কালজানি অথবা নিতান্ত একটা ভ্রমণ

ঘুম ভাঙার পর প্রতিদিন যে দিনটা উপহার হিসেবে পাই আজ অবধি তার সবকটা যথেষ্ট ভাল, সুন্দর। সাংসারিক টানাপোড়েনকে এই সব ভাল দিনগুলোর বাইরে রাখি না। ওটা জীবনের বা যাপনের অঙ্গ। বড় কথা হয়ে গেল? যদি হয় হোক। আপনাকে মানতেই হবে এরম মাথার দিব্যি কেউ দেয়েছে কী না জানি না, আমি অন্তত দিচ্ছি না। একটা সামান্য ভ্রমণ লিখতে এসব কথা বাড়তি হয়ে যাচ্ছে না?
২২শে মার্চ,২০২৫, অনেকদিন আগের পরিকল্পনা; আমি আর আমার পার্টনার ভুটানঘাট বেরাতে যাব। "ঝরা পাতা গো আমি তোমারই দলে" এরম একটা মানসিকতা নিয়ে বসন্তে বাইক রাইড। এরম এর আগেও বহুবার গেছি। কখনও পার্টনার বন্ধু, কখনও পার্টনার স্ত্রী। এমনও হয়েছে, শুরুটা ঝকঝকে আকাশ নিয়ে; হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। পাহাড়ি বৃষ্টি, এখানে টিপিরটিপির তো ওখানে টাপুরটুপুর কোথাও ঝমঝমিয়ে আবার কোথাও রোদ্দুর। ভিজে একশা। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে কোথাও একটু আশ্রয় নিচ্ছি। কিন্তু সে বৃষ্টি থামবার নামই নেয় না। ধুর বলে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই “চল পানসী বেলঘরিয়া”, পাকদণ্ডীর চড়াই উৎরাইয়ের লাভা লোলেগাঁও। সেদিন এক পাহাড়ি তরুণী দোকানী খুব সাহায্য করেছিল। এভাবে কোথাও বেরাতে গেলে তাকে খুব মনে পড়ে। মাথা মোছার জন্যে সে তার দোকানের অনেকগুলো টিসুপেপার খরচ করেছিল। আগুনের কড়াইটা আমাদের মাঝে রেখে দিয়ে নিজে হাতে করে চা আর ডিম দিয়ে পাউরুটি ভাজা এনে আমাদের সামনে চেয়ার টেনে বসল। গল্প। অনভ্যস্ত পাহাড়ি রাস্তায় বাইক চালাব বলে মদ খাব না বলেছিলাম। “ভুলি কেমনে আজো যে মনে ...” ‘বুড্ডা হোগিয়া’ বলে চোখ মুখের অদ্ভুত মজার একটা ভঙ্গী করে খুব হেসেছিল মেয়েটা। একটা পাহাড়ি মদের বিবরণ দিল। সদ্যজাত বাঁশ থেকে তৈরি হয়।সে বাঁশ জন্ম দেওয়ানোরও পদ্ধতি আছে। পাকা দাড়ির সৌজন্যে এসব আমার জুটেই যায়।
সেদিন ভাল থেকে খারাপের দিকে গেছিলাম আজ খারাপ থেকে ভালর দিকে যাচ্ছি। মন ছোটার মত ঝরা পাতারা সড়সড় উড়বে চাকার পিছুপিছু। বর্ষায় জঙ্গল তো এক রকমের, আসলে সবকটা ঋতুতেই জঙ্গল তার চরিত্র পরিবর্তন করে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিনের দিন, রাত্রির জ্যোৎস্না বা অন্ধকারের প্রতিটা মুহূর্তেই সে নিজেকে পরিবর্তন করে। পর্ণমোচী অরণ্যেরও তো এক রূপ আছে। জানা নামের গাছেদের মধ্যে শিমূল, শিমূল ফুটলে তার পাতারা ঝরে যায়। আর তুলো উড়িয়ে দিয়ে সব্বার আগে তার শাখায় শাখায় জাগিয়ে তোলে সবুজ। পাশাপাশি মরার মত শাল, সেগুন, খয়ের, অর্জুন, মেহগিনিরা কী চেয়ে তাদের লম্বা লম্বা হাতগুলো ছড়িয়ে রেখেছে আকাশের দিকে! এরকম বৈসাদৃশ্যও তখন একটা দৃশ্য হয়ে ওঠে! জাড়ুলের সব পাতা একবারে ঝরে যায় না। সামনে দুই মাস, তারপরেই তো জাড়ুলের মাস তাই তার শাখায় শাখায় প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। প্রতিটা শাখায় শাখায় চকচকে নতুন সবুজ আর সেই শাখাগুলোর শেষের দিকে ধুলো মাখা বৃদ্ধ পুরু পাতারা হলুদ হয়ে এসেছে।
এই বসন্তে একগুচ্ছ ভাল ভাল আবহাওয়ার দিন উপহার দিয়ে কী না একদম এই দিনেই সকাল থেকে বসন্তবৃষ্টি? আফসোস যে একটুও ছিল না তা নয় তবুও বসন্তবৃষ্টি খুব প্রিয়, ফিসফিসিয়ে চুমু খাই। কখনও কখনও আবেগ ঘন ও গভীর হলে জিভ ছুঁচলো হয়ে আসে, তখন বৃষ্টির আল জিভ পর্যন্ত ছুঁয়ে ফলি। তাছাড়া বৃষ্টি ফিস্টিকে তেমন একটা আমল দেই না। ভালবাসলে তাকে আমল না দিলেও চলে। সে অভিমান করবে, গালফুলিয়ে বসে থাকবে কিন্তু আড় চোখে হেসে দিলে জড়িয়ে ধরতে দ্বিধা করবে না। এইটুকু জানি, এইটুকু বিশ্বাস করি, এইটুকুই তো ভালবাসাবাসির দুর্বলতা। সুযোগটা কাজে লাগাব না? যেমন, ধরা পরবই জেনেও কাজে যাচ্ছি এরম একটা মিথ্যা বলে স্ত্রীকে আপাতত ম্যানেজ করে রেখেছি। কী কাজ, বলে কোন প্রশ্ন কী ওর মনে জাগে নি? নিশ্চয় উঠেছে কিন্তু অপেক্ষা করে আছে সেই মিথ্যেটাকে হাতেনাতে ধরবে বলে। আমিও জানি ধরা পড়ব। কী দরকার ছিল? আযথা মিথ্যেবাদী হওয়ার? না, অযাথা না, এরম মাঝে মাঝে করতে হয়। স্ত্রী রাগ করবে, বলবে তোমাকে বিশ্বাস করেই ভুল করেছি না হলে আমার জীবনটা অন্য রকমের হতে পারত। তবেহ্! রাগ প্রশমনের সুযোগ তৈরি নাহলে কিসের দাম্পত্য! গড়গড়িয়ে চলা সংসার খুব একঘেয়ে। দাম্পত্যে একটুখানি আশান্তি খুব খুব খুব প্রয়োজন। বৃষ্টিতে ভিজতে ভাল্লাগে। সাধারণত রেইন কোট পরিই না। সারা শরীর জুড়ে একমাত্র তুইই তো আছিস! আর সব দুধভাত। দু'দিন ছোলা বাদাম ভাজা।
কিন্তু কয়েকদিন হল জেনেছি অবয়সে বয়সীয় কিছু রোগে আমার পার্টনার আক্রান্ত। কোলেস্টেরল, হাই প্রেসার ইত্যাদি ইত্যাদি ... আমারও খুব ইচ্ছা আর ওর বেপরোয়া ভাব নিয়ে আমরা দেরি করেই রওনা দিলাম। কিছুদূর চলে আসার পর আবহাওয়া অনুকুল। ঝকঝকে বাসন্তী রঙের রোদ্দুর কিন্তু বেলা পড়ে এসেছে। দেরি করে রওনা দেওয়ার কারণে আমরা ভুটানঘাট যাওয়ার ঝুঁকিটা নিলাম না। অসমগামী ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে ডানদিকে নেমে আলিপুরদুয়ার। সেই দিকে না গিয়ে তার উল্টোদিকে কালজানি নদীর পাড়ে জয়ন্তীতে ঢুকে পরার সিদ্ধান্ত নিলাম। পেছনে পড়ে রইল আলিপুরদুয়ার আমরা জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম।
রাজাভাতখোয়া অঞ্চলের এটি একটা তিনটে রাস্তার জংশন। সেখান থেকে দক্ষিন পশ্চিম দিকে শর্টকাটে দলসিংপাড়াকে ছুঁয়ে হাসিমারা যাওয়া যায় আবার সেই দলসিংপাড়াকে ছুঁয়ে জয়গাঁও ও ভুটানে পৌঁছনো যায়। দক্ষিণ দিকে আলিপুরদুয়ার আর উত্তর দিকে বক্সা ফোর্ট। কালজানি/জয়ন্তী থেকে পাঁচ কিলোমিটার আগে অরণ্য দফতর আমাদের এই জায়গায় আটকে দিল, বলল মূল বন বা প্রান্তীয় বনে বাইক নিষেধ। তাহলে বাইক কোথায় রাখব? একজন অটো ভাই, রকি, নিজের দ্বায়িত্বে একশ টাকার বিনিময়ে বাইক রাখার ব্যবস্থা করে দিল। জানলাম, রাজাভাতখোয়ায় এই রোজগার ব্যবস্থাটার বয়স বড়জোর দেড় বছরের। ভেবে দেখলাম হ্যাঁ, বছর দুয়েক আগে আমি আর আমার আর এক পার্টনার এই রাস্তা দিয়ে নদী পার করে ছয় সাতটা চাবাগান মধ্যে দিয়ে শামুকতলা, প্রচুর ঘোরা পথ, তবুও রাস্তার আনন্দ নিয়ে আলিপুরদুয়ারে গেছিলাম। তখন এরকম অরণ্য চেকপোস্ট ছিল না। রকি ভাইয়ের অটোই আমাদের কালজানি নদীর কাছে পৌঁছে দিল।
কালজানি নদীর দুই পাশ জুড়ে এই অরণ্য বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট। নদীর অববাহিকার পশ্চিম পাড়ের অরণ্যের মধ্যেকার এই জনবসতি রাজাভাতখোয়া অঞ্চলের মধ্যেই পড়ে। এখানেই নতুন জঙ্গল চেকপোস্ট তৈরি হয়েছে। সেখান থেকেই মূল বনের মধ্যে দিয়ে যে রাস্তা তার পাঁচ কিলোমিটার এসে আমরা ডান দিকে বাক নিয়ে কালজানি নদীর পাড়ে জয়ন্তীতে পৌঁছেছি। মূল রাস্তাটা সোজা আরও পনেরো কিলোমিটার দূরে মূল রাজাভাতখোয়া হয়ে সান্তালা বাড়ি অবধি চলে গেছে। রাজাভাতখোয়া থেকে সান্তালা বাড়ি দশ কিলোমিটার। সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার পায়ে হেটে ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্ট অবধি পৌঁছোতে হয়। যেখানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বন্দী ছিলেন। এই হেটে আসার পথেই একটা উঁচু ওয়াচ টাওয়ার (নজর মিনার), সেখান থেকে চারদিকে বক্সা অরণ্যকে দেখা যায়। বক্সা থেকেই পাহাড় আর বনের মধ্যে দিয়ে রূপম ভ্যালী, সিঞ্চুলা পর্বত শ্রেনী, ভুটান সীমান্ত। এর পরেই ভুটানের ফিপসু অভয়ারণ্য। ভুটান সীমান্ত অবধি রূপম ভ্যালী অপূর্ব একটা ট্র্যাকিং রুট। গাইড নিয়ে যেতে হয়। না বললেই নয়, এই পথে জোঁকের খুব উপদ্রব। আগে থেকে সাবধান না হলে টেরই পাওয়া যায় না যে পিঠ ভরে গেছে জোঁকে। ছোট বড় প্রচুর নদী দিয়ে ভরা এই জঙ্গল টাইগার রিজার্ভ হলেও এই বনে হাতি, চিতা, বারকিং ডিয়ার, হরিণ, বাইসন (গাউর), জংলী কুকুর ও অজগর ছাড়াও আরও বিভিন্ন রকমের বিষধর সাপেদের দেখা পাওয়া যায়। কালজানি নদীতে জল খেতে এলে হাতিদের প্রায় প্রতিদিনই নদীর বেডে দেখা যায়। বিশেষ করে ধান পাকার সময়গুলোতে হাতি এই অঞ্চলে হামেশাই অত্যাচার করে। তাছাড়া বন লাগোয়া চা-বাগানগুলোর মধ্যে চিতার গতিবিধি ও হানা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। এই জংগলের বিশেষত্ব হল বুশ, ঘন ঝোপ। যে ঝোপগুলো বাঘেদের পছন্দের। বহুবার এসেছি, হাতি ছাড়া কিছু দেখি নি। যদিও জঙ্গল আর বিভিন্ন ধরণের পাখিই আমার ভাল লাগে। কত রকমের, কত রঙের যে পাখি আর আপন মনে ওদের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ! সবার তো নাম জানি না। ধনেশ, বসন্ত বৌরি, হলুদ বউকথাকও, ময়না, মাছরাঙা ... এখানে জোড়া ধনেশ খুব সহজ লভ্য। গাছ ভরা বিভিন্ন রকমের নরম অর্কিড, বর্ষায় সেই অর্কিডগুলোতে বিভিন্ন রঙের ফুল।
এখান থেকে ছয় জনের বসার ব্যবস্থা সহকারে হুড খোলা জিপে তিন ধরণের জংগল ঘোরাঘুরির সরকারী ব্যবস্থা আছে। এক/ জঙ্গল সাফারি (বেথুয়াডহরী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ৬৭ হেক্টর আয়তন) দুই/ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামে প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র, পাখিরালয় ও কুফরি লেক আর তিন/ মহাকাল। মহাকাল যাত্রা। ভক্ত মানুষেরা সংখ্যায় বেশি বলে মহাকাল যাত্রাটাই এখানে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। শিবরাত্রির দিন এখানে প্রচুর ভিড় হয়। নদীর বেডের উপর দিয়ে জিপ পৌঁছে দেবে পাহাড়ের পাদদেশে। তারপর পায়ে হেটে, পায়ে হেটে প্রথমে কালজানির শীত অথবা বসন্তকালীন জলধারা পার হয়ে তারপর খাড়া পাহাড়ি পথে মহাকাল দর্শন। পূজোর ব্যবস্থা আছে। সমতল ও পাহাড়ি এই অঞ্চলের উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৫২- ১৭৫৫ মিটার পর্যন্ত। উচ্চতা কম হলেও খাড়া এই মহাকাল পাহাড়ে উঠতে মানতে সময় লাগে মোটামুটি দুই ঘণ্টা।
অযথা কেন যে বেশীরভাগ প্রোসেশনাল ভ্রমণ পরিকল্পনাকারীরা এন.জে.পি কে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করে থাকেন! কিন্তু ডুয়ার্স বেরাতে হলে জলপাইগুড়ি, মালবাজার, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারকে কেন্দ্র করাটা সহজ এবং সাশ্রয়ী। কারণ যে ট্রেনগুলো এন.জে.পিতে আসছে সে
সব ট্রেনগুলোই উল্লেখিত ষ্টেশনেও যায়। বক্সা ব্যাঘ্র অভয়ারণ্য / জয়ন্তী / জলদাপাড়া / চিলাপাতা / ভুটানঘাট/ ভুটান ইত্যাদি ইত্যাদি জায়গাগুলো ঘোরার জন্যে সবচেয়ে ভাল
আলিপুরদুয়ারকে কেন্দ্র করেই পরিকল্পনা করা। কাশিয়াং, কালিংপং, দার্জিলিং, সিকিম ইত্যাদি পাহাড় ও পাহাড়ি অফবিটগুলো ভ্রমনের জন্যে এন.জে.পি অনেকটাই ঠিকঠাক কেন্দ্র।
সূর্য দুবে যাওয়ার পর সমতলে আরও বেশ কিছুক্ষণ আলো থাকে কিন্তু জঙ্গলে ঝুপঝুপ করে সন্ধ্যারা নেমে আসে। তখনও কালজানির বুকের উপর নীলচে সাদা আলো। দুর্গাপূজা ও তার আশপাশের সময় মানে ভরা মরসুম, এ বাদে যে কোন সময় এখানে সুলভে হোমস্টে পাওয়া যায়। কোন এজেন্টের উপর নির্ভর করতে হবে না। সোজা পথ আমরা নিজেরাই চলে এসেছি। নদীর বুক বরাবর একটা বাড়িতে আস্তানা গেড়েছি। বারান্দায় বসলেই বুক চিতানো কালজানি। বহু ধর্ষণ লুকিয়ে সে যেন ক্লান্ত। কালজানি কী বুড়ি হয়ে গেল? তাহলে সে কী আর গর্ভবতী হবে না? “নদী গর্ভবতী হলে বান আসে”। তার গর্ভবতী হওয়ার খবর তো সবার জানা। বারান্দা থেকে শোনা যায় অন্ধকার মাখা পাহাড়ের নিচ দিয়ে এখন তার তিরতির করে অনিচ্ছায় বয়ে যাওয়ার আওয়াজ। ক্লান্ত কিন্তু হাসিটা তার মুখে এখনও লেগে আছে। একটা হুতুম পেঁচা, সামনের পাতা ঝরা গাছের ডালে বসে তার ঘুম ভাঙার খবর ছড়াচ্ছে। একটা উক পাখি, যে ডাকলে বাড়ির মহিলারা তাকে বাড়ির আশপাশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, গরম খুন্তি দেখায়; সে ডাকছে। ডাকটা চেনা কিন্তু পাখিটাকে কখনও দেখিনি। রাতের পাখি বোধহয়। চিরকাল রাতেই তার ডাক শুনেছি। পাখিটাকে খুঁজতে যাই নি কোনদিন। তাকে দেখবার ইচ্ছায় একটু এগোতেই ফড়ফড় ডানার শব্দ করে উড়ে গেল। বোধহয় আস্তানার লনে একটা মাথা ভাঙা ঝাউগাছে সে বসে ছিল। তাকে উড়ে যেতেই শুধু দেখলাম, একটু ভারী গোছের পাখিটা। দূর থেকে আবার তার ডাক শুনতে পাচ্ছি। যাব?
হঠাৎ একটা গান মনে পড়ল –
"ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি,
নয়নে দেখেছি তব নূতন আকাশ॥
দুখানি আঁখির পাতে কী রেখেছ ঢাকি,
হাসিলে ফুটিয়া পড়ে উষার আভাস॥
হৃদয় উড়িতে চায় হোথায় একাকী--
আঁখিতারকার দেশে করিবারে বাস।
ওই গগনেতে চেয়ে উঠিয়াছে ডাকি--
হোথায় হারাতে চায় এ গীত-উচ্ছ্বাস"॥
জোরে বাতাস বইলে দুর্ঘটনা এড়াতে এখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ কেটে দেওয়া হয়। ততক্ষণে সবটাই অন্ধকার। বিদ্যুৎ চলে গেছে। শনশনে বাতাসের শব্দটা বদলে গেল। সো সো আওয়াজ। এতক্ষণ এদিক ওদিক থেকে দুটো একটা পাতা ঝরে পড়ার আওয়াজ হচ্ছিল হঠাৎ শুরু হল ঝড় ঝড় শব্দে শুকনো পাতাদের প্রচণ্ড ওড়া উড়ি আর ধুলো। দেখাশোনার জন্যে যে মানুষটা এতক্ষণ আমাদের চা পকোড়া ও বিভিন্ন ফাই ফরমাইশ সরবরাহ করছিলেন তিনি আশঙ্কা ভরা গলায় বললেন, রাতে আর বিদ্যুৎ আসবে না। আমরা বললাম, অসুবিধা নেই, এই বেশ ভাল আছি।
বিরামহীন ঝিঁঝিঁর একটানা তানের মধ্যে আমাদের উপভোগ্য স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে একটা স্করপিও সশব্দে ঢুকে পড়ল শান্ত নীড়ে। হৈ হৈ করে কয়েকজন নামলেন। সারা রাত সেই হৈ হৈটা শেষ হল না। কথায় বার্তায় বোঝা যাচ্ছিল তারা শিলিগুড়ির একদল কাঠের ব্যবসায়ী, সাথে জমির দালালীও করেন। তাদের বন ও বন্য পশু পাখিদের সম্পর্কে কোন ধারনা নেই। থাকার কথাও নয়। নতুন পয়সা হয়েছে তাই আরও অনেকের মত একদিন জঙ্গলে মস্তি করে যাওয়াই উদ্দেশ্য। রাস্তায় বোধহয় চিতা দেখে এসেছে তাই মোবাইলে এ ওর পরিচিতদের সেই আনন্দবার্তা শোনাচ্ছে। এত চীৎকার করে চিতাবাঘের কথা বলছিল যে আমার পার্টনারের মনে হয়েছিল বলে, যে, চিতা কবে বাঘ হয়ে গেল? অনুভব করলাম ওদের মোবাইলের প্রয়োজন নেই, যে পরিমাণ চীৎকার করছে তাতে এমনিই সেই আওয়াজ অনায়াসে শিলিগুড়ি অবধি পৌঁছে যেতে পারে। সোল্লাসে আমাদের বলল, আপনারা কখনও চিতাবাঘ দেখেছেন? আমরা বললাম, না। ইচ্ছে হচ্ছিল ঘাড় ধরে ওদের অরণ্যের বাইরে বার করে দেই। কিন্তু ক্ষমতাহীন নিরুপায় মানুষের সৌজন্য নামক একধরনের সহ্যশক্তি থাকে। তাই নিতান্ত ভদ্রতায়, নিস্তব্ধতা বেছে নিতে আমরা বারান্দা ছেড়ে নিঃসঙ্গ নদীর বুকের উপর একটা বড় পাথরকে বেছে নিলাম।
তখন মাঝরাত, নিস্তব্ধ নিশুতি। হঠাৎ খিকখিকিয়ে হাসির আওয়াজ। একটু ভয় তো পেলামই। মুহূর্তেই বুঝলাম এই শব্দ দু'জন তক্ষকের কথোপকথন। এই আওয়াজের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল জলদাপাড়া ঘুরতে গিয়ে। চিনিয়ে ছিলেন আমাদের গাইড। দুটো তক্ষক পরস্পর বোধহয় তাদের কথা বিনিময় করছে। অন্ধকার ঝোপঝাড়ে লুকনো একটা মড়া ডোবার মধ্যে মুখোমুখি দুটো শিমূল গাছ। সেখান থেকেই ওই দুজনের কথোপকথন, আলাপ। আমার মনে হল ওরা সোশ্যাল ডিস্টেন্স বজায় রেখেই কথা বার্তা চালাছে। লাভ স্টরি ডিস্ট্যান্স গড়ার সময় তো সামনেই। আমাদের দুজনেরই ইচ্ছা হল ওদের এই প্রাক প্রেমালাপ মোবাইলে ধরে রাখি। পার্টনারের নির্দেশে মোবাইলের টর্চ না জ্বালিয়ে বুশ ঠেলে সাবধানে, পা টিপে টিপে আমরা দুজন তক্ষক তক্ষকির কাছাকাছি গেলাম। খুব সামনেই মিলন মাস। আর সবার মত ওদেরও পছন্দ অপছন্দের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে। অরণ্যে নারীরা পছন্দের পুরুষ নির্বাচন করে তাই সমস্ত পুরুষের মধ্যেই থাকে একটা তাগিদ, নিজেকে নারীর কাছে শ্রেষ্ঠ করে তুলে ধরার। প্রলোভন, উস্কানি বা প্ররোচনা না, সেটা পেখম তোলা থেকে শুরু করে যুদ্ধ অবধি গড়াতে পারে। বাবুই পাখি বাসা বুনে সেখানে জনাকী ধরে এনে ঘর আলকিত করে, অপেক্ষা করে তার প্রেমিকার জন্যে।
কী আশ্চর্য না এই অরণ্য সভ্যতা!
... মানুষ খুব জানে মানুষ কতটা অন্য পৃথিবীর। পনেরোই জুন থেকে চোদ্দই সেপ্টেম্বর তাই অরণ্যে মানুষের প্রবেশ নিষেধ হয়ে যায়। নিয়মটা মানুষই করেছে। অন্তত তিন মাস অরণ্য সম্পর্কীয় প্রানীরা নিশ্চিন্তে থাক, শান্তিতে থাক। মানুষের জন্যে মানুষের এই সিদ্ধান্তে এমন মনে হয়েছে যে, সবার জন্যে অরণ্য ভ্রমণ নয়। ... তবুও বেওসা তো!
কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী, শেষ রাতে মেঘেদের আড়াল করে চুপিচুপি লাল চাঁদ উঠেছিল পশ্চিম আকাশে। আমরা ঘুমোতে গেলাম।





















Comments