সামান্য ফুল, সামান্য পাতা— স্মৃতির পূজা

দুর্গাপুর থেকে কেন্দুলি যাওয়ার পথে কীভাবে যেন চোখে পড়ে গিয়েছিল৷ এমনি এমনি হয়তো চোখে পড়েনি৷ হয়তো-বা আমি খুঁজি, চেতন অবচেতন অন্ধকারের ভেতর নিরন্তর খুঁজে চলি৷ হয়তো কোথাও পৌঁছাতে চাই৷ হয়তো বুঝতে চাই৷ কী বুঝতে চাই, কোথায় পৌঁছাতে চাই স্পষ্ট করে জানি না৷ তবুও পরিচিত শ্মশান-গন্ধ পেলে কে যেন ভেতরে ভেতরে এক দুর্নিবার আকর্ষণে টেনে নিয়ে যায়৷ সেই অমোঘ ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারি না৷ বোধয় চাইও না৷ মন্ত্রচালিত নিরুদ্দেশের ভেতর, অসংখ্য ‘নেই’-য়ের ভেতর৷ যাদের আত্মীয় পরিজন সকলেই আছে কিংবা যাদের আর কেউ নেই৷ ধুয়ে মুছে ছাপ হয়ে গেছে, তবু কিছু ধুলো, তবু কিছু হারিয়ে যাওয়া পায়ের ছাপ ধরে এগিয়ে যাই৷ ব্যর্থ হই৷ তবুও এগোই৷ হয়তো কিছুই পাইনা, হয়তো-বা আবার এমন কিছু পাই---যা প্রাপ্তির অতীত---অমূল্য, অভূতপূর্ব, বিস্ময়কর৷
আহামরি রূপ না হলেও মনে আছে জায়গাটার নাম ছিল রূপগঞ্জ৷ চলে যাওয়া রাস্তার পাশে অর্ধনির্মিত একটি মন্দিরে অচেনা দেবী প্রতিমা৷ প্রতিমাটি দেবী কালীর।কিন্তু যে কালী প্রতিমা আমরা চিনি ঠিক তেমন নয়৷ খানিকটা ভিন্নরকম৷ চতুর্ভূজা এবং সমগ্র শরীর চেনা কৃষ্ণ বর্ণের৷ দেবীর গলা এবং মুখমণ্ডল শ্বেত৷ জিহ্বা লাল৷ জিহ্বার পাশ দিয়ে উঠে যাওয়া দুটি মোটা দাগের লাল রেখা৷ দেবীর চার হাতের দুই হাতে খড়্গ এবং ছিন্ন শির হলেও মুখে প্রশান্তির ছাপ৷ চলতি পথে মনে হয়েছিল কোনো স্থানীয় লোক-দেবী হবেন হয়তো৷ কিন্তু মন্দিরের সামনে এসে দেখা গেল তিনি দেবী কালী৷ শ্মশান কালী৷ মন্দিরের একপাশে একটি নাতিবৃহৎ ধুনি৷ ধুনিতে কাঠ৷ তার ভেতরে একপাশে পোঁতা একটি ত্রিশূল৷ ধুনির সামনে একটি পুরু আসন পাতা৷ কিছুদূরে উঁচু লাঠিতে একটি গেরুয়া নিশানা৷ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, নিকটেই হয়তো কোনো শ্মশান থাকলেও থাকতে পারে৷ অনুমান ভুল নয়৷ একটু খুঁজতেই মন্দিরের পিছনের দিকে দেখা গেল ইট দিয়ে সাজানো একটি সাদামাটা আভরণহীন চিতা৷ চিতা ঘিরে পোড়া-কাঠ, ইত্যাদি মানুষ পোড়ানোর চিহ্ণ৷ বলবার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় হয়তো৷ এমন অজস্র শ্মশান রয়েছে ভারতভূমিতে৷ তবুও সামান্যের ভেতর কখনো কখনো থেকে যায় অসামান্যের উদ্ভাস৷ যা নির্দিষ্ট হলেও হয়ে ওঠে শাশ্বত কালের৷
ইটের উপর কে যেন বন থেকে তুলে এনে রেখে গেছে সামান্য কয়েকটি অপরাজিতা আর জবাফুল, সঙ্গে একগুচ্ছ বেলপাতা৷ সদ্য তোলা৷
---এই নির্জন শ্মশানের চিতার উপরে সেগুলি কে রেখে গেছে?
---কেনই-বা রেখে গেছে?
---যে রেখেছে তার কোনো প্রিয়জনকে হয়তো দাহ করা হয়েছে এই শ্মশানে৷ জঙ্গলে ঘেরা চারপাশের আলো-আঁধারের ভেতর হারিয়ে গেছে৷ তাকে মনে করে, বন থেকে তুলে এনেছে ফুল-পাতা৷ সেগুলো খুব যত্ন করে রেখেছে চিতার পদপ্রান্তে৷ খুব সামান্য আয়োজন কিন্তু এই আয়োজনের ভেতর নীরব প্রণাম রয়েছে, গোপন শ্রদ্ধা রয়েছে, রয়েছে প্রগাঢ় ভালোবাসা--- তা নির্জনে রেখে গেছে কেউ৷ মৃত প্রিয়জনকে মনে মনে ব্যাথার ভেতর স্মরণ করেছে৷ তার ভিতরে কোনো প্রদর্শন নেই, চাকচিক্য নেই৷ কেন নেই? যে বুনো ফুল তুলে এনেছিল বন খুঁজে, সে কি দরিদ্র? সে কী কৃপণ? নিয়ে আসতে পারত সুদৃশ্য সাজানো ফুলের বোকে নিদেনপক্ষে দামী কোনো ফুল৷ তার বিনিময়ে এই সামান্য আয়োজন? না কি সহজ সরল এই উষ্ণতা ছুঁয়ে থাকাই তার সম্পদ৷
---কে মারা গেছে তার?
---বাবা? মা? স্ত্রী?
সেদিন কি ছিল তার মৃত্যুবার্ষিকি? নাকি অরণ্য-সন্তানের অরণ্যের মধ্যে বিদায়ের কথা স্মরণ রেখে এমনি এমনি নিবেদন করে গেল ধুলোমাটি-ফুল-পাতার শ্রদ্ধার্ঘ্য৷
আসলে দেখা যায়, বহুমুল্য উপহারে থাকা ভক্তি অনেকাংশে যান্ত্রিক, স্থূল স্ট্যাটাস নির্ভর৷ সেই উপহার সহজে চোখ টানে৷ সেই উপহার জটিল৷ তার পিছনে থাকে বহু সূক্ষ্ম জ্যামিতিক অঙ্ক৷ দেওয়া-নেওয়ার ভেতর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা থাকে৷ আলো কেড়ে নেওয়ার অভীপ্সা থাকে৷ তা সহজ, পয়সা খরচ করলে অনায়াসে মেলে সুদৃশ্য প্যাকেটে৷ কিন্তু সেগুলি কেবল উপহার৷ তার ভেতর দাতার কোনো স্পর্শ থাকে না, আবেগ থাকে না, অনুভূতি থাকে না, তৈরি হওয়া মুহূর্ত থাকে না৷ থাকে শুধু পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ৷ পক্ষান্তরে যখন দেখি সামান্য আয়োজনে মানুষ মুগ্দ হয়, আনন্দ পায়, গায়ে মেখে নেয় আদর করে৷ যে সরল আনন্দে জীবন কাটিয়েছে সেই যাপিত সরলতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে জীবনের যাবতীয় কৃত্রিমতা৷
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আসলে মনের গভীর থেকে উঠে আসা স্বতঃস্ফূর্ত এক বিমূর্ত অবস্থান৷ সেখানে বলপ্রয়োগ, কৃত্রিম অনুরাগের কোনো স্থান নেই৷ প্রান্তিক নিম্মবৃত্ত মানুষের জীবনে পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার ভাগ বেশি৷ কিন্তু এই সরলতা, এই সহজতা, এই আনন্দ-ই তাদের সম্পদ৷ ‘আন্তরিক’ শব্দটিও এখানে কৃত্রিম নাগরিক রুচি থেকে উঠে আসা নীরস শব্দ৷ আসলে তারা এইভাবে ভাবতে শেখে, এইভাবে বিশ্বাস গড়ে তোলে৷
ঝাড়গ্রামের এক পাহাড়ি গ্রামে সেই রকম এক বিশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করেছিলাম৷ পাহাড়ের উপর সাদামাটা একটি মন্দির৷ বাঁধানো কোনো ঘর বা ছাউনি নয় একটি সামান্য সমতল চাতাল৷ শিলাখণ্ডে রঙে আঁকা দেবতা, শিব ও দুর্গার একটি করে ফটো প্রতিকৃতি৷ ঘট, ধুনুচি, একটি প্রণামী থালা, কয়েকটি প্লাস্টিকের ফুলের মালা৷ আর ধূপ মোমবাতি জ্বেলে দেওয়ার থান৷ নিচের গ্রাম থেকে কখনো কেউ উঠে এসে দেবতার মানত করে, পুজো করেন৷ সেই পুজোর মন্ত্র বড়ো বিচিত্র৷ শুদ্ধ সংসৃকত উচ্চারণ নয়৷ আসলে পাহাড়ের জনজীবন যে অনাড়ম্বড় ভাবে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায় সেখানে নিয়ম, সুসংহত, সুসংসৃকত ভাব গড়ে ওঠা সহজ হয় না সবসময়৷ তাই তারা নিজেদের মতো নিজেদের বিশ্বাস আর ভক্তি নিয়ে শিলাখণ্ডের কাছে গিয়ে দেবতার অর্চনা করেন৷ নিজের জীবন থেকে উঠে আসা মন্ত্রে আরাধনা করেন৷ প্রণামের মুদ্রায় নিজেদের ভাষার টানে উচ্চারণ করেন---
‘দেবতা, আমরা আইলাম, শান্তিমনে আইলাম৷ তোমার নে আমরা আছি৷ ইহার পর নমঃ করে যাচ্ছি আমরা বাড়িতে৷ জয় হলো মোসাদেবের (মহাদেব) জয় হলো শিব-দুর্গার, এসেছি দেবতাগণ, ভালোমন্দ দেখতে আইলাম, তুমিও ভালো থেকো, আমিও ভালো থাকি৷ আমার ছেলে যেন পড়ে (মরে) নাই, বউ পড়ে নাই৷ তোমার নে আমরা বাঁচি, ফলে আমরা আছি৷ তোমার জানাচ্ছি, বাড়িতে যাচ্ছি৷ জয় করছি আমরা, জয়৷’
এই মন্ত্র কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দেবতার মন্ত্র হতে পারে? এই মন্ত্র শাস্ত্রসিদ্ধ? অথচ এই মন্ত্র উচ্চারণ করে বছরের পর বছর স্থানীয়রা দেবতাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন৷ অর্ঘ্য দান করছেন৷ এই অর্ঘ্য ও সরলতার কাছে সুসংসৃকত মন্ত্র স্থবির হয়ে পড়ে৷ পুজো, অর্চনা, শ্রদ্ধা, ভক্তি যাই হোক না কেন তার সঙ্গে থাকে সরাসরি অন্তরের যোগ৷ অন্তরের যোগ না থাকলে কোনো উপহার, শ্রদ্ধা অর্থহীন৷ বহুমূল্য দ্রব্যের থেকে বহুগুণ উচ্চমার্গে উঠে যায় তখন একটি বুনোফুল, পাতা কিংবা শিশির মাখা ঘাস৷ তখন আলাদা করে আর আন্তরিক শব্দটি উচ্চারণ করতে হয় না৷ আলাদা করে ভাবতে হয় না৷ সামান্যের ভেতর আপনা-আপনি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে স্মৃতি, ব্যথা, স্মরণ৷ মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তো স্মরণই, মনে রাখাই৷
সুন্দরবনেও দেখেছি বাড়িতে মৃতদেহ দাহ করে অধিকাংশ মানুষ একটি মাটির থান নির্মাণ করে রাখতে৷ সেখানে রোজ দুপুরে ফুল আর সন্ধের প্রদীপ জ্বেলে দেয় স্ত্রী সন্তান বা প্রিয়জন৷ প্রতিদিন না-থাকা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে নিজেদের মুহূর্ত৷ তিনি যে নেই এই শূন্যস্থানে ভরিয়ে তুলছেন--- ‘তিনি আছেন, মনের ভেতরে আছেন’---এই সহজ ভাবনায়৷
আলোর বাইরে এলে বোঝা যায় জীবন কত মহৎ, বৃহৎ ও শাশ্বত৷ সেখানে জোর করে মুখে হাসি ফোটানোর যায় না৷ বিনির্মিত নাগরিক হাসির ভেতর যে ছল থাকে সেই ছদ্মনকশা ঝরে পড়ে নিমেসে৷ তখন বাহুল্য থাকে না, প্রদর্শন থাকে না৷ থাকে শুধু যে নিচ্ছে আর যে দিচ্ছে তাদের মনের যোগ, মনের আনন্দ৷ পরস্পরের স্পর্শ পাওয়ার জন্য ব্যকুলতা৷ চিতাপ্রান্তে ওই ফুল ওই পাতা সেই স্পর্শের মাধ্যম৷ যে নেই আর যে আছে--- এই দুজনের মিলনের মাধ্যম৷ যারা সামান্যের মধ্যে দিয়ে ছুঁয়ে দেখবে পরস্পর পরস্পরের৷ ঘ্রাণ বিনিময় করবে, অনুযোগ বিনিময় করবে, রাগ অভিমান সব বিনিময় করবে৷ অন্ধকার নেমে এলে সেই ফুলে, পাতায় জ্বলে উঠবে অজস্র জোনাকি৷ সেই জোনাকিরা, চিতা, মন্দির, বন সমস্তই আস্তে আস্তে সাজিয়ে তুলবে তাদের অপূর্ব স্নিগ্দ আলোয়৷ সামান্য সেই আলো--- অথচ তার অসামান্য উদ্ভাস















Comments