গোপালপুর-অন-সি, নির্জনাবাস

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

সমুদ্র তো নয়,উপসাগর।বঙ্গোপসাগর।ঢেউ কাটতে থাকে নির্জনতার গিঁটগুলো।পুরী থেকে এলে মনে হয় এই নিরালায় একটা সমুদ্রপরবশ বাড়ি তুললে মন্দ হত না।উইথ মালঞ্চের বেড়া।তার আগে পালিয়ে বেড়ানো আর বেড়ানোর যে ফাঁকটায় সূর্যডোবে,গোপালপুর-অন-সি সেই ফাঁক দিয়েই অনুপ্রবেশ করেছিল।বেরহামপুর(ওড়িশা)স্টেশনে থেকে বেরোলেই বিশাল চত্ত্বর।অটো-রিক্সা চালক,ক্যাব ইত্যাদি’র হাঁকডাক আছে,দৌরাত্ম নেই।আমি আর শ্রীলা,ধীমান(কবি ধীমান চক্রবর্তী)এবং ওর অর্ধাঙ্গিনী শর্মিলা এবং কবি উমাপদ কর,পাঁচজনের টিম।পুরী থেকে এখানে আসা।বেরহামপুর থেকে মাত্র ষোলো কি.মি দূরত্বে গোপালপুর-অন-সি’র নির্জন আহবান,যা এই স্টেশন চত্বরেই ‘ওরে আয় আয়’করছিল।যাঁরা আসবেন হাওড়া থেকে তাঁদের জানাই যে,দক্ষিণগামী প্রায় সব ট্রেনই থামে ‘বেরহামপুর’বা ‘ব্রহ্মপুর’স্টেশনে।ওরিশার গঞ্জাম জেলার মুখ্য শহর ‘বেরহামপুর’।রিজার্ভেশন  আগেই করে নেবেন।পুরী হয়ে যাঁরা আসতে চান তাঁদের জন্যও ট্রেনের অভাব নেই।পুরী থেকে টিকিট পেতে অসুবিধে হয় না।‘বেরহামপুর’-এ নেমে অটো বা ক্যাবে যেতে হবে ষোলো কিমি দূরের গোপালপুরে।নানাবিধ বাজেটের হোটেল আছে গোপালপুরে।ফাইভস্টার থেকে বাজেট হোটেলের যাবতীয় বুকিং আপনারা করতে পারবেন পছন্দ মত ওয়েবসাইট থেকে।হোটেল আগে থেকে বুক করে আসাই ভাল।হোটেলের সংখ্যা কমের দিকেই।

যাইহোক আমাদের হোটেল-বুকিং না থাকায় অটো-চালকের সঙ্গে কথা হল যে,সে কয়েকটি হোটেল দেখা অব্দি আমাদের সঙ্গে থাকবে।তবে তার আগে খেতে হবে।মাঝ-দুপুর।অটো-চালকই একটি পথ-চলতি রেস্তোরাঁয় নিয়ে এল।মন্দ নয়।এমনকি মাছও।অবশ্য ওড়িয়ারাও মৎসভুক,বিশেষত কোস্টাল-ওড়িশার বাসিন্দারা।খাদ্য গ্রহণান্তে চলল অটো গোপালপুর।সমুদ্র টানছে।একসময় বাঙালি সমুদ্রমুখী হলেই গেয়ে উঠত,‘চলো রীণা,ক্যাসুরিনার ছায়া গায়ে মেখে…’আর দীঘা গন্তব্য হলে অবশ্যই,চল না দীঘার সৈকত ছেড়ে…

সময় পুরনো হয়েছে।আমরাও।শুধু সমুদ্রের টান প্রায় একইরকম।জল,নুন আর সূর্যের গন্ধ মেশানো।

তবে যেহেতু গোপালপুর যাচ্ছি,এবার তার কথাই হোক।হাউ কাম গোপালপুর?কী ভাবাই বা গোপালপু্র একটা ভ্রমণবিন্দু হয়ে উঠল?অটো ছুটতে থাকুক সামনের দিকে।মন বরং পিছিয়ে যাক।১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯।ফ্রান্স।

ফরাসী বিপ্লবের টালমাটা্ল দশক।

মন্তেস্কু,রুশো,ভোলতেয়ার,দিদেরো’র মত দিগগজ দার্শনিকদের দিগনির্দেশনায় নিপীড়িত মানুষ বিপ্লবের জন্য পথে নেমেছিলেন।রাজতন্ত্রের যাবতীয় অত্যাচার,অনাচার,অবিচার এবং ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে খেপে উঠেছিল সাধারণ মানুষ।ভেঙে ফেলেছিল বাস্তিল দুর্গ স্বাধীনতা,সাম্য,মৈত্রীর আদর্শকে সামনে রেখে।‘ম্যাক্সিমিল্যান রোবসপিয়ের’-এর জ্বালাময়ী ভাষণে তেতে উঠছে ফ্রান্সের তরুণ সমাজ।রোবসপিয়ের যখন বলছেন, ‘The king must die so that the country can live.’ চিৎকার করে উঠছে তরুণ বিপ্লবীরা।এই তরুণদের মশ্যেই ছিলেন ‘লোরেঁ’ নামের এক তরুণ,অত্যধিক সক্রিয়তার জন্য যিনি অচিরেই রাজকীয় রোষাণলে পড়ে যান এবং আত্মগোপন করেন।ফ্রান্সের রাজকীয় আরক্ষা-বাহিনী তা&কে যখন হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে তিনি তাঁর বন্ধু ইস্ট ইন্ডিয়া শিপিং কর্পোরেশনের ক্যাপ্টেন ‘এদোয়ার্দো’র সাহায্যে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া শিপিং কর্পোরেশন’-এ যোগ দেন এবং তাদেরই জাহাজে এসে পৌঁছান ‘গোপালপুর-অন-সি’তে।

শুরু হল এই জায়গার উত্থানের ইতিহাস।গোপালপুর বিচে ইংরেজ,ডাচ ব্যাপারীরা বার্মা যাওয়ার পথে কিছুটা বিশ্রামের জন্য অবতরণ করতেন।হয়ত কিছু ব্যবসাবানিজ্যও হত।‘লোরেঁ’ এটা লক্ষ্য করে একটি সরাইখানা খুললেন।খাদ্যদ্রব্য,পানীয় ইত্যাদির মাধ্যমে সরাইখানা জমে উঠল।তবে ‘লোরেঁ’র ব্যবসায়িক বুদ্ধি ছিল প্রখর।তিনি প্রথমে একটি বন্দর আর লাইটহাউস প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন।অচিরেই তাঁর বন্দর ব্যস্ত হয়ে পড়ে।‘লোরেঁ’ এবার সরাইখানাকে রূপান্তরিত করেন হোটেলে।একাধিক হোতেল,রেস্তোরাঁর মালিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিড়ি,মশলাপাতির ব্যবসায়ে হাত দিয়ে ফুলেফেঁপে ওঠেন।সস্তার শ্রমিক আসত বাংলা থেকে।তারা বার্মা যেত পসরা নিয়ে।সে এক এলাহি ব্যাপার!গোপালপুর তখন ইংরেজ,ডাচ,পর্তুগিজদের আনন্দ,ফুর্তির জায়গাও বটে!খানাপিনা,নাচগানা চলত।আর এই ঐতিহ্যের হাত ধরে ১৯১৪ সালে ‘সিসিলি সিনর ম্যাগলিওনি’ গড়ে তুললেন ভারতের প্রথম সি-বিচ –রিসোর্ট।‘পাম-বি-রিসোর্ট’,যা আজও সমান উজ্জ্বল!এই সময়েই গোপালপুর জুড়ে গড়ে উঠেছিল প্রচুর ‘ওয়্যারহাউজ’ যার ধ্বংসাবশেষ এখনো গোপালপুরের ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে।

ইতিহাস পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ‘গোপালপুর-অন-সি’।হোটেল বুকিং না-থাকায় অনেক খুঁজে একটি আশ্রয় খুঁজে বার করা হল।ভালই ছিল  থাকা এবং খাওয়াদাওয়া।গোপালপুরে আগাম বুকিং করেই আসাই ভাল,নইলে সিজনে সমস্যা হতে পারে।

সন্ধ্যা আর রাতের গোপালপুর মায়ামায়।বেশ ছিমছাম বাঁধানো পরিসর আছে সি-বিচ ছুঁয়ে।সেখানে পসরা নিয়ে আছেন দোকানিরা।রাস্তার ধারে প্রচুর স্ট্রিট-ফুডের দোকান,খাবেন কি না,আপনার ব্যাপার।তবে চাঁদের আলোয় ঝাঁপিয়ে পড়া সমুদ্রে ঢেউসমগ্রে হারিয়ে গেলে ভালই লাগবে।কোনও গানের কলি মিশিয়ে দিতেই পারেন অফুরন্ত ঢেউসমগ্রে।যেন জীবনই।আসছে,মরে যাচ্ছে,আবার আসছে।

ভোর অবশ্যই এক বিস্ময়মিহি আবাহনে মিশে থাকে এই গোপালপুরে।

হাঁটুন বিচ ধরে।সূর্য উঠবে।

কেমন এক অলসচাঞ্চল্য আকাশে।

দেখুন।

তারপর ফুলকো লুচি আর আলুর সব্জি এবং চা।আর কী চাই!

হাতে সময় নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন এবার।অটো ভাড়া করুন।চলে যান ‘তাতপানি’,’তারাতারিণি’,চিল্কা ইত্যাদির দিকে।যেতে পারেন ‘দারিংবাড়ি।গাড়ি বুক করে একদিনের জন্য।

দেখা শেষ হলে শুধু শুধুই বসে থাকুন সমুদ্রের ধারে।বালুকাবেলায়।

গোপালপুর অতি নির্জন বালক,থুড়ি বালক নয়,আশ্রয়।আপনি বসে থাকুন।আর গুনতে থাকুন ঢেউয়ের আসা-যাওয়া।মন ভাল হয়ে উঠবে।হয়ত গেয়ে উঠবেন,এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু…

 

About Author
&
Photographer

লেখক : স্বপন রায়

৮০ -র দশকের কবি ও গদ্যকার। 

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : আমি আসছি , কল্পে যদি বাঁচি (যৌথ), চে, লেনিন নগরী, কুয়াশা কেবিন, ডুরে কমনরুম, মেঘান্তারা, হ থেকে রিণ, স্বপনে বানানো একা (সঙ্কলন), দেশরাগ, সিনেমা সিনেমা, আইসক্রিম একটু হেসেই তো কিনে দেবে, শ্বাসাবরী জংশন(সঙ্কলন) , মাধবী সিরাপ, গানকীয়া।

প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ : স্বর্গের ফোকাস, রুয়ামের সংগে, একশো সূর্যে , কুঁচবাহার। 

আলোকচিত্রী: স্বপন রায়

৮০ -র দশকের কবি ও গদ্যকার। 

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : আমি আসছি , কল্পে যদি বাঁচি (যৌথ), চে, লেনিন নগরী, কুয়াশা কেবিন, ডুরে কমনরুম, মেঘান্তারা, হ থেকে রিণ, স্বপনে বানানো একা (সঙ্কলন), দেশরাগ, সিনেমা সিনেমা, আইসক্রিম একটু হেসেই তো কিনে দেবে, শ্বাসাবরী জংশন(সঙ্কলন) , মাধবী সিরাপ, গানকীয়া।

প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ : স্বর্গের ফোকাস, রুয়ামের সংগে, একশো সূর্যে , কুঁচবাহার। 

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget