শী-রিসর্ট

ফণী দৌড়চ্ছে।ট্রেন শামুকাচ্ছে।৩০শে এপ্রিল ২০১৯।চাকার আলিস্যি নয়।ভয় পেয়েছে বোধহয় সতর্ক ড্রাইভার।ধীরে ধীরে করবট বদলাচ্ছে,থুড়ি, পাশ ফিরছে চাকা–মাদ্রাজ টারমিনাসের দিকে। ধ্যুস!এ তো থমকাচ্ছে। বিশ্রাম নেবে লব্জদুয়েক। চিনতে পারছ না? এখানেই তো পেতেছিলে সেই ৩০ ইণ্টু ২৪-এর খেলনাবাটি সংসার!সাক্ষী সাতমাসের কন্যা। ওই তো পেন্নার।নদী—নাব্বে না?ইস!প্ল্যাটফর্মেও নামবে না, এমনকি ট্রেনের দরজাতে গিয়েও দাঁড়াবে না?ছ্যা!নেল্লুরে বৃষ্টি।ইস্টিশনে ঢুকতেই পাঠিয়ে দিল গুচ্ছফুলের তোড়া।সম্বর্ধনার bouquet=গুঁড়িগুঁড়ি ইলশেগুঁড়ির তোহ্ফা। ক্যামন ইনভাইটিং। স্তবকে স্তবকে ভিজিয়ে দিচ্ছে ‘ফিক্সড’ কাচ। ওহো!এক্ষণে অবসৃত প্রচন্ড সমীরণ,কড়কড় বাজ!এখন তো কেবল অনুভবে মাস-জুলাই। ভিজে ওঠা ছিটেফুট চোত,চুয়াত্তরি বোশেখ ।
বদলে,তার বদলে কতোকিছুই তো মনে পড়ছে।সেঁটে থাকা ২৪ ইঞ্চি কাচের ওপারে বারাতি।শাঁখে পড়ত ফুঁ,মহিলাদের উলু,আর কমবয়সীদের গোলাপজলের মৃদু-স্প্রে।আকাশ আজ যেভাবে মেঘ-মল্লার ধরেছে,তাতে মনে পড়ার কি শেষ আছে?ফিল্টারড স্মৃতিটুকুই তো থেকে যায়।এমনিতে মনে হয় ওদের আদমসুমারির হ্যাপা নেই । কারণ ঘরদুয়োর নেই। মন চাইলে রাখে।নইলে বেবাগি!থাকে কোন ভদ্রাসনে,কোন সাকিনে–কেউ তা জানে না?
এমন বৃষ্টিটিষ্টি পেলে স্বয়ম্ভু হয়ে ওঠে স্মৃতি,কেবলই ভুসভুসায়।ঠিক যেন কেউ কড়া নাড়ছে। দৌড়ে গেলাম।কেউ নেই।এমন বৃষ্টিতে সব মানুষই তো রবীন্দ্রগান ঃ “তোরা যাসনে ঘরের বাইরে’!ভিজিবে নিচোল...তবু অনুসন্ধিৎসা কি ‘টু-স্টেপ’ পিছোবে?! কে এলো?কে এলো?কেউ নেই।খোলা দরজা পেয়ে ধাক্কিয়ে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল লগভগ দুশো কি.মি বেগে ঘরের দখল নেওয়া ঝড়। রাত ১২-৩০।পাশের বাড়ি থেকে কাদের বক্সের মায়ের চিৎকার ঃ পাঁচিল ধসে পড়ার আওয়াজ । রাতভোর কাঁপুনি। আলো ফুটল পুবমুখো রান্নাঘরে। ছাঁকনি-পেয়েলা-পিরিচ টুংটাং ।কাল সন্ধেবেলা থেকেই আকাশ ছেয়ে থেকে ক্যামন এক আঁধার ব্র্যাণ্ডের আলো।ছাদে উঠছে মকানমালিক রহিমভাই প্রশ্ন ছুঁড়লঃ কেয়া! দেখনা নেহী ? এয়সা নজারা ফির কাঁহা মিলেগা? অগত্যা! রঙ্গিন না হোক, বিবর্ণই সই!
কাঁকন-স্বরে অশরীরী কেউ বলে উঠল –নামবে না ?
উঁহু, মাদ্রাজ পর্যন্ত আমাদের টিকিট কাটা !
-ইস! এত্তো প্রোগ্রামড্ সন্তমন্তু কবে থেকে হলে গো?
ঠোনা খেয়েই চাঙ্গা। সিধে দরগামিট্টার বাসগুমটি ।রাত নটা বিশের লাক্সারিতে চেপে কত্তোবার যে গেছি। আজো তাই। সাইক্লোন-ভ্রমণ বদলে গেল চটজলদি আনপ্রোগ্রাম্ড্ ফ্যুড-ট্যুরে। সাইক্লোন-টোন, অনর্গল ধুরুম-ধারাম চেখে দেখার মজা ছিল সুঠাম তেত্রিশে।কিন্তু মেঘজ্যাজ বাজে নাকি আর উনসত্তুরে অ-ঘ্রাণে?ভোর হলো লাক্সারি বাসে, উলসুরের পাশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ডেরা নেব গান্ধীনগর,ব্যাঙ্গালোরে।ছুঁয়ে ছেনে দেখা হল না আদিগন্ত বীভৎসতার সংক্ষুব্ধ সৌন্দর্যকে।ফণী রইল পড়ে সাগর-কিনারে ।
তারচে বরং দখিনি খাবারের সোয়াদ; উল্লাল বীচ-য়ের উল্লাস।ডিপফ্রায়েড বেঙ্গলি ঝোল-মশল্লময়ের পরিবর্তে পিওর (অ)বাং-গালি স্মোকড বাংড়ার ননফ্রায়েড মৎস কারি-সুবাস।সঙ্গে মোটা লালচালের টেস্টি-টেস্টি ভাত।শেট্টীদের হোটেল।কোস্টাল কুইজিনের,আই মীন সামুদ্রিক মাছের সেরা ঠিকানা। জমজমাট আবহ, দারুচিনি-লং-গোলমরিচের মিলিজুলি দারুণ প্রিপ্যারেশন।হাজারো হোটেল । বাসশট্যান্ড কাম শহরের মাঝখানেই ছিলাম।।ম্যাঙ্গালোরে দু-রাত, শী-আয়নায় ১৭৭ সেন্টিমিটার খুবসুরত সৈকত ; সুরাটকল বীচ।আবার।পুজো দিলাম উল্লালের সোমেশ্বর শিবমন্দিরে। গোস্তাকি মাফ!ম্যাঙ্গালোর ২০১৯ থেকে ফে-বু’র ১৯৫৫-য় এখুনি ফিরে যেতেই হবে। আর্যনীল একটা ছবি পোস্টালো।ছবিময় লোরেনের তম্বুরা পাছা। তিনি কার্ল্টন হোটেলের বারান্দায়।ছবিতে মিসিং উথলে ওঠা তার দেদার দুধস্টোর। যে দৃশ্য আজও যে কোনো বাহাত্তুরেকে নীল্লোহিত বানাতে পারে। ভিতর থেকে আওয়াজ এল ঃ আব্বে! লোকে ভ্যানতাড়া বুঝবে না।সংখ্যায় বল!সপাটে জবাব দিলামঃ ওকে বস! সাতাশ। শোনামাত্র বাপী স্টেডিয়াম-কা বাহার !ব্যস্!
ফের বেলাইন হচ্ছ। হ্যাঁ তেমনই তো এইযাত্রার আগাগোড়া।সমুদ্র উপকূল ফেলে নয়নাভিরাম পাহাড়ি চিত্রকথায় চেপে বসা।আরে, ব্যাঙ্গালোর–ম্যাঙ্গালোর রেলপথের নয়নভুলানো চোখজুড়ানো দৃশ্যপথ তো এই রুটেই।যাবে না? কীভাবে তাহলে উল্লালের উল্লাস? কীভাবে তাহলে শিরিবাগালু স্টেশনের অরণ্য-চিত্র-চারিমা।ট্রেন দাঁড়ায় অনেকক্ষণ।হাতে এন্ড্রয়েড ছিল না। ভিডিওর বদলে খুব ছবি তুলেছিলাম। একান্ন-বাহান্ন-সাতান্ন টানেল পেরিয়ে Yedakumari-র মিঠি মিঠি স্টেশনে পৌঁছনো ।কী সুন্দর নাম !তিষ্ট ক্ষণকাল! টানেলের ভিতরে রেলপথের একশোবিশ-বাইশ কার্ভ। স্লিক চলন।অপরূপ বিভা। টানেলের বাইরে এলো যখন আগামুড়ো সবটাই নজরে বিদ্ধ।বাঁক—তা ১৪০-১৪২ ডিগ্রি হবে নিশ্চিত।ব্রিটিশের তৈরি ব্রিজ, নীচে বহতা ধারা,ভেঙ্গে না পড়া অটল ইতিহাস।অন্ধকারে ঢুকছে, আলোয় বেরিয়ে পড়ছে। চাকার ঘর্ঘর। বিনয় মনে পড়েঃ ‘সেই কোন ভোরবেলা ইটের মতোন চূর্ণ হয়ে পড়ে আছি নানা স্থানে’ জঙ্গলময় ছড়িয়ে পড়ছে সেই কব্বে শোনা চাকার আদিমতা “।প্রশ্ন তুলিতে কি পারি—‘য়েডাকুমারি’-নামের অর্থ কি বাম(পার্শস্থ)কুমারী? নাকি যদা যদা হি স্টাইলে স্বকপোলকল্পিত“ যৌবনযখনকুমারী’।সুনীলদার কবিতায় ‘হারাংগাযাও’-য়ের খোঁজ পেয়েছিলাম ।শিলং থাকাকালীন হাফলং গিয়ে রাতজাগা চোখে পাখিসমুদ্রে সত্যিই হারিয়ে গিয়ছিলাম।এই নামটাও একটু রদবদল করে নিলে হয় না?সাহস জোটাই ’য়েডাকুমারী’র ওর্ফে‘“যৌবনযখনকুমারী’’কাম‘যদি-কুমারী’ ভাবা যেতে পারে?
জেসিবি ব্যস্ত একপাশে, পাহাড় গুঁড়োনো হচ্ছে , আগামীতে সেজে উঠবে নাকি Yedakumari। আপাতত,তাকে ঘিরে হিসহিস সভ্যতা,চোখের জন্য—মনের জন্য—অনুভবের অনুভূতিকে কেবল সুদটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভোর হই রোমাঞ্চ বইয়ের রহস্য-পৃষ্ঠায়।থার্ডলাইনের ধারেই পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বলিষ্ঠ সবুজ অরণ্যাণী এবং সুরধুনী,’ও ঝরঝর ঝরণা’। না,না!স্বপ্ন দেখছি না ।
এপথের সৌন্দর্য আ-পার্থিব, কাব্যিক, ১৮০ ডিগ্রি মহাজাগতিক।রেল কোম্পানি এখন ভ্রমণার্থীদের সুবিধার জন্য ‘ভিশটাদোম’ চালু করেছে ঃ সিটে বসেই যাতে ‘নজারা’ দেখা যায়। আমরা গেছিলাম মান্ধাতার ট্রেনেঃ ছেলেমানুষের মতো চেনা-অচেনা নেই,এ-জানালায় উঁকি/ও-জানালায় ঝুঁকি। এইসবকিছু পেরিয়ে কখন যে ঢুকে পড়েছিলাম দ্রাবিড় ম্যাঙ্গালোরে।অনার্য-প্রদেশে।আর্য ঢুকে পড়ে যেভাবে দুম করে ইতালীয় রম্যকথায়। চওড়া চওড়া পাথর বিছানো সমুদ্র-উপকূল।যেখানে তেমনটা নেই সেখানেই এক-একটি she resort. অ্যাই,গুলোবে না মোট্টে।sea-resort। কেলেকুলে পাথর সর্বত্র।ওখা হোক বা উল্লার।যেখানে নেই সেখানেই সমুদ্র-বিলাস। জুহু অথবা গণপতিপুলে কিংবা কারোয়ার । কেলেকুলো পাথরগুলো কোথায় সেখানে? সৈকত গার্ড দিচ্ছে পাহাড়।পশ্চিমঘাট সমুদ্রতীর অব্ধি এগিয়ে এসেছে ।পূর্বঘাট যেন কেমন দূরে দূরে।পাহাড় এসেছে কাছে কেবল ইয়ারাদা- সৈকতে। গোয়া বলে ভ্রম হয় ।কারোয়ারে তো আরো খাসা।এক জোড়া কপোত-কপোতী যেন বা টেগোর বীচে। দুটি সুঠাম পাহাড়ই ঢুকে পড়েছে সমুদ্রগহ্বরে।কালোপাথরের উদোম বুক—রৌদ্রবর্শায়, কেমন মসৃণ, বালুতৃণে মোড়া পাছা।ভেজাভেজা আশপাশ জাল পেতেছে কিছু লোক। ধরেওছে দু’দশ জিওল।না! পুবদিকের সমুদ্রগুলো এমন পাথুরে নয়। পাত্থর কে সনম তাই পশ্চিমের; মনোজ-মুমতাজ, পুবে আনন্দ-ভৈরবী(কাঞ্চনা-গিরিশ কার্নাড ) । পাথর নেই পুবে–ইয়ারাদা ছাড়া । উপ্স ! কিছু বেলাইন হতে পারো বাছা > ফিরে যাও উল্লাল-উল্লাসে।
উল্লাল ঃ ম্যাঙ্গালোর শহর থেকে দশ কিলোমিটারের মতো দূরে।বাস আছে।পৌঁছে দেবে।ফটাফটপ্রেমীদের লাগিয়া সেখান অটো-সুবিধা।রিজার্ভ করে যাওয়াটাই ভালো সোজা।রাস্তা সিধেসাধা ।নাকবরাবর। ঝকঝকে নীল আকাশ।মে-পাথর তেতেছে কিছুটা। খালি পা থেকই না কক্ষনো।সূর্যাস্ত নয়নাভিরাম।পাশেই সোমেশ্বর মন্দির।
এই যা বলতে ভুলে গেছি সকাল আটটায় ব্যাঙ্গালোরে চেপে বসা এই ট্রেনটা যাবে কারোয়ার পর্যন্ত ।আমরা ম্যাঙ্গালোর নেবে পড়েছিলাম।গোয়া(পাঞ্জিম) থেকে একদিনের ট্রিপে ঘুরে কারোয়ার ঘুরে গিয়েছিলাম। ব্যাঙ্গালোর থেকে অনেক দূর। ১০/১২ ঘন্টা লাগে ,ট্রেনে তো বটেই ,মোটরকারেও।
কারোয়ার = টেগোর বীচ। ১৮৮২ –তে রবীন্দ্রনাথ এখানে এসেছিলেন।এখানে এসেই প্রকৃতির অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন। । জন্ম নিয়েছিল ‘প্রকৃতির পরিশোধ’। জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন প্রকৃতির ঔদার্য্য । উমা দাশগুপ্ত সম্পাদিত My Life in My Words’-য়ে খুঁজে পাই অমর্ত্য কয়টি মণিমুকুতার দ্যুতিঃ যা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করে কী অনন্ত অমোঘতায় অগাধ জলরাশিও ভোলে না কণামাত্র তার প্রথম বিন্দুটিকে। কবি লেখেন “This Nature’s Revenge may be looked upon as an introduction to the whole of my future literary work,” the Nobel Laureate poet said later, “or rather this has been the subject on which my writings have dwelt –the joy of attaining the Infinite with the finite.” (‘My Life in My Words’ by Rabindranath Tagore, selected and edited by Uma Das Gupta).
আর একটিও শব্দবিকৃতি নয়। চলুন, আঁজলায় তুলে নিই,নত হই বিনম্র শ্রদ্ধায়,প্রণাম জানাই প্রকৃতির প্রকৃত পুত্রকে।


















Comments