ইতিহাস ঐতিহ্য ও পরম্পরার পাশে আধুনিকতা কোচবিহারের শারদোৎসব

কোচবিহারের মাটি বহন করছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। জেলা কোচবিহারের মহকুমাগুলি কোচবিহার সদর, দিনহাটা, মাথাভাঙ্গা, মেখলিগঞ্জ, তুফানগঞ্জ। বর্তমান ভূগোলের যা আকার, তার অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলে দেবীপুজো হয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়, কিছু ক্ষেত্রে মৌখিক। অবিভক্ত বাংলা, বিহার, অসম, ত্রিপুরা, ওড়িশা সহ নেপাল ও ভুটানের যে শক্তি পুজোর ইতিহাস, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবস্থান করছে কোচবিহারও। এ অঞ্চলের রাজ পরিবারের পুজো, বাড়ির পুজো, মঠ ও মন্দিরের পুজোর সঙ্গে বাংলা ভাগের পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলা থেকে আসা পরিবারের পুজো, তাদের এলাকা গঠনের পর বারোয়ারী কিছু পুজোর জন্ম, ক্লাব সংস্কৃতি... সবটা মিলে কোচবিহারের পুজো। মূলত রাজ পরিবারের পুজো ও অন্যান্য পারিবারিক পুজোগুলোই ইতিহাসকে সূচিত করে। প্রথমেই যে পুজোর কথা উঠে আসে, তা শ্রী শ্রী বড়দেবী বাড়ির পুজো। এরপর শ্রী শ্রী মদনমোহন ঠাকুর বাড়ির পুজো অর্থাৎ কাঠামিয়া দুর্গাপুজো। এ দুটো প্রধান পুজোই রাজ পরিবারের পুজো।
শ্রী শ্রী বড়দেবী বাড়ির পুজোর সাথে বিভিন্ন লোককথা জড়িয়ে। কোচ রাজবংশের মহারাজা বিশ্বসিংহ শক্তি পুজোর দ্বারাই বিস্তৃত অঞ্চলের অধিপতি রূপে প্রতিষ্ঠিত হন বলে কথিত। কাহিনী বলছে, বিশ্বসিংহ ও তাঁর ভাই জঙ্গলে খেলার ছলে একটি শুকনো ময়না গাছকে ভগবতী রূপে কল্পনা করেন। বিন্নাপাতায় দেওয়া বলি গাছকে পল্লবিত করে। দেবী দর্শন দেন ও আশীর্বাদ করেন। অন্য এক কাহিনী বলছে, মহারাজা নরনারায়ণের ভাই শুক্লধ্বজ কোনও এক পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ করেন স্বয়ং দশভূজা ভগবতী মহারাজা নরনারায়ণকে কোলে নিয়ে সভা আলো করে বসে আছেন। তিনি মূর্ছা যান। পরবর্তীতে মহারাজকে বিবৃত করেন। বিবরণ শুনে মহারাজ নির্জনে অবস্থান করেন। নির্জনবাসের তৃতীয় রাত্রিতে দেবী ভগবতী আবির্ভূত হন এবং যে রূপ তিনি সে সময় দেখিয়েছিলেন, সে রূপে মূর্তি নির্মাণ করে শরৎকালে পুজো শুরু হয়।
শ্রী শ্রী বড় দেবীর রূপ অন্যান্য দেবীমূর্তির থেকে অনেকটা আলাদা। দেবী দশভূজা, ত্রিনেত্রা, রক্তবর্ণা। দেবীর ডান পা সিংহের ওপর, বাম পা মহিষের ওপর। মহিষাসুরের ডান হাতে সিংহ ও বাম হাতে বাঘ কামড়ে আছে। সিংহ শ্বেত বর্ণ, অনেকটা ঘোড়ার মতো। বাঘটি হলুদ। মহিষাসুরের রং সবুজ। দেবীর দশ হাতে বিভিন্ন অস্ত্র সজ্জিত, ডানে শূল খড়গ শর শক্তি চক্র এবং বামে পাশ খেটক ধনু পরশু অঙ্কুশ। দেবীপরিবার অনুপস্থিত, আছেন জয়া বিজয়া। এ পুজোর রীতি স্বতন্ত্র। রাজ পরিবারের পুজো, যেগুলো দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের দায়িত্বে সম্পন্ন হয়, তার মধ্যে এটি অন্যতম। শ্রী শ্রী বড়দেবীকে দর্শন করেই কোচবিহারের জনসাধারণের উৎসব শুরু হয়।
শ্রী শ্রী মদনমোহন ঠাকুর বাড়িতে মা ভবানী মন্দিরের নিত্য পুজোর পাশাপাশি কাঠামিয়া মন্দিরে সপরিবারে দেবীর পুজো হয়। এক কাঠামোয় লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশসহ দেবীদুর্গা থাকেন বলে এ মন্দিরের নাম কাঠামিয়া। মূর্তিকে বলা হয় কাঠামিয়া দুর্গা। মা ভবানী মন্দিরের কষ্টি পাথরের বিগ্রহ শ্রী শ্রী দেবী বাড়ির মৃন্ময়ী দেবীমূর্তির অনুরূপ। এছাড়াও এ মন্দিরে কষ্টিপাথরের আরেকটি ছোট দুর্গা মূর্তি দেখা যায়।
এই পুজো দুটো ছাড়া রাজ আমলে কিছু বাড়ির পুজো ছিল। গ্রামাঞ্চলে বেশকিছু ধনীবাড়ির পুজো ছিল। তাদের ধারাবাহিকতা কতটা ছিল, জানা যায় না, কারণ ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। তবে বিশেষ ইতিহাস বহন করছে দিনহাটা গোবরাছড়ায় মুস্তাফীদের পুজো, লাউচাবড়া বামনহাটে লাহিড়ীদের পুজো, খাগড়াবাড়ির পঞ্চগ্রামী ব্রাহ্মণ পরিবারগুলোর পুজো। কোচবিহার শহরে রাজ আমলের যে ১২টি পুজোর সন্ধান পাওয়া যায়,
১. পাটাকুড়ায় দেববক্সী বাড়ির পুজো (অমূল্য কুমার দেববক্সী)।
২. পাটাকুড়ায় চক্রবর্তী বাড়ির পুজো (রায় চৌধুরী সুশীল কুমার চক্রবর্তী)।
৩. কেশব রোডে ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো (মুরলীধর ভট্টাচার্য)।
৪. জিতেন্দ্র নারায়ণ রোডে রায় বাড়ির পুজো (গোবিন্দ প্রসাদ রায়)।
৫. রাজ রাজেন্দ্র নারায়ণ রোডে চক্রবর্তী বাড়ির পুজো (দীনেশানন্দ চক্রবর্তী)।
৬. বিশ্বসিংহ রোডে রুপচন্দ্র মুখার্জি ও অভয়াচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো।
৭. বিশ্বসিংহ রোডে গুহ বাড়ির পুজো (দীনেশ চন্দ্র গুহ, অক্ষয় চন্দ্র গুহ)।
৮. হাজরা পাড়ায় গুহ চৌধুরী বাড়ির পুজো (চন্দ্রমোহন গুহ চৌধুরী)।
৯. পাটাকুড়ায় চক্রবর্তী বাড়ির পুজো (হরমোহন চক্রবর্তী, যোগেন্দ্রমোহন চক্রবর্তী)।
১০. জিতেন্দ্র নারায়ণ রোডে বিশ্বাস বাড়ির পুজো (শরৎ চন্দ্র বিশ্বাস)।
১১. পাটাকুড়ায় দাস বাড়ির পুজো (পদ্মনাথ দাস)।
১২. স্টেশন চৌপথি এলাকায় সুকুল বাড়ির পুজো (সত্যনারায়ণ সুকুল)।
পরবর্তী সময়কার গুরুত্বপূর্ণ বাড়ির পূজোগুলির মধ্যে রয়েছে, সুভাষপল্লী দত্তবাড়ির পুজো, মিনিবাস স্ট্যান্ডের কাছে ঘোষ বাড়ির পুজো, রাসমেলা মাঠের কাছে নিয়োগি বাড়ির পুজো, ভগবতী জুয়েলারির বাড়ি অর্থাৎ রায় বাড়ির পুজো। এছাড়াও পদ্মনাথ চাপরাশির বাড়ির পুজো, নিউটাউনের ভাদুড়ি বাড়ির পুজো, হীরালাল ঘোষের বাড়ির পুজো, সিতু ডাক্তারের বাড়ির পুজো, ধর্মতলায় রামেন্দ্র ভবনের পুজো, তল্লিতলার শশাঙ্কশেখর বর্মন ও পূর্ণচন্দ্র বর্মনের বাড়ির পুজো, অশ্রুমান দাশগুপ্তের বাড়ির পুজো, মধুসূদন অধিকারীর বাড়ির পুজো, ডাক্তার বিকে রায়ের বাড়ির পুজো ইত্যাদি।
এসবগুলোর কিছু পুজো প্রায় হারিয়ে গেছে, কিছু চলছে। কিছু পুজো বাড়ির পুজো থেকে এলাকার পুজোয় পরিণত হয়েছে। কিছু প্রতিমা পুজোর বদলে ঘট পুজোয় এসে দাঁড়িয়েছে। কিছু পুজো তৎকালীন গৌরব হারিয়েও বর্তমান সময়ে নিয়ম পুজোতে রূপান্তরিত। নতুন পরিসরেও কিছু পারিবারিক পুজোর সূচনা হয়েছে ও ধারাবাহিক ভাবে হচ্ছে। বসু বাড়ির পুজো, দাস বাড়ির পুজো এর অন্যতম।
কোচবিহারে রামকৃষ্ণ মঠের পুজো, নিত্যানন্দ আশ্রমের পুজো, হরিসভার পুজো, ধর্মসভার পুজো সহ বেশ কিছু মঠ ও মিশনের পুজো হয় ও হচ্ছে।
জেলায় প্রায় হাজার খানেক পুজো হলেও, মহকুমাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পুজো হয়। মূলত দিনহাটা। বড় বাজেটের যেমন হয়, তেমনই থিমের, আবার সাবেকিও। এবার আসি কোচবিহার সদর শহর এলাকার ক্লাবগুলোর কথায়। পৌর এলাকাতেই প্রায় দুশোর বেশি।
কোচবিহারের ক্লাব সংস্কৃতি যে সময় থেকে প্রকট হয়ে উঠল, সে সময়ই মূলত বারোয়ারী দুর্গাপুজোগুলোর প্রচলন। অনেক মন্দির বা আশ্রমের পুজো পরবর্তীতে ক্লাবের পুজো হয়ে ওঠে। যেমন পারিবারিক পুজোও অনেক ক্ষেত্রেই আজ ক্লাবের।
ক্লাবগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় (এবং তারিখ ও সাল বিষয়ে অবশ্যই মতভেদ আছে। এই লেখার ক্ষেত্রে ক্লাব থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই সম্ভব হয়নি।),
নিত্যানন্দ আশ্রমের পুজো এ বছর ১১২ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯১২।
হরিসভার পুজো এ বছর ১০৩ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯২১।
পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ার পুজো এ বছর ৯২ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৩২।
কলাবাগান এলাকার পুজো এ বছর ৮২ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৪২।
কোচবিহার ক্লাব (নতুন বাজার পুজো কমিটি)এর পুজো এ বছর ৮০ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৪৪। ক্লাবের সূচনা ১৮৯৭।
গুড়িয়াহাটি ক্লাবের পুজো এ বছর ৮০ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৪৪।
অনেকে বলেন, কোচবিহারের প্রথম বারোয়ারী দুর্গাপুজো তরুণ দলের। এ বছর এ পুজোর ৮০ তম বছর। পুজো শুরু হয় আনুমানিক ১৯৪১এ। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ পুজো বন্ধ ছিল।
সুভাষপল্লী এলাকার পুজো এ বছর ৭৫ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৪৯।
গান্ধীনগর লীলা স্মৃতি ভবানী মন্দিরের পুজো এ বছর ৭৫ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৪৯।
পাটাকুড়া ক্লাবের পুজো এ বছর ৭৩ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৫১।
দুর্গাবাড়ি এলাকার পুজো এ বছর ৭১ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৫৩।
ঘোষপাড়ার পুজো এ বছর ৬৮ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৫৬।
দক্ষিণ খাগড়াবাড়ি এলাকার পুজো এ বছর ৬৬ তম। আনুমানিক সূচনা ছয়ের দশকে।
ভারত ক্লাবের পুজো এ বছর ৬৫ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৫৯।
শান্তিকুটির ক্লাবের পুজো এ বছর ৫৯ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৬৫।
রবীন্দ্রনগর এলাকার পুজো এ বছর ৫৮ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৬৬।
ভেনাস স্কোয়ার ক্লাবের পুজো এ বছর ৫৮ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৬৬।
বয়েজ ক্লাবের পুজো এ বছর ৫৭ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৬৭।
নিউটাউন এলাকার পুজো এ বছর ৫৫ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৬৯।
ঐক্যবিতান ক্লাবের পুজো এ বছর ৫০ তম। আনুমানিক সূচনা ১৯৭৪।
এছাড়াও উল্লেখযোগ্য ক্লাবের পুজোগুলি হল মৈত্রী সংঘ এলাকার পুজো, অমরতলা এলাকার পুজো, চালতাতলা এলাকার পুজো, এসিডিসি ক্লাবের পুজো, সুভাষ ক্লাবের পুজো, তল্লিতলা এলাকার পুজো, সংহতির পুজো ইত্যাদি। এছাড়াও যে পুজোটির কথা বলতে হয়, তা পুলিশ লাইনের পুজো।
ক্লাবের পুজোর ক্ষেত্রে কিছু অংশেই লিখিত ইতিহাস আছে, এবং সংরক্ষিত। বাকিটা মৌখিক। অবিভক্ত ভূখণ্ডে মূলত চন্ডী ও মহিষমর্দিনী রূপের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে বাংলায় শরৎকালীন যে পুজো, তা বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ, দেবী পুরাণ, কালিকা পুরাণ-এর মতো কোনও একটি মতকে সামনে রেখে সম্পন্ন হয় বলেই মনে করেন গবেষকরা। এই আয়োজন, এই উৎসব আসলে ধর্মের ওপরে উঠে সমাজের, সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। পারিবারিক পুজো, কিংবা মঠ মন্দির, বা ক্লাব, প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই উৎসবের শুরু হয় নবপত্রিকা স্থাপনের মধ্যে দিয়ে। এরপর চন্ডী পাঠ, মহাস্নান, সন্ধিপুজো, বলিদান, কিছু ক্ষেত্রে কুমারী পুজো, এই সব পর্বের মধ্য দিয়ে। আর শেষটায় বিজয়া।
শেষ মানে কি শেষ! সেও এক শুরু। আদি অনন্ত জীবনের মতোই।সামগ্রিক কোচবিহারের পুজোকে এই সংক্ষিপ্ত আয়োজনে ধরা অসম্ভব। তাই নির্বাচিত। সামগ্রিক সন্ধান ও সংকলন নিশ্চই আগামীতে হবে।
তথ্য ঋণ:
• রাজ আমলের পারিবারিক পুজো। রাজআমলে কোচবিহার শহরের পারিবারিক দুর্গাপুজো প্রবর্তন, দুর্গোৎসব ও দুর্গামণ্ডপের ইতিহাস। ঋষিকল্প পাল। শারদছন্দ, ১৪২৫।
• আধুনিক পরিবৃত্তে পারিবারিক পূজায় কোচবিহার। প্রসাদ দাস। অদ্রিজা, ২০১৮।
• প্রাণের ঠাকুর মদনমোহন। তন্দ্রা চক্রবর্তী দাস। এখন ডুয়ার্স।
• ড. নৃপেন্দ্রনাথ পাল, দেবদর্শন চন্দ, অভিষেক সিংহ রায়, শহরের বিভিন্ন ক্লাব ও ক্লাবকর্তা।
ছবি সৌজন্য: সিদ্ধার্থ বসু, অরিন্দম সাহা, সুজন সাহা, নীলাদ্রি দেব।















Comments