পুজোর পরবাস

পুজোর ঢাকি ও একটি টিফিন কৌটোঃ
বৃষ্টি তার নিজের পথে বয়ে যাচ্ছে, আমি সেই নদীর ধার ধরে সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছি। নদীর চর ধরে হাঁটাকে সান্ধ্যভ্রমণ বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে আমি হাঁটছি গোধূলির আহ্নিক গতির সাথে পৃথিবীর বার্ষিক গতির মন্থরতায়। এখন বর্ষার শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। হাঁটতে হাঁটতে আমার পথ নদীর কাছে চলে এসেছে নাকি নদী আমার পথের কিনারে এসে পৌঁছেছে সেটা বুঝতে পারছিনা। তবে এটা বুঝতে পারছি যে মাঝে মাঝেই আমি খানা-খন্দ লাফিয়ে এগোচ্ছি। পৃথিবীর বুকে কেঁচোখোঁড়া ব্যথা জেগে উঠেছে। সোঁদা গন্ধ পেয়ে মনের মধ্যে শেওলাকালো সবুজ কিলবিলিয়ে ওঠে। একটা দুটো বর্ষাতি ফুলের গন্ধেও মন মজেনা। কিছুটা পথ পেরলেই দেখা পাবো কাশফুলের দুলুনি। কিছুটা দূরে গেলেই ঢাকের মৃদু আওয়াজ শুনতে পাবো হয়তো। আবার হাওয়ার অন্যমনস্কতায় সেই শব্দ শুনতে নাও পারি। কিন্তু মনে পড়ে এক অদেখা ঢাকির চেহারা - কাঁধে ঝোলানো রয়েছে ঝালর দিয়ে সাজানো ঢাক- সে ঢাকের পিছনে সাদা পালকের সাজ।পুরনো ধুতি পাঞ্জাবি ধুয়ে পরিষ্কার করে পরা, সামনের দিকে একটু ঝুঁকে দুলে দুলে ঢাকের চামড়ায় কাঠির স্পর্শে স্পর্শে এক সুর-তাল পুজোমণ্ডপময় ছড়িয়ে দেয় সে। পথ চলার নেশাতেও মোবাইলের বেজে ওঠার ঝংকার শুনতে পাই। অচেনা নম্বর, হ্যালো বলতেই ওপার থেকে ভেসে আসে গ্রাম্য সরলতা মাখা শব্দগুলি- ‘দাদা আমি মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকি সনাতন দাস বলতেছি, অই গতবার যাওয়ার কথা হয়েছিল আপনাদের ওখানে পুজোতে...।’ থমকে গেলাম। একটা ভৌগলিক দূরত্বের পর ঢাকের আওয়াজ হয়ত শুনতে পাওয়া যায়না, কিন্তু একজন ঢাকির মনের কথা শুনতে পারা যায়। -‘ হ্যাঁ বলুন সনাতন দা। ভালো আছেন তো?’ ‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ আপনারা ভালো আছেন তো ?’ ‘হ্যাঁ বলুন।’ ‘বলছিলাম গত বার তো আর যাওয়া হলনা, তাই এবার যদি ডাকেন সেই জন্য আগেই ফোন করলাম।’ গতবারের কথা মনে করে নিজেরই খারাপ লাগল। আমি নিজেই শিলিগুড়ির এক বন্ধুর মারফৎ ফোন নম্বর জোগাড় করে সনাতন দাস কে গতবার যোগাযোগ করেছিলাম।
সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি, ভেল, হরিদ্বার এর কালচারাল কমিটির সদস্য ছিলাম ২০১৬ ও ২০১৭ এই দু’বছর। সেই দায়িত্বের সুবাদে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। এখানকার পুজোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল ষষ্টি থেকে নবমী পর্যন্ত চারদিনই নানারকম সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ। সে কথায় পড়ে আসছি। তবে এখানকার ঢাক নিয়ে আমার একটা খুঁতখুঁতানি ছিল। যে ঢাকি এখানে বহুবছর ধরে বাজায় সে বাঙালি হলেও তার ঢাকের মধ্যে সেই বাঙালি ঢাকের ছোঁয়া পাইনা। তারা আসে উত্তরাখণ্ডেরই রুদ্রপুর জেলা থেকে। সেখানে দেশভাগের সময় বাংলাদেশ থেকে এসে উদ্বাস্তু বাঙালিরা কয়েকগ্রাম জুড়ে বসতি গড়ে তোলে। চাহিদা না থাকার কারণে তারা ঢাকের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। শুধু পুজোর ক’টা দিন একমুঠো টাকার জন্য কোনোভাবে কাজ চালিয়ে দেয়। তাদের ঢাকও আধুনিক সস্তার- স্টিলের ধাঁচার উপরে প্লাস্টিকের কভার। তাদের রেটও কম। দশ থেকে বারো হাজারের মধ্যে পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত বাজিয়ে দেয়। কিন্তু আমার মন মজেনা তাতে। কারোই মজে না, তবে সেটা কেউ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনা। সেবার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মিটিঙে প্রস্তাব দিই পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকি আনার। সবাই রাজী হতেই যোগাযোগ করি সনাতনদার সাথে। কথা হয় দু’জন ঢাকি একজন কাঁসি বাজানোর লোক- এই তিনজন আসবে ওরা, বাজেট মোট পঁচিশ হাজার। কমিটিকে সে কথা জানাতে বাজেটের কথা ভেবে পিছিয়ে যায়। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট বিশ্বজিৎ দাস শুধু শুধু ঢাকের পিছনে এত বাজেট অনুমোদনের পক্ষপাতী নয়, তবে আর এক গুরুত্বপূর্ণ ও সিনিয়র সদস্য অশোকদা আশা জিইয়ে রেখে বলে- ‘বাজেটটা বর্তমান ঢাকির চেয়ে যথেষ্ট বেশি, আর পনেরর মধ্যে মনে হয়না ওরা আসবে- দেখ একবার কথা বলে।’ আমিও আর জোর দিইনা শুধু বলি ঠিক আছে বলে দেখব। আসলে এরা ঢোলকের আওয়াজ শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সেই সাজানো ঢাক আর তার চড়াম চড়াম আওয়াজ আর তার সাথে ধুনকি চালের নাচ এরা দেখেনি বা দেখলেও দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে স্মৃতি থেকে তা হয়ত মুছে গেছে। তিনটে লোক আসা-যাওয়া আর পুজোর পাঁচদিন মিলে কম করে আটদিনের হাজিরা, ট্রেনের টিকিট ইত্যাদি মিলে পঁচিশ হাজারের মধ্যেই বা কি তেমন হাতে থাকবে ওদের। আর পনেরো কেন কুড়ির মধ্যেই বা তারা কীভাবে আসতে পারবে এটা যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারিনা। সনাতনদাও একইরকম জিজ্ঞাসা সবিনয়ে আমার সামনে রেখেছিল তার কয়েকদিন বাদে। সেদিন মিটিঙের পর বুঝে গেছিলাম যে ঢাকি আর আনা যাবেনা তাই আমিও লজ্জায় আর ফোন করিনি। সেইদিন সনাতনদা-ই ফোন করল। সেদিনও সন্ধ্যায় ভেলের পার্কে আমি হাঁটছিলাম প্রতিদিনের মত। উনার সাথে দরদামের মধ্যে না গিয়ে আমি শুধু কমিটির কথাগুলো বললাম, সে বুঝল ব্যপারটা। তবুও একরকম কাতর হয়েই বলল ‘ দেখেন যদি বাইশও দেয় চলে আসব। আসলে হরিদ্বারে যাবার জন্য মনটা খুব টানছে। সেইজন্যই আর কি!’ একমুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে পড়লাম। ছায়া মাখা একটা মূর্তি যেন দেখতে পেলাম সামনে। আমি কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিনা। শুধু বললাম ‘হবে না দাদা।’ তারপরও সে বলল ‘আরেকবার শেষবারের মত আপনাদের প্রেসিডেন্টকে বলে দেখেন যদি রাজী হয়!’
না আমি আর প্রেসিডেন্টকে সরাসরি বলিনি। আমাদের এখানে বাঙালীদের মধ্যে কোম্পানিতে সবচেয়ে উঁচু পদে যারা থাকবে তাদের মধ্যে থেকেই যার প্রভাব বেশি থাকে পদমর্যাদা অনুযায়ী, তাকেই প্রেসিডেন্ট করা হয় পূজা কমিটির। সেক্ষেত্রে টারবাইন ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার বিশ্বজিৎদাকে যদি রাজী করানো যায় তবে আর কেউ সেরকম কিছু আপত্তি করবে না। সেবছরের পূজা কমিটির সেক্রেটারি তাপস সাহাকে(সেও টারবাইন গ্রুপের ডিজিএম) আর একবার বুঝিয়ে বললাম, এমনকি নিজের রিস্কেই এটাও বললাম যে ‘ দাদা বিশের মধ্যে হলেও ওরা আসতে রাজী। আপনি একবার বিশ্বজিৎ দা’র সাথে আলাদা করে কথা বলে দেখুন।’ তাপসদা কথা বলেছিল কিন্তু ওতেও রাজী হয়নি বিশ্বজিৎ দা। সনাতনদার মন খারাপের কারণটা বুঝতে পেরেছিলাম সেদিন। শুধু টাকার জন্যই নয়, এখানে আমাদের পুজোটার সাথে সাথে হরিদ্বার জায়াগাটাও ঘুরে যাবার সাধ জন্মেছিল তার।
বাংলার ক্লাবের পুজোগুলিতে থিম পুজোর চল অনেকবছর আগেই শুরু হয়েছে। আর একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পুজোর জাঁকজমক ও বাজেট। কিন্তু সেই তুলনায় প্রবাসের পুজোগুলোতে এখনও রয়েছে সাবেকিয়ানার ছাপ। খুবই কম বাজেটের মধ্যেই সমস্ত উৎসব সারতে হয়। সেইজন্য এইসব পুজোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রসাদ বিতরণ এই দুই প্রধান দিকটির প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। তাই ষষ্টি থেকে নবমী প্রতিদিন দুপুরে কোনো বাঙ্গালীর ঘরের উনুনে হাঁড়ি চড়ে না। আমাদের পুজোটি যেখানে হয় সেটি একটি স্কুল পরিসর। জায়গার কোনো অভাব নেই। স্কুলের ছাদেই পাতপেড়ে চলে ভুরিভোজ, কী নেই তাতে- খিচুড়ি, পোলাও ,বেগুন ভাজা, লাবড়া, দই, মিষ্টি। প্রসাদের কোনো অভাব হয়না, বাঙালী থেকে অবাঙ্গালী সবার লাইন পড়ে যায়। ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমসিম খেতে হয় পুজো কমিটির কর্ম-কর্তাদের। একবার হল কি, সেদিন আমিও প্রসাদ বিতরণে শামিল। তো সেই ব্যাচ শেষ হবার পড়ে আরেকটি ব্যাচ বসতে যাচ্ছে এমন সময় আমাদের কোম্পানিরই কোয়ালিটি ডিপার্টমেন্টের একজন স্বল্প পরিচিত বাঙালী খেয়ে উঠে এসে একটি টিফিনবাক্স এনে সামনে ধরল। স্বল্প পরিচিত এই জন্যই যে দু’তিন বছর হয়েছে এখানে জয়েন করেছে তাই তেমন ভাবে আলাপ হয়ে ওঠেনি। উনার মিসেস আসতে পারেনি, তার জন্য ঘরে প্রসাদ নিয়ে যেতে চায়। আর এদিকে কমিটির কড়া নির্দেশ কারও বাড়ির জন্য প্রসাদ দেওয়া চলবে না। সব ব্যাচ শেষ হয়ে যাবার পর দেওয়া যেতে পারে। একজনকে দিলে তার দেখাদেখি অন্যান্যরাও নিয়ে যাবে, সেদিক থেকে দেখলে এটি ভালো নিয়ম। আমি সবিনয়ে তাকে আমার অপারগতার কথা বললাম, সাথে এটাও বললাম যে এই ব্যাচের পর আর বাইরের ভীড় নেই, তখন এসে নিয়ে যাবেনক্ষণ। তা ভদ্রলোকের হয়ত একটু অপমানজনক লেগেছে কথাটা, যদিও আমার আন্তরিকভাবে খারাপই লাগছিল না দিতে পেরে। তা রেগে লোকটি তখন কী সব একটা দুটা কথা বলেছিল তা আজ আর খেয়াল নেই, তবে এটা মনে আছে যে- ‘ চাঁদা নেবার বেলায় তো বেসিকের টু পারসেন্ট নিয়ে নেন, আর প্রসাদ চাইতে গেলে খারাপ ব্যবহার করেন। লোকটির শোরগোলে সবাই ভ্যবাচ্যকা খেয়ে গেছিলাম। যতদুর অনুমান করতে পারি সেইসময়ের হিসেবে উনার মূল বেতনের দুই শতাংশ হারে দেওয়া চাঁদার পরিমাণ হবে খুব বেশি হলে তিনশ টাকা। যাই হোক সেটা কথা নয়, কথা হল এই প্রবাসেও সামান্য একটাই পুজোর জন্য সামান্য চাঁদা নিলেও কিছু কিছু লোক তাকে জুলুম বলে মনে করে।
সনাতনদার হরিদ্বার আসার স্বপ্নটা এবারেও পূরণ হল না। তাকে বললাম-‘ দাদা আমি তো এবারে কমিটিতে নেই। তাই কোনোরকম আশা রাখবেন না।’ তারপরও সে বলল ‘বুঝতে পারছি দাদা,তবু যদি প্রেসিডেন্ট রাজী হন তো জানাবেন।’ ফোন রেখে দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে দিগন্ত বিস্তৃত বালির চড়ায় এসে উঠেছি। বন্যার শেষ জলটুকু নদী ছাপিয়ে বয়ে যাচ্ছে। সেই স্রোতে ভেসে যাচ্ছে একটি টিফিন কৌটো আর একটি উদ্ভ্রান্ত লোক তার পিছু পিছু নদীর পাড় ধরে ছুটছে অনবরত। ওপারেই অদূরে আরেকটি লোক কাশবনে আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কখনো কখনো কাশফুলের স্পর্শে দুলে উঠছে ,নেচে উঠছে।
পুজো ও একটি সাহিত্য পত্রিকার বীজ বপনঃ
“ভাবনা না হয় থাক আজ, মুখফুটে কিছু বলতে পারি কিনা দেখি। কোন কথনের প্রাক্কালে ভূমিকা ভীষণ প্রয়োজন আর গুরুত্বপূর্ণও বটে। আমার আবার ছোটবেলা থেকেই মুখ বন্ধই থাকে প্রায়। তাই এই মুখবন্ধটি লিখতে গিয়ে হাত কতটা খুলবে তা নিয়ে একটা সন্দেহ অবশ্য আছেই। আসলে যেই বক্তব্য এই পত্রিকাটির মাধ্যমে আমরা প্রকাশ করতে চাইছি তার সূত্রপাত ও পটভূমি আমার চাইতে অনেক অনেক পুরনো। তবুও চেষ্টা করছি (আমার ক্ষুদ্র অনুভূতির দ্বারা ) পত্রিকার বক্তব্যগুলির মধ্যে যে যোগসূত্র তার একটা ভূমিকা দিতে পারি কিনা।
কথায় আছে যে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তেমনি আমার মনে হয় বাঙ্গালি চাঁদে গেলেও চাঁদা তুলে সেখানে দুর্গাপূজার আয়োজন করবে আর সেখানকার উদাসী হাওয়ায় হালকা ওজনে সাহিত্যচর্চা করতে করতে হৃদয় ভাসাবে।
তাই বাঙ্গালি জীবিকার সূত্রে দেশ-বিদেশের যেখানেই পাড়ি জমাক না কেন সাথে নিয়ে যাবে দুর্গাপূজার সংস্কার আর তার ঐতিহ্যশালী শিল্প-সংস্কৃতি। ঠিক যেমন পঞ্চাশ বছর আগেও কিছু উদ্যমী আর সচেতন বাঙ্গালী এই ভেল উপনগরীতে দুর্গোৎসবের সূচনা করেছিলেন। তারপর থেকে এই দুর্গাপূজা কমিটি ৪৯ টি শরৎকাল পেরিয়ে আজ ৫০-তম মাতৃবন্দনার দোরগোড়ায়।
দেবভূমি উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার সাধারণত উত্তর ভারত তথা হিন্দিবলয়ের অন্তর্গত হলেও একাধিক ভাষা ও জাতির মেলবন্ধনে ভেল উপনগরী যেন ছোট একটি ভারতবর্ষ। তাই এই দুর্গাপূজা সাধারণত বাঙালিদের দ্বারা পরিচালিত হলেও তা আর শুধু ‘বাঙালিদের উৎসব’ এই পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গাপূজা একসময় প্রাচীন বাংলার ধনী ও সম্পন্ন পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে ধনী-দরিদ্র সবার উৎসবে পরিণত হয়ে সার্বজনীন আখ্যা পেয়েছিল। আর আজকের দিনে দুর্গাপূজা প্রবাসী বাঙালিদের হাত ধরে সত্যিকারের অর্থেই সার্বজনীন হয়ে উঠেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাতে কিন্তু আমাদের বাঙালিদেরই লাভ হয়েছে। দুর্গোৎসবের মাধ্যমে শুধু মাতৃ-আরাধনাই নয় বাঙালি তার শিল্প-সৃষ্টিকে, তার শিল্প-সত্ত্বাকে সমগ্র বিশ্বে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।
আর সাহিত্য পত্রিকার সূত্রপাতও হরিদ্বারে এই প্রথম নয়। অতীতেও ভেল উপনগরীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বাঙালিদের উদ্যমে ত্রিভাষিক ( বাংলা, হিন্দী ও ইংরেজী ) সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রবাসী দর্পণ’ শুরু হয়। বেশ কয়েকবছর তা নিয়মিতভাবে প্রকাশিতও হয়েছিল। তারপর কর্পোরেট-কাজের চাপে ও হরিদ্বারে বাংলা ভাষায় ছাপানোর সুব্যবস্থা না থাকার কারণে তার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলেও সাহিত্যচর্চার সুপ্ত বাসনা তাদের মনে থেকে যায়। সেই সব শুভবুদ্ধি সম্পন্ন অগ্রজদের উৎসাহ আর সাংস্কৃতিক বিভাগের উদ্যোগে সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির তরফ থেকে শারদোৎসবের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ‘সুবর্ণপত্র’ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এটি কোন নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা নয়, সুবর্ণ-জয়ন্তী বর্ষের স্মারক পত্রিকা মাত্র।
যাই হোক কালচারাল্ কমিটি তথা সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির এই ক্ষুদ্র অথচ মহৎ প্রচেষ্টায় হরিদ্বারের বাঙালি তথা অন্য ভাষা-ভাষীর সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের মধ্যেকার শিল্পী-সত্ত্বাটি প্রকাশিত হবার একটা সুযোগ পাবে আশা করি। এবং সেইসব সুধীজনদের থেকে এটাও আশা রাখছি যে তাদের সেই প্রকাশ শুধুমাত্র ২০১৬ এর ‘সুবর্ণপত্র’-তেই সীমাবদ্ধ না থেকে আরও নতুন ভাবে নতুন দিশায় নদীর মত বয়ে যাবে। আর তার জন্য আলাদা করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশের চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে।
সর্বোপরি হরিদ্বারের সমস্ত বাঙালিদের কাছ থেকে আশা রাখছি যে তারাও, বর্তমান যুগের ইংরেজী ও হিন্দীর আগ্রাসী (তবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাধ্যতামূলকও বটে) মনোভাবের কাছে যাতে আমাদের মায়ের মত প্রীয় ‘বাংলাভাষা’ চাপা পড়ে না যায় – সেইজন্য বিশেষভাবে সজাগ ও সচেষ্ট হয়ে উঠবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে যেন তাদের ‘মাতৃদান’ বাংলাভাষা থেকে বঞ্চিত না করি । জগতের সবচাইতে মিষ্টি ভাষাটিকে হারিয়ে যেতে না দিয়ে তাদের ঠোঁটে যেন তুলে দিতে পারি – সেই পবিত্র চেষ্টাটি অবশ্যই আমাদের করে যাওয়া উচিত। আর তার জন্য এই প্রবাসে বসে বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না।”- ঠিক এই দীর্ঘ ভূমিকাটিই লিখেছিলাম সেবছর সুবর্ণপত্র পত্রিকার ভূমিকার জন্য। তবে লেখাটি আর ছাপিনি পত্রিকায়। কারণ প্রথম উদ্যোগ বলেই হয়ত জনে জনে দরবার করেও তেমন মেটেরিয়াল পাইনি। সেই কারণে নিজের লেখালেখির যতটা সম্ভাবনা ছিল তা উজাড় করে দিয়ে কবিতা, গল্প, আর ভ্রমণকাহিনী দিয়ে শুধু পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। তবে শুধু ওজনে ভারী করাই নয় নিজের সুপ্ত বাসনার অতি উৎসাহও যে ছিল সেটা অকপটে স্বীকার করি। আর নিজের এই বাড়াবাড়িটায় একটা জায়গায় লাগাম পরাতেই পত্রিকার ভূমিকাটি হিমঘরে পাঠিয়ে দিই।
এই পত্রিকার বীজ বপনের কাজটাও যে খুব সহজ ছিল তা নয়। পুজো কমিটির অনেকেই এই ফালতু খরচের পক্ষে ছিল না। তবে অশোক দাস, প্রবাল গাঙ্গুলি মহাশয়দের উৎসাহ ও সহযোগিতায় এগোতে সাহস পাই। আর পাশে পাই এই পত্রিকার আর এক সহরূপকার অগ্রজপ্রতিম স্বরূপ চক্রবর্তী দাদাকে। বাঙ্গালি যে মননে চেতনে শিল্প সাহিত্যকে লালন পালন করে তা সর্বজনবিদিত হলেও কেউ কেউ যে সাহিত্য পত্রিকাকে রদ্দি কাগজ হিসেবে দেখে সেরকম বাঙ্গালিও হরিদ্বারে দেখেছি। কমিটির সিদ্ধান্তেই সুবর্ণপত্রের একটা ন্যূনতম মূল্য রেখেছিলাম ও পুজোর মাঠে স্টল লাগিয়েছিলাম। সেখানে যখন পরিচিত একজনকে পত্রিকাটি কেনার অনুরোধ করি সে তখন বলেছিল-‘ কী হবে এটা নিয়ে, রেখে দাও ওগুলো পরে কেজি দরে কাবাড়িকে বিক্রি করে দিও।’ তা এরকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে স্বরূপদার মত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও কর্মঠ একজন শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষককে পাশে না পেলে পত্রিকা বের করা সম্ভব হত না। তার উদ্যমেই আমরা দিন-রাত এক করে সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলির সুষ্ঠ সম্পাদনার সাথে সাথে সুবর্ণপত্র প্রকাশ করেছি। সাহিত্যপ্রেমী বাঙ্গালিদের পুজো মানে যেমন দেদার আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, তেমনি দুপুরগুলো একান্তে পুজোবার্ষিকী পত্রিকার সাথে কাটানো- ঠিক এই ফ্লেবার টাই আমরা তৈরি করেছিলাম সেবছর। ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছিলাম বাৎসরিক পুজো সংখ্যার কাজটি পুজোকমিটি প্রতি বছরই করুক। কিন্তু বেশিরভাগ সদস্য রাজি না হওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। তবে সেইসূত্রে হরিদ্বার থেকে ‘অলীকপাতা’ নামের একটি অনলাইন পত্রিকা ও হেমন্তলোক নামের একটি ছাপা পত্রিকা প্রকাশনার বীজ বপন শুরু হয়ে যায়।
এভাবেই বাঙ্গালীর কাছে শিল্প ও সাহিত্যের চর্চা যে পুজো তথা ধর্মাচরণের সমার্থক হয়ে উঠেছে সে নিজবাসেই হোক বা পরবাসেই সে কথা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আর পুজোর কটাদিন সমগ্র বিশ্বের বাঙ্গালিরা যেন একটি গ্রামেরই বাসিন্দা হয়ে যায় তাদের এই নিজস্ব চেতনার আলো মেখে।
হরিদ্বারের পুজো ও এক সাধক কবির ভ্রমণ
সালটা ২০২১, হেমন্তলোকের সেবারে ক্রোড়পত্রের বিষয় কবি জহর সেনমজুমদার। কলকাতার ছাপাখানা থেকে পুজোর আগে আগেই পত্রিকা বেরিয়ে যাবে। এদিকে বিগত প্রায় দেড়বছর ধরে কোভিড মহামারীর প্রকোপ থেকে বিশ্ব একটু একটু করে ঘোমটা খুলছে। ২০২০ সালের পুজো হল না। শুধু প্রতীকী ঘটপুজো হল এক শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। এযাবৎ ভেলের দুর্গা পূজা হতো একটি স্কুলের মাঠে। আয়তাকার বিশাল মাঠের উত্তর প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে একটি পাহাড়ি ঝোরা। শরৎকালে তার দুপ্রান্ত ঘন কাশফুলে সাদা হয়ে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে মেঘের ঢেউ খেলছে। নদীর ওপারে রাজাজী ন্যাশনাল পার্কের একটি অংশ শিমূল, পলাশ, শিশু ও শালের বন ছোট্ট একটি ভূমিকা করেই শিবালিক পাহাড় হয়ে গেছে। এমন একটি পুজো মণ্ডপে এলে যে কারোরই ডুয়ার্সের কোনও দুর্গাপুজোর মণ্ডপ বলে ভ্রম হতে পারে। যাই হোক সেই স্কুল মাঠ ও মাঠের একপ্রান্তে পাকা বাঁধানো মঞ্চের মায়া ছেড়ে পুজো কমিটি চলে এল সেক্টর ফোরের শিবমন্দিরে। কারখানার পাঁচিল ঘেঁষা মন্দির চত্বরটি ঘন ঝোপঝাড় ও ছোট উপবনের আড়ালে এক মৌন ঋষির মতো যেন বসে আছে। কোভিডের কারণে এবারে কোনও স্পনসর নেই। চাঁদাও যৎসামান্য। এমন অবস্থায় মন্দিরের হলঘরেই ছোট করে দেবীর আরাধনার আয়োজন। শিখা অষ্টমীর অঞ্জলিতে ব্যস্ত। আমি দুই মেয়েকে নিয়ে মন্দিরের আমবাগানে বসে আছি। মূল মন্দির ছাড়াও এদিকে একটি ছোট মন্দির আছে। স্থানীয় কেউ কেউ বলে এখানে নাকি কোনও এক সাধক সিদ্ধি লাভ করেছিল কোনও এক কালে। সৃজা , অদ্রিজা খেলছে। আমি বসে বসে সেই সাধক ও সেই কাল নিয়ে ভাবছি এমন সময় জহরদার ফোন- ‘ শিবু আমি আগামীকাল হরিদ্বার আসছি।’
পরদিন ঝোলায় হেমন্তলোক ভরে স্কুটি নিয়ে হরিদ্বারের মতি বাজারের ভিড়ভাড় কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম হোটেল আলপনাতে। এখানেই উঠেছেন কবি জহর সেনমজুমদার তাঁর পরিবার ও আত্মীয় নিয়ে। হোটেলে খোঁজ নিয়ে জানলাম তাঁরা ঘুরতে বেরিয়েছেন। জহরদাকে ফোন করে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হর-কি-পৌরির অলিগলি ঘুরে ঘুরে, তীর্থযাত্রীদের গা ঘেঁষে ঘেঁষে, টোটো, রিকশার ধাক্কা সামলে অবশেষে কবিকে ধরা গেল মনসা মন্দিরের পায়ে হাঁটা পথের শুরুর মুখে। হেমন্তলোকের কবি তখন হরিদ্বারের অলিগলি, পুরানো বাড়ি ও দোকানের ভিড়ে স্মৃতি খুঁজে বেড়াচ্ছে। হয়তো কবিতাও! জহরদার সাথে পরিচয় ছিলই, বাকি তাঁর পরিবার ও আত্মীয়দের সাথেও পরিচয় হল। এরপর হাঁটতে হাঁটতে সবাই মিলে পৌঁছলাম বিষ্ণুঘাটে। হর-কি-পৌরি ঘাট থেকে কিছু আগেই ছিমছাম এই ঘাটে ভিড় একটু কম থাকে বলে আমার বেশ পছন্দ। কখনো কখনো গঙ্গার হাওয়া খেতে মন চাইলে পরিবার নিয়ে এখানেই এসে বসি। তাই হেমন্তলোক পত্রিকার উদ্বোধন করবার জন্য এর চাইতে আর সুন্দর জায়গা আর কী হতে পারে! আর সৌভাগ্যক্রমে ক্রোড়পত্রের কবি স্বয়ং যেখানে হাজির! এর আগেই অবশ্য কলকাতার পথে কবির হাতেই পত্রিকার উদ্বোধন একবার হয়ে গেছে। সেই অনন্য নজিরে সাহায্য করেছিল ক্রৌঞ্চদ্বীপ পত্রিকার সম্পাদক স্নেহাশিস রায়।
হিমালয়ের কোল থেকে নেমে আসা পান্নাসবুজ হিমগলা জল নিয়ে বয়ে যাচ্ছে নবমীর গঙ্গা! তাঁর সামনে হেমন্তলোক হাতে তুলে নিয়েছেন কবি জহর সেনমজুমদার! এ এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত!
তখনও সন্ধ্যে হতে বাকি। তখনও নবমীর নিশিতে পায়নি আমাদের। মতি বাজারের গলি জুড়ে বাঙালি টুরিস্টদের পোশাক থেকে বাংলা অক্ষর টুপটাপ ভোরের শিউলির মতো ঝরে পড়ছে। স্থানীয় দোকানীদের গলাতেও ভাঙা ভাঙা বাংলা শব্দ! চা-দোকানীর ডান হাতের মগ থেকে বাঁ হাতের মাটির ভাঁড়ে বিদায় বেলার সুরের মতো ঝরে পড়ছে আসামের সিটিসি চায়ের সুবাস। তা দেখে জহরদার চা-পিপাসা পায়। চায়ের তেষ্টা মিটে গেলে সবাই মিলে গেলাম কনখলের আনন্দময়ীর আশ্রমে। বিখ্যাত আনন্দময়ী আশ্রমের দুর্গাপূজা হরিদ্বারে বিশেষ প্রসিদ্ধ। সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও নিয়মনিষ্ঠা করে পাঁচদিন মায়ের পূজা হয় এখানে। প্রতিমা দর্শন ও প্রসাদ গ্রহণ করার পর আমরা বসলাম গিয়ে আনন্দময়ী আশ্রমের ঘাটে। এখানে কোনও টুরিস্টের যাতায়াত নেই। নেই কোনও আশ্রমিকের ব্যস্ততা। রাস্তার ওপারে মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঢাক বাজছে। সবাই ওখানেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে আছে। আর এদিকে নদীর কলকল শব্দমুগ্ধ, সন্ধ্যার ঝিঁঝিঁমুগ্ধ, নবমীর বিষাদমুগ্ধ হয়ে মূর্তির মতো বসে আছি আমরা পাঁচজনা!














Comments