প্রিয় সিমলিপাল

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা ।  আমি তখন শ্যামবাজারের এক মেস ‘শাবক’ । কলেজের থার্ড ইয়ার পরীক্ষা শেষ । একই মেসে থাকে বন্ধু পার্থ । আর এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু সুরজিৎ পান্ডে, রামরাজতলায়, যাকে আমরা পরে শুধু ‘পান্ডে’ নামেই চিনব । ফাস্ট ইয়ার থেকে আমরা টুকটাক ঘুরেছি, তবে রিসেন্ট বেশ কিছুদিন কোথাও যাওয়া নেই । এই নিয়ে পার্থ’র সাথে কিছু কথা হতে হতে বাকবিতন্ডা, শেষে পার্থ বলল আমি আর পান্ডে রাজি, তোর জন্যেই যাওয়া হচ্ছে না । খেয়ে গেলাম সেন্টু, চল কালকেই বেরুবো । ফোন হলো পান্ডে’কে , নানান গাই গুই করে শেষে রাজি । কিন্তু যাওয়া কোথায় হবে ? কদিন আগে পেপারে পড়েছিলাম সিমলিপালের কথা । হাতের কাছে উইক এন্ড ট্যুরের গাইড বই, কাল সকালে হাওড়া থেকে ছ’টার সময় ধৌলি । পান্ডে কে সেদিনই গুটিয়ে পাঠিয়ে আমাদের মেসে আসতে বলে দিলাম ।

এর আগে আমরা কেউই কোন রিজার্ভ ফরেস্টে যায়নি, ফলে সেভাবে অভিজ্ঞতাও নেই । টাকাপয়সাও তো সেভাবে নেই । আমি কয়েকটা টিউশনি করতাম । শুরু হল হিসেব কষা মোটামুটি আন্দাজে হাজার টাকা করে নিয়ে নিলাম সবাই । তখন আমাদের ছিল না কোন এটিএম কার্ড না ছিল ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল। আমার কাছে একটা হাজার আড়াইয়ের ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল, ওটাই ভরসা । আমাদের দ্রুত গোছগাছ শুরু । সিমলিপালে ম্যালেরিয়ার হেব্বি উৎপাত, কিন্তু আপাতত গুডনাইট কয়েল দিয়েই কাজ সেরে নেওয়া যাবে ভাবা হলো । সেই গাইড বুক, পেন, পেপার , ছুড়ি, দড়ি, টর্চ, ওষুধে আমরা দুজন রেডি । পান্ডে এলো সন্ধ্যের দিকে । তিনজনের নানানা খিল্লি চললো । বেশ রাত হয়েছে, ভাবলাম আর ঘুমিয়ে কাজ নেই চারটের দিকে তো বেরুতেই হবে । আর এমনিতেও তখন পুরো গরমের সময়, অতজন মিলে ছোট্ট মেসটায় আরামে ঘুমানোও যেত না ।

মাঝরাত থেকেই আমরা জোর করে প্রেসার আনার চেষ্টা করলাম, বিশেষত আমি আর পান্ডে কারন আমাদের আবার পেটের একটু ইয়ে ছিল । যাইহোক বেরিয়ে পড়া হলো চারটের পর পর । শ্যামবাজার পাঁচমাথা কিন্তু কখনো ঘুমোয় না । চা দোকান, ডিম্ সেদ্ধর দোকান তখনও খোলা । ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে । কিছু লোক, এক দুটো পুলিশ এদিক ওদিক । ফুটপাথের লোকজন ভোরের একটু কম গরমে অঘোরে । আমরা একটা ট্যাক্সি ফিট করলাম । ফাঁকা রাস্তা হু হু ট্যাক্সি হাওয়া জ্বলছে সিগ্রেট এক বাঁধন ভাঙার উচ্ছাস মন ভরপুর । আমি আর পার্থ তো বাড়িতেও জানাইনি । আলো বেশ ভালোই ফুটেছে তখন ট্যাক্সি নামাল হাওড়া চললাম কাউন্টার ।

তিনটে বালেশ্বর । কাউন্টার বলল কি? ওই নাম কোন স্টেশন নেই । আমরা চমকেছি । সাইড হয়ে আবার গাইড বুক , হ্যা বালেশ্বর-ই । এবার কাউন্টার জবাব দিল, উড়িষ্যাতে তো ? ওটার নাম বালাসোর । আমরা তাও বিশ্বাস করি না । বালেশ্বর আর বালাসোর কি এক হতে পারে ! টিকিট না কেটে আলোচনায় বসলাম যে , কে ভুল, সাধের গাইড বুক নাকি কাউন্টার ? তারপর জিজ্ঞাসা শুরু হল নানান জনকে । আমাদের তখন আনন্দ উড়ে গেছে । যাক শেষমেশ বুঝলুম যাহাই বালেশ্বর তাহাই বালাসোর । চলো তাড়াতাড়ি নাহলে ধৌলি যাবে বেড়িয়ে ।

ট্রেন ভালোই স্পিড নিয়েছে। জায়গা পাওয়া গেছে এক কুলিকে কিছু পয়সা গছিয়ে। তাই নিয়ে চলছে বাকবিতণ্ডা। পার্থ আর পাণ্ডের উপর দায়িত্ব ছিল রানিং ট্রেনে উঠে জায়গা ধরার। কিন্তু শেষ মেশ টাকা দিয়েই জায়গা কিনতে হল। এই নিয়েই একে অপরকে দোষারোপের মধ্যে এক হাতে গরম চা আর অন্য হাতে আমার সেই ‘সন্দেহজনক’ উইকএন্ড গাইড বুক। শেষতক যেটা আমরা বুঝলুম তা হলো, বালেশ্বর বা বালাসোর নেমে সেখান থেকে বারিপদা নামক এক স্থানে পৌঁছতে পারলেই কেল্লা ফতে। মানসচক্ষে দেখতে পেলুম সিমলিপালের বিশাল এক গেট, আর তার ভিতর দিয়ে আমরা তিনজন হেঁটে যাচ্ছি। আগেই বলেছি যে এর আগে  আমাদের কাউরিরই বড়সড় কোন রিজার্ভ ফরেস্টে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না, আমি আমার বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিয়ে সিমলিপালকে মাপার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম।   

সিগরেট তেষ্টাকে দমিয়ে রেখে আমরা নিজেদের আগাম পরিকল্পনায় এবং ধীরে ধীরে জানলার বাইরের দৃশ্যে চোখ । তিন জনেই নিজেদের মতো করে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছি। সময় পেরুচ্ছে গতি। ট্রেন খড়গপুরে। লোকজনের ওঠানামা, হকারের চিৎকার, খিদেও জোর। বাইরে দেখি রঙিন আলুর দম। আহা! পেটরোগা লোকদের একটু ইয়ে মানে নোলা- সে তো আপনারা জানেন নিশ্চই! হুমড়ি খেয়ে তিনপ্লেট আলুরদম আর পাউরুটি। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। চমকালেই তো আর সব ধাতুই সোনা হয় না- বুঝলাম দমে মুখ দিয়ে। যা এতক্ষণ রূপে ভোলাচ্ছিল, তা আর গুণে টিকল না! অগত্যা সেই লাল লঙ্কার গুড়ো মারা আলু গেল গটরে, সেই হকারের খানিক বাপবাপান্ত করতে করতে দেখি জানলার বাইরের পরিবেশ কেমন যেন অচেনা, অজানা। নিজরাজ্যের বাইরে এর আগে বেরোইনি কেউই, তাই বাইরে তাকিয়ে যখন দেখি দেওয়াল লিখনের অক্ষর গুলো কেমন জড়িয়ে পেঁচিয়ে গেছে, মন কিছুটা চঞ্চল, নেচে উঠল। কামরাতেও ভাষার পরিবর্তন এবার কান টানল। এভাবেই সাড়ে ন’টার দিকে ট্রেন উৎরিয়ে দিল। বালাসোর।

স্টেশনে নেমে নামের বিড়ম্বনা ভুলে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেল। গরমের একটা অদ্ভূত আভাস পাচ্ছিলাম, কিন্তু সেসবর গুরুত্ব আমাদের কাছে নগণ্য। প্রাণ ভরে জল খেলাম, ঠাণ্ডা জল, প্রাণ জুড়িয়ে। কয়েক মিনিট ওখানে নিজেদের একটু গুছিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে রওয়ানা বাসস্ট্যান্ডের দিকে। খুব বেশি দূর নয়। হেঁটে মিনিট দশ-পনেরো। কোনটা কোথায় যাবে, বাসের লেখা দেখে বোঝা দায়! দেখি একটা বাস তখুনি বেরুচ্ছে। দৌড়। অমনি এক লোক আটকে দিল পথ। তার ভাঙ্গা বাংলা। আমাদের গোটা। যা বলল, তার মানে, ঐ বাসটাও বারিপদা যাবে ঠিকই কিন্তু ওটা লোকাল আর এর পরেরটা এক্সপ্রেস। এক্সপ্রেসই তো আমাদের চাই। সিট বুকড। বাস ছাড়লো প্রায় মিনিট কুড়ি পরে। গরমটা টের পাচ্ছি তখুনি। তবুও মনের উত্তেজনার কাছে সে নেহাতই শিশু। জার্নি আবার শুরু। দুপাশের ক্রমশ প্রকৃতির পট পরিবর্তন। বেশিরভাগ ফাঁকা ধু ধু, আবার কোথাও শাল পিয়াল।  কিন্তু শেষ না হওয়া রাস্তার মতো, গরমও বেড়ে চলেছে। ঘাম নেই। চামড়া শুকিয়ে যাচ্ছে। বিরক্তি ঘিরে ধরতে ধরতে প্রায় ঘণ্টা দুই পরে পৌঁছলাম বারিপদা বাসস্ট্যান্ড।

বাস থেকে আগে নেমেছিল পান্ডে। আমি আর পার্থ ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে নেমে দেখি পান্ডে এক অচেনা লোক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কে এটা? ও বলল, এ আমাদের নিয়ে যাবে ফরেস্ট বুকিং অফিসে। আগ বাড়িয়ে একটা উঠকো লোক ধরে আনায় (নাকি লোকটাই ওকে ধরেছিল কে জানে!) একটু বিরক্ত হলেও চললাম তার সাথে। সে এক অটো ড্রাইভার। তার অটোয় উঠিয়ে টুক করে একটা বাঁক ঘুরিয়েই আমাদের এক ছোট্ট বিল্ডিং-এর সামনে নামিয়ে দিল। কেমন যেন একটা সন্দেহ হল। তাকে দাঁড় করিয়ে আমরা ঢুকলাম। বুকিং চাই সিমলিপালের। তারা বলল, এখান থেকে তো বুকিং হয় না, আপনাকে সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট বুকিং অফিসে যেতে হবে, যা কিছু আগে ছেড়ে আসা মূল রাস্তার উপরে। ওটা সম্ভবত ছিল উড়িষ্যা সরকারের বনদপ্তরের অন্য কোন অফিস। এমনিতেই সকাল থেকে জার্নি, তারপর এই, এবার রাগ গিয়ে পড়ল সেই অটোওয়ালা আর পান্ডের উপর। অটোকে পত্রপাট বিদেয় জানিয়ে, পান্ডে কেও খানিক দিলাম দুজনে, তারপর হাঁটা, খুঁজে বেড়ানো মূল বুকিং অফিস, শেষমেশ বড় রাস্তার উপর লাল বিল্ডিং। আমাদের আশা-ভরসা। বাস থেকে নেমে আমরা বারংবার চারদিক তাকিয়ে কোথাও ফরেস্ট খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এটা একটু ভাবাচ্ছিল, বইয়ে লেখা ছিল বারিপদা, সিমলিপালের একটা গেটওয়ে। ভাবলাম হয়তো কাছকাছিই কোথাও আছে বটে আমাদের স্বপ্নের সিমলিপালের গেট!   

ধীরে ধীরে ব্যাগপত্তর নিয়ে ঢুকলাম বিল্ডিং এর ভিতর। কিন্তু নিচের তলায় কাউকে খুঁজে না পেয়ে একটু ভয়ে ভয়েই সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে মুখ বাড়িয়ে দেখি এক ভদ্রলোক টেবিলে আলো করে। আহা! ঐ তো দেবদূত। দ্রুত পায়ে, আসতে পারি স্যার। কিন্তু লোকটা কিছু বুঝলো বলে মনে হলো না, কিছু অবোধ্য উড়িয়া শব্দ উড়ে এলো। আমরা হাঁ। এরপর দুপক্ষই বুঝলাম ভাষা কিছু জটিল বটে। তিনি ইংরেজিতে, আমরা বেঙ্গলী পোলাপান, বেংলিশে। বুকিং চাই। সিমলিপাল। কিন্তু ওখানকার বুকিংতো এখান থেকে হয় না। কি? আবার ইয়ার্কি! গাইড বুক খোলো । এই তো পরিষ্কার লেখা আছে। লোক বলে, হুম, সে হতো আগে, কিন্তু আপাতত বন্ধ। এবার কাকুতি মিনতি এবং গাড্ডায় গড়াগড়ি। কি হবে! লোক বলে, চিন্তা নেই, এখান থেকে যশিপুর চলে যান, ওখানেই বুকিং অফিস। তারপর কি যেন দয়া হলো, বললেন কিন্তু আগে থেকে বুকিং করেননি, শেষে যদি কাল বুকিং না পান! আমরা বলি সেকি মশাই, কাল কাল করছেন কেন আজই ঢুকব আমরা জঙ্গলে। হাসিতে অফিসারের গুঠকা পোড়া দাঁত । আরে ভাই বিকেল পাঁচটায় অফিস বন্ধ। ঠিক আছে দাড়াও আমি ব্যবস্থা করছি বলে, ফোন ঘুমলো, হ্যালো যশিপুর , আরে তিন উঠকো ছোকড়া, কাল বুকিং, হ্যাঁ ফাঁকা রেখো, আজ বিকেলে পৌঁছবে যশিপুর। আমরা বিগলিত, থ্যাঙ্কু, থ্যাঙ্কু। হটাত তিনি পিছন ডেকে বললেন, কিন্তু গাড়ি আছে তো তোমাদের? গাড়ি? সে আবার কি হবে? আমরা বাসেই চলে যাব যশিপুর। আরে না না, জঙ্গলে ঢুকতে তো গাড়ী লাগবে। আমরা তো আকাশ থেকে পড়ি আর কি! ধুর মশাই, পা থাকতে আবার গাড়ি কি হবে! জঙ্গলে তো পায়ে হেঁটেই ঘুরব বলে এতদূর আসা। কি জানি তিনি কি বুঝলেন, চুপ মেরে গেলেন, শুধু বললেন, যাও এই বাসস্ট্যান্ড থেকেই বাস পেয়ে যাবে, আর খেয়ে নিও কিছু।

তিনি খাওয়ার কথা মনে না করিয়ে দিলে, সত্যি বলছি, সকাল থেকে যে প্রায় কিছুই খাওয়া নেই সেকথা মনে পড়ত না। কারন তখন আমাদের ভেস্তে গেছে প্ল্যান। আজকে জঙ্গলে ঢুকে, কাল গোটা দিন থেকে পরশু ফিরত- এই হিসেবেই সব, মানিকড়ি-সব। এখন আজকের দিন গুবলেট মানে শুধু গুবলেট নয়, সঙ্গে এক রাত্রের হোটেলের এক্সট্রা খরচ, প্লাস বাস ভাড়া। যাইহোক ফিরে চললাম বাসস্ট্যান্ডে। পাওয়া গেল যশিপুরগামী বাসের টিকিট। এবার খাওয়ার পালা। ওখানেই এক ভাতের হোটেল। জম্পেশ ভীড়। ভাত এলো, উপরে হলুদ গোলা জল , কাঁচা আমড়া থেঁতো, সাথে অজানা জ্বরের মতো এক শাক ভাজা। সে এক অবাক ভাতপান বটে! উঠতি গরম ক্লান্তি আর চিন্তায় রগ ছিঁড়ছে। এরপর বাসের টানা সিটে টানটান তিনজন। কন্ডাক্টার জানালো, যশিপুর কম করে ঘণ্টা চারেক।  

বাস কিছুটা এগোতেই কিন্তু ক্লান্তি কিছু কম। চারপাশে এক অদ্ভূত রহস্যময়তা। দূরে দূরে ক্লান্ত রোদচটা সবুজ পাহাড়। পাশে অনন্ত নেমে যাওয়া খাদ। সবুজের এক অদ্ভূত সমারোহ। রাস্তা কখনও এই উঠছে তো নামছে। মজা পাচ্ছি। জানলার সিট নিয়ে ঝারপিট তিনজনে। এ কোন জায়গা? কে যেন বলে বাংরিপোশি। এই সেই বাংরিপোশি! ‘বাংরিপোশির দুরাত্তির’ পড়েছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। সে তো এক স্বপ্নরাজ্য। গোগ্রাসে গিলছি চারপাশ। মনে হচ্ছে পড়ে থাক সিমলিপাল, এখানেই ঝুলে যাই দুরাত। একটু পড়েই দেখতে পেলাম রাস্তার সেই বিখ্যাত বাঁকে কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া ঠাকুরীনি পাহাড়ের কনক দুর্গা বা বন বিবির মন্দির, যার থানে দক্ষিণা ফাঁকি দেওয়ার ভুল কোন গাড়ির চালক জেনে বুঝে করেন না। সে মনময় জায়গা একসময় চোখ আড়াল হলো। বাস চলেছে। পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে লু। এই প্রথম লু’এর সাথে পরিচয়। বোতলের পর বোতল জল শেষ। কিন্তু ঘাম নেই, ইয়ে নেই, যাচ্ছেটা কোথায় কে জানে! চোখ মুখ পুড়ে যাচ্ছে, চামড়া যেন সত্যি খুলে হাতে চলে আসবে। সিগ্রেটে বিতৃষ্ণা। গাড়ি থামলেই জল কিনতে হচ্ছে। ঝোপ বুঝে দামও চড়া। কিছুটা ঘুমোনোর চেষ্টা করি। ব্যর্থ। এভাবে আরো সময় কাটলে দেখি বাসের লোক কমে এসেছে। সামনের স্ক্রিন দিয়ে এক মনভোলানো দৃশ্য। দুপাশে ঘন সবুজ জঙ্গল। মাঝখান দিয়ে রাস্তাটা সাপের মতো এঁকে বেঁকে। কিন্তু অদ্ভূত ঢেউ খেলানো। আর মাঝে মধ্যে বাঁ দিকে জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে অনন্ত পাহাড়ের সমাহার। পড়ে জানলাম ঐ তো আসল সিমলিপাল, আমাদের গন্তব্য। আমার ক্লান্তি উধাও। উঠে এসে দাঁড়ালাম বাস ড্রাইভারের পাশে। বাকী রাস্তাটা ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, যতক্ষণ না বাসটা আমাদের ছোট্ট যশিপুর বাজারে নামিয়ে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেল।

যশিপুর একটা ছোট্ট লোকালয়। অনেকটা দূর দিয়ে পাহাড় ঘেরা। বাজারে গোনাগুন্তি কিছু দোকান। আমাদের বাসটা নামালো প্রায় পাঁচটার কাছাকাছি। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, আগে ফরেস্ট অফিসে একবার খোঁজ নিতে যাব। কিন্তু তিনজনেরই শরীরের যা অবস্থা তাতে চটজলদি একটা আস্তানা খোঁজাটাই প্রাওরিটি হয়ে দাঁড়াল। লটরপটর করতে করতে বাসটা যেদিকে চলে গেল, সেদিকেই মেইন রাস্তা ধরে ব্যাগ কাঁধে হাঁটা মারলাম। এবং কিছুটা গিয়ে এক পান দোকানে বাঙালি সুলভ আচরণ- একটা সিগ্রেট, তারপর হোটেল এবং জঙ্গল অফিসের খোঁজ খবর। আমাদের অবাক করে তারা সুদ্ধ বাংলায়-  জঙ্গল অফিস এখান থেকে কিলোমিটার দুয়েক দূর এবং এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এবং রাস্তার ওপারেই একটা হোটেল দেখা গেল। বেশ বড়সড়। হিসেবের পর হিসেব- হোটেল বলল, রুম মিলেগা, দুশো রুপিয়া, কিন্তু তিনজন হলে পঞ্চাশ বেশি। আমাদের চেষ্টা বিফল। পঞ্চাশের হিসেব আমাদের তখন অচেনা কালকের দিনের জন্য খুব জরুরি। আবার হাঁটা শুরু, চলছে জিজ্ঞাসা। বাসটা যেখানে নামিয়েছিল, ফিরে এলাম সেথায়। হোটেল এক আছে বটে- বৌদির হোটেল। দরদাম নট। তিনজনে দুইশো। জিও পাগলা। নিচে সেই কাকিমা থুড়ি বৌদির মুদিখানা দোকান, উপরে কয়েকখানা ঘর প্রান্থশালা। সাথে সাথে গিয়ে গ্যারেজ হলাম। উফ! এ যে কি পাওয়া যে জানে সেই শুধু জানে।

টানা দুটো চৌকিকে জোড়া লাগিয়ে থ্রি-বেড রুম। একটা ঘড়ঘড়ে টিভিও ছিল। আমরা ফ্রেস হয়ে রেস্ট। ততক্ষণে বাইরে অন্ধকার নেমেছে ভালোই। প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। পার্থ আর পান্ডে রাত্রে কিছু খেয়েছিল কিনা মনে পড়ছে না, কারন পান্ডের অলরেডি শরীর ব্যাগড়বাই শুরু করেছে। আমি ভেতো লোক। ভাত আমার চাই-ই। চললাম ভাতের খোঁজে, ও হ্যাঁ মনে পড়েছে পান্ডেও ছিল, আমাদের হোটেল থেকে বেরিয়েই পাশে একটা ভাতের হোটেল পাওয়া গেল। তস্য নোংরা। টিভি চলছে। লোকজন কেউই ভাত খাচ্ছে না হয়তো আরো গভীর রাতে খাবে- বেশিরভাগ লোকের হাতেই বিয়ার কিমবা দিশির বোতল। পান্ডের শরীরটা ভালো না থাকায় ও কেটে পড়ল, কিছু না খেয়েই। আমি বসেই আছি। মাছ ভাত এলো বেশ কিছু সময় পর। আসলে সে দিনটাতেই শনি লেগেছিল। দুপুরের সেই আমড়া থেঁতো তাও অনেক ভালো ছিল, কিন্তু ওরকম বালি মেশানো কিচমিচে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত এতদিনে আর কোথাও কপালে জোটেনি আর জোটাতেও চাইনা। তারপর আর কিছু আলোচনা করা বা ভাবার মতো ইচ্ছে ও শক্তি আমাদের মনে ও শরীরে ছিল না। একটা উড়িয়া চ্যানেলে কিছু ভিনগ্রহী শব্দের খবর শুনে আমরা নিন্দিয়ে পড়লাম। তখন যশিপুর এক অদ্ভূত মায়াবী দেশ।

নতুন জায়গাতে আরো অনেকের মতো আমারও ঘুম ঠিকঠাক হয়না, সে যতোই ক্লান্তি থাক। ভোর ভোর উঠে রুম থেকে বাইরে এসে মন জুড়িয়ে গেল। দূরে হালকা মেঘ ভেদ করে জেগে উঠছে পাহাড় চুড়ো। গরম ততটা নেই। যশিপুরে তখনও প্রাণচঞ্চলতা শুরু হয়নি। একে একে ফ্রেস হয়ে আমরা প্রথমেই চললাম ফরেস্ট অফিসে। হেঁটেই এগুলাম। লোকালয়টা পেরিয়ে যেতেই এক বাধানো সাঁকো। বেশ দূরে দুপাশে পাহাড়। শরীর বেশ তাজা। অফিসটা অনেক দূর। হাঁফিয়ে উঠে যখন সেখানে পৌঁছলাম, মূল রাস্তাকে দেখি দুধারে থেকে ঘিরে এগিয়ে গেছে সবুজের দল। এই তো চাই। রাস্তার বাঁ পাশে অফিস। আমরা গিয়ে বলতেই ফর্ম দিয়ে দিল। সব্বাই জঙ্গলে এন্ট্রি ফি’র স্টুডেন্ট কনশেসন চাই, কলেজ আই কার্ড আছে। ওরা আস্থা যোগায়, সব হবে। ফর্মটা ভরুন আগে। টুকটাক করে এগুচ্ছি, হটাত দেখি ফর্মে গাড়ির নম্বর, ড্রাইভারের নাম লিখতে বলা হয়েছে। এবার তো বেশ ঘাবড়ে গেলাম। আমরা বলি, আমাদের তো গাড়ি লাগবে না। শুনে লোকগুলোর সে কি হাসি। হাসি থামিয়ে শেষে বলল, গাড়ি নেবেন না তো যাবেন কিভাবে? এখান থেকে সবথেকে কাছের যে বনবাংলো সেটাও প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। আমাদের তো বনজঙ্গল মাথায় ভেঙ্গে পড়ে আর কি! বলি আপনাদের দপ্তরের নিজস্ব গাড়ি নেই? হ্যাঁ, তাও ভি আছে, কিন্তু সে গাড়ি আজ অলরেডি বুকড। এখন উপায়? তারাই আবার ত্রাতার ভূমিকায়। কারে যেন ফোন ঘুমিয়ে ডেকে নিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হাজির এক গাড়ি উইথ ড্রাইভার। পরিচয় পর্ব শেষে, সে বলল, নাইট স্টে তো, ওয়ান নাইট, দু হাজার দেবেন। আমাদের পরিস্থিতিটা আপনারাই এবার কল্পনা করে নিন। বেড়িয়েছিলাম মোট হাজার তিনেক নিয়ে। তার মধ্যে খরচও হয়েছে বেশ কিছু। তাহলে কি আর জঙ্গলে ঢোকা হবে না? যশিপুর থেকেই বিদেয়? আমরা ড্রাইভারকে সাইড করে আলোচনায় বসলাম। কিছুই বুঝতে পারি না। শেষতক মনে হল, যেহেতু ফান্দে পড়েছি তাই এরা এত ভাড়া হাঁকছে। আমরা বাজারে গিয়ে খোঁজ নেব। নিশ্চই এর কমে গাড়ি পেয়েই যাব। অফিসে বললাম ফর্মটা রাখুন আমরা একটু পড়ে আসছি, আবার বাজারের দিকে হাঁটা। সেই ড্রাইভার কিন্তু পিছু ছাড়ল না। নিজেই দর কমাতে শুরু করেছে। ১৭০০ এর নিচে হবে আর হবে না। তারপর বলল, চলুন আমি গাড়িতে ছেড়ে দিচ্ছি বাজারে, পয়সা লাগবে না। আমরাও নাছড়বান্দা, অচেনা লোকের থেকে বিনে পয়সায় কিছু নিতে নেই, আর আমাদের পকেটে টান আছে, তাই সে পাশে পাশে গাড়ি নিয়ে চললেও, গাড়িতে উঠলুম না। সে বেড়িয়ে গেল আগে আগে। বাজারের আগেই বেশ কিছু গাড়ি পেলাম এক স্ট্যান্ডে। জিজ্ঞাসা করতেই অদ্ভূত ভাবে সবাই ১৭০০ হাঁকতে লাগল। দরদামের কোন অপশন নাই। যেন কেউই যেতে চায় না। কি জায়গা রে বাবা ! আমরা একে অপরকে দুষছি, কেন বেশি করে টাকা আনিস নি? কিন্তু আনবই বাঁ কোত্থেকে ! মাথা আর কাউরির কাজ করছে না। ফিরে চলেছি আবার হোটেলে। যদি কিছু ব্যবস্থা হোটেল মালকিন করতে পারে কমে। ফিরে গিয়ে সব বলতেই হোটেলের কর্মচারী ছেলেটি বলল, আরে বাবা এই ব্যাপার! আগে বলবে তো, দাঁড়াও এখুনি ইকবালকে ডাকছি। ওর চেয়ে কমে আর কেউ করতে পারবে না এখানে। আমরা গভীর অপেক্ষায়। সময় যেন কাটে না। প্রায় মিনিট দশেক পর আমাদের সামনে এসে ব্রেক মারল গাড়িটা। যে নেমে এলো ড্রাইভারের সিট থেকে তাকে আমরা অলরেডি চিনে ফেলেছি। একটু আগেই ফরেস্ট অফিস থেকে আমাদের জন্যে তাকেই ডেকে পাঠিয়েছিল। একটু আগে সেই লোকটাই ফ্রিতে বাজারে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। এই সেই ইকবাল! এর রেট-ই সবথেকে কম! হায় রে! এবার যাব কোথায়! সিমলিপাল কি এবারের মতো দিল্লীকা লাড্ডু হয়েই থেকে যাবে আমাদের কাছে?

সিমলিপালের অবস্থান উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ জেলায়। মূলত সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভ অংশটি (প্রায় ২৭৫০ বর্গ কিমি) ময়ূরভঞ্জ এলিফ্যান্ট রিজার্ভের তিনটি অংশের একটি। সিমলিপাল আগে ছিল  ময়ূরভঞ্জের রাজাদের মৃগয়াভূমি। উড়িষ্যা সরকার ১৯৭৯ সালে এটাকে প্রথম ওয়াইল্ডলাইফ স্যানচুয়ারি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৮০ তে এটি ন্যাশানাল পার্কের মর্যাদা পায়। এরিয়া বাড়তে থাকে এবং ১৯৯৪ এ ভারত সরকার একে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণা করার পর উইনেস্কো ২০০৯ সালে তাদের বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ- এর তালিকায় এর নাম তোলে। জোরান্ডা ও বরেহিপানি ঝর্ণা ছাড়াও রয়েছে চাহালার মতো কোর এরিয়া। সরকারি বাংলো আছে কিছু, জঙ্গলে রাত কাটানোর। বিভিন্ন প্রকার গাছ, প্রায় ৮০ টি রয়্যাল বেঙ্গল, হাতির পাল অনান্য পশুপাখি এবং হো, সাঁওতাল প্রজাতির বসবাস এই জঙ্গলে। সিমলিপাল নাম টা এসেছে এই জঙ্গলে শিমুল গাছের আধিক্যের জন্য। জঙ্গলে সকালে ঢুকে বিকেলে বেড়িয়ে আসা যায় পারমিট নিয়ে আবার রাত্রিবাস ও করা যায় বুকিং নিয়ে, গাড়ি কিন্তু সবক্ষেত্রেই প্রয়োজন, নিজের বা ভাড়ার। এই জঙ্গলে প্রবেশের পথ গুলোর মধ্যে মূলত পরিচিত দুটি। একটি বারিপদা হয়ে, আর একটি জশিপুর। যে জশিপুরে এক সকালে আমরা দাঁড়িয়ে আছি ফাঁদে পড়ে।

       ইকবাল গাড়ি থেকে নেমে আমাদের দিকে তাকিয়ে, আমরা ওর দিকে। প্রাথমিক অবস্থা কাটিয়ে সে বলে,  আরে দাদা বললাম তো আমিই সবথেকে কমে দিতে পারি এখানে। আমরা নাছোড়। টাকার ব্যাপারটা লুকিয়ে, বারগেনিং, কিছু যদি সামান্য কমে! শেষমেশ গাড়ির মালিককে ফোন, কিন্তু লাভ হল না কিছুই। সেই ১৭০০। আমরা ঠিক করলাম, নৌকো যখন একবার ঘাট থেকে ছেড়েইছি, আর বেশি মাথা খারাপ করে লাভ কি! চলো, ডান। জো হোগা দেখা জায়েগা। ইকবাল বলে, বুকিং করে এসেছেন তো ? নাতো! সেতো তখন গাড়িই ছিল না। ও বলে থাকবেন কোথায়? আমরা সেসব জানিনা, জঙ্গলের মধ্যে থাকলেই হল। তাহলে চাহালা’তেই থাকুন, ওটা কোর এরিয়া, জন্তু দেখা যাবে। কিন্তু বুকিং করেননি এখনও, এতক্ষনে না বুক হয়ে যায়!- বলে নিজেই ফোন লাগালো, উড়ে কথাবার্তা- বাংলা তর্জমা- বুকিং রাখো, আমরা আসছি, চাহালা তে চিতল ভিলা। আহা! নাম শুনেই প্রাণ জুড়োয়। চিতল ভিলা! গাড়ি করে আমরা আবার ফরেস্ট অফিস পথে। মন ফুরফুরে। সিগ্রেটে আগুন। চলতে চলতে ইকবাল বলে, (বাংলাটা ভালোই বলে, নাহলে যে কি অবস্থা হতো সে ভগাই জানে!) জলদি করবেন, আমরা এখান থেকে ৯ টার মধ্যে বেরুব, তাহলে  বরেহিপানি ফলস হয়ে চাহালা প্রায় বিকেলের মধ্যেই পৌঁছে যাব। আমরা তো ভেবেই আকুল, সারাদিন চলবোই তো জঙ্গলে হাঁটব কখন! কিন্তু ড্রাইভারের এর পরের কথা গুলো আমাদের ঘুম ছুটিয়ে দিল- দুপুরের খাবার রুটি তড়কা, প্রায় বারো লিটার জল, রাতের চাল ডাল মশলা সবজি সব নিতে হবে। হে প্রিয়ে, এবার যাই কোথা! কি বলে এ লোক! আরে দাদা আমরা মেস ‘শাবক’, আমাদের জল কিনতে হয় না আমরা সব জল খেতে পারি, আর রাত্রে বন বাংলোর হোটেলেই খেয়ে নেব? ইকবাল এবার আমাদের বয়স ও পালস আন্দাজ করে আপনি থেকে তুমিতে, তোমরা কি এমনি এমনিই বেড়িয়ে পড়েছো? কিছুই কি জানো না? জঙ্গলে আবার খাবার হোটেল কোথা? রান্না করার কেয়ারটেকার আছে, কিন্তু মাল মশলা তুলতে হবে। আর খাওয়ার জল, মানে ওখানকার পাতকুয়োর জল খেলে আর দেখতে হবে না, দেখে তো ভদ্রঘরের লোক বলেই মনে হচ্ছে। কথা স্টপ, সামনে অফিস।

       স্টুডেন্ট কনসেশন আদায় করে দ্রুত ফর্ম ফিলাপ, সাথে জঙ্গলে ডু আর নট টু ডু এর লিফলেট। ইকবাল তখন রুটি তড়কার দোকানে। সেসব নিয়ে আবার ফিরে আসছি বৌদির প্ল্যাটফর্মে। হিসেবে দেখলাম তড়কার দোকানদার পঞ্চাশ টাকা কম নিয়েছে ভুল করে। মন খুশ। সততা তখন আমাদের কাছে এক জঘন্য পাপ। বৌদিকে টাকা মিটিয়ে জলের বোতল তুলে মুদিখানায়। দেখি ইকবাল নেমে গিয়ে মুরগী কাটাচ্ছে, আরে ভাই মুরগী কি হবে? জঙ্গলে তো মাংস রান্না করা বারন, লিফলেটে লেখা আছে ? সে বলে, কেয়ারটেকার আমার বন্ধু, কোন চিন্তা নেই। চিন্তা নেই বললেই হল, মুরগীর পয়সা কি আকাশ থেকে আসবে?- বলতে পারলুম না, বরং তিনজনে গাড়িতে ঢুকে কান্নাকাটি। ইকবাল মুদিখানায়। অলরেডি চিতল ভিলা নিয়েছে ৬০০ প্লাস এন্ট্রি ফি। জল, মশলা, মাংস- আমরা তিনজনকেই নিজেরাই বলি, কি আছে আর হাজারের বাইরে বার কর। শেষতক ঝামেলা, এক এক করে একশ, দুশ বেরুলো চোরা পকেট থেকে। সব মিলিয়ে পান্ডের হিসেবের পর হিসেব, দেখা গেলো সব শেষ করে আমাদের থাকবে শ’দুয়েক। তাতে কাল সকাল থেকে শুধু জল খেয়ে থাকলেও ফেরা অসম্ভব। জানি না কি হবে। মাথা হ্যাং। ফুর্তি উবে যাচ্ছে। মনকে বোঝাচ্ছি সময়কে এগুতে দাও, কিন্তু মন কি সহজে বোঝে গো! হাটবাজার শেষে গাড়ি এসে থামল বাজারের একমাত্র ফরেন লিকার অফ সপে, একিরে বাবা, আমরা তো কিছু বলিনি!? ড্রাইভার গিয়ে কাউন্টার থেকে কিনল কিছু, এর দামও কি আমাদের মেটাতে হবে নাকি? চিন্তায় আছি। নিজেদেরও একটু ছুকছুক করছিল, নেবো নাকি? হবে গোটা ষাট টাকা এক্সট্রা? জয় তারা, ব্যোম তারা! না, ড্রাইভারের ওটার দাম আমাদের মেটাতে হয় নি, অবশ্য ওটা ইকবালের ছিলও না।

       কিছু খেতে হবে। বাজারে একটা বড় জলখাবারের দোকান থেকে আলুর তড়কারি সহযোগে ফুলুরি খাওয়া গেল। ন’টা বাজে গাড়ি গড়াল। গাড়িটা কিন্তু বেশ বড়। ড্রাইভার ছাড়াও আরামে আট জন বসা যাবে। সেখানে তিনজন। আমি সামনে, পান্ডে আর পার্থ পিছনে, তার পিছন সিটগুলো ফাঁকা, জলের বোতল গড়াচ্ছে। জশিপুর বাজার ছেড়ে বেড়িয়েছি, দোকান পাট কমতে কমতে খালি হল, মাটির রাস্তা, পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কিছু আদিবাসী মহিলা। হটাত ইকবাল গাড়ি থামিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করল, গাড়ি তো খালিই, এদের তুলে নেব? মানে এদের গ্রাম সেই জঙ্গলের ভিতরেই, এখানে হাট করতে এসেছিল, এখন কিলোমিটার বিশেক হেঁটেই যাবে, তুলে নেব? নিয়ে নাও, পিছনের সিট তো খালিই আছে। একটু ইতস্তত করে চারজন মহিলা উঠে পড়লেন। গাড়ি ছুটল এবার। বেশ কিছুটা গিয়ে প্রথম চেকপোস্ট, টিকিট-উকিট দেখিয়ে কিছুটা গড়িয়েই দাঁড়াল গাড়ি। এই জঙ্গলে কে আবার এক বিশাল গণেশ মন্দির ও সংলগ্ন বাগান বানিয়েছে, দেখে এসো। গেলাম, ফিরলাম, চলছি। ক্রমশ চড়াই ভাঙছে, পাহাড়ি লাল ধুলোর পথ, পাহাড় চড়ছি, চলার উঁচু হয়ে যাওয়া রাস্তা টুকু বাদ দিলে একদিকে জঙ্গলে ভর্তি খাদ, অন্য দিকে টানা গাছে ভর্তি উঠে যাওয়া পাহাড়। মাঝে সাজে দু একজন আদিবাসী সাইকেলে পাশ কাটাচ্ছে। পিছনের সেই আদিবাসী মহিলারা প্রায় নিশ্চুপ। এখন মন কিছুটা ভালো লাগছে। কি হবে সেসব ভাবনা মাথা থেকে অল্প অল্প করে ভ্যানিশ হচ্ছে।

       সত্যি বলতে কি এই খারাপ সময়ের মধ্যেও আমরা ড্রাইভারটি পেয়েছিলাম জবরদস্ত। ইকবাল নিজের পরিচয়ে আমাদের বলেছিল, মু জঙ্গল কা বস আছি। এখনও কানে বাজে তার সে কথা। সিমলিপালের এক এক জায়গায় এক এক রূপ। পাহাড়ে ওঠার সময় একরকম, পাহাড়ি মাথায় সমতলে অন্য, ঝর্নায় আলাদা আবার চাহালায় মনমাতানো ও ভয়ধরানো আদিম অনুভূতি। এই এগিয়ে যাওয়া রাস্তায় মাঝে মাঝে কয়েকটি ঘর নিয়ে আদিবাসী গ্রাম, ছোট জায়গায় চাষবাসও চলছে। আমরা একসময় এরকম একটি গ্রামের পাশে এসে হাজির হলাম, যেখানে ঐ মহিলারা নেমে গেলেন। ইকবাল বলল, আজ এখানে হাট। আমি তো লাফিয়ে, চলো ঘুরে আসি। ছোট্ট একটি সমতলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের কয়েকটি অস্থায়ী দোকান। সেখানে আছে তেলেভাজা, মিষ্টি, সবজি, মশলা, হাঁড়িকড়াই, গামছা, জামা কাপড়, হাঁড়িয়া এইসব। একথা আপনাদের বলা ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে বলেই ফেলি, কারন লুকোনোর তো কিছুই নেই গল্প করতে বসে-  ড্রাইভারকে কানে কানে বলে রেখেছিলাম, প্রথম একটু হাঁড়িয়া খাওয়ার সাধ। পান্ডের তখন গতকালের লু খেয়ে শরীরের উত্তাপ বেড়েছে, তাই আমি আর পার্থ। ইকবাল আমাদের জায়গাটা দেখিয়ে দিল। হাটের পিছন দিকটাই অস্থানা ছাউনির তলায় পর পর কিছু মেয়ে বসে আছে একটা দুটো করে বিরাট বিরাট অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি নিয়ে। আমরা যার কাছে দাঁড়ালাম, সেখানে দুটো দশ-বারো বছরের মেয়ে। আমরা শহুরে মানুষ যতটা নাক সিটকব এসব ব্যাপারে, ওদের কাছে কিন্তু সেসব নয়। হাঁড়িয়া ওদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। যাইহোক, আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম কয়েক মুহূর্ত, তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, পাতি বাংলায়, হাঁড়িয়া কত করে? (ছোটবেলা থেকেই শেখা যে কিছু কেনার আগে দরদাম করতে হয়!) মেয়েগুলো কোন উত্তর দিল না। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, এবার তারা একে অপরের গায়ে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে প্রায়। আমরা ভ্যাবাচ্যাকা। কি করি রে বাবা! আবার ইকবালকে ডাক, সে এসে কিসব ভাষায় কি বলল, তারপর একটা মেয়ে উঠে একটা হাঁড়ির ঢাকনা খুলে দিল। সে এক দৃশ্য বটে! সাদা ধবধবে এক থকেথকে পদার্থ, মাঝে মাঝে এক দু ডানা কালো কালো ভাতের গুড়ো। গা’টা গুলিয়ে উঠল। কিন্তু খাবই। মেয়েটা একটা বড় বাটি চুবিয়ে তুলে ধরে দিল আমার সামনে। আমি তো লাফিয়ে উঠে ইকবাল কে বলি, আরে কি করছে, একটা গ্লাসে দিতে বল, আর এতটা না। সেটা ভাগ হল দুটো গ্লাসে, আমি এক ঢোকে মারলাম। তারিয়ে তারিয়ে খাওয়ার কোন উপায় নেই। গন্ধ আর রূপে সে ভোলাবে না! এরপর আবার কি মনে হওয়ায় পান্ডে নেমে এলো, ওর সাথেও খেলুম আর এক গ্লাস। আচ্ছা কত দেব? দাম শুনলে ভিরমি খাবেন, আমাদের মতোই। দুটাকা। এও কি সম্ভব! দু’ টাকার বিনিময়ে সেদিন আমাদের শরীর অন্তত অনেকটাই সুস্থ ছিল। না , এত কম খেলে নেশা ফেশা কিছু হবার লয়। বরং শরীরটা ঠাণ্ডা ছিল এই গরমে- এটা পান্ডের বক্তব্য।

       চলুন আর সময় নষ্ট না করে আমরা এগিয়ে যাই এই পাহাড়ি সমতলে। কিছুদূর পুরো সমতল। দূরে চারদিকে পাহাড় ঘেরা জঙ্গল। চাষবাস হচ্ছে কোথাও। এভাবে পেরুচ্ছি ঘন জঙ্গল, আবার ফাঁকা সমতল। এক জায়গায় গাড়ি থামালাম। একটা পাহাড়ি স্রোত বয়ে যাচ্ছে ঘন জঙ্গুলে রাস্তা। পান্ডে উঠে পড়ল গাড়ির ছাদে। ছবি উঠল (ক্যামেরা ছিল দুটো, আমার আড়াই হাজারি চিনা ডিজিটাল আর পার্থ’র ফিল্ম ভরা। ফলে সব ছবি আমার কাছে নেই।) এভাবে চলতে চলতে একসময় পাহাড়ি জঙ্গলে কিছুটা ঘোরানো পথে নামছি, এসে হটাত চোখের সামনে এক অপূর্ব দৃশ্য, বরেহিপানি ফলস। গাড়ি দাঁড়াল। এখন প্রায় মাঝ দুপুর, এখানে লাঞ্চ হবে, রুটি তড়কা। বরেহিপানির ফরেস্ট অফিসের সামনেই ফরেস্ট বাংলো, আর সামনে পাহাড় শেষ হয়ে নেমে গেছে গভীরতর খাদ, ওপাশে কিছু দূরের পাহাড় শুরু, সেখান থেকে নেমে আসছে তখনকার ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম ফসলের জলধারা, খাদের অন্ধকারে যেখান থেকে তৈরী হচ্ছে বুড়িবালাম। বরেহিপানি আপনাকে মোহিত করে দেবে। কোথায় যেতে দেবে না আর। নিস্তব্ধতা, নির্জনতা কাকে বলে এখানে আসলে বোঝা যায়। এখানে হাতিদের খুব উৎপাত। এই বনবাংলোটি সেই কারনেই উঁচু উঁচু শালের থাম্বার উপর দাঁড়িয়ে। মাঝে মধ্যেই নাকি এর নীচে হাতি এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হল, এখানে থাকলেই ভালো হত। এর মধ্যে আমরা পেতে শুরু করেছি ইকবালের পরিচিতি। সে ফরেস্ট অফিসে গিয়ে, কর্মচারীদের কাছ থেকে থালা নিয়ে পেঁয়াজ কাটতে বসে গেছে। আমরাও গাড়ি থেকে খাবার, জল বার করে নিয়ে বসলাম হাত পা ছড়িয়ে। মন থেকে টাকাপয়সার চিন্তা কিছুটা উবেই গেছে। এই জার্নিতে রুটি তড়কার পরিস্থিতিও কিছুটা আমাদের মতো-বিক্ষিপ্ত। বেশ কিছুক্ষন সেই দৃশ্য উপভোগ করে আবার রওয়ানা। ইকবাল বলল, চাহালা তোমাদের বরেহিপানির কথা ভুলিয়ে দেবে।

       আবার পাহাড়ি পথ। নির্জনতা আর ঘোর জঙ্গল। এবার জঙ্গলের চরিত্রে বদল ঘটছে। আর ফাঁকা স্থান নেই, দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে লাল মাটির পথ। কোথাও কোথাও রাস্তা খুব মুশকিলের, ভাঙ্গা চোরা, পাশে খাদ। আমরা উৎসুক দৃষ্টি রাখছি বাইরে। গা ছমছম। কোথাও নিচু হয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও ঘুরে ঘুরে পথ উঠছে। ইকবাল বলল, আমরা কিন্তু মূল জায়গায় ঢুকছি। চারপাশে খেয়াল রেখো আর আমি গড়ান দেখে স্টার্ট বন্ধ করে দেবো, ইঞ্জিনের শব্দ থাকবে না, তখন যদি কিছু দেখতে পাও। আমরা উত্তেজনায়। হটাত বন্ধ হল ইঞ্জিন, তিনজোড়া চোখ জঙ্গলের গভীরে, উফ, সে অনুভূতি এভাবে লিখে বোঝানো আমার সাধ্যি নয়। না কিছুই সেরকম আমরা দেখতে পাই নি তখন কয়েকটা হনুমান ছাড়া, এতে কোন খেদ নেই কারন আমরা তিনজনেই জঙ্গলে পশুপাখি দেখতে যাইনি, গেছি জঙ্গলকে অনুভব করতে। এভাবে চলতে চলতে প্রায় বিকেল চারটে নাগাদ আমরা চাহালার ফরেস্ট বাংলো গুলো থেকে শ’খানেক ফুটের দূরত্বে আবার থামলাম। চারপাশে তাকিয়ে আছি। আমি বললাম, নামি একটু? কারন সামনেই তো বাংলো দেখাই যাচ্ছে। জঙ্গলের আশে পাশে কয়েকটা সরু রাস্তাও দেখা যাচ্ছে যেগুলোর সামনে নো এন্ট্রির বোর্ড ঝোলানো। কিন্তু ইকবাল আমায় নামতে দিল না, তার কথা, এটা জঙ্গল, এখানে কোন মুহূর্তে কি হবে কেউ জানেনা, কোথায় কে কার জন্য ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে কেউ বলতে পারে না। এগুলাম আবার। বহু বছর আগের কাটা পরিখা পেরিয়ে গাড়ি ঢুকল চাহালা বনবাংলোর এরিয়ায়। মন জুড়িয়ে এলো।

        গাছের গায়ে সাদা কালো রঙের পোঁচ দেখে চিনতে হয় জঙ্গলের কোর এরিয়া সেটা ইকবালই শিখিয়েছিল। চাহালায় তিনটি ভিলা। আমাদের বুক করা চিতল ভিলা ছাড়া একই রকম একটি এবং একটি ভিআইপি ভিলা। এছাড়া ফরেস্ট অফিসার ও কর্মীদের থাকার জন্য দুটি। একটি ওয়াচ টাওয়ার। আর সামনে পরিষ্কার একটি বিশাল সল্টলেক, যেখানে পশুরা নুন চাটতে আসে, তারপর উঠে গেছে গভীর জঙ্গল। এখানে ময়ূরভঞ্জের রাজাদের লাগানো ইউক্যালিপটাস গাছগুলো পরিবেশকে মায়াময় করে তুলেছে। কারেন্ট ফারেন্টের বালাই নেই। ভিআইপি বাংলো এবং রেঞ্জারের ঘরে সোলার সিস্টেম আছে শুধু। আমরা ছাড়া সেসময় ট্যুরিস্ট বলতে দিনের দিন ঘুরে ফিরে যাওয়ার একটা পার্টি, আর অন্য ভিলাটি বুক করা উড়িষ্যার এক পুলিশ আধিকারিক। আমাদের বুকিং কাগজপত্র ইকবাল দেখালো। রেঞ্জার তো অবাক। তিনজন মাত্র। এরা বুক করেছে চিতল ভিলা। ইকবাল বলে, এদের কোন ঠিক ঠিকানা নেই, কিছুই জানে না, হটাত বেড়িয়ে পড়েছে এখানে। সে আমাদের হয়ে একরাতের ব্যাপার বলে ভিআইপি বাংলোটা পাওয়ার একটা বৃথা চেষ্টাও চালিয়েছিল। এরপর দেখলাম ভেট দিল সেই জশিপুর অফ সপ থেকে কিনে আনা বোতলটি। আসলে চিতল ভিলা হল দুটি প্রমান সাইজ ঘর , বারান্দা ও দুটি টয়লেট মিলে একটি ভিলা। প্রত্যেক ঘরে চারটি করে বেড। তাই রেঞ্জার ওরকম একটু অবাক হয়েছিলেন। যাইহোক, চলে এলো আমাদের কেয়ারটেকার কাঁপতে কাঁপতে। জিজ্ঞাসা করে জানি, একটু ম্যালোরি হয়েছে। এ তো হরবখত হচ্ছে। বাবা রে! আমরা ঘরে ঢুকেই আগে জ্বালালাম মশার ধুপ। ঠিক হল একটি ঘরে আমরা তিনজন, অন্যটিতে ড্রাইভার আর তার দোস্ত কেয়ারটেকার। পরিপাটি করে পাতা চারটি বিছানা, উইথ মশারি, এবং মোটা গায়ে দেবার কম্বল। আরে ভাই কম্বল কি হবে কে জানে! উড়িষ্যায় তখন ৪০ ডিগ্রী চলছে। তবে গরমটা কিন্তু আর সেরাম কিছুই মালুম হচ্ছিল না। আমাদের সারা গা হাত পা ধুলো।  মালপত্র নামানোর পর একে একে ফ্রেস হলাম। বাথরুমে কুয়ো থেকে জল তোলা থাকে ড্রামে। আমরা এসে বসলাম বাংলোর বাইরে চেয়ারে। চা এলো (সব মাল কিন্তু আমরাই বয়ে নিয়ে গেছি) , গল্প শুনি যে কাঁঠাল গাছের নিচে আমরা বসে আছি, সেখানে পরশু রাতে হাতী দাঁড়িয়ে ছিল সারারাত। এরপর লুকিয়ে মাংসটা নিয়ে কেয়ারটেকার চলে গেল পাশের রান্নাঘরে। আমরা একটু ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। ওয়াচ টাওয়ারে উঠলাম। ওপাশের সেই নোনতা জায়গায় তখন অজস্র হরিণ আর ময়ূর। আকাশের রং বদলাচ্ছে দ্রুত। খুব ভালো লাগছিল, এতটা জার্নির পুরস্কার। চারপাশে গভীর উঠে যাওয়া গাছগাছালি। মধ্যে জগত বিচ্ছিন্ন আমরা, না আছে মোবাইল টাওয়ার, না আছে কারেন্ট না অন্যকিছু। ছবি তুলি, ঘুরি জায়গাটা। 

       এবার এসে ঘরে বসলাম। তারপর ফিরে এলো কালকের চিন্তা। শেষে ঠিক করলাম, চলো ইকবালকে বলি, যদি কোন রাস্তা বার হয়! ইকবালকে ডাকা হল, ইসস্তত ভাব কাটিয়ে বলে ফেললাম যে , আমাদের ফেরার টাকা নেই। প্রথমে সে ঘাবড়ে গেল, তারপর একটু চিন্তিত, গাড়ির ভাড়া আছে তো? হ্যাঁ বলায় এবার সে মনমরা, কারনটা বুঝি,  আসলে তার বকশিস পাবেনা। কিন্তু পরক্ষনেই বলল, চিন্তা নেই, আমার মালিক খুব নামকরা মানুষ জশিপুরের, কোলকাতাতে যাতায়াত, কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে। আমরা কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম, তবে পুরোটা নয়। এরপর বাংলোর সামনে বসে থাকতে থাকতে অন্ধকার নেমে আসছে, ঘরে জ্বলে উঠল হ্যারিকেন, ছোটবেলার স্মৃতিকে মনে পড়িয়ে দিয়ে। পান্ডের জ্বর এসেছে, ওষুধ খেয়ে ও শুয়ে আছে। আমরা বাইরে বসে। জঙ্গলে পুরো অন্ধকার। রান্নাঘর থেকে মাংসের গন্ধ আসছে। ফরেস্ট রেঞ্জারকে দুটো সিগ্রেট ঘুষ দিয়ে বাকীটা আমরা ফুঁকছি। এমন সময় হটাত ইকবাল ঝড়ের মতো এসে বলল, তাড়াতাড়ি এসো, হাতী দেখিয়ে আনি। পান্ডেও লাফ মেরে উঠে বসে তিনজনে সটান গাড়িতে। চারপাশ অন্ধকার, মাথা টাল খাচ্ছে (মাথার কোন দোষ ছিল না, সঙ্গত কারনেই হয়েছে), কিছুই ঠাহর পাই না। বুঝলাম ঐ চৌহদ্দির মধ্যেই ভিআইপি বাংলোর পাশে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে ইকবাল আমাদের এক মাটির তলার ঘরে নিয়ে এলো। এ ঘর সল্টলেকে জন্তু দেখার জন্য বানানো। এখানে দাঁড়ালে, মাটির উপরে তৈরী করা ফাঁক দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু ঐ অন্ধকারে কিছুই দেখা হল না, আসলে পরে জানলাম ততক্ষণে ফিরে গেছে হাতির পাল। আবার ফিরে আসা, কিন্তু সাথে ইকবালের লোভনীয় অফার, নাইট সাফারি করবে? উরিব্বাবা! আমরা দ্রুত রেডি, ড্রাইভার রেঞ্জারের কাছে পারমিশনে। হাত পা কাঁপছে উত্তেজনায়। গাড়ি ছাড়ল। এগুচ্ছি। চারপাশ প্রচন্ড কালো। শুধু হেড লাইটের আলোয় যা বোঝা যায়। বেশ অনেকটা ধীরে ধীরে এসেও কিছুই চোখে পড়ল না, কিন্তু সে না পড়ুক, এই অভিজ্ঞতাই তো দরকার। এবার ইকবাল গাড়ি লাগাল আর এক ছোট্ট এক কামরার ফরেস্ট অফিসের গায়ে। সেখানে চারপাশে এক বিরাট গভীর পরিখা। অফিসে মাত্র দুটি লোক, একটি টিমটিমিয়ে জ্বলছে সৌরবাতি। একজন একটা কাঠের পাথাতন পেতে দিল, আমরা ঢুকলে আবার তা উঠিয়ে নেওয়া হল। এরা ইকবালের চেনা। বসলাম তাদের সাথে। উড়িয়ে বাংলা মিশিয়ে গপ্পো। এই অফিসের সামনেও একটা ছোট্ট নুনক্ষেত। আর এই গভীর পরিখা, হাতদের হাত থেকে বাঁচার উপায়। আমি অফিসারকে অনুরোধ করলাম তার দেখা কিছু রোমহর্ষক ঘটনা বলার জন্য। আমরা শুনছি, হাতী-বাঘের লড়াই, শুনছি তার নিজের চোখে দেখা এই নুনক্ষেতে বাঘের শিকার ধরার কথা। আচ্ছা কখনও ভূত দেখেননি? শুরু হল ইকবালের ভূতের গল্প। আজ সেসব মনে পড়লে হাসি পাচ্ছে, কী ছেলেভুলোনো গল্প ছিল সেসব, কিন্তু ঐ পরিবেশ ছিল ওসবের উপযুক্ত, আমাদের ঘাম শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেছিল তখন। গল্প চলছে, মাঝে মাঝে পিছন ঘুরে দেখছি হাতী ফাতি তাড়া করল কিনা। এমন সময় দেখি অফিসের অন্য ছেলেটি মাঝে মাঝে লম্বা নাক টানছে এবং উড়ে ভাষায় কিসব বলল ইকবালকে। ইকবাল গল্প থামিয়ে লাফিয়ে উঠল, চলো তাড়াতাড়ি, হাতী বেড়িয়েছে। আমরাও এক লাফে কাঠের পাটাতন পেরিয়ে গাড়িয়ে। রোমকূপ সব খাঁড়া হয়ে গেছে। বাতাসের গন্ধ শুঁকে কেউ হাতির আগমনবার্তা দিচ্ছে, ভাবতেই পারছি না। গাড়ি গড়াচ্ছে অন্যরাস্তায়। আমরা সিঁটিয়ে বসে আছে, বাইরে চোখ। ইকবাল দেখাচ্ছে হেডলাইটের আলোয় ঐ দেখ, ছোট ছোট গাছ ভেঙ্গে আছে, মানে হাতী সামনে। ও বলে, সার্চ লাইট দাও। আমরা এভারেডি টর্চ বার করলে, একটু খেপেই যায়, এই নিয়ে নাইট সাফারি করতে এসেছো!? আমাকে যদি প্রথমেই বলতে আমি তাহলে বাড়ি থেকে সার্চলাইট নিয়ে আসতাম! তাও ঐ আলোতেই জঙ্গলে খোঁজা খুঁজি চলছে। হাতী মনে হয় ভাগলবা। আমরা বেশ ভয়ে আছি, সত্যিই যদি একটা হাতী এখন এসে পড়ে রাস্তায়? হটাত সে গাড়ির মোড় ঘুরিয়ে নিচ্ছে, মূল রাস্তা থেকে এক সংকীর্ণ জঙ্গুলে পথে। আমরা তিনজনেই একটু ভয় পেয়ে গেলাম। পান্ডেদের সিটের পাশের একটা জানলার কাঁচ ভাঙ্গা। আর এটা কোর এরিয়া। ফলে হাতী যদিও চলে গিয়ে থাকুক, বাঘ তো থাকেতেই পারে। এবং সেটা যে কোন জায়গায় থাকতে পারে। আমাদের সাহস আর কুলোলো না। বললাম, দরকার নেই ফিরে চলো। ইকবাল মেনেও নিল। ফিরে আসছি, কয়েক মিটার সবে এগিয়েছি, হটাত থমকে দাঁড়াল গাড়ি, রাস্তার মাঝখানে হেডলাইটের আলোয় জ্বলজ্বল করছে রাস্তা ব্লক করে বসে থাকা এক প্যাঁচার চোখ।

একটা সাধারন পেঁচা যাকে দিনের বেলা দেখলে আমরা বীরপুরুষ, কিন্তু ওই পরিবেশ, একটু আগেই হাতির পালের ভেঙ্গে যাওয়া ডালপালা, ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে লাফ মেরে বাঘে তুলে নিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এবং কিছুক্ষন আগের শোনা সেইসব ভুতের গল্প, যেখানে ইকবাল বলছে, তখন অনেক রাত, সে গাড়ি নিয়ে এই জঙ্গল থেকেই ফিরছে, বৃষ্টি হচ্ছে হালকা, এমন সময় জঙ্গলের পথে এক মহিলা হেডলাইটের আলোয় কাঁদতে কাঁদতে হাত দেখাচ্ছে, গাড়ি থামল, সে এক ট্যুরিস্ট, তার টিম তাকে না খুঁজে পেয়ে চলে গেছে, লিফট, ইকবাল রাজি, মেয়েটা সামনের সিটে। কেউ কোন কথা বলছে না। ইকবালের চোখ মাঝে মাঝে মেয়েটার দিকে, তার হাত দুটো সামনে রাখা। কিছু জিজ্ঞাসাতেই সেরকম উত্তর নেই, সন্দেহ হচ্ছে। ইকবাল নজর রেখে যাচ্ছে, হটাত ওর খেয়াল হয়, মেয়েটার হাতের আঙুলের নখ গুলো কেমন যেন অদ্ভূতভাবে বেড়েই চলেছে। ব্যস, এরপর সে জ্ঞান হারায়, এবং জ্ঞান ফিরে কাউকে আর দেখতে পায়নি, অনেক কষ্টে বাড়ি ফিরে, টানা কয়েকদিন জ্বরে পড়ে- এখন এ গল্প যতই ছেলেভুলোনো হোক না কেন, সেসময় আমাদের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া- তার উপর রাস্তা আটকে এই পেঁচা। হুট, হাট- বেশি জোড়ে চেঁচাতেও পারি না, জঙ্গলের মধ্যে নিজের গলার শব্দকেই কেমন সন্দেহ হয়। কিছু হর্ন। তারপর রাস্তা ক্লিয়ার দিলেন তিনি! ফিরে চলেছি। ডান দিকে উঁচু উঠে যাওয়া জঙ্গল, বাঁ দিকে বয়ে যাচ্ছে এক ছোট্ট জলের স্রোত, পুরোটাই ঘন জঙ্গল, অন্ধকার চেপে বসেছে। কিছুই দৃশ্যমান নয়। হটাত, ব্রেক মেরে গাড়ির মুখ কিছুটা ঘুরিয়ে হেডলাইট ফেলল পাশের জঙ্গলে। দেখি দুজোড়া চোখ। অন্ধকার ভেদ করে তীব্র জ্বলছে। বরাহ-ইকবাল বলে। তবে এ যে সে শুয়োর নয় বন্য। ভয়ঙ্কর। এগুলাম আবার।

       ভিলায় পৌঁছে পান্ডে বিছানা নিল। আমি আর পার্থ বোতলের টুংটাঙে। বাইরের আর কিছুই দেখার উপায় নেই। অন্ধকার গিলে ফেলেছে। এর মধ্যেই রান্না শেষ। শুরু হলো মোমবাতি জ্বালিয়ে ডিনার। যাকে শহুরে মানুষ নাকি বলে ক্যান্ডেল নাইট ডিনার !! গরম গরম ভাত আর দেশি মুরগির ঝোল। অমৃত! খেতে খেতেই বাইরে কিছু উসখুস শব্দ । কেয়ারটেকার বলল, বাবু সব হরিণ। বাঘের ভয়ে রাত্রে সব এই কটেজের আশে পাশে জড়ো হয়। সারারাত এখানে থাকে। বাবারে! মনে মনে একটু ভয় হলো, হরিণের পিছু নিয়ে তো বাঘও আসতে পারে! আর দুদিন আগে এখানে এই ভিলার সামনেই এক হাতী রাতভোর তাণ্ডব চালিয়েছে কাঁঠাল গাছটায়-তার চিহ্নও দেখলাম। তবে মুখে কিছুই বলি নি- কারন সবাই যখন আছে, তাহলে আর আমাদের থাকতেই বা ভয় কি! ঘুম জড়িয়ে এসেছিল অনেক আগেই। ঘরের মেঝেতে পুরো কার্পেট পাতা। তার মাঝে জ্বলছে একমাত্র একটি হ্যারিকেন। পান্ডে আর আমি মাথায় মাথায় লাগানো দুটো চৌকিতে, পার্থ অন্য দিকের একটাতে আর একটা ফাঁকাই থাকল। পাশের ঘরে ইকবাল ও কেয়ারটেকার- তাদের চটুল ঠাট্টার শব্দ ভেসে আসছিল। মশারি টাঙিয়ে, টর্চ নিয়ে, মশার ধুপ জ্বেলে আমরা শুতে শুতেই বুঝতে পারলাম, পায়ের নিচে রাখা কম্বলটার প্রয়োজনীয়তা। পান্ডে আবার একটা প্যারাসিটামল মেরে ঘুমের গভীরে। আমি কিছুক্ষন জেগে থাকার চেষ্টা করছিলাম, যদি বাঘের ডাক শোনা যায়, ওই করতে করতেই কখনও যে ঘুমিয়ে গেছি কে জানে! শুধু হ্যারিকেনটাই জেগে আছে নিভু নিভু আলোয়।

       রাত তখন কটা হবে জানতাম না বা এখন মনেও পড়ছে না। তবে ঘুমের গভীরতা বেশ। একটা ঝুম ঝুম শব্দ থেমে থেমে ভেসে আসছে স্বপ্নে কে যেন আমায় বহুদূর থেকে ডেকে যাচ্ছে – সুপ্রিয়...সু...প...রি...য়...অনেক্ষন ধরেই সে ডাক। আস্তে আস্তে ঘুম ভাঙছে যত, তত গভীর হচ্ছে শব্দের কম্পাঙ্ক। বেশ অনেকটা সময় লেগে গেল এটা বুঝতে যে ডাকটা আসছে উল্টোদিকের বেডে পার্থর কাছ থেকে। পার্থ আমায় ডাকছে। অল্প আলোয় চোখ সইতে সময় লাগল, দেখি পার্থ, ওর বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে অর্ধেক উঠে বসে তখনও আমায় ডাকছে ধীর গলায়। শুনেছিস? আমি শুয়ে শুয়েই একটু কুঁকড়ে গেছি, হ্যাঁ, অনেকক্ষণ ধরেই শুনছি। ঐ তো আবার, আবার হচ্ছে। ঝুম ঝুম...ঝুম ঝুম। থেমে গেল। আবার। থামছে আবার হচ্ছে। যেন কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে, দাঁড়াচ্ছে। শব্দটা শুনেই প্রথম আমার যেটা মাথায় এলো, না কোন ভূত প্রেত নয়, কারন তখন আমি ঘোরতর ঘোষিত নাস্তিক (যদিও ভয় টয় হেব্বি পাই), প্রথমেই অ্যানিমাল প্ল্যানেটে দেখা র‍্যাটেল স্নেকের কথা মনে পড়ল। সাপটা চলার সময় লেজের পিছনের অংশে যেমন শব্দ হয়, এই শব্দটাও সেরকম মনে হচ্ছিল। বেশ ঘাবড়ে গেলাম। বুঝতেও পাড়ছিলাম যে এখানে ওই সাপ থাকা সম্ভব কিনা। এবার পান্ডেকে ডাকলাম। অনেকক্ষণ ডাকার পান্ডের ঘুম ভাঙল, কিন্তু সে উঠল না। সব শুনে বেশ গুম মেরে শুয়ে থাকল। আমি মাথার পাশে রাখা টর্চটা হাতড়াতে গিয়ে দেখি টর্চ নেই। সেকি! টর্চ কোথায় গেল। গলা শুকিয়ে আসছে। পান্ডে বলি টর্চ পাচ্ছি না। তিনজনেই বেশ ভয় পাচ্ছি এবার। শব্দ কিন্তু হয়েই যাচ্ছে। হচ্ছে, থামছে, আবার হচ্ছে। আমি পাগলের মতো আধো অন্ধকারে টর্চটা খুঁজতে খুঁজতে শেষে পেলাম, ওটা মশারির সাইডে গড়িয়ে কিছুটা ঝুলে ছিল। তিনজনেরই মনে হল এটা সাপ না হয় কোন জন্তু। এবার সাহস করে ঘরের চারদিকে টর্চ মেরে চলি, মুখ দিয়ে হ্যাট হ্যাট শব্দ করি। আওয়াজ টা থেমে যায় একটু। কিন্তু আবার শুরু হয়। কি মুশকিল! ভয়ে কেউ নামতেও পারছি না। এভাবে কিছু সময় গেল। ঘরের কার্পেটে চারদিকে টর্চ মারতে মারতে বুঝলাম মেঝেতে অন্তত কিছু নেই। কে নামবে? হ্যারিকেন টা একটু বাড়ানো দরকার। শেষমেশ আমিই। টুক করে নেমে হ্যারিকেন বাড়িয়ে আবার বিছানায়। আবার শব্দ করি মুখ দিয়ে, টর্চ মারি। সেই ঝুম ঝুম একবার থামে বেশ কিছুক্ষণ আবার শুরু হয়। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ! এবার সাহস করে আমি প্রথমে তারপর পার্থ দুজনে নামলাম। শব্দ টা বন্ধ ছিল। আমরা আমরা নামতেই আবার শুরু। কিন্তু দুজনে মিলে শুরু করলাম খোঁজা। খাটের তলা পরিষ্কার। কিচ্ছু নেই। খাটের ড্রয়ারগুলো এবার খোলা শুরু করলাম, নাহ, কোথাও কিছু নেই। এরপর দুজনেই কিছুক্ষণ মুখ দিয়ে জোড়ালো শব্দ করতে করতে বাথরুমটাও দেখলাম। নাহ, নেই...এর মধ্যে শব্দটাও থেমে গেছে। আর হচ্ছে না দেখে দরজা খুলে বারান্দায় বেরুলাম। জানালার লোহার জালির ভিতর দিয়ে বুঝতে পারলাম বেশ অনেক হরিণ এখানে এসে জড়ো হয়েছে। শব্দটা এবারে একেবারে থেমেছে। আমরা বাথরুম করে শুতে যাব, হটাত শুনি জঙ্গল থেকে এক অদ্ভূত প্রানীর ডাক ভেসে আসছে। ভাবলাম বুঝি বাঘেরই ডাক হবে! ঘরের জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখার বৃথা চেষ্টা করে আবার শুয়ে পড়লাম।

        নতুন জায়গা। ফলত ঘুম ভাঙল প্রায় সাড়ে চারটের দিকে। ওরা তখনও ঘুমোচ্ছে। আমি বাথরুমের কাজ সেরে, ক্যামেরা নিয়ে টুক করে গেট খুলে বেড়িয়ে পড়লাম। চারপাশ যথেষ্ট ফর্সা। বেরিয়েই দেখি পাশের কটেজের ট্যুরিষ্ট দের সাথে আসা গাইডটা বেরিয়েছে, হাতে এক পোক্ত ডাণ্ডা। সে বাংলোর চৌহদ্দি ছেড়ে বেড়িয়ে গেল হেঁটে। আমি তখনও ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকা হরিণগুলোর কাছাকাছি। একটু ছবি তুলি। তারপর দেখি পার্থও উঠে এসেছে। ওকে বললাম চল একটু বাইরেটা থেকে ঘুরে আসি। ও রাজি হলোনা দেখে একাই বেরুলাম। একটু বেরুতেই দেখি সেই গাইড ভদ্রলোক ফিরে আসছেন। আমায় দেখে বললেন, বেশি দূর যেওনা, সকালের দিকে ভাল্লুক বেরোয়। সে চলে গেলে আমি আর কয়েকটা ছবি তুলে ফিরে এলাম। সকালের এই চাহালার আকাশ মনোময় আর জঙ্গলের রাস্তায় একটু বেরোলে আর ফিরে আসতে মন চাইবে না। অদ্ভূত সব পাখি ডাকছে, ঠাণ্ডা হাওয়া, দুপাশে ঘন সবুজ বয়ে চলেছে, মাঝে লাল রাস্তা। নাহ, নির্জনতাকে যদি ভয় না পান তবে অন্য কোন ভয় কিন্তু মনে আসবে না। কিন্তু প্রচণ্ড সাবধান থাকতেই হবে, কারন এটা জঙ্গল এবং কোর এরিয়া। কার জন্যে কোথায় কে অপেক্ষা করছে কেউ জানেনা।

       একটু পরে পান্ডে উঠলে, আমরা তিনজনেই এই ভিতরের জায়গাটা ঘুরলাম, আবার একবার ওয়াচ টাওয়ারে ওঠা হল। তখন নুনক্ষেতে কতকগুলো ময়ূর। ইকবাল উঠেছে। কেয়ারটেকার চা করতে গেছে। চা হাতে নিয়েই প্রথম ধরলাম তাকে। আচ্ছা কাল রাত্রে জঙ্গলে যে চিৎকার হল, ওটা কি বাঘের ডাক? ওরা বলল, না না , ওটা বার্কিং ডিয়ার। তারপর সোজা সাপটা, রাত্রে আমাদের ঘরে অনেকক্ষণ ধরে একটা নুপুরের মতো শব্দ হচ্ছিল, ওটা কি? কেয়ারটেকার আর ইকবাল দুজনেই বলল, কই, এমন শব্দ তো আমরা শুনিনি! তোমরা ভুল শুনেছ। তারপর কেয়ারটেকার বলল, হতে পারে আমাদের পোষা শজারুটা এসেছিল এঁটোকাঁটা খেতে, ওটার চলার শব্দ। আমরা আর কথা বাড়াতে পারলাম না, জানতাম না শজারু চললে শব্দ হয় কি হয় না। আর তাছাড়া প্রায় সাড়ে ছটা বাজে, আমাদের বেরুতেও হবে। কিভাবে ফিরব তার নাই ঠিক! রেঞ্জারের কাছে বিদায় নিয়ে, কেয়ারটেকারকে ইকবালের কথা অনুযায়ী পঞ্চাশ টাকা বকশিস দিয়ে গাড়ি ছাড়লাম। এবার ফেরা অন্য পথে। সকালের সেই চাহালা ঢোকার পথ যা আমরা গতকালের বিকেলে অনেকটাই মিস করেছি, সেসব অনুভব করতে করতে এগুচ্ছি, কোথাও গাড়ি দাঁড় করিয়ে ছবি, ইকবালকে রিকোয়েস্ট, আমাদের তিনজনের একটা ফটো ।

       চাহালা থেকে ভোরবেলা ফিরতে খুব মনখারাপ হবে। দুপাশের গাছপালা ঘন থেকে ঘনতর, মেঠোপথ চড়াই-উতরাই, পাশের নালার জল খেতে আসা হরিণ- খুব মনখারাপ। মাঝেমাঝে জংলি ঝোড়া পেরিয়ে চলা। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে জঙ্গলে ইশারা করে ইকবাল বলে, পরের বার তো আসবে নিশ্চই, তখন এখানে বাঘের গুহা দেখাব। এভাবেই চলি, ক্রমশ নামছি। সেই পাশে উঠে যাওয়া পাহাড়, আর অপর পাশে খাদ। ইকবাল খাদের কিছু কিছু ছোট উপড়ানো গাছ দেখিয়ে জানায় এখুনি এখান দিয়ে হাতির পাল গেছে। হাতী আমাদের চোখে পড়েনি। এভাবেই নেমে চলি সমতলের দিকে। এবার আমাদের আলোচনায় ফিরতে হয়, কিভাবে ফিরব? ইকবাল বলে, অনেক উপায় আছে। দেখি মালিক কি বলে? নাহলে এখান থেকে মুরগির গাড়ি যায় রোজ, তাতেই তুলে দেব। আমি ভাবি, ট্রেনে টিকিট না কেটে গেলেও চলবে, কিন্তু সারাদিন না খেয়ে তাহলে বালাসোর পর্যন্ত পৌঁছতে হবে। আবার ভাবি, খড়গপুরে তখন থাকা এক বন্ধুকে ফোন করব জশিপুর গিয়ে, ওকেই বলব যে খড়গপুর স্টেশনে এসে টাকা ধার দিতে। নানান প্ল্যানিং চলে। এর মধ্যেই আমরা নেমেছি সমতলে, একটা আদিবাসী গ্রাম পেরুলাম, একটা অন্য হাটের জায়গা- সেদিন অবশ্য সেখানে হাট ছিল না, পিছনে পড়ে থাকছে গোটা পাহাড়-জঙ্গল, দেখতে পাচ্ছি, ততই মনখারাপ হচ্ছে। আর খুব বেশি দেরি নেই জশিপুরের। ইকবাল ওর মালিককে ফোন করল, ভাষা বুঝি না, কিছু পরে বলে, মালিক আসবে, কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক করেই দেবে। শোন সেরকম হলে আমার মালিকের চেনা গদি আছে বড়বাজারে, সেখানে টাকা দিয়ে দেবে, এখন মালিক যদি তোমাদের ধার দেয়। কিন্তু মালিককি দেবে আমাদের ধার? অচেনা, উঠক তিন ছোকড়াকে কে দেবে ধার এই বিদেশ বিভূঁইয়ে?

       জশিপুর পৌঁছলাম প্রায় নটার পর পর। গাড়ি এসে যেখানে দাঁড়ালো, তার কাছেই এক দোকান থেকে ইকবাল গিয়ে ডেকে আনল তার মালিককে- রাজা বাবু। সৌমদর্শন, পরনে সাদা পাঞ্জাবী ও লুঙ্গি, বেঁটেখাটো চেহাড়ার মুসলিম ভদ্রলোকের চোখ দুটো অদ্ভূত। মনে হবে যেন এক্সরে করে নিচ্ছেন। আমাদের দেখে প্রথমে বললেন, আগে হাত মুখ ধুয়ে নাও, তারপর কথা বলছি। সারা গা মাথা তখন লাল ধুলোয় ভর্তি। পাশের কলে একটু পরিষ্কার হয়ে আমি বসলাম তার সামনের ছোট্ট টুলে। ইকবাল কিছু বলছিল, ওকে থামিয়ে দিয়ে উনি বললেন, কি হয়েছে বলো। আশেপাশে দু একজন লোক জুটে গেছে। আমি শুরু করলাম, একদম শুরু থেকে তার চোখে চোখ রেখে। সব বলে থামলাম। তারপর উত্তর দিলাম তার নানান প্রশ্নের। গোয়েন্দাদের মতো প্রশ্ন। শেষে মনে হল কিছুটা বিশ্বাস জোগাতে পেরেছি। কিন্তু টাকপয়সা ধার দেওয়ার কথা তিনি কিছুই বললেন না উল্টে বললেন ইকবালকে গাড়ির পয়সা মিটিয়ে দাও। দিলাম। দাঁড়িয়ে আছি। কিছু পরে আবার তিনি। এবার বললেন এখান থেকে এখুনি একটা বাস যাবে বাবুঘাট। আমি ওই বাসের কন্ডাকটারের সাথে কথা বলব, ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আচ্ছা ভালো কথা। বসে আছি রাস্তায়। কিছু পরেই সেই বাস এলো। রাজাবাবু, ইকবাল আরো কিছু লোক। ভাষা না বুঝলেও এটা বুঝছি কথা কাটাকাটি হচ্ছে, বাসের লোক আমাদের নিতে চায় না, তাদের ধারণা আমরা টাকা দেব না পরে- এটা ভাবাটাই স্বাভাবিক। তার মানে রাজাবাবুও টাকা খসাতে চাইছেন না। কি করি। দাঁড়িয়েই আছি। কিছু পরে ইকবাল এলো, হয়ে গেছে, রাজাবাবু তোমাদের ভাড়া দিয়ে দিচ্ছে, এই বাসেই চলে যাবে। এবার রাজাবাবু, তোমরা টাকাটা ওকে ফিরত দিয়ে দিও, ও আমাকে দিয়ে দেবে। আমরা কৃতজ্ঞ। অনেক ধন্যবাদ। তিনি বললেন, যাও কিছু টিফিন করে নাও, বাস দাঁড়াবে আরো দশ মিনিট। আমরা আসছি আবার ডেকে বললেন, টাকা যখন দেবে তখন ইকবালের বকশিসটার কথাও একটু মনে রেখো। আমরা ঘাড় নাড়ি। তাড়াতাড়ি আবার সেই টিফিনের দোকানে, তড়কারি দিয়ে সিঙ্গারা, ফুলুরি।

       বাসে আমাদের সিট দেওয়া হলো একদম শেষে টানা সিটে। প্যাকডআপ ভিড়। কন্ডাকটার বড্ড তুচ্ছ, তাচ্ছিল করে আমাদের সিটটা দিল, সাথে বেশ কিছু কথা। জানলা দিয়ে বিদায় ইকবাল, বিদায় রাজাবাবু এই জশিপুর এবং প্রিয় সিমলিপাল। বাস ছুটল। প্রায় সাত সাড়ে সাত ঘণ্টার জার্নি। বাসটা উড়িষ্যা থেকে ঝাড়খন্ড হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ঢুকেছিল। আমাদের ফ্রিতে ঝাড়খন্ডের হাওয়াও স্পর্শ করা হয়ে গেল। বাস চলেছে। গরমে আর পিছনের সিটের লাফানোতে ঠিকঠাক বসাই যাচ্ছে না । তারপর খিদে ও ঘুম। বসে আছি, তখন ঝাড়খন্ডের ভিতর দিয়ে চলেছে, হটাত পায়ের কাছে কি একটা যেন গড়াগড়ি খায়। হাত দিয়ে তুলে দেখি একটা বড়সড় কাঁচা আম। এ আবার কোত্থেকে এলো রে বাবা! এদিক ওদিক তাকালাম। নাহ, কোথাও তো বস্তা দেখি না, বা কেউ আমার দিকে বা ওই আমটার দিকে তাকাচ্ছেও না। চলো গুরু, হো যাও শুরু। দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে প্রসাদ দিলাম ওদেরও। আবার ঢুলছি একটু। হটাত পায়ের কাছে কিছু একটা থেকে। উরিব্বাস! আবার একটা। কোথা থেকে কে যে পাঠিয়েছিল কে জানে! কিন্তু সেই খিদের মুখে সে এক অমৃত! আরো একটা এসেছিল তারপরে, সেটা ওরা আর কেউ না খাওয়ায়, আমি একাই সাবাড় করলুম। বাস দুপুর গড়িয়ে থামল একটা হোটেলে, খাওয়া হল ভাত। শেষমেশ বাবুঘাট পৌঁছল বিকেল পেরিয়ে। পান্ডে গঙ্গা পেরোবে আর আমরা মেট্রো। পথ আলাদা হলো। পকেটের কয়েকটা টাকা, শুধু ভাড়া টুকুই। বাস ধরে নামলাম ধর্মতলা, তারপর মেট্রো। গেট আটকে পুলিশ। না ভাই এত বড় ব্যাগ আর গা ভর্তি-মাথা ভর্তি ধুলো নিয়ে তো ঢোকা যাবে না! আবার কাঁউতালি! গুছিয়ে বললাম ঘটনা, শেষে দয়া হল, নামলাম শ্যামবাজার। লেদিয়ে লেদিয়ে মেসে এসে গা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বাসওয়ালা কে টাকা ফেরাতে হবে! তার কি হবে! শরীর আর চলে না। আমরা নামার সময় জেনে নিয়েছিলাম বাসটা পরের দিন সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ছাড়ে। ঠিক হলো কাল যাওয়া হবে।

       আমি ট্যাঙ্ক খুলে জমিয়ে রাখা কিছু পয়সা হিসেব করে দেখলাম খুব বেশি নেই। তিনজনের বাসভাড়া ৪৫০ আর ইকবালের জন্য একশোর বেশি আমি আর জোগাড় করতে পারিনি, কারন দুজনের কাছে এবাবদ দেওয়ার মতো কিছু আর অবশিষ্ট ছিল না। পরদিন ভোর থেকে বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে কোলকাতা। আমরা বেরুলাম। সময়ের আগেই পৌঁছেছি বাবুঘাট। কিছু পরে সেই বাস এলো। কন্ডাক্টার তো আমাদের দেখে থ!!! এখন তার হাসি হাসি মুখ। মনে মনে খিস্তি দিলাম খানিক কালকে ওই পিছনে বসানোর জন্য। তারপর বারবার মনে করিয়ে দিলাম টাকাটা পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বৃষ্টিতে ভিজে ফিরে এসে ফোন দিলাম ইকবালকে, জানালাম টাকা পাঠিয়েছি- সেই তার সাথে শেষ কথা।

About Author
&
Photographer

লেখক : সুপ্রিয় সাহা

শূন্য দশকের গল্পকার ও ভ্রমণপিপাসু।

আলোকচিত্রী: সুপ্রিয় সাহা

শূন্য দশকের গল্পকার ও ভ্রমণপিপাসু।

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget