈতিক সারথিরা। এই দ্বিমুখী ষড়যন্ত্রের ফলে ভারতের আদিবাসী জনজাতির অস্তিত্ব পুরাকালের মতো আরও একবার গভীর সঙ্কটের মুখে! পুঁজিবাদকে কেন্দ্র করে রাজনীতি ও বহুত্ববাদী ধর্মের এই মিলিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যদি কোনও শক্তি রুখে দাঁড়ায়, যদি কেউ বাঁধা দেয় তবে তাকেই মেপে নেওয়া হবে দেশদ্রোহী বলে শাসকের মানদণ্ডে! হাজার হাজার বছর আগে যে দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছিল তার কিছুই বদলায়নি। বদলেছে শুধু পোশাক ও নাম!  

থাকা-খাওয়ার টুকিটাকিঃ

পুরীতে আমরা উঠেছিলাম জগন্নাথ মন্দিরের কাছাকাছি, গ্র্যান্ড রোডে, হোটেল শ্রীহরি গ্র্যান্ড-এ! তবে এই এলাকার হোটেলের ভাড়া একটু বেশি। তবে বেশীরভাগ বাঙালিরা পছন্দ করেন স্বর্গদ্বার এলাকার সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি হোটেলগুলি। খরচও কম হয়।

মন্দিরের কাছাকাছি হোটেলগুলিতে থাকলে খাবারের একটা সমস্যা হবে; এখানে সব হোটেলই নিরামিষ খাবার পরিবেশিত হয় আট-দশ রকম পদ সহ। আমিষ খাবার খেতে আমাদের স্বর্গদ্বার অথবা মেরিন রোড এলাকায় যেতে হয়েছিল। এখানকার রান্না প্রায় বাঙালি রান্নার মতোই; তা ডাল-সব্জি হোক অথবা চিংড়ি-পম্‌ফ্রেট! মিষ্টির মধ্যে বিখ্যাত এখানকার খাজা! আর রসগোল্লা তো আরেক ইতিহাস- পশ্চিমবঙ্গের সাথে তার চিরকালের লড়াই; সে আরেক উপখ্যান! 

About Author
&
Photographer

লেখক : শিবু মন্ডল

প্রথম দশকের কবি।

কাব্যগ্রন্থ : শীতঘুম ও আনুষঙ্গিক জ্বর , দার্জিলিংয়ের রাত্রিগুলি।
সম্পাদনা: হেমন্তলোক নামক সাহিত্য পত্রিকা।

আলোকচিত্রী: শিবু মন্ডল

প্রথম দশকের কবি।

কাব্যগ্রন্থ : শীতঘুম ও আনুষঙ্গিক জ্বর , দার্জিলিংয়ের রাত্রিগুলি।
সম্পাদনা: হেমন্তলোক নামক সাহিত্য পত্রিকা।

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget