গির অরণ্যকথা

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

ধান ভানতে শিবের গীত

এবারে বিশ্ব বিখ্যাত মিউজিক ব্যান্ড কোল্ড প্লে ভারতে আসে জানুয়ারি মাসে। আমার পুত্রের (সপ্তর্ষি) ইচ্ছা হল সামনে থেকে দেখবে। এমনিতেই আমাদের তিনজনের পায়ের তলায় সর্ষে। এরকম সুযোগ কেউ মিস করে !   দেবাশিস ও আমার অফিসের কাজের চাপ আবার ওদিকে বইমেলায় প্রকাশিতব্য ‘এবং সইকথা’ পত্রিকার সম্পাদনা কাজ।  তদোপরি পুত্রের কর্পোরেট চাকরি । কাজ, ছুটির অনুমোদন সব সামলে যাওয়া। নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শো-এর টিকিট পেতেই শুরু হয়ে গেল যাওয়ার প্রস্তুতি। আমাদের দ্বিতীয় বার গুজরাট ভ্রমণ এবং গতবারে অদেখা গির অরন্য ভ্রমণ ঘটিয়ে দিলেন আসলে কোল্ড প্লের প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিন। তাই ক্রিস মার্টিনকে  ধন্যবাদ জানিয়ে সৌরাষ্ট্রের এই অরণ্যকথা লেখার প্রয়াস করছি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এখানে প্রধান চরিত্র এশিয়াটিক লায়ন। ২০২০-এর শুমারি অনুযায়ী ৬৭৪টি এশিয় সিংহ,৩০০টি লেপার্ড রয়েছে এই অভয়ারণ্যে। তবে পার্শ্ব চরিত্রগুলি যেমন চিতল হরিণ, সম্বর হরিণ, নেকড়ে, বন্য শুকর, নীলগাই, লেঙ্গুড়, হায়েনা, নানা প্রাজাতির বিড়াল এরাও যে একে অপরের পরিপূরক তা বলাই বাহুল্য। প্যাঁচা, চিল, বাজ, ময়ূর, কিংফিশার ,দুধরাজ এরকম দুশো প্রজাতির পাখি… এরাও যথার্থ সঙ্গত করে। পশুরাজের দেশে অতিথিদের ভাগ্য ভালো থাকলে সাপ কুমীরও একবার পেন্নাম ঠুকে যায়  বৈকি…

শুরুর কথা

 কলকাতা থেকে উড়ান পথে আহমেদাবাদ। পরদিন সকালে সেখান থেকে সড়ক পথে  বেড়িয়ে পড়লাম সাসন গিরের উদ্দেশে। পথে ছোট ছোট পাহাড় , শুষ্ক বনভূমি , গ্রামের দৃশ্য দেখতে দেখতে সাসন গিরে এসে পোঁছালাম বিকেল বেলায়। এখানে অনিল ফার্ম হাউস আমাদের দুদিনের ঠিকানা। হিরন নদীর ধারে অবস্থিত বিশাল বাগান , জঙ্গলে ঘেরা ফার্ম হাউস। ঢুকতেই ওয়েলকাম টি দিলো বাগানে। চেক ইন করলাম রিভারসাইড দোতলার রুমে। এখানে আমের বউলের নেশা ধরানো মিষ্টি গন্ধ , বারান্দা থেকে নদী , পাখির ডাক, গাছ গাছালির অপুর্ব দৃশ্য মন ভরিয়ে দিল। রাতের ডিনার করতে যাওয়ার সময় গা ছমছমে আধো আলো-অন্ধকার আর রহস্যময় পরিবেশে  ধুকপুক ছন্দে বুকের নেচে ওঠা বেশ উপভোগ্য। ডিনারে বসে বুঝলাম দেশি বিদেশী অনেক পর্যটক এখানে এসেছেন।

প্রথম সাফারি পর্ব

 পরদিন ভোর চারটেয় বাবা আর ছেলের ঘুম ভাঙিয়ে একটু বিরাগভাজন হয়েছিলাম।  কিন্তু না এই জঙ্গল ট্রিপে  ভোরের প্রথম সাফারিতে আমাদের রুটে আমরাই প্রথম জিপ। ভোর ভোর উঠে সিং সদনে লাইন দিয়েছিলাম ।  রিসেপশান কাউন্টারে কলকাতা থেকে বুক করে আসা অন লাইন পারমিট দেখিয়ে টাকা জমা দিয়ে জিপসি গাড়ি ও গাইড নিয়েছিলাম। ১৮১২ বর্গ কিলোমিটার জঙ্গলে ২৫৮ বর্গ কিমি জাতীয় উদ্যান। মোট ১৩টি রুটে সাফারি হয়। এবারে আমাদের রুট তেরো। প্রথম সাফারি এই  রুটে, সঙ্গে সঙ্গে বসেও পরলাম তিন ঘন্টার সাফারিতে। এক একটা সাফারি কভার করে ৩২ কিলোমিটার এরিয়া। সকাল ৬ টায় শুরু হল। আমাদের পরনে হাল্কা শীতের জামা, মাথায় টুপি … জঙ্গলের মধ্যে খাওয়ার নিয়ে ঢোকা নিষেধ । এমনকি প্লাস্টিকের বোতলে জলও নেওয়া যাবে না।  তবে জল শুদ্ধু মেটালের বোতল ১০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যায়। আমাদের ড্রাইভার ও গাইড  লালু এবং দীনেশ ভাই। খুব সুন্দর ভাবে আমাদের গাইড করছিলেন। জঙ্গলের আয়তন ও কত প্রকার পশুপাখি আছে সে সব বিস্তারিত বলতে বলতে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন , কিন্তু তীক্ষ্ণ নজর জঙ্গলের দিকে। তখন সূর্যের আলো ফোটেনি । জিপসি গাড়ির হেড লাইট ভরসা। সপ্তর্ষি  ক্যামেরা তাক করে আছে জঙ্গলের দিকে। আমাদের হাতেও মোবাইল ক্যামেরা। শুকনো পাতার উপর দিয়ে আঁকা বাঁকা মাটির পথ ধরে  একটা খস খসে আওয়াজ করে শুষ্ক পর্ণমোচী জঙ্গলের ঘুম ভাঙিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে  

ভোর বেলার দৃশ্যে আধ ঘন্টার মধ্যেই  প্রথমেই আমাদের দেখা দিল অন্ধকার মাখা তরুণ একটি সিংহ । বসে আছে ঘাস জাতীয় ঝোপের মধ্যে গাছের তলায় যার এখনো কেশর গজায়নি। ভোরের দিকে শুধু আমাদের গাড়ির আওয়াজেও বোধ হয় মাথা নাড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালো। ব্যাস এততুকুই। গাইড ভাই বললেন , ‘ আপনাদের ভাগ্য ভালো শুরুতেই আপনারা  সিংহ দেখলেন’। জঙ্গল বলছে  ‘আরও গভীরে যাও … তখনও জানি না আর কী কী অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য… ধীরে ধীরে শাল আমলকী তেঁতুল বাবলা গাছের ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে… চারিদিকে লালচে হলুদ আভা…  একলা হরিণ ,যূথবদ্ধ হরিণ নজরে এল। শিঙের নিখুঁত ভাস্কর্য আর গায়ের বেনারসি শাড়ির মতো জড়ির কারুকাজ উপভোগ করছিলাম।  চলন্ত গাড়ি থেকে ছবি তুলতে তুলতে এগোলাম। এখন গোল্ডেন আওয়ার, ড্রাইভার ও গাইড ভাই বুঝিয়ে দিলেন এখন সিংহ আর চিতা দেখার জন্যই কেবল গাড়ি থামবে…  গাইড আমাদের সিংহের পায়ের ছাপ দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছিল । আর বলছিল সঙ্গে দুটো বাচ্চাও আছে। একদম টাটকা পায়ের ছাপ দেখে আশা জাগছিল মনে।

একটু বাদেই Indian Scops Owl দেখলাম যার কান ছুঁচলো উপর দিকে ওঠানো। একটা গাছের কোটরে বসে আছে। গাইড দৃষ্টি আকর্ষণ না করলে দেখার সৌভাগ্য হত না। কিছু সময় পরে নজরে এল একটা নীল গাই উঁচু গাছের ডাল থেকে মাথা উঁচু করে পাতা খাচ্ছে । আমাদের কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না। মাঝে মধ্যে ঈগল, বাজ ছাড়াও আরও কতরকমের নাম না জানা পাখিরা দেখা দিচ্ছে। গাছে নখের আঁচর জানান দিচ্ছে সিংহের অস্তিত্ব, আনা গোনা।  বেশ কিছু ছবি তুলে এগিয়ে গেলাম। রুটের মাঝামাঝি জায়গায় একটা জায়গায় ড্রাইভার গাড়ি থামাল । সেখানে টয়লেট আছে। সবাই নামতে পারবে এখানে। কিছু ছবিও তুললাম এই সুযোগে ।

সপ্তর্ষি আগেই তার মাকে সাবধান করেছিল তার দেখা পেলে মুখে আওয়াজ যেন না করি। ভাবুন পাঠক আমাদের আড্রিনালিন ক্ষরণ ,আমাদের গাড়ির পিছন দিকের জঙ্গলে থেকে এন্ট্রি নিচ্ছেন মা সিংহী , আর ছানা দুটি পিছন পিছন এগিয়ে আসছে। মা একবার সাফারি গাড়িটার দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে নিল মানুষের বাচ্চাগুলোর মোটিভ আর ছানারা সুরক্ষিত আছে কিনা। আর ছয়মাসের ছানা দুটি আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন কিছু বলতে চাইল। তারপর রাজকীয় চালে চলে গেলেন তেনারা সামনের দিকে।  এরপর রাস্তা ধরে এগিয়ে বাম দিকের জঙ্গলে ঢুকলেন।  জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো দু একটা ময়ূর দেখতে পেয়ে ছানা দুটি তাড়া করল। আসলে খেলছিল। মারেনি কিন্তু। ওরা এত আদুরে ঘরে রেখে আসা আমার পোষ্যদের কথা মনে পড়ে গেল।  মিনিসোনার মতো বুকে জড়িয়ে চুমু খেতে চেয়েছিলাম ওদের। আসলে আমি ওদের মা হতে চেয়েছিলাম। কী যেন বলে, ঢেকি স্বর্গে  গিয়েও…  ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ নেই…  আমার যেমন স্বভাব আর কি! ‘তোমরা ভালো থেকো’ গির অরণ্যের দুটো সিংহ শাবকের প্রতি আমার এই চিৎকৃত উচ্চারণ … সাভানা পেরোচ্ছি উত্তেজনা আর আনন্দ নিয়ে … যারা আমার চোখে চোখ রেখেছিল তাদের কোনোদিন ভুলব না। ক্রমশ মা ও ছানারা আমাদের চোখের বাইরে চলে গেল… বেশ কিছু দূর গিয়ে কয়েকটি সাফারি গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি হলাম । ট্যুরিস্টদের মুখ দেখে বুঝলাম পশুরাজের দেখা এরা পায়নি। আমাদের ভোর ভোর উঠে আসাটা খুব কাজে দিয়েছে বুঝলাম। গাইডও খুব দক্ষ না হলে পায়ের ছাপ দেখে যা প্রেডিকশন করেছিল ঠিক তাই … ওদের এভাবে দেখতেও পেয়ে গেলাম …

 লেপার্ড এর প্রসঙ্গ একবার উঠতে গাইড ভাই বলল খুব তাড়াতাড়ি ওরা ভেতরে ঢুকে যায় । লেপার্ড দেখা খুব ভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের সে প্রত্যাশাও ছিল না। কিন্তু একটু এগিয়ে দেখলাম দূর থেকে একটা লেপার্ড আসছে। গাইড গাড়ি থামিয়ে দিয়ে আমাদের আওয়াজ না করতে বললেন।  সামনে থেকে রাস্তা ক্রস করল একলা লেপার্ড। আমরা সবাই কেমন চুপ হয়ে গেলাম। আমাদের অনেকগুলি জঙ্গল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি আমাদের জঙ্গল ভাগ্য ভালো না। সেখানে সামনে দিয়ে লেপার্ড চলে গেল ! রোমাঞ্চিত আমরা। গাইড বলল, ‘আমরা সব সময় আসছি আমাদের ভাগ্যেও সচরাচর জোটে না; আপনারা প্রথমবার এসেই…’ সত্যিই এবারে ভাগ্য আমাদের খুব সহায় ছিল। আমাদের প্রথম সাফারির সময় শেষের দিকে এবার আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে…

একটা গেট দিয়ে ঢুকে আরেকটা গেট দিয়ে বেরোনো নিয়ম। আমরা যখন বেরোচ্ছিলাম তখন একটা ছোট রেলপথ পড়ে। সেখান দিয়ে ছোট রেল গাড়ি (মিটার গেজ) চলে। স্থানীয় লোকেরা এই রেলগাড়ি চড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় । এই অরণ্যের মধ্যেই ৫৪টি আদিবাসীদের গ্রাম আছে। এক একটা গ্রামে ৪/৫ টা পরিবার আছে। মূলত মালধারী ট্রাইবালরা থাকে।  গবাদি পশুপালন ওদের কাজ। দুধের ব্যাবসা করে। মনে পড়ল আহমেদাবাদে সকাল বেলায় সুস্বাদু মালধারী চা খেয়েছিলাম। ওদের পরিবারের তরুন যুবকরা মূলত সিংহদের দেখাশোনা করে। অসুস্থ হলে সেবা করে। রাস্তার কাছাকাছি চলে এসে পাহাড়া দেওয়া ইত্যাদি কাজ ওদের দিয়েই করানো হয়।  এছাড়াও অফিসার থাকেন। রেসকিউ টিম থাকে। গাইড বললেন পর্যটকদের  সিংহ আক্রমণ করেছে এরকম শোনা যায়নি । মানুষ খেকো নয় এরা।

বিরতি

প্রথম সাফারি শেষে আবার ফার্ম হাউসে ফিরে আসা । জলখাবার খেয়ে একটু ইতি উতি ঘোরা… ম্যাঙ্গো মিউজিয়াম সহ সম্পূর্ণ ফার্ম হাউসটি ঘুরে দেখাও একটি অনন্য সুন্দর অভিজ্ঞতা …।   সুন্দরী হিরন নদীতে কুমীরের ডুবে ডুবে সাঁতার বহুদিন মনে থাকবে। লেজ আর মাথার দিকে অংশ জলের উপরে। কুমীর আর বাঁদরের গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছিল। কারণ এর আগে কুমীর দেখলেও সব সময় স্থির অবস্থায় দেখেছি। এবারের অভিজ্ঞতা বেশ আনন্দ দিল… দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে আবার সিং সদন যাব। এখানে সব জায়গায় নিরামিষ খাওয়া দাওয়া। যারা নিরামিষ পছন্দ করেন না তাদের একটু অসুবিধা হতে পারে।

দ্বিতীয় সাফারি পর্ব

 একইদিনের দুটো সাফারির বুকিং ছিল। দুপুরে তিনটে থেকে দ্বিতীয় সাফারি। এবারে একটু ভুল করলাম । সকালের মতোই প্রথমে গিয়ে লাইন দিলাম। এবারে পেলাম ১১ নম্বর রুট। জেনে রাখা ভালো যত বিকেলের দিকে যাওয়া যায় সিংহের মুভমেন্ট বাড়ে।  প্রথম সাফারিতে যেখান থেকে বেরিয়ে ছিলাম সেখান দিয়ে ঢুকলাম। রোদ বেশ কড়া তবে জঙ্গলের মধ্যে তেমন গায়ে লাগে না।  অনেকগুলি কৃত্রিম জলাশয় আছে সেখানে পশুরা জল খেতে আসে।  বেশ কিছুক্ষণ পরে  দেখা মিলল গাছের তলায় ঘুমিয়ে থাকা কেশরযুক্ত যুবকের। খাওয়া দাওয়া শেষে টান টান ঘুম। এদিকে টুরিস্টদের অপেক্ষা ক্যামেরায় তাক করা চোখ।  ‘একবার আয়… একবার এদিকে আয়’ । কত কাতর প্রার্থনা শোনা গেল জিপসি গাড়িগুলি থেকে। সে কি আর শুনতে পাচ্ছে।  অনেক্ষণ পরে একবার উঠে বসে চারিদিকে তাকিয়ে কেশর নাড়িয়ে জঙ্গল কাঁপানো একটা গর্জন করল। এই গর্জন শোনার জন্য আরেকবার আসা যেতে পারে এমন এক অনুভূতি। তারপর আবার মাথা নাড়িয়ে কেশর ঝাঁকিয়ে পর্যটকদের নিরাশ করে আবার শুয়ে পড়ল।  সন্ধ্যা হয়নি যে এখনও। রাজকীয় ভাবসাব দেখার মতো। দীর্ঘ শ্বাস পড়ল আমাদের… ধীরে ধীরে গাড়িগুলি এগিয়ে যেতে থাকে। একটু বাদেই সার্কাসের ক্লাউনের মতো একটা লেঙ্গুর এসে গাছের গুঁড়ির ওপর থপ করে বসে পড়ল। রাস্তার উপর গাড়ির রাস্তা গার্ড করে অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল । যেন আমরা ওকে দেখি। সিংহের জঙ্গলে ওরা একটু হলেও পর্যটকদের কাছে ব্রাত্য …

উল্টো দিক থেকে আসা কয়েকটা সাফারির গাইডকে দেখলাম আফ্রিকান চেহারার। গাইডকে জিজ্ঞেস করে জানলাম যে জুনাগড়ের রাজা আফ্রিকা থেকে শ্রমিক এনেছিলেন । তারা দীর্ঘ বছর কাজ করে আর দেশে ফিরে যায়নি । তখন জঙ্গল ছিল জুনাগড়ের রাজার অধীনে। এরা সিদ্দী উপজাতি। বনের মধ্যে ওদের জমি দেওয়া হয় । এবং চাষ বাস করে এখানে থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম । তাদেরই পরিবারের ছেলেরা এখানে গাইডের কাজ করে। গল্প করতে করতে গাড়ি এগোচ্ছে …  গাইডের কাছেই জানলাম প্রত্যেকটা গাড়িতে জিপিএস লাগানো থাকে । সিংহ না দেখতে পেলেও রুট চেঞ্জ করা যায় না। পাথুরে খাল , নদী পেরিয়ে এগোচ্ছি। পশু পাখি দেখুন না দেখুন জঙ্গলের রহস্য আর ফুরায় না।

এবারের গাইড ভাই বললেন, দেখুন সকালে যা দেখেছেন দেখছেন । এই রোদে কিন্তু বেরোবার চান্স কম। একটা দেখলেই অনেক’… কিছু সময় পরেই দেখলাম একটা brown fish owl । গাছের ডাল বসে আছে। গায়ে একদম মাছের মতো আঁশ আঁকা। সামনেই একটা মেল সম্বর। গাছের পাতা চিবিয়ে খাচ্ছে। একটু দূরেই দেখলাম তিনটে বন শূয়র জঙ্গলের ভিতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। এখানে স্পটেড ডিয়ার খুব কমন। ছোটাছুটি করছে। এদিকে ওদিকে ময়ুর ঘুরে বেড়াচ্ছে… ডাকছে। প্রাকৃতিক র‍্যাম্পে সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে । মনে হচ্ছিল কাছে কোথাও কণ্ব মুনির আশ্রম। এক্ষুনি শকুন্তলা বেরিয়ে আসবে। চলতে চলতে একটা পাথুরে খালে গাইড দেখালো একটা সাপ। স্বচ্ছ জলে  ছোট ছোট মাছকে খাচ্ছে। নাম জিজ্ঞেস করতে বলল চেকারড কিলব্যাক । বোধ হয় জল ঢোড়া গোত্রের সাপ। কিন্তু ঝাঁকের মাছগুলি পালাবার চেষ্টা করছে আর ও ওদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে … এরকম স্বচক্ষে দেখাটা মনে থাকবে…  একটা নদী জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেছে নাম হিরণ। যাকে আমরা ফার্ম হাউসে বারান্দা থেকে দেখেছি। একটু দূরে ঝোপের আড়াল থেকে কুমীরের পশ্চাৎ দেশ আর লেজ দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় সাফারিতে চলতে চলতে একটু ক্লান্ত লাগছিল। একে রোদ তারপর পশুরাজের দেখা নেই। শেষ পাতে মিষ্টির মতো আমাদের মন ভোলাতে এলেন দুধরাজ পাখি। The Indian Paradise Flycatcher – শাহ-বুলবুল । মাথায় কালো ঝুঁটি । লম্বা শাদা লেজ শেষের দিকে দুভাগ হয়ে গেছে। সে কী লেজ নাচানো… মনে হচ্ছে দুধের ধারা …  অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করার জন্য দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।  গাইড বলল এটা পুরুষ পাখি। এমন সুন্দর করে যে বানিয়েছেন সেই সৃষ্টি কর্তাকে মনে মনে প্রণাম জানালাম …।

বিদায় পর্ব

সূর্যের আলো কমে আসছে ধীরে ধীরে আমাদেরও বেরোবার সময় হল। ঢোকার সময় যেমন ফরেস্ট অফিসে এন্ট্রি পাস চেক হয়  বেরোবার সময়ও একবার চেক হয়। সেই সময় গাইড ও ড্রাইভার ভাইয়ের সঙ্গে আমরা ছবি তুললাম । এই সাফারিতে ওদের ভূমিকাও অনেকখানি । বেরোবার আগে সুভেনির শপ থেকে প্রিয়জনদের জন্য বেশ কিছু উপহার কিনে এবারের মতো বিদায় জানালাম গির অভয়ারণ্যকে । কোলাহলময় নিজের শহরে ফিরতে হবে…

বিশ্বাস করি প্রকৃতির নিবিড় সংস্পর্শ মানুষের হৃদয়কে প্রসারতি করে। প্রতিবার ভ্রমণে গিয়ে এক নতুন আমি হয়ে ফিরে আসি। অন্যান্য জঙ্গল ভ্রমণে গিয়ে তেমন পশুপাখি না দেখতে পাওয়ার বেদনা ভুলিয়ে দিল এই ভ্রমণ। ঝুলি ভরে নিয়ে এলাম অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা… সারা বছরের অক্সিজেন… বুনো গন্ধ… পাখির কলতান… সিংহের গর্জন … সিংহ শাবকদুটির চোখের মায়া…

 

ভ্রমণ স্থানে যাওয়ার উপায়

বিমান- কলকাতা থেকে রাজকোট বা আহমেদাবাদ পর্যন্ত ফ্লাইট । সেখান থেকে সড়ক পথ।

ট্রেন – কলকাতা থেকে রাজকোট/সোমনাথ/জুনাগড় পর্যন্ত ট্রেন নিন।

ট্রেন অপশন: হাওড়া-অহমদাবাদ এক্সপ্রেস (12937)/ হাওড়া-পরবন্দর এক্সপ্রেস (12949)

  রাজকোট/সোমনাথ/জুনাগড় থেকে গাড়ি/বাস নিন গির অভয়ারণ্যের দিকে।

  • সোমনাথ থেকে গির: প্রায় ৫০ কিমি (১-২ ঘণ্টা)/জুনাগড় থেকে গির: প্রায় ৭৫ কিমি (২ ঘণ্টা)

টিকিট বুকিং

গির জাতীয় উদ্যানে (গির অরণ্য) সাফারির জন্য অনলাইন টিকিট বুকিং গুজরাট সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে থেকেই করুন।

https://girlion.gujarat.gov.in/

পরিচয় পত্র আপলোড করতে হয়।

ভ্রমণের সময় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখবেন মনে করে।

দেভালিয়া সাফারি পার্ক ভ্রমণের পরিকল্পনা রাখুন। এটিও অনলাইন বুকিং হয়।

থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা

হোটেল অনিল ফার্ম হাউস। সমস্ত রকম সুবিধাযুক্ত, সুন্দর থাকার ব্যবস্থা। খাওয়ার বিভিন্ন পদের নিরামিষ গুজরাটি থালি।

যোগাযোগের ওয়েব সাইট  https://www.girjungleresort.com/

এছাড়াও অনেক থাকার জায়গা রয়েছে। গুজরাট ট্যুরিজম কলকাতা অফিসের ঠিকানাতেও যোগাযোগ করতে পারেন।

7th floor, Chitrakoot Building, 7th fl, 700020, Acharya Jagadish Chandra Bose Rd, Sreepally, Elgin, Kolkata, West Bengal 700020

গির অরণ্য খোলার সময়:

গির জাতীয় উদ্যান খোলা থাকে: ১৬ অক্টোবর থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত
উদ্যান বন্ধ থাকে: ১৬ জুন থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত (বর্ষাকাল)

সেরা ভ্রমণের সময়: নভেম্বর - মার্চ: 

About Author
&
Photographer

লেখক : শীলা বিশ্বাস

প্রথম দশকের কবি ও গদ্যকার।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: হেমিংটনের জন্য - (নীলাঞ্জনা প্রকাশনী) প্রকাশ রথযাত্রা ২০১৪, অন্তর্গত স্বর - (ক্রান্তিক প্রকাশনা) প্রকাশ বইমেলা ২০১৫, নেবুলা মেঘের মান্দাসে- (কলিকাতা লেটারপ্রেস ) প্রকাশ বইমেলা ২০১৮ , নির্বাচিত শূন্য (সুতরাং প্রকাশনা) প্রকাশ বইমেলা ২০২০, Voyage (transcreated in English)-(সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল প্রকাশনা)-  প্রকাশ বইমেলা ২০২২, আজরখ নগর (বার্ণিক প্রকাশনা)-প্রকাশ বইমেলা ২০২২, এ লেখা অশ্রুমাত্র (সপ্তর্ষি প্রকাশন) প্রকাশ বইমেলা ২০২৪, আপনি কিছুই জানেন না মঁসিয়ে (আলোপৃথিবী প্রকাশন) বইমেলা ২০২৪, মৃত পতঙ্গের ডানা (আলোপৃথিবী প্রকাশন) বইমেলা ২০২৫।

সম্পাদিত পত্রিকা : এবং সইকথা।

আলোকচিত্রী: শীলা বিশ্বাস

প্রথম দশকের কবি ও গদ্যকার।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: হেমিংটনের জন্য - (নীলাঞ্জনা প্রকাশনী) প্রকাশ রথযাত্রা ২০১৪, অন্তর্গত স্বর - (ক্রান্তিক প্রকাশনা) প্রকাশ বইমেলা ২০১৫, নেবুলা মেঘের মান্দাসে- (কলিকাতা লেটারপ্রেস ) প্রকাশ বইমেলা ২০১৮ , নির্বাচিত শূন্য (সুতরাং প্রকাশনা) প্রকাশ বইমেলা ২০২০, Voyage (transcreated in English)-(সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল প্রকাশনা)-  প্রকাশ বইমেলা ২০২২, আজরখ নগর (বার্ণিক প্রকাশনা)-প্রকাশ বইমেলা ২০২২, এ লেখা অশ্রুমাত্র (সপ্তর্ষি প্রকাশন) প্রকাশ বইমেলা ২০২৪, আপনি কিছুই জানেন না মঁসিয়ে (আলোপৃথিবী প্রকাশন) বইমেলা ২০২৪, মৃত পতঙ্গের ডানা (আলোপৃথিবী প্রকাশন) বইমেলা ২০২৫।

সম্পাদিত পত্রিকা : এবং সইকথা।

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget