তুমি কোন অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

কলকাতার দুর্গাপুজো তো শুধুমাত্র একটা উৎসব নয়, তা একই সঙ্গে একটা সাংস্কৃতিক যাত্রাপথের মানচিত্র। এখানে সংস্কৃতি বলতে আমি অবশ্যই তাকে জড়িয়ে থাকা অর্থনীতিও বলছি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে বলছি - সেই পুজোকে ঘিরে থাকা বর্ণ, গন্ধ আর রঙ। একেকটা এলাকার পুজো একেকটা বিশেষ চরিত্র। এই যেমন উত্তর কলকাতার পুজোর যে গন্ধ, তার থেকে দক্ষিণ কলকাতার পুজোর গন্ধ আলাদা। রঙ আলাদা। এমনকি শব্দও আলাদা।

এই যেমন ধরুন না, আমার এলাকার পুজো। আমার ছোট্ট পাড়াটাকে যদি একটা বড় বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু ধরি তাহলে তার সোজা, উলটো, ডাইনে, বাঁয়ে – যেদিকেই যাই না কেন, একেক দিকে একেক রকম রঙ। কত ইতিহাস। কত ইতিহাসের মলিন হওয়া। কত আলাদা আলাদা তার রঙ, কত আলাদা আলাদা তার স্বরূপ। নিজের এলাকা বলে বলছি না, এই বিন্দুটাকে ধরে একটা বৃত্ত আঁকি যদি, তাহলে আক্ষরিকা অর্থেই দুর্গাপুজোর একটা ডায়াস্পোরার হদিশ পেয়ে যাব। সেখানে হাই সেলিব্রিটি ঝকঝকে পুজোও যেমন, আবার তার আশে আআত মলিন কিন্তু বড় আন্তরিক পুজো্... হ্যাঁ, তাও আছে। ভাবছেন কী ঘুরে আসবেন নাকি বন্ধুরা, হাঁটবেন নাকি আমার সঙ্গে এই যাত্রায়? চলুন...

আসুন, পুজোয় কবে কোথায় যাবো, তার একটা তালিকা করে ফেলি। সেইমতো হাঁটতে হবে কিন্তু। পুজোয় হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখার মজাই তো আলাদা। আসুন তাহলে, ষষ্ঠীর সন্ধে দিয়েই শুরু করা যাক।

ষষ্ঠী : একটা আমার পাড়া বলতে দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী মোড় পেরিয়ে টালিগঞ্জের দিকে সামান্য এগোলে, ডানদিকে একটা পুরোনো বাজার সাদার্ন মার্কেট – তার পিছনে একটা ছোট্ট রাস্তা। ভবানন্দ রোড। সব মিলিয়ে ২০০ জনের বাস। ব্যস। এতটুকুই। ১৯৩২ সালে সেখানকার বাসিন্দারা ভবানন্দ রোড বয়েজ ক্লাব নাম দিয়ে শুরু করলেন কালীপুজো। ১৯৩২ সালে বাবার জন্ম। সেই বাবা এবং তার বন্ধুরা, সঙ্গে আরও কিছু উৎসাহী লোকজন ১৯৭৮ সালে,  কলকাতায় তখন বন্যার আঁচ লেগেছে, শুরু করলেন দুর্গাপুজো। পাড়ায় আমরা তখন দশজন বাচ্ছা ছেলেপুলে। কেউ ১ বছর, কেউ ২, কেউ বা সদ্য। আমাদের দিদিদের ব্যাচে আরও ৮ জন। পাড়ার ছোটদের জন্য শুরু হল দুগ্‌গাপুজো। তারপর নানা ঘাতপ্রতিঘাতে পথ চলা। ২০১২ সালে পাড়ার সব মেয়েরা গঠন করলেন নারীমৈত্রী। সে বছর তাঁদের আয়োজনে আয়োজিত হল  কালীপুজো। ২০১৩ থেকে তাঁরাই আয়োজন করে চলেছেন দুর্গাপুজো। আমরা ছেলেরা আছি, কাজে ক্ররমে, দৌড়ঝাঁপে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন মেয়েরাই। মাতৃপূজা করেন মায়েরাই।

আমাদের পাড়ার পুজো আসলে চরিত্রগত ভাবে আমাদের বাড়ির পুজো। প্রত্যেক দিন সকাল সন্ধে মায়ের পুজোয় যে ভোগ দেওয়া হয়, তা কোনো না কোনো বাড়ি থেকে তাঁদের নিজ উদ্যোগে আসে। আমরা নিজেরা ঠাকুরের শাড়ি কিনি। পটুয়াকে দিয়ে আসি। আমাদের মা সেই শাড়িই পরে আসেন। কার্তিক, গণেশ, এমনকি অসুরও। সবাই মিলে আল্‌পনা দিই। সমস্ত মণ্ডপের ভেতরে আমরাই নিজেরা সাজাই। রাত জেগে মণ্ডপেই আড্ডা হয়। চতুর্থীর সন্ধেবেলা হয় আনন্দমেলা। রতিদিন সন্ধেবেলা নিজেরাই গান বাজনা করি। মেয়েদের পুজোয় মেয়েদের সব শেকল ভাঙা পড়ে। যে কাকিমা তাঁদের বাড়ির শাসনে সন্ধে ৭টার পরে বাইরে থাকেননি কোনোদিন, তিনি এবং তাঁর চেয়ে বেশি বয়সের মেয়েরাই রাত ১২টা...১টা অব্দি মণ্ডপে বসে হৈ হৈ করেন। দশমীর দিন মেয়েরাই... আক্ষরিক অর্থে আট থেকে আশি মেয়েরাই ধুনুচি নাচ নাচেন।

সপ্তমী: কী? তাহলে, হল তো এ পুজোর প্রথম ঠাকুর দেখা... আমাদের পাড়ার? চলুন, তাহলে এবার আমার পাড়া থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে। ওই তো আপনাদের চেনা মুদিয়ালি ক্লাব। তারপরেই শিবমন্দির। মাঝখানে সে সরু গলিটা দিয়ে বেরোলেন, ছোট্ট পাড়া, কিন্তু কী সুন্দর পুজো... টি এন মজুমদার স্ট্রিট। শিবমন্দির থেকে বেরিয়ে এদিকে বেংগল ইউনাইটেড ক্লাব। সেবক সংঘ। বেরোবার মুখে ভারী সুন্দর জালান বাড়ির পুজো। আর ওই যে নীল দুর্গা। ওটাও বাড়ির জালান বাড়ির পুজো। নীল দুর্গা। ওনারা স্বপনে অমন রূপে মা-কে পেয়েছিলেন। চলুন এবার সাদার্ন এভিনিউয়ের দিকে যাই। সে কী? এর মধ্যেই পা টনটন করছে? নাকি নতুন জুতোয় ফোশ্‌কা। আচ্ছা বেশ, বুলেভার্ডের ভেতর শতদল-এর পুজো। একটু বসে নিন তাহলে। এখনও অনেক ঠাকুর দেখা বাকি।

আরেকটু এগোলে লেক মার্কেট অঞ্চলে বহু পুরোনো পুজো পরাশর রোড, জনক রোড। আমি আর এগোব না। পাড়ায় রচুর কাজ। আপনারা থামবেন কেন বালাই ষাট? ওই তো... এগোতে থাকুন – দেশপ্রিয় পার্ক, ত্রিধারা, সমাজসেবী, বালিগঞ্জ কালচারাল হয়ে ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক, হিন্দুস্থান পার্ক, সিংহী পার্ক হয়ে সোজা একডালিয়া, ফাল্গুনী সঙ্ঘ আর দুর্গাবাড়ি।

মাঝপথে ক্ষিদে না পেলে বুঝব আপনারা বাঙালিই নন। বলি, ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের উল্টোদিকে শংকরের ফিস ফ্রাইয়ের দোকানটা তো আর এমনি এমনি নয়। ও খুঁজে এতে হবে না মশাই। ম’-ম’ করা গন্ধ আপনাকে এমনিই টেনে নিয়ে যাবে। ও আচ্ছা, আপনি আবার আমারই মতন বিরিয়ানিতে আসক্ত। ডোন্ট ওয়ারি, মুদিয়ালি ক্লাবের গায়েই বিরিয়ানিশ্‌ক, দেশপ্রিয় পার্কে অঞ্চলে জিশান, লেক মার্কেটে আউধ ১৫৯0... তিন মাইল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অড়ুন। কে আটকাচ্ছে? না হলে লেক স্টেডিয়ামের কাছে ওহ্‌ লেবানিজে শাওয়রমা চেখে দেখুন। দক্ষিন ভারতীয় খাবার চাইলে প্রেমা ভিলাজ কিংবা বানানা লিফে নিরামিষ আর নয়ত মুদিয়ালি ক্লাবের পাশে পাপ্পাডাম্‌-এ অথেন্টিক মালাবারি ও কেরালিয়ান আমিষ রান্না পেটে পুরে হাঁটা দিন পরের পুজোর দিকে। মধ্যিখানে একবার গিরিশ দে-র অথেন্টিক জলভরা-টা খান দুয়েক হবে না? কিংবা রাসবিহারী মোড়ের নলিন চন্দ্র দাশ-এ চকোলেট মনোহরা? বা কামধেনুর মালাই রোল। ও আপনার সুগার... মিষ্টি খান না? মশাই, আমি খাই। আপনার খাওয়ানোর মন থাকলেই হল।

অষ্টমী : আজ চলুন, অন্য আরেকটা দিকে যাই। সকালবেলা অঞ্জলি দিয়ে মন বেশ খুশি। আমাদের ঘটিবাড়িতে আবার অষ্টমীর দিন ভাতের কিচ্ছু চলে না। আজ বেলায় লুচি, আলুর দম, ফুলকপির ডালনা আর ছানার মুড়কি। অমন করে দেখলে হবে? বলেছিলাম তো, চলে আসুন সকাল সকাল। যাক গে, সন্ধে গড়িয়ে যাচ্ছে যে ! চলুন আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়া যাক। আজ পাড়া থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকে যাবো। ওই যে সামনেই ত্রিকোণ পার্কের পুজো। দেখে নিয়ে চলুন – সোজা রাসবিহারী মোড়ের দিকে। দু’দুটো সুপার স্টার পুজো। প্রত্যেকবার নতুন নতুন থিম দিয়ে চমকে দেওয়া বাদামতলা আষাঢ় সংঘ। তার উল্টোপিঠেই গত কয়েক বছরে প্রচাররের আলোয় চলে আসা ৬৬ পল্লি। এবার যদি মন চায় এমন সুপার স্টার পুজোই দেখব, তাহলে ধরুন একটা অটো। চেতলা ব্রিজ পেরোলে চেতলা অগ্রণী, আরেকটু এগোলে সুরুচি সংঘ।

আর যদি মন চায় পুরোনো বনেদী পুজোর গন্ধ নেবেন, তাহলে চলুন এগোই কালিঘাটের দিকে, সেখান থেকে সোজা ভবানীপুর। প্রথমেই পড়বে সংঘশ্রী। দক্ষিণ কলকাতার প্রথম পুজো যেখানে আজ থেকে ৫০ বছর আগে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড আর সাইক্লোরামা স্টেজ ব্যবহার করে পুজো শুরু হয়। ছোটবেলায় শুনেছি, তখন নাকি ভিড় ভেঙে পড়ত। তখনও শারদীয়া প্রতিযোগিতা আর পুরস্কারের চল শুরু হয়নি। আজ সেই সংঘশ্রীর দিন গিয়াছে। তবু, চাইব একবারটি উঁকি দিয়ে যান। ওই তো সামনেই পিঠোপিঠি দুটো পুজো। ফরওয়ার্ড ব্লক আর যুব মৈত্রী। ইদানীং ভারী সুন্দর প্যাণ্ডেল বানাচ্ছে ওরা। এই তো ! চলতে চলতে প্রায় হাজরায় চলে এলাম। এদ্দুর এলাম, চলুন, আপনাদের সংগেই ২৩ পল্লির দুর্গা মন্দিরে একবার প্রণাম করে আসি। যজ আর বেশিদূর যাব না। এবার আমায় পাড়ায় ফিরতে হবে। আজ রাতের আড্ডায় ছেলের দলের সঙ্গে মেয়েদের দলের গানের লড়াই। এ খেলা ছাড়া যায়? আপনারা বরং এগোন। ও হ্যাঁ, ফেরার সময়ে শ্রীহরি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে খান চারেক কচুরি, ছোলার ডাল আর একটু বড় সাইজের ল্যাংচা নিয়ে আসবেন তো! আজ অষ্টমী। আজ আমার ভাতের কিছু চলবে না।

নবমী : নবমীর সন্ধে থেকেই কী মনখারাপ লাগে না? আজ বেশি দূর যেতে ইচ্ছে করছে না। আজ একটু পাড়াতেই বসি। মা-কে দু’চোখ ভরে দেখি। বলেছিলাম না, সময়ের নিরিখে একেকটা পুজো একদিন আলো পায়, আবার একদিন দেখি তারা আবার ফিরে গেছে আলোহীনতায়, এই যেমন টালিগঞ্জ রেলব্রিজ পেরিয়েই নবপল্লীর পুজো। সাধারন পাড়ার পুজো একদিন শারদ পুরস্কারে চলে এল প্রচারের আলোয়। তারপর আস্তে আস্তে আবার কখন যে আলো সরে গেল। তবু, মা তো আসেন সেখানে। প্রত্যেকবার সেখানেও মা চলে যাওয়ার সময়ে সকলের চোখ দিয়ে জল ঝরে। পুজো তো মনের ভেতর। ঝকমকে না হলেও, যত সামান্য আয়োজনই হোক, মা তো আমাদের সকলের মাথাতেই হাত রাখেন, তাই না... বলুন? নিন, হাত পাতুন, মায়ের আরতি শেষ হয়েছে। এই সামান্য প্রসাদী সন্দেশ রেখেছি।

বিশ্বাস করুন। আজ মায়ের দিকে তাকিয়ে সারাটা রাত বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। আজ রাতটাই তো। মা-কে গান শোনাব। আজ পাড়ায় জোর গানের জলসা হবে একটু পরেই। বাইরের কেউ না। আমরাই সকলে মিলে গান গাইব, কবিতা বলব, নাচব... আজকের রাতটাই তো বলুন... আজ আপনারা যান, ঘুরে আসুন, তেমন হলে মেট্রো রেল ধরে সোজা উত্তর কলকাতা। দক্ষিণ তো তা-ও কিছুটা হল। ঘুরে আসুন। আজকের রাতটাই তো...  

About Author
&
Photographer

লেখক : কৌশিক চক্রবর্তী

৯০ দশকের কবি ও গদ্যকার

কাব্যগ্রন্থ : মায়ের লেখা রান্নাঘর (২০০০),অন্তর্বর্তী রূপকথার প্রচ্ছদ (২০০৩),করোগেটেড ওভারডোজ (২০০৭),ভাষা হারানোর অন্ধ মাঠ (২০১০),ঋতুহীন মুক্তাঞ্চল (২০২২),রাত্রির রবীন্দ্রসঙ্গীত (২০২৩)।

উপন্যাস: অন্তহীন বেদনাঋতু (২০২০)

প্রবন্ধগ্রন্থ: রূপান্তরের চিত্রকলা : ধ্রুপদী বাংলা কবিতা (২০২২),প্রান্তিকের পরের স্টেশন : বাংলা কবিতায় ছোটগল্পের আভাস (২০২৩)

অনুবাদ: Selected Poems – Sabyasachi Hazra (২০২২)

সম্পাদনা: নির্বাচিত কবিতা – প্রদীপ চক্রবর্তী (২০২৩)

আলোকচিত্রী: কৌশিক চক্রবর্তী

৯০ দশকের কবি ও গদ্যকার

কাব্যগ্রন্থ : মায়ের লেখা রান্নাঘর (২০০০),অন্তর্বর্তী রূপকথার প্রচ্ছদ (২০০৩),করোগেটেড ওভারডোজ (২০০৭),ভাষা হারানোর অন্ধ মাঠ (২০১০),ঋতুহীন মুক্তাঞ্চল (২০২২),রাত্রির রবীন্দ্রসঙ্গীত (২০২৩)।

উপন্যাস: অন্তহীন বেদনাঋতু (২০২০)

প্রবন্ধগ্রন্থ: রূপান্তরের চিত্রকলা : ধ্রুপদী বাংলা কবিতা (২০২২),প্রান্তিকের পরের স্টেশন : বাংলা কবিতায় ছোটগল্পের আভাস (২০২৩)

অনুবাদ: Selected Poems – Sabyasachi Hazra (২০২২)

সম্পাদনা: নির্বাচিত কবিতা – প্রদীপ চক্রবর্তী (২০২৩)

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget