ভূতলস্বর্গের কানাচ আর মরুপাহাড়ের আলসে থেকে

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

১.

--‘ওই দ্যাখ চন্দ্রতাল…’। প্রায় চেঁচিয়েই উঠল প্রনব দা। একটু পিছন থেকে দৌড়ে এসে এক ঝলক দেখেই জড়িয়ে ধরলাম প্রনবদা কে। মুহূর্তে ধীমান এসে জড়িয়ে ধরল আমাদের। আমাদের চোখে সকালের ভেজা মেঘের জল। ষাটোর্ধ তিনটে মানুষ কী করবে বুঝতে পারছে না। এইরকমই হিমালয়। তাঁর বৈভবে বৈচিত্রে আর প্রাচুর্যে। এবং এটাও বলতে হবে মেহমানপনায়। যদি খুলে না ধরত তবে কি দেখতে পেতাম ওই পান্না-সবুজ নিস্তরঙ্গ জল? জলই তো নাকি? হ্যাঁ জলই। ছায়া পড়েছে পাহাড় শরীরের। একবার চারপাশ মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিলাম। গিরি আর গিরিশৃঙ্গ। অধিকাংশই রূপোলি। সূর্য তেড়ছা স্লিপার দিচ্ছে কিরণে কিরণে।পায়ের কাছে খাদের মধ্যে যেন বাঁকানো হাতের তালুতে কেউ সবুজ মেখেছে। না এ সাধারণ মানুষের ছোট্ট হাতের তালু নয়। কল্পিত দৈত্য-দানোর কিছুটা বড় হাতের তালুও নয়। এ মহাকালের হাতের তালু। আমরা একটু ধাতস্ত হতেই প্রনবদা জুগনুকে নিয়ে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেল কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে। স্থানু হয়ে গিয়েছিলাম দুজনেই, ধীমান আর আমি। শোভায়। মাথায় দাগছাড়া নীলতম আকাশ। পায়ে পাথুরে মাটি আর বোল্ডার। সামনে খাড়াই পাড় ওয়ালা পুষ্করিনীর জল নামক শান্ত সবুজ। চোখ ওঠালেই ক্ষয়া বরফ নামতে দেওয়া পাহাড় আর তার তুষারাবৃত শৃঙ্গমালা। ঘোর কাটতে চালু দুজনেই। তারিয়ে তারিয়ে চোখে মনে শরীরের সর্বাঙ্গে জড়িয়ে নিতে উদ্যত এবং কিছুটা উদ্ধতও। হাঁটা, নামা-ওঠা, ক্লিক ক্লিক। জুলাই প্রথম ২০১৬, আমাদের দুজনের কাছেই এক ফলকোচিত দিন। কেননা প্রনবদা আগেও একবার চাঁদ-তাল (চন্দ্রতাল) ছুঁয়ে গেছে ট্রেক করে।

প্ল্যানটা অনেক দিনের। প্রায় চার মাস আগে ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলায় সূত্রপাত। সূচী পাঠক্রম সবই প্রনবদার তৈরি। কিন্নৌর ও লাহুল-স্পিতি। টুকিটাকি পইপই তালিকা-তুলিকা ভয় ও সাহস। শিক্ষানবিশ দুটো যার পর নাই। অগত্যা, ১৭ জুন হাওড়া বড় ঘড়ির নীচে সন্ধ্যা ৭, ত্রিমূর্তিমিলন। ১৭ জুন ট্রেন্ডস টু ১৯ জুন, ট্রেন ট্রেন। খুচরো ও খেজুর। কালকা। কালকা@টয়ট্রেন.শিমলা.কম। জানলায় জানলায় খচাখচ ক্লিক। মোবাইলে গাড়ি চলার ছবির রিলে তুলে রাখা। সুড়ঙ্গের রকমারি আর অন্ধকারের সময়কাল ভ্যারেইজ-এজ। সূর্য ও বারোট। সিঙারা ও চা। গিরিরা সব বন্ধু হতে চললো। ১৯,২০ বুতেল গেস্টহাউস, শিমলা। কর্ণধার কমল বুতেল, হার্দিক। প্রনবদার প্রাণাধিক বন্ধু ও ভাই। বিকেলে ম্যাল ফেরত (ততক্ষণে ধীমান তার ‘বেজে ওঠা সূর্যাস্ত’ সিরিজ ক্যামেরাকৃত করে নতুন ক্যামেরার দাম কিছুটা তুলে ফেলেছে) আমাদের কেয়ার-অফ, কমলসদন। সান্ধ্য পান আর দীপক বুতেল এর শায়েরি। রাতে কমলিনীর হাতের রান্নায় অতলান্তিক ডিনার। রাস্তা, হাঁটা, বাড়ি, ফুল, পাইন, লিফট, পান, বৃষ্টি, কবিতা…। কবিতার জন্যই যোগ এবং যোগাড়।

সফর থামে না। কবিতা তাকে শক্তি যোগায়। প্রথম যে-রাতে কবিতা পাঠ, তাতে নস্টালজিয়া উঠে এল। ধীমান অনুমতি চেয়ে নিল, সে সঙ্গে নিয়ে-আসা কবিতার বই-এর পান্ডুলিপি থেকে আজ পড়বে না। পড়বে বেশ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত ‘পাখীদের রোববার’ থেকে। পড়ে চলল, ফিরে এল কিন্নৌর স্পিতি পূর্বভ্রমণের স্মৃতি। তাঁর চোখ চকচক করছিল। বুঝতে পারছিলাম ভেতরে ভেতরে সে আবার ঘুরছে আর পুলক জেগে উঠছে। আমি আর প্রনবদা শুধু আহা বাহা তেই থেমে থাকতে পারছিলাম না। দু-চার কথা বলেও ফেলছিলাম। আমি নিশ্চিত প্রনবদাও খুঁজে ফিরছিল সে যাত্রার এপিসোডগুলো, কলমে হারিয়ে এখন যেগুলো অনুভূতিমালায় রূপান্তরিত হয়েছে। ধীমানও আজ একটু ‘রেড ওয়াইন’। আমি পড়লাম একটা দীর্ঘ কবিতা। প্রায় একটানে। সেখানেও ফিরে দেখা। নস্টালজিয়ার টুকরো-টাকরা সহ যাপন। বহুদিন আগের লেখা ও তার বেশকিছু দিন পরের সংযোজনে তিনটি পর্বে নির্মিত কবিতা ‘ছাব্বিশ’ (বালুমানুষের ঝুনঝুনাৎ)। ভাবতেও পারিনি ধীমানের মত কবি ও প্রনবদার মত কবিতা-পড়া কবিতা-পাগল মানুষকে এতক্ষণ ধরে শান্ত ও মগ্ন বসিয়ে রাখতে পারব। তবু তো হল। মনে হয় এসব পাহাড়ের গুণ। পাহাড় যে বড় উদার।

নামটা জোরে করে উচ্চারণ করে প্রনবদা আমাদের শুনিয়ে রাখল। ‘জুগনু’। হ্যাঁ আমাদের আগামী তেরো-চোদ্দ দিনের সফর সারথি। জাইলো। আটত্রিশ-সাঁইত্রিশ বছরের তরতাজা মানুষ। হাসিখুশি। যদিও হিন্দি সিনেমার সঙ্গে তার কোনও যোগ নেই। ভ্রমণকারীদের গাড়িতে করে ঘোরানোই তার পেশা। কিন্নৌর স্পিতির এমন কোনও গ্রাম শহর জনপদ নেই যা সে চেনে না বা যায়নি। কারণটা সহজ। এই পেশার আগে জুগনু গ্রামে শহরে শাল কম্বল বেচতে আসত। সুতরাং। আহা। প্রনবদা তো এমন সারথিই চাইছিল। মিলে গেল। চল ধন্নু। জাইলোর চাকা গড়ালো।

সকাল। ২১ জুন, তারিখ মনে থাকলেও বার মনে নেই। সাড়ে সাতটা। বুতেল গেস্ট হাউস থেকে নেমে এসে ‘পঞ্চায়েত ভবনের’ সামনে। প্রতীক্ষা। জুগনু ও তার জাইলো। অগত্যা আট। সওয়ারি ও সারথি নিজ নিজ আসনে। বাই শিমলা। কিছুক্ষণ পরেই এন-এইচ ২২। প্রনবদা সামনের সিটে বসে জুগনুর জান-পরিচয় ও জুগনু-কিন্নৌর-স্পিতি-লাহুল জান-পরিচয়। আমরা জানলার নামানো কাচের ফাঁকায় দূরে আর কাছের দৃশ্য দেখতে দেখতে কথাবার্তায়। প্রনবদা আমাদের ঘোরার পরিবর্তন সাপেক্ষ একটা প্রোগ্রাম জানিয়ে রাখল জুগনুকে। সম্ভবত জুগনু কিছুটা অবাকই হয়েছিল— এতটা জানে লোকটা! ক্রমে দু-পাশের বাড়ি-ঘর দোকান-পাট মানুষজন কমে এল। ‘কুফরি’ পেরিয়ে আসতেই শুরু হল একপাশে সুবজ মাখানো পাহাড় আরেকদিকে খাদ, আর দূরে দূরে গিরিশৃঙ্গ। দাঁড়িয়েও পড়া হল দু-একবার। ফোটো, ফোটো। নেশা। নিসর্গও খোলামেলা, মিশুকে। নাও, নাও যত পার নাও। কোনও নিষেধের মানা নেই। ‘কত নেবে নাও, না পাবে শেষ’ ভাবখানার মধ্যে অবশ্য কোনও চ্যালেঞ্জ নেই, আছে প্রশ্রয়। যেন বলছে— আরে বাপুরে তোমাদের জন্যই তো এত সাজ, এত ভূষণ আবার খোলাখুলিও। তোমাদের জন্যই এত সূর্য আজ। আবার তোমাদের জন্যই হালকা মেঘের আড়াল। সামনে পাশে চোখ সারানো সবুজ আর নীচে খাদে অন্ধকার, দূরে শৃঙ্গে শৃঙ্গে গলতে থাকা বরফের সাদা আর কালো। তোমাদের জন্যই এত আয়োজন। নগর সভ্যতা থেকে এসেছো, আলোর ঝলমলানিতে চোখ ধাঁধিয়ে, এবারে চোখের আরাম নাও নরম, প্রখর অথচ ধাঁধানো নয়, এমন আলোতে। দূষণ থেকে এসেছো। বাতাসে কার্বন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের দূষণ। এবারে বুক ভরে অম্লজান টেনে নাও। গন্ধের দূষণ থেকে এসেছো। বর্জ্যের ঝাঁঝালো গ্যাস আর কৃত্রিমতার চাপান। এবারে প্রাণ ভরে সুবাস নাও। তোমাদের জন্যই এত গাছ আর ফুল। নাই বা জানলে নাম। রং দেখেছো! শব্দের দূষণ থেকে এসেছো। ডেসিবেল ভাঙা দূষণ। এবারে নৈশব্দ পান করো। এক কাজ করো, জুগনু কে বলো গাড়ি থামাতে। স্টার্ট বন্ধ করতে। তারপর শান্ত হয়ে যাও। দেখবে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ লুকোতে পারছ না বলে একটা অতি কম কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পাচ্ছো। হতে পারে চারপাশের দেওদারের পাতার শব্দ এসে মিশে থাকতে পারে তার সঙ্গে। গেয়ে উঠতে পারো,  ‘কোলাহল তো বারণ হলো…’। দৃশ্যদূষণ থেকে এসেছো! হোর্ডিং ব্যানার দেয়াল-লেখা, বাসে বাসে ঘসটানি রক্ত, টাওয়ার টাওয়ার পাশে ঘিঞ্জি বস্তি, হত্যার পাশে কান্না, ঘেঁয়ো কুকুরের পাশে ভিখিরির খোলা হাত, ফুটপাতে শুয়ে থাকা শিশু যৌনতা। এবারে দেখো সবুজের মখমল, পাহাড়ের গায়ে, তাকে থাকে সাজানো। হরেক রকম সবুজ। ফিকে, কালচে, ডিপ, সাদা-ঘেষা। ফুল দেখো বিচিত্র বর্ণের। ছায়া এসে আরও খানিকটা নরম করে দেবে চোখের পাতা। তুমি নিজেকে দূষণ মুক্ত মনে করো। আর আরও এগিয়ে যাও পাকদন্ডি বেয়ে, উঠে নেমে থেমে আবার চলে। কথা দিচ্ছি আমি আরও বিস্ময় ও বৈচিত্র নিয়ে তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করে থাকব।

নারকান্ডা পেরোনোর আগেই ধীমানের সামান্য অস্বস্তি টের পাওয়া। প্রথমে উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না বলে মনে হলেও আসলে তা যে সকালের খাবারের কল্যানেই, বোঝা যেতে বেশি দেরি লাগলো না। বমি, গাড়ি থামানো, জল, বেশ কয়েকবার, সামান্য ওষুধ। এর মধ্যেই হয়তো মুখ ফস্কে বলে ফেলল— ‘সরি, প্রনবদা’। প্রনব দা চুপ। নিরুত্তর। চিন্তা। আবারও, ‘আমার আসাই উচিৎ হয় নি’। এবারে আমি ওর হাত ধরে, ‘এই ধীমান! কী বলছিস? আমরা আছি তো, নাকি?’। গাড়ি থামতেই এতক্ষণ কিছুই না বলা প্রনবদা, ফোন। বন্ধু ডাক্তার। অবস্থার বর্ণনা। ওষুধের নাম উচ্চারণ। নারকান্ডায় মিলল না। সামনে রামপুর। আমাদের কিছু খাবার। ধীমান ওষুধ আর ও-আর-এস। এবারে প্রনবদা, ‘ঠিক হয়ে যাবি’। দমক কমে এল, ধীমান আবারও সতেজ। শুধু এই যাত্রাপথের মাঝে-মধ্যে তোলা ছবিগুলোর কোনওটাই ওর দুদিন আগে বউনি করা নতুন ক্যামেরায় রইল না।

সাংলা পৌঁছুতে পড়ে যাওয়া বিকেল। কমটা জার্নি হলো না সারাদিনে। মনটা তখনও ‘সারাহান’ ‘সা-রা-হা-ন’ করছিল। সেখানে আমাদের যাওয়ার প্রোগ্রাম আগে থেকেই ছিল না। সময় বার করাই তার আসল কারণ। তবু ছুকছুকানিটা আমার ছিল। এন-এইচ ২২ ধরে যেতে যেতে রামপুর আর ওয়াংটুর মাঝামাঝি এসে যে রাস্তাটা ডান দিকে বেরিয়ে সারাহানের দিকে, সেখানে এসে প্রনবদা আমাকে এড়িয়ে না গিয়ে চিনিয়ে দিয়েছিল— এই রাস্তায় সারাহান, ২২ কিলোমিটার। সেটুকুই আমার চিন্তা ও মনকে নিয়ে গিয়েছিল সেই ছোট্ট গ্রামের ‘ভীমকালী’ মন্দিরের স্থাপত্যে আর কাঠের সূক্ষ্ম কাজে। তবে, এখন, মন চলো নিজ নিকেতনে। সাংলায় হোটেল ঠিক করাই ছিল। প্রনবদার পরিচিত বন্ধুর হোটেল। বাজার এলাকায়। ‘হলিডে হোম হোটেল’। এক কাপ চায়ের পরেই প্রনবদা বললো— বেরোবি? আমি প্রস্তুত। ধীমানের এখন ধকল প্রশমনের সময়। তাছাড়া যেখানে যাবো, তা তার আগেই দেখা। -- ‘হাজার ফিটের মত নামতে হবে কিন্তু। মন্দির, নদী, আর ‘ছোটে কাশ্মির’।’  অবশ্যই। ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে প্রনবদা আগে, আমি পেছনে। নামছি। সরু পথ। কাঁকুড়ে, কোথাও সামান্য কংক্রিট। নামার সময় আমি হাঁটুর অসুবিধার জন্য কুজো হয়ে পড়ছিলাম। প্রনবদা দেখিয়ে দিল নামার সঠিক তরিকা। সুবিধে হলো। ‘নাগমাতা মন্দির’। সুন্দর স্থাপত্য। কাঠে মোড়া। গায়ে বিচিত্র এবং সূক্ষ্ম কাজ। চত্বরে ছোট ছেলে-মেয়েরা খেলছিল। বাড়ির বয়স্ক মহিলারা বসেছিল মন্দিরের সিঁড়িতে। তাদের কয়েকজনের মাথায় কিন্নরি টুপি। আসলে ওই সময়ে আমরা দর্শক ছিলাম দুজনই। প্রনবদার ক্লিক ক্লিকে মন্দিরের শরীর আর পরিমণ্ডল যেমন, অনুরোধে এক মহিলাও তেমন পোজ-সহ ক্যামেরাবন্দী। আমিও খুচখাচ কিছুমিছু। উঠে নেমে ঘুরেফিরে খোদাই করে নক্সা তোলা পালিশ করা কাঠের কাজ দেখছিলাম। লতাপাতা, বরফি, চলমান কলকা, সাপ, ময়ূর, হরিণ আর স্থানীয় পুরাণের দেব-মুখ। নিঁখুত, শিল্পসম্মত, পরিশ্রমসাধ্য। মন্দিরের  স্থাপত্যে অনেকটা প্যাগোডার আদল। সামনে বাড়ানো কার্নিশে ঝুলছে কাঠের সরু গোল অজস্র কাঠি। যেন সহস্র সমাকৃতির আঙুল ঝুলছে। চারচালা মন্দিরের মাথায় দ্বিতীয় ধাপে গোলাকৃতি শঙ্কুর মত টুঁই। সবটাই আয়তাকৃতির শ্লেট পাথরে ঢাকা। অদ্ভুত কায়দায় আটকানো। মনে হয় এক্ষু্ণি গড়িয়ে পড়বে। চূড়া গড়েছে কোনও ধাতব জিনিসে। পিছলে দিচ্ছে বিকেলের রোদ। চূড়ার কিন্তু শেষ নেই। মানুষের তৈরি চূড়ার পেছনেই নিসর্গের অসংখ্য চূড়া। এক ফ্রেমে। উচ্চতার হেরফেরে সবুজ ঢালের মাথায় মাথায় ধূসর কালো গোটাটা ঢাকতে না পারা বরফ সাদা। কালচে মেঘ হয়তো কোথাও রেখেছে ভেজা হাতখানা। আরও দূরের আরও উঁচুর চূড়াটা গোটাটাই রজত সাদা, সূর্যের শেষ বেলাকার তেড়ছা আলোয় কিছুটা মায়াময়।  বাকিটা এফোঁড়-ওফোঁড় নীল। নীল নীল। তাকিয়ে থাকতে হলো অনেকক্ষণ। ভাবছিলাম এই যে মানুষ সাজায়, নানা কিছু, ধরা যাক এই মন্দিরটাই, কে তাকে শেখায়? নিসর্গের কাছ থেকেই সে শেখে না তো? তার এত সাজ দেখে মনেই হলো, তাই শেখে, মানুষ সেই লাবণ্যে মজে আর শেখে।

ভাবনাটার তাল কেটে যায়। --চল। এবার নদী আর আপেল বাগান আর সবুজের গ্যালারি। আরও ৫০০ ফুট নামতে নামতেই গর্জন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে জলধারার। আরও তীব্রতর হলে দেখা গেল তার নাচুনি শরীর। চওড়ায় প্রায় ৪০ ফুট ব্রিজটা পেরোনোর সময় মাঝখানে দাঁড়ালাম। দুদিকেই। যে দিক থেকে আসছে আর যে দিকে চলে যাচ্ছে। ব্রিজের এই এক মাহাত্ম। দুদিকে দুভাবে দেখায়। আসছে। আর চলে যাচ্ছে। তো, ‘বাস্পা’ যে আসছে বা নামছে তার আঁকা-বাঁকায় গতি আর নানাকৃতির উপলখণ্ডে বাধা-না-মানা তেজ, বা বাধায় নিজেকেই ভেঙে উতরে যাওয়ার কৌশল সব কিছুকেই প্রকাশ করছে এই ধারা। খুব বেশি দূর পর্যন্ত নেমে আসা দেখা না গেলেও তার বেঁকে যাওয়ার ভঙ্গিতে নাচের মুদ্রা। আর চলমানতার ধ্বনি। গর্জমান কবিতা। আর ব্রিজের আর এক দিকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত সহ নাচের আরেকটি মুদ্রার প্রকাশ। ধারার গতি কমেনি এতটুকু। কমেনি গর্জন। তবু কেন মনে হয় চলে যাচ্ছে আমাকে ছাড়িয়ে কোথাও একটা আকন্ঠ মিশে যেতে! বর্ণহীন জলের ভেঙে পড়া সাদায় তখন লালচে হলুদ রঙের সূর্যকিরণ চলকে ওঠে, চলে যাওয়া তত্ত্বের বিষাদ প্রশমনে।

বাস্পা নদীর পাশ দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ। সে পথেই। এবার প্রায় সমতল। হাঁটছি আর দেখে চলেছি আপেল বাগান। সারি দিয়ে। এত সবুজ আর গাছে গাছে কিশোরী আপেল। সাংলার রাস্তায় আসতে আসতে দুপাশেই ফলে-থাকা আপেল দেখেছি। কিন্তু এবারে যেন আরও ঘন আর ফলনের মাত্রা ছাড়া ভাব। নদীর ওপর ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম ‘র‍্যালডাং’ চূড়ার বৈভব। চারপাশের চূড়াগুলোর রকমারি ধড়চূড়া। এখানে তাই পাতার ফাঁকে ফাঁকে মাঝেমধ্যেই তার রূপ প্রকাশ। আলোও মরে এসেছে। সব মিলিয়ে এক মায়াময় আধিভৌতিক পরিবেশ। ফিদা হয়ে যেতে বুঝি এই মরা আলো-আঁধারিই চাই। আপেল চাষে এই সমস্ত এলাকা এত উন্নতি করেছে যে এর নতুন নামকরণ হয়েছে। এই এলাকাটাকে ‘ছোটে কাশ্মির’ বলে স্থানীয়রা। কাশ্মির গিয়েছিলাম ৩০ বছর আগে। অনেক কিছুই মনে নেই। তবু একবার মিলিয়ে নিতে গিয়ে অনেক সাযুয্য খুঁজে পেলাম। ফেরার পথে প্রনবদা জানালো আপেল ফলনে এরা কাশ্মিরিদের ছাড়িয়ে গেছে। কঠোর পরিশ্রম ব্যবসায়িক বুদ্ধি মিশিয়ে এরা ভারতের একটা বড় অংশের বাজার ধরে ফেলেছে। এতে এদের জীবনযাত্রার মানেরও অনেক উন্নতি হয়েছে। গড়পরতা দারিদ্রের হার কম। ভালো লাগল শুনে। দেখতেও পাচ্ছি, হাসিমুখ ‘নমস্তে’ বলা কিন্নর, কিন্নরিদের। এক সময় নদীর এত কাছে আর এত সমানে চলে এলাম, প্রনবদা বলল—‘চল জল ছুঁয়ে আসি’। বালক আমরা সামান্য কসরতেই কিছুটা ভেজা মাটি ঘাস পেরিয়ে জলস্রোতের কাছে। নিচু হয়ে ছুঁয়ে দিলাম হিম, জল নিলাম চোখে গালে মুখে। আরাম আরাম। পথশ্রান্তি ভুলিয়ে দেওয়া নির্মল। বুঝলাম এর নামই শান্তি, এর নামই আনন্দ। সাতটা চল্লিশের আলোয় এবার ফেরা। হোটেল ফিরতে এবার চড়াই ভাঙার আমন্ত্রণ।

জায়গাটার নাম ‘চিটকুল’ না ‘ছিটকুল’ তা নিয়ে ধন্দ গেল না। কিন্তু বেরিয়ে পড়া গেল, সকাল সকাল। বাস্পা ভ্যালি, বাস্পা নদীকে ঘিরেই। তার ডান তীরে যেমন সাংলা, তেমনি বাস্পার ডান তীরেই চিটকুল। স্থানীয় অধিবাসিরা দেখলাম এভাবেই বলছে। এটিই এই ভ্যালির শেষ এবং উচ্চতম গ্রাম। এর পরেই ইন্দো-তীব্বত সীমান্ত। দুপাশে, কখনওবা একপাশের সবুজের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি অনেক সময়ই অগঠিত রাস্তার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো। গোটাটাই প্রায় চড়াই। তবে হালকা। সাংলা থেকে প্রায় ৮৩০ মিঃ বা ২৮০০ ফুট ওপরে। কিন্তু সবুজের কমতি পড়ল না। জুগনু একটা মন্দিরের কাছাকাছি গাড়ি এনে দাঁড় করা্লো। নেমেই বুঝলাম সামনে অনেকটা জুড়ে সমতল প্রায়। একটা রাস্তা এগিয়ে গিয়েছে বরাবর, যার দুপাশে মাঠ, চাষ চলছে, কাজ করছে নারী পুরুষ। সবুজ প্রায় একই থাকলেও অদূরের পাহাড়গুলোর রূপ অনেকটাই বদলের খপ্পরে। বদলেছে তার রঙের চেহারা। কাঠিন্য হারিয়েছে যেন। অনেকটা মেটে রঙের এই পাহাড়গুলো বেশ ন্যাড়া। গায়ে নেই সবুজ জামা। জানা গেল সামনের এবং বাঁ-পাশের পাহাড়ের ওপারেই তীব্বত। কিছু মিলিটারি তৎপরতা আমরা দেখতে দেখতে এসেছি পথে। মিলিটারি ভ্যানের আনাগোনা, চেকপোস্ট, গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, কোথাও সামান্য সমতলে উর্দিদের গা গরমি প্যারেড। যেমন এখন দেখছি ডানে একটু দূরেই বাস্পা নদীর তীরে সামান্য সমতলে জলপাই রঙের সেনানী ড্রিল। আমরা কিন্তু মন্দিরেই ঢুকে পড়লাম প্রথম। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো মন্দির। স্থানীয় দেবী ‘মাথি’। গাড়োয়ালের কোনও রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন এটি। ওয়ালনাট কাঠে তৈরি, অনেকটা কাপড়েও ঢাকা। ছোট্টর মধ্যে বেশ সুন্দর। সকালের রোদটা স্নান করাচ্ছে এর চূড়া, আর চারপাশের বাউণ্ডারি ওয়ালের কাছ থেকে বিভিন্ন কোণে আমাদের ক্যামেরার ক্লিক-ক্লিক শব্দ মিশে যাচ্ছে বাতাসে। প্রবেশ প্রস্থানের একটাই দরজা প্রাচীন কারিগরি ও কারুকার্যের নমুনা পেশ করছে লেন্সের সামনে। এবারে সেই রাস্তা বরাবর এগিয়ে যাচ্ছি, একপাশে সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে এক জলধারা, না নদী নয়, নর্দমাও  নয়, ঝরনা বেয়ে নেমে আসা জলধারাকে চাষের কাজে লাগানোর নালা। দুপাশে একটু উঁচুর চাষজমিতে তখন ছোট্ট ছোট্ট এক-পাতা দু-পাতার সবুজ চারাগাছ। মখমল বিছানো এই সুদূরে এবড়ো-খেবড়োয় আর ভঙ্গিলে। আমরা সামনে হেঁটে গেলাম অনেকটা। হাঁটতে ভালো লাগছিলো। সামান্য ঠান্ডা, রোদ আর সবুজে। উপভোগ করছিলাম খুব। হঠাৎই ধীমানের মোবাইল কানে কানে উচ্চারণ করলো সমীরদার (কবি, গল্পকার, প্রবন্ধকার সমীর রায়চৌধুরী) মৃত্যু সংবাদ। মুহূর্তে হু হু করে উঠলো বাতাস। স্মৃতি এলো পায়ে পায়ে। বেরোনের ক’দিন আগে শরীরটা খারাপ খবরে আমি আর ধীমান গিয়েছিলাম তাঁর বাঁশদ্রোণির বাড়িতে। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম সেখানে, গল্পে। অন্যদিনের তুলনায় কথা বলেছিলেন অনেক কম। তারও কদিন আগে টেলিফোন করেছিলেন আমায়। আমার ‘আলোর হাঁসুয়া’ কবিতার বইটি নিয়ে বলেছিলেন বেশ কিছু কথা। সূর্যটা যেন মেঘের আড়াল নিলো। মনে মনে প্রণাম জানালাম তাঁকে। তাঁর শবযাত্রায় আর থাকা হলো না আমাদের। তাঁকে নিয়েই দু-চার কথা বলতে বলতে ফিরতে লাগলাম, সামনে প্রনবদা, আমরা পেছেনে। ফেরার পথে মাঠে কাজ করা এক চাষির কাছে জানতে চাইলাম চাষ করা চারাগাছের নাম। জানালোও সে। আজ লিখতে গিয়ে দেখলাম ভুলে গেছি। নোটহীন ভ্রমণ তো! চালচুলো অনেক সময়ই ঠিক থাকে না। শুধু দু-চোখ ভরে দেখে যাওয়া, দেখে নেওয়াতেই তার আনন্দ। একটা দোকান কাম বাড়ির ফ্ল্যাট-ছাতে উঠে, বেশ জোরে বইতে থাকা বাতাসের মধ্যে চা-কফি পান আমাদের। আর আলসে ভরা বসে থাকা। তুচ্ছ আর সব। মৃত্যুও যেন গভীর ক্ষত সৃষ্টিতে অপারগ। জুগনু আর প্রনবদার তাড়ায় অবশ্য উঠতেই হলো। আজ নাকি আমাদের অনেকটা ট্র্যাভেল করতে হবে।

চলবে...

About Author
&
Photographer

লেখক : উমাপদ কর

৮০-র দশকের কবি ও গদ্যকার।

কাব্যগ্রন্থ : ঋতুপর্বের নাচ, কয়েক আলোকবর্ষ দূরে, পরিযায়ী চলো, ভাঙা পিয়ানোর পা ,অপর বসন্ত, ধনুক কথায় স্বর, নদীতে সায়ং ভেসে যায়, আলোর হাঁসুয়া, বালুমানুষের ঝুনঝুনাৎ, নৈর্ঋতে বিষুবে, নামিয়ে রাখা চোখ, আনারকলির তানপুরা, শিরোনামহীন পুতুল , নিমিখ, অগঠিত জিঞ্জির, কবিতাসংগ্রহ- ১ ও ২ ।
SUGARFREE MAILBOX (Collections of Translated Poems/ Flying Turtle, 2022)।

গদ্যগ্রন্থ : রিলেদৌড়ের অনিঃশেষ, রবীন্দ্রকবিতাঃ আজকের উঠোনে,  আবহমান পাঠঃ তেরো আকাশ, ভিন্নপথঃ নয় আকাশ।

আলোকচিত্রী: উমাপদ কর

৮০-র দশকের কবি ও গদ্যকার।

কাব্যগ্রন্থ : ঋতুপর্বের নাচ, কয়েক আলোকবর্ষ দূরে, পরিযায়ী চলো, ভাঙা পিয়ানোর পা ,অপর বসন্ত, ধনুক কথায় স্বর, নদীতে সায়ং ভেসে যায়, আলোর হাঁসুয়া, বালুমানুষের ঝুনঝুনাৎ, নৈর্ঋতে বিষুবে, নামিয়ে রাখা চোখ, আনারকলির তানপুরা, শিরোনামহীন পুতুল , নিমিখ, অগঠিত জিঞ্জির, কবিতাসংগ্রহ- ১ ও ২ ।
SUGARFREE MAILBOX (Collections of Translated Poems/ Flying Turtle, 2022)।

গদ্যগ্রন্থ : রিলেদৌড়ের অনিঃশেষ, রবীন্দ্রকবিতাঃ আজকের উঠোনে,  আবহমান পাঠঃ তেরো আকাশ, ভিন্নপথঃ নয় আকাশ।

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget