মাই ডিয়ার জলবন, এসো ঢেউ শিখি

I prove a water and the moon expands
Joined by zeros
Paired to none
Stop, stop not,
repeat the water…..
মনে মন উঠলেই চোখের দিলরুবায় রসগোল্লা ! অফুরন্ত প্রকৃতির কৃতিলাবণ্যের স্মৃতিচারণ মানেই চার অক্ষর ঘোর ও তার বেনিয়াসহকলা। আর সেই স্মৃতি যখন সমুদ্র ভ্রমণ নিয়ে তখন তো স্বাভাবিক ভাবেই মন হতে হতে মনান্তরে ফুর। আমার কাছে সমুদ্র মানেই অপার বিস্ময় ! আমরা জীবনের শুরু থেকেই জল সম্পর্কিত, জলের সাথে সংযুক্ত । কোথাও যেন সাঁওতাল রঙের মায়া ঢেউ ও ঢেউয়ের চাঁদতুতো । যখনই মন কেমন করে জলের কথা ভাবি । আর তাই জলের টানেই বারবার ছুটে যেতে হয় সমুদ্রে যার কোন গন্থব্য নেই , আছে কেবল রহস্যময় আত্মমোহনের ছাপ। ফর্সা জলের গা থেকে মুছে ফেলা ঢেউকালীন সোনালি কিংবা রুপোলী তন্দ্রা সরিয়ে মনের সর্বত্র মন ভরে দিলে আমি ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া আয়নার দিকে দুরকম তাকাই। তাকিয়ে থাকি যতক্ষণ কোন চেতনার জমজ একসাথে রিলিজ করে পার ও পারানি। যেখানে ঢেউ মানেই জীবনের জোয়ার ও ভাঁটার কথাকলি । ঢেউ মানেই মৃদু বাতাসের চাঁদোচিত আলিঙ্গন।
দক্ষিণ ভারতের সমুদ্র সৈকতগুলি তাদের সর্বোত্তম সৌন্দর্য, অভূতপূর্ব বালির প্রসারিত রূপ এবং চকচকে, সুরম্য জলের জন্য পরিচিত। তাদের সৌন্দর্যে নিজেকে সিক্ত করতে আমি বারবার ছুটে গেছি, যেতে হয় । মা প্রকৃতি সত্যিই দক্ষিণ ভারতের সমুদ্র সৈকতে সীমাহীন আনন্দের বর্ষণ করেছে। ঢেউ খেলানো ঢেউ , সৈকতের সৌন্দর্য এবং মন্ত্রমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আত্মাকে সিক্ত করে নেয় অবলীলায়। দক্ষিণ ভারতে থাকার সুবাদে আমি সৈকতের সেই রাগিণী খুব কাছ থেকেই শুনতে পাই । বিভিন্ন সময়ে ঘুরে বেড়িয়েছি সেইসব উপকূলীয় স্বর্গ ও তার শান্তস্নিগ্ধ ল্যান্ডস্কেপে।
জীবন রং বদলায়, আর তাই জলও । খুব কাছে থেকে জলের এই অপরূপ রঙামো প্রত্যক্ষ করতে হলে চলে যেতে হয় কন্যাকুমারীর সমুদ্রসৈকতে । এই সমুদ্র সেই মোলায়েম গতিশীল কবিতা যার মহিমাময় ছন্দ ও তালের গ্যাপে কোথাও যেন হারিয়ে গেছিলাম আজ থেকে ১৩ বছর আগে। মিলনের সুর সবসময় বিচিত্রতর ।এক শ্বাসরুদ্ধকর মিলনের বেমিসাল আশ্চর্য হল এই বিচের তিনটি জলাশয়ের ত্রিবেণী সঙ্গম: বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগর। কথায় বলে তিন সমুদ্র মিশে না । কিন্তু সহজেই এই তিনটি সাগরের ফিরোজা নীল, গভীর নীল এবং সমুদ্রের সবুজ জলের মধ্যে নিখুঁত পার্থক্য ধরা পরে রঙিন চোখের সৌরভে যা মিলেমিশে স্বপ্নগামি প্রবাহ, যদিও রঙগুলি ঋতু এবং দিনের আবহাওয়ার সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে। জীবনের যেসব স্পন্দন আমাদের ভেতরিনকে সংজ্ঞার বাইরে কয়েকশো আকাশ এগিয়ে দেয় তার উজ্জ্বল আবিষ্কার এই বিচ । কন্যাকুমারীর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ভ্রমণপিপাসুদের ভ্রমণতৃষ্ণার অ্যাডভেঞ্চারিক ক্যানভাস যা না দেখলে জীবনের অনেক কিছুই মিস হয়ে যায় ! সেখানে প্রতিটি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত আত্মার নিজস্ব ঘরানার সিম্ফনি ছাড়িয়ে ছাপ রেখে যাওয়া আইকনিক একেকটি মাস্টারপিস । প্রতিদিন নতুন ও তীব্র অনুরণন ! প্রেম, মন ও আত্মা যে বুননে বোনা সেই একই
বুননে বোনা সমুদ্র, ঢেউ ও তার বিস্ময়-- আরেকটু এগিয়ে গেলে এই সেই বিচ যেখানে রয়েছে বিশ্বকে তাঁর নিজস্ব দীপ্তিতে পরিতৃপ্ত করা বিবেকানন্দ রক । যার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে নিজের সামনে খোলা অনুভূত হয় ! এটি কন্যাকুমারীর বাবাতুরাই-এর কাছে মূল ভূখণ্ড থেকে ৫০০ মিটার দূরে সমুদ্রের উপর অবস্থান করছে। বিবেকানন্দ রক ভারতের প্রধান স্থলভাগের দক্ষিণতম বিন্দু। ১৮৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বামী বিবেকানন্দ এখানে এসে এই শিলাখণ্ডের উপর বসে দীর্ঘক্ষণ ধ্যান করেছিলেন। এখানে বসে তিনি ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করেন। তারই স্মৃতিতে ১৯৭০ সালে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল কমিটি এখানে একটি স্মারকস্থল নির্মাণ করেন। নৌকো করে লাইনে দাঁড়িয়ে এই রকে যেতে হয় ।
প্রাচীন তামিল প্রবাদ অনুসারে, এই শিলাতে দেবী কুমারী বসে তপস্যা করেছিলেন। তাই এই শিলার আগেকার নাম ছিল শ্রীপদ পারাই (দেবী কুমারীর পদস্পর্শধন্য শিলা)। বর্তমানে শিলার উপর একটি ধ্যানমণ্ডপ নির্মিত হয়েছে। এখানে বসে পর্যটকরা ধ্যান করেন। ধ্যান না করলেও এক অপরিসীম সিম্ফনি অনুভব করি ভিতরে ভিতরে। সেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার সেই মুহূর্ত আজও শিহরিত করে । যদিও সেদিন মেঘলা থাকায় সূর্যোদয়ের পুরোপুরি মহিমা অধরা থেকে যায় । পাশেই অন্য একটি শিলায় ১৩৩ ফুট উঁচু বিখ্যাত তামিল কবি তিরুভাল্লুভারের মূর্তি। ধ্যানমণ্ডপের স্থাপত্যে ভারতের নানা অঞ্চলের স্থাপত্যরীতির মিশ্রণ দেখা যায়। বিবেকানন্দ মণ্ডপম ও শ্রীপদ মণ্ডপম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিবেকানন্দ মণ্ডপমে স্বামীজির বিশাল মূর্তি ছাড়াও রয়েছে ধ্যানগৃহ, মেডিটেশন হল, বুক স্টোর। অনেকটাই বেলুড় মঠের মন্দিরের আদলে তৈরি। শ্রীপদ মণ্ডপমে আছে কন্যাকুমারী দেবীর পদচিহ্ন। সব মিলিয়ে এই সমুদ্রসৈকত ভ্রমণ যেন উজ্জ্বল মানসভ্রমণ! আবারো যাবার ইচ্ছে নিয়ে ফিরে আসতে হয় সেবারের মতো । সব স্মৃতি লিখে ফেলা যায় না ……
সৈকতের ধরন: পাবলিক সৈকত
করণীয়: বোটিং, সৈকতের খুপরি এবং স্টলে কেনাকাটা করা, বাতিঘরে আরোহণ করা
খাওয়ার বিকল্প: রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের সৈকতের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাওয়া যায়। বাঙালি বেশ কিছু
হোটেলও রয়েছে সেখানে।
অবস্থান: সৈকতটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা ব্যক্তিগত গাড়ির মাধ্যমে সড়কপথে পৌঁছানো যায়। চেন্নাই
থেকে সরাসরি ট্রেন যায় কন্যাকুমারী। এ ছাড়া বিমানে বা ট্রেনে তিরুঅনন্তপুরম পৌঁছে গাড়িতে বা বাসে
যাওয়া যায়।
প্রতিটি ভ্রমণের সঙ্গেই আত্মার এক তৃতীয়াংশ ছুটে যায় আত্মার সান্নিধ্যে। তাই কি? সমুদ্রের সান্নিধ্যে আমার তো তাই মনে হয়। আমার ‘আমি’ কে আলাদা করে কাছে পেতে চাইলে আমি সমুদ্র খুলে বসি। একটা একটা করে ঢেউ এর পৃষ্ঠা উল্টালে রকমারি নৌকোর ফেরি আমাকে গালিব করে ! এক টোকা জলে তো এক টোকা নীলে । নীলে - নীলে রাঙা হতে কার না ভালো লাগে ! আর ভালো লাগে বলেই মন হাতে নিয়েই টুক করে চলে যাই পন্ডিচেরি । সেখানকার সমুদ্র সৈকত নিজেকে এলোমেলো করে দেবার অত্যাশ্চর্য মনমোহনা ।
প্রথমেই বলবো প্যারাডাইস বিচের কথা যা কিনা পন্ডিচেরির একটি শীর্ষ পর্যটক আকর্ষণ। এটি একটি নির্মল, সমুদ্র সৈকত যা সমুদ্র প্রেমীদের মোহনীয় প্রশান্তি প্রদান করে বলে আমার বিশ্বাস। সাদা বালির বিচ হিসেবে এ এক লোভনীয় ডেসটিনেশন । যতবার গেছি মুগ্ধ হয়েই ফিরেছি । প্রতিটি সাঁতারে লিখা ছিল মাদক পাখির নাম। নীর উড়িয়ে নীড় । কার নাচে কে যে নাচে ! নৌকো ধরে জলের তালে তালে জল পেরিয়ে জলের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ অব্ধি নিজেকেই খুঁজি । প্রতিটি ভ্রমণই যে খোঁজ ।প্যারাডাইস সৈকত, কখনও কখনও প্লেজ প্যারাডিসো নামে পরিচিত, পন্ডিচেরি শহরের কাছে চুনাম্বারের কাছে অবস্থিত। এই বিচের রোমাঞ্চকর আকর্ষণের মধ্যে একটি হল ব্যাকওয়াটারের উপর দিয়ে ফেরি চালানো। ফেরি যাত্রায় প্রায় 20 থেকে 30 মিনিট সময় লাগে। সৈকতে রয়েছে চেঞ্জিং রুম, জলখেলা, শাওয়ার রুম, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি ।
শান্ত নীল জলে সোনালী সাঁতার সহযোগে সূর্যস্নান সেরে পরিতৃপ্ত মনে স্মৃতিসঞ্চয় মাতাল করে দেয় প্রতিবার। এটি সবচেয়ে পরিষ্কার সৈকতগুলির মধ্যে অন্যতম। বালির রং এতো সাদা হয় এই বিচে না গেলে জানা যাবে না। তিন বার গেছি এই বিচে। প্রতিবারেই মুগ্ধ হয়েই ফিরেছি। এ এক অমোঘ মায়া! মনে হয় এই বিচকে প্রকৃতি নিজহাতে সাজিয়েছে অন্য আঙ্গিকে। ঝরে পড়া রোদের আঁচলে এক অনাবিল মায়া আমাকে আকৃষ্ট করে আছে । মনে হয় যেন জলের পায়ে কেউ সাইকেল পরিয়ে দিয়েছে আর গলায় ঘণ্টা । এ দৃশ্য এক নজরে আলোকবর্তিকা । খুব শীঘ্রই আবারো যাবো এই দৃশ্যসুখে লীন হতে।
ঢেউয়ের সাথে একান্ত মনোলাপে কালাতীত করতে চাইলে পন্ডির রক বিচ সর্বোত্তম । অনাবিল কূজন সৃজন ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিন্দু বিন্দু ছন্দের দিকে ডিকোড করে আত্মজ। ঢেউ আসে , ঢেউ মেলায়। মন হয়, মন বিলায়। জলের শিল্পে শিল্পিত মোহ মায়া ছাড়িয়ে উষ্ণ করে ছলাৎ ও তার তৎক্ষণাৎ । পাথর বেষ্টিত এই বিচ খুব সজাগ। এই বিচে বসে সূর্যাস্তের গরিমা খুব উপভোগ্য ছিল । চকোর পাখি যেভাবে চাঁদ কে দেখার মাঝে তন্ময় হয়ে থাকে , ঠিক তেমনি চুপচাপ বসে ঢেউযাপনে অপার সুখ অনুভূত হয়। মনে হয় কবিতা প্রসব হচ্ছে অতিমননে, তাকে ছাদ দাও , ছায়ার উষ্ণতা দাও, দুমুঠো পাখি দাও। আজাদ আকাশের মুক্তি নিয়ে মন খরচ করে ফেলা যায় নিমেষে , ভালোবাসায় , একমনে, নিভৃতে । সেখানে কবিতা কথা বলে চোখে - চোখে । সময় যত দীর্ঘ হয় মনও ঠিক ততটাই । আর সেই কালো পাথরগুলি যেন নিরবে অনেক কথা বলে যায় কানে কানে ।
বিচ ঘুরতে গেলে আমি খাবারের দিকেও আচ্ছা করে ঘুরে দেখি। প্রতিটি কামড়ে এক স্বাদযুক্ত বিস্ফোরণ আমাকে আরও ভোজনরসিক করে তুলে । সেখানে পানি পুরি, বোন্ডা, মসলা পুরি, কাঁকড়া মসলা ফ্রাই, ফিস ফ্রাই সহ স্থানীয় নানা খাবারের লোভ সম্বরণ করা মুশকিল হয়ে পরে । মনোরম দৃশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই পন্ডির চমৎকার পানীয় ভ্রমণকারীর অন্যতম আকর্ষণ।
আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে রক বিচের মনকাড়া মাধবী রাত । সেবারে ছিল পূর্ণিমার রাত । দেখি জলের ছায়া ঘটি ঘটি রোশনি তুলছে আর ঢেউ এর রক্তিম উড়ে উড়ে ক্রপ করা রাতের মালকোষে । সমস্ত রাগ-রাগিণীর মোহ একসাথে আলোর গভীরে তোলপাড় । জলের রিডে হাত বোলাতেই সহস্র মন মিনিচাঁদের মোড়ে ম্যাক্সিমাম! এদিকে ‘আমি’ মিনিমাম হতে হতে কখন পৌঁছে যাই রিসোর্ট খেয়াল নেই । পরের দিন আবার নিজের মত ফিরে আসা চেন্নাইয়ে।
চেন্নাই এ বিচ-হপিং বলতে গেলে আমাদের মুড-হপিং। ব্যতিক্রমী কবিতা যেমন স্রোতবদলের আদলে বাতিঘরে প্রসব করে ধ্বনির চারকদম , তেমনি একঘেয়েমি যাপনে রাগ ঢেলে দিতে চেন্নাইয়ের বিচগুলির সান্নিধ্য আমাকে আলোড়িত করে। বেশ কিছু সৈকত চেন্নাইয়ের প্রাকৃতিক মনোরঞ্জনকে এগিয়ে দিয়েছে বহুদূর । এখানে যতগুলি সি-বিচ ঘুরেছি তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে মহাবলিপুরম বিচ। এই বিচের জলের অবয়ব আমাকে রোমাঞ্চিত করে । দৈত্যরাজ মহাবলীর নামানুসারে এই স্থানের নাম হয় মহাবলীপুরম। সৈকতটি বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এবং কিছু পাথর কাটা শিল্প-ভাস্কর্য নিয়ে গঠিত। ঝকঝকে সৈকতটির পুরোটা জুড়ে সোনালি বালি রয়েছে এবং এটি গুহা, বিশাল রথ, রথ এবং মন্দিরের জন্যও বিখ্যাত। মহাবলিপুরম আজ পুনরুজ্জীবন এবং সুন্দর পরিবেশের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য। শহরের কোলাহল পেরিয়ে একটু ইউনিক যাপনের ছাপ ক্লিক করতে হলে এই বিচ বেস্ট । এখানে গেলে আমি দেরি করে ফেলা জলের ভাবনাকে এক্সপ্লোর করতে পারি সহজেই। চারদিকের বাতাবরণ পায়ে পায়ে দোল দিয়ে যায় সময়ের আগে আগে। জানি, কোথাও পৌঁছাবার নেই, তাও কোথাও একটা পৌঁছে যাবার তাগিদ ঢেউয়ের এর আগেপিছু তুমুল মনগামী । প্রতিটি জলের আচানক অগত্যা হাসিন চোখে চাঁদ নামিয়ে আনে ফির। থতমত ঢেউ নীল বুনতে বুনতে আকাশের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যায় যা কিছু রঙিন । আমিও উড়ি । নীলে । জলে । অতলে । এই সৈকতের শপিংহাবও আকর্ষণীয় । স্থাপত্য- ভাস্কর্য মণ্ডিত এই সাদা বালুকার বেলাভূমিটি যেমন নির্মল তেমনই মনোরম। চারপাশ ঘিরে রেখেছে কোমল ঝাউয়ের বন। বহুবার গেছি এই বিচে। প্রতিবার ইউনিক লেগেছে এর সৌন্দর্যশোভা । বিচ ছাড়াও এর আশেপাশেই রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ট্যুরিস্ট স্পট যা দেখলেই নয়। তীরের মন্দির, কৃষ্ণের বাটারবল, পঞ্চ রথস, ভারাহ গুহা মন্দির, গঙ্গার অবতরণ, স্মৃতিস্তম্ভের গ্রুপ, মহাবালিপুরম সমুদ্র সৈকত, থিরুকাদালমাল্লাই, কৃষ্ণ মণ্ডপম, ইন্ডিয়া সিশেল মিউজিয়াম এবং মহিষাসুরমর্দিনী মণ্ডপ মহাবালিপুরের প্রধান আকর্ষণ। বিচের উল্টোদিকেই এ সমস্ত আশ্চর্যসমাহার । মহাবলীপুরম তটমন্দিরটি সমুদ্র তীরে অবস্থিত মহাদেবের একটি মন্দির। অন্যান্য মন্দিরের মধ্যে রয়েছে ওলক্কনেশ্বর মন্দির, লাইট হাউজ, আরও কিছু শিলা নির্মিত কারুকার্য, দ্রৌপদীর স্নানঘর প্রভৃতি। খাওয়া দাওয়ার ভরপুর ব্যবস্থা তো রয়েইছে। আমরা যখনই যাই সারাদিনের জন্য চলে যাই ।
গন্তব্য: মহাবালিপুরম, তামিলনাড়ু
শিশুরা (15 বছরের নিচে) বিনামূল্যে প্রবেশ করে, যেখানে পর্যটকদের অবশ্যই INR 340 এবং স্থানীয়দের
10 টাকা দিতে হবে।
সময়: পর্যটকদের জন্য খোলার সময় সপ্তাহে সারাদিন সকাল 6 টা থেকে সন্ধ্যা 6 টা পর্যন্ত।
পরিদর্শনের জন্য ভাল সময়: জলবায়ু অবস্থা বিবেচনা করে, জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি এই পুরানো মন্দির
দেখার জন্য সেরা মাস। ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় অক্টোবর থেকে মার্চ।
লিলিপুট জীবন । গতিতেই আপন। থামতে নেই-ই । থামাতেও নেই চোখের গাগরী । তাই তো ভ্রমণ আমাকে
দ্বিগুণ করে । প্রতিবারই নতুন ধরিয়ে দেয় চোখের দরবারে। আমি দরবারী কানাড়ায় বাজতে শুনি নজরুল----
“স্মরণ-পারের ওগো প্রিয়, তোমায় আমি চিনি যেন।
তোমার চাঁদে চিনি আমি, তুমি আমার তারায় চেন॥
নতুন পরিচয়ের লাগি
তারায় তারায় থাকি জাগি,
বারে বারে মিলন মাগি
বারে বারে হারাই হেন॥
নতুন চোখের প্রদীপ জ্বালি চেয়ে আছি নিরিবিলি,
খোলো প্রিয় তোমার ধরার বাতায়নের ঝিলি-মিলি।”
সুতরাং প্রদীপের আলোয় আলোয় পৌঁছে যাই সেই নিরিবিলি জলবনে । নাম ভিজিপি গোল্ডেন বিচ। যেমন নাম তেমনি মহিমা। পুরী নয় , চেন্নাই গোল্ডেন বিচ । বিচটি শহর থেকে অল্প দূরেই । সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি একটি রিসর্ট রয়েছে, যা পর্যটকদের সময় কাটাতে এবং প্রদত্ত বিনোদনের সুবিধা নিতে আমন্ত্রণ জানায়। একবার সেখানে দুদিনের ছুটি কাটাতে চলে যাই সপরিবারে। প্রাইভেট বিচের সুবিধা যুক্ত এই রিসোর্টে সেরা সময় কাটে প্রকৃতির গতি-অগতির চালে। দিনের চাইতেও রাত ছিল অমায়িক ছন্দমুখর। চাঁদনিমাখা নীল থেকে জলবনের কুহু অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছিল । মন হচ্ছিল তীব্র ! আমরা ছাড়াও উপস্থিত পর্যটকের সান্নিধ্যও মনের খোরাকে বোল তুলছিল প্রখর। স্মৃতি এভাবেই তো দে-দোল দে-দোল ! এ তো ছিল রিসোর্ট বিচযাপন ।কিন্তু ট্যুর বলতে সেই ভিজিপি গোল্ডেন বিচ যা পর্যটকদের গোল্ডেন ঠিকানা । টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয় । অসম্ভব সুন্দর স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন এই বিচ। ভিজিপি গোল্ডেন বিচ অবশ্যই চেন্নাইয়ের সেরা জায়গাগুলির মধ্যে একটি যা শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্করা একইভাবে উপভোগ করতে পারে। রয়েছে নানা রাইড ও আর্কেড । অনেকবার গেছি পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুদের সাথে। স্নানের জন্য এই বিচ খুব উপযুক্ত । স্নানাঘরও রয়েছে ফ্রেশ হবার জন্য। রয়েছে ছোট বড় রেস্টুরেন্ট ও নানা খাবারের ব্যবস্থা । পারিবারিক রিচ সময় কাটানোর জন্য এই সৈকত সঠিক স্পট । ঠাণ্ডা হাওয়া এবং আদিম জলের এই দর্শনীয় পটভূমির থিম পার্কও খুব উপভোগ্য ।
উত্তরে ফোর্ট সেন্ট জর্জ থেকে দক্ষিণে ফোরশোর এস্টেট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার প্রসারিত চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিচ হিসেবে খ্যাত। চেন্নাই আসার পর প্রথম প্রথম এই বিচেই কাটিয়েছি অনেক সোনালী সময়। প্রকৃতপক্ষে, মেরিনা বিচ এমন কয়েকটি স্থানের মধ্যে একটি যা প্রতিদিন হাজার হাজার লোককে হাঁটা এবং জগিংয়ের জন্য আকর্ষণ করে। সমুদ্রমন্থনে সব বয়সের মানুষকে দেখা যায়। বিশেষ করে মধুচন্দ্রিমাযাপনরত দম্পতিকে এখানে বেশি দেখা যায়। মেরিনা সৈকত মূলত বালুকাময়। এখানে জলের স্রোত খুব বেশি। সে কারণে মেরিনা সৈকতে স্নান এবং সাঁতার কাটা বিপজ্জনক, এবং আইনত নিষিদ্ধ। এটি দেশের অন্যতম জনবহুল সমুদ্র সৈকত এবং সপ্তাহের দিনগুলিতে প্রতিদিন প্রায় ৩০,০০০ পর্যটক এখানে আসেন। এই বিচেই ছিল আমার প্রথম সমুদ্রস্নান ! সৈকতের ধারে রয়েছে প্রচুর দোকান এবং অস্থায়ী স্টল। খাবার, কেনাকাটার জিনিস সবই পাওয়া যায় এখানে। এখানকার ঝিনুকের গয়না এবং ঘর সাজানোর জিনিস বেশ বিখ্যাত। আর জিভে জল আনা খাবার তো রয়েইছে। বালির সৈকতে নানা ধরনের বিচ স্পোর্টস্ হয়ে থাকে। এই সৈকতে হাঁটা আমার খুব পছন্দের ।
পাশেই রয়েছে মেরিনা বিচ বাতিঘর, বিবেকানন্দ হাউস, আন্নাস্কয়ার । এই বাতিঘর চেন্নাইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটন স্পটগুলির মধ্যে একটি যেটি আপনাকে উপরে থেকে মেরিনা বিচ এবং পুরো শহরটির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে দেয়। সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকাল ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভিজিট করার সময়।
এছাড়াও প্রায়-ই আমি চলে যাই এলিয়ট বিচ বা বেসেন্ত নগর বিচ। এটিও একটি শহুরে ওপেন বিচ। এই বিচ আমাকে খুব টানে । মনে হয় পেছনে ছুটে যাওয়া খুব মূল্যবান কিছু হারিয়ে গেছিল একদা। আর তাই তারই সন্ধানে সৈকতের পিছু পিছু কোথাও আমার ছুটে যাওয়া , কেবল ছুটে যাওয়া । চেন্নাইয়ের বেসান্ত সমুদ্র সৈকত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই রয়েছে অষ্টলক্ষ্মী দেবীর মন্দির। এখানে দেবী লক্ষ্মীর আটটি অবতারের উপাসনা করা হয়। মন্দিরের আধ্যাত্মিক পরিবেশ মনকে শান্ত করে। সমুদ্রের ঢেউগুলি মন্দির কমপ্লেক্স জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। পরিবেশকে আরও প্রশান্ত করে তোলে। মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীও প্রশংসনীয়। সাথেই রয়েছে একখানা চার্চ । সৈকতের কাছেই রয়েছে খাবার দাবারের দোকান , কেনাকাটার নানারকম দোকান । এই বিচের শান্ত জলছাপ হৃদয়কে কায়দা করে ছুঁয়ে যায় । পরিষ্কার এই বিচ হর্স রাইড , বন্দুক খেলা, রিং- খেলা ইত্যাদি নানারকমের খেলা সহযোগে ক্রীড়াময় উদাম মনোকাশ । এই বিচের অন্যতম একটি আকর্ষণ নলেন গুঁড়ের আইসক্রিম যা আমাকে তাড়িত করে ছুট তুলতে।বিচের মেইন রোড পেরিয়ে গলি ধরে এই আইসক্রিম শপ ষোলআনা বাঙালিআনা ।এছাড়াও আরও বিচ রয়েছে চেন্নাই যেখানে প্রায়ই গিয়ে থাকি। সে গল্প না হয় আবার কখনো … ইশ্ !! এসব ভ্রমণস্বাদ ! লিখা যায় আদৌ ? কাছে যেতে হয় , পাঠ করতে হয় সমুদ্র ও তার অবয়ব । রিপিটপাঠ দাবী করে ভ্রমণকৌশল। নাড়ির বন্ধন ছিন্ন করতে নেই । পৃষ্ঠা উলটাতে উলটাতে কখন নীল খুলে যায় ! কেবল জলছুট! তাই তো ভ্রমণ কোনো গন্থব্য নয় , গতিশীল পিপাসার কনসার্ট । আবার কবে …















Comments