ঢ্যাং বাড়ির দুর্গাপুজো সার্ধশতবর্ষে

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

সময়টা ঊনবিংশ শতাব্দী। হুগলির খানাকুলের কাছে রাজহাটি গ্রামের তৎকালীন জমিদার স্বর্গীয় শ্রীরাম ও তাঁর পিতা গুরুদাসপুত্র স্বর্গীয় লক্ষণ ঢ্যাং ব্যবসার সূত্রে সালকিয়ায় পাকাপাকিভাবে চলে এলেন। এখান থেকেই রাজহাটিতে জমিদারী দেখাশোনা করতে লাগলেন। আর সালকিয়াতে লোহা ঢালাইয়ের কারখানা স্থাপন করলেন। নতুন ব্যবসায় সমৃদ্ধিলাভ হলো। পরে একদিন ঠিক করলেন যে দেশের বাড়ির ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গেই দুর্গোপুজো শুরু করবেন। সেই কথামতো  তৈরি হলো খিলান দেওয়া দুর্গাদালান। দুর্গামূর্তি, উঠোন আর তার মাঝখানে হাঁড়িকাঠ প্রস্তুত হলো। তার চারপাশ জুড়ে দালান।  এখানেই ১৮৭৩ সালে দুর্গাপুজোর সূচনা করলেন তিনি। পরে শ্রীরাম ঢ্যাংএর পাঁচ ছেলে যৌথভাবে পিতল ঢালাই কারখানা, তেলের ব্যবসা, তুলোর ব্যবসা ও সুদূর সুইডেনে প্রস্তুত টেক্কামার্কা দেশলাই এর এজেন্সি দেখাশোনা করতেন। ১৯৮২সালে লিখিত হেমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'শালিখার ইতিবৃত্ত' বইতে উল্লেখ আছে - ' বিলাতি 'ফরবেন কোম্পানি'র দিয়াশলাইয়ের এঁরা ছিলেন বাংলাদেশে সোল এজেন্ট। এঁদের ক্যানিং স্ট্রীটে বড় দোকান ছিল। তখনকার দিনেও লাইন দিয়ে ঐ দোকানে দিয়াশলাই বেপারীদের কিনতে হত।' সেসময়ও খুব ধুমধাম করে পুজো পালন করতে লাগলেন। এই শুরু যা এখনও সমানভাবে চলে আসছে। যদিও সে জৌলুস অনেকটা কমে গিয়েছে তবুও তো ঢ্যাং বাড়িতে পুজো হচ্ছে মহাসমারোহে বংশপরম্পরায়। এবার তো সেই পুজো সার্ধশতবর্ষে। যেহেতু মা লক্ষ্মীর কৃপায় ব্যবসায় সমৃদ্ধিলাভ তাই দুর্গোপুজোর পাশাপাশি শ্রীরাম ঢ্যাং লক্ষ্মীপুজোও ততধিক জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করলেন। এখনও সে প্রথাই মেনে আসছে বর্তমান প্রজন্ম। এই দুর্গোপুজোর সময় থেকেই কাঠের সিংহাসন বার করা হয় এবং সেই সিংহাসনেই পদ্মের ওপর লক্ষ্মীপ্রতিমা অধিষ্ঠিত থাকেন এবং ধুমধাম করে বিসর্জনের শোভাযাত্রা সালকিয়া প্রদর্শন করে। যাই হোক সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই একভাবে সমস্ত নিয়ম ও রীতি মেনে চলে আসছে ঢ্যাং বাড়ির পুজো। 

প্রতিমা শিল্পী থেকে শুরু করে রাজহাটি থেকে পুরোহিত ও ঢাকি আসা পর্যন্ত সবকিছুই পুজোর প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে বংশানুক্রমিকভাবে চলে আসছে। পুজো সূচনার কয়েক বছর পরে শ্রীরাম ঢ্যাং ‘শ্রীশ্রী দুর্গামাতা ও লক্ষ্মীমাতা সহায়’ নামে একটি এস্টেট চালু করলেন। এই এস্টেট দ্বারাই খরচাপাতি ও পুজোর যাবতীয় কাজকর্ম এখনও পরিচালিত হয়। 

হাওড়া স্টেশন থেকে সালকিয়া চৌরাস্তা ক্রসিং পেরিয়ে বাবুডাঙ্গার মোড়ে এসে যে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি ডানদিকে চলে গেছে সেটা যে বাড়ির পূর্বপুরুষের নামে একদা নামকরণ করা হয়েছিল সেই ঢ্যাং বাড়িতে জন্মাষ্টমী থেকেই পুজোর সূচনাকাল। জন্মাষ্টমীর সকালে স্নান করে এই বাড়ির ছেলেরা শ্রীরাম ঢ্যাং ঘাট( যেটা ফুলতলা ঘাট নামে পরিচিত) থেকে মাটি তুলে এনে পুজো করার পর মূর্তি গড়ার কাজ শুরু হয় পুরানো কাঠামোতেই( বিসর্জনের পর কাঠামো তুলে এনে রাখা হয় দুর্গাদালানে।) এবছর যদিও নতুন কাঠামো বাঁধা হয়েছে এবং তাতেই মূর্তি গড়া হচ্ছে। ঢ্যাং বাড়ির ঠাকুর দালানেই মূর্তি গড়ার কাজ করা হয়। ডাকের সাজের একচালা প্রতিমা। সেই জন্মাষ্টমী থেকেই বাড়িতে নিরামিষ পালন করা হয় কালিপুজো পর্যন্ত। তারপর তো একে একে পুজোর আনুসঙ্গিক কাজ করে থাকে বাড়ির মেয়ে বৌ-রা। অন্যান্য পুজোর মতই ঠাকুর অধিষ্ঠান করার চৌকিতে আলপনা দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটা আসন ও প্রসাদী জায়গায় আলপনা দেওয়া হয়। এস্টেটের স্টোররুম থেকে একে একে ঠাকুরের গয়না, বাসনপত্র সব বের করে পরিষ্কার করা হয় যে সময় সেসময় ওইদিকে ঠাকুর দালানে খড়ের কাঠামোতেও মেটের পর মেটে মাটি চড়ে। এই মূর্তি তৈরির কাজ এখন প্রিয়লাল পাল এন্ড সন্স থেকে বর্তমান বংশধর বাপিদা এসে করে যান। দালান, ঝাড়বাতি( পুরনো ঝাড়বাতির বদলে এখন অবশ্য নতুন ঝাড়বাতি) ঘষেমেজে পরিষ্কার করে এইসময়ের মধ্যেই রং করে সাজানো হয়।  এই বাড়ির হাড়িকাঠ স্থায়ী নয় তাই এই সময়েই তা উঠোনে স্থাপন করা হয় আর বছরের বাকিসময়ে তুলে রাখা হয়।  দুর্গাপুজোর কটাদিন এই বাড়ির বড় সদর দরজা পুজোর সময় শুধুমাত্র খোলা হয়। এই পরিবারের সদস্যরা পুজোর বাকিসময় বৈঠকখানা ঘরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে দালানে ওঠেন। যারা ওইবাড়িতে বর্তমানে বসবাস করছেন তাদের জন্য অবশ্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। বাড়ির পুরুষ সদস্য যাঁরা বর্তমানে স্বর্গীয় তাঁদের স্মরণের জন্য প্রত্যেকের ছবি এই দালান ও বৈঠকখানা ঘরে রাখা হয়। বিবাহপরবর্তীতে দেখেছি কাকিমারা আরতি চলাকালীন সাদা চামর আর সন্ধিপুজোর সময় কালো চামর দোলান। আরতীর সময় সকল সদস্য (যারা উপস্থিত থাকেন) অংশগ্রহণ করেন। তারপর চলে পুষ্পাঞ্জলিপর্ব। 

মহাষষ্ঠীর সকালে বেল-বরণ ও ঘট স্থাপন করে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবীর বোধন হয়। রীতি অনুযায়ী সপ্তমীর সকালে কলাবউ স্নান করানোর পর দেবীর চক্ষুদান হয় ও সন্ধ্যায় ১২ জন ব্রাহ্মণকে লুচি, ফল, মিষ্টি ও দক্ষিণা দিয়ে আপ্যায়িত করা হয়। অষ্টমীর দিন সকাল  ও সন্ধিপুজোর সময় ‘ধুনো পোড়ানো’ রীতি। বাড়ির মহিলারা মায়ের সামনে সারিবদ্ধভাবে বসেন। তাঁদের দু’হাতে ও মাথায় একটি করে হাঁড়ি বসানো হয়। তাতে কর্পূর জ্বালিয়ে ধুনো পোড়ানো হয়। এরপর ছোট থেকে বড়, বাড়ির সবাই ওই মহিলাদের কোলে বসে মাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন। যেসব সদস্য বসেন এই রীতিতে তাদের সন্ধিপুজো পর্যন্ত উপবাসে থাকতে হয়। এখানে চন্ডীপাঠ হয়। নবমীতে কুমারী পুজো। পুজো শেষে কুমারী মাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে কুমারী মায়ের কাছে প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণপর্ব চলে একে একে। তারপর কোলে করে তাকে ছেড়ে আসা হয়। 

এই বাড়িতে অন্নভোগ রীতি নেই। প্রতিদিন সকালে ফল, মিষ্টি ও নারকেল নাড়ু দিয়ে মায়ের ভোগ নিবেদন করা হয়। সন্ধ্যায় লুচি, হরেক মিষ্টি ও ক্ষীর-রাবড়ি দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। সন্ধিপুজোয় একমণ চালের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। দশমীর দিন সকালে ঘট নাড়ানো ও সুতো কাটার পর চলে সিঁদুরখেলা। রাতে মাকে বরণ করে সালকিয়ারই শ্রীরাম ঢ্যাং ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন করা হয়। তারপর বিসর্জন ও লক্ষ্মীপুজোর মধ্যবর্তী সময়ে একদিন শুভযোগে সুবচনী পুজো করে বাড়ির এয়োস্ত্রীদের প্রতি লোকাচার পালন করে উপহার তুলে দেওয়া হয়। বাড়ির যে সদস্যের ভাগে পুজোর দায়িত্ব বরাদ্দ হবে সে দম্পতি পুজোয় সংকল্পে বসা থেকে শুরু করে কুমারী পুজো ও সুবচনী পুজো করা ও পরবর্তীতে এইরকমভাবে লক্ষ্মীপুজো ও কালিপুজো করে দায়িত্ব সম্পন্ন করবেন এবং সেই দম্পতি সদস্যকেও যেখানেই বসবাস করুন না কেন নিরামিষ ভক্ষণ পালন করতে হবে।

শ্বশুরের মুখে শুনেছি একসময় নাকি বাড়ির ছাদ থেকে কামান দাগা হতো আর মা বলে ডাকা হত তারপর ছাগবলি দেওয়ার রীতি ছিল। আর ওই কামানের শব্দ ঢ্যাং পরিবারের তিনটি প্রধান বাড়ি থেকে শোনা যেত। যদিও সুরকার পুলক বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ির অনতিদূরে অবস্থিত ব্যানার্জী বাগানের বাড়িটাই আদি বাড়ি এবং এখানেরই দুর্গাদালানে পুজো হয়। তারপর শ্রীরাম ঢ্যাং এর পাঁচ ছেলেরা ( দেবেন্দ্রনাথ, মহাদেব, শিবচন্দ্র, রাখালচন্দ্র এবং তারকনাথ) একে একে ছড়িয়ে গেছে গোটা বাবুডাঙ্গা জুড়ে। একসময় সারারাত ধরে যাত্রাপালাও হতো। সেসব এখন অতীত। তবে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ছাগবলি ও অন্যান্য সবজি বলির রীতি এখনও  চলছে। ঢ্যাং বাড়ির সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সকলেই এই কটাদিন দালানে উপস্থিত থাকেন। দেশের বাইরে যারা থাকেন তারাও এই কটাদিন উৎসবে যোগ দিতে বাড়ি ফেরেন। বাড়ির উঠোনেই নিরামিষ খাওয়া-দাওয়া চলে। তবে বলির মাংস নিরামিষভাবে রান্না করে খাওয়া হয়। উৎসব প্রতিবছর হৈ হৈ করে কেটে যায়। সারাদিন বাড়ির পুজোয় থাকলেও কখনও রাতের দিকে কাছাকাছির প্যান্ডেলগুলোয় ঘোরা হয়-- প্রতিবেশী বাড়ির ঠাকুর দেখতে যাওয়া হয়। দশমীর দিন মাকে উঠোনে নামিয়ে সিঁদুরদান ও বরণ করা হয়। তারপর সদর দরজা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ততক্ষণে ব্যান্ডদল ও আলোকসজ্জা সজ্জিত থাকে গলির মুখ পর্যন্ত। তারপর প্রথমে ষষ্ঠীতলার বাড়ির সামনে আনা হয় সেখানে চাকা ধুইয়ে শাঁখ বাজিয়ে মাকে প্রণাম করা হয়। তারপর শোভাযাত্রা এগিয়ে গিয়ে জিটি রোড ক্রস করে শ্রীরাম ঢ্যাং রোডে প্রবেশের পর লালবাড়ির সামনে এসে কিছুক্ষণ থামে।  সেখানেও ওই একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি তারপর আবার ওই রোড ধরে গিয়ে ষষ্ঠীতলার সামনে উপস্থিত হলে গঙ্গাঘাটের দিকে যাত্রা শুরু হয়। এইভাবে তিনটে বাড়ি ছুঁয়ে মায়ের বিসর্জন সম্পন্ন হয়। এই লালবাড়ি তৈরি হওয়ার মূলেও এক ইতিহাস জড়িত। ঢ্যাং বাড়িতে বিবাহসূত্রে পদার্পন করে জেনেছি লালবাড়িটা দেশলাই ব্যবসা সূত্রেই ইংরেজরা আসবেন বলে তৈরি হয়েছিল সেইসময়ের অত্যাধুনিক ডিজাইনে। বাড়িতে মিনি চিড়িয়াখানা ছিল যেখানে ময়ূর থেকে অন্যান্য পশুপাখি থাকতো। উপরিউক্ত বই থেকেই জানতে পারলাম বাড়িটা ১৯২৪ - ২৫ সালে তৎকালীন একলক্ষ টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশে বিলাতি দ্রব্য বয়কট চলাকালীন সময়ে সে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরে শ্রীরাম ঢ্যাং পুত্র শিবচন্দ্র ঢ্যাং 'কার্তিক' ও 'গনেশ' নামে দুখানা বাস চালু করেন বালি পর্যন্ত। তার আগে হাওড়াতে হাওড়া থেকে বাঁধাঘাট পর্যন্ত প্রথম বাস চালু হয়েছিল।

এতক্ষণ যে পুজোর কথা এখানে বলা হলো সেই ঢ্যাং বাড়ির ঢ্যাং পদবী কিন্তু আসল পদবী নয়। এই ঢ্যাং পদবী আসলে উপাধিপ্রাপ্ত। জন্মগতভাবে এই পরিবারের পদবী দে। তবে ঢ্যাং পদবীই সকলে ব্যবহার করে থাকেন সেই পুরনো আমল থেকে। কিভাবে কবে এই উপাধি প্রাপ্ত হয়েছিল এবং ঠিক কবে থেকে এই পদবী ব্যবহার শুরু হয়েছিল সে ইতিহাস যদিও অজানা। 

যাই হোক, উমা মার এবার মর্ত্যে ফেরার পালা। সেই প্রতীক্ষার অবসান হতে আর মাত্র হাতেগোনা কয়েকদিন। ঢাকে কাঠি এই পড়লো বলে। ঘরে বাইরে তারই প্রস্তুতিপর্ব। উত্তর হাওড়ার সালকিয়াও ব্যতিক্রম নয়। সালকিয়ার মতো বহু পুরনো জায়গায় বাবুডাঙ্গার দুর্গাবাড়ি, শান্তি সংঘ, অগ্রদূত, ছাত্র ব্যায়াম সমিতি, ঘাসবাগান, দুর্বাদল ক্লাবের পুজো, সালিখা সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পুজো(গঙ্গার ঘাটের পুজো) ইত্যাদি বারোয়ারি পুজো যেমন আছে তেমনই ঢ্যাংবাড়ির পাশাপাশি এখানে সালকিয়া হাউস (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি), ঘোষবাড়ির পুজো, আটাবাড়ির পুজো, হাজরাবাড়ির পুজো ইত্যাদি বনেদি বাড়িগুলোর দুর্গাপুজোও আছে। সবমিলিয়ে সালকিয়া একেবারে কটাদিনের জন্য জমজমাট উৎসবে সামিল হওয়ার জন্য প্রস্তুত।

আসন্ন শারদীয়ার শুভেচ্ছা ও প্রীতি জানালাম সবাইকে। সবই শুভ হোক ও সবার মধ্যে সৌহার্দ্য বিনিময় বজায় থাকুক।

"ইয়া দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।।"

About Author
&
Photographer

লেখক : রুমা ঢ্যাং অধিকারী

প্রথম দশকের কবি

আলোকচিত্রী: রুমা ঢ্যাং অধিকারী

প্রথম দশকের কবি

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget