ভূতলস্বর্গের কানাচ আর মরুপাহাড়ের আলসে থেকে

৩.
কারছাম হয়ে রেকংপিও। রাস্তাটা খুব সুন্দর। কী, বোঝানো গেল না তো? কিছুই না। এভাবে ঠিক বোঝানো যায়ও না। এন-এইচ ২২। হিন্দুস্থান-টিবেট রোড নামেও পরিচিত। ঢাল যেদিকে খাদ পর্যন্ত সেদিকে দেওদার সবুজ, কিছুটা কালচে। আরও সব নাম-না-জানা সবুজ। নীচে ‘সাতলেজ’ নদী চলন। ধীমান অন্তত এরই মধ্যে দুবার বলে ফেলল—কেন রে ‘শতদ্রু’ বলতে পারিস না? বলতে তো পারিই। কিন্তু এখানে এসে ওই কালচে ধূসর জলধারা দেখে স্থানীয় মানুষের মত সাতলেজ বলতেই ভালো লাগছে যেন। ব্যাখ্যাহীন। বিপরীতে শক্ত পাথরের খাড়া পাহাড়। মাঝে-মধ্যেই যার শরীর কেটে রাস্তা গড়া। গাড়ি চলছে, আর কাটা পাহাড়ের আঁকা-বাঁকায় বিচিত্র সব কল্পমূর্তি। কয়েক জায়গায় ছোট সুড়ঙ্গ পথ। দু-একবার দাঁড়াতেও হলো। রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে। কাজ চলছে ভারি মেশিনে। পাহাড় ভাঙা, পাথর সরানো ইত্যাদি। একবার যেখানে দাঁড়াতে হলো, গাড়ি থেকেই কিছুটা দূরে লক্ষ্য করলাম, পাহাড় কাটা পড়ায় সামান্য এক সুড়ঙ্গ। আর সুড়ঙ্গমুখে খাদের দিকে পাথরের খিলানের ওপর যেন এক ঘোড়ার মুখ এসে মিশেছে। ভাস্কর্য। তেজি ঘোড়ার মুখ, কিন্তু কিছুটা বিমর্ষ। ক্লিক, ক্যামেরা। উল্লসিত হতেই হলো।
ঝকঝকে দিন। শহর রেকংপিও। কেউ আর এতবড় বলে না। শুধুই পিও। জেলা সদর। মানুষজন, গাড়ি-মিছিল, দোকান-পাট, অফিস-কাছারি, একটা চলমানতা। শহরের একদম হৃদয়ে আমরা নামলাম। টুকিটাকি দরকার। সামনে তাকালে সব ছাড়িয়ে চোখ চলে যাওয়া গিয়ে ঠেকল গিরিশৃঙ্গ ‘কিন্নর কৈলাশ’-এর গায়। একদম খাড়াই যেন। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। ভাঙা ভাঙা বরফে রজত উজ্জ্বল। তখন দুপুর। তাকিয়ে থাকলে সাদা-কালোর বৈপরীত্যে আর উজ্জ্বলতায় চোখ ধাঁধায়ও। বেশিক্ষণ দাঁড়ালাম না আমরা। গাড়ি ধরলো কল্পার পথ। ১৪ কিঃমিঃ।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে প্রায় ২৭০ ডিগ্রি খোলা। বিভিন্ন আকৃতি আর উচ্চতার পাহাড়ি রেঞ্জ। উচ্চতা অনুসারে বরফ সমাচার। গায়ে সামান্য সামান্য মেঘ চরতে এসেছে, বা মুছিয়ে দিচ্ছে রোদ। পাহাড়ের পেছন থেকেই নীল একদম মাথার ওপর পর্যন্ত। সূর্যটা আড়ালে। ঝলক দৃশ্যের পর এখন চোখজোড়া ‘কিন্নর কৈলাশ’-এ। প্রনব দা চিনিয়ে দিচ্ছে—এই দ্যাখ, বাঁ-দিকে খাঁজে খাঁজে নামতে নামতে ওই ‘শিব-লিঙ’। আর ডানে ওই দেখ অনেকটা এলিয়ে থাকার পর উঁচু চূড়ার পাহাড়টা ‘জোরকানদেন’। ঝলমলে, কিছুটা ধাঁধানোও, তবুও তাকিয়ে থাকতে থাকতে কি যেন কেন, সিগারেট ইচ্ছে। ধীমান আমি হাফ হাফ। ফুরোতে না ফুরোতেই প্রনবদা আবার—‘নে এবারে স্নান, খাওয়া, বিশ্রাম। সন্ধ্যায় দেখবি খেল-খিলাড়ি। যদি অবশ্য ডানদিকের মেঘটা না জ্বালায়।’
সত্যিই মেঘটা ঝামেলা করলো কিছুটা। আড়াল করলো। তবে সবটা নয়। আড়ালের ফাঁক গলে ‘অস্তরাগ’ চলকে পড়লো ‘কৈলাশ’ চূড়ায়। নিমেষে তামাটে বর্ণ ধারণ করলো তার উষ্ণীষ। ‘শিব-লিঙ’-এর লিঙ্গে কিন্তু তার রেশ পড়লো না। ‘জোরকানদেন’-এর চূড়ার অনেকটা অংশেও কেউ যেন ধাতব তামা গলিয়ে ঢেলে দিয়েছে। মেঘ ছাড়ানো নীলাকাশের তলায় এই উজ্জ্বল যে বৈপরীত্যের সৃষ্টি করেছে কে তাকে বর্ণনায় আনবে? ‘অস্তরাগ’ কথাটা কত দিন ধরেই না শুনে আসছি। সে রাগ আগেও বহুবার দেখেছি সমুদ্রে আর বালুতটে, দেখেছি পাহাড়ে পাহাড়ে। কিন্তু এমন ‘রাগ’টি অধরাই ছিল এতোদিন। গোটাটা খোলেনি, তাতেই এই। খুললে না জানি পুলক মাত্রা ছুঁয়ে দিত কোন পারা! সন্তুষ্ট থাকতে হলো। ওই যে আগেই বলেছি, এই-ই প্রকৃতির বিচিত্র খেলা। অপার-এর পর লীলা শব্দটিও বসানো যায়। বিস্ময় যেখানে মাথা খোঁড়ে, আর দেখার স্তব্ধতা যেখানে আসন-পিঁড়ি পেতে রাখে। নীচে ছায়ার অন্ধকার, ওপরে সোনালি তামার আস্তরণ। এখান থেকে কিন্নর-কৈলাশ (৬০৫০ মিঃ) দেখার মাত্রাটাই আলাদা। বাদ যান না দাদা জোরকানদেন (৬৪৭৩ মিঃ)। একই ফ্রেমে। চোখ ঘোরালেই। আশ্বাস দিলো প্রনবদা। আগামীকালের সন্ধ্যেটাও আমরা এখানেই থাকবো। প্রনবদার বন্ধুর হোটেল। ‘কৈলাশ ভিউ হোটেল’। মূল রাস্তা থেকে আপেল বাগান চেরা পথে সামান্য হেঁটে উঠতে হয়। ব্যালকনিটা মনোরম বললে কম বলা হয়। পূবের জানালা খুললেও পাহাড়। দক্ষিণেও। হঠাৎই জানতে বড় ইচ্ছে করলো, আচ্ছা ওরা দাঁড়িয়ে, না বসে, না শুয়ে? ওরা মানে পাহাড়েরা। ক্রমে আত্মীয় হয়ে উঠছে। আমাদের বিশ্রামপর্বে ওরাও কি বিশ্রামে?
বিকেলেই ঘুরে এসেছিলাম ‘বিষ্ণু নারায়ণ নাগিন মন্দির’। অপরূপ তার কাঠের কারুকাজ। গড়ন গঠন এদিককার মন্দিরগুলোর মতই। কিন্তু তার শরীরে মানুষের বছরের পর বছরের নির্মাণ-শ্রম আর সৃষ্টির তাগিদ। সিং দরজা, মন্দিরের গা, চাতালের ঘর-দুয়ার, বা সামনের ফোয়ারা-স্থানের আশেপাশে সবই প্রায় সোনালি-হলুদ আর পোড়া-ইট-লাল রঙের পালিশে ঝলমল করছে। দেবী-মুখ, ড্রাগনের মুখ, সাপের শরীর, লতাপাতা, কল্কা, বরফি সবই খোদাই-কাঠে প্রাণ পেয়েছে। এই সমস্ত কথা-বলা খোদাই-কাঠের ছবি উঠলো অনেক। প্রত্যেকের ক্যামেরা যখন ভীষণ বেগে ছুটছে, তখনই পোজ দিয়ে আমাদের দুজনের ছবি তুলে নিল প্রনবদার ক্যামেরা। একা একা আবার দোকা দোকাও। মানুষটা মানুষেরও ছবি তোলে। আহা, মানুষ ছাড়া সবকিছুই তো তুচ্ছ।
বুঝতে পারছিলাম পরিবেশটা কবিতার দিকে এগুবে। কখন প্রনবদা বলে উঠবে, ‘নে ধীমান কবিতা পড়’। কিন্তু হলো না। দরজায় করাঘাত। প্রনবদার বন্ধু কাম হোটেলের মালিক নিজেই চলে এসেছেন আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। গরম কাপড়ে বেশ মুড়ে জড়িয়ে। একটা জিনিস খেয়াল করছি, স্থানীয়রা শীত সম্পর্কে বেশ সচেতন। আমরা অনেক সময়েই যেমন পোষাক-আষাকে ঢিলেঢালা ক্যাসুয়াল, ওরা তেমনই সতর্ক, যথাযথ। এ ক’দিনে ধীমান তো আমাকে বার বার দেখিয়েছে—‘ওই দ্যাখ, ফুলহাতা সোয়েটার। দ্যাখ, দ্যাখ ভারি জ্যাকেট, মাফলার।’ আর কিন্নরে টুপি তো কমন। তো আড্ডাই চললো। হিমাচল, আপেল, অন্যান্য চাষ, বেচাকেনা, হোটেল, দর্শনার্থী, এবারের ওয়েদার, কর্মসংস্থান, নেশা, বাঙালী পর্যটক, বাঙালী হোটেল-মালিক কাম ইজারা নেওয়া, আর অবশ্যই আমাদের কাল সকালের এদিক-ওদিক ঘুরতে যাওয়া।
ভোরগুলো পাখির ডাকেই ঘুম ভাঙাচ্ছে আজকাল। চেনা নয় এইসব ডাক। জানালার পর্দা সরিয়ে একবার দেখে নিয়েই প্রনব দা— ‘ওরে, উঠে বাইরে আয়। আগুনের আভা দেখবি।’ ক্যামেরা নিয়ে ছুট লাগালো সে। আমরাও। একটু ঢেকেঢুকে। কালো কুচকুচে পাহাড়ি রেঞ্জের রেখা আর তার গা পিছলে আসা লাল আভা। খাড়াই এর পাশ ঘেঁষে ছুটে আসছে রশ্মিমালা। এই কি সপ্তাশ্ববাহিত রথের দড়িগুলো? ‘অচেনা কে ভয় কি আমার ওরে?’। ভয় নয়, স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া। ‘কৈলাশ’ ‘শিব-লিঙ’ ‘জোরকানদেন’ আরও নাম-না-জানার ভিন্ন রূপ, ভিন্ন পোষাক। যা আবার ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছেও। যেন সময় আর সজ্জার গ্রাফ। দেখতে দেখতে চূড়াগুলো হলদেটে হয়ে উঠল। ‘প্রথম আলোর চরণধ্বনি’ বেজে উঠল বরফাবৃতে। প্রথমে সর্বোচ্চে, পরে তার নীচেরগুলিতে। সন্ধ্যায় চোখে তারা ফোটার মতো। এক দুই তিন… অনেক…। এখন এখানেও তাই। অনেকগুলো চূড়ার ঢালে, যেখানে আলো এসে পড়তে পারে তা সোনালি হলুদ, আর তার পাশেই অধিকাংশটা সাদা-কালোর গ্যালারি। উজ্জ্বলতা তাই বড়ো উদ্গত, আর অঙ্গীকারপূর্ণ। এক সময় আলো আরও জোরালো হয়ে এইসব বিভাজন মুছে ফেললো। আমরা পেরিয়ে এসেছি ব্রাম্মমুহূর্ত। অতএব চা। বিদ্যুত-কেটলিতে বসিয়ে দিলাম তিন গ্লাস। ধীমান ‘তাজা’ দুটো লিফ এনে দোলাচ্ছে গরম জলে।
নির্ধারিত রোগি আর কোঠির উদ্দেশ্যে ছুটলো গাড়ি। রেকংপিও হয়ে। গ্যাইবং আর লান্জায় সরকারি গেস্ট-হাউসে থাকার পারমিট বের করতে হবে প্রনবদাকে। পিও থেকে প্রনবদা আমার জন্য কিন্নরি টুপি নিল স্থানীয় এক দোকান থেকে। মাথায় পরিয়ে দেখে নিলো বাহার খুলছে কিনা। ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে পারমিটও মিলে গেল, প্রনবদার পরিচিত একটি ছেলের চেষ্টায়। রোগি গ্রামটা বেশ ছোটই, কিন্তু পুরোনো জনপদ। দেখেই বোঝা গেল। মন্দিরটা অবশ্য ততটা ছোট নয়। শৈলী একই। শ্লেট পাথরে দো-চালা বা চার-চালা মন্দির। গায়ে কাঠের কাজ। কিছু বাড়ি দেখা গেল যার দেওয়াল তৈরী হয়েছে কাটা পাথরের চাঁই আর মোটা কাঠের পরপর সাজানোয়। খুব বেশি মানুষজন দেখা গেলো না রাস্তায়, সম্ভবত বেলা বেড়ে যাওয়ায়। গ্রামে বিদ্যুৎ রয়েছে। ঝোলানো টানা তারে দূরের পাহাড়ি রেঞ্জ আর নীলাকাশের ছবি ক্যামেরাবদ্ধ করতে অসুবিধা হচ্ছিলো প্রনবদা আর ধীমানের। তার বাঁচাতে তৎপর তারা। একটা তারের দাগ মাটি করে দিতে পারে নিসর্গ ছবির ভার্জিনিটি ও স্যাংটিটি। হাঁটতে হাঁটতে একসময় এক ঝোরার কাছে। শব্দ আর গতি। শীর্ণ, কিন্তু অঢেল প্রাণশক্তি। এরই সেচ-এ গ্রামের আশেপাশে চাষ। হয়ত পানীয় জলের নিবৃত্তিও এতেই। সামনের পাহাড়ের গায় একটা বুদ্ধ মনস্টারি। ছোট-খাটো। কিন্তু স্থান নির্বাচন অসাধারণ। যেন পাহাড়ের গালে একটা বিউটি জরুল হয়ে ঝুলে আছে। মনস্টারির ছাত কিন্তু ফ্ল্যাট। স্টাইলটাও আলাদা। ওখানে যাওয়া হলো না, অনেকটা উঁচু বলে। কিন্তু নানা ভঙ্গিতে ক্যামেরা লিখে নিলো নাম। বোঝা গেল, এলাকায় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষরা বাস করে পাশাপাশি। কোঠির মন্দিরের নাম চন্ডীমাতা মন্দির। বিষয়টা এমন নয় যে আমরা শুধু মন্দির দেখে বেড়াচ্ছি। বরং এটাই সত্যি যে গ্রামেই যাচ্ছি, স্কুল পোস্টাফিস ব্যাঙ্ক হাসপাতাল না থাকুক একটা সুদৃশ্য মন্দির অবশ্যই আছে। আর আছে নদী কিংবা ঝোরা। আছে আপেল বাগান আর চাষের মটরশুটি। এসব ছাড়িয়ে পাহাড়ের রেঞ্জ আর চূড়া আপনি দেখতে পাবেনই। যেমন কোঠি থেকেও দেখা যাচ্ছে ‘কিন্নর কৈলাশ’ আর ‘জোরকানদেন’। এখন ভিন্ন রূপ, অন্য মর্জি। কোঠি কল্পা থেকে মাত্রই এক কিলোমিটার। খুব পুরোনো আর বড় গ্রাম এটি। উইলো গাছে ভরা। এখানকার মন্দিরটা কি একটু হলেও আলাদা লাগলো? হতেও পারে। মাঝখানে এক চূড়া সমৃদ্ধ শ্লেট পাথরের দোচালা এসে মিশেছে একটু বড় চারচালায়। প্যাগোডা টাইপ। হতে পারে হিন্দু ও বৌদ্ধ নির্মিতির মিশ্রন। কিন্তু একই ভঙ্গির ও নির্মাণ কৌশলের মন্দির দেখে দেখেও চোখের নেশা আর মনের আশ মিটছে না। পেট কিন্তু তা বলছে না। তার উদ্বেগের কারণ দেখালো ঘড়ি, আর একটু বড় হয়ে যাওয়া ছায়া। হোটেলে ফেরা তাই অবধারিত হয়ে পড়লো।
আবার সন্ধ্যা নিচু হয়ে এলো ‘কৈলাশ ভিউ হোটেল’-এর এল-আকৃতির ব্যালকনিতে। ক্যামেরা প্রস্তুত। প্রস্তুত সামনের পাহাড়। সূর্য, আড়ালে। সেও প্রস্তুত নিশ্চয়ই। অস্তাচলে যাবেন। আচ্ছা, মেঘমালাও কি প্রস্তুত হয়েই আছেন, আমাদের অপ্রস্তুত করতে? সকালে দেখা নীলাকাশ মাঝেমাঝেই ছিন্ন কেন? ‘কিন্নর কৈলাশ’-এর গলা জড়িয়ে আছে ওকি সাপ না মেঘ? আর ‘শিব-লিঙ’-এর লিঙ্গটির দুধ ধোওয়া মাখন মাখন রূপটিও বা কেন ধূসর? ‘জোরকানদেন’ এর মধ্যে যেন কিছুটা স্পষ্ট, ব্যক্ত। গত সন্ধ্যার রিপ্লে হবে না তো? অনেকটা তাই ঘটলো। আমাদের উদ্বেগ আবেগ আর চোখ-জুড়োনোর অভীপ্সাকে পাস মার্ক না দিয়ে মেঘ বেশ কিছুটা আড়াল করেই দাঁড়ালো। পৃথিবী তার ঘূর্ণন বন্ধ করলো না। সূর্যকেও বলা গেল না—‘অস্ত যেয়ো না গো, মেঘটা সরুক।’ মহাভারতে অবশ্য জয়দ্রথ বধের সময় কিছুটা নাটক হয়েছিল। এখানে তেমন হলো না যেমন নিরাশও করলো না একদম। পাহাড়ের গায়ে কোথাও কোথাও সোনালি আলোর ঝলক, রং পাল্টে কখনও তা তামাটে লাল, আর পেছনের ক্যানভাসে কোথাও নীল, কোথাও দুধ-সাদা আবার কোথাও ধূসর বর্ণের মেঘ। সব মিলিয়ে সন্তোষজনক। কিন্তু প্রনবদা যাকে ‘খুলে যাওয়া’ বলে তেমন খুল্লাম-খুল্লা খুললো না। তবু আমি প্রীত, আমি সন্তুষ্ট। এরই মধ্যে ক্যামেরা বুকে রেখেছে অনেক আলো অনেক তাপ। আমাদের চিনিহীন চা মনে হয়েছে যথেষ্ট মিষ্টি। আর ধার্য সিগারেটের চেয়ে খাওয়া হয়েছে কিছুটা বেশি। রাতে কি খুলবে চেরি-ওয়াইনের কর্ক, আর কবিতার খাতা কিংবা বই? আজ খুলবে। প্রকৃতির খেয়ালে গোটাটা খুলে না-যাওয়া সন্ধ্যার পাগলপারা ‘কিন্নর কৈলাশ’-এর দোরগোড়ায় আমরা আজ খুলে যাবো পাগলপারা, এবং খুলে গিয়েছিলামও।
৪.
‘রারাং’ নামটা শুনলেই কেমন ঢাক বেজে ওঠে না? আমার উঠেছিল। পিও হয়ে আবার ইন্দো-টিবেটান রোড ধরে ৪৫ কিলোমিটার এলে তবেই রারাং। মাঝে ‘পাঙ্গি’ পেরিয়ে আসতে হয়। ছোট্ট জনপদ। কিন্তু খুব সাজানো, ছবির মতো। সবুজে ভরা। মাঠে চাষ হয়েছে মটরশুটি। এখন খাবার উপযুক্ত হয়েছে। গ্রামের রাস্তা প্রশস্ত নয়, কিন্তু বেশিরভাগই শান বাঁধানো। আমার হাঁটার গতিবেগ রীতিমত বেড়ে গেলো। হাঁটতে হাঁটতে মন্দির। তবে বেশি নীচে নামতে হয়নি। প্রায় সমতল, সামান্য উৎরাই। মন্দির খুবই ছোট, কিন্তু প্রবেশদ্বারে মন্দিরের গায়ে নানা রঙে আঁকা নক্সা আর মূর্তি-কল্পনা। কতদিনের পুরোনো বুঝতে পারিনি, রং এখনও বড় উজ্জ্বল। প্রনবদা নানা রকম কৌণিক অবস্থানে নিজেকে রেখে সে-সবের ছবি নিলো অনেক। সকাল দশটা হবে। রোদ তখনও ততটা চড়েনি। একটা মিঠি তাপ শীতল ভাঙছে। খুব ভালো লাগছিল হাঁটতে। দুপাশের নানারকম গাছপালা রাস্তায় ছাতার কাজ করছিলো। একটা আমেজে মজে যাওয়ার মতো। মন্দির পেরিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলেই নদী। নদী না, সম্ভবত ঝোরা। ধারা খুব দ্রুতগামী নয়, হয়তো এ জায়গাটা অনেকটা সমতলের মতো বলেই। ফেরার পথে জুগনু আর প্রনবদার অনেক পিছনে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। এক জায়গায় নতুন ঘর বানানোর তোড়জোড়ে কাজ করছিলো কুলি-কামিন। তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলছিলাম। পরিস্কার হিন্দি বলে ওরা। ভেবেছিলাম ভাষা অন্তরায় হবে। কিন্তু টুকিটাকিতে কিছুই অসুবিধা হলো না। এগিয়ে যেতেই দেখলাম চাষের কাজ করা লোকেদের সঙ্গে প্রনবদা দাঁড়িয়ে কথা বলছে। লোকটি একমুঠো সবুজ কচি মটরশুটি তুলে দিলো প্রনবদার হাতে। প্রনবদা আমাদের। খোসা ছাড়িয়ে দানা মুখে পুড়লাম। মিষ্টি, স্বাদু। এত মিষ্টি মটরশুটি আগে কোনওদিন খেয়েছি কিনা মনে করতে পারলাম না। কয়েকটা গাড়িতে বসে থাকা ধীমানের জন্য। সুগার পাশে রেখে সেও মিষ্টি ভোগ করলো মুখে। এ সমস্ত প্রত্যন্ত গ্রামের নাম প্রনবদার দেওয়া প্রোগ্রামেই প্রথম জানতে পারি। পরে সেই মোতাবেক আসার আগে ‘গুগুল’ সার্চে সামান্য তথ্য।
কিছুটা গিয়েই পথে পড়লো ‘জাংগি’ গ্রাম। এখানে আমরা নামলাম। কিন্তু গ্রামে ঢুকলাম না। রাস্তার ধারে একটা টি-স্টলে বসে চা-পান, সঙ্গে বিপরীত দিকে দুটো সুন্দর সুন্দর বাড়ির বারান্দা থেকে সুন্দরী মহিলাদের হাসিমুখের কথা বিনিময় বোঝা না-বোঝার উর্ধ্বে রেখে ঠারেঠোরে শুধুই দেখে যাওয়া। এরই মধ্যে ফেসবুকের মাধ্যমে বারীনদা প্রনবদার পোস্ট করা কোনও একটা জায়গার ছবি দেখে আর্জি পেশ করেছে ‘আমার জন্য একটা বাড়ি দেখ’। আমি আর ধীমান চায়ের পর সিগারেট খেতে খেতে আলোচনা করছিলাম, এই স্বর্গীয় পরিবেশে বারীনদার জন্য একটা বাড়ি হলে কেমন হয়! মনে হলো প্রনবদাও বেশ উত্তেজিত। ‘ঠিকই বলেছিস, এই সেই আদর্শ জায়গা’। কিন্তু বাড়ি খুঁজে বেড়ানোর বদলে আমাদের গাড়িতে গিয়ে উঠতে হলো। বারীনদার জন্য স্বপ্ন-বাড়িটা আমরা ঠিক করে যেতে পারলাম না। কোথাও থিতু হয়ে বসা নয়। এ ক’দিন বসা-শোয়ার চেয়ে পথেই চলেছি বেশি। পথই এখন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। হয়ত কোনওদিনই আর দেখতে পাবো না এমন মহিলাদের একটু হেসে টা-টা করতে ইচ্ছে করছিলো খুব ওদের হাসিমুখ দেখে। কিন্তু নিজেকে নিবৃত্ত করাই শ্রেয় মনে হলো। এ যেন সেই অধিক বয়সে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ছাগল দেখে ধা করে ঢিল মারার বালসুলভ আচরণ হাসিয়া নিবৃত্ত করার মতোই। পার্থক্য শুধু হাসিটাতে, যা আমাকে চেপে যেতে হয়েছিলো। ‘জাংগি’ থেকে ‘লিপ্পা’ ১৪ কিলোমিটার। রাস্তা এখন যথেষ্টই ভালো। দুপাশ চোখ জুড়োনো। পাইনের পাশাপাশি এখন ‘চিলগোজ়া’-পাইন গাছও দেখা যাচ্ছে। প্রনবদা চিনিয়ে দিল। পাতার পার্থক্যটা বুঝলেই সহজেই চেনা যায় এই গাছ। বোঝা গেল একটা নির্দিষ্ট উচ্চতার নীচে এই গাছ দেখা যায় না। মোটামুটি ১৮০০ মিটার থেকে ৩৩৫০ মিটার সেই আশ্রয়স্থল। আবার এটাও ঠিক সেই উচ্চতায় ভারতের সব পাহাড়ে এই গাছ হয় না। হতেই পারে, এর জন্য চাই এখানকার মতো উপযুক্ত পরিবেশ। নর্থ-ওয়েস্ট হিমালয়, যেমন আফগানিস্তান, পাকিস্থান, কাশ্মিরের কিছু অংশ আর এই কিন্নৌর জেলায় এই গাছ দেখা যায়। গাছের ফল বাদাম জাতীয়, নাম চিলগোজা। এখন অফ-সিজন। গাছে ফল নেই, রাস্তায় পড়ে নেই এক দানাও, এমনকি ফুল আসারও সময় নয় এই মধ্য-জুন। প্রনবদার বর্ণনায় বুঝতে চেষ্টা করলাম এর আকৃতি, সংগ্রহ, আর ব্যবহার। পাতা লম্বা সূচের মতো। অলিভ গ্রিন। ফল সবুজ। সাইজে লম্বায় ১০ থেকে ১৮ সেঃমিঃ, ঘেরে ৯-১১ সেঃমিঃ। এর ভেতরেই থাকে দানা বা বীজ। সেগুলো একেকটা লম্বায় ১৭-২৩ মিঃমিঃ ঘেরে ৫-৭ মিঃমিঃ। অনেক দানা থাকে একেকটি ফলে। কিন্নৌর জেলার এটি একটি মূল্যবান ক্যাশ-ক্রপ। দাম কেজি প্রতি ১৮০০-২৪০০ টাকা। আর যেটি মূল্যবান তথ্য, তা হলো হিমাচল প্রদেশ সরকার নানা জায়গায় এই গাছের কৃত্রিম পুনর্জন্ম বা চাষের চেষ্টা করেছিলো, যা সফল হয়নি। প্রকৃতি তার খেয়ালেই চলেছে। প্রনবদা অনেক চেষ্টা করেও এই ফল বা দানা আমাদের দেখাতে পারেনি। আফশোস রয়ে গেল। পরে আমরা যা দেখেছি, তা দোকানে। গাছের জেল্লা তাতে ছিল না।
আফশোস মিটিয়ে দিলো ‘তাইতি’ নদী। তার প্রবল বেগ। বড় বড় বোল্ডারের ওপর আছড়ে পড়া জলধারা ভেঙে ওপরে উঠে পড়ছে। বিন্দু বিন্দু, সাদা। কিছুক্ষন গাড়ি চললো তার পাশ দিয়ে। জাংগি থেকে আমরা প্রায় ১৪ কিমি চলে এসেছি। এবারে একটা ব্রিজের কাছে এসে দাঁড়ালো গাড়ি। নেমে মোটামুটি প্রশস্ত আর শক্ত-পোক্ত ব্রিজটা পেরোলেই ‘লিপ্পা’ গ্রাম। ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আরেকবার ভালো করে লক্ষ্য করা গেল বেগে ধাবমান জলের ধারা। কোত্থেকে আসছে ঠিক জানিনা। কোথায় চলে যাচ্ছে জানিনা তাও। শুধু এই আমার সামনে দিয়ে চলে যাওয়াটাই আপাত সত্য। স্বাভাবিক এই আপাত সত্য তার মৌহূর্তিক প্রতিবেদন রাখলো আমাদের ক্যামেরায়। কিন্তু চোখ যা ধরতে পারে, ক্যামেরা তা পারেনা সবসময়। আবার চোখের দেখাটাও মন-ক্যামেরার নিগেটিভ বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। সেখানে একের পর এক প্রলেপ। এও তো ঠিক চোখের দেখার বিবৃতিতে হয়তো খুব সামান্যই বোঝানো যায় তার রূপ রং রস মাধুর্য আর উদ্ভাস। একটু এলিয়ে ছিলাম বোধহয়, প্রনবদার ডাকে হাঁটা লাগাতে হলো। ব্রিজ পেরিয়ে ডানে ঘুরে গ্রামের শুরু। কয়েকটা বাড়িঘর। খুব সামান্য দু-একটা দোকান, বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না সেখানে খাবার কী পাওয়া যেতে পারে। ঘুরে এসে আমাদের কোথাও একটা কিছু খেতে হবে যে। তবু হাঁটা। এবারে দু-পাশেই ঘরদোর। পরপর দুটো ‘হোম-স্টে’ দেখা গেলো। রাতেও তাহলে থাকা চলে এখানে। আমাদের প্ল্যান-এ অবশ্য রাত্রিবাস নেই এখানে। আরও বেশ খানিকটা এগিয়ে বাঁ-দিক ঘেঁষে চলে আমরা এক ঝোরার কাছে চলে এলাম। এখানে ঝোরাটার জলধারার বেগ খুব সামান্য। আসলে জায়গাটা প্রায় সমতল। আর একটা ধারা নয়। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকটা চওড়া জায়গায় বেশ কিছু ক্ষীণ জলধারা। যার প্রত্যেকটিই পেরিয়ে যাওয়া যায়। আমরা কয়েকটা পেরিয়ে একদম মাঝে এসে দাঁড়ালাম। প্রনবদা আর জুগনু তখন সব কটা পেরিয়ে বেশ কিছুটা ওপরে আর দূরে। চলেছে, এখানকার বুদ্ধ মনস্টারির দিকে। বেশ কিছুটা উঁচুতে। দেখা যাচ্ছে একাংশ। পা-কাতুরে আমরা দুজন ঝোরার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম প্রনবদার দূরে মিলিয়ে যাওয়া। খুব হাওয়া বইছিল। গ্রামের ভেতরে সিগারেট খাওয়া মানা। এখানে ঠিক হবে কিনা ভাবছিলাম দুজনেই। আসলে এটাও ঠিক আমরা এখনও পর্যন্ত কোনও গ্রামের ভেতরেই ধূমপান করিনি। যা করেছি পথে কোথাও, নয়ত হোটেলে বা হোম-স্টেতে। শেষে প্রায় পাঁচটা কাঠি মাঠে মারা দিয়ে একটা সিগারেটে আগুন, সামান্য ধোঁয়া, আড়ালের আপ্রাণ, হাফ-হাফ। এই ঝোরাটা সামান্য কিছুটা গিয়েই ‘তাইতি’ নদীতে মিশেছে। এখান থেকে অবশ্য মিলনস্থলটা দেখা যাচ্ছিলো না। পাশে দেখা যাচ্ছিলো একটা টিলা-পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা বুদ্ধ মনস্টারিটা। পতাকা উড়ছে। বাড়ির গায়ে মন্দিরের মতো দু-তিনটে। জানিনা এর ব্যাখ্যান। তবে শুনেছি বহু আগে থেকেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজম সেন্টার। ফিরলাম একসঙ্গে। একটা দোকান। জুগনু বললো খাবারের। ঢুকলাম। দেখলাম ক্যারমবোর্ড খেলা হচ্ছে সোৎসাহে। চার-পাঁচ জন। উৎসাহ এতটাই যে আমরা যে ঢুকেছি, তা যেন খেয়ালই করলো না কেউ। যা হোক, জুগনু আর এক গ্রামবাসির তাড়ায় যুবক খেলুড়েটি স্ট্রাইকারে দু-আঙুলের চাপ রেখে নিশানা ঠিক করতে করতে আমাদের সাসপেন্সে রেখে স্ট্রাইকার মারা শেষ হয়ে গেলে জানালো কিছুই পাওয়া যাবে না, এক ম্যাগি ছাড়া। সাড়ে বারোটা, ঘড়ি বলছে। আমরা বললাম ওতেই সই। খুব খুশি হলো না মনে হচ্ছে যুবকটি। খেলা ছাড়ার বেদনা ব্যবসার লাভ-ক্ষতিকে কতটা টলাতে পারে তা নিয়ে আমার সংশয় ও বিস্ময় রয়েই গেলো। অগত্যা ঝোলঝোলে ম্যাগি, ঝালাক্রান্ত, এবং অমৃত। জমে গেলো বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী। ক্যারম তখন বন্ধ। গল্প চালু। কিরকম পর্যটক এখানে আসে, প্রধান চাষ কী, শীতে কী অবস্থা হয় এ অঞ্চলের, লেখাপড়ার ব্যবস্থা কী ইত্যাদি। আমার ঝাল লাগাটা সবসময়ই একটু বেশি বেশি। তাই লাগছিলো, কিন্তু উদরপূর্তির বিষয়টাই প্রাধান্য পাচ্ছিলো বেশি। তাই সামান্য উঃ আঃ নিয়ে শুনছিলাম উত্তরগুলো। পর্যটকের সংখ্যা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও, ‘চিলগোজা’ আর মটরশুটি চাষ নিয়ে গ্রামবাসীদের মনে আর কথায় কোনও সংশয়ই ছিলো না যে তারাই কিন্নৌরে শ্রেষ্ঠ। কোয়ালিটিতে আর পরিমানেও। পর্যটক যে কম আসে তা তো বোঝাই যায় খাবারের দোকানে ক্যারম খেলায়, কিন্তু বিদ্যালয় আছে গ্রামেই। কিছুদিন আগে এখান থেকে কোনও ছেলে আই-এ-এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছে। আর শীতে মনস্টারির কয়েকজন ছাড়া গ্রামের অধিকাংশই নেমে যায় নীচে। আমাদেরও উঠতে হলো। রাতে যেখানে যাবো সেখানে থাকার আস্তানা যোগাড় করতে হবে।
পথে পড়লো কিরণঘাট। নদীর সঙ্গে নদী মিলন। না কোনও ঝোরার! মূল নদীতো সাতলেজ, কিন্তু যে এসে মিশছে? না, নাম মনে নেই। সমতলে নদীর সাগরে পড়া, ছোট নদীর বড় নদীতে মেশা এসব দেখেছি। কিন্তু পাহাড়ে যেটা বেশি চোখে পড়ে তা হলো স্বল্প দৈর্ঘের ঝোরার নদীতে মিশে যাওয়া। হয়ত সামান্য ওপরে উৎপত্তিস্থল, এসে মিশেছে কিছুটা নীচে। আবার বড় ঝোরাও আছে। যার দৈর্ঘ বেশি, প্রস্থেও কিছুটা বড় আর গতিতে দড়। খুবই মনোরম দৃশ্য। ব্রিজের ওপর থেকে দেখা এই মিলনস্থলটি কোথায় যেন স্বপ্নে দেখা। ক্লান্তি দূর করে দেয়। এর ধ্বনির দ্যোতনায় ধরা পড়ে মিলনাকাঙ্খার স্ফুট গান। গান এসে পড়ে দেখার মধ্যে। তখন জানি কি জানি না বড় কথা হয়ে থাকতে পারে না। আধা ঠিক আধা ভুল সুরেই গাওয়া হয়ে যায়—‘আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে… ’। স্পিলো তে এসে থামা গেলো। গঞ্জ মতো জায়গা। ছোট্ট। এন-এইচ-২২ এর এপার ওপার জুড়ে। যেমনটা অন্যান্য জায়গায় হয়েছে, এখানেও তাই। প্রনবদা আগে গিয়ে দেখেশুনে ঠিক করে আসে। আমরা পরে মালপত্র সমেত শুধু ঢুকে পড়ি, আর অবাক হয়ে দেখি আমাদের চাহিদা মতো ঘরখানা প্রস্তুত। বাঁকানো ঘূর্ণি পথে অনেকটা চড়াই বেয়ে স্পিলোর থাকার জায়গা। ঘরের সামনে টানা বারান্দা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনে রাস্তা। রাস্তার ওপারে এক পঙক্তিতে কিছু বাড়িঘর। মূলত দোকানপাট। তারপরেই নদী। বইছে। নদীর গায়ে ওপারে খাড়াই পাহাড়। আবার কোথাও ধ্বসে ঝুরো মাটি পাথরের নেমে আসার চিহ্ন। বেশ দূরে গিরিচূড়াদের কবি সম্মেলন। সম্মোহিত হয়ে পড়তে হয়। জামাকাপড় পাল্টানোর চেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয়। কিন্তু চেয়ার ছেড়ে উঠতেই হয়, এক রাউন্ড চায়ের পর। খানিকটা ফ্রেশ হতেই পেট বলে—‘যাবোই আমি যাবো’। আমরাও চলি। ধীর পায়ে নেমে রাস্তা ধরে রেস্তোরায়। মেনু চার্ট। মূলত ধীমানের দপ্তর। খাওয়ায় একঘেয়েমি কাটানোর বহু চেষ্টাই ধীমান করে। কিন্তু কাটে কি? স্থানীয়রা বলে ‘সাপিলো’। আমাদের বলতে দোষ কোথায়! প্রনবদা ওটা বলতেই ইন্সপায়ার করছে। ইত্যাদি সুতরাং। আড্ডা, আর আড্ডা। তিনজনে। হাসি, খুনসুটি। খুব কম হলেও কিছু পি-এন-পি-সি। সময় যে কোথায় গুজরান হয়ে যায়! রাতের খাবারের পর ক্লান্তি এলেও কিছু অমিমাংসিত কথা আবার উঠে পড়ে। শেষে ঘুম মিমাংসার কাজটুকু সারে। এভাবেই চলছে ক’দিন। সকাল সকাল উঠে পড়া। স্নান-দান সেরে স্বরচিত ব্রেকফাস্ট সপাটে সেরে (চিড়া, ছাতু, গুড়োদুধ, চিনি/সুগার-ফ্রি, ইত্যাদি গরমজলে মেখে) বা দোকানে মিললে শুকনো আলুপরোটা খেয়ে দিনের ভ্রমণসূচী ও দূরত্ব অনুসারে সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে বেরিয়ে পড়া। আর পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে নতুন ডেরায় উঠে পড়ার চেষ্টা। আগামী কাল দূরত্ব কম, কিন্তু স্পট বেশি। ধার্য হলো সাড়ে আটটা।
ক্যালেন্ডার ভুলে যাওয়ায় তারিখ বার জানতে হলো মোবাইল থেকে। আজ ২৫ জুন শনিবার। এরকমটা হয়। শুধু বয়সের কারণে নয়, ঘোরের কারণে। ঘোরার ঘোর। স্নান সেরে অকারণেই গাইছিলাম ‘আনন্দধারা বহিছে ভূবনে’। সুরে গাইতে না পারলেও দেখছিলাম ধীমানের চকচকে চোখ, চশমা যাকে আড়াল করতে শেখেনি। প্রনবদা গুনগুনায়। সে ক্ল্যাসিকাল। তালে চলতে চলতে গুনগুনানো সমে ফেলে। আর অদ্ভুত এক হাসি খেলে যায় ঠোঁট ছাড়িয়ে মুখমণ্ডলে। তখন সব কিছু তুচ্ছ মনে হয়। জীবনের অপার রহস্যের মধ্যে নিজেকেও কেন জানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রাতিতম মনে হয়। মানুষটা সেতার বাজাতো। শিখেছিল। কাল রাতেই শুনছিলাম তার ন্যাড়া-বাঁধার গল্প। তারপর ছেড়েও দেয় একসময়। ততদিনে হয়তো পাহাড়-প্রেম গ্রাস করেছে তাকে। একসময় সেই কন্ঠস্বর—‘চল। আজ ল্যাবরাং, কানাম, রাসকালান, শেষে রোপা ভ্যালির গ্যাবিয়ং। আর ওখানেই রাত কাটানো।’ আজ থেকে প্রায় ৩৪-৩৫ বছর আগে আমার কোনও একটি কবিতায় এমন একটা পঙক্তি ছিল—‘রুকস্যাক তোলো। চলো নীল-ডুংরি।’ সে কবিতা আজ সত্যি হয়ে উঠছে। সে কবিতায় গ্রুপলিডার ছিলো অচেনা অজানা এক কল্পচরিত্র। আজ পরিচিত, জানা, বাস্তব। সেদিনের পাহাড় আর চূড়ার নাম বদলে গেছে শুধু। কিন্তু এসব নাম তো বাপের জন্মেও শুনিনি। কিছুদিন আগে তালিকা প্রকাশের পর শুনেছিলাম। এবার দেখবো, শুনবো, হাঁটবো আর গায়ে মেখে নেবো মাটি-জল-বাতাস-তাপ। থ্রিল উপচে পড়ছে শরীরে মনে। থ্রিলাহত আমরা তুলে ফেলছি লটবহর, গাড়িতে।
‘সাপিলো’ থেকে কিছুটা পিছিয়ে এসে ‘ল্যাবরাং’ গ্রাম, একদম এন-এইচ ২২ এর গা ঘেঁষে। গাড়ি থেকে নেমে সামান্য হেঁটে গিয়ে ছোট্ট এই জনপদে মানুষজন খুব কমই দেখলাম। হতে পারে সকাল তখনও তেমন আড়মোড়া ভাঙেনি। এলোমেলো কিছুটা ঘুরে সেই বুদ্ধ মনস্টারির কাছে। বন্ধ তখন। অতএব বাইরে থেকে। কিছুটা অন্যরকম মনে হলো। সবকিছু ছাড়িয়ে খাড়া, তে-তলা বাড়ির সমান প্রায়। দৈর্ঘে-প্রস্থে সমান মনে হলো। ফলে আশেপাশের বাড়ি-ঘরের তুলনায় হঠাৎই যেন বেশি উঁচু এই চৌকোনো প্যাগোডাকৃতির মনস্টারি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়। গোটাটাই কাঠের। গায়ে তার বিচিত্র কাজের সম্ভার। বেশ কিছুটা দূর থেকে ছবি তুলতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম তার পেছেনের ক্যানভাসটা গোটাটাই প্রায় নীল আকাশ। আর দিগন্তে নীল আকাশে আঁকা গিরিশৃঙ্গ, একের পাশে আরেক। প্রকৃতি এখানে ধ্যানমগ্ন। মনস্টারির পাশেই একদম নীচে আমরা যে লেভেলে দাঁড়িয়ে দেখছি, ছবি তুলছি, তারও সামান্য নীচে সবুজ রঙের টিনের একচালায় বেশ বড় হরফে লেখা – ‘G.P.S L A B R A N G’। বার বারই চেস্টা করছিলাম এমন একটা শট নিতে যাতে এই লেখাটি আর মনস্টারিটা একসঙ্গে ধরা পড়ে। বুঝতে পারছিলাম অসম্ভব। তবুও। এদের যে কৌণিক অবস্থান, তাতে এক ফ্রেমে ধরা অসম্ভব। তবুও কেন? বিশ্লেষণটা তখনই মাথায় এলো। ছবি দেখিয়ে বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় পরিজনদের বলতে পারবো—‘দ্যাখো, হিমাচল প্রদেশের কিন্নৌর জেলার পুহ তহশিলের ছোট্ট একটা গ্রাম ল্যাবরাং-এ আমি গিয়েছিলাম।’ দেখতে দেখতে চমকে যাবে তারা। এই তো! হায় লোভ একহারা, হায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দুলুনি, হায় প্রত্যাশা-পারদের সম্প্রসারণ তোমাদের ত্যাগ করা যায় না সহজে। এই অঢেল নিসর্গেও সামান্য নিয়ে মনের ছোট্টটি ঠিক বাসা বেঁধে আছে। দীন মনে হলো নিজেকে।
গাড়ি ঘুরিয়ে ‘কানাম’। গ্রাম। বুঝতে পারলাম ‘সাপিলো’র খুব কাছে। এন-এইচ ২২ ছেড়ে বাঁ-দিকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এসে আমাদের গাড়ি এসে থামলো ছোট্ট একটা সমতল মতো জায়গায়। গাড়িতে আসতে আসতেই বুঝতে পারছিলাম মূল জনপদটা অনেকটা নীচে। কেননা সেখানেই অধিকাংশ বাড়ি-ঘর। আমরা যেখানে এসে দাঁড়ালাম, সেটাই এখানকার বাস-স্ট্যান্ড। একটিও বাস নেই, নেই একজন মানুষও। আসলে সারাদিনে হয়তোবা দুটো কি তিনটে বাস ছাড়ে। যায় সাপিলো পর্যন্ত। এখন নিশ্চয়ই সেই সময় নয়। আপার আর লোয়ার কানাম নিয়ে কানাম। একে বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ গড’ বা ‘Land Of Sangyas’। কেন যে ঠিক জানিনা। মনে হয় এর নিজস্ব সৌন্দর্যের জন্য। সবুজ এখানে তার ভ্যারাইটি দেখাতে অভ্যস্ত মনে হলো। আর এই মনে হওয়ার অনেক আগেই প্রনবদা জানতে চাইলো— ‘নীচে যাবি’? ‘হ্যাঁ যাবো’ বলে ফেললাম। এগিয়ে গিয়ে উৎরাইটা দেখে জিজ্ঞাসা করলাম—‘কত নীচে?’। ‘অনেকটা’। ‘মানে এরকম উৎরাই, ক’বার?’ ‘বেশ কয়েকটা’। হায় রাম! এরকম প্রায় ৪৫ ডিগ্রি এঙ্গেলের কয়েকটা উৎরাই-এর ভার নিতে পারবে হাঁটু? জিজ্ঞাসা করলাম। হাঁটু বললো—নামলে যে উঠতেও হবে বাছাধন! সেখানেও ৪৫ ডিগ্রি এঙ্গেলের চড়াই। আমি কাৎরাতে কাৎরাতে নামা ওঠা করলেও বুকের খাঁচায় দম থাকবে তো? সত্যি প্রশ্ন। বুকের খাঁচাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই আমি আর ধীমান জানালাম আমরা লোয়ার-কানাম-এ আর যাচ্ছি না। প্রনবদাও আমাদের ওপর তেমন ভরসা পাচ্ছিলো না। দুমদাম পা ফেলে সে আর জুগনু চললো ঢালু বেয়ে। মন্দির যাবে, নদী যাবে, যাবে চাষের জমি। অগত্যা শ্রীচরনেষু আমরা সেই সমতল মতো জায়গাটাকেই নিজেদের বিচরণভূমি বানিয়ে নিলাম ওদের ফিরে আসা পর্যন্ত। প্রথমেই ঢালে হাঁটা কয়েক কদম। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল বেশ কিছুক্ষণ। উঠে এসে দুজনেই হাঁটা লাগালাম বিপরীতে একটা সরকারি বড় বাড়ির পেছন দিকটায় অনেকটা গিয়েও আবার ফিরে এলাম। রোদ এড়াতে কোনও গাছের ছায়াই তখন যথেষ্ট নয়। কারণ তারা আছে ঢালে। ওখান থেকে কানাম গ্রামটা স্পষ্ট। একটা উঁচু পাহাড়ের ঢালের একদম নীচের দিকে কয়েকটা স্তরে বাড়ি-ঘর-দুয়ার। যে পর্যন্ত বসতি সে পর্যন্ত সবুজে ঢাকা। তারপর ন্যাড়াই লাগলো পাহাড়টাকে। নীচে অনেকটা সমতল মতো জায়গা। চাষ-বাসের। অনুমান করলাম পাশেই নদী বয়ে যাচ্ছে। চড়াই বেয়ে কারা যেন উঠে আসছে। উঠে আসছে চারটে মানুষ ছ-পায়ে। মধ্য বয়সী এক যুবকের কাঁধে এক কুচ্চি মেয়ে, তার স্ত্রী, আর তাদের পাঁচ-ছ বছর বয়সী বাচ্চা ছেলেটি। অক্লেশে। দু-পাশ ছাড়িয়ে উঠে আসছে। দুস্থ মনে হলো। পিড়ীতও কি? হতে পারে, যাচ্ছে স্পিলোর হাসপাতালে। বাচ্চাটির হাঁটা, গতি দেখে লজ্জা পেলাম। এও পারে, আমরা পারলাম না। ফেরার পথে এক কিন্নরী মহিলা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে লিফট্ চাইলো। ভাবলাম জুগনুর পরিচিত। কিন্তু না, এখন বাস নেই, যেতে হবে স্পিলো, আতান্তরে পড়েছে, তাই অনুরোধ। আমার বাঁ-পাশে উঠে এলেন। আমি সরে আরও ধীমানের দিকে। জুগনুর সঙ্গে কথা চালাচালি। হঠাৎই আমার খেয়াল হলো কিন্নরী টুপিটি আমার মাথায় নেই। সেটা সুন্দর করে মাথায় চাপিয়ে আমিও দু-চার কথা। কথায় কথায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার নেমে যাওয়া গন্তব্যে। আমাদের আরও দূর যেতে হবে।
‘রাসকালান’-এও ধীমান গেলো না গ্রামের ভেতর। এবারে আমি প্রনবদার লম্বা লম্বা পায়ের সঙ্গে আমার মাঝারি পা ফেলে সঙ্গী হলাম। কী সুন্দর গ্রামখানা। শান বাঁধানো পথ। দুপাশে কিছুটা উঁচুতে চাষের জমি। জমির ধারটা বনকাঠির বেড়া দেওয়া। হাঁটছি। খুব সামান্যই নীচে নামছি। রাস্তার পাশে নালিতে নামছে ঝরনার জল। এ জলে নিশ্চয়ই চাষে সেচের কাজ। এক জায়গায় দেখলাম একটু গোলাকৃতি গর্ত মতো জায়গা। কায়দা করে সেখানে গর্তের ধারে বসে বাসন ধুয়ে নিচ্ছে গ্রামেরই কোনও রমণী। একবার ছবি হোক। হোলো। প্রাণভোলানো হাসি। যেতে দুপাশে ফলের গাছ। আখরোট ফলে আছে। বেশ নিচে ঝুলছে অনেক কটা। সবুজ। কালচে সবুজ। ছবি হোক। যেতে যেতে অনেকটা গিয়ে ডানে ঘুরলে মন্দির। খুব ছোট্ট। চূড়া নেই বললেই চলে। প্রবেশদ্বারে চৌকোনো ছোট্ট চাতাল। দরজায় দেয়ালে সিলিং-এ নানারকমের ছবি আঁকা। রঙিন। ছবি হোক। সিলিং নিচুতে। চিৎ-শোয়া প্রনবদার ক্যামেরায় ছবি হলো। মন্দির ঘুরে একই পথে আবার খানিকটা এগুলে নদী। রোপা নদী। আসলে আমরা কানাম ছেড়ে এন-এইচ ২২ ধরে অনেকটা এগিয়ে এসে যেই না বাঁ-দিকে রাসকালন-এর পথ ধরেছি, শুরু হয়েছে রোপা-ভ্যালি। রোপা নদীকে ঘিরে বিভিন্ন জনপদ। নদী থেকে ফেরার পথে মন্দির পেরিয়ে গ্রামের আরেকটু ভেতরে ঢুকে গেলাম আমরা। গোয়ালে গরু। রাস্তাতেও কয়েকটা ছিলো। ছবি হোক। এক বৃদ্ধাকে মাসিমা সম্বোধনে প্রনবদার আলাপ। ছবি হোক। দু-চার কথার পরেই মাসিমার দরাজ গলায় আমাদের আমন্ত্রণ, চা খেয়ে যেতে হবে তার বাড়িতে। খুবই আন্তরিক সেই ডাক। কিন্তু আমাদের সময় জ্ঞানে এড়াতেই হলো। চেনা নেই জানা নেই কত্ত দূর থেকে আসা নেই তার হদিস, তবুও এমন আদর করে ডাকায় দুটো কথা মনে এলো। এখানকার মানুষজন ভারী উষ্ণ আর বন্ধুত্বপূর্ণ। কতদিন এরা বাঁচিয়ে চলতে পারবে নাগরিক জীবনের জটিলতা আর কুটিলতা? ছবি হলো। আপেল-বাগান। কাঠ আর পাথর সাজিয়ে বাড়ি। সবসময় মুখে হাসি মানুষ। মা ও বাচ্চা যাচ্ছে হেঁটে। ছবি হোক। বাধা দিচ্ছে না কেউ। এমনই উদার। হাঁটতে হাঁটতে সেই শান-বাঁধানো পথে ফেরা। এবারে বেড়ার ধারে বিস্ময় চোখে এক কচি বালক। একটু যেন ত্রস্ত। দুয়ে মিলে অপার সন্ধিক্ষণ। ছবি হোক। মাঠে কাজ করা চাষির সঙ্গে কথা। এক মুখ হাসি ভর্তি একমুঠো মটরশুটি। আহা মিষ্টি। আহা ছবি হোক। অনেক ছবি হলো। কোনওদিনই হয়তো বা এই গ্রামে আর আসা হবে না। কিন্তু সে ব্যথায় নয়, এই গ্রামের নাড়ীর স্পন্দন যেন আমি অনুভব করতে পেরেছি সেই আনন্দে গ্রাম ছেড়ে এলাম।
‘গ্যাইবং’ রোপা ভ্যালিতেই। ‘রাসকালাং’ থেকে অনেকটাই দূর। গাড়ি চলেছে। পথের শোভার কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এটা ‘মিডিল কিন্নৌর’-এ পড়ে। আপেল বাগান কমে এলো। মাঝেমধ্যেই সমতল মতো রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে কিছুটা। নদী চলেছে। গতি কিছুটা কম। আকাশের নীল ঘন হয়েছে অনেক। দূরের পাহাড় শৃঙ্গের কালো ভাব বেড়েছে। সাদা সাবুর দানা লেগে আছে তার গায়। গাড়িতে গান হচ্ছে—‘সাওন কি ম্যায়হিনা…’। পশ্চিমবঙ্গে বর্ষা এসে গেছে, এমনই খবর। এখানে বৃষ্টি নেই। জলদ মেঘও নেই তেমন। গড় বৃষ্টিপাত যথেষ্ট কম এসব অঞ্চলে, ভূগোল বলছে। ‘গ্যাইবং’-এ সরকারি গেস্ট-হাউসে আমাদের রাত্রিবাস আজকে। বুক করা হয়েছে আগেই। প্রনবদার পরিচিত এক যুবক বুক করে দিয়েছিল, তার বন্ধু এলো আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। গায়ে তার বেশ জ্বর, আর কাশি। দোকানে বসে চা খেতে খেতে প্রনবদা তার জন্য ওষুধ। গাড়ি থেকে ব্যাগ-পত্তর নামানো হয়নি তখনো। গেস্ট-হাউসের চৌকিদারের খোঁজ পাওয়া গেল অচিরেই। একটু টলোমলো। রসনাগর। জানালো এখনও সেখানে গেস্টরা আছেন, কিছুক্ষণ বাদেই বেরিয়ে যাবেন, কোনও অসুবিধা নেই। সুতরাং গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে জুগনু সহ আমরা গেস্ট-হাউসের সামনে। অসাধারণ জায়গা। বড় একটা ঘরের সঙ্গে সামনে লাগোয়া বারান্দা। বারান্দার সামনে একটা ছোট্ট লন। আয়তক্ষেত্র। সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া। সেখানে বসার কয়েকটা জায়গা। তারপরেই গভীর খাদ। নীচে নদী বয়ে যাওয়া। নদীর ওপারে খাড়াই পাহাড়। পাহাড়ের পর পাহাড়। গা বেয়ে নেমে আসা একটা ঝরণার রেখাও দেখা যাচ্ছে। মন ভরে গেল। ঠিক হলো আজ রাতে এখানেই বসা, এখানেই কবিতা পাঠ, আড্ডা, এখানেই মেহেফিল। ঘরটাও বেশ ভালো। কে কোথায় শোবো, ঠিক হয়ে গেল তাও। কিন্তু ঘরের চাবিটা পাওয়া গেলো না। সেটা পাওয়া যাবে লাঞ্চ সেরে আগের গেস্টরা বেরিয়ে গেলে। সংশয় থাকলেও বেরিয়ে পড়া গেল। লাঞ্চ আমাদেরও প্রয়োজন। দুটো বাজে প্রায়। যে রেস্টুরেন্টে বসে চা খেয়েছিলাম সেখানেই ঢুকলাম। বসে আছি, বসেই আছি। কেউ আসে না। অর্ডার নেয় না। সন্দেহ জাগলো, আদৌ কিছু মিলবে তো? অগত্যা ধীমান উঠে গেলো কিচেনে, ফিরে এলো ব্যাজার মুখে। একজনই মানুষ, সেই কুক, সেই সার্ভারার, সেই টেবিল-মোছা থেকে টাকা নেওয়া। কিন্তু ২৫-৩০ জনের লাঞ্চের অর্ডার আছে তার কাছে, সে আমাদের জন্য কিছুই করে দিতে পারবে না। ভগ্নমনোরথ, পেটে বসে যাওয়া চাকা নিয়ে গড়িয়ে এলো বাইরে। স্থানীয়রা জানালো সামান্য কিছুটা দূরে আরেকটা খাবারের দোকান আছে। চলো তাহলে। চক মতো সমতল জায়গাটা পেরিয়ে বাঁয়ে ঘুরে সেই দোকান যাওয়ার রাস্তা। চড়া রোদ উঠেছে। সঙ্গে পেটের চড়া পড়া। বিস্কুট কিছুটা। এরই মধ্যে প্রনবদা দেখালো এক জায়গায় জায়গাটার নাম লেখা আছে ‘ক্যাইবং’। এই ক আর গ, ত আর থ, দ আর ধ-এর ধন্দটা মিটছে না কিছুতেই। থাক সে। একটু দূরেই ‘স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া’র এটিএম। তার আগেই খাবারের দোকান। লোলুপ চাউনি সমেত ঢুকে পড়া। বাত-চিত। বিমর্ষ। কিছুই করে দিতে পারবে না ওয়ান-ম্যান এটেন্ডার। তারও রয়েছে লাঞ্চের অর্ডার। শুধু মাটনের কী একটা প্রিপারেশন হয়েই রয়েছে। কিন্তু আমাদের তো মাটন চলবে না। অতএব শুকনো মুখে প্রত্যাবর্তন। এখন কী করার? পকেটে টাকা, এটিএম-এ টাকা। কিন্তু খাবার নেই। থাকলেও করে দেবার লোক নেই। চিন্তিত প্রনবদা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না। ‘—জুগনু, পার্কিং থেকে গাড়ি বার করো। লাগাও গেস্ট-হাউসের কাছে। চল, লটবহর তোল। এখানে আর থাকবো না। চলে যাবো পুহ।’ সব ঘটলো দ্রুত। জ্বর গায়ের ছেলেটিকে খবর দেওয়া হলো না, সে আমাদের বিকেলে জায়গাটা ঘুরে দেখাবে বলেছিলো। লনে বসে কবিতাপাঠ হলো না, বসলো না মেহেফিল। চৌকিদারের কাঁচুমাঁচু মু্খ আর কিছুটা জড়ানো কথা আমাদের যাওয়া আটকাতে পারলো না। গাড়ি ছুটলো। সামনের সিটে বসে প্রনবদা বললো—‘পাহাড় এরকমই। যখন দেবে না তো, দেবেই না। সে খাবারই হোক, আর নিসর্গই হোক।’
পথ আর ফুরোয় না। পু আর আসে না। ‘পু’ না ‘ফু’ কোন উচ্চারণে পেটের ক্ষুধা মিটবে বোঝা যাচ্ছিলো না। শেষে ‘পুহ’ উচ্চারণে যা হোক পথ শেষ হয়ে এলো। গোটা পথে কি কিছুই দেখিনি? দেখেছি। গল্প খুনসুটিও ছিলো। তবু একটা যেন কিছু ছিলো না। প্রনবদার পুহ তে থাকার একদম ইচ্ছে ছিলো না। তাই বাধ্যতামূলক ‘গ্যাইবং’ ছেড়ে আসায় মনটা বুঝিবা ওখানেই পড়েছিলো। তাই মূল পুহ শহরে না ঢুকেই শহরাম্ভের একটা হোটেল ফিট করে ফেললো প্রনবদা। সেই পৌনে পাঁচ। খাওয়া, আর গড়িয়ে নেওয়া। সন্ধের গোড়ায় আমি আর ধীমান হাঁটতে বেরোলাম। প্রনবদা বেরোতে চাইলো না। প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ফাঁকা জায়গা থেকে পাহাড়ের গলার কাছে ঝুলে থাকা পুহ শহরটাকে আমরা দেখলাম এক ছবির মতো। আসলে সেই আপার আর লোয়ারের লুকোচুরি। আমরা রয়েছি লোয়ারে। মূল শহরটা আপারে। যাওয়া হলো না। কানাম-এ ছিলাম আপারে যাওয়া হয়নি লোয়ারে। এমন অনেক কিছুই থাকবে যা কাছে এসেও ধরা দেবে না। এ ক’দিনে সেটা ভালোই বুঝে গিয়েছিলাম। দূরে কিছুটা নিচুতে মিলিটারি ক্যাম্প, বিল্ডিং সব দেখা যাচ্ছিলো। একটা দুটো সন্ধ্যাতারায় শুরু হচ্চিলো পাহাড়ের সন্ধ্যা। ফেরার পথে খাদের খুব ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আর এ অঞ্চলের গাছ ও সবুজের অপ্রতুলতা ভাবতে ভাবতে হোটেল ফিরে আসায় ‘গ্যাইবং’ গেস্ট-হাউসের চৌকিদারের নেশা-মুখটা একবার স্পষ্ট চোখে ভেসে উঠলো। রাতে চৌকিদারের ওই মুখ আমাদের মুখে প্রতিফলিত হলো, কবিতা হলো দোসর।
চলবে...


















Comments