সাগর থেকে বকখালি

চাইলেই কি আর যাওয়া যায়। মহাশূন্যের যাবতীয় দূরত্ব তোমায় ডাকবে, তবেই না যেতে পারবে। একা বসে আছো বারান্দায়, বাঁশি কিংবা গড়িয়ে যাওয়া ছোট্ট নুড়ি হয়তো তোমায় ডেকে নিয়ে গেলো। যাওয়া যায় অনেক ভাবেই। মনে মনে সময় ভ্রমণ করে দশ বিশ বছর পিছিয়ে কোনো এক শহরে ঘুরে বেড়াতে পারো। কিংবা সামনের দিকে এগিয়ে বারান্দায় বসে সমুদ্রের মুখোমুখি। আর তুমি নির্দিষ্ট কোথাও যাবে বলে বেড়িয়ে, অন্য কোথাও পৌঁছে যাবে কি না তাও জানো না।
২০২১সাল, অষ্টমীর দিন আড্ডা মারতে মারতে হঠাৎ ঠিক হলো। আমরা একটা গাড়ি নিয়ে বকখালি যাবো। দশমীর দিন সকালে চড়ে বসা হলো ইনোভায়। মোট পাঁচজন। ঠিক হলো ডায়মন্ডহারবারে কিছুক্ষণ থেমে, চা খেয়ে, সমুদ্র দেখে চলে যাবো বকখালি। সেরকমই হলো। বেশিক্ষণ থাকিনি ডায়মন্ডহারবারে, সূর্যের তেজ ভালোই ছিল। বকখালি যেতে যেতে একটা ঘটনা মনে ভেসে আসছিল। প্রথমবার যখন পরিবার নিয়ে গেছিলাম, সেই ঘটনা। ধর্মতলা থেকে বাসের টিকিট কাটা ছিল নামখানা পর্যন্ত। সরকারী বাস। সকাল ৭-১৫য়। ধর্মতলা পৌঁছে শুনি বাস যাবে না। সরকারী – বেসরকারী কোনও বাসই। কাকদ্বীপ বনধ, কোনো এক রাজনৈতিক নেতা খুন হয়েছেন। আমাদের মাথায় হাত।
এসব শুনে তখনই মনে মনে ঠিক করেছিলাম, বাড়ি ফিরব না-কোথাও একটা ঠিক যাবোই। আরো কেউ কেউ যাবেন বলে এসেছিলেন, ক্রমে তাদের ভিড় পাতলা হয়ে এলো। ভাবছি কি করা? এসময়ে নজরে পড়লো দুজোড়া স্বামী-স্ত্রীর উপর। সঙ্গে দুটি ছোট ছোট মেয়ে। তাঁরাও যাবেন বলে এসেছেন। কিন্তু বিধি বাম। দুই বন্ধু। তাঁদের মধ্যে একজন দেখি বারবার কাউকে ফোন করছেন কিন্তু লাগছে না। পাবলিক বুথ থেকে, তখন সেটাই ছিল একমাত্র ভরসা। আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে জানলাম, দুদিন পরে ওনাদের বুকিং আছে ভারত সেবাশ্রম সংঘ-গঙ্গাসাগরে। বকখালি থেকে সেখানে যাওয়ার কথা। কিন্তু কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। অন্য কোথাও যাবেন, সে ভরসাও পাচ্ছেন না।
তখন সকাল সাতটা কুড়ি। আমি ওনাদের প্রস্তাব দিলাম, চলুন গঙ্গাসাগর চলে যাই। থাকার জায়গা না পেলে ফিরে আসবো অথবা কাকদ্বীপ চলে যাবো। ওনারা এক কথায় রাজি। একটু পাশ থেকেই সাড়ে সাতটায় লট নং ৮এর বাস ছাড়বে ৭:৩০এ। বাস দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই গিয়ে উঠে পড়লাম। বসার জায়গাও পেয়ে গেলাম। ৭:৪০ নাগাদ বাস ছাড়লো। বাসেই টিকিট কেটে পৌঁছে গেলাম লট নং ৮। এটাই গঙ্গাসাগর যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। ধর্মতলা থেকে SBSTC-র বাসে সোজা ৮ নং লটে পৌঁছে ভেসেলের টিকিট কেটে নেওয়া। CSTC এবং ভূতল পরিবহনেরও বাস ছাড়ছে। তিন ঘন্টার পথ। প্রাইভেট বাসও আছে। জায়গাটার পুরো নাম হারউড পয়েন্ট লট নাম্বার ৮ এর জেটিঘাট। এছাড়া নামখানা ও কাকদ্বীপ থেকে লোকাল বাসও আছে।
ওখানে নেমে প্রথম কাজ ভেসেলের টিকিট কেটে নেওয়া। সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভেসেল পাওয়া যায়। ভেসেলে উল্টোদিকে কচুবেরিয়ায় পৌঁছে বাস, ট্রেকার কিংবা গাড়ি ধরে সোজা সাগরে। তবে গঙ্গাসাগর মেলা যখন হয়, তখন আরো বিভিন্নভাবে এখানে আসা যায়। রেলে কাকদ্বীপ পৌঁছেও বহু মানুষ এখানে আসেন। পয়সারও সাশ্রয় হয়।
তো ভেসেলে কচুবেড়িয়া পৌছে ট্রেকার ধরে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম সাগরে, ভারতসেবাশ্রমের পাশেই। থাকার জায়গা বলতে মূলত ভারত সেবাশ্রমের অতিথি সালা মূল রাস্তার ডানদিকে। এছাড়া কিছু সরকারী বাংলো এবং আশ্রম বা ধর্মশালাও আছে। ভারত সেবাশ্রমে ১০০-র ওপরে ঘর থাকায় সাধারণ সময়ে যাত্রীদের থাকার বিশেষ সমস্যা হয় না। ভারত সেবাশ্রমে গিয়ে আমরা আবেদন করা মাত্র মহারাজ আমাদের তিনটে এটাচড বাথ ঘরের বন্দোবস্ত করে দিলেন। দুপুর এবং রাতের খাওয়া আশ্রমেই। আশ্রমের ডানদিকে রাস্তা ধরে একটু এগোলেই সমুদ্র এবং তার ডানদিকে গঙ্গাসাগরের কপিলমুনির মন্দির। তো আমরা বেরিয়ে পড়লাম, ঘরে মালপত্র রেখে, সমুদ্র এবং মন্দির দর্শনে।
ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবলেই, মনে মনে বেরিয়ে পড়া। তখন তোমার হাতে রুমালও থাকতে পারে আবার আকাশও থাকতে পারে। কাল যে অন্ধকার আয়নায় মুখ দেখছিল, সকালবেলায় সে হয়তো অনেক আলো হয়ে দরজা খুলে দিলো প্রতিবেশীকে। বকখালি আর সাগর আমাদের সঙ্গে একটু লুকোচুরি খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের তো স্বপ্ন ছিলো, দু-চারটে নিরিবিলি ছিল। চশমা মুছতে মুছতে ছিল শুধু রওয়ানা দেওয়ার অপেক্ষা।
পরদিন সকালবেলা সবাই কচুবেড়িয়া থেকে ভেসেল ধরে পৌঁছে গেলাম ৮নং লটে। কাউকে ছাড়তে আসা একটা বড় গাড়ি ধরে সবাই পৌঁছে গেলাম নামখানা। সেখান থেকে নৌকা ধরে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পেরিয়ে উল্টো প্রান্তে। তখন নৌকায় না হলে বার্জে, নদী পেরিয়ে বকখালি যেতে হতো।
এখন নদীর উপর সেতু হয়ে গেছে। গাড়ি বাস সমস্ত সোজা বকখালি চলে যাচ্ছে। ভ্রমণ অনেক মসৃণ হয়ে গেছে, তবে সাথে সাথে রোমাঞ্চও কমে গেছে।
একটা ট্রেকার ধরে আমরা সবাই পৌঁছোলাম বকখালি। আগে থেকে বুকিং করা ছিল বলে আমরা উঠেছিলাম বে ভিউ টুরিস্ট লজে। ওনারা কোথায় উঠেছিলেন এখন আর মনে নেই। সবচেয়ে ভালো থাকার জায়গা হল WBTDC-র টুরিস্ট লজ। এছাড়াও অজস্র হোটেল আছে বকখালিতে, সাহানা, বলাকা, অমরাবতী, রাজবালা, নারায়ণী, মা কালী, সি ভিউ ইত্যাদি। এছাড়া একটু দূরেই ডলফিন, কুমুদিনী, রুদ্রানী, বালুচরী, সুধাময়ী ইত্যাদি অনেক হোটেল। বাসস্ট্যান্ডে খাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটা হোটেল আছে। আর চায়ের দোকান প্রচুর। তবে হোটেলের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ওখানে শীতকালে সৈকত উৎসব এবং মার্চ – এপ্রিল মাসে বকখালি কবিতা উৎসব হতো। কবি সৌমিত বসুর আমন্ত্রণে ৫-৬ বার সেই উৎসবে গেছি। তারপর করোনা সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল।
এখনকার সমুদ্রের স্নান করে বিশেষ মজা নেই। জলের ঢেউ ছোট ছোট তার উপর কয়েক বছর আগে তীব্র ঘূর্ণিঝড় মোকা বকখালিতে আছড়ে পড়ে সব তছনছ করে দিয়েছিল। তট থেকে বালি উড়িয়ে সমুদ্র তীরের একটু দূরেই আরেকটা চরের সৃষ্টি হয়েছে। আজকাল অধিকাংশই জল ভেঙে সেই চর পেরিয়ে স্নান করতে যান। এখান থেকে ঘুরতে ফ্রেজারগঞ্জ, হেনরি আইল্যান্ড এবং জম্বুদ্বীপ যাওয়া যেতে পারে।
সমুদ্রে তো অনেকেই। আলো নামার অজুহাতগুলো নিয়ে আমি তো বারবার। তখন অধিকাংশেরই আর মুখোশ থাকে না। থাকে না মাথার ভিতরে কোনও সীমানা কিংবা বাড়ি। দুঃখ একটাই সমুদ্রে নেমে গামছা বা তোয়ালে হারিয়েছি। হয়তো আপনিও। কিন্তু কোনওবারই জলদেবতা উঠে এসে তা ফেরত দেন নি।আপনি কি কিছু ফেরত পেয়েছেন? উনি কিন্তু কুঠার ফেরিয়ে দিয়েছিলেন।














Comments