রাকাব জঙ্গল ভ্রমণ

--- “রাকাব বুড়ির কথা জানিস?”,আমার দশ বছরের ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম।
--- “না তো! কে আবাই?”বাবাইকে ও আদর করে আবাই ডাকে,বাবাইও তাকে একই নামে ডাকে।
--- “শোন তবে। পুরুলিয়া জেলার হুড়া ব্লকের কেশরগড় অঞ্চলে রয়েছে রাকাবের জঙ্গল। আগে এর নাম ছিল ষোলো ক্রোশের বন। এই বনের জাগ্রত দেবী রাকাব বুড়ি।“
--- “আচ্ছা!”
--- “আরও শোন, সাঁওতালি ভাষায় ‘রাকাব’ শব্দের অর্থ ‘ওঠানো’ বা ‘তাড়ানো’। সময়টা ১৮৫৭। উত্তাল হয়ে উঠেছে ব্যারাকপুর সহ গোটা দেশ। প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন কেউ কেউ। সেই আগুনের আঁচ এসে পড়েছিল এই অজ দেশেও। ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার আর মুখ বুজে সহ্য করবেন না,এই ছিল তদানীন্তন কেশরগড়-রাকাব অঞ্চলের সাঁওতাল কৃষক ও জনজাতির মানুষের জেদ। কেশরগড়ের মহারাজা গরুড়নারায়ণ সিংদেওয়ের বীরপুত্র নীলমণি সিংদেওয়ের আহ্বানে রাকাবের প্রায় দশহাজারের মতো সাঁওতাল জড়ো হয়েছিলেন রাকাব জঙ্গলে। রাকাব বুড়িকে সাক্ষী রেখে তারা শপথ নিয়েছিলেন এ দেশ থেকে ব্রিটিশ সূর্যকে চিরদিনের মতো অস্তাচলে পাঠিয়ে দেওয়ার।“
--- “তারপর?” নাছোড়বান্দা ছেলের কৌতূহল নিবারণ করতেই হল। বললাম কেমন করে বিপ্লবীরা পুরুলিয়া ট্রেজারি লুঠ করেছিল,ইংরেজ সাহেবদের বাধ্য করেছিল পুরুলিয়া ছেড়ে পালাতে।
--- “আবাই! আমাকেও নিয়ে চলো। রাকাব জঙ্গল দেখব।“
--- “চ তাহলে একদিন। বেশি দূর তো নয়। পুরুলিয়া শহর থেকে তেরো কিলোমিটার দূরে পুরুলিয়া-বাঁকুড়া রোড ধরে ভাঙড়া মোড়। সেখান থেকে কেশরগড় যাওয়ার রাস্তা ধরতে হবে। ভাঙড়া মোড় থেকে কেশরগড় আরও সতেরো কিলোমিটার। সেই রাস্তাতেই পড়বে রাকাবের জঙ্গল।“
--- “কাল যাবো?”
--- “না রে! কাল তোরও ইস্কুল, আমারও।“
--- “তাহলে সামনের রবিবার?”
--- “বেশ। কিন্তু রবিবার যে তোর ক্রিকেট ক্যাম্প আছে?”
--- “একদিন যাবো না। বা বিকেলে যদি ফিরতে পারি, তাহলে যাবো।“
--- “জঙ্গল ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যাবি তো!”
--- “তাহলে যাবো না।“
--- “রাকাব যাবি না?”
--- “উফফ! ক্যাম্পে।“
শুক্রবার থেকেই নিম্নচাপের ভ্রূকুটি। নাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। শনিবার বিকেলে একটু ধরলেও, রবিবার ভোর থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে, মাঝে মাঝে রোদও উঁকি মারছে জানলায়। সারাদিন ঘরবন্দী একটি ছোট ছেলে বিরক্ত হয়ে গেছে।
--- “রেইনকোট পরেই যাবো।“
--- “দাঁড়া বাবা! ব্রেকফাস্টটা সেরে নে, ততক্ষণে বৃষ্টি ধরে যাবে।“
--- “যদি না ধরে?”
--- “তাহলে অন্য কোনো ছুটির দিনে বা পরের রবিবার?”
--- “না! আজই যেতে হবে।“ বলেই সে শুরু করল,”নেবুর পাতায় করমচা,হে বিষ্টি ধরে যা।“
লুচি আর সাদা আলুর তরকারি দিয়ে জমাটি ব্রেকফাস্ট শেষ করতে করতে সত্যিই বৃষ্টি ধরে এলো। মেঘ যদিও পুরোপুরি সরেনি। পিতা-পুত্রে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। মাকে নেওয়া গেল না কারণ বাইকে তিনজন যাওয়া যাবে না। ভাঙড়া ঢোকার আগেই একটি পাম্প থেকে পর্যাপ্ত পেট্রোল ভরে নিলাম। বাইক সার্ভিসিং আগেই করা ছিল। পুরুলিয়ায় মার্চ থেকেই বেশ ভালো গরম পড়ে যায়। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে জলকষ্ট। ভাগ্যিস নিম্নচাপ হয়েছিল। তাই শাপে বর হল। এই হাল্কা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় আমাদের জঙ্গল অভিযান বেশ মনোরম হবে বলেই বোধ হল।
ভাঙড়া মোড় আসতেই গুগল ম্যাপটা অন করে রাস্তাটা বুঝে নিলাম। এদিকে এই প্রথম আসছি। চাকরিসূত্রে পুরুলিয়ায় থাকা হয় ঠিকই,কিন্তু সপ্তাহান্তের একটি ছুটিও সংসার দাবি করে বসে। ফলে বড়ো ছুটি ছাড়া বেরোনো হয় না তেমন। যাহোক,গুগল ম্যাপকে সবসময় ভরসা করতেও নেই। তাই ভাঙড়া মোড়েই আরেকবার জেনে নিলাম আমরা ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কিনা। যখন দেখলাম ঠিক পথেই আছি, তখন নির্ভাবনায় এগিয়ে গেলাম একমাত্র পথটি ধরে, নাক বরাবর।
ভাঙড়া মোড় থেকে ডানদিকের পথ ধরে প্রায় সতেরো কিলোমিটার দূরে কেশরগড় জনপদ। বেশ অনেকটা যাওয়ার পর পড়ল অর্জুনজোড়া গ্রাম। ছেলে বলল,
--- “মহাভারতে তো একজন অর্জুন ছিল, এখানে কি দু’জন?”
--- “ওরে!’ফাল্গুন,তালজোড়/দুই মাঝে ভুঁইফোঁড়’পড়িসনি?
--- “হ্যাঁ,রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য!”
--- “ফাল্গুন কী বলত?”
--- “অর্জুনের আরেক নাম।“
--- “ঠিক। ওখানে অর্জুন কি মহাভারতের অর্জুন ছিল?”
--- “না, গাছ। অর্জুন গাছ।“
--- “আর তালজোড়?”
--- “জোড়া তালগাছ।“
--- “এই তো! এখানেও অর্জুনজোড়া হল জোড়া অর্জুন গাছ।“
--- “এইবার বুঝলাম।“
অর্জুনজোড়া পেরোতেই শুরু হল পলাশ, সোনাঝুরি, সেগুন, শাল, বট, আম, বাঁশ, ক্যাকটাস, অর্জুন গাছের জঙ্গল। জঙ্গল এই শুরুর দিকে একদমই ঘন নয়। বহুদূর অব্দি ফাঁকা ফাঁকা। কাছাকাছি চাষের জমি কিছু আছে। বাড়িঘর আর চোখে পড়ে না। এখন সকাল দশটা। একটা বাসকে আসতে দেখলাম কেশরগড় থেকে পুরুলিয়ার উদ্দেশে। বাইকটাকে রাস্তার পাশে মাঠের মধ্যে দাঁড় করিয়ে আমরা দু’জন পলাশ কুড়োলাম, কিছু ছবি তুললাম আর জঙ্গলের গন্ধ নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করে আবার বাইক স্টার্ট দিলাম। এখান থেকে কেশরগড় সাত কিলোমিটার। পিচ রাস্তা চলে গেছে রাকাব জঙ্গলের বুক চিরে। রাকাব জঙ্গলের শুরুটা এখানেই।
রাস্তা যত এগোতে লাগল বনের গভীরতা অল্প বাড়তে লাগল। তবে এখানকার জঙ্গল ডুয়ার্সের মতো ঘন বা দুর্ভেদ্য নয়। এখানের জঙ্গল ছোটনাগপুর মালভূমির অন্তর্গত হওয়ায় বেতলা, নেতারহাট, পালামৌয়ের জঙ্গলের সমগোত্রীয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ দেখা থাকলে বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ পড়া থাকলে এ জঙ্গলকে উপলব্ধি করা যেতে পারে।
--- “আবাই, এ জঙ্গলে বাঘ আছে?”
--- “না রে! আগে ভালুক-টালুক ছিল, ছিল লেপার্ডও। এখন খরগোস, বনময়ূর, শেয়াল, সাপ ছাড়া আর কিছু নেই।“
--- “ওই দেখো, গরুর পাল নিয়ে যাচ্ছে বাগাল।“ (এই সব বনপাহাড়ের দেশের মানুষ রাখালকে ‘বাগাল’ বলে)।
--- “লালমোহন বাবু থাকলে এগুলোকেই হয়ত হরিণ বলে বসতেন!”
--- “হা হা হা!” ছেলে হেসেই অস্থির।
--- “জানিস আবাই, কাশীপুরের রাজারা এই জঙ্গলে আগে শিকার করতেন।“
--- “আরিব্বাস! রাজাদের বাড়িতে শিকার করা মহিষ, বাঘ, হরিণের মাথা থাকতে দেখেছি।“
আবার কিছুদূর গিয়ে বাইক দাঁড় করিয়ে ছবি নিলাম, নিলাম নির্জনতার নিজস্ব আঘ্রান। মাঝে মাঝে ডেকে যাচ্ছে নাম না জানা পাখি, আবার ফিঙে, ঘুঘু, টসরাজা, বনচঁটির মতো চেনা জানা পাখিও উঁকি দিয়ে যাচ্ছে ডালপালার আড়াল থেকে।
কিছুদূর গিয়ে দেখলাম রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়েছে। একটি গেছে দিরাং-এর দিকে,অন্যটি কেশরগড়। ঠিক সেই ভাগ হওয়ার জায়গাতেই ‘রাকাব বুড়ির থান’। রাকাব বুড়ি কোনো প্রচলিত দেবী নন। প্রাচীনকালে এইসব জঙ্গলে ডাকাতি হত। ডাকাতরা ডাকাতি করার আগে শক্তিদেবীর আরাধনা করে ডাকাতি করতে যেত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ছিল কালীপুজো। মুখে মুখে চলে আসা কিংবদন্তি অনুসারে বিপিন ডাকাত নামে জনৈক এক ডাকাত এই রাকাব বুড়ির পুজো করে ডাকাতি করতে যেত। আর সে-ই এই রাকাব থানের প্রতিষ্ঠাতা। রাকাব থানে নেমে দেখলাম এখন জায়গাটা বাঁধিয়ে দিয়েছে। এইসব অঞ্চলের মানুষেরা পোড়ামাটির হাতি ঘোড়ার মূর্তি দিয়ে মানত ইত্যাদি করে রাকাব বুড়ির কাছে। রাকাব বুড়ির কোনও মূর্তি বা ছবি নেই। হাড়িকাঠ দেখে বুঝলাম এখনও বলি হয় এখানে।
রাকাব বুড়ি ছেড়ে আর দুই কিলোমিটার বনের মধ্যে দিয়ে গেলেই কেশরগড় জনপদ। রাকাব বন এখানেই শেষ। কেশরগড় ঢোকার মুখে আছে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম। স্বামী কৃষ্ণানন্দ মহারাজ এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এইসব অঞ্চল দুর্ভিক্ষপীড়িত। মহারাজকে পাঠালেন বেলুড়মঠ। মানুষের সেবাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। মহারাজের কাজ মুগ্ধ করে কেশরগড়ের রাজাকে। মানুষ কিছুটা সেই মন্বন্তর কাটিয়ে উঠলে স্বামীজী উত্তর ভারত চলে যাবেন বলে মনস্থির করেছিলেন তপস্যা করার জন্য। কিন্তু কেশরগড়রাজ তাঁকে ছাড়তে রাজী হলেন না। মানুষের ভালোবাসায় তখন বাঁধা পড়েছেন এক সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী। রাকাব বনেই এক তপস্যাস্থল খুঁজে সেখানেই থেকে গেলেন বাকিজীবন। তাঁর সমাধিস্থান দেখে আমরা ঢুকে গেলাম কেশরগড়।
জঙ্গল ফুরিয়ে লোকালয় চলে এল। মধ্যাহ্ন সবে পেরিয়েছে। হাল্কা খিদে পাচ্ছে। দুপুরের খাবার এখানেই খেয়ে নেব বলে ভাবলাম। কিন্তু এখানে কোনও হোটেল-টোটেল চোখে পড়ল না। সম্ভবত নেই। এটা তো আর টুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয়। একটা গ্রাম্য চা দোকান খুঁজে পেলাম। ঠাণ্ডা সিঙাড়া সহযোগে চা খেয়েই অল্প খিদে মেটানো গেল। ঠিক হল পুরুলিয়া ঢোকার আগে কোথাও খেয়ে নেব। এবার দেখতে চললাম রাজবাড়ি। দু’য়েকজনকে জিজ্ঞেস করে হাইস্কুলের পাশ দিয়ে বাঁদিকে একটু এগিয়ে চলে এলাম রাজাদের ভাঙা রাজবাড়ি (সেটা নাকি রাজবাড়ির আস্তাবলের অংশ), বিষ্ণুমন্দির (এখনও নিত্যপুজো হয়), রাণীদের স্নান-পুকুর দেখতে। বিষ্ণুমন্দিরের পাশেই দাঁড় করানো রথ। বেশি কিছু আর অবশিষ্ট নেই সেসময়ের স্থাপত্যের। আশপাশের গরীবগুর্বো গ্রামবাসীরা রাজবাড়ির ইঁট খুলে নিয়ে গেছে নিজেদের ভাঙাচোরা মাটির ঘরকে কিছুটা পোক্ত করার জন্য, একথা জানালেন স্থানীয়রাই। মন্দিরগুলিতে কিছু কিছু স্ংস্কারের কাজ হচ্ছে। একটা আশ্চর্য সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম এসব দেখতে দেখতে। সেই প্রাচীন সময় কেমন যেন এখনও লুকিয়ে আছে এই বিদ্যুৎ-মুখর তুলনামূলক আধুনিক সময়ের অন্তরালে।
যাহোক, কেশরগড়কে বিদায় জানিয়ে ফিরছি আবার রাকাব বনের পথ ধরে। পথে পড়ল কাঠুরিয়াদের শুকনো গাছের ডালের বোঝা মাথায় হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য। মহুয়া (মহুল)র মিষ্টি গন্ধে ম ম করছে আশপাশটা। বাইক থামিয়ে গাছ চেনালাম ছেলেকে। বললাম, ভালুকের খুব প্রিয় এই মহুয়া ফল। এ থেকে স্থানীয় মদজাতীয় পানীয় তৈরি হয়। ও কয়েকটা মহুল ফল কুড়িয়ে নিল।
--- “আবাই, জঙ্গলের মধ্যে পায়ে চলার পথ চলে গেছে অনেক জায়গায়। ওদিকে কি গ্রাম?”
--- “হ্যাঁ। এই জঙ্গলের ভেতরে ভেতরে বেশ অনেকগুলি গ্রাম আছে।“
--- “চলো না যাই।“
--- “চ তবে। এইসব জঙ্গল কিন্তু সব জায়গায় একইরকম দেখতে। ফলে খুব ভালো করে রাস্তা না চিনলে বা যেতে যেতে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য মনে না রাখলে এসব জায়গায় পথ হারানো অবশ্যম্ভাবী।“
--- “আচ্ছা। দেখছি কতটা মনে থাকে।“
আমিও ঠিক করলাম বেশিদূর যাব না। একে তো ফোনের চার্জ ফুরিয়ে এসেছে। পথ হারিয়ে গুগল ম্যাপ খুলতে গেলে ফোনই বন্ধ হয়ে যাবে। পিচ রাস্তা ছেড়ে বনের পথ ধরা গেল। সে পথ চলছে তো চলছেই। শেষ নেই যেন। যেতে যেতে দেখলাম একটা তিন রাস্তার ত্রিভুজ পথ তিনদিকে চলে গেছে। একটা পথ নিলাম। এই ত্রিভুজ রাস্তাটিকে মনে রাখলাম। ছেলেটি লক্ষ্য করেছে কিনা জিজ্ঞাসা করিনি। ও এই প্রথমবার জঙ্গলে যাচ্ছে। এই বনপথ নিভৃত। নির্জনতাকে ছিন্ন করছে আমার বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ। ভাগ্যিস রয়্যাল এনফিল্ড নয় আমার বাইক,তাহলে সাইলেন্সারের কর্কশ শব্দে বিরক্তি আরও বাড়ত। বাইক চালাতে চালাতে এক পাপবোধ হতে লাগল ভেতরে ভেতরে। এই ঐশ্বরিক নির্জনতাকে ভেঙে ফেলার অপরাধবোধ। মনখারাপ হতে লাগল। কিন্তু এখন থামা যাবে না। অভ্যন্তরের অন্তত একটি গ্রামের সন্ধান পেতেই হবে। পিচ রাস্তা থেকে জঙ্গলের পথ ধরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার চলে এসেছি। পথে একটিও লোক নেই। ভুল পথে যাচ্ছি না তো! আচ্ছা, দেখাই যাক। আরেকটু যাই, না হলে ফিরে এসে অন্য পথ ধরবখন। বুঝলাম এখানে বাইক খারাপ হলে আর রক্ষে নেই। ফোনে নেটওয়ার্ক প্রায়ই থাকছে না। আশেপাশে সাহায্যের জন্যও কাউকে পাওয়া যাবে না। মেঘলা করে থাকায় বেশ একটা ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশ। এই বুঝি সন্ধে নামবে। যদিও সন্ধে নামার এখনও ঢের দেরি। তবুও সাহস আর অনিশ্চয়তায় ভর করে আরও কিছুটা যাওয়ার পর দেখলাম এক মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন। সামনেই কিছু ঘরবাড়ি চোখে পড়ল। বুঝলাম গ্রাম এসে গিয়েছে। একটু ভরসা হল। গ্রামটি খুবই ছোট। হাতে গোনা কয়েকটি সাঁওতাল ঘর (পুরুলিয়ায় এসে শিখেছি ঘর আর বাড়ির পার্থক্যঃ ঘর হল যেখানে লোকে থাকে,যাকে আমরা বাড়ি বলি; আর বাড়ি বলতে এখানকার মানুষ সব্জি ক্ষেত’সব্জি বাড়ি’ বোঝে।)। সেগুলির গায়ে খুব সুন্দর আল্পনা আঁকা। বাঁদনা পরবে এরা বাড়ির গায়ে বিভিন্নরকম আল্পনা আঁকে। অযোধ্যা পাহাড় বেড়াতে যাওয়ার সময়ও দেখেছি। দেখেছি একবার এই জেলারই তুন্তা গ্রামে গিয়ে। আরও অনেক সাঁওতাল গ্রামেই এ ছবি দেখা যায়। যাহোক, যে গ্রামটিতে পৌঁছলাম, তার নাম আড়ালকোচা। আড়ালে থাকা গ্রামটি সার্থকনামা বলেই মনে হল। মনে হল, জঙ্গলের এত ভেতরে গ্রাম, রাতবিরেতে অসুখবিসুখ বা ডাক্তার ডাকা বা জরুরি প্রয়োজন হলে এরা কী করে! অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় ইলেকশন ডিউটি করতে গিয়ে দেখেছি অনেক গ্রামের মানুষ প্রাথমিকভাবে ভরসা করেন কয়েকটা গ্রাম মিলে তৈরি হওয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে, তারপর ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে এবং তারপর জেলা হাসপাতালকে। কিন্তু এই স্বাস্থ্যব্যবস্থা এইসব অঞ্চলের মানুষকে পর্যাপ্ত পরিষেবা দিতে পারে না তেমন নানাবিধ কারণে। সে সব আপনারা অর্থাৎ সচেতন পাঠক ভালোই জানেন। এসব অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিক অবস্থার নিরিখে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে আটকে থাকে। বেশিরভাগেরই দৌড় বড়জোর জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত। আরেকটু যাদের অবস্থা ভালো, তারা বাঁকুড়া, দুর্গাপুর, টাটা বা রাঁচী অবধি যায়; কিছু টাকার বিনিময়ে এজেন্ট পেলে কেউ কেউ চিকিৎসার জন্য পাড়ি দেয় ভেলোর, বেঙ্গালুরু। না হলে এদের নিজস্ব গাছগাছড়ার অনেক গোপন ওষুধ জানা। তা দিয়েই যতটা চিকিৎসা হয় আর কী। আর আছে ওঝা। সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওঝার কাছে বিষ ঝাড়াতে নিয়ে যাওয়াতেই ভরসা রাখে এইসব পাহাড়-জঙ্গলের মানুষরা। আড়ালকোচার যা ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, তাতে মনেই হয় শেষের পদ্ধতিই এরা অবলম্বন করে। লোকজন খুব একটা চোখে পড়ল না। দু’একজন মহিলা সংসারের কাজে ব্যস্ত। কয়েকটা ছোট ছেলেপুলে খেলা থামিয়ে অবাক চোখে আমাদের দেখছে। অস্বস্তি হল খুব। যেন এখানে আমরা তথাকথিত সভ্য মানুষরা বেমানান। ফিরে আসতে লাগলাম যে পথ ধরে গিয়েছি, সে পথ ধরেই। গ্রাম ছেড়ে কিছুদূরে এসে বাইকের স্টার্ট বন্ধ করলাম। অনেক ঘোরা হল, ছবি তোলা হল, এবার একটু খাঁটি নির্জনতাকে ছুঁয়ে দেখা যাক। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হেঁটে বেড়ালাম বনের ভেতর। ছানাটিও কিছু ফুল, ফল কুড়োলো। একটা ফোকলা মহুলগাছ খুঁজে পেলাম আমরা দু’জন।
বিদায় রাকাব। কত কিছু দেখা বাকি থেকে গেল। কাঁসাই নদী, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের শপথ নেওয়ার পিলার, জঙ্গলের আরও কত শব্দ, দৃশ্য, অনুভূতি… ফেরার পথে একটা পুকুর খুঁজে পেলাম। ছেলেটি সেখানে খানিক ব্যাঙবাজি করল আপন খেয়ালে। দিরাং-এর দিকটা একটু ঘুরে কেন্দ,পিয়াল,ইউক্যালিপ্টাসের বাড়িঘর ফেলে ফিরে আসতে লাগলাম ভাঙড়া মোড়। বেলা এখন সাড়ে তিনটে। যেতে যতটা সময় লেগেছিল, আসতে তারও কম। আসলে আসারা মনখারাপ নিয়ে ফেরে বলেই বোধহয় এমন হয়। পুরুলিয়া ঢোকার আগে একটা রাস্তার পাশের রেস্তোঁরাতে অবেলায় লাঞ্চ সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে এলাম বাড়ি। তখন পাঁচটা বেজে গেছে। ছেলেরও আর ক্রিকেট ক্যাম্প যাওয়া হল না। একদিক থেকে এইই বেশ হল।



























Comments