যতটা শেষরাতের স্বপ্ন, যতটা দেজা ভ্যু

হ্যাঁ, মানুষ হিসেবে সমুদ্রের প্রতি আলাদা ভালো লাগা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। আরেকটু পেছনে গিয়ে তো নিজেদের সাগরিকই দেখতে পাই আমরা। সমুদ্র থেকেই যে উঠে এসেছি এখনো রক্তে প্রমাণ, অস্থিমজ্জায়ও। আর এখনো আমাদের সহজাত প্রবণতায়ও প্রমাণ। সেটা কেমন? রাশি রাশি জল মানেই রাশিকৃত আদিখ্যেতা। আর তা কোথায় পৌঁছে গেছে টের পাওয়ার আগেই যা হওয়ার হয়ে যায়, যখন কক্সবাজার যাই।
আজকের এ আলাপে নিছক সমুদ্র নয়, বরং কক্সবাজারের সমুদ্র মুখ্য।
আমি আর পার্র্লিয়া যখন প্রথম কার্জন হলে হাত ধরেছি, তখনো বিয়ে করতে আরো তিন বছর। আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে হেসেছে ‘লস্কর বাড়ির ছেলেরা’। তা ঠিক। মাত্র তিন বছরের প্রেমে কৃতিত্ব কোথায়। তবে ওইসমস্ত বীরমৌমাছির বন পেরিয়ে আমরা ডিঙিয়ে যখন আমাদের ব্যক্তিগত রাস্তা-নদের বাঁকে হারাতাম, হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো একসাথে আমাদের যেন কত যুগ পেরিয়ে গেছে। মাইলের পর মাইল আমরা গল্প করতে করতে হেঁটেছি। আমাদের আলাপের অনেকটা জুড়ে ছিল এই সাগর নিয়ে কল্পনা। বাংলার গোটা দক্ষিণ ছুঁয়ে সমুদ্র। তবু কক্সবাজারের মতো এমন চিরবসন্ত আর কোথাও লেগে থাকতে দেখিনি। দুজনই। তাই সাগর মানেই ছিল আমাদের কক্সবাজার নিয়ে আলাপ। সেইসব দিনে একসঙ্গে কত কী ভেবেছি। গিয়ে কোথায় উঠব, কী পরব কোন প্রহরে। আমাদের দুজনের একটা প্রিয় গান ছিল।
“ওই ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায় আমার ইচ্ছে করে/ আমি মন ভেজাব ঢেউয়ের মেলায় তোমার হাতটি ধরে।”
আমাদের কল্পনা এতো দূর বেড়েছিল, এতো উঁচু হয়ে জমেছিল, যে একসময় কেমন চেপে বসল অস্তিত্বের ওপর। চেপে বসেছিল কারণ যে আমরা ভাবছিলাম বিয়ের পরের সকালেই জেগে উঠব কক্সবাজারে, সেই আমাদের বিয়ের পর একদিন দুদিন করে প্রায় ছয় মাস কেটে গেল, সমুদ্রে যাওয়া অপেক্ষা ফুরলো না। রাতের পর রাত আমরা “ওই ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায়,” শুনেছি, শুনেছি “সেই সাগর বেলায় ঝিনুক খোঁজার ছলে গান গেয়ে পরিচয়...” তবু শেকল ছিড়তে পারিনি।
অবশেষে, একদিন, সকল কাঁটা ফুল করে যখন আমরা রাতের বাসে উঠতে পেরেছি, তারপর সকালে, হাতে হাত ধরে সাগরের সামনে দাঁড়িয়েছি, দুজনই কেমন নির্বাক হয়ে পড়েছিলাম। মনে আছে তখন সকাল, আমরা কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকতে নরম বালুর দিয়ে হাঁটছিলাম। সায়নরঙা বঙ্গোপসাগরের ক্রোড়ে কী মিষ্টি রো-দ! নীল হীরকচূর্ণঝরা! ঢাকা থেকে প্রায় বারো ঘণ্টা বাস যাত্রার ক্লান্তি আমাদের প্রতি কোষে ধরা থাকলে কী হবে। ক্লান্তি বোঝার মতো বোধবুদ্ধি আমাদের তখন লুপ্ত। আমি বললাম, “পার্ল, এই সেই সমুদ্র। দেখেছ? অনেক স্বপ্নের...”
পার্লিয়া বলল, “অবশেষে মিম। বিশ্বাস হচ্ছে না এখনো। চলো একটু পা ভিজিয়ে দাঁড়াই।”
সৈকতসমগ্র
আগেও আলাদা আলাদা এসে আমরা দুজন সমুদ্র দেখেছি। তখনো আমাদের পরিচয় ছিল না, থাকলেও প্রেম ছিল না।সেবার দুজনে একসঙ্গে প্রথমবারের মতো সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলাম। আসলে এই সব বোকাদের জন্য কিছু আসেনি। এরা কল্পনা আর বাস্তব গুলিয়ে ফেলে। কারো কারো কাছে সমুদ্র কখনই পুরোটা বাস্তব নয়। অর্ধেকটা কল্পনার, আবেগের।
তদুপরি- সৈকতে দাঁড়ালে পায়ে পায়ে দেজা ভ্যু! কেন মনে হয়; এ ভুবনেও নয়, এ জীবনেও নয়; অথচ সমস্ত আগেও ঘটেছে?
সুগন্ধা সৈকত
আমরা দুজন প্রথম যে সৈকতে দাঁড়িয়েছিলাম তার নাম সুগন্ধা। সুগন্ধা থেকে ডানদিকে, অর্থাৎ উত্তর দিকে লাবণী সৈকত। বাম দিকে কলাতলী সৈকত। সুগন্ধা সৈকতে যখন দাঁড়িয়েছি, তখনো সকালের মন ভালো। সমুদ্র ঝিলমিল করছে। তার দিকে তাকানো যায় না, কিন্তু চোখে অস্তিত্ব প্রকটভাবে ধরা পড়ে। বালিয়াড়িতে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। নোনা ফটিক জল জমেছে তার ভেতর। সেই সব গর্তের ভেতর তাকালে দেখালে যায় জল ভেদ করে ছোট ছোট বুড়বুড়ি উঠছে মাটির নিচ থেকে। সূর্যের ঝিলিকওঠা স্বপ্নদৃশ্যের মতো সেই ছবি। আমি হাঁটু ভাঁজ করে সেই জলের ছোট গহ্বরের ভেতর হাত ডুবিয়েছি কত। ঠাণ্ডা! তবে বেশিক্ষণ আর ঠাণ্ডা থাকে না। থাকেনি। বরাবরই আমরা দুজন স্যান্ডেল খুলে ফেলে খালি পায়ে হাঁটি ভেজা বালুর ওপর।
কক্সবাজারে জলের সাগরের পাশাপাশি আরেক অদৃশ্য সাগর আছে। সারাক্ষণ সেখানে উত্তাল সব ঢেউ জেগে আছে। তা হলো অনুভবের সাগর।
লাবণী সৈকত
সুগন্ধা থেকে উত্তরে আমার সবচেয়ে প্রিয় সৈকত, লাবণী। লাবণী সৈকত প্রিয় সৌন্দর্যের দিক থেকে নয়। স্মৃতির দিক থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে পরিবারসহ লাবণী সৈকতে এসে আমি সর্বপ্রথম ঝাউবন দেখেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি ঈশ্বরের শৈশবের স্বপ্নের ভেতর হারিয়ে গেছি। ঈশ্বর যখন শিশু, যখন তিনি নিষ্পাপ, তখন তাঁর স্বপ্নগুলো যেমন ছিল; তা আজকের পাপিষ্ঠ ঈশ্বরের সঙ্গে মিলবে না; আমি খুব আপন-আপন যাপন করেছিলাম। সেটা ২০০৭ সালের দিককার ঘটনা। শীতের একেবারে শুরু ছির মনে আছে। ডিসেম্বর বোধয়। লাবণী সৈকতের ঝাউবনের পেছনে একটা সরকারি রেস্টহাউজে উঠেছিলাম। সেই প্রথম ভোরের ঝাউবন আর রাতের ঝাউবন আমার ভেতর একটা কালো রূপকথার জগৎ তৈরি করে। ভোরে যখন লাবণী সৈকতের ঝাউবনে আসি, সামনে সমুদ্র রেখে একটা মেঘচাপা পবিত্র অন্ধকারকে অনুভব করি। মনে হচ্ছিল আমি একা এই গোটা পৃথিবীতে। আর পৃথিবীতে আমি একা মানে আমার চতুর্পাশে সহস্র আলোকবর্ষের ভেতর আমি একা! আবার যখন রাতে এসেছি, মনে হয়েছিল আমি বুঝির রাত্রির হৃদপিণ্ডের ভেতর আছি। সমুদ্রের গর্জন আর ঝাউগাছের ঝিরিঝিরি আমাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল। রাতের সমুদ্র থেকেও যে আলো উঠে আসে, সেই আমার প্রথম দেখা। এর আগে তো শুধু বইয়ে পড়েছি।
পার্লিয়ার সঙ্গে এসব নিয়ে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যেতাম, যখন আমরা ঢাকার চিৎকারপ্রিয় রাজপথে মাইলের পর মাইল হাঁটতাম। আর সেইসব স্মৃতির যাপন চারপাশে একটা নীরবতা নামিয়ে আনত।
লাবণীর পেছনে বহুপুরাতন বৌদ্ধ মন্দিরের চূড়া। ওখানে আমাদের ভীষণ প্রিয়, শান্ত সময় কেটেছে একবার। ওখানে বৃক্ষ থেকে সবই প্রাচীন।
কলাতলী সৈকত
সুগন্ধা থেকে দক্ষিণে কলাতলী সৈকত। নামের দিক থেকে কলাতলী সবচেয়ে লৌকিক। সুগন্ধা আর লাবণী শুনলেই বোঝা যায়, ওরা আরোপিত নাম। ওপর থেকে চাপানো। আর কলাতলী নামটা বলছে, এ নাম বেরিয়েছে ভেতর থেকে। এখানে বর্তমানে পাঁচ তারা হোটেল একটা উৎকট সুন্দর হয়ে বারবার তাদের দিকে তাকাতে বলে। কিন্তু একসময় এ ছিল জেলেপল্লী। সরব-নীরব হাসি কান্নায় বন্য সভ্য জলজ মানুষদের গ্রাম। সে গ্রাম আমি দেখেনি। শুনেছি তার কাথা। যাদের কাছ থেকে শুনেছি তাঁদের একজন কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল। কামাল ভাই বলেছিলেন একবার, নব্বইয়ের শুরুর দিকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের নিয়ে কলাতলীর সৈকতে এসে রাতে ক্যাম্প করে ছিলেন। জেলেপল্লী তখন ক্ষয়িষ্ণু। আর কুড়ি বছরের ভেতর যে তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তা সেইসব দিনে, সেইসব আগুনজ্বলা রাত্রিতে কল্পনাও করা যায়নি। কিন্তু কামাল ভাই বুঝেছিলেন, তার আর দেরি নেই। কারণ শহর এগিয়ে আসছিল।
এই কলাতলী সৈকতে আমরা সবচেয়ে গাঢ় মেঘলা সাগর কাটিয়েছি। আকাশের মেঘ যখন জলের ওপর ছায়া ফেলে রাখে, জল কালচে ধূসর করে রাখে, তখনকার বিকাল আর সন্ধ্যার মতো বিষণ্ন সময় আর নেই। যদি লাবণীতে আমার সবচেয়ে গভীরতাময়, সুগন্ধায় সবচেয়ে আনন্দময় সময় কেটে থাকে, তো কলাতলী সৈকতে সময় কেটেছে সবচেয়ে সুখময় বিষণ্নতায়। প্রতিবার কক্সবাজারে গেলে আমরা কলাতলীর একটা সৈকতবর্তী একটা বিশেষ হোটেলের বিশেষ একটা ঘরে ওঠার চেষ্টা করি। হোটেল সি ক্রাউনের ছয়শ তিন নম্বর ঘর। তারচেয়ে ভালো হোটেল আছে, তারচেয়ে সুন্দর ঘরও আছে। কিন্তু মানুষ এমন প্রাণি, তার সব কিছু স্মৃতি দিয়ে বিচার্য। হোটলের সেই বিশেষ ঘরটা থেকে সারাক্ষণ যেন সমুদ্রের ওপর ভেসে আছি এমন একটা অনুভব হয়। আমরা দীর্ঘসময় হোটেলের বারান্দায় চেয়ার টেবিলে পেতে বসে বসে পানীয়তে চুমুক দিয়েছি আর সাগরের রংবদল দেখেছি।
কোথাও গেলে আমরা খুব দ্রুত এর অতীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। অতীতের পায়ের ছাপ দেখি, তার দীর্ঘশ্বাস শুনি। আমাদের সামনে যদি সাগর থাকে তো আমারা তার ওপরে আকাশসাগরসহ দেখি।
দক্ষিণে কলাতলী থেকে উত্তরে লাবণী পর্যন্ত এই লম্বা পথ ধরে তিন তারা পাঁচ তারা হোটেলের অভাব নেই। যারা এই দেখে বড় হচ্ছে তাদের কাছে এ স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু যারা আরো আগে থেকে এক পবিত্রনির্জন সৈকতসারি দেখে এসেছে তাদের কাছে এ দৃশ্য পীড়াদায়ক। পৃথিবী জুড়েই তো এই হচ্ছে। হোটেলগুলো সব সমুদ্রের চোখ ঢেকে দিতে চায়। তবে পণ্ডিচেরি থেকে ফিরে এসে মনে হয়েছিল এই কক্সবাজারেই সাগরের গলা জড়িয়ে ধরে পড়ে থাকি, আনন্দে অশ্রুপাত করি। কারণ সেখানে বিদেশি ঢঙে সাগরকে যেভাবে দেয়াল দিয়ে বাঁধা হয়েছে, ওই দুঃসাহস চট্টগ্রামের দিকে খানিক হলেও এখানে কেউ এখনো করেনি।
এক ফাঁকে খাবার নিয়ে ছোট্ট আলাপ : যখন কেবলই বেড়াতে এসেছি, তখন এই তিন সৈকতময় বেড়ানো হয় সবচেয়ে বেশি। আর সমুদ্রবর্তী হাওয়ায় আমাদের ঘনঘন ক্ষুধা পেতে থাকলে আমরা দুটো খাবার জায়গাকে আশ্রয় মানি। এক হলো ঝাউবন, আরেক হলো পউশী। এখন আরো অনেক নতুন নতুন ভালো খাবারের দোকান হলেও পউশী ও ঝাউবন আমাদের কাছে কখনো ব্রাত্য হবে না। এখন পউশীর আরো অনেক শাখা হয়েছে কিন্তু আমরা লাবণী পয়েন্টের কাছে যে পউশী আছে সেটাকেই পছন্দ করি বেশি। খাবারের মেনু হাতে নিয়ে লইট্যা ফ্রাই অর্ডার করতে আমাদের কখনো ভুল হয় না। লইট্যা মাছের জন্যে দুর্ভাগ্য, এখানকার লইট্যা আমাদের মতো আদেখলা রসনামিতার হৃদয়ে আজীবন রাজত্ব করার ক্ষমতা রাখে। আরো যা যা আছে, রূপচাঁদা ভাজা কোরাল মাছ ভাজা, চট্টগ্রামের বিখ্যাত কালাভুনা আর ওদের বিশেষ আমড়ার চাটনি, এসব দিয়ে খেতে খেতে, ভাতের বিরাট বোল আমাদের দুজনের জন্যে ছোট্ট মনে হয়। মনে একটা পেয়ালায় করে এই অল্পকটা মোটে ভাত দিলো!
ইনানী সৈকত
ইনানীর কথা বলি এবার। কলাতলী থেকে আরো দক্ষিণে উখিয়ার দিকে যেতে যেতে পড়ে ইনানী সৈকত। এই ইনানীতে এসে এতোক্ষণের দেখা মসৃণ সৈকতকে চট করে আর চেনা যায় না। কারণ এখানে মতো চোখে পড়বে প্রবালপাথর, যেন ভূপ্রকৃতিতে কিছু একটা বদলে গেছে। উত্তর দিকের সৈকতে একটা দুটো চোখে পড়তে পারে, কিন্তু এখানে এসে হঠাৎ রাশি রাশি।
ইনানী সৈকতে এই প্রবাল পাথরের কাছে একটা ভয়ের স্মৃতি তৈরি হয়েছিল আমার। সেটা কেমন? সেবার আমার বাবা মায়ের সঙ্গে এসেছিলাম। পার্লিয়াসহ আসার সাত বছর আগের কথা। সময়টা দুপুরের কিছুটা পরে, হয়ত খানিকটা বিকালের দিকে, খুব সম্ভব। সাগর ক্রমশ এগিয়ে আসছিল। আমি প্রবাল পাথরগুলো ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা সামনে একটু উঁচু এক বালির সোপানের ওপর বসে ছিলাম। রোদ কোমল ছিল, তাই বসে থাকতে পারছিলাম। কোমল থাকলেও সাগরের জলে সৌরঝিলিক ছিল স্পষ্ট, মনে আছে। হঠাৎ খেয়াল হলো চোখ বন্ধ করে থাকি। সমুদ্র আরো কাছে এলে, আমাকে ছুঁই ছুঁই মতো হলে তখন পিছিয়ে যাব। সমুদ্র আমাকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলে যখন, তৃপ্ত আমি চোখ খুললাম। এবার পেছনোর পালা। যখন আমার পেছনে তাকালাম, বুক ধক করে উঠল। পেছনে থৈ থৈ সাগরের জল। এবং যে ধারাল প্রবালপাথরগুলো আমি সাবধানে পার হয়ে এসেছিলাম, সেগুলো তার নিচে ডুবে গেছে। আমি একটু উঁচু জায়গায় বসে যখন জলের আমাকে ছোঁয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, ততক্ষণে এগিয়ে আসা সাগার আমার পেছনের নিচু সৈকত প্রায় কোমর জল অবধি ডুবিয়ে দিয়েছে। কোমর জল সমস্যা নয় ততটা, যতটা হুমকি ডুবো প্রবাল পাথরে। ধারাল প্রবালে পা তো কাটবেই, যদি কোনো পা হড়কে কোনো খাঁজে পড়ে যাই, এই জোয়ারের জোরাল সাগরে আর কাকে পাব উদ্ধারে জানি না। এবং আমি ছিলাম মানুষজন থেকেও বেশি কিছুটা দূরে। বহুকাল আগের কথা। সেই ২০০৭। বুকে বিশ্বাস ছিল, উপায় আমার মিলবেই। মিলেছিল। সাবধানে একটা একটা ডুবোপাথরের ওপর পা রেখে রেখে আমি ক্রমশ তীরে এলাম। ঘোলা জল, পাথরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ, পাথর থেকে পা সরিয়ে নিতে চায় ফিরতি স্রোত। কিন্তু শেষমেষ আর কোনো বিপদ হয়নি।
একফাঁকে পাহাড়ের খানিক চোখ ফেরানো : কক্সবাজার কি কেবল সৈকত? অতি উর্বর কালো মাটির ভিত থেকে পাথরের পাহাড় উঠে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও সৈকত ঘেঁষে খাড়া দেয়ালের মতো। উঁচু, উদ্ধত। শাল, সেগুন, গর্জন ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিচে আশ্রয় নিয়েছে শ্যাওড়া, তেলসুর, সশন বাঁশঝাড়। আর সবার মহিমাময়ী অভিভাবক হয়ে ডালপালা বিস্তার করে রেখেছে আদিম ফাইকাস : বট, অশ্বত্থ। বড় বড় ধারাল ঘাস, কাশ, ভাঁট আর নাম না জানা আরো অজস্র বিরুৎ গুল্মে পূর্ণ সে সব পাহাড়ের এখানে সেখানে পাথুরে, কালো; দেখে মনে ভয় জাগে, মনে হয় ওগুলো যেন পৃথিবীর অংশ নয়। পৃথিবী যে একটা গ্রহ সেই কথা মনে পড়ে যায়। কোথাও কোথাও পাথরের চাঁই পড়ে বেদির মতো পড়ে আছে, শ্যাওলাটে, ঠাণ্ডা, অন্ধকার। লুকিয়ে থাকার ঝরণার জলনুপুর বাজছে, শোনা যায়। পাথর ফেটে বেরিয়ে আছে ঘন কমলা বর্ণের আয়রণ এখানে সেখানে। কোথাও কোথাও কবেকার কোনো ভূমিকম্পে গভীর চিড় ধরেছে পাহাড়ে। সেখানে গোপন কালো গুহার ভেতর কী যেন নড়ে উঠল, কাছে যেতে ভয় হয়।
পাহাড়ের আরো বুনো রূপ চোখে পড়ে টেকনাফে। সেখানে তো এখনো অনেক জায়গায় বন্য হাতি শুঁড় দোলায়, ডাকে, মিলিয়ে যায়।
যদি কখনো মানুষ সরে যায় কক্সবাজার থেকে, তবে অর্ধেক বাস্তব আর অর্দেক আবেগে গড়া এই স্থান তার প্রকৃত রূপ ফিরে পাবে। তবে আবেগী মানুষ যদি না থাকে, কে বলবে বাহ! আর মানুষ বাহ না বললে তো সুন্দর জানবে না কখনো সে সুন্দর। সুন্দরের কাছে গেলেই তাই আমার ম্যাক্সিম গোর্কির কথা মনে পড়ে।
পাটুয়ারটেক সৈকত
ইনানী ছাড়িয়ে আমরা আরেক বিস্ময়কর সৈকতে গেল বছর গিয়েছিলাম, তার নাম পাটুয়ারটেক। আকাশে এখানে চিরশরৎ। সৈকত থেকে পেছনে পাহাড়ে তত মানুষের পা এখনো পড়েনি, যতটা পড়ে আরো উত্তরে, সুগন্ধা, লাবণী, কলাতলী, হিমছড়ির পাহাড়ের ওপরে।
পাটুয়ারটেকে ইনানীর মতোই প্রবাল পাথরের ছড়াছড়ি। বিকেলের দিকে সাগরকে মনে হবে কণকশয্যা। নরম জল ঠেলে আমরা বেশ কিছুদূর এগিয়েছিলাম যখন আমার শাশুড়ি মা, ভাইবোন আর ছানাপোনা নিয়ে গিয়েছিলাম। আপনজনদের নিয়ে ঝুড়িউপুড় হয়ে সৈকতে পড়ে আরেক রকম আনন্দ। ছোটদের উচ্ছ্বাস দূর থেকে দেখতেও আনন্দ হয়। আমার মেজো শ্যালিকা জমজ দুটি মেয়ে রোদেলা আর মেঘলা। সাগরের সঙ্গে সেই প্রথম তাদের দেখা আর সখ্য। ওদের দেড় বছরের পা জোড়া একটা অদ্ভুত সহজাত স্বাভাবিকতায় সাগরের দিকে চলতে শুরু করেছিল। যেন সাগর ছেড়ে আসার স্মৃতি ওদের আরো কাঁচা। আমাদের তুলনায় ওরা যেন সাগরের আরো নিকটবর্তী।
পাটুয়ারটেকে আমি আর পার্লিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে গিয়েছিলাম ঝাউবনে। লাবণী সৈকতে যে ঝাউবন আমার ব্যক্তিগত রূপকথায় মিশে আছে, পাটুয়ারটেকের ঝাউবন সুন্দরে তাকে ছাড়িয়ে যায়। ঝাউবনের পাতা দেখে মনে হয় কেউ যেন স্বপ্ন থেকে এই গাছ নামিয়ে এনেছে। এখানে সেখানে বালুতে পড়ে আছে ঝাউয়ের বীজ। চারপাশে ঝাউবন রেখে মাঝখানে একটা জায়গায় হৃদের মতন। যেন বিভূতির কোনো গল্পে জোছনায় এ কালরাতেও পরী নেমেছিল।
টুকরো শরণার্থী কথা : পাটুয়ারটেক পড়েছে উখিয়ায়। কক্সবাজারে মানবতার দীর্ঘশ্বাস টের পাওয়া যায় উখিয়া থেকে। সেই উখিয়াকে পাটুয়ারটেকে পাওয়া যাবে না। তাকে পেতে যেতে হবে কুতুপালং। আরো দক্ষিণে টেকনাফ; যেতে হবে হ্নিলায়। সেখানে গেলে মনে পড়ে যাবে একসময়ের আমাদের শরণার্থী জীবন। যে জাতি নিজে কখনো কারো শরণ নিয়েছে, সে জানে এর ব্যথা। আর ব্যথিত পারতপক্ষে আরেক ব্যথিতের অশ্রদ্ধা করে না। তারপরও যে জীবন রোহিঙ্গারা সেখানে যাপন করছেন তা মানুষের নয়। সেখানে সমুদ্রমিতা নাফ নদীর ওপারে ধূসর মিয়ানমার। ভূমির অধিকারের অহম আর ক্ষমতার দম্ভে মানুষ স্বয়ং, তার স্বজাতি মানুষকে কতখানি নিচে নামতে বাধ্য করতে পারে, অনুভব করতে হলে আসতে হবে উখিয়া, টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে।
টেকনাফ সৈকত
টেকনাফের সৈকত আমাদের দুজনার কাটানো সবচেয়ে নির্জন সৈকত। জলের রঙ নিরুপদ্রুত, সেই বিখ্যাত ওশন গ্রিন। ঢেউয়ের অবিরত গর্জন। আর হঠাৎ একটা দুটো ডেকে ওঠা গাংচিল। এছাড়া যতদূর চোখ যায় সামনে পেছনে, শুধু আমরা দুজন ছাড়া প্রায় মিনিট দশ আর কোনো মানুষ দেখিনি। এক পর্যায়ে অস্বস্তি হতে থাকে। তখন আবার উত্তর দিকে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে আমরা একটা আলকাতরা মেরে উপুড় করা জেলে নৌকার কাছে পৌঁছেছিলাম। সেখানে রঙ ওঠা লাল ছাউনি খাটিয়ে দুজন মানুষ কথা বলছিল। আরেকটু এগোতেই দেখেছিলাম অসংখ্য হলুদ পতাকা ওড়ানো বিশাল এক মাছধরা সাম্পান টেনে কূলে তুলছেন জেলেরা। এরপর আবার লোকশূন্য। দূরে খাড়া উঠে যাওয়া দুটো ঝাপসা পাহাড়। ২০১৬ সালের টেকনাফ সৈকতের সেই নির্জনতা হয়ত এখন মেরিন ড্রাইভ পূর্ণ হওয়ার পর শান্তিতে পরকাল যাপর করছে। তবে আমি যতদিন বেঁচে থাকব, সেই নির্জন সৈকত কোনোদিন মন থেকে মুছে যাবে না।
ভিনদেশিক : আমাদের সাগরে তো বিদেশি মানুষ তেমন আসতেন না। তবে আজকাল অনেক ভিনদেশি মুখ চোখে পড়ে। আমি কক্সবাজারের রাস্তায় ক্যামেরা বুকে নিয়ে হাঁটতে থাকা এক ভিনদেশি শেতাঙ্গ যুবককে দেখেছিলাম, ঘাড় কাত করে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ডাস্টবিনে মুখ দেওয়া এক ঘোড়ার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। জায়গাটা লংবিচ হোটেলের সামনে। আমি আর পার্ল রিকশায় চড়ে যাচ্ছিলাম। মনে হলো, নেমে একটু ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করি। এই ছেলেটি ছাড়া আরেকটি মেয়েকে দেখেছিলাম, যার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছে হতো। রূপালি সোনালি চুলের একটা মেয়ে শেষ বিকেলের দিকে সাগরে সার্ফিং করতে আসত। হয়ত দিনভর শরণার্থী শিবিরে ক্লান্ত হয়েছে। একা একা সার্ফিং বোর্ডটা নিয়ে সাঁতরে চলে যেত গভীরের সাগরে। তারপর চড়ে বসত। তীরে ফিরে এলে যখন তাকে কাছ থেকে দেখতে পেতাম, দেখতাম, সেই ছেলেটির মতোই, এর চোখেও একজন মমতার্দ্র পর্যবেক্ষক আছে। তবে মানুষের সহজাত সংকোচের কারণে তারা হয়ত কারো সঙ্গে কথা বলছে না, কিন্তু সারাক্ষণ আসলে তারা কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। কেউ না শুনলেও আমরা ঠিক শুনতে পেতাম।
সমুদ্রের ঝড় ও ইতিহাসের টুকরো ছিন্নাংশ
সমুদ্রের ঝড়ের সময়ে গিয়েছি দু’বার। সে কী কালো আকাশ, সে কী ভয় ধরানো ধূসরকালো জল, গর্জন! ঝাউয়ের বন বাতাসে মাতাল। প্রথম দেখেছি ২০১১ সালে। আর সর্বশেষ আমি আর পার্লিয়া দেখেছি মে মাসে মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলাম ঘূর্ণিঝড় মোকার। বিপদ সংকেত মহাবিপদের সীমানায় চলে এসেছিল। আঘাত হানার ঠিক আগের দিন আমরা কক্সবাজার ছাড়ি। তবে সেই আগের দিনের দুপুর আর সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা দীর্ঘকাল ধরে রসিয়ে বলার মতো। নয় নম্বর মহাবিপদ সংকেত সামনে রেখে, মে মাসে সাগর যদি ডিসেম্বরের মতো চুপচাপ এসে পা ভেজাতে থাকে উপকূলে, যে কোনো অভিজ্ঞ মানুষের ভয়ে পিঠ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আমাদেরও মেরুদণ্ড ধরে একটা শিরশিরে সাপ বারবার ওঠানামা করছিল। আমরা হাতে হাত ধরে কখনো সৈকতে, কখনো হোটেলের বারান্দায় সাগরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম।
এ বছর কক্সবাজার ছাড়ার দিন বিকালে গিয়েছিলাম কক্সবাজারের শহরের দিকে। লাবণী সৈকতলগ্ন শহর, বার্মিজ মার্কেট ছাড়িয়ে আরো উত্তরে ঘন এক শহর। পর্যটক আনাগোনার পরিচ্ছন্ন বলয় পেরিয়ে ঘরোয়া অপরিচ্ছন্ন। কোথাও কোথাও তা শোভন সীমা ছাপিয়ে গেছে। সেই শহর পেরিয়ে আর একটু উত্তরে বাঁকখালি নদী। একটা লোহার পুলের ওপর দিয়ে, পায়ের তলায় মাছ ধরার দানবীয় সব কাঠের নৌকা আর নোনাজলের গাছের ঘন গুচ্ছবন রেখে সেই নদী পার হয়ে গিয়েছিলাম আমরা খুরুশকুল, কবি দম্পতি নিলয় রফিক আর আকলিমা আঁখির বাড়ি। বাড়িটা নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সৈন্যদের একটা অস্থায়ী হাসপাতাল ছিল।
সেদিন আমরা যেখানে খাবার টেবিলে টুংটাং শব্দে কোরাল মাছের ঝোল এগিয়ে দিচ্ছিলাম, আশি বছর আগে, সেখানে হয়ত কোনো সেবিকা রাতজাগা চোখে সারি সারি সৈনিকের ক্ষত পরিষ্কার করছেন। কোনো দূর ইংরেজ গাঁয়ে ফেলে আসা মায়ের কাছে ফিরে যেতে চেয়ে কোনো কিশোর সৈনিক হয়ত শেষরাতে শেষবার অশ্রুপাত করল, ওই যে জানালা, তার দিকে তাকিয়ে। সেই একই জানালার বাইরে সেদিন বৃষ্টিভেজা বাতাসে একটা অচেনা কর্ষিকা দুলছিল। আর কী বৃষ্টি!
কক্সবাজার এমন এক স্থান, প্রতিবার ছেড়ে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে বলি, আবার আসছি শিগগির।
আবেগের বশে মানুষ কত কিছুই তো বলে।
যাতায়াত ও থাকা
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার সড়ক ও আকাশপথ দুটোই ভালো। বাসযাত্রা বারো ঘণ্টার, বিমান যাত্রায় পঁতাল্লিশ মিনিটের কিছু বেশকম। অতিশিগগির রেলপথও চালু হতে যাচ্ছে। শীতাতাপ বাসের টিকিট সুলভ্য। বিমানেও ভোগান্তি নেই। সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতলগ্ন এলাকায় আছে অজস্র হোটেল, আর নান্দনিক সব রিসোর্ট। ইনানীর দিকে যেতে পথে আরো কিছু বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্ট চোখে পড়বে। পিক সিজনে যখন প্রায় তিন লক্ষ লোকের সমাগম হয় তখনো যতটা দেখেছি, কাউকে ফেরায় না কক্সবাজার।
কালকাতা থেকে, আগে ঢাকায় এসে কক্সবাজার যাওয়া যেতে পারে। আবার খুলনা বা যশোরের দূরত্ব যেহেতু তুলনামূলক কম, সেখানে এসেও বাসে কক্সবাজার যাওয়া সম্ভব। যশোর থেকে বিমানেও কক্সবাজার যাওয়া যাবে। তবে বিমানটা ঢাকায় মুখ না দেখিয়ে কক্সবাজারমুখো হয় না। তাই বাড়তি ঘণ্টা দুই গুনতে হতে পারে।
























Comments