পুজো আর পূজা

ছেলেবেলা থেকে পুজো আর পূজা দুটো শব্দ অর্থ খুঁজে খুঁজে আজও হয়রান। যেমন করে মৃত্যুকালে বৃদ্ধা খুঁজে গুরুকূল আমারও হয়েছে তেমন। সেদিন আমার কূলগুরু চন্দ্রবিন্দু ভট্টাচার্য এক সকালে পাদ্যঅর্ঘ্য শেষে আমাকে খোলাসা করে বললেন, 'পুত্র, পূজা শব্দটি হলো সাধু ভাষা আর পুজো শব্দটির হলো চলিত ভাষার রূপ।'
আমি অবাক তো অবাক! গুরুজীর সেই কথামৃত শুনে আমিও মনে মনে ভাবলাম, সামনেই তো বাঙালির শারদ উৎসব মানে দূর্গা পুজো— তাই তাকে মানে পুজা নিয়ে কিছু লিখলে তো মন্দ হয় না।
অতএব যেই কথা আমার সেই কাজ। রাত জেগে পাণ্ডুলিপি খসড়া তৈরি করে মোক্ষম সময়ে মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করাই ক্ষেত্র তৈরি করলাম। যেমন সুত্রপুত্র কর্ণ তার জীবন সংকটের সময় সবকিছু উপচে গিয়েছিল। তাই কালক্ষেপণ আমার সইছিলো না। খসড়াকে মূল লেখা করবার তবে এখানে আপনাদের বলে রাখা ভালো, চলিত ভাষায় পূজা লিখলে তা আপনাদের সাহিত্যে গুরুচণ্ডালী হবে আর যদি সাধু ভাষায় পুজো লিখলে তাও আমার গুরুচণ্ডালী দোষ হবে। অথচ আমার কি হবে! এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি কয়েকদিন ধরে একদম দিশাহীন। আহ্ গুরুর কি অসাধারণ লীলা! অথচ একালব্যহীন সংসারে এখনও আমি একা একা পথ চলি। যেমন করে একদিন তাকে ছাড়া আমার পথ চলা শুরু হয়েছিলো তাও তো উনিশ বছর আগেকার কথা। হায় প্রেম! এখন আমার সংসার আছে। সন্তান আছে। সে কথা থাক এবার আসল কথা বলি— এইতো সেদিন সকালে পুত্র আওয়াজ করে পড়ছিলো, যেমন 'খাইতে' গেলে হইবে সাধু ভাষা, আর 'খেতে' গেলে হবে চলিত ভাষা। আর আমাদের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় হবে 'খায়ুম'। হঠাৎ আমার মাথা ভো-ভো করে মৌমাছির মতো ঘুরে উঠলো। যেমন করে মৌমাছি হুল ফুটিয়ে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করে। ভাবলাম আজ এই পযর্ন্ত নোম্যান্সল্যান্ডের সীমারেখায় সীমিত থাকুক।
বাবারে— মহাভারতের চরিত্র সমূহকে যে কষ্ট বেদব্যাস দিয়েছেন তা 'খাইবো, খাবো কিংবা খায়ুম' শব্দের মতো। আমিও এখন মাঝে মাঝে ভাবি, 'খা' মানে 'হা' করা আর 'বো' মানে কি? তার অর্থ আজও খুঁজি। কিন্তু সব কথার অর্থতো একই! এখানে ওখানে শুধু বানানগত পার্থক্য ছাড়া অর্থগত আর কোনো পার্থক্য আছে কি না আমার জানা নেই।
আমার কথা শুনে গুরুদেব চন্দ্রবিন্দু ভট্টাচার্য্য অত্যান্ত ক্ষেপে গিয়ে আমাকে বললেন, ওরে মুখপোড়া 'পূজা' মানে পূজিত এর পূ+জা হলো শুদ্ধ বানান। তবে মনে রাখবি পূজা শব্দের প্রতি অনেক যত্ন-আত্তি করতে হয়। আমি আমার গুরুদেবের এই যত্ন-আত্তির মর্মবাণী কখনও বুঝতে পারিনি। এটা হয়তো আমার সংকিণতা কিংবা অজ্ঞাত বললেও ভুল হবে না।
এদিকে আমি মহাভারত কিংবা রামায়ণ হয়ে বিবিধ উপনিষদ খুঁজে খুঁজে একদিন কুলগুরুর মুখচ্ছবি মুছে গেছে গান্ধারীর শতপুত্রের শোকের মতো।
রামসুন্দর বসাক রচিত বাল্যশিক্ষার সমীক্ষায় শিক্ষক সলিল চক্রবর্তীর মুখচ্ছবি এখনও আমার মনে পড়ে । ছেলেবেলায় তিনি আমাকে যত্ন-আত্তিতে আমার পড়াশোনায় মনস্থির করেছেন। তাঁর পরিশ্রম কখনও ভুলার নয়। শিক্ষক সলিল বাবু তিনি আমাকে বলতেন, এই যে পূজা, পূজা হলো তোর একটি বিশেষ্য পদ। আমরা তাকে সহজ অর্থে আরাধনা, উপাসনা, অর্চনা; ভক্তি; শ্রদ্ধাজ্ঞাপনও বলে। দিন যেতে যেতে বারো মাসে তের পার্বন আবার বছর শুরু একদিন তাও শেষ হয়।
কিন্তু আমার পূজা আর তার তাৎপর্য খোঁজা কখনও শেষ হয় না। আমিও বুনো মোষের মতো এদিকে ওদিকে ঘুরি, খুঁজি।
এখনও আমার মনে আছে, বাংলার মাষ্টার মশাই পিকে বল বাবুর কথা। পিকে বল মানে প্রফুল্ল কুমার বল। বল উনার পদবী। মাঝে মাঝে আমার এও মনে হয়েছে ক্ষীনকায় মানুষটির পদবী কী করে বল হয়। সে যাই হোক, তিনি প্রায় সময় আমাকে বলতেন, পূজা শব্দটির প্রকৃত উৎপত্তি হচ্ছে সংস্কৃত শব্দ থেকে। যার সহজ অর্থ দেবতাকে প্রদীপ, ফুল, ও জল বা খাবারের প্রেমপূর্ণ নৈবেদ্য উৎসর্গ করার নামেই হলো পূজা। তোমাকে পূজা লিখতে একদম কোনো ভাবেই কোনোদিন হ্রস্ব উ-কার লেখা চলবে না। আবার তেমনি পুজো লিখতে দীর্ঘ ঊ-কারও তোমার দেওয়া চলবে না।
এসবের দোটানা দু'মুখো আর দোলাচালে আমি যেটুকু সার বুঝে নিয়েছি, তা হলো এমন— অনেকটা বিশ্বমিত্রের ধ্যান ভগ্নের মতো। যেমন পুজো আর পূজা এসব আমার কাছে অনেকটা উবর্শীর মতো কিংবা উপাসকের জন্য যেমনটা নির্ধারিত। তখন শকুন্তলা কিংবা মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময় রূপে দেখতে দেখতে দেবতারা আমাদের মাঝে হয় দৃশ্যমান, এবং এও নিশ্চিত মৃন্ময়ী দেবতারা উপাসককে দেখে। এই যে "মানুষ ও দেবতার মধ্যে" এবং "ব্যক্তি ও গুরুর মধ্যে" দেখাদেখির মিথস্ক্রিয়াকে বলা হয় দর্শন। আর পূজা হলো প্রার্থনার আরেকটি রূপ। সে কথা থাক আজ এবার আসল কথায় আসি...
আমাদের চট্টগ্রামের ঐতিহ্যগত পূজা হলো মনসা পূজা। একমাত্র এই পুজোটা গোটা শ্রাবণ মাসব্যাপী হয়। পাড়ায় পাড়ায় বাইশকবির রচিত পুঁথি পাঠ হয় বিভিন্ন সুরে। কখনও কখনও নামকরা কবিয়ালের গান হয়। কোন কবিয়াল সাজে শিব আর কেউ গৌরী কিংবা কালি। রাতভর মনসামঙ্গল কাহিনীতে লখীন্দর আর বেহুলার কষ্ট ভেসে বেড়ায়। নাগপঞ্চমীতে আরম্বরের সাথে পাঠা বলি অনুষ্ঠিত হয়। তবে কেন পাঠা বলি দিতে হয় তা আমরা কেউ জানি না। অথচ আমাদের পাড়ার হরিসাধন দাশ বলে ছাগ মানে ছাগল। অথচ হরিসাধন জানে না ছাগ মানে ছাগল নয় রে পাগলা এযে ষড়রিপু মানে কাম ক্রোধ মোহ লোভ মাৎসোয্য ইত্যাদি। এটা আমরা হরিসাধনের মত অনেকেই ভুলে গেছি। যেমন ভুল বানানটা উ-কার নাকি ঊ-কার তাও আজকাল বেমালুম উপচে যায়।
আমার বধুয়ার একবার দূর্গা পুত্র কার্তিক এর প্রতিমা গড়ে পূজা করবার অভিলাষ হলো। তার যেমন ইচ্ছে তেমন আয়োজন। ঢোল বাজলো, মঙ্গলপ্রদীপ জ্বললো ঘরের দাওয়ায়। ভোগারতি হলো। কিছুতে কিছু কমতি রাখলো না। এবং পূজা শেষে তার বিসর্জনের সময় হলে আমি গিন্নিকে বললাম, এই যে এতো পয়সা খরচা করে কার্তিক বাবুর প্রতিমা গড়লে এবং প্রতিমা বিসর্জেনের সময় ঘনে আসতেই গিন্নির চোখ ছলছল করে উঠলো, তার বিষাদভরা মুখ দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিমা বিসর্জনের তাৎপর্য কী? গিন্নি আমার কথা শুনে একগাল হেসে নেয়, এমন ভাব করলো যেন গিন্নি সর্বজান্তা। আদৌও যে তা কাঁচকলা তা আমার জানা আছে। আমিও গিন্নিকে সবিস্তরে এমন উত্তর দিলাম, যেমন ধরো পূজা প্রতিমা, ঘট, শালগ্রাম শিলা, শিবলিঙ্গ, যন্ত্র কিংবা ওঁকার, স্বস্তিকা ইত্যাদি চিহ্ন সামনে রেখে পূজা করা হয় আবার নিরাকার ভাবেও পূজা করা যায়। পূজা হলো তোমার মাঝে যে দ্বৈতভাব থাকে, তার থেকে তোমাকে ধীরে ধীরে অদ্বৈতবাদের দিকে অগ্রসর করে। আর এই অগ্রসর হওয়াকে অনুশীলন। অথবা বলতে পারেন নিজ হৃদয়ে ঈশ্বরের অবস্থান অনুভব করার প্রক্রিয়াগুলি যথা- চিন্তন-মনন, ধ্যান- জপ, যাগযজ্ঞ এবং আত্মনিবেদন অর্থাৎ পূজার মধ্যে একটি। চতুর্বেদ এ যে চারটি মহাবাক্য আছে তা মনে রাখা আমাদের প্রয়োজন। যেমন, (প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম(ঋক্), তত্ত্বমসি(সাম),অয়মাত্মা ব্রহ্ম(যজু) এবং অহং অথচ আমাদের জীবনে কতো পূজা যায় কতো পূজা আসে, কিন্তু পূজায় কার কি উন্নতি হয়েছে? সেইটুকু আজ একানে প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। কেনোনা আমাদের চারপাশের কোটিপতিরাই এগিয়ে গেছে সম্মূখপানে। তাদের শোষনের পাখা বিস্তৃতি করেছে বারবার। যেমন করে এদিকে ওদিকে সুদখোর মহাজনরা বারবার সুদের টাকায় মসগুল হয়েছে।
আপনার মনেই হতে পারে আমার বক্তব্য কতটুকু সত্য?
আমি যদি বলি শতভাগ সত্য। তবে কি আমার বলা ভুল! একবার ভাবুন তো দিনের পর দিন পূজা-অর্চনায় কাদেরকে জাহেলিয়াতের যুগে নিয়ে যাচ্ছে। থাক আমার ব্যক্তিগত অভিমত।











Comments