বড়ন্তি: এক গলানিচু সৌন্দর্যের স্বর

আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ব্রজদা। বলেছিলেন কলকাতা থেকে আসবে তিনজন। আর দুর্গাপুর থেকে তিনজন। রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। বলতে গেলে বাড়ির সামনে একটা জায়গা যা আমরা অনেকেই দেখিনি তখনও পর্যন্ত। ট্রেনে দুর্গাপুরে চেপে বসলাম আমি, প্রদীপ চক্রবর্তী এবং ব্রজদা। একই ট্রেনে কলকাতা থেকে চাপবে সব্যসাচী হাজরা এবং এই টিমে আমাদের সিনিয়রমোস্ট উমাপদদা। কবি উমাপদ কর। অর্থাৎ আমরা যে ট্রেনে উঠলাম সেই ট্রেনেই আছেন ওঁরা। হালকা টিফিন সেরে নিলাম ট্রেনের মধ্যে। সময়টা ছিল আগস্টের শেষ। দু’হাজার একুশ। করোনার প্রকোপ নেই তখন। ভীতিও তখন কমে এসেছে মানুষের। ফলে খোঁয়াড় থেকে ছাড়া-পাওয়া গরুর মতো ভ্রমণপ্রিয় মানুষ সময় এবং সুযোগ পেলেই যে-যেদিকে পারছে বেরিয়ে পড়ছে।
আসানসোলে নেমে দেখা হল আমাদের মধ্যে সবথেকে কনিষ্ঠ সদস্য সব্যসাচী এবং বরিষ্ঠ সদস্য উমাপদদার সঙ্গে। আমার সঙ্গে এদের কারও তেমন পরিচয় ছিল না। অবশ্য লেখা পড়েছি এদের। কিন্তু ভ্রমণ ব্যাপারটা এমনই যে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা বয়স বা অপরিচিতির বেড়া ভেঙ্গে একে-অপরের বন্ধু হয়ে উঠলাম। দেখা হওয়া মাত্রই উমাদা খুনসুটি শুরু করলেন ব্রজদার সঙ্গে ব্রজদার কথার পূর্ববঙ্গীয় টান-কে নকল করে। সন্দেহ প্রকাশ করলেন ব্রজদা আদৌ রিসর্টের বুকিং এবং গন্তব্যে পৌঁছে খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করে রেখেছে কিনা! ব্রজদা একটু রাগলেও তালে যে ভুল নেই তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সবকিছুর পাকা অ্যারেঞ্জমেন্ট করে। হইহই করে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম অন্য এক সদস্যের জন্য। শৌভিক দত্ত। চেলিডাঙ্গায় ভলভো বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালাম। দু-প্রস্থ চা-বিস্কুট হয়ে গেল। কেউ কেউ হালকা টিফিন করল। আসলে ভ্রমণ একটা দিলখোলা সেনসেশন তৈরি করে মনে। সেখানে গন্তব্যস্থানটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যাচ্ছি কোথাও- এটাই ম্যাটার করে। তবে বড়ন্তি কিন্তু ছোট জায়গা হলেও রূপসী। এই বড়ন্তি আসলে পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর সাবডিভিশনের অন্তর্গত একটি ছোট্ট গ্রাম। সেখানে মুরাডি পাহাড় এবং বড়ন্তি পাহাড়ের মাঝে একটি লেক। বড়ন্তি লেক নামে পরিচিত। শৌভিকদা আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার পর আমরা বড়ন্তির রিসর্ট থেকে পাঠানো গাড়িতে উঠে বসলাম সবাই মিলে। আসানসোল থেকে বড়ন্তি আটত্রিশ কিমি।
আসানসোল থেকে জিটি রোড ধরে নিয়ামতপুর। তারপর ডিসেরগড় ব্রিজ পেরিয়ে বরাকর-পুরুলিয়া রোডে শর্বরি মোড়। যাইহোক, আরও কিছুটা গিয়ে আমরা মুরাডি গ্রাম পঞ্চায়েত পেরিয়ে একটি নির্জন কাঁচা রাস্তা দিয়ে পৌঁছলাম নিরিবিলি একটি ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনে। তখন দুপুর। খিদে পেয়েছে। মনে মনে কেবল ভাবছি মেনুতে কী আছে। হ্যাঁ, যে কোনও জায়গা বেড়াতে গিয়ে আমার জিভটা বেশ লোভী হয়ে ওঠে। উমাদা বললেন, দেখি, ব্রজ কতটা 'যাচ্ছেতাই' ব্যবস্থা করে রাখতে পেরেছে! আমরা ব্রজদার দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
রিসর্ট- ‘বড়ন্তি ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার স্টাডি হাট’। রিসর্টে পৌঁছে আমরা ফ্রেশ হয়ে নিলাম সকলে। খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম। দুটি এসি রুমে তিনজন করে। আহামরি ভাড়াও নয়। ছিমছাম রিসর্ট। খুব বেশিকিছু নয় যদিও। তবে পরিবেশটি চমৎকার। ছোট একটি প্রাকৃতিক বনভূমির মধ্যেই আমাদের রিসর্ট। বাউন্ডারি না থাকলে মনে হবে চারপাশে যে বনভূমি, তারই অংশ এটি। বহুরকম গাছপালা। সুসজ্জিত। বাইরেটা গাছপালায় ঘেরা গ্রাম।
চা-টা খেয়ে বিকেল নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম আমরা ছয় মূর্তি। পায়ে-হাঁটা দুরত্বে বড়ন্তি লেকের দিকে। আসলে রামচন্দ্রপুর সেচপ্রকল্পের অন্তর্গত এটি একটি বৃহৎ ড্যাম। পিচরাস্তায় উঠে দেখতে পেলাম সেই লেক। পাহাড় না, বরং বলা ভাল কয়েকটি টিলা বেষ্টিত এই বড়ন্তি লেক অপূর্ব শোভা নিয়ে আমাদের জন্য যেন অপেক্ষা করছিল। সূর্য তখন পশ্চিমে অল্প ঝুলে মুখ নিচু করে গভীরভাবে ধ্যানমগ্ন হয়েছে অনপনেয় একটি ছবি লেকের জলের ভিতর আঁকার জন্য। না, এঁকেই ফেলেছে। ইমিটেশন অফ ইমিটেশন। হ্যাঁ, যে কোনও আর্ট আসলে ঈশ্বরের সৃষ্টির অনুকরণ- বলেছিলেন প্লেটো। আসলে সূর্য তখন গলিত মোলায়েম আগুনের মতো জলের ভিতর আশ্চর্য বর্ণচ্ছটায় বিচ্ছুরিত হয়ে অপরূপ হয়ে উঠেছে। আর টিলাটিও জলের মধ্যে নেমে যেন মুখ দেখছে নিজের। আমরা যেমন ছবি তুলছি, সেলফি নিচ্ছি- ওরাই বা নেবে না কেন! চারপাশে এক শান্ত সমাহিত পরিবেশ। কিছু গাড়ি চলাচল করছে রাস্তা দিয়ে। এছাড়া কোনও শব্দ নেই আর। একদিকে লেক অন্যদিকে বেশ খানিকটা নিচুতে বিস্তৃত জমি। মাঝে চওড়া রাস্তা। প্রায় সবই ধানের জমি। সবুজ চারা লকলক করছে। এখানে জলের অভাব নেই। তাই শস্যশ্যামলাং।
লেকের জলে সন্ধ্যা নামছে। ঘনীভূত হচ্ছে অদ্ভুত এক মায়া। আশেপাশে আরও কিছু সৌন্দর্যপিপাসু টিম আকণ্ঠ পান করছে সেই মায়াভরা ‘স্টানিং বিউটি’। পাহাড়ি নিসর্গকে দু’চোখে রেখে দিকশূন্যপুরের দিকে চলে যায় মন। শহর থেকে দূরে আসার একটি আক্ষরিক তাৎপর্য-অর্থ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে এই প্রকৃতিযাপনে। আমি, প্রদীপ, সব্যসাচী, শৌভিকদা, উমাদা এবং ব্রজদা নিজেদের ভেতর যেন এই অনুচ্চার প্রকৃতির মহিমা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছি। ফলে কথা কম, চোখে মগ্নতা। ছবি তোলার মধ্যেও ধীর এক সঞ্চরণশীলতা। টেড হিউজ-এর একটি ইংরেজি কবিতার কথা মনে এল, যেখানে কবি ওকবনে হরিণ খুঁজতে গিয়ে গাছপালার অমোঘ সংস্পর্শ নিয়ে বেরিয়ে আসার পর লিখছেন: “My walk was the walk of a human child, but my heart was a tree.” জানি, মনের মধ্যে একটু সরল, নিষ্পাপ আবহ রচনা করে এই প্রকৃতি। জানি, সাময়িকভাবে একটা ম্যাগনেটিক অভিঘাত প্রকৃতি আমাদের মনে হানে। সেটা তার বাইরের সৌন্দর্যে অথবা অন্তরিন ছায়াময় রহস্যঘেরা এক ব্যাখ্যায়। সে-ব্যাখ্যা কেবলই অনুভবযোগ্য।
লেকের জল এবার নীলাভ থেকে আরও গভীর কোনও সিলুয়েট। মসীবর্ণ ছায়া-পরিলেখ! আহা, কে নেবে এই ফোটোগ্রাফি!
হাট-এ ফিরে এসে অল্প টিফিন সেরে আমরা বসে পড়লাম কবিতা নিয়ে। আমরা সকলেই মূলত কবিতালেখক। কেউ কেউ বলেন বটে- ‘কবি’! আমার কবিতা পাঠের পর অন্য পাঁচজন কবিতা পড়লেন। সব্যসাচী এই প্রজন্মের একজন অন্য ধারার কবি। এরা সকলেই একটি ভিন্ন পোয়েটিক স্কুলের বলে দাবি করেন। তথাকথিত বাণিজ্যিক, বাজারি বা জনপ্রিয় কবিতাপথটির সঙ্গে এদের চিরকালীন বৈরিতা। ক’জন পারেন? ধীরে ধীরে উপভোগ্য হয়ে উঠছিল আমাদের আসর। কবিতা-পাঠ সঙ্গে বিশ্লেষণ। প্রদীপের প্রতিক্রিয়া ক্রিটিক্যাল। কবি ছাড়াও প্রদীপ মেধাবী প্রাবন্ধিক।
বুঝতে পারলাম এবার- আসলে অন্য এক ভ্রমণ শুরু হয়েছে আমার। এটা খুব অপ্রত্যাশিত ছিল আমার কাছে। এদের কবিতার সিংহভাগ আমার কাছে নতুন মনে হল। সব লেখার দৃশ্যরূপ যেমন হয় না, তেমনই সরাসরি অর্থও হয় না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম- কীভাবে যেন আমি লেখাগুলোর সাথে কমিউনিকেট করতে পারছি। একটু আগে দেখে আসা প্রাকৃতিক অন্ধকারের মতো- যার মধ্যে খুব-একটা কিছু দেখা যায় না, কিন্তু তবু অপার একরকমের আগ্রহ ও অনুসন্ধান-স্পৃহায় চেয়ে থাকি সেই অন্ধকারের দিকে! তার মানে কবিতা আমাকে নিয়ে যেতে লাগল কোনও পথের দিকে। কোনও খোঁজের দিকে। এ তো জার্নি আনএন্ডিং! সত্যিই তো, আমাদের ভ্রমণ কি শুধু ফিজিক্যালি হয়? কোথাও গিয়ে শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেই হয়? আমরা তো মানসিক ভ্রমণের কথা জানি। লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এরকম ভ্রমণের কথা বলতেন। কবিতা কিন্তু আসাধারণ এক ভ্রমণপথের সন্ধান দিল। তবে আমার একটু অতিরিক্ত আগ্রহ ছিল শৌভিক দত্ত-র প্রতি। তুলনায় একটু চুপচাপ। কবিতা পড়তে গিয়ে একবার বললেন- ‘এখন আমি কবিতা লিখি না।’
‘কেন?’
‘আমি মনে করি কবিতা লেখার থেকে সরাসরি মানুষের কাজ করা অনেক জরুরি। রাজনীতি করেও সেটা করা যায়।’
জানলার বাইরে তখন ঝিকমিকি জোনাকি- গাছে গাছে। নিঃশব্দ। আমাদের চোখে ও মস্তিস্কে তখন মধুর চাক জমে ওঠার মতো নেশা জমছে। কবিতামদের নেশা। হ্যাঁ, জমছে। অপ্রয়োজনীয় কথা কমে যাচ্ছে একেবারে। শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধে পড়া লাইন মনে আসতে পারে এসময়- “এমনও কি কথা আছে যা দিয়ে নীরবও গড়ে ওঠে!”
অনেকটা রাত অব্দি আড্ডার পর দেশি মুরগি আর গরম রুটি, সঙ্গে সন্দেশ। সবকিছুই জমজমাট!
পরদিন সকালে যে-যেদিকে পারল প্রাতঃভ্রমণে বেরল। আমি আর ব্রজদা পাশের একটি গ্রামে। ছোট ছোট বাড়ি। চাষবাস। সবুজ জমি। আমরা শালুকভরা একটি পুকুরের পাড়ে এসে স্থির। স্নিগ্ধ হলাম। একপাল ছাগলের পায়ে পায়ে হাঁটলাম। বৃদ্ধ পশুপালককে বললাম- ‘এই অজ গাঁয়েও এমন রামছাগলের চাষ!’ উনি হাসলেন একগাল। বললেন, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ে যে বাপ।’
স্নান সেরে টিফিন খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম গড়পঞ্চকোট পাহাড়ের উদ্দেশে। বড়ন্তি থেকে মাত্র ১২ কিমি। যাত্রাপথে গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে চলা গান আমাদেরকে অনেকটা অধিকার করে ছিল। কথা হচ্ছিল নাটক ফিল্ম এবং আমাদের পড়া নানা বইপত্র নিয়ে। উমাদা দস্তয়েভস্কির কথা বলছিলেন। ব্রজদার ইংরেজি সাহিত্য পাঠাভ্যাস আমাদের কাছে আগেই স্বীকৃত। এসবের মধ্যেই এসে গেলাম গন্তব্যে।
অপরূপ প্রকৃতির সাথে অবহেলিত ইতিহাসের অপূর্ব মেলবন্ধনের নিদর্শন পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত রহস্যাবৃত্ত নিশ্চুপ এই গড় বা দুর্গ যা গড়পঞ্চকোট নামেই বিখ্যাত। কোট-এর অর্থ গোষ্ঠী। পাঁচটি আদিবাসী গোষ্ঠী, যার থেকে এই পঞ্চকোট নামের উদ্ভব। পঞ্চকোট রাজাদের এখানে গড় বা দুর্গ ছিল। পুরুলিয়া জেলার উত্তরপূর্বে নিতুরিয়া ব্লকের অন্তর্গত এই এলাকাটি। এখন এখানে পঞ্চকোট রাজাদের পুরনো প্রাসাদ, তোরণ এবং দুর্গের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। দেখার বলতে শুধু একটি মন্দির- যাতে টেরাকোটার কাজ।
১৮৭২ সালে এখানে এসেছিলেন কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত। তাঁকে আইনি উপদেষ্টা হিসেবে এনেছিলেন মহারাজা নীলমণি সিংদেও। এই পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি একটি সনেট রচনা করেছিলেন।
পাহাড়ের বিস্তৃত রেঞ্জ। সবুজ গাছে ঢাকা। না, ওঠার রাস্তা সহজলভ্য নয়। তবে জঙ্গলের ভিতর কিছুটা যাওয়ার চেষ্টা হল সদলবলে। বুনো ফুল হাতে ছবি নেওয়া হল। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার সময় আবার মনে পড়ল টেড হিউজের কবিতার লাইন-দুটো। কিন্তু আমরা যে সেই মননে দীক্ষিত নই। ওই রূপান্তর আমাদের এই ইহজন্মে হবে না আর!
ছৌ নাচ বিখ্যাত পুরুলিয়ায়। মুখোশ বিক্রির দোকানে রয়েছে হ্যান্ডমেড পেপার দিয়ে তৈরি নানান শিল্পময় মূর্তি। দিনটা মেঘলা ছিল। গোল টেবিলে আমরা চা আর ডিম খেলাম। এই চত্বরে অস্থায়ী দু-একটি হোটেলের পাশে খোলা জায়গায় দেশি মুরগি বাঁধা রয়েছে। বললেই ঘচাং করে কেটে উনোনে বসিয়ে দেবে।
এরপর পাঞ্চেত ড্যাম। একদিকে সুবিস্তৃত জলাধার। অন্যদিকে গাছপালার শোভা। জলাধার থেকে বেশ কিছুটা উচ্চতায় রাস্তাটিও চমৎকার। নৌকায় চাপার শখ হলেও মাঝি পাওয়া গেল না। জলের দিকে তাকিয়ে ঝাঁকবাঁধা মাছেদের মাথা উঁচিয়ে চলাকে আমরা প্রথমে সাপ ভাবছিলাম। আমরা বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে জলের কাছাকাছি এলাম। জল ছুঁলাম। নীল জল। ভ্রমণের নির্মল উচ্ছ্বাস। রোদ্রময় দিন। যেদিকে তাকাই এক উজ্জ্বল জীবনের উপস্থিতি। কবি প্রণবেন্দু দাসগুপ্ত-র কবিতার লাইন মনে এল- “কখনও রৌদ্রের দিকে, কখনও বৃষ্টির দিকে\ চলে যাই।\ যেতে ভাল লাগে বলে চলে যাই।\ যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপাই থাকে না বলে\ চলে যাই।”
ভাবতে ভাবতে কখন যে গাড়িতে চড়ে বসেছি আর কখন যে আমরা জয়চণ্ডী পাহাড়ে এসে হাজির হয়েছি খেয়াল করতে পারিনি! রাস্তা খারাপ থাকার জন্য একটু আগে নেমে হাঁটলাম। পায়ে পায়ে স্থানীয় বাচ্চারা কাঁচা তালপাতার বুননে ছোট ছোট ফুল, নানা কারুকাজ দশ-কুড়ি টাকায় বিক্রি করতে হুড়োহুড়ি করতে লাগল। কেউ কিনল কেউ ধমক দিল। পাহাড়ের উপর মা চণ্ডীর মন্দির। ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। প্রায় আটশ ফুট উচ্চতা। আর রয়েছে একটি বৃহৎ ঝোলানো প্রস্তরখণ্ড। ভাবলে অবাক লাগে এখানেই আমাদের এক গ্রেট মাস্টার তাঁর হীরক রাজার দেশে ফিল্মের শুটিং করেছিলেন। এই পাহাড় ছোটনাগপুর মাল্ভুমির অংশ। কিন্তু যখন শুনলাম প্রায় পাঁচশ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে, সকলেই পিছপা হলাম। কারও কারও আগেই দেখা ছিল এই পাহাড়। অগত্যা পাহাড়ের নীচে মাঠে চায়ের দোকানে বসলাম। কেউ লিকার চা, কেউ দুধের। পান করতে করতে হঠাৎ একটা মনখারাপ উজিয়ে এল। এখানেই কি আমাদের ট্রিপ এবারকার মতো শেষ!
রিসর্টে রাতে আবার জমে উঠল আমাদের আসর। আজ গান। এগুলো ভ্রমণের আবশ্যিক অঙ্গ। মূল গায়েন সব্যসাচী। অবাক হলাম ওর দক্ষতায়। দিলখোলা একের পর এক সংগীত পরিবেশন। এত গান মনে রাখে কী করে ছেলেটা! বয়েসের তুলনায় ও সব কিছুতেই একটু বেশি পরিণত। রবীন্দ্রনাথের গান অন্তত কুড়িখানা লিরিক না দেখে গাইতে পারে ছেলেটা। আমি খুব মন দিয়ে শুনছিলাম। ‘কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও’ গানটা একটা তরঙ্গ বইয়ে দিল আমাদের খোলা বারান্দায়। প্রদীপ গলা মেলাল। গানের খাতা বের করে নিজেও গাইল কয়েকটা। আমি রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের টপ্পাপ্রধান বৈঠকিগান গাওয়ার চেষ্টা করেই ভাবলাম এই বুঝি হোঁচট খেলাম, এই বুঝি উমাদা দু’হাত তুলে বললেন- থাম তো উৎপল, খুব বাহাদুরি হয়েছে!
হুঁ, আমরা যে রুমটায় ছিলাম, সেখানে রাতেও গান থামেনি। মানে আগের রাতেও গান ছিল। সে গান প্রদীপের নাসারন্ধ্র থেকে ভয়ংকরভাবে নির্গত! সকালে ব্রজদা উঠে দেখল আমি ওর পায়ের দিকে মাথা করে শুয়ে আছি!
হ্যাঁ সকাল। স্নান এবং টিফিন করে রওনা দিলাম। আমরা ছয় মূর্তি। কত কত না-জানা গ্রাম, অঞ্চল, বসতি পার হয়ে আমরা ফিরে চললাম নিজেদের বাসায়। কিন্তু ফিরে গিয়েই কি সব মুছে যায় নিমেষে? কোথাও কি আর ভ্রমণের চিহ্ন থাকে না ক্লেদভরা দৈনন্দিনতায়? আমার অবশ্য জার্নি শেষ হয় না সহজে। আমার কেবলই মনে পড়তে লাগল টিএস এলিয়টের অমোঘ লাইন- “End of an endless journey to no end.” আহা, অশেষ যাত্রাপথের শেষ নিঃসীমে! আমাদের জীবনও তো এমনই, তাই না?
স্থান: বড়ন্তি
পথনির্দেশ: আসানসোলগামী যে কোনো ট্রেন বা বাস, সেখান থেকে গাড়িতে বড়ন্তি প্রায় ১-ঘন্টার পথ।
রিসর্ট : Baranti Wildlife & Nature Study Hut
যোগাযোগের নম্বর : 9874887046





















Comments