জলপাইগুড়ি শহরের পুজো পরিক্রমা

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

যতই দৈনন্দিনে ব্যস্ত থাকি আমরা , প্রকৃতি কাশ উড়িয়ে, চারদিকে নীল গুলে, মেঘের পেখম উড়িয়ে ঠিক সময় মতো আমাদের মনে করিয়ে দেয় উৎসবের দিন এসে গেছে। পুজো মানে শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান নয়, পুজো মানে মিলন উৎসব । সব কাজ সরিয়ে কত আড্ডা কত গল্প চলতে থাকে চারদিন ধরে। তার সঙ্গে চলতে থাকে নস্টালজিয়ার আলো বাতাস। উত্তরবঙ্গের একটি জেলা শহর জলপাইগুড়ি ।  ১৮৬৫ সালে এই জেলা শহরের জন্ম। এই শহরের গায়ে লেখা আছে অনেক ইতিহাস। অরণ্য , চা বাগান , সবুজ অকৃপণ প্রকৃতি আর নানা উপজাতির নানা সংস্কৃতি এই জেলা শহরের বৈশিষ্ট। দেশভাগের আগে ও পরে  উদবাস্তু মানুষ নতুন বসতি গড়েছিল এই অঞ্চলে। তাদের সংস্কৃতি বয়ে চলেছে অন্যান্য সংস্কৃতির পাশাপাশি। দুর্গাপুজো আপামর মানুষের প্রাণের উৎসব । শহরের বিভিন্ন ধরণের পুজোর কিছু পরিচয় দেওয়া হল। আশা করি জলপাইগুড়ির পুজোর কিছু ইতিহাস রাখতে পেরেছি পাঠকদের কাছে।

বৈকুণ্ঠপুরের রাজবাড়ির গল্প

জলপাইগুড়ি শহরের সবচেয়ে প্রাচীন পুজো রাজবাড়ির পুজো। রাজত্ব নেই কিন্তু ঐতিহ্য থেকে গেছে আজও। প্রতিবছর মহাসমারোহে রাজবাড়ির নাটমন্দিরে  পুজোর আয়োজন করা হয়। জলপাইগুড়ির রাজবাড়ির পুজোর বয়েস ৫১৪ বছর। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জলপাইগুড়িবাসীর আবেগ ও ভালোবাসা, রয়েছে মিথ।  রাজপরিবারের প্রবীণ সদস্য প্রণত বসু জানিয়েছেন, এই রাজবংশের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশে। তাঁদের রাজধানী ছিল সুবর্ণপুরে। সেই স্থানও আজ বাংলাদেশের অন্তর্গত। ১৫১০ সালে এই পুজো শুরু করেছিলেন রায়কত বংশের বিশু সিংহ ও শিশু সিংহ। পরবর্তীকালে পুজোর দায়িত্ব আসে সংশ্লিষ্ট রাজার মাতুল বংশের হাতে। প্রণত বসু সেই মাতুল বংশেরই উত্তরসূরি। সুবর্ণপুরে শুরু হওয়া পুজোই চলছে জলপাইগুড়ির রাজবাড়িতে।রাজপরিবারের পুরোহিত শিবু ঘোষাল এই প্রসঙ্গে জানান,আগে রাজবাড়ির পুজোতে নরবলি হত। সেই রীতি প্রতীকরূপে আজও চলছে। চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষের পুতুল তৈরি ধানের তুষ দিয়ে সেই পুতুলের শিরচ্ছেদ করা হয়। বর্তমানে পায়রা ও ছাগ বলি হয়। যেহেতু কালিকাপুরাণের মতে পুজো হয় তাই একই সঙ্গে দেবী কালীরও পুজ হয়। রাজবাড়িতে একটি স্থায়ী নিরেট সোনার দুর্গা প্রতিমা রয়েছে। তাতে নিত্য পুজো হয়। কিন্তু পুজোর সময় তৈরি হয় মাটির প্রতিমা। সে প্রতিমা তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা। দেবীর বাহন এখানে সিংহ নয় বাঘ। চার সন্তান ছাড়াও দুর্গার সাথে পুজিতা হন গঙ্গা, বিষ্ণু , মহেশ্বর , মহামায়া ও জয়া বিজয়া । দেবীর মহাস্নানের জল আনা হয় হরিদ্বার, মথুরা, বৃন্দাবন থেকে। দেবীর গলায় থাকে নবরত্নের হার ও মাথায় সোনার মুকুট ।রূপোর অস্ত্রে সাজানো হয় দেবীকে।   রাজবাড়ির পুজোর ভোগ বিখ্যাত। শাক্তমতে পুজো বলে রোজই আমিষ ভোগ হয়। নানারকম মাছ ভোগের তালিকায় থাকে। দশমীর দিন পুঁটি মাছ, ইলিশ মাছ, চিতল মাছ, পান্তা ভাত, কচু শাক থাকে দেবীর ভোগে। সকল দর্শনার্থীদের পুজোর প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

ভুঁইয়া বাড়ির পুজো

জলপাইগুড়ির এক বনেদি পরিবার হল ভৌমিক পরিবার। শোনা যায় ঢাকার মানিক গঞ্জের এই পরিবারটি বারো ভুঁইয়ার একজন। তাই এই বাড়ির পুজো ভুঁইয়া বাড়ির পুজো নামেই পরিচিত। জমিদার হলেও এই পরিবারটি বর্তমানে আইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এই পরিবারের শরিকরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও পুজোর দিনে সবাই একত্রিত হন খানিকটা জরাজীর্ণ নাটমন্দিরে। এই পুজো আগে হত ঢাকার মানিকগঞ্জে । ১৯৩০ সালে জলপাইগুড়িতে আসার পর এখানেই পুজো হয়ে আসছে। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী এই পুজোর বয়েস ১৬১ বছর।

      ভুঁইয়া বাড়ির পুজোয় দেবীর বাহন সিংহের রঙ সাদা। প্রতিমার গায়ের রঙ উজ্জ্বল হলুদ। একচালার প্রতিমায় একদিকে থাকেন গণেশ ও দেবী সরস্বতী অন্যদিকে লক্ষ্মী দেবী ও কার্তিক। পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসার সময় তারা প্রতিমার কাঠামোটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সেই কাঠামোতেই প্রতিবছর পুজো হয়। বিসর্জনের পর কাঠামোটি তুলে আনা হয়। দেবীর মহাস্নানে ব্যবহার হয় চল্লিশ ধারার জল। কোন বছরই তা লঙ্ঘন করা হয় না। চল্লিশ রকমের নদী হ্রদ সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা হয় জল। দেবীর পুজোয় অন্নভোগ হয় না। প্রতি বছর এই বাড়ির পুজো দেখবার জন্য দর্শকরা ভিড় করেন।

নিয়োগী বাড়ির পুজো

জলপাইগুড়ির বনেদি বাড়ির পুজোর মধ্যে নিয়োগী বাড়ির পুজো অন্যতম। এই বাড়ির পুজো প্রথম শুরু হয়েছিল ঢাকা জেলার বালাধারে। পরে তারা বসতি উঠিয়ে এসেছিলেন ঢাকা জেলার পাটগ্রামে। তবে পাটগ্রামের জমিদার নিয়োগীদের দুর্গাপুজো বালাধারার বাড়িতেই হত। ১৮০৮ সালে পুজো পাটগ্রামেই শুরু হয়েছিল। এই বাড়ি থেকে পাওয়া তথ্যসূত্রে জানা যায়, সেইসময় গ্রামে একাধিক পুজো হত না। একটি বা দু’টি পুজো হত সারা গ্রাম জুড়ে। পাটগ্রামে একমাত্র নিয়োগী বাড়িতেই পুজো হত। সারা গ্রামের মানুষ অংশগ্রহণ করতো এই পুজোতে। এত মানুষের যাতে প্রসাদ থেকে বঞ্চিত না হন সেই জন্য তৈরি করা হত দুর্গা দই। মিষ্টি দইএর সাথে লেবু ও জল মিশিয়ে এই দুর্গা দই বানানো হত, যা এখনো প্রচলিত আছে। দেশভাগের পর পাটগ্রাম থেকে কোলকাতার বাড়িতে দীর্ঘদিন পুজো চলার পর ১৯৬৭ সালে জলপাইগুড়ির বাড়িতে এই পুজো স্থানান্তরিত হয়। নেক নিয়ম নীতি আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই পুজো চলে আসছে। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী মহালয়ার পরদিন প্রতিপদে বসানো হয় মা চণ্ডীর ঘট। পঞ্চমীর দিন দুর্গা মণ্ডপে পূজিতা হন মা মনসা। এই মনসা পুজো নিয়োগীবাড়ির বাৎসরিক পুজো। ষষ্ঠীর দিন রীতি অনুযায়ী সন্ধেবেলা অনুষ্ঠিত হয় অধিবাস ও আমন্ত্রণ । সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সপ্তমী পুজো। অবিভক্ত বাংলায় পুজো শেষে প্রতিমা বিসর্জন হত পদ্মা নদীতে। বর্তমানে জলপাইগুড়ির করলা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন হয়।

       এই বাড়ির প্রতিমাতেও কিছু বিশেষত্ব আছে। দুর্গার গায়ের রঙ অতসী ফুলের মতো। একচালার প্রতিমায় গণেশের অবস্থান উল্টো। এই বাড়ির পুজোর অন্নভোগ রীতি নেই। মুড়ি মুড়কি নাড়ু লুচি ছানার পায়েস দিয়ে দেবীর ভোগ হয়। এই ভাবেই বছরের পর বছর অনুষ্ঠিত হ্যে চলেছে নিয়োগী বাড়ির পুজো।

 বাগচী বাড়ির পুজো

বাগচী বাড়ির প্রাণপুরুষ হৃদয়নাথ বাগচীর আগ্রহে জলপাইগুড়ির উকিল পাড়ায় এই বাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হয়। সেটি ছিল সিপাহী বিদ্রোহের বছর, ১৮৫৭ সাল, পাবনা থেকে জলপাইগুড়ি এলেন হৃদয়নাথ বাগচী । পাবনার সুবিশাল জমিদারি ফেলে নতুন করে শুরু করলেন জয়যাত্রা। দেশ তখন একটু একটু করে জাগছে। পাবনার বাড়িতে পূজিতা দুর্গা এখানে শক্তিরূপে পূজিতা হলেন। কারণ এ বাড়ির সাথে জড়িয়ে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। হৃদয়নাথ বাগচীর পাবনার জমিদারি ছাড়াও ছিল একটি বর্ণময় পেশাগত জীবন। তিনি ছিলেন নামকরা ব্যারিস্টার, প্র্যাকটিস করতেন ঢাকা কোর্টে। জলপাইগুড়ি চলে আসার পর কোচবিহারের রাজা তাঁকে আইনি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। ইংরেজের বিরুদ্ধে কোচবিহার রাজের অনেকগুলি কোর্টকেস জিতিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এই মামলা ছিল সম্মানরক্ষার লড়াই। এরপর ইংরেজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি প্রথম বাঙালি চা-বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এই বাড়ির আরো দুই পুরুষ। কারাবরণ করেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ বাগচী।

       এইবাড়ির প্রতিমা নির্মাণে কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে। বামদিকে থাকেন কার্তিক ও ডানদিকে থাকেন গণেশ । কার্তিকের পাশেই থাকে নবপত্রিকা। কালিকা পুরাণ ও দেবী পুরাণ এই দুই মতে শাস্ত্রীয় রীতি মেনে পুজো হয়। মহাস্নানে সপ্ত সাগরের জল না এলেও নানা জায়গার মাটি ও অন্যান্য উপকরণ পুজোয় ব্যবহার হয়। শাক্ত মতে পুজো হয় বলে আগে পুজোতে মোষ ও পাঁঠা বলি হত। বর্তমানে বন্ধ আছে বলি প্রথা। সোনার হার ,দুল, টিকলিতে সাজানো হয় দেবীকে। তবে দেবীর ভোগ আয়োজনে থাকে দু’ তিন রকমের মাছ। সবই রান্না হয় পেঁয়াজ রসুন ছাড়া। ভোগ রান্নার কাজে এ বাড়ির বধূরা অগ্রণী ভূমিকায় থাকতেন। আগে প্রতিদিন গড়ে নিমন্ত্রিত হতেন প্রায় হাজার জন। পরিবেশন করার কাজে হাত লাগাতেন বাড়ির ছেলেরা। এখন পারিবারিক আয় কমার সাথে সাথে কমেছে জৌলুস । কিন্তু নিষ্ঠার ভাগ কমেনি।বেলতলা পুজো দিয়ে পু্জো শুরু হয়। প্রতিদিন সকালে থাকে ফলমূল ও নাড়ু মুড়কির ভোগ, দুপুরে অন্নভোগ, বিকেলে লুচি তরকারি ক্ষীর পায়েস ভোগ। দু’তিন রকম মাছ, খিচুড়ি পোলাও  ইত্যাদি থাকে ভোগের আয়োজনে।  নবমীতেই তৈরি হয় দশমী পুজোর ভোগ। পান্তা ভাত, পুঁটি ও ইলিশ মাছ ভাজা, শাপলার চাটনি। নবমীর দিন বধূরা সিঁদুর দান করেন দেবীর পায়ে।  প্রতিদিন সন্ধেবেলা প্রতিমার সামনে ছেলেমেয়েদের আরতি দেখার বিষয় । পরিবারের অনেকেই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব।

গুহ বাড়ির পুজো

নতুন পাড়ার গুহ বাড়ির পুজো তিনশো বছরের বেশি পুরনো। ১৭০৩ সালে এই পুজো শুরু হয়েছিল বারো ভুঁইয়ার বংশধর সুরেশ্বর গুহের উদ্যোগে। প্রথমে এই পুজো শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ফরিদপুরে, তারপর পাবনায়। ১৯৪৯ সালে পরিবারের সাথে এই পুজো স্থানান্তরিত হয় জলপাইগুড়িতে। তবে ১৯৫৩ পর্যন্ত পুজো বাংলাদেশেই হত। এই পরিবারের ছিল গুড়ের ব্যবসা। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সাথেও ব্যবসায়িক সম্বন্ধ ছিল ।এই পরিবার স্বাধীনতা সংগ্রামেও অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। রীতি মেনে রথযাত্রার দিন থেকে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের কাজ। মহালয়ার দিন থেকে নিরামিষ খাওয়া হয় অষ্টমী পর্যন্ত। এখন ষষ্ঠীর দিন থেকে নিরামিষ খাওয়া হয়। নবমী থেকে হয় আমিষ ভোগ। দশমীতে থাকে ইলিশ মাছ, পান্তা ভাত ও কচু শাকের ভোগ। এ বাড়ির দুর্গাকে পরানো হয় বেনারসি শাড়ি। কোলকাতা থেকে আসে সেই শাড়ি আর কৃষ্ণনগর থেকে আসে দেবী ও তাঁর সন্তানদের সাজসজ্জার সরঞ্জাম। সোনা রূপোর অলঙ্কারে সাজান হয় দেবীকে। অষ্টমীর দিন হয় কালী-গঙ্গা পুজো। বিসর্জন শেষে রীতি মেনে নারায়ণ পুজো হয়। এই পুজো দেখতে বহু দর্শনার্থী ভিড় করেন।

জলপাইগুড়ির রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপুজো

বেলুড় মঠের রীতি মেনে জলপাইগুড়ি রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমেও মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপুজো। ১৯২৮ সালে জলপাইগুড়িতে রামকৃষ্ণ মিশনের এই শাখাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নানারকম সামাজিক কাজ যেমন দাতব্য চিকিৎসালয় , ছাত্রাবাস, দারিদ্র সীমার নীচে থাকা মানুষদের জন্য খাবার, পোশাক বিতরণ, ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সাহায্য করে থাকে এই প্রতিষ্ঠানটি। এই আশ্রমের দুর্গাপুজা শহরের মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র।  স্বামী বিবেকানন্দ একজন অল্পবয়েসী মুসলিম কন্যাকে কুমারী রূপে পুজো করেছিলেন। সেই রীতি অনুযায়ী মহাঅষ্টমীর দিন শহরের কোন সাত/আট বছরের  কন্যাকে দুর্গার কুমারী রূপে পুজো করেন আশ্রমের ব্রহ্মচারীরা। চিরন্তন মাতৃত্ববোধ যা শুধু নিজ সন্তানকে ঘিরে আবর্তিত হয় না, সমস্ত বিশ্ব সংসারকে বেঁধে রাখে স্নেহের আলোয়। বেনারসী ও অলঙ্কার শোভিতা সেই জীবন্ত মায়ের মূর্তিকে দেখবার জন্য শহরের মানুষের আকুলতা থাকে। শাক্তমতে পুজো হয় বলে মাছ ভোগ দেওয়া হয়। অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে এই পুজো করা হয় বলে দর্শনার্থীর সংখ্যা থাকে প্রচুর। দারিদ্র সীমার নীচে থাকা মানুষদের খাওয়ানো হয়। পুজোর প্রসাদ পান ভক্তরাও।

যোগমায়া কালীবাড়ির পুজো

জলপাইগুড়ি যোগমায়া কালী মন্দিরের ভেতরে অবস্থিত নাট মন্দিরে প্রতিবছর নিয়ম মেনে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। জলপাইগুড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্রে ডিবিসি রোড সংলগ্ন তেলিপাড়ায় ১৯২৭ সালে শহরের অন্যতম ঐতিহ্যমণ্ডিত কালী মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল। শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন রাধামোহন চক্রবর্তী, রেবতী মোহন চক্রবর্তী , কালু রাহুত, মোহিত ঘোষ, তরণী মোহন চক্রবর্তী, বাগচী পরিবার সহ শহরের গণ্যমান্য মানুষজন। সেইসময়ে মাতৃ সাধনার পাশাপাশি এই মন্দিরে ভিড় করতেন শহরের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। এই কালী মন্দিরের দুর্গাপুজো ৭৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে।

জলপাইগুড়ির সর্বজনীন দুর্গোতসব

কদমতলা দুর্গাবাড়ির সর্বজনীন দুর্গোৎসব খুবই প্রাচীন একটি পুজো। এই পুজোটি এবার ১০৪ বছরে পদার্পণ করেছে। সাবেকিয়ানা এই পুজোর বৈশিষ্ট। ডাকের সাজের অপূর্ব প্রতিমা সবার মন ভরিয়ে দেয়। শোনা যায় ত্রৈলোক্যনাথ মৌলিকের বাড়িতে দুর্গাবাড়ির পুজোর সূচনা হয় ১৯২০ সালে। পরবর্তীকালে এলাকার সকল বাসিন্দার আর্থিক সহযোগিতায় পুজা প্রাঙ্গনের বর্তমান জায়গাটি কিনে নেওয়া হয়েছিল। যেসব শ্রদ্ধেয় মানুষ এই পুজোর উদ্যোগে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁরা হলেন ত্রৈলোক্য নাথ মৌলিক , মাখন লাল কুণ্ডু , রমা প্রসন্ন সরকার, ত্রিপুরা সুন্দর ব্যানার্জি , রুক্মিনীকান্ত ভৌমিক , পূর্ণচন্দ্র বাগচী এবং তারক নাথ চক্রবর্তী। ১৯২০ সালে জলপাইগুড়ির পুজো বলতে ছিল রাজবাড়ি ও বিভিন্ন বাড়ির পুজোগুলি। সেই পরিস্থিতিতে কদমতলা সর্বজনীন, বর্দ্ধন প্রাঙ্গন আর বাবু পাড়া উদ্যোগ নিয়েছিল পুজোকে সর্বজনীন করে তুলতে। অতীতের মতো এই পুজোতে নবীন প্রবীনের অপূর্ব মেলবন্ধন আজও মুগ্ধ করে। পাড়ার মহিলা ও পুরুষ সকলেই পুজোর কাজে অংশগ্রহণ করেন। নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। 

জলপাইগুড়ির পুরনো সর্বজনীন পুজোগুলির মধ্যে বাবু পাড়ার পুজো অন্যতম।এ বছর ১১৩ বছরে পদার্পণ করবে এই পুজো। সেইসময় যাদের উদ্যোগে বাবুপাড়ার পুজো শুরু হয়েছিল তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন বেশ কয়েকটি চা বাগানের মালিক বিখ্যাত সত্যেন্দ্র প্রসাদ রায়, মন্টু চ্যাটার্জি, কানু সেন প্রমুখ। পাড়ার মানুষদের সক্রিয় সহযোগিতায় এই পুজো অনুষ্ঠিত হত। আগে বাড়ি বাড়ি চাঁদা তোলার রেওয়াজ ছিল না। যে যেমন পারতেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। সেই সময় বিখ্যাত পুজোগুলির মধ্যে চল ছিল বড় বড় নৌকোতে পাটাতন বেঁধে আলো জ্বেলে ভরা করলা নদীতে গান বাজনা আরতি সহ প্রতিমা বিসর্জন। সেই অপার্থিব দৃশ্য দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতেন করলা নদীর পাড়ে। বাবু পাড়ার প্রতিমাও বিসর্জন হত এমন জাঁকজমক সহযোগে। বর্তমানে এই পাড়ার কিছু ব্যক্তির উদ্যোগে দশমীতে বাজির রাবণ পোড়ানো হয়। যা দেখতে ভিড় করেন বহু মানুষ। প্রতিবছর বিভিন্ন থিমে এই পুজো হয়। অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বর্দ্ধন প্রাঙ্গনের পুজোটিও একটি প্রাচীন বারোয়ারী পুজো। বাড়ির পুজোতে সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারতো না বলে এই বারোয়ারী পুজো শুরু হয়েছিল। এইবছর পুজোটি এবার ৯৬ বছরে পদার্পণ করবে। তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা, বাগচী বাড়ি ও স্যান্যাল বাড়ির কিছু উদ্যোগী মানুষ প্রথম অব্রাহ্মণ দিয়ে এই পুজো করিয়েছিলেন। এমন ঘটনা সেইসময় বিরল ছিল। বর্তমানে স্থানীয় মুসলিম ধর্মাবলম্বী পাপ্পু আনসারী ২৫ বছর ধরে এই পুজো কমিটির সক্রিয় সদস্য।

রায়কতপাড়া বারোয়ারির ঐতিহ্যশালী পুজো এবার পড়ল ৯৪তম বছরে। রথযাত্রার দিন অনুষ্ঠিত হয় খুঁটি পুজো। পূর্বে রায়কত বাড়ির মাঠে পুজোটি অনুষ্ঠিত হত। পরবর্তীতে এলাকাবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী একবছর নদীয়া টি কোম্পানির মাঠে পরের বছর রায়কত বাড়ির মাঠে পুজো হত। এরপর পুজো দু’ভাগ হয়ে যায়। একটি পুজো হয় রায়কত পাড়া শনি মন্দিরের পাশে ,অন্যটি ইয়ং এ্যাসোসিয়েশনের মাঠে আজো হয়ে চলেছে। বিগ বাজেটের পুজোর মধ্যে এটি একটি। প্রতিবার নানা থিমের ওপর পুজো হয়। বহু দর্শনার্থীর ভিড় হয় এই পুজোতে।

জলপাইগুড়ির বিগ বাজেটের পুজোর মধ্যে তরুণ দলের পুজো অন্যতম। এবার এই পুজো ৬৪তম বছরে পদার্পণ করলো। উদ্যোক্তাদের দাবী, দর্শনার্থীদের কাছে বরাবরই এই পুজোর আকর্ষণ রয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে উপচে পড়ে আগ্রহী দর্শনার্থীদের ভিড়। নানারকম থিম ও অপুর্ব মণ্ডপ সজ্জার কারণে এই পুজো বরাবর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শুধু পুজোপাঠই নয় তরুণ দল দরিদ্র মানুষের হাতে বস্ত্রও তুলে দেয়। এছাড়াও প্রতিবার থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এইসব পুরনো পুজোগুলি ছাড়াও আরও অনেক পুজো হয় শহরে। কয়েকদিন  যেন উৎসব মুখর শহরকে চেনা যায় না। কত রঙ, কত আনন্দ ছড়িয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় কত মণ্ডপ... দেবী আরাধনার মন্ত্র ভাসে বাতাসে। সব পুজো নিয়ে লেখা হয়তো সম্ভব নয়, যতটুকু অল্প পরিসরে পারা যায় সেইটুকুই রইল পাঠকের জন্য। সবার পুজো ভালো কাটুক।

তথ্যসূত্র : ১. বিভিন্ন পরিবারের সদস্য ও পুজো কমিটির সদস্যদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য

২. আন্তর্জাল

৩. দৈনিক সংবাদ পত্র

About Author
&
Photographer

লেখক : জয়শীলা গুহ বাগচী

শূন্য দশকের কবি 

কাব্যগ্রন্থ : দেবদারু অপেরা,থার্মোকট,ফুল্লরার কলের গান,ফার্নের গন্ধ,শরীর জুড়ে সূর্যফুল,কমললতা কমার্শিয়াল

উপন্যাস : আপনি যে ব্যক্তিকে কল করেছেন 

আলোকচিত্রী: জয়শীলা গুহ বাগচী

শূন্য দশকের কবি 

কাব্যগ্রন্থ : দেবদারু অপেরা,থার্মোকট,ফুল্লরার কলের গান,ফার্নের গন্ধ,শরীর জুড়ে সূর্যফুল,কমললতা কমার্শিয়াল

উপন্যাস : আপনি যে ব্যক্তিকে কল করেছেন 

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget