দেবীর মেলা

সামিউল তখন ক্লাস থ্রী/ফোরে পড়ে। মালদা শহর থেকে ২০ কি.মি. দূরে তার গ্রাম চন্ডীপুর। দাদুর (ঠাকুর দা) সাথে প্রথম পাশের গ্রাম শোভানগরে দেবীর মেলা দেখতে যায়। দাদু পাপড় ভাজা, জিলাপি কিনে দিলে খেতে খেতে মেলার আনন্দ উপভোগ করে। তারপরে আর একটু বড় হয়ে একা একাই দেবীর মেলা যাওয়া শুরু করে। ইতিমধ্যে শোভানগরে কিছু বন্ধু বান্ধব জুটেছে। তাদের সাথেই মেলা ঘোরা, খাওয়া দাওয়া আর মেলার আনন্দ প্রতি বছর উপভোগ করে সামিউল। মণ্ডপের পাশেই হরিপদ ঝা এর মুদিখানা দোকান। হরিপদ ঝা আসলে হরিয়া ঠাকুর নামে পরিচিত। হরিয়া ঠাকুরের সাথে সামিউলের দাদুর একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তাই সামিউল তাকে হরি দাদু বলত। হরি দাদু তাকে খুব ভাল বাসতেন। মাঝে মাঝে তাঁর দোকান থেকে লজেন্স, ডালমুট খেতে দিতেন। দিন দিন সবার সাথেই এক চরম আত্মীয়তায় জড়িয়ে পরল।
আসলে দুর্গা পূজা উপলক্ষে এই মেলা। যদিও সে সময়ের লোক বলত ভগবতী পূজা। একচালা ঠাকুর। আর দেবীর থানের উপর পাকা মন্দির। সামনে চাতালে শামিয়ানা। আলোর ব্যাবস্থা বলতে কয়েকটি হ্যাজাক। তার মধ্যে দুটি হ্যাজাক সামিউলের বাড়ি থেকে দেওয়া হত। শোভানগরের সব পাড়ার লোকে মিলে এই বারোয়ারী পূজার আয়োজন করত। সব পাড়া বলতে বামুন পাড়া, জেলে পাড়া, মিস্ত্রী পাড়া, ঘোষ পাড়া, স্বর্ণকার পাড়া আর গোয়াল পাড়া। আস্তে আস্তে মেলা বড় হতে লাগলো। আরও পরে ওখানে আলকাপ গান হত। আলকাপ গানের দল ওই এলাকার হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের লোক নিয়েই তৈরী। এই দল পূজা কমিটির কাছে কোন টাকা পয়সা নিত না। শুধু ওদেরকে পূজা কমিটির পক্ষ থেকে চা জল খাবার দেওয়া হত। তাতেই ওরা খুশী হত। আলকাপ দলের মাথা জোহর খলিপা্র কথা মত দলের সবাই মনে করত এটা সবার পূজা। তাই সবাই আনন্দ ভাগ করে নিত। আলকাপ শুরু হত রাত ১০ টার পরে। তার আগে হত গ্রামের ছেলে মেয়েদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলতে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা আবৃত্তি আর গান। সামিউলও কখনো কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিত। যেন সব সম্প্রদায়ের মিলন মেলা। আর মেলাতে পাপড় ভাজা, জিলাপি ও অন্যান্য মিষ্টি, নানা রকম খেলনা ইত্যাদি দোকান। বেশ জমজমাট পরিবেশ। সামিউল মাঝে মধ্যে ফ্রী পাপড় খাওয়া্র লোভে পাপড় ওয়ালা নরেশ কাকার সাথে গল্প করত। নরেশ কাকা দোকান ফাঁকা হলে ওকে পাপড় খেতেও দিত। মেলাতে খেলনা ওয়ালা দূরের কোন গ্রাম থেকে আসত। তার কাছে সামিউল শুনেছে মালদা জেলার সব মেলাতেই সে যায়। কোথাও বেচাকেনা কম হয় কোথাও বেশী। তাই মোটামুটি চলে যেত। খেলনা ওয়ালার কাছে সামিউল জানতে চেয়েছিল যখন মেলা থাকেনা তখন সে কি করে। সে বলেছিল দিন মজুরী করে। দেবী পূজার সময় ঢাক বাজাতো ছাক্কু রবিদাস। শোভানগরেরই বাসিন্দা। সামিউল তাকে ছাক্কু মামা বলে ডাকত। কারণ ছাক্কু রবিদাস সামিউলের দাদুকে (মায়ের বাবা) কাকা বলত। ছাক্কু মামা সামিউলকে খুব ভালবাসত তাই প্রত্যেক বছরই ছাক্কু মামা সামিউল কে বাড়িতে নিয়ে যেত আর মিষ্টি খাওয়াতো। এভাবেই সামিউল সবার সাথে মিলে মিশে গিয়েছিল।
এখানে দেবীর পূজায় পাঁঠা বলী হত। রাতের দিকে বলী হতো তাই সামিউল পাঁঠা বলী দেখতে পেতোনা। কিন্তু বন্ধুদের বাড়িতে প্রায় প্রতি বছরই পাঁঠার মাংস খেতে যেত সামিউল। ৩ কি.মি. দূরে মিল্কীতে মিশ্র বাড়ির পূজা। ওখানে মোষ বলী হত। কিন্তু সে মাংস কেউ খেত না। বলী দেওয়া মোষ নদীর ধারে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হত।
পরে আরও একটু বড় হয়ে গ্রামের বন্ধু বান্ধব মিলে মালদা শহরে পূজা দেখতে যাওয়া। শহরে ইলেকট্রিক আলো, সুন্দর করে সাজানো মণ্ডপ দেখে অভিভূত হয়ে যেত সবাই। গ্রামে সবাই একচালা ঠাকুর দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু শহরে কোন মণ্ডপে পাঁচ চালা ঠাকুর, কোন মণ্ডপে তিন চালা ঠাকুর। গ্রামের চেয়ে ঠাকুর দেখতেও সুন্দর, ঠাকুরের সাজগোজও সুন্দর। আর কি সুন্দর আলোর খেলা। আর ডেকোরেটর দিয়ে তৈরী করা বিভিন্ন রকমের সুন্দর সুন্দর প্যান্ডেল। কিন্তু কোথায় যেন আন্তরিকতা ছিল না। হয়ত তখন সামিউলদের চেনা কেউ ছিল না তাই।
ইতি মধ্যে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। গ্রামেও শহরের মত আলোর ব্যবহার শুরু হয়েছে। শহরে যেভাবে আলোর ব্যবহার হত, পরের বছর গ্রামে সেই আলোর ব্যবহারের চেষ্টা করা হত।
তারপর চাকরী সূত্রে সামিউল শহরে এসে থাকা শুরু করে। প্রতি বছর নবমী পর্যন্ত শহরে থাকলেও দশমীর দিন সামিউল শোভানগরে দেবীর মেলা যেতই। ওখানে একটা টান অনুভব করত। প্রথম দিকে শহরের পূজা দেখতে বেরিয়ে সামিউলের ভালই লাগতো। নানারকম আলোর খেলা। অনেক লোক সমাগম। ইতিমধ্যে শহরেও অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। এছাড়া অফিস কলিগদের সাথে ঘনিষ্ঠতা। পূজার সময় সারা শহর জুড়ে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি। রাত ১২ টার পর শহরের বন্ধুদের সাথে সামিউল ঠাকুর দেখতে যেত। আর ভোর ৪ টার দিকে ফিরে আসতো।
এর মধ্যে শোভানগরের বেশ কিছু বন্ধু বান্ধব শহরে এসে থাকা শুরু করেছে, কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি/ফ্লাট কিনেছে। ওদের সাথে সামিউলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। সামিউলও একটা ফ্লাট কিনেছে, আর চাকরী থেকে অবসরের পর পাকাপাকি ভাবে শহরের বাসিন্দা হয়ে গেছে। সব সময় শোভানগরে যাওয়া না হলেও বিজয়া দশমীর দিন শোভানগরের বন্ধুদের সাথে দেবীর মেলা যেতে ভোলে নি। সেই ছোট বেলার টান এড়াতে পারে না।
দাদুর কাছেই সামিউল মানুষকে মানুষ ভাবতে শিখেছে। এরজন্যই বোধ হয় দাদু সেই ছোট বেলায় ওকে দেবীর মেলা নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই যুগে দাদুর প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও দাদু সুফি মানসিকতার মানুষ ছিলেন। ছোট বেলা থেকেই সামিউলের মনেও সেই প্রভাব। দাদুর জন্যই সামিউল দেবীর মেলার প্রতি দুর্বলতা। এখন দাদু নেই কিন্তু দেবীর মেলা আছে। হয়ত একদিন সামিউলও থাকবেনা। তাই সামিউল ভাবে শোভানগরের দেবীর মেলা যেন কোনদিন বন্ধ না হয়।















Comments