দুই ঋতুর দেশ দিল্লির দুর্গাপুজা

দিল্লি কাল পাত্র নিয়ে কিছু জানো? অথবা ভার্চুয়ালিটি নিয়ে। কোনটা মতবাদ আর কোনটা ধানবাদ ? এতো যখন তর্ক জমে উঠেছে, দিল্লির আবহাওয়া নিয়ে দুকথা শোনা যাক । নিঃশ্বাস ধীর করে নিয়ে এসে বসা যাক ধিল্লিকাপুর। উত্তরাবর্তের দুর্গাপুজো পরিক্রমা নিয়ে বিস্ময়যাত্রার দিল্লির কতিপয় কথা শোনা যাক । তবু এই দূরদেশে । বঙ্গপ্রদেশ থেকে আসা বাঙ্গালীদের দুর্গাপূজা ঘিরে কোনায় কোনায় ঝলমলিয়ে ওঠা দিল্লির এক অপরূপ সৌন্দর্য নিদর্শন। পাঁচশতের অধিক রেজিস্টার্ড দুর্গাপূজা হয় দিল্লিতে। দিল্লি এন সি আর এলাকায় বাইশ লক্ষ বাঙ্গালির বাস ।
দিল্লি, এমনিতেই রুক্ষমাটির দেশ, কাঁটা ঝাড়ের দেশ এই উত্তরা । আরাবল্লি পাহাড়ের নীচে রাইসিনা হিলস। আবহমান কাল থেকে এর অঙ্গনে পুষ্পের থেকে রক্ত বেশী ফুটেছে । দিল্লির ঋতুপরিবর্তন নিয়ে দুকথা যদি বলা যায় ? 'দিল্লি দুটি ঋতুর দেশ' । ছয় ঋতুর ব্যাকরণ এখানে খাটে না । শীত আর গরম দিল্লির এই দুটি মাত্র ঋতু। একটু মডারেট করলে, বড়জোর দুটি ঋতুর সংখ্যা বাড়িয়ে তিন করা যায়। অর্থাৎ গরম, শীত ও বসন্ত । খানিকটা বর্ষা আছে , না থাকার মতো। আর দিল্লির তরুরাজীর বিশাল সম্ভার যখন তাদের পত্রালিকায় চিকচিকে সবুজের ডাক দেয় । বোঝা যায় বসন্ত এসেছে । লোকে বলে পতঝড় ।
আর একটা ঋতু আছে ভার্চুয়াল । শরৎ । সেটা ভাগীরথীর মতো পরিষ্কার , মাতলা নদীর মতোই বিস্ময়পুর । দিল্লিতে শরৎ আছে বাঙালির মননে , স্বপনে ও যাপনে। সেটা বোঝা যায় ঢাকে কাঠি পড়লে। দুর্গাপূজার আগমন যেন একটা ঋতু। এমনিতেই সারাবছরই মেলা লেগে আছে দিল্লি । বারো মাসে, তের মেলার দেশ। জায়গায় জায়গায় আবাসন, মহানগরের সবচেয়ে বড় মেলা হলো, বাঙ্গালিদের বারোয়ারী দুর্গাপূজা । দিল্লি উত্তর ভারতের শহর, স্থানীয় লোকেরা বলেন দশেরা । এই ঋতুটা সার্বভৌম ভাবে শুধু বাঙ্গালিদের । দূর পরবাসে আমরা সম্পূর্ণ অবাঙ্গালী হয়ে উঠতে পারিনি বলেই এই ঋতুর জন্য আমাদের অপেক্ষা থাকে। কখনো মনে হয়ে, চরম উল্লাসে ভার্চুয়ালিটি ভেঙ্গে ফেলি । এইভাবে ভার্চুয়াল দেশ, ভার্চুয়াল মাটি, ভার্চুয়াল বাঙ্গালিয়ানায় আমাদের এই প্রবাস জীবন । কেন যে দুর্গাপূজার শারদ উৎসব এতো মধুময় হয়ে ওঠে ।
মানুষ জাত ধর্ম নির্বিশেষে বঙ্গপ্রদেশ পাড়ি দিয়ে দিল্লিতে মাইগ্রেশন করেছে । দিল্লি এমন একটি মহানগর যেখানে অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দারাও চাকরি সূত্রে, ব্যবসা সূত্রে এসে বাসা বেঁধেছেন । অনেকেই ভাবেন অস্থায়ী , এই আর কটা বছর পার করে চলে যাবো দেশের বাড়ি । এই আশায় আশায় দিন কেটে যায় । দেশ ততদিন পালটে যায় । বাড়ি ততদিন বেহাত হয়ে যায় । দেশের বাড়ি আর ফেরা হয় না । এই রকম দিল্লি বাসীদের সঙ্গে আমাদের একদিন টিমারপুর দুর্গাপূজায় দেখা হয় । দেখা হয় মাতৃমন্দিরের মানুষের ঢলের সঙ্গে । যে মানুষ হাসপাতাল, রেলওয়ে, কর্পোরেট, সেনাবাহিনী, স্কুল, কলেজ, দোকানে ও কারো বাড়িতে পরিচারিকার কাজে দিল্লিতে এসে আর দেশে ফিরে যেতে পারেনি ।
দিল্লির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর এই এক সম্মিলিত পার্বণ দুর্গাপূজা , যা সম্ভবত শুরু হয়েছিলো পুরানো দিল্লির টিমারপুর বা কাশ্মীরি গেটের কাছাকাছি কোথাও । কলকাতা থেকে ভারতের রাজধানী যখন দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হলো , সরকারী কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা হলো গোল মার্কেট এলাকায় । ফতেহিপুর এলাকায় প্রবাসী বাঙ্গালিদের সংগঠনে মনে হয় দিল্লিতে দুর্গাপূজার প্রসার ও জনপ্রিয় হয় এক দশকে ।
আমার দুর্গাপূজার পরিক্রমা অবশ্য এতো ঘটা করে নয় । বছর পঁচিশ আগের কথা । তখন আমার তরুণ বয়স, থাকতাম পালম বিমান বন্দরে। একটা পুজো অবধারিত ভাবে পেতাম,সেটা হলো পিন্টোপার্কের পুজো। স্মৃতি বিজড়িত হয়ে আসে আজ । অনেক কিছুই ভালো মনে নেই । শুধু এই একটা ঋতু শরৎ কিনা তাই নিয়ে তুমুল তর্ক ছিলো বলে মনে আছে । শিউলির ঘ্রাণ আর শরৎ যেন সমার্থক ছিলো। কলেজ ফেরত ললনার বিনুনিতে ফুল গুঁজে দেবার কি অদম্য ইচ্ছা ছিল সে সময় । তার ওড়না উড়িয়ে চলে যাবার দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকা । পিন্টো পার্ক,এয়ারম্যানদের কোয়ার্টার এলাকা অথচ কি সবুজ তার স্মৃতি, দুর্গাপূজার চারদিন ভোগ আর প্রসাদ খেয়ে, ওয়ারেন্ট অফিসারের কন্যাসকলদের হা হা হি হি দেখে কেটে যেতো পুজো পরিক্রমা । দু একজন জাঠ তরুণী ছিলো।লম্বা ও স্লিম। শাড়ী পরতে পারতো না ।তাদের মুখেই প্রথম শুনি ‘দশেরা’ নামের শব্দটি।সেটা ছিলো বিজয় দশমীর দিন।হৈ হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে ট্রাকে করে যমুনাতে প্রতিমা বিসর্জনে যাওয়া।বলো দুর্গা মাই কি, জয়। দুর্গা দুর্গতিনাশিনীর আশীর্বাদে কখনো আমার পা পিছলে যায়নি ।
বরং, দিল্লিতে তখন একটু পা একটু একটু করে জমেছে। তখন এয়ারফোর্সে কাজ করতাম । আমি দূরদেশ থেকে আগত এক সৈনিক। সারা বছর ব্যারাকে আটকা থাকা ব্যাঘ্র যেন ছাড়া পায় । সেই সময়, জানতে পারলাম সি আর পার্ক, আর একটি পার্ক আছে। সেখানে চোদ্দটি দুর্গাপূজা বিশাল প্যান্ড্যাল আর অনন্ত বাঙ্গালীদের নিয়ে পাঁচ দিন ব্যাপী মহা মিলন মেলা উদযাপিত হয়। সি আর পার্ক এক বিস্ময়পুরী। সমবয়সী একজন বন্ধুর মোটরসাইকেলে চড়ে সেই প্রথম সি আর পার্কের পুজো দেখতে গেলাম। কি বিশাল ভিড় আর মানুষের ঢল। শিব মন্দিরের সামনে হাঁটা যায় না। বাইক, গাড়ি রাখার কোথাও জায়গা নেই। দুপাশে বাদাম-ভাজা, পাঁপড় ভাজা, জিলাপি, চাউমিন, মিষ্টি, খেলনার দোকান, জামা কাপড় ইত্যাদিতে সুসজ্জিত। সমস্ত দোকানিরা সেখানে বাঙালি, আশ্চর্য ব্যাপার । প্যাঁ পু বাঁশীর আওয়াজ । মেলা গ্রাউন্ডে নাগরদোলা । আলোয় আলোয় সি আর পার্ক সেজে উঠেছে বাঙালি হয়ে। লোকে, সি আর পার্ককে লোকে বলতো 'মিনিক্যালকাটা' । আমি তখন মফস্বলের তরুণ, সত্যি বলতে কি আমার কলকাতার অভাব কখনো মনে পড়েনি।
আমার বরং বাঙালী হয়ে উঠতে এক দশক লেগে গেলো । ততদিন নানান জাঁতাকলে ঠাসা খেয়ে, উন্নাসিক বাঙালির ব্যাবহারে অনেক বাঙালি হয়ে উঠেছি । ভুল বানানের বাংলা লিখে যে কতবার ঝাড় খেয়েছি। শুদ্ধ বাঙালী হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় বুঝলাম, আমরা কলকাতার নেই । আমরা কলকাতায় বাস করি না । আমাদের স্বতঃটাই এখন দিল্লির । ভুল বানানের দিল্লি । আমাদের একই খাবার থালায় এক সঙ্গে উঠে এসেছে তন্দুরী চিকেন ও ভাপা ইলিশ । আমাদের ভাষা বাংলা অথচ আমরা বাঙালি নই । দুর্গাপূজা এখনো হয় সি আর পার্ক সহ সমস্ত দিল্লিতে , তবে আগের মতো দোকানীরা আর বাঙালী নেই । সেই বাদাম ভাজা কেউ আর খায় না । পাঁপড় কোথায় হারিয়ে গেছে । জিলাপির রঙ্গে এখন পাঞ্জাবী পাঞ্জাবী গন্ধ । আমার কৈশোরে দেখা সেই জাঠ তরুণী এখন কোথায় কোন জাঠের ঘরের মস্ত ঘরণী । তাদের ছেলে মেয়ে এখন উন্নতবক্ষা রেশমি ওড়না চুড়িদার সালওয়ার । হয়তো এখন কলেজে যায় ।
দিল্লির দুর্গাপূজা এখন সত্যই প্রতিযোগিতার পুজো । কলকাতাকে টেক্কা দেওয়ার পুজো । কোথাও কোথাও বাজেট অনুযায়ী টেক্কা দিয়েও ফেলা যাচ্ছে । এখন এতো বানান ভুল আর হয় না । হিন্দি, ইংরাজির পাশাপাশি পত্র পত্রিকা বাংলায় বের হচ্ছে । কলকাতা থেকে বাংলা গানের শিল্পীরা দলে দলে পাড়ি দিচ্ছে দিল্লি শহরে। টলিউডের শীর্ষস্থানীয় গায়কদের নিয়মিত পূজামণ্ডপে আমরা দেখতে পাচ্ছি । দিল্লির পুজো পরিক্রমা এখন খবর । সব দিক থেকে দিল্লি স্বয়ং সম্পূর্ণ এখনো হয়ে উঠতে পারে নি বটে, তবে বাঙ্গালিয়ানায় এখন একটা আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে । সার্বিক জনপ্রবাহের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে ।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার পুজো দেখার সেই উন্মাদনা হয়তো নেই, তবে ঐতিহ্যবাহী কিছু পুজোর প্রতীক্ষা আমাদের থাকে । পুজোতে দু-তিনটে করে নতুন জামা প্যান্ট এখনো আমরা কিনি । পরিবারের মধ্যের পুজোর অনেকদিন আগে থেকেই সেই অপেক্ষায় দিল্লির ছোটরাও । শাড়ীর বাজারের দিল্লির রমণীরা বিশেষ পটু । বাংলার জামদানী, কাতান সিল্ক, বালুচুরী, কাঁথাস্টিচ ঘরে ঘরে সেজে উঠছে । পাড়ায় পাড়ায় ডোর টু ডোর শাড়ি সার্ভিস দিতে চলে আসছে শান্তিপুর, ফুলিয়া, রাণাঘাট থেকে । বিউটি পার্লারে এক মাস আগে থেকেই ভিড় । এপয়েন্টমেন্ট না হলে মনের মতো বিউটিসিয়ান পাওয়া যাচ্ছে না । সমস্ত স্তরেই পুজোর জন্য প্রস্তুতি রয়েছে । আয়োজক হিসাবেও নানান ধুম দেখতে পাচ্ছি । এদিক ও দিক থেকে হুট করে কেউ হোয়াট-এপ গ্রুপে ঢুকিয়ে দিচ্ছে । গুড মর্নিং দিয়ে শুরু হচ্ছে, চাঁদা তোলা দিয়ে শেষ হচ্ছে । প্রতি সপ্তাহে মিটিং । অনুষ্ঠানে সংগীত, নাটক, সমবেত নৃত্য পরিবেশনের জন্য রিহার্সালের ধুম পড়েছে। দিল্লির শিশুরা করবে বাংলায় কবিতা পাঠ । কয়েকটি প্যান্ডেলে গতবার বাংলা নাটক দেখেছি । একটা প্যান্ডেলে তো আমাদের কবিতা পড়ার জন্য ডাক দিয়েছে ।
দুর্গাপূজার কমিটিদের জন্য এই পুজো হল পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি উত্তর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া । পুজোতে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যা ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতিতে পূর্ণ। তারা আরও বিশ্বাস করে যে দুর্গাপূজা মানেই দান, তাই তারা বিভিন্ন অনুদান কর্মসূচির আয়োজন করে। তারা পূজার একটি ঐতিহ্যবাহী ফর্ম অনুশীলন করে যেখানে তারা প্যান্ডেলের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলে সেইসাথে প্রতিমা বিশুদ্ধ রাখা প্রয়াস দেখা যায়। পার্মানেন্ট পূজারী রাখা হয় দিল্লির কালীবাড়ির আয়োজনে ।
দুর্গাপূজা আমাদের অনেক বাঙালি করে দিয়েছে বলা যায়। শিকড়ের টান টের পাওয়া যায় এই প্রবাসে । মহালয়া দিয়ে শুরু হয় । শিউলির গন্ধ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে । বাংলার টান শুধু ভাষার টান ও বটে । বাংলা সংস্কৃতির খাদ্য, বস্ত্র, সঙ্গীত, নৃত্য , প্রেম ভালোবাসা বাঙ্গালির মতো । বাঙ্গালি হয়ে ওঠার অপেক্ষা তো আছেই। দিল্লির পুজোর বিশেষ দিক হলো এই পাঁচ দিনের উৎসবে, বাড়িতে রান্না হবে না । আনন্দমেলা দিয়ে শুরু । আনন্দমেলাটা আমার কাছে নতুন । আমার ছোটবেলা কেটেছে বহিরগাছি, রাণাঘাট, বীরনগর, বনগাঁয় দুর্গাপূজা দেখে । আমি সেখানে কোনদিন আনন্দমেলা দেখিনি । পঞ্চমীর দিন যখন প্রতিমা ও প্যান্ডেল সেজে উঠছে, সেদিন এখানে বাড়িতে রান্না করা খাবার প্রদর্শনের একটি মেলা হয় । সেটাই আনন্দমেলা । সেখানে পিঠে, পুলী পায়েস , বিভিন্ন মাছ, খাসির মাংস ও অন্যান্য সুস্বাদু বাঙালী রান্নার জন্য পুরস্কৃত করা হয় । আমরাও চেখে নিতে পারি বাঙ্গালির ঐতিহ্যবাহীর খাবারের স্বাদ । আর ষষ্টি থেকে শুরু হয়ে যায় প্রতিমা দেখার ভিড় । যতটা না পুজো, তার থেকে বেশী নিজের রাজ্য থেকে পাড়ি দিয়ে অন্য রাজ্যে ভ্রমণের ভিড় । দুপুরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে দেদার ভোগ খাওয়া। পর্যাপ্ত খিচুড়ি, পোলাও, পনীর ও সাদা ভাত । লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন গরীব, বড়লোক, মধ্যবিত্ত । উকিল, ডাক্তার, মুদীর দোকানী, খুচরা ব্যবসায়ী, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার , সরকারী অধিকারী ও গৃহবধূ । কোন মারামারি ঠেলাঠেলি নেই । কোন মস্তানি, প্রণামী, দালালী চাড়াই নির্বিঘ্নে মায়ের পূজার প্রসাদ ও পেট-পুরে ভোগ সংগ্রহ করা যাচ্ছে । অবশ্য, কিছু পেইড ব্যবস্থাও চোখে পড়েছে । যারা একটু বিশেষ 'থালি' অর্ডার করবেন, তারা 'মূল ভোগ' নামের একটি সজ্জিত থালায় নানান ব্যঞ্জনসহ ভোগ পাবেন । আর রাতের দিকে, সম্পূর্ণ নিজের খরচে চলে বাঙ্গালীর রসাস্বাদনের পর্ব । দিল্লির নিজস্ব রেস্তোরা চেইন করিম, মাল্টি ন্যাশনালদের ভিড় । বিকানীর, করিম, বিজলী গ্রিলস, ডমিনোজ, ক্রিস্পি, জাইকা, গালিব কাবাব, আলইউসুফ, ইকবাল, চুস্কি । এন্তার দিল্লির খাদ্য-রসিক ধর্ম-জাত-পাত নির্বিশেষে এসে ভিড় জামায় । আমার পছন্দ থাকে ছোট খাদ্য ব্যবসায়ীদের মুখরোচক রেসিপি । আমরা বলি স্ট্রিট ফুড । তন্দুরী চিকেন, আফগানি চিকেন , ললিপপ । সি আর পার্কে পাওয়া যায় সমস্ত মাছের চপ, ডিম চপ, ভেজ চপ, মোগলাই, চাউমিন ও চাইনিজ ফুডের মেলা । কুলপি মালাই, তন্দুরী রুটি, রুমালী রুটি ও কাবাব । বিরিয়ানির রকমফের নিয়ে লেখা যেতে পারে পূর্ণ নিবন্ধ । এমনিতেই দিল্লিতে সারা বছরই মেলা । তবুও, দুর্গাপূজার মেলায় এতো ভিড়, যেন দাঁড়ানোর জায়গা নেই ।
আমি এনজয় করি পরিবারকে একসঙ্গে পেয়ে । স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র নিয়ে আমার সংসার । সামান্য যাপন প্রক্রিয়া । কোন কোন দুর্গাপূজায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমার ভাই-বন্ধুরা আসেন । নতুন কাপড় জামা পরে আমরা বেরিয়ে পড়ি দিল্লি দর্শনে । দিল্লির মন্দির মার্গের কালীবাড়ি না গেলে দিল্লির দুর্গাপূজা সম্পূর্ণ হবে না। দিল্লিতে অনেক কালীবাড়ি। দক্ষিণ দিল্লির কালীবাড়িও প্রতিবার প্রতিমা দর্শনে আমরা যাই । ময়ূর বিহারের কালীবাড়ি আরও একটি জায়গা যেখানে বেশ কিছুদিন ধরেই দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। তারা বিকেলে দর্শনার্থীদের পরিবেশন করা চমৎকার 'ভোগ' বা প্রসাদের কারণে লোকেরা তাদের পূজা প্যান্ডেলে টানছে। এটি থিম পূজার আয়োজন করার জন্যও পরিচিত যা তারা প্রতি বছর পরিবর্তন করে। চারদিনের পূজার সময় স্থানীয়রা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বলে পূজাটি সব মহিমায় পালিত হয়।
কিছু ঐতিহ্যবাহী পুজো মধ্যে পড়ে, কাশ্মীরি গেট দুর্গাপূজা । কারণ এটি শহরের প্রাচীনতম দুর্গা পূজা। বর্তমানে আলিপুর রোডের বেঙ্গলি এসআর সেকেন্ড স্কুলে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এটির উৎস ১৯১০ সাল নাগাদ খুঁজে পাওয়া যায় । এটি একটি 'বারোয়ারি' পূজা হিসাবে শুরু হয়েছিল । বলা যায় এটি ১১০ বছরের চিহ্ন অতিক্রম করেছে। প্যান্ডেলটি দিল্লির অধিবাসীদের কাছে নস্টালজিয়া অনুভব করায় । কারণ এটি এখনও ঐতিহ্যগতভাবে 'ডাকার সাজ' এ সজ্জিত । পূজা কমিটি প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে এবং তাদের জন্য, দশমীর সন্ধ্যায় তারা প্রতিমা বিসর্জন করতে যমুনার দিকে যায়।
আমার সবচেয়ে সুন্দর ও সুচারু পুজোর ভিতর মাতৃ মন্দিরের পুজোকে ভালো লাগে । তারা নিরলসভাবে পূজার আয়োজন করেছে যা স্থানীয় অংশগ্রহণকেও আকর্ষণ করে। তারা ইভেন্টটি পরিচালনা করার জন্য তাদের ঐতিহ্যগত এবং ক্লাসিক পদ্ধতির কারণে সারা বছর ধরে বেশ কয়েকটি পুরষ্কার পেয়েছে।
প্রতিবছর কিছু পুরানো পুজো খুঁজে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি । এ বছর ও যাবো নয়ডা এলাকাতে। আগের বছর দর্শন করে এলাম মিন্টো রোড পূজা সমিতি যেটা ১৯৪০ সাল থেকে দুর্গা পূজার আয়োজন করে আসছে । এই পুজোর পুরোটাই ঐতিহ্য, এবং এটি মূর্তি থেকেই শুরু হয়। প্যান্ডেল সহজ, এবং তারা বিভিন্ন পুরস্কার জিতেছে. কমিটি দুর্গাপূজা জুড়ে বিশেষ করে সন্ধ্যায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে থাকে। তারা তাদের ভোগ বা প্রসাদ সবার মধ্যে বিতরণে বিশ্বাসী। সুতরাং, চমৎকার খাবারের স্বাদ পেতে সময়মতো উপস্থিত থাকা জরুরী। এগুলি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রাচীনতম দুর্গাপূজাগুলির মধ্যে একটি। দিল্লিবাসী হওয়ার কারনে একটা ঐতিহাসিক ও বটে ।
কলকাতা প্রায়ই বড় বাজেটের থিম পুজোর প্যান্ডেলের জন্য পরিচিত। আরামবাগ দুর্গা পূজা সমিতি হল এমনই একটি দুর্গা পূজা প্যান্ডেল যা এর সাথে মিলে যায় এবং একটি বড় বাজেট রয়েছে এবং তারা সেখানে জয়লাভ করতে পারে। আপনি যদি দিল্লিতে দুর্গা পূজার জন্য উজ্জ্বল এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্যান্ডেলগুলির মধ্যে একটি খুঁজছেন, তাহলে আপনার এটি মিস করা উচিত নয়। থিমগুলি প্রায়শই বিস্তৃত হয় এবং এটি আপনাকে চমকে দেবে৷ ২০১৩ সালে, তারা পূজা সম্পাদন করতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করেছিল।
এখনো আমার গুড়গাঁও পুজো দেখতে যাওয়া হয় নি । সুশান্ত লোক প্যান্ডেল গুড়গাঁও বা গুরুগ্রামে অবস্থিত এবং এটি সেখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত প্যান্ডেলগুলির মধ্যে একটি। এটি একটি কমিটি যা সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তাই আপনি সেখানকার বাসিন্দাদের উৎসাহ দেখতে যাচ্ছেন। তার উপরে, তারা তাদের পূজার জন্য সহজ কিন্তু প্রভাবশালী থিম রাখে। এই পূজার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল তারা সেলেব্রিটিদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সুতরাং, সময়সূচী পরীক্ষা করে প্লান করলে, বিনামূল্যে দেখা হয়ে যেতে পারে টপ সঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গে ।
এবারের পুজোতে বিশেষভাবে ভেবে রেখেছি, মিলনীর পূজাটা দেখার । বাকুড়া থেকে পোড়া মাটির ছাঁচ নিয়ে এসে প্যান্ডেল সাজানো হচ্ছে । কমিটি থিম-ভিত্তিক পূজার আয়োজন করে এবং তারা সর্বদা সর্বোত্তম উপায়ে এটি সাজিয়েছে। এটি সুপ্রিম এনক্লেভ অ্যাপার্টমেন্টের কাছাকাছি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এবং আপনি ভিড় লক্ষ্য করে সহজেই এটি খুঁজে পাবেন। থিমের পাশাপাশি, তারা প্রকৃতপক্ষে বাঙালি দুর্গা পূজার ঐতিহ্য বহন করছে । দিল্লির আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পুজোর ভিতর পড়ে গ্রেটার কৈলাস, কাশ্মীরি গেট, হজ-খাসের পুজো, বসুন্ধরা এনক্লেভ, মহীপাল পুর, পূর্বাশা ময়ূর বিহার, অন্তরঙ্গ ময়ূর বিহার, নয়ডা ৬২ সেক্টর, সপ্তর্ষি সংঘ নয়ডা, শিপ্রা সান সিটি গাজিয়া বাদ, সুশান্তলোক গুড়গাঁও, বি ব্লক সিআর পার্ক, কে ব্লক সি আর পার্ক, কালি মন্দির সি আর পার্ক , মেলা গ্রাউন্ডের পুজো দ্বারকা কালীবাড়ি , দ্বারকা বঙ্গীয় সমাজ, দ্বারকা সেক্টর ২১ কোওপারেটিভ । আমাদের বাড়ি পালাম, মহাবীর এলাকায় । দ্বারকার কাছাকাছি। দ্বারকার রাত্রির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলির উপভোগ করার জন্য আমাদের পুরো বছরের অপেক্ষা থাকে।
দিল্লির পুজোপরিক্রমা করার জন্য চাই একটি মোটর গাড়ি । পুজোর মণ্ডপগুলি দূরে দূরে অবস্থিত । তবে, আমার পাড়াতে দুটি পুজো হবে । মহাবীর এনক্লেভ কালীবাড়ি ও এল ব্লকের কালীবাড়ির পুজো । দুজায়গাতেই আমি সামান্য কিছু অংশগ্রহণ করি । দলবেঁধে আমরা প্রতিমাদর্শনে যাই । সপ্তমী বা অষ্টমীর ভোগ এখানেই লাইন দিয়ে খাওয়া হয় । আমার স্ত্রী পুত্র বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে হৈ হৈ হাসিমজাকের মাধ্যমে খুবই সুন্দর দিন অতিবাহিত হয় । আর দশমীর দিন শুরু হয় সারাদিন ধরে সিঁদুর খেলা । এমন ভাবে ঢাকের তালে তালে সিঁদুর খেলা চলে, যেন হোলি খেলা চলছে । সিঁদুর তুলতে, প্রায় চামড়া উঠে যায় । আমার অবশ্য আজকাল বিসর্জনে যাওয়া হয় না । শুধু নাচানাচি দেখি । মোবাইলে ফটো তুলে রাখি । ফেসবুকে দেবো দেবো করে, আর দেওয়া হয় না ।
তবে, বিজয় দশমীটা আমি খুবই আনন্দ করে কাটাই । অনেক কবি ও সাহিত্যানুরাগীদের নিয়ে আমাদের বিজয় সম্মেলনী হয় । বিজয়ার বাহানায় অনেকের বাড়িতে মিষ্টি খেতে যাওয়া হয়, আবার অনেকে বিজয়া করতে আসেন । আমরা কবিতা পড়ে, গান গেয়ে বিজয়া দশমী উৎযাপন করি ।
দুর্গাপূজা ছাড়াও আমাদের আরও অন্যান্য অস্তিত্ব এখানে আছে । আমার প্রিয় বন্ধুদের দুজন বিহারী, দুজন পাঞ্জাবী, পড়শি রাজস্থানই, অফিসের বস সাউথ ইন্ডিয়ান । আমাদের উৎসবে তাদের অংশগ্রহণ থাকে, তেমনি নবরাত্রি নামের এই উত্তর ভারতের উৎসবে আমরাও জুড়ে থাকি । আমাদের পার্কে অনুষ্ঠিত হয় রামলীলা। প্রতিদিন মাইক বাজিয়ে বাজিয়ে রামযাত্রা । আর ইয়া বড় বড় নাগর দোলা এখনো দেখা যায় । পানিপুরি আর কুলফির দেদার বিক্রি । ধুলো জমিয়ে বিক্রি হচ্ছে ভেলপুরি । দিল্লির নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত দের কি বিশাল ভিড় । রাস্তায় জ্যাম লেগে যায় দশেরার দিন ।
আমি আর আমার পুত্র বেশ কয়েক বছর ধরে রাবণ পোড়ানো দেখতে যাই । আমার স্ত্রী বাড়িতে থাকেন । উনি বলেন, এ আমাদের দেশের সংস্কৃতি নয় । রাবণ পোড়ানোর উল্লাস আমরা দেখতে চাই না । আমরা বিজয় দশমী নিয়েই ভালো আছি । এই বিবিধের দিল্লির ভিতর আমি মিনি ভারতবর্ষকে দেখি । সর্বধর্ম সম্প্রদায় এখানে রাবণ পোড়ানো দেখতে এসেছেন । প্রথমে ইন্দ্রজিত, পরে কুম্ভকর্ণ কে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় । রামযাত্রার রাম এসে তীর মেরে রাবণকে আগুন ধরিয়ে দেন । ইয়া বড় বড় রাবণ নিমেষে আগুনে পুড়ে ধরাশায়ী হয়ে পড়ে । মানুষের কি উল্লাস । মানুষ কি সত্যিই এতোটা হিংস্র হতে পারে ?
দিল্লির চরিত্রই এমন । এই রুক্ষতায় যেন তার কাঁটা ভরে রাখা আছে । এখানকার প্রকৃতি যেন তাই কণ্টকময়।এখানে সেখানে বাবলার বন,কাঁটাঝাড়ের গুল্মলতায় ছেয়ে আছে প্রান্তর । দৌড় ঝাঁপে ক্লান্ত পড়ে আছে ইতিহাসের খন্ডহর । হাজার বছরের পুরানো ইট পাথর আর গাঁ ছমছম করা ভাঙ্গা বাড়ি।তার যতটা না ইতিহাস, ততটাই গল্পকথা , ততটাই বিস্ময়পুর।তার আবহে আমাদের দিল্লিযাপন, এখানেই আমার প্রেম , ভালোবাসা , ঘর, শিশু ও বধু , এবং পরিশেষে ঘুম । এতোটা পথ পার করে এসে দিল্লিকে বহোত দূর বলা চলে না।

























Comments