সবুজ বনে অন্য মনে

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে । শীতকাল আসলেই বড় বড় সার্কাসের ত্নাবু পড়ত এই শিল্পাঞ্চলে । গ্রেটরেমন, অলিম্পিক, জেমিনি, নামগুলোও মনে আছে কিছু কিছু ।
জঙ্গলের হিংস্র জন্তুদের নিয়ে খেলা দেখানো হত । বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া, জেব্রা, জলহস্তি, ম্যাকাও - অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম । ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসত ওরা, উঠে আসত জঙ্গলের গল্প থেকে। কয়েক ঘণ্টা যেন পেরিয়ে যেত স্বপ্নের মতো , আবার সেই স্বপ্নের ঘোর এতদিন পরে । বক্সাদুয়ার অঞ্চলে কয়েকটা দিন ছিলাম। অসাধারণ রূপ বন্য প্রকৃতির। বক্সা টাইগার রিজার্ভের পশ্চিম বাফার অঞ্চলে বয়ে গেছে রায়মাটাং নদী । দুই পাড়ে ঘন সবুজ অরণ্য । তার মাঝেই সরল সুন্দর ছোট্ট একটি গ্রাম । নদীর নামেই নাম । ভূটান পাহাড়ের কোলে মেঘের আনাগোনা। শাল- সেগুন- শিরীষ- গামারের ঘন জঙ্গল । নদীর কোলে আশ্বিনের কাশের বন , হাজারো পাখির ডাক , ঝিঝি ডাকা সন্ধ্যায় ' হাতিমহলের' কাঠের বারান্দায় বসে উপভোগ করা বনজ্যোৎস্না, চিক চিক শব্দ করে গাছের ডালে ছুটে বেড়ানো কাঠবিড়ালি , হঠাৎ ছুটে চলে যাওয়া বেজির দল , রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেওয়া ময়ূরের তীক্ষ্ণ স্বর , সবই আঁকা হয়ে যায় মনের গভীরে । জয়ন্তীকে কি ভোলা যাবে কোনোদিন ? বন – পাহাড়ের কোলে বইছে জয়ন্তী নদী । সাদা - কালো - বাদামী নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যায় স্ফটিক স্বচ্ছ জল । কত যে পাখি , সবুজ লাল বাঁশপাতি , ছাই সাদা পালকের লেজ নাচানো খঞ্জনা , হলুদ ঠোটের ধনেশ , বাদামী - সাদা লম্বা লেজের হাঁড়িচাচা , হলদে - সবুজ হরবোলা , ধূসর পাটকিলে ঘুঘু , শাহ্ বুলবুল , দোয়েল , ফিঙে , বন-টিয়া - পক্ষী প্রেমিকদের স্বর্গরাজ্য এই জয়ন্তী । দুপুর গড়িয়ে গেলেই বনতলী আধো অন্ধকার । গাছের মগডালে সবুজ চন্দ্রাতপে শেষ বিকেলের কমলা রঙটা ফিকে হতে হতে হারিয়ে যায় । নদীর দুই পাড়ের ধূসর সবুজ বন , জয়ন্তীর জলে আছড়ে পড়া রুপোলী চাঁদ , অস্পষ্ট ভুটান পাহাড়ের কুয়াশা , ভেঙে যাওয়া পুরনো ব্রিজটা , দুর থেকে ভেসে আসা ঘণ্টা পোকার আওয়াজ , বাঘ - হাতির ভয় , রাতচরা পাখির ডাক , নিসর্গ পাগল মন - সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । ঝোপের অন্ধকারে জোনাকি জ্বলে । হাতিপোতা , জয়ন্তী থেকে বেশি দুরে নয় । দুয়ারসের প্রথম হাতির দল ঐখানেই দেখি । পুকরি পাহাড়ে উঠলে বকসাদুয়ারের অরণ্য অঞ্চলটার একটা দারুণ ছবি পাওয়া যায় । যে দিকে তাকাও শুধুই সবুজ । বক্সা থেকে লাটাগুড়ি হয়ে গরুমারা । লাটাগুড়িতে রাত্রি কাটান অনেকেই । অভয়ারণ্যে ঢোকার প্রধান প্রবেশপথ এটাই । সকাল- বিকেল জীপ সাফারির ব্যবস্থা আছে । আমরা চলে এসেছিলাম গোরুমারা ইকো ভিলেজ । কালিপুর ইকো ভিলেজ হিসেবেই পরিচিতি বেশী । গরুমারা জাতীয় উদ্যানের মধ্যে এই জায়গাটি জলপাইগুড়ি বনদপ্তরের তত্তাবধানে পরিচালিত হয় । মুর্তি , ডায়না আর জলঢাকা- তিনটি নদীর সঙ্গম এখানে । জঙ্গল লাগোয়া চারটে ছবির মতো সুন্দর কটেজ ।একটু হাঁটলে চা বাগান । সুদৃশ্য খড়ের ছাউনি দেওয়া কাঠের ঘরগুলি মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে কাঠের গুঁড়ির উপর বানানো। বন্য হাতির আনাগোনা আছে এ অঞ্চলে । কটেজের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা চলে গেছে নদীর দিকে। মূর্তি নদী অনেক চওড়া এখানে । বিস্তীর্ণ বালির চড়া। জঙ্গল এদিকেই ঘন । ওপারে দিগন্ত বিস্তৃত উঁচু ঘাসের বন। হরিন, হাতি আর গণ্ডারের খুব প্রিয় এই ঘাসের বন। ম্যানেজার অসিতবাবুর সাথে আলাপ হোল । মিশুকে মানুষ । চা খেতে খেতে কথা হচ্ছিল । কুকুর পোষার সখ । দুইবার ভালো জাতের কুকুর নিয়ে এসেছিলেন । দুইবারই চিতাবাঘের খাদ্য হয়েছে । অতিথিদের বিপদ হতে পারে তাই ঐ শখ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন । চারটে কুনকি হাতি রয়েছে এখানে । হাতিদের কিভাবে পরিচর্যা করা হয় দেখানোর জন্য নদীর ধারে নিয়ে গেলেন । মাহুতেরা তৈরি হচ্ছেন ওপারের ঘাসবন থেকে হাতিদের নিয়ে আসতে । ভোরের আলো ফুটলে এপারের ঘন জঙ্গল থেকে বন্য প্রাণীরা নদী পেরিয়ে ঘাসবনে ঢুকে পড়ে , আবার বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভ্যাপসা গরম বাড়তে থাকলে ফিরে আসে আলো আধারি ঘন অরণ্যে । হাতি আর তার মাহুত , মানুষ আর বন্য প্রাণের কি দারুন বোঝাপড়া । নদীর অগভীর জলে শুইয়ে দিয়ে কত যত্নে বন্য জীবগুলির পরিচর্যা করেন এঁরা । বিশাল জীবগুলো শিশুর মতো জল নিয়ে খেলা করে । সে এক মন ভালো করে দেওয়া দৃশ্য । কটেজগুলোর বেশ সুন্দর নাম , ছেপ্তি , ধাদ্দা, মালসা আর মধুয়া । একটি ঘরে তিন জনের থাকার বাবস্থা । সরল সুন্দর ঘর , দেওয়ালের বাইরে ভিতরে চেরা বাঁশ দিয়ে সাজানো।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে শিরিষ গামার সেগুনের ঘন সবুজ । দরজা দিয়ে বেরিয়ে কাঠের রেলিং দেওয়া বারান্দা । কাঠের সিঁড়ী নেমে গেছে উঁচু নিচু ঘাসজমিতে । দুপুরের খাবার যত্ন করে পরিবেশন করা হল । বিকেলে গেলাম মূর্তি নদীর ধারে মেদলা ওয়াচ টাওয়ারে । অন্যান্য পর্যটক যারা এখানে রাত্রিবাস করেন না তাদের মোষের গাড়ীতে আসতে হয় । নদীতে জল খেতে আসে বাইসন, চিত্রল অথবা সম্বর , গাউর , হাতি । ঘাসের আড়ালে থাকে গণ্ডার । পীঠের উপর বসে থাকে সাদা কোরচে বক । শেষ বিকেল পর্যন্ত বেশ কিছু পর্যটক ছিল । পরে আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেলেও আমরা রয়ে গেলাম । ফেরার তো তাড়া ছিল না । পড়ন্ত বিকেলের কমলা আলোটা ফিকে হয়ে আসছিল । চারপাশের জঙ্গলে অন্ধকার নেমেছে । সামনের ঘাস বনে তখনো হাল্কা আলো । ঝি ঝি পোকার ডাক বাড়ছে । ঘাসবনটার মাঝে মাঝে বেশ কিছুটা করে লম্বা ঘাস কেটে ফেলা হয়েছে । জঙ্গলের আগুন যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তাই এই বাবস্থা । দৃশ্যটা দেখলাম ঠিক ঐখানেই । এক দিকের লম্বা বাঘ ঘাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একটি মাদি গণ্ডার আর পিছনে তার ছোট্ট শাবকটি । ইতিউতি তাকাতে তাকাতে ফাঁকা জমিটা পেরিয়ে আবার গা ঢাকা দিল ঘন সবুজের আড়ালে । দিনের শেষে জ্যাকপট । সন্ধ্যা নামল মূর্তি নদীর জলে । ফিরে দেখি ক্যাম্প ফায়ারের বাবস্থা হয়েছে । আশেপাশের গ্রাম থেকে আসা আদিবাসী মহিলারা লাল সাদা শাড়িতে নিজেদের সাজিয়েছেন । কোজাগরী পূর্ণিমার রাত । মাদলের তালে তালে আর সুন্দর এক সুরে কি অনায়াস তাদের জোটবদ্ধ নাচের প্রদর্শন । অনভ্যস্ত আমরাও সেদিন পা মিলিয়েছিলাম ওনাদের সাথে । সেও এক নির্মল আনন্দ । রাতের খাওয়া শেষ করে বন্ধুরা মিলে বসেছিলাম কটেজের সামনে ঘাস জমিতে । রুপোলী সাদা বনজ্যোৎস্না রাতের অন্ধকারকে করে তুলেছিল রহস্যময় । এক ঝাঁক দুধসাদা বক উড়ে গেলো মাথার উপর দিয়ে । অরণ্য কখনও ঘুমায় না । খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে ঘরের ভিতর । ভোরে উঠতে হবে । পরের দিন যখন ঘুম ভাঙল দিনের আলো ভালো করে ফোটেনি । গত রাতের আলসেভাব পাতলা কুয়াশার মতো লেগে আছে চারপাশে । ঝোপ জঙ্গলে , ঘাসের উপর শিশির পড়েছে । ভোরের আলো উঁচু গাছগুলোর মাথার উপর ছড়িয়ে আছে । বনমোরগ ডাকে । দোয়েল শিস দিতে থাকে শিরীষ গাছের ডালে বসে । ফিঙে , বুলবুল , বাঁশপাতি গাছের মগডালে ওড়াউড়ি করে । সকালের চা পর্ব সেরে তৈরি হয়ে নিলাম । সাড়ে ছটা নাগাদ ক্যাম্পের হাতি এসে হাজির হল । শ্যামলাল নামের হাতীটা বেশ বড় । তিনজনকে পিঠে নিতে পারে । সবচেয়ে ভালো লেগেছিল তিস্তাকে । সবেমাত্র সওয়ারী নেওয়া শুরু করেছে । কোন এক বর্ষায় এই মূর্তি নদীর জলের টানে ভেসে এসেছিল হস্তিশাবকটি । বন দপ্তরের কর্মচারীরা অনেক যত্নে বড় করে তুলেছেন । কটেজের একদিকে হাতীতে উঠবার জন্য কাঠের উঁচু বারান্দা । সিঁড়ি দিয়ে উঠে পিঠে চাপতে সুবিধা হয় । হাতির পিঠে বস্তা আর পাতলা তোশক বেঁধে বসার জায়গা । দু দিকে পা ছড়িয়ে বসতে হয় । দুলকি চালে চা বাগানের গা ঘেঁসে মেদলা ওয়াচ টাওয়ারের দিকে চললাম । রাজস্থানের উট দেখে লাল মোহন বাবু বলেছিলেন আশ্চর্য জানোয়ার । লম্বা শুঁড়ের এই জীবগুলোর পিঠে সওয়ারী করতে করতে আমারও একই কথা মনে হল । জঙ্গলে হাতি সাফারি এক অনন্য অভিজ্ঞতা । নদীর ধারে এসে শ্যামলাল দাঁড়িয়ে পড়ল । জল বেশী গভীর নয় । মাহুতের ইশারার সাথে সাথে পরপর চারটে হাতি নেমে পড়ল জলে । নদী পেরিয়ে ওপারের ঘাসবনে উঠলাম । তিস্তা আকারে ছোট , অর্ধেক শরীর হারিয়ে যাচ্ছে এক মানুষ সমান উঁচু নলখাগড়া আর বাঘ ঘাসের মধ্যে । গোছা গোছা কাশে সাদা ফুল ঘাশবনের মাথা ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে । কোন কোন জায়গায় জল জমে জলা মতো । ছোট সাদা করচে বক আর ধুসর কোঁচ বক ওড়া উড়ি করছে । ওদেরকে দেখেই মাহুতরা গণ্ডারের খোঁজ করে । হাতি দেখে জলা থেকে উঠে ঘন সবুজের মধ্যে হারিয়ে যায় গণ্ডার । হঠাৎ লাফিয়ে বেরোয় চিতল হরিন । বাতাসে পচা কাদামাটি আর বুনো ঘাসের মিশেল একটা গন্ধ । জলার ধারে জলপিপির বাসা আছে । শামুকখোল দেখলাম বেশ কয়েকটা ।
ঘণ্টা খানেক সাফারি করে ফিরে এলাম । শ্যামলালের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম । শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল হাতটা । তিস্তা খুনসুটি করছিল মাহুতের সাথে , এখনও সে কিশোরী । ওরা ফিরে গেল , আমাদেরও ফেরার সময় হল । কিছু দিনের অপেক্ষা । শহুরে জীবনটা তো কয়েকদিন পরেই ক্লান্তির ছাপ ফেলবে । আর তখনই মনের কোন এক জানালা দিয়ে উঁকি দেবে সবুজ নদী আর রূপোলী চাঁদ । নিসর্গের সেই ডাক ঘরে স্থির হয়ে বসতে দেবে না । পরিযায়ী পাখিদের মতো আবার ফিরব কোন এক বন পাহাড়ের কোলে । বিস্তীর্ণ ঘন সবুজ জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে কোন পড়ন্ত বিকেলে আবার হয়ত ডানা মেলে দেবে হলুদ ঠোঁটের ধনেশ । সবুজ মনের মানুষ কি সবুজ ছাড়া থাকতে পারে ?
যোগাযোগ ;
কালিপুর ইকো ভিলেজ আসতে হলে মাল বাজার স্টেশন থেকে ৪৫ মিনিট গাড়ীতে যেতে হবে । চালসা স্টেশন থেকে ২০ মিনিট লাগবে । শিলিগুড়ি থেকে বাস ধরে চালসা আসা যায় । বুকিং ; বিভাগীয় বন আধিকারিক , বন্য প্রান শাখা - ২ , অরণ্য ভবন , জলপাইগুড়ি - ৭৩৫১০১ । দূরভাষ - ০৩৫৬১ – ২২০০১৭ ।
রায় মাটাং আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে ৪০ কিলোমিটার । গাড়ীতে আসা যায় । বাসে কালচিনি হয়ে আসা যায় ।
জয়ন্তী আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে ৩০ কিলোমিটার । বাসে আসলে রাজাভাতখাওয়া হয়ে আসতে হবে ।





















Comments