ত্রিশূলধারি পার করেগা - পর্ব ১

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

সব তীর্থ একবার গঙ্গাসাগর বারবার - এখন আর কিন্তু ব্যাপারটা তেমন নেই, গঙ্গাসাগর যাওয়া মোটের উপর খুবই সহজ হয়ে গেছে কিন্তু আজ আমি যেই তীর্থযাত্রা নিয়ে লিখতে চলেছি সেটা কিন্তু বেশ কষ্টের এবং আমার জন্য মানে আমাদের সঙ্গে যারাই গেছিলেন প্রত্যেকের জন্যই ব্যাপারটা যথেষ্টই কষ্টকর হয়েছিল। কেনো এবং কি ব্যাপার সেটা বলার সুপ্ত বাসনা চেপে রাখতে না পেরেই এই অধমের কলম ধরা। 

আমরা ৮-১০ জন বন্ধু মিলে প্ল্যান করেছিলাম দিল্লিতে দ্যাখা করে তারপর গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়বো, প্রথম দিন হরিদ্বার তারপর সেখান থেকে কেদারনাথ সেখানে একদিন থেকে নেমে এসে চোপ্তা হয়ে তুঙ্গনাথ। মোটামুটি যাওয়া আসা নিয়ে ৭-৮ দিনের ব্যাপার। আমরা গেছিলাম ২০২২ সালে, আমি যদিও ২০১৬ থেকেই যাওয়ার প্ল্যান করছি কিন্তু ঐ যে মা ঠাকুমারা বলেন না ভগবান না ডাকলে যাওয়া যায় না, তো যাই হোক ৭ বছরের চেষ্টার পর আমি ভগবানের অ্যাপয়েনমেন্ট পাই। বলে রাখা ভালো, কেদারে আমি ২০১০ সালে একবার গেছিলাম তখন যদিও পথ অন্য ছিল মানে ২০১৩ এর ধসের আগে আর কি। ২০১৩ ধসের আগে পথ ছিল ১৬ কিমি মত কিন্তু এখন সেটা ২২ কিমি প্রায়। আর এমনিতে ঐ অঞ্চলে সচরাচর ধস নামাটা কোনো ব্যাপার না সেতো মোটামুটি আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে যথেষ্টই অবগত। ও একটা কথা বলে রাখা উচিত, আমরা যেসব বন্ধুরা মিলে গেছিলাম তার মধ্যে একজনের ট্রেকিং কোম্পানি আছে, কলকাতার বেশ নাম করা কোম্পানি, তো সেই আর কি দিল্লি থেকে সমস্ত ব্যবস্থা করবে এই কথা ছিল এবং সেই বন্ধু তার কোম্পানির একজন ট্রেক লিডার কে একদিন আগেই আমাদের গন্তব্যে পাঠিয়ে দিচ্ছিল এবং সে হোটেল বুকিং বা টেন্ট বুকিং সংক্রান্ত সমস্ত কিছু দেখে রাখছিল যাতে পরদিন গিয়ে আমরা বিনা ঝামেলায় সব পেয়ে যাই। এতে আমাদের যা সুবিধা হয়েছে সে বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে জানতে পারবেন এবং সেই সূত্রেই আমার বন্ধুর ট্রেকিং কোম্পানি ওরফে চেসিং ক্লাউড এর ঈষদ প্রসঙ্গ উল্লেখ করলাম। 

তো হ্যাঁ, পরিচয় পর্ব এবং ভূমিকায় নিয়ম মাফিক শব্দ অপচয়ের পর এবার আসি মূল কথায় মানে আমাদের দিল্লি থেকে যাত্রা এবং সব ট্রেকিং কমপ্লিট করে আবার দিল্লি হয়ে কলকাতা ফেরা, ওই আর কি পাহাড়ের গল্প তো, ধাপে ধাপে উন্মোচিত হওয়াই শ্রেয়। মোটামুটি মে এর দ্বিতীয় সপ্তাহ, কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে আমি আমার সহধর্মিনী আর এক বন্ধু ভোরের মানে ৬ টা নাগাদ ফ্লাইটে চেপে ৮৩০ নাগাদ সোজা রাজধানীতে অবতরন এবং সেখানে ব্যাঙ্গালোর থেকে আসা আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আমরা দুটো ক্যাব বুক করে চলে গেলাম পাহাড়গঞ্জের দিকে, সেখানে ভোরে বাকি সবাই ট্রেনে করে এসে উঠেছে বিশ্রামের জন্য। যাই হোক এই আমার প্রথম দিল্লী ভ্রমণ, ক্যাব করে নতুন দিল্লি দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম বেশ ভালোই লাগছিল আর কি, কিন্তু সব ভালো লাগা নিমেষে কেটে গেল পুরনো দিল্লিতে ঢোকার পথে, উফ সে কি জ্যাম, তার উপর অফিস টাইম। যাইহোক অনেক কষ্টে পৌঁছলাম পাহাড়গঞ্জে এবং এরপর থেকে আমাদের হরিদ্বারের যাত্রা শুরু। আমরা প্ল্যান করেছিলাম একটু খরচা বেশি হলেও ক্যাব নিয়ে যাবো হরিদ্বার, তাতে নিজেদের সুবিধা মত রাস্তার মাঝে দাড়ানো যাবে এবং যাওয়া টাও কম্ফর্টেবেল হবে। তো ওই যেমন প্ল্যান আর কি, দুটো ক্যাব নিয়ে আট জন মিলে যাত্রা শুরু করলাম দেবভূমির উদ্দেশ্যে। 

মে এর দুপুর, ক্যাব যাচ্ছে দিল্লি হয়ে উত্তর প্রদেশের দিকে, ফুল স্পিডে এসি চললেও সে যা গরম প্রাণ ওষ্ঠাগত আর কি। যাইহোক আমরা মোটামুটি ঐ দুপুর ১২-১ টা নাগাদ সদ্য উত্তর প্রদেশে ঢুকে একটা ধাবার সামনে দাড়ালাম লাঞ্চ সারতে। সেখানে হালকা খাবার খেয়ে আবার মিনিট ৩০ এর মধ্যে রওনা দিলাম। যত দুপুর বাড়ছে গরম ও তত বাড়ছে, পয়সা বেশী দিয়ে ক্যাব বুক না করে এসি বাসে গেলে যে বেশি কম্ফর্টবেল লাগতো সেটা মোটামুটি আমরা বন্ধুরা এতক্ষনে বুঝে গেছি। যাই হোক উপায় কি আর, যেতে তো হবেই তবে আরও অসুবিধা হচ্ছিল উত্তর প্রদেশের খারাপ ও ভীষণ খারাপ রাস্তা। হাই রোড বেশিরভাগ সময় জ্যাম থাকে বলে গুগল ম্যাপ দেখে কিছু কিছু জায়গায় আমরা অন্য রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম আসে পাশে শুধু আখের ক্ষেত যত দূর দেখা যায়। দুপুরবেলা তেও এমন ফাঁকা সেইসব গ্রামের রাস্তা যে কোনো বিপদ হলেও কেউ দেখতে আসার নেই তারমধ্যে রাস্তার যা অবস্থা। সেই কারণে আমরা দু চারটে এরম রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পর ভাবলাম না জ্যাম হোক সময় বেশী লাগুক হাইরোড দিয়েই যাওয়া ভালো। যতদূর খেয়াল আছে আমরা এন এইচ ৫৮ ধরে যাচ্ছিলাম এবং যারা গেছেন তারা হয়তো জানবেন এই হাইরোড দিয়ে দিল্লি থেকে মানে নয়ডা হয়ে হরিদ্বার যেতে বেশিরভাগ সময়টা আপনাকে উত্তর প্রদেশের মুজাফফর নগরের উপর দিয়েই যেতে হবে। আর হিন্দি সিনেমার কল্যাণে এই মুজাফফর নগর সম্পর্কে আমরা কে না অবগত, তবে সিনেমায় যেটা দ্যাখায় জায়গাটা ততটাও ভয়ানক আমাদের লাগেনি, যদিও আমরা দিনের বেলা গাড়ি করে যাচ্ছিলাম, তাও। উত্তর প্রদেশে যে জিনিসটা আমায় বিশেষত খুব মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলেছে তা হলো তাদের মাইল ফলক, এখনতো আর সেই ছোট্ট ইটের ফলক নয়, বিশাল বড় হোডিং করে সব কিলোমিটার লেখা। তবে দুঃখের বিষয় হলো এই কিলোমিটারের হিসেবের কোনো মা বাবা নেই, মানে ধরুন একটা জায়গায় আপনি দেখলেন হরিদ্বার ১৫০ কিমি তো ৫০ কিমি যাওয়ার পর আবার দেখলেন হরিদ্বার ১৮০ কিমি। অদ্ভুত ভাবে এই বিষয়টা হরিদ্বার পর্যন্ত বিশেষ ভাবে আমি লক্ষ্য করে গেছি তাই অগত্যা আমাদের ভরসা একমাত্র গুগল ম্যাপ, কিছু ক্ষেত্রে আবার নেট পরিষেবার জন্য সেটাও সবসময় পাওয়া যায় না। যাই হোক আমার যেটা মনে হয়েছে দিল্লি থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত ঐ ২৩০-২৫০ কিমি মত হবে, যদিও গুগলে সার্চ করলে কম দেখায় কিন্তু ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে গেলে আদতে সেটার থেকে অনেক টাই বেশি। মোটামুটি আমরা বিকেলের দিকে হরিদ্বার ঢুকেছি মানে সব মিলিয়ে ৬-৭ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেছি হরিদ্বার। তবে হরিদ্বারে গিয়ে গাড়ি আমাদের যেখানে নামায় সেখান থেকে হোটেল টা বেশ দূরে আর পিঠে লোকজনের ৫০-৬০ লিটারের ট্রেকিং ব্যাগ। যাই হোক আমরা হেঁটে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে, আগেই বলেছি বন্ধুর ট্রেকিং কোম্পানির সুবিধার্থে সব কিছু আগে থেকেই বুক ছিল। হোটেলের নাম হোটেল চাড্ডা, মোটামুটি হোটেল টা ছিল হরিদ্বার মার্কেটের উপরই। তবে সেই হোটেলের সিড়ি দেখে মনে হলো, আমাদের ট্রেকিং বুঝি এখান থেকেই শুরু হলো, তবে ঘর গুলো বেশ বড় ছিল এবং অদ্ভুত স্ট্রাকচার। ঘর গুলোতে এসি ছিল এবং এসি কিন্তু সেই সময়ে দরকার কারণ হরিদ্বারে বেশ গরম, আদ্রতা জনিত সমস্যা সেরম না হলেও তাপমাত্রা কলকাতার থেকে কোনো অংশে কম নয়। 

হোটেলে ঢুকেই যে যার মত ফ্রেস হয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম, গঙ্গা আরতি দেখবো, মার্কেট টা একটু ঘুরবো এই প্ল্যান নিয়ে। হরিদ্বারে গঙ্গা আরতি ভীষণ ভিড় সে অকল্পনীয়, আমি বেনারসে ও গঙ্গা আরতি দেখেছি যেটা অনেক ক্ষন ধরে হয় তবে এত ভিড় দেখিনি। যাইহোক সেই ভিড় ঠেলে আরতি দেখে বেরিয়ে পড়লাম মার্কেট ঘুরতে, আর হরিদ্বার এসে যদি লস্যি আর রাবড়ি না খাই সে তো জীবনের এক চরম না পাওয়া। এইসব টুকটাক খাওয়া দাওয়া,  যার যা কেনাকাটি সেরে আমরা ৯ টা নাগাদ একটি বাঙালি হোটেলে খেতে ঢুকলাম, ভেজ থালি, ঘি, বেগুন ভাজা, ডাল, আলু পোস্ত আর চাটনি, আহা সে অমৃত। তারপর ফেরার পথে আর একটু ঘাটে বসে গঙ্গার ঠান্ডা জলে পা ভিজিয়ে আমরা হোটেলে ফিরলাম। হরিদ্বারের গঙ্গার জলে যে এত আরাম তা আপনি সমতলে কিছুতেই পাবেন না, যেমন স্বচ্ছ তেমন তার স্নিগ্ধতা। সব সেরে হোটেলে ফিরে এবার আমাদের আড্ডা দেওয়ার পালা কারণ আগামীকাল আমাদের হরিদ্বারেই থাকা এবং বহু বছর পর কলেজের বন্ধুরা সবাই একসাথে। মোটামুটি বেশ কিছুক্ষন মানে ঘন্টা দু তিনেক জমাটিয়া আড্ডা মেরে এবং আমাদের পুরো ট্রেকের প্ল্যানটা আলোচনা করে যে যার ঘরে চলে গেলাম রাত্রি বিরতি নিয়ে। পরের দিন সকালে উঠেই দেখি আমাদের আর এক সহযাত্রী মানে আমাদেরই আর এক বন্ধু এসে হাজির। আজ আবার আমাদের গঙ্গা স্নান, পুরো হরিদ্বার ভালো করে ঘোরা, কাল তো যেটুকু সন্ধ্যার পর সময় পেয়েছি গঙ্গা আরতি আর মার্কেট টুকটাক ঘুরেই কেটে গেছে। তাই সকালে উঠেই বেশি দেরি না করে চা, পুরি-সবজি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম স্নান সারতে। তবে সকালের যা ভীষণ রোদ বিশেষ করে পাহাড়ের রোদ কি তেজ তার। আমাদের আবার স্নানের প্যান্ট ছিল না তাই যাওয়ার পথেই সব ছেলেরা মিলে হাফ প্যান্ট কিনে গামছা গলায় আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে চললাম হর কি পৌরি তথা হরিদ্বারের সবথেকে বিখ্যাত ঘাটের দিকে। ঘাট ধরেই আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, বেশ অনেক খানি যাওয়ার পর কষ্টের অবসান। কষ্টই বটে যা রোদ আর গরম, তবে গঙ্গার জলে একবার শরীরটা ভেজালে সব কষ্টের অবসান, সে এক ঐশ্বরিক তৃপ্তি। যদিও ঘাটের সামনে লোহার ব্যারিকেড করা এবং চেন দিয়ে বাঁধা। সেই চেন ধরেই সবাই স্নান করছে ডুব দিচ্ছে। আমরা তো বেশ অনেকক্ষন ছিলাম গঙ্গার জলে প্রায় এক ঘন্টা মত। উঠতে ইচ্ছেই করছেনা উঠলেই তো সেই রোদ আর গরম। আর সামনে দেখছি কত সাধু সন্ন্যাসী আহ্নিক করে গঙ্গায় স্নান করছেন, কতজনে পুজো দিচ্ছেন, বাচ্চারা সাঁতরে এপার ওপার করছে অনেকে আবার গঙ্গা মাকে দেওয়া পয়সা, নারকেল কুরচ্ছে এটাই তাদের রুজিরুটি, পুরো জীবনটাই তাদের বেধে এই গঙ্গা ঘিরে প্রাত্যহিক করে নিয়েছে হাজার বছরের ইতিহাসকে। আমরা যখন উঠলাম গঙ্গা স্নান সেরে তখন ২.৩০ মত বাজে, উঠেই দেখি গঙ্গার পারে নানা রকম খেলা দেখাচ্ছে একদল বাচ্চা, দড়ির উপর হেঁটে কখনো গানের তালে ডিগবাজি দিয়ে, আর ঐ দূরে বসে আছে তাদের মাস্টার সব পর্যবেক্ষন করছে পরীক্ষার হলের মত। পরীক্ষাই বটে, এই পরীক্ষা তো ওরা রোজ দেয়, জীবনের পরীক্ষা। চারদিকে কত রকমের মানুষ সন্ন্যাসী সংসারী, হিন্দু মুসলমান, ধনী দরিদ্র সবাই এক সাম্যের মেলায় মেতে উঠেছে গঙ্গার পবিত্র ছোঁয়ায়। এরপর আমরা গঙ্গার পার ধরে হেঁটে হেঁটে গেলাম মার্কেটের দিকে, লাঞ্চ করতে হবে প্রায় ৩-৩৩০ বাজে। খাবার হোটেলে যেতে হলে মার্কেটের ভেতর দিয়েই বেশ কিছুটা যেতে হয়, তবে আজ আমাদের একটু স্পাইসি খাবার খেতে ইচ্ছে করছে আর কাল সকালে বেরোনো রাতের বেলা এমনিতেই হালকা খাবার খাওয়া তাই যা খেতে হবে এই বেলাতেই। তাই ঢুকে পড়লাম একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে, অর্ডার করলাম বাটার পনির, ফ্রাইড রাইস বেশ জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করে সবশেষে একটা করে কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে সুখ টান দিতে দিতে চলে এলাম হোটেলের দিকে। আসার পথে অনেকেই টুকটাক কেনাকাটা করলো, কেউ উলের টুপি, কেউ বা গ্লাপস, কেউ রেনকোট যায় যেমন প্রয়োজন আর কি। হোটেলের রুমে ফিরে একটু রেস্ট নিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ আবার বেরিয়ে পড়লাম ঘাট পরিভ্রমণে। শেষ বেলায় যতটা হরিদ্বার গো গ্রাসে গেলা যায় আর কি। আমার সহ ধর্মিনি আরও কিছু বান্ধবীরা মিলে গঙ্গার জলে প্রদীপ ভাসিয়ে পুজো দিলো আর আমরা ছেলেরা বসে আড্ডা মারছিলাম বেশ অনেক ক্ষন, এই গরমেও গঙ্গার পারে আসলে যেন এক অদ্ভুত আরাম। তবে আজ বেশি দেরি করা চলবেনা, কাল ভোর ৪৩০-৫ টায় বেরোনো, হরিদ্বার থেকে সোন প্রয়াগ বেশ অনেক টাই দূর, ২২০-২৩০ কিমি প্রায় তারপর বেশি দেরি হলে ঋষকেশে খুব জ্যাম হয় তাই আমাদের প্ল্যান যত তাড়াতাড়ি ঋষিকেশ থেকে বেরোনো যায়। প্ল্যান মাফিক আমরা ৮ টা নাগাদ দুটো ডাল ভাত খেয়ে রুমে ঢুকে গেলাম তারপর খানিক আড্ডা মেরে ১০ টা নাগাদ যে যার ঘরে ঘুমোতে চলে গেলাম। 

পরের দিন, অর্থাৎ আমাদের যাত্রার তৃতীয় দিন ভোর বেলা ৪-৪৩০ নাগাদ সবাই ঘুম থেকে উঠে ৫-৫৩০ নাগাদ বেড়িয়ে পড়লাম। আগেই বলেছি চেসিং ক্লাউড এর দৌলতে আমাদের গাড়ি হোটেল সবই আগে থেকে বুকিং ছিল। হোটেল থেকে নামতেই দেখি গাড়ি দাড়িয়ে, মানে পাহাড়ের বুকে যেরম ১০ সিটের ট্রেকার চলে। সবাই একটু চা খেয়েই উঠে পড়লাম গাড়িতে, কিছুদূর এগোতেই মানে হরিদ্বারটা ক্রস করে ঋষিকেশ ঢোকার মুখ থেকেই দেখছি বেশ জ্যাম লেগে গেছে, যাই হোক ধীরে ধীরে সেইসব জ্যাম কাটিয়ে আমরা প্রায় ঘন্টা খানেক পর ঋষিকেশ থেকে বেরোলাম। তবে ঋষিকেশ জায়গাটা অসাধারণ, হরিদ্বারের মত এতটা জনসমাগম না হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করার সুযোগও বেশী। আর ঋষিকেশ এর ত্রিবেণী সঙ্গমের দৃশ্য তো অভাবনীয়, গঙ্গা যমুনা এবং সরস্বতীর মিলনের সে এক অতিপ্রাকৃত পবিত্র রূপ, বর্ণনাতীত। তবে জ্যামের কারণে আমরা বেশিক্ষন দাড়াতে পারিনি। আর ঋষিকেশ থেকে আমাদের গন্তব্য ও বেশ দূরে, সোনপ্রয়াগ, নয় নয় করে এখান থেকে ২০০ কিমি। আর আমাদের প্ল্যান সন্ধ্যার আগে মানে অন্ধকার হওয়ার আগে সেখানে পৌঁছে যাওয়া, পাহাড়ের রাস্তা তো রাত হলেই বিপদ। 

ঋষিকেশ থেকে বেরোনোর পর ই ধীরে ধীরে পাহাড়ের রাজত্ব শুরু, যত উপরে উঠছি তত বাড়ছে পাহাড়ের বাক, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড় আর সঙ্গে অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। আমরা তো ৭-৮ জন গাড়িতে করে কথা না বলেই প্রায় ৩-৪ ঘন্টা চললাম শুধু সৌন্দর্য্য আহরন করতে করতে। আদতেই দেবভূমি, তাইতো ভগবান নিজের সবটুকু দিয়ে সাজিয়েছে তাকে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমাদের কারুর তেমন খিদেও পাচ্ছেনা ওই সকালে টুকটাক ঋষিকেশ থেকে ম্যাগি চা খেয়ে লোকজন বেরিয়েছে এতক্ষন পড়েও কারুর খিদে নেই। মনে হচ্ছে সবুজ দিয়েই পেট ভরছে সবার। দুপুর দুপুর নাগাদ আমরা পৌঁছলাম রুদ্র প্রয়াগে, এখানে অলকানন্দা, মন্দাকিনী মিশেছে। ছোট্ট শহর পাহাড়ের বুকে, দারুন সুন্দর, সবই আছে স্কুল, হাসপাতাল, বিজনেস সেন্টার, মার্কেট মানে লোকজন থাকতে যা যা প্রয়োজন আর কি। পাহাড়ের লোকজনের তো প্রয়োজন ও আমাদের মানে সমতলের থেকে অনেক কম হয়, হয়তো আমরা ওখানে থাকলে এতটা কমে মানিয়ে নিতে পারতাম না অথবা প্রকৃতির প্রেমে পড়ে ওদের একজনই হয়ে যেতাম। এইসব হিসেব নিকেশ, আকাশ গঙ্গা ভাবতে ভাবতে আমরা চললাম গন্তব্যের দিকে, যত উপরে উঠছি মন্দাকিনী যেন আরও আপন হয়ে উঠছে, গারোয়ালের মৃদু আলিঙ্গনে শৈত্য প্রবাহ চলে যাচ্ছে সুষুম্না বরাবর। আমার এক লেখক বন্ধু তো বলেই বসলো আচ্ছা মন্দাকিনী আর গারোয়ালের প্রেম কাহিনী লিখলে কেমন হয়, জানিনা সে সেই লেখা সম্পূর্ণ করে উঠতে পেরেছিল কিনা তবে গারোয়ালের বুক চিরে তন্বী মন্দাকিনীর প্রেম প্রবাহ আমাদের সকলকেই নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল সেদিন, জীবনের মানে, হাজার বছর ধরে একসাথে পথ চলার মানে। শান্ত পাহাড়ের বুকে মাঝেমধ্যেই অভিমানী প্রেমিকার মত মন্দাকিনীর শো শো রাগের শব্দ কানে আসছে, কখনো তার ঝর্ণা পথ ধুয়ে দিচ্ছে আমাদের, কখনো বা তার খরস্রোতা রং আমাদের নিয়ে যাচ্ছে মেলুহা পিয়াসির সন্ধানে। এভাবেই আমরা এক স্বপ্নের পথে পারি দিয়ে পৌঁছতে থাকলাম আকাশের কাছাকাছি, ধীরে ধীরে মেঘ করে আসছে, আবছা হয়ে উঠছে দৃশ্যপট কিন্তু তাও আমরা অবিচল মননে মানস চক্ষুর ভিড়ে হারিয়ে যেতে থাকলাম পাহাড়ের বুকে। এই নেশা গ্রস্থ অবস্থায় হঠাৎ খেয়াল হলো গাড়ি টা দাড়িয়ে পড়েছে, সামনে বেশ কয়েকটা গাড়ি আর কিছু ঘর আছে দূরে দূরে। ড্রাইভার বললো এটাই সোন প্রয়াগ আমাদের আজকের বিশ্রাম স্থল। দূরে দেখা যাচ্ছে কেদারের চূড়া, বরফে ভর্তি, পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের আলোয় অভিষেকের সাক্ষী থাকলাম আমরা। আমাদের হোটেল এর পাশ থেকে বয়ে যাচ্ছে মন্দাকিনী, কি ভীষণ গর্জন তার, এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো লোক সমাগম কমতে শুরু করলো আর বাড়লো মন্দাকিনীর সুর তরঙ্গ। যত রাত বাড়ছে আমরা যেন ঠান্ডায় আরও কাবু হয়ে যাচ্ছি, সকালে হরিদ্বারে ৩০-৩২ ডিগ্রি থেকে বিকেলে ৩-৪ ডিগ্রি । এই হোটেলেই আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা, ৮ টা নাগাদ উনুন থেকে নামানো ডাল,ভাত তরকারি এই ঠান্ডায় যেন আমাদের কাছে অমৃত। সবাই একদম চেটে পুটে খেয়ে খানিক আড্ডা মেরে ৯ টায় চলে গেলাম যে যার ঘরে। আগামীকাল ভোর ৩ টে নাগাদ বেরোনো মানে খুব দেরী করে হলেও রাত ২.৩০ এ উঠতেই হবে। যাই হোক এতটাই টায়ার্ড ছিলাম সবাই বিছানায় পড়তেই ঘুমিয়ে পড়লাম, মাথার কাছে শুধু নেটওয়ার্ক হীন মোবাইলটা আছে আল্যার্মের সুবিধার্থে। 

পরের দিন উঠে কোনমতে ঐ ঠান্ডায় প্রাতকৃত সেরে বেরিয়ে পড়লাম আমরা, কিছুদূর গাড়ি করে যাওয়া তারপর মন্দাকিনী ব্রিজ ক্রস করে চার ধাম কমিটির গাড়ি, ওখানে আবার নিজেদের গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবেনা। যদিও সেটুকু ৪ কিমি মতই তারপর থেকে হন্টন। এই ভোর রাতেও গাড়ির লাইন দেখলে ভিমড়ি খেতে হয়, ব্রিজের ২ কিমি আগে থেকে গাড়ির লাইন । আমরা বুঝতেই পারছিলাম কেমন ভিড় ঠেলে উঠতে হবে আমাদের দেবাদিদেব দর্শনে। আর হবেই বা না কেন, আগের দু বছর কোভিডের কারণে সব বন্ধ ছিল এবার সুযোগ হয়েছে বাবাকে দেখার, ভক্তরা কি আর ছেড়ে দেবে সহজে। যাই হোক আমরা ঐ গাড়ির লাইন পেরিয়ে ৪ টে নাগাদ ব্রিজের সামনে এলাম সেখানেও যেন জন সমুদ্র, কে আগে গাড়িতে উঠবে তার জন্য এক ক্রমাগত যুদ্ধ চলছে। বিশেষত পুরো ট্রিপ টায় এই খান থেকে গাড়িতে ওঠার ব্যাপারটা আমার একটু খারাপ লেগেছে কারণ অনেকেই গোলমাল করে এগোতে যাচ্ছে চলন্ত গাড়ির পেছনে ছুটছে উঠবে বলে এতে অনেকেই আহত হচ্ছে। বিশেষ করে অসুবিধা হয়েছে বয়স্ক লোকদের যারা কম বয়সীদের সাথে পাল্লা দিয়ে মারামারি করে গাড়িতে উঠতে পারছেনা, পর্যাপ্ত গাড়িও নেই, কেউ কোনো লাইন মানছে না। দু একটা পুলিশ থাকলেও তারা সম্পুর্ন ব্যার্থ ক্রাউড কন্ট্রোলে। যাই হোক এভাবেই ভিড় ঠেলে আমরা খানিক ক্ষন যুদ্ধের পর একটি গাড়ি পেলাম, গন্তব্য এবার গৌরী কুণ্ড। আমি প্রথমবার যখন কেদার আসি ২০১০ সাল নাগাদ তখন গৌরী কুণ্ড তেই আমরা এক রাত ছিলাম পরের দিন কেদার যাত্রা করেছিলাম কিন্তু এবার সোন প্রয়াগে ছিলাম কারণ এক ছিল সময় আর দ্বিতীয়ত এই গাড়ির ঝামেলা। ২০১৩ সালের ধসে গৌরী কুণ্ড একদম ধ্বংস হয়ে যায়, এবার যে গৌরী কুণ্ড দেখছি সে যেন এক সম্পুর্ন নতুন। অনেককেই দেখলাম গৌরী কুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণ এ স্নান করে পুজো দিয়ে তারপর কেদার এর উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে। চারদিকে প্রচুর দোকান নানা রকম জিনিস, পুজোর সামগ্রী, গরম কাপড়ের দোকান, খাবারের দোকান, লাঠি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু হোটেল বেশ জমজমাট এবং এরিয়া টাও অনেক টাই জুড়ে। আগেরবার মানে ২০১০ সালে গৌরী কুণ্ড জায়গাটা অনেক টাই ছোট ছিল, এবার দেখছি আকার আয়তনে বেশ বেড়েছে এবং অনেক টাই কমার্শিয়ালাইসড। এখানেই ঘোড়ার আস্তাবল অনেকেই ঘোরা নিয়ে উঠছেন, আবার অনেকে খাটিয়া বা পিঠে করে ওঠা জালিও ভাড়া করছে। আসলে ১৩ সালের ধসের পর এই ট্রেক টা অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে আগে ছিল ১৬ কিমি এখন প্রায় ২২ কিমি। তারপর ল্যান্ড স্লাইড তো লেগেই আছে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমরা যখন গৌরী কুণ্ড থেকে কেদার এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম তখন ৬.৩০ মত বাজে, গৌরী কুণ্ড থেকে একটু এগোলেই মানে ১ কিমি গেলেই একটা বিশাল বড় গেট হয়েছে নতুন, আর সেই গেটে যা লাইন দেখে মনে হচ্ছে দুর্গা পুজোয় শ্রীভূমির ঠাকুর দেখতে দাড়িয়েছি। কে বলবে এই দুরুহ রাস্তা এত কঠিন ট্রেক ভিড় দেখে একেবারেই তা বোঝার উপায় নেই। একটু একটু করে গেট খুলছে আর কিছু জনকে ঢোকাচ্ছে আবার গেট বন্ধ, তার কারণও আছে আমরা আসার ঠিক ৩০ মিনিট আগে এখানে স্লাইডিং হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে, বেশিরভাগ অংশটাই ভেঙে গেছে তাই একজন একজন করে পাস করাচ্ছে ওইটুকু জায়গা দিয়ে। যাই হোক ৪৫ মিনিট মত সেই লাইনে দাড়ানোর পর আমরা গেট পেরিয়ে যাত্রা শুরু করলাম, বলা যায় এখান থেকেই কেদার এর আসল ট্রেকিং শুরু। 

বেশ সুন্দর, চারদিকে পাহাড়, গাছপালা, অরণ্য, কোথাও সরু রাস্তা, কোথাও বা একটু চওড়া, কোথাও আবার সিড়ি বেয়ে ওঠা এই করতে করতে আমরা উঠলাম বেশ কিছুক্ষণ। চারপাশে প্রচুর লোকজন, সবাই যাচ্ছে হর হর মহাদেব রব। তবে পাহাড়ে গেলে বিশেষ করে তীর্থ ক্ষেত্রে যে জিনিসটা আমার খারাপ লাগে তা হলো ঘোড়া, যদিও ঘোড়ার জন্যই অনেক বেশী মানুষ সেখানে যেতে পারেন, একটা বৃহৎ অংশের জীবিকা নির্ভর করছে এই ঘোড়া পরিবহনের উপর।  কিন্তু আমার পার্সোনালি যে জিনিসটা খারাপ লাগে সেটা হলো চারদিকে ঘোড়ার পায়খানা, যারা হেঁটে উঠছে তাদের জন্য এটা খুবই বিরক্তিকর। আরও একটা ব্যাপার হলো, এই ঘোড়া গুলো পাহাড়ের একদম ধার ঘেঁষে যায় মানে একদম খাদের পাশ দিয়ে তাই ভুল করেও কেউ যদি ওই পাশ দিয়ে হাটে ঘোড়া গুলো পারলে তাকে ঠেলে ফেলে চলে যায়, এমনভাবে অনেক অ্যাকসিডেন্ট ও হয়। যাই হোক আমাদের সঙ্গে প্রপার ট্রেক গাইড থাকার জন্য আমরা খাদের বিপরীত পথ দিয়ে মানে পাহাড়ের দিক দিয়েই হাঁটছিলাম। এইভাবে বেশ কিছুক্ষন মানে ৪-৫ কিমি হাঁটার পর ওই ঘন্টা ২ পর আর কি আমাদের বিশাল খিদে পেয়ে গেল, সকাল থেকে কিছুই পেটে পড়েনি তার উপর এই হাটা। আর বেশি দেরি না করে আমরা দাড়িয়ে পড়লাম একটা ছোট দোকানের সামনে, কেদার যাওয়ার পথে এখন ছোট খাটো প্রচুর দোকান দেখা যায়, ম্যাগি, আলুর পরোটা, চা, কোল্ড ড্রিংকস এসব জিনিস পাওয়া যায়। আমরাও চা আর ম্যাগি ব্রেক নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আমার একটা অসুবিধা হচ্ছিল সেটা বেশ কিছুটা যাওয়ার পর অনুভব করলাম, আমি ট্রেকিং বুট নিয়ে আসিনি, নরম্যাল স্পোর্টস সু পড়ে আসায় আঙ্গুলের মাথা গুলো খুব ব্যাথা করছিল। সবই ঠিক ছিল হঠাৎ দেখি চরম বৃষ্টি শুরু, যদিও আমাদের কাছে ওই প্লাস্টিক এর ওয়ান টাইম ইউস রেন কোট ছিল, হরিদ্বার থেকে কিনেছিলাম তবে ট্রেকিং ব্যাগ নিয়ে ওই রেন কোটে কিছুই মানছে না। তাই অগত্যা আবার একটু দাড়ালাম আমরা। কেদার এ এবার একটা ব্যাবস্থা দেখলাম, দু তিন কিমি বাদে বাদেই সরকার থেকে টেম্পোরারি শৌচালয় করেছে, খুবই উপযোগী তবে যা নোংরা ওখানে যাওয়া খুব চাপের। কি করা যাবে তাতেই লোকজন যাচ্ছে, নয়তো রাস্তার পাশে কোনো এক বোল্ডারের পেছনে বসে পড়ছে। পাহাড়ে একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগে, পাহাড় আদতে সাম্যবাদী। আপনার যতই টাকা থাক, পরিষেবা সবার জন্য সমান। আপনাকে থাকতে হবে সেই টেন্ট করেই, বাথরুম পেলে যেতে হবে বোল্ডার এর পেছনেই, খিদে পেলে ম্যাগি আর আলুর পরোটা ছাড়া উপায় নেই। যদিও দেব ভূমি ছাড়া অন্যান্য ট্রেকে আমিষ কিছুটা পাওয়া যায় যেমন নেপাল বা কাশ্মীরে তবে ভারতে ট্রেক মানে তো উত্তরাঞ্চল আর হিমাচল সেখানে বেশিরভাগ নিরামিষ, খুব বেশি হলে ডিম পেতে পারেন। যাই হোক, এসব উপলব্ধি নিয়ে পাহাড়ের কাছ থেকে আরও কঠিন হওয়ার শিক্ষা নিয়ে বৃষ্টি কমলে আমরা আস্তে আস্তে রওনা দিলাম। রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে, আরও সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। আমাদের গ্রুপে আমি আর একটা বন্ধু ছাড়া বাকি সবাই দেখি বেশ অনেক আগে চলে গেছে, আমরা টুক টুক করে হেঁটে চলছি।

আমি আবার জুতোর জন্য বেশি জোড়ে যেতেও পারছি না, প্রায় ৯-১০ কিমি পথ চলার পর দেখলাম ৬ ঘন্টা অতিক্রান্ত। এবার একটু পা চালিয়ে চলতে হবে, নিদেন পক্ষে সবার শেষে গেলেও যাতে অন্ধকার হওয়ার আগে পৌঁছতে পারি, এখনই বাজে ২ টো। অগত্যা পাহাড়ের শট কাট, এই আমার অন্ধের নড়ি। তবে শট কাট দিয়ে যাওয়া বেশ চাপের, খুবই চড়াই আর জঙ্গল। তারমধ্যে বৃষ্টিতে আরও পিচ্ছিল হয়ে গেছে, লোকজন সেখান দিয়েই যদিও যাচ্ছে, একজন আর একজনকে হাত ধরে টেনে তুলছে, সম্পুর্ন অপরিচিত মানুষরাও যে কতটা উপকার করে তা আপনি পাহাড়ে বিশেষত ট্রেকিং এ না গেলে বুঝতে পারবেন না। প্রকৃতি মনে হয় প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে বারবার মানুষকে শিক্ষা দিতেই, স্মরণ করিয়ে দেয় আদিম সত্যকে। এইভাবে কিছুটা শট কাট কিছুটা আবার নরম্যাল রাস্তা যেখানে শট কাট নেই করতে করতে দেখলাম বিকেল ৪টে বাজে তখনো বাকী প্রায় ৫-৬ কিমি। আমি এবার সত্যি আর পারছি না, পায়ের অবস্থা ভীষণ খারাপ, কিভাবে যে যাবো, তার মধ্যে অনেকটা অল্টিটিউড গেন হওয়ার ফলে বেশ ঠান্ডা লাগছে, পাহাড়ের গায়ে দেখছি গ্লেসিয়ার গুলো বরফ হয়ে জমে আছে, অতীব মনোরম দৃশ্য কিন্তু সত্যি বলতে আমার উপভোগের ক্ষমতা টুকুও আর নেই। পিঠের ট্রেকিং ব্যাগটা মনে হয় ফেলে দিতে পারলে বাঁচি, দু পা যাচ্ছি আর পাঁচ মিনিট বসছি, মনে হয় সবাই পৌঁছে গেছে এতক্ষনে, শুধু আমি আর একজন এইভাবে চলছি, যদিও প্রথম থেকেই আমরা সবার শেষে। এইভাবে কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি এখনো ২.৫-৩ কিমি বাকি, আমার সঙ্গে আর একজন যে ছিল তার অবস্থা আমার থেকেও খারাপ, বলছে ভাই এবার কিছুতেই যাওয়া সম্ভবনা ঘোড়া খোঁজ, এটুকুর জন্য ঘোড়া পাওয়াও খুব চাপের কেউ যেতে চায়না। যাইহোক লোকজনকে অনেক বলে কয়ে অনুরোধ করে আমরা দুটো ঘোড়ার উপর চেপে বসলাম, কিছুদূর এগোতেই দেখি বেস ক্যাম্প আমাদের বাকি বন্ধুরা সবাই ওখানে বসে রেস্ট নিচ্ছে। আমরা তো মজায় রাজার হালে ঘোড়ায় চেপে উঠছি, তবে বেস ক্যাম্প থেকে ১-১.৫ কিমি দূরে ঘোড়া ছেড়ে দিল ওখানেই আস্তাবল ওর বেশি আর যাবেনা না কি। এখান থেকে মন্দির আরও ২ কিমি তবে মোটামুটি সমতলে হাটা। ঘোড়া থেকে নেমে দেখছি বৃষ্টি পড়ছে উফ সে যা ঠান্ডা আর বলার কথা না। কোনমতে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে গরম গরম চা হাতে নিলাম, ইতি মধ্যে বাকিরাও আসতে শুরু করেছে সবাই ঠান্ডায় কাবু।

গরম গরম চা আর সুখ টান দিয়ে আমরা আবার হাটা শুরু করলাম মন্দিরের দিকে, আগেই বলেছি এখান থেকে মন্দির ১.৫-২ কিমি দূরে, সমতল রাস্তা প্রায়। পুরো ঘন বরফের আস্তরণে ঢেকে আছে রাস্তা, তারমধ্যে আবার বৃষ্টি হচ্ছে কি যে ঠান্ডা বলে বোঝানো যাবেনা। প্রায় -১ ডিগ্রি তো কম করে হবেই। এখান থেকে চারদিক যেন আরো সুন্দর দেখাচ্ছে মনে হচ্ছে আমাদের এত ঘণ্টার কষ্ট যেন সার্থক। এইভাবেই ভাবের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা এগিয়ে ঠিক মন্দাকিনী নদীর পাশে আমাদের টেন্টে উঠলাম। হোটেল ও আছে বেশ কয়েকটা কিন্তু যা দাম তার থেকে টেন্ট অনেক ভালো আর একটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা। যেহেতু আগের দু বছর কেউ আসতে পারেনি আর এই মে মাসে অক্ষয় তৃতীয়ার পর কেদার খোলে তাই অসম্ভব ভিড় আর সব জিনিসের প্রচুর দাম। ১০০ স্কয়ার ফিট একটা রুমের এক দিনের ভাড়া চাইছে ১০-১২ হাজার টাকা। তারপর তো অন্যান্য জিনিস আছেই। যাইহোক আমরা টেন্টে পৌঁছে একটু ফ্রেস হয়ে চেঞ্জ করে বেরিয়ে পড়লাম মন্দির দর্শনে। যদিও পুজো এখন দেওয়া যাবেনা সন্ধ্যা ৭ টার পর মন্দির বন্ধ হয়ে যায় আর এতদূর এসছি যখন সবাই একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ধোয়া জামা কাপড় পড়ে কাল সকালেই পুজো দেবে ঠিক করলো। আমরা বেরিয়ে দেখলাম বেশ বড় চাতাল বাঁধানো মন্দিরের ৫০০ মিটার আগে থেকে, চারদিকে পুজো সামগ্রীর দোকান, ঠাকুরের গান চলছে আহা কি মনোরম পরিবেশ সবাই যেন ভেসে যাচ্ছি এক অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক প্রবাহে। আমার ব্যক্তিগত ভাবে যেটা মনে হলো ২০১০ এর কেদার এবং আজকের কেদার এর আকাশ পাতাল তফাৎ। এখন কেদার অনেক বেশি বাণিজ্যিক হয়ে গেছে, বৈষ্ণব দেবী যেমন কেদার ও ঠিক তেমন হয়ে গেছে, আগে এত লোকেও আসতো না এত দাম ও ছিল না জিনিসের। তবে সরকার থেকে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে কিছু টেন্ট তারপর আসার পথে অস্থায়ী বাথরুম এগুলো করায় অনেকের সুবিধা হয়েছে। আমরা টুকটাক মন্দিরের আশে পাশে ঘুরে ওই ৮ টা নাগাদ রুটি তরকারি কিনে টেন্টে ঢুকে গেলাম। খাওয়া দাওয়া করে ৯-১০ টা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন ভোর ৩ টে নাগাদ উঠে সবাই রেডি হয়ে গিয়ে লাইনে দাড়ালাম, বেশ বড় লাইন, মন্দির খুলবে ৬ টায় এত তাড়াতড়ি এসেই যা লাইন। যাইহোক লাইনে দাঁড়িয়ে কিন্তু কেউ আমরা বিরক্ত বা অস্থির হয়নি বরং প্রাণ ভরে আহরন করছিলাম কেদার এর অপরূপ দৃশ্য, মন্দাকিনীর গর্জন আর দেবাদিদেব এর অপার মহিমা। আমরা যেহেতু লাইনের প্রথমেই ছিলাম তাই মন্দির খোলার পর আমাদের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি, খুব সুন্দর করে পুজো দিলাম সবাই মিলে। মন্দিরের চারপাশে অনেক সাধু সন্ত বসে আছেন, কেউ আগুনে হাত সেকছেন, কেউবা বোম ভোলে বলে কলকে তে টান দিচ্ছেন আবার কেউ গভীর ধ্যানে মগ্ন। মন্দিরের ঠিক পেছনেই বিশাল আকৃতির ভীম শিলা, এই শিলাই রক্ষা করেছিল কেদার নাথ মন্দির কে ২০১৩ এর ধসের সময়, আশে পাশের সমস্ত অঞ্চল ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলেও মন্দিরের কিন্তু কিছুই হয়নি। এইসব ঘটনা গুলোই কেমন যেন ঈশ্বরের অস্তিত্বকে আরও প্রকট করে জনমানসে। কিছুদূর এগোলেই আদি শংকরচার্য এর বিশাল এক মূর্তি এবং এখান থেকে ২ কিমি গেলেই তার সমাধি। তবে আমরা এক ঘন্টা খানেক ঘুরে দেখে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়লাম কারণ আজ আমাদের আবার চোপড়া পৌঁছতে হবে। যত তাড়াতাড়ি নামতে পারবো আমাদের জন্য ভালো কারণ চোপড়ার রাস্তা খুব অন্ধকার আর বাঁক বহুল। টেন্টে ফিরে ৮ টা নাগাদ আমরা সবাই নীচের দিকে নামা শুরু করলাম, তবে আজকে আবহাওয়া বেশ ভালো ঝলমলে রোদ সকাল থেকেই। সেই একই রাস্তা দিয়ে নামতে হবে তবে নামাটা অপেক্ষাকৃত কম কষ্টের হবে এই আশা রেখে আমরা চলতে থাকলাম। নামার পথে দেখছি আজ আরও বেশি লোক উঠছে, কাল আসলে ল্যান্ড স্লাইডিং এর জন্য অনেক কম লোকজন এসেছে আজ রাস্তা পরিষ্কার তাই লোকের পরিমাণ ও বেশি। ৯ কিমি যাওয়ার পর মোটামুটি হালকা টিফিন করে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার নামতে থাকলাম। যখন গৌরী কুণ্ড পৌঁছলাম তখন মোটামুটি ৩ টে মত বেজে গেছে। এদিকে আমাদের ট্রেক লিডার সামনে তাড়া দিচ্ছে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে চোপড়ার পথে রওনা হওয়ার জন্য। 

ক্রমশ

About Author
&
Photographer

লেখক : শুভ্রনীল চক্রবর্তী

প্রথম দশকের কবি

আলোকচিত্রী: শুভ্রনীল চক্রবর্তী

প্রথম দশকের কবি

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget