তিন ভুবনের পারে

ও জীবন রে…
এই ধরা যাক ফেসবুক বা ইউটিউব-এ আপনি যা দেখার জন্য সার্চ করবেন, তারপর থেকে প্রতিনিয়ত সেই সম্পর্কিত ভিডিওই আসতে থাকবে। এখন তো আরো এ আই হয়ে গিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সে বুঝে ফেলছে আপনি কি চান বা কি ভালোবাসেন। তাই-ই সে গুচ্ছ গুচ্ছ দেখিয়ে চলেছে। আর আমার মতো যারা আছেন, যারা ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন অথচ বিভিন্ন কারণে গিয়ে উঠতে পারেন না, তাদের সেই সমস্ত ভিডিও দেখে ক্রমাগত মন খারাপ হতে থাকে।
আবার প্রচুর লোক আছেন, কি সুন্দর কয়েকটি ছুটির দিন একসাথে পড়তেই, সেদিন সন্ধেতেই বা পরদিন সকালে ট্রেনে বা প্লেনে চেপে বসেন। চমৎকার ঘুরে আসেন দু চার দিনে দারুণ কোন একটি জায়গা থেকে। এত গোছানো লোকেরা আমার কাছে রীতিমতো ঈর্ষা করার মতো পাত্র হন। কি ভাবে যে তারা এত সব করে উঠতে পারেন। সংসার ইত্যাদি নিয়ে শুধু বসে বসে মন খারাপ করি যে আমারও একদিন এরকমের দিন ছিল। আর ঘুরতে যাবার জন্য এগুলো তো রীতিমতো জেম। মানে ধরা যাক একটা দিন ছুটি নিলেই চারদিন একটানা ছুটি বা মাঝে একখানা রোববার পড়ে গেলে তো আরো সরেস।
তো এই মন খারাপ আর স্মৃতি রোমন্থনকেই যখন ভবিতব্য বলে ধরে নিয়ে সময় কাটাচ্ছি, এলবাম- কম্পিউটারে পুরোনো ছবি দেখছি আর বসে বসে এস এল আর-এ হাত বোলাচ্ছি, তখনই হঠাৎ একদিন রাতে ঠেকে এসে ভিকি বলল- চল ঘুরে আসি। শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম।
কি ভাবে সম্ভব, বাড়ির এই পরিস্থিতি-
আরে সে তো আমারও, তার মধ্যেই বেরুতে হবে-
সেগুলো গল্পে হয়, যদি হঠাৎ করে বাড়িতে কোন দরকার পড়ে তখন কি করবি?-
সঙ্গে সঙ্গে ফেরা স্টার্ট করে দেবো-
আর তখনই যদি কোন ট্রেন না থাকে, কি করবি?-
ট্রেনে তো যাবোই না-
তাহলে?-
গাড়িতে যাব-
মানে লং ড্রাইভ? উরিব্বাস-
হ্যাঁ-
ঠিক আছে, তাহলে ভেবে দেখি-
জানাস-
রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে শুধু ভাবি হবে কি সম্ভব এই স্বপ্ন সত্যি আমার জন্য? পারব কি পাড়ি দিতে মেঘের ভেলায় চেপে সেই মায়াকাজলের দেশে? বাড়িতে কোন অসুবিধা হবে না তো? হঠাৎ করে যদি দরকার পড়ে যায় তাহলে সবাই মিলে একসাথে রওনা দেবে তো? মুখ কালো হয়ে যাবে না তো সবার? না কি তখন আমাকেই একা ফেরার গাড়ি ধরতে হবে? এতসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে। সকাল হতেই- যা হবে দেখা যাবে, ভেবে ভিকিকে ফোন করি-
হ্যাঁ, যাব-
বেশ, তাহলে আরো দুজনের খোঁজ কর, গাড়ি নিয়ে গেলে কমপক্ষে চার পাঁচ জনের দরকার, না হলে কিন্তু খরচ অনেকটা বেশি পড়ে যাবে-
তাই তো, এই বিষয়টা তো এতক্ষণ মাথাতেই ছিল না।
কিন্তু আমরা যাবোটা কোথায় আর কেমনই বা খরচ হতে পারে?-
যাব আসামের দিকের কোন জঙ্গলে…সে একটা হতে পারে বা একাধিকও হতে পারে। পুরোটাই পকেটের ওপর…
খরচ যেটা ভিকি বললো তা যে খুব বেশি তা নয়, কিন্তু খুব কমও নয়। তবে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন লোকের কাছে শিখতে শিখতে এটুকু বুঝেছি যে এ জিনিসের খুব বেশি মায়া করে লাভ নেই। যতক্ষণ আছে, সামলে সুমলে আনন্দ করে নিতে হবে।
আরো কথায় কথায় জানা গেল ভিকির রিসেন্ট ইন্টারেস্ট জঙ্গল। ভারতবর্ষের বেশ কিছু নাম করা জঙ্গল ইতিমধ্যেই ওর দেখা হয়ে গিয়েছে। আর যেহেতু নর্থ ইস্টের দিকে প্রচুর জঙ্গল আর অন্য কোন দিকে যাবার থেকে এদিকটায় চট করে গিয়ে ঘুরে আসা যায় তাই ওর প্রথম পছন্দ নর্থ ইস্ট। আমার তো বাড়ির পাশের জঙ্গলে যেতেও মন নেচে ওঠে। সেখানে আমার প্রায় কোন জঙ্গলেই না যাওয়া এবং সেক্ষেত্রে ভারতের ইত্তরপূর্বের জঙ্গল এক রহস্যে ঘেরা গা ছমছমে দুনিয়া তো বটেই। তার ওপর লং ড্রাইভ।
অধীর আগ্রহে দিন কাটে। দুরুদুরু বুকে বাড়ির পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখি। চলবে তো সব ঠিকঠাক? আমি না থাকলে অসুবিধা তো হবেই, কিন্তু পারবে তো লোকজন সেটুকু সামাল দিয়ে দিতে? আসলে এসবের নামই মায়া, সংসার থাকলে যাতে জড়িয়ে পড়া অনিবার্য। তাহলে কি উচিত ছিল এই সংসার বা মায়ার বাঁধনে না জড়ানো? যখন বাইরের টান এত প্রবল, তখন এই পিছুটানের সৃষ্টি না করাটাই মনে হয় ভালো ছিল। কিন্তু একবার যখন তা হয়ে গিয়েছে তাকে তো মেনে নিয়েই চলতে হবে। যতই সারাক্ষণ মন বাইরে বাইরে করুক, এডজাস্ট করে নিতেই হবে। আর এই সংগ্রামের নামই তো জীবন।
আগুন জ্বালো…আগুন জ্বালো…
এমন নিকষ কালো অন্ধকার যে গাড়ির আলো ঠিক সামনে যতটা এলাকা জুড়ে পড়ছে তার বাইরে মানে গাড়ির দুপাশে বা পেছনে কি আছে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। আর যে রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছি তা খুব বড় জোর হলে দশ ফুট মতো চওড়া হবে। তাই কোন কারণে যদি গাড়ি ঘোরানোর বা পেছনোর দরকার পড়ে, কে নেমে দেখবে তা হবে প্রথম সমস্যা, পেছনো তো পরের কথা।
এমনটা কিন্তু হবার কথা ছিল না। কিন্তু ঐ যা হয়, বন্ধু বান্ধব এক হলে এক কথার জায়গায় দশ কথা হয়। প্রচুর গল্প হয়। আর থামা যাবে না বলে ছোট বাইরেতে নেমে চা সিগারেট খেতে খেতে সময় গড়ায়। আসলে এই হচ্ছে এককথায় গাড়ি থাকার এডভান্টেজ এবং ডিসএডভান্টেজ। গত কদিন ধরে ভিকির সাথে কথার পরে ওর পড়াশোনা অনুযায়ী ঠিক হয়েছে যে আমরা প্রথম যাব ওরাং।
নর্থ ইস্টের জঙ্গলে তো প্রথমেই নাম আসে কাজিরাঙা আর তারপর মানসের। তাহলে ওরাং কেন যাব? ভিকিকে এই প্রশ্ন করতেই ও বলল যে কয়েক বছর আগের একটা রিপোর্টে ঘনত্ব অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ভারতে সব থেকে বেশী ছিল ওরাং এ। যদিও এই রিপোর্ট এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না। আর এখন এই কৃতিত্ব কাজিরাঙার। আমাদের যেহেতু কখন ফেরার ডাক পড়ে সেটা যেহেতু জানা নেই তাই প্রথমেই ওরাং করে নেওয়াটাই বেটার। সেখানে ব্যাঘ্র দর্শন হলে ভালো। না হলে কিছু তো দেখা যাবেই। তারপর যদি ফিরতে হয় তো ফিরলাম আর ফেরার ডাক না পড়লে অন্য কোথাও চলে গেলাম।
গতকাল ছিল বড়দিন। ছুটির দিন মানেই শুধু কাজ আর কাজ। সব করার পরেও দেখা গেল প্রচুর না করা কাজ থেকে গেল। সন্ধে নাগাদ সপরিবার চার্চ থেকে ঘুরে আসবার পর দেখি কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে শরীরে। খানিকক্ষণ বসে থাকার পর বুঝলাম যে এর পুরো কারণটাই হচ্ছে উত্তেজনা। কাল সকালেই যে বেরুনো। ব্যাগ গুছোনো, টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনাকাটি, আড্ডা- ইত্যাদি হয়ে বাড়ি ঢুকে আরেকবার ব্যাগ গুছোনো- এসব করে খেয়েদেয়ে বিছানায় যাবার খানিকক্ষণ পর বুঝলাম উত্তেজনায় আজ আর ঘুম তাড়াতাড়ি আসবে না। এইটা যখন একবার হয়ে যায় তখন সেই ঐশ্বরিক বস্তুকে পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। লেডি ম্যাকবেথের কথা মনে পড়ে ভয় হয়।
আসলে ঘুমোনোটা খুব দরকার ছিল। কারণ কাল গাড়ি চালাতে হবে। ঝিমুনি এসে যাওয়া ড্রাইভিং এর জন্য ডেঞ্জারাস। আমরা যাচ্ছি মোট চারজন। তারমধ্যে তিনজন আছি ড্রাইভিং জানা। তাই পালা করে তিনজনকেই চালাতে হবে। গুগল বলেছে প্রথমদিনের ডেস্টিনেশনের জার্নি মোটামুটি দশ ঘন্টার। চারটেতে উঠে সব কাজকম্ম সেরেটেরে গাড়িতে ওঠার জন্য পাড়ার মোড়ে চলে যাবার কথা ছিল সাড়ে চারটেতে। ডিসেম্বরের যা জব্বর শীত। পারলামই না। আবার রাস্তার কুকুরেরও ভয়। কয়েক মিনিট পেরুতেই গাড়ির আওয়াজ আর ভিকির ফোন- আমি তোর বাড়ির নিচেই, নেমে আয়।
নেমে বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। প্রথমেই লেট করেছি। তাই স্পিকটি নট। বাকি দুজন আর দু তিন কিমি পরেই হাইওয়ে জংশন এ অপেক্ষা করবে। এমনটাই কথা। একটু এগোতে না এগোতেই দেখি ফোন। চলে এসেছে দুই পার্টনার। আমার কিন্তু তারা অচেনাই। ভিকির পরিচিত। ঐ ঠিক করেছে। আলাপ হবার পরে দেখা গেল যে তারা এমনই সরেস যে জমে যেতে দু মিনিটও লাগলো না। আর তারপর থেকে যত বেলা গড়াতে লাগলো আড্ডাও জমতে লাগলো আর সময়ের প্ল্যানিং-এরও দফারফা হয়ে গেল।
এরপর আমরা বঙ্গদেশ ছেড়ে বঙ্গাইগাঁও, রঙ্গিয়া পেরিয়ে গুয়াহাটির রাস্তা ছেড়ে যখন মঙ্গলদৈ এর রাস্তা ধরেছিলাম ততক্ষণে বিকেল সন্ধের দিকে ধীরে ধীরে গড়াতে শুরু করে দিয়েছে। যথারীতি দুপুরে জমিয়ে রাস্তার ধারের ধাবায় হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া হয়েছে আর তারপর থেকে কেউই একটানা গাড়ি চালাতে চাইছি না, কারণ ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। আর ফোরলেন ছাড়বার পর তো গাড়ি আর সেরকম জোরে টানাও যাচ্ছে না।
খানিকক্ষণ আগে পর্যন্তও টিমের একজন শুধু অভয় দিয়ে যাচ্ছিল যে এই এলাকা ওর চেনা। কোন অসুবিধা হবে না। আর সত্যিই খানিকটা চেনাও বটে। কারণ খারুপেটিয়া নামের একটি জায়গার পরে দলগাঁও, তার আশেপাশে কোথাও একটা হাট বসেছিল। সেখান থেকে হাঁস কিনে ওর এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাতে আমরা যেখানে থাকবো সেখানে রান্না করে নিয়ে আসবে। কিন্তু এখন এই অন্ধকারে গাড়ির ভেতরে তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সেও খানিক ভয় পেয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওমন জোরালো গাড়ির আলো দেখে মাঝেমধ্যে লোক এসে দাঁড়াচ্ছে রাস্তায়। তাদেরকে জিজ্ঞেস করে করে আমরা এগোচ্ছি।
ওরাং এর একটা নম্বর কিছুদিন আগে গুগল থেকে জোগাড় করে ফোন করেছিলাম। বলেছিল যে সরকারি লজ, যার নাম প্রশান্তি, সেখানে থাকবার ব্যবস্থা আছে। তারপর থেকে সে নম্বর আর ধরছে না। সেই নিকষ কালো অন্ধকারের রাস্তা পেরিয়ে আমরা ওরাং রিজার্ভ ফরেস্টের গেটে পৌঁছে তার সাইনবোর্ড দেখে ঢুকে গেলাম সে রাস্তায়। কিন্তু হাঁকডাক করার পর যিনি বেরিয়ে আসলেন তিনি জানালেন যে তার সাথেই ফোনে কথা হয়েছিল। আর লজ আছে বটে, কিন্তু রেনোভেশনের কাজ চলার জন্য সেখানে থাকা আপাতত বন্ধ।
এবারে অবধারিত প্রশ্ন আসে যে তাহলে আমরা থাকবো কোথায়? এবারে সেই ব্যাক্তিই বললেন যে পাশেই তার বাড়ি আর সেখানে হোমস্টেও আছে। কিছু একটা আঁচ করতে পারলেও ডিসেম্বরের ঐ রাতে ওরকম ঠান্ডার মধ্যে আমাদের ওর হোমস্টেতে যাওয়া ছাড়া আর কোন অপশন নেই। অগত্যা সেখানেই গিয়ে উঠলাম। গিয়ে দেখলাম ব্যবস্থা ভালোই। আর ঘোরাঘুরির ব্যাপারেও কথা বলে জানা গেল যে ঐ ভদ্রলোকই কাল সকালে সব ব্যবস্থা করে দেবেন। জিপসিও চলে আসবে। তাই কোন সমস্যা হবে না। ইতিমধ্যে হাঁসের মাংসও চলে এসেছে। তাই আর দেরি না করে আমরা বনফায়ারের আগুন জ্বালিয়ে দিলাম।
গঙ্গা আমার মা…
ভোরে ঘুম থেকে উঠে কটেজের দরজা খুলে দেখি চারিদিক কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে। গাছ থেকে টুপটুপ করে শিশির পড়ছে। মাটি ভিজে। বুঝলাম, সব দেখেশুনে ভিকি খুব একটা প্রসন্ন নয়। কারণ জানতে চাইলে বলল যে এই রকম ওয়েদার ওয়াইল্ডলাইফ সাইটিং এর জন্য একদমই ঠিক নয়। তাহলে ঠিক কোনটা? যখন সূর্যালোক প্রচুর পরিমাণে থাকবে অথচ তার তাপ হবে কম, ভিজিবিলিটি লেবেল হবে হাই আর গ্রাসল্যান্ডের গ্রাসের উচ্চতা থাকবে কম তখনই ওয়াইল্ডলাইফ দেখা যাবে ভালো। খুবই স্বাভাবিক। অথচ কোনদিন এতটা ভেবেই দেখেনি। আসলে আমার জঙ্গলে যাওয়াই সেই অর্থে খুব কম। তাই অনেক নতুন নতুন জিনিস জানছি। ভালো লাগছে।
যেই সরকারি লজটিতে আমাদের থাকা হল না তার নাম প্রশান্তি। গুগলে লিখলে দেখায়। আর আমরা আছি ঠিক তার উল্টোদিকেই। ছোট ছোট কটেজ। দুই বা তিনজনের থাকার মতো প্রতিটি। একদম জঙ্গলের গা ঘেঁসেই কটেজগুলো। তবে বেশ উঁচু দেওয়াল এবং তার ওপর ব্লেডতার দেওয়া আছে। তাই বন্যপ্রাণের এদিকে চলে আসার চাপ কম। অবশ্য সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে বাস্তবে আমাদের দিক থেকেই ওরা চাপে থাকে।
যাই হোক, কাল আসার সময় কিছুই বুঝতে পারিনি। এখন রেডি হয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি ছোট্ট একখানা গ্রাম, যা পেরিয়ে কাল এসেছি, এই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে যেন গুটিসুটি থেকে আড়মোড়া ভাঙছে। নাম তার শিলবড়ি। আর খুব একটা নামজাদা না হয়ে উঠলেও এই ওরাং কিন্তু স্যাংচুয়ারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল বহুদিন আগে, সেই ১৯৮৫ সালে। তারপর ১৯৯৯ সালে এটি ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পায়। তখন তার নাম হয় রাজীব গান্ধী ওরাং ন্যাশনাল পার্ক। আর ২০১৬ সালে এটি ভারতের ৪৯তম টাইগার রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। আনুমানিক ৮০ বর্গকিমি কোর এলাকা নিয়ে এই টাইগার রিজার্ভ আসামের চারটি টাইগার রিজার্ভের মধ্যে ক্ষুদ্রতম। টেলিগ্রাফ পত্রিকা অনুযায়ী ২০১৩ র টাইগার সেন্সাসে এখানে বাঘের সংখ্যা ছিল চারটি শাবকসহ ২৪ টি।
এমন নয় যে সকালে উঠে এসব পড়াশোনা করে তারপর বাঘ দেখতে ঢুকছি। সবই নেট আর কথায় কথায় ভিকির কাছ থেকে জানা। সেখান থেকেই চালিয়ে দিলাম। টিকিট, পারমিশন, জিপসি,গাইড- এসব করে জঙ্গলে ঢুকতে ঢুকতে সাড়ে সাতটা বেজেই গেল। তখনও কুয়াশা বেশ ভালোই। বাঘ দেখা যাবে কি যাবে না এই নিয়ে কারুর উদ্বেগ থাকলেও আমার মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পেলাম না। বরঞ্চ আমার মন বলছিল যে ওসব খতরনাক জিনিস না দেখতে পেলেই ভালো। হঠাৎ করে যদি গুরুগম্ভীর স্বরে সে চোখের সামনে বা কানের পেছন থেকে বলে ওঠে- এই যে আমি এখানে, তখন কি হবে? তার থেকে জঙ্গলের মধ্যে কতরকমের সুন্দর পাখি ডাকছে, এতেই তো মন ভালো হয়ে যায়।
যাই হোক শেষ অব্দি আমাদের ব্যাঘ্রদর্শন আর হল না। ভিকি দেখলাম একটু মুষড়ে পড়েছে। ওকে আর আমার মনোবাসনার কথাটা জানালাম না। বাঘমামাকে দেখতে না পেলেও একপাল হাতি আর বাচ্চা সহ একটা বড় গন্ডার রাস্তা পেরুনোর সময় আমাদের দেখে রেখেছে। কি যে হবে পরে কে জানে? যদি ওরা আমাদের কথা মনে রেখে দেয় যে সকাল সকাল এরা আমাদের বিরক্ত করতে এসেছিল। তাই একটা চাপা টেনশন থেকেই যাচ্ছে।
মোটামুটি দশটা নাগাদ জঙ্গল ঘোরা শেষ করে আমরা ফিরলাম। রুটি, তরকারি, ডিমসেদ্ধ- রিসর্টে আমাদের জন্য ব্রেকফাস্টে রেডি করাই ছিল। খাবার টেবিলে বসে সেসবের সদব্যবহার করতে করতে ভিকি বললো- আর এখানে থাকবো না। বাড়ি থেকেও যেহেতু ডাক আসেনি তাই চল আমরা কাজিরাঙ্গা দেখে আসি। মনটা যেন আনন্দে নেচে উঠলো। আহা...কি কথা।
ততক্ষণে রোদ উঠে পড়েছে। গতকাল সন্ধেবেলার সেই অন্ধকার শিলবড়ি গ্রামের রাস্তায় এখন শীতের সকালের কাজের ব্যস্ততা। মানুষজন ধান শুকোতে দিচ্ছে। পরিশ্রমের ফসল। লোকজন কেউ যাতায়াত না এমনটা ধরে নিয়েই তারা রাস্তার ওপর সোনা রঙের ধান মেলে দিয়েছে। এখন আমাদের যেতেও হবে তার ওপর দিয়েই। উপায় নেই। শিলবাড়ি বাজারে এসে লোকজন এবং গুগলের সাহায্যে রাস্তা ঠিক করে নিয়ে আমরা কাজিরাঙার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিলাম।
ঘড়িতে সময় দুপুর দুপুর। গাড়ি চলছে ভালোই। আমরা ইতিমধ্যে ঢেকিয়াজুলি, তেজপুর পেরিয়ে লাঞ্চ করে নিয়েছি। চমৎকার রাস্তাঘাট আসামের। ফালতু পুলিশের ঝামেলা নেই। একটু কিছু জানতে চাইলে অনেকটা বলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এল বিশাল বহ্মপুত্র নদ।
আহা... এই সেই ছোটবেলার ভূগোল বইয়ে পড়া ব্রহ্মপুত্র । যার তিব্বতে উৎপত্তি এবং সেখানে তার নাম সাংপো। তারপর অরুণাচল হয়ে আসামে ঢুকে বেশ খানিকপথ ব্রহ্মপুত্র নামে পাড়ি দিয়ে একসময় তিস্তাকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নিয়েছে। এরকমভাবেই হয়তো কোন একদিন এর ওপর দিয়ে যেতে যেতে বা পাড়ে দাঁড়িয়ে ভূপেন হাজারিকা গেয়ে উঠেছিলেন-
“গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা
আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা
মেঘনা যমুনা...”
সেই ব্রহ্মপুত্র পেরুচ্ছিলাম আর এসব কথা ভাবতে ভাবতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কোহরা বা কোহরা মোড়। সেটাই কাজিরাঙা জঙ্গলের নিকটবর্তী জনপদ। তার আগের মোটামুটি বড় জনপদ জাকলাবান্ধা। এখন আমরা তার কাছাকাছিই।
ঘুম ঘুম...
ঐ দেখ…
শুনেই ধড়মড় করে জেগে উঠলাম। জাকলাবান্ধা পেরুতে পেরুতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল কে জানে। দেখলাম শুধু আমি নই। যে গাড়ি চালাচ্ছিল সে ছাড়া বাকি দুজনও একইভাবে আমার মতোই অবাক হয়ে লাল চোখে বাইরে দেখছে। রোদের তেজ অনেকটাই পড়ে এসেছে এখন। আর খানিকক্ষণ পরই হয়তো সন্ধে নেমে যাবে। জাকলাবান্ধা থেকে কাজিরাঙ্গা বা কোহরা অভিমুখে আমাদের বামদিকে এখন বিস্তীর্ণ ঘাস এবং জলাজমি। আর সেখানেই চড়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি গন্ডার, ওয়াটার বাফেলো আর হরিণের পাল।
ও জীবন রে…
এই ধরা যাক ফেসবুক বা ইউটিউব-এ আপনি যা দেখার জন্য সার্চ করবেন, তারপর থেকে প্রতিনিয়ত সেই সম্পর্কিত ভিডিওই আসতে থাকবে। এখন তো আরো এ আই হয়ে গিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সে বুঝে ফেলছে আপনি কি চান বা কি ভালোবাসেন। তাই-ই সে গুচ্ছ গুচ্ছ দেখিয়ে চলেছে। আর আমার মতো যারা আছেন, যারা ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন অথচ বিভিন্ন কারণে গিয়ে উঠতে পারেন না, তাদের সেই সমস্ত ভিডিও দেখে ক্রমাগত মন খারাপ হতে থাকে।
আবার প্রচুর লোক আছেন, কি সুন্দর কয়েকটি ছুটির দিন একসাথে পড়তেই, সেদিন সন্ধেতেই বা পরদিন সকালে ট্রেনে বা প্লেনে চেপে বসেন। চমৎকার ঘুরে আসেন দু চার দিনে দারুণ কোন একটি জায়গা থেকে। এত গোছানো লোকেরা আমার কাছে রীতিমতো ঈর্ষা করার মতো পাত্র হন। কি ভাবে যে তারা এত সব করে উঠতে পারেন। সংসার ইত্যাদি নিয়ে শুধু বসে বসে মন খারাপ করি যে আমারও একদিন এরকমের দিন ছিল। আর ঘুরতে যাবার জন্য এগুলো তো রীতিমতো জেম। মানে ধরা যাক একটা দিন ছুটি নিলেই চারদিন একটানা ছুটি বা মাঝে একখানা রোববার পড়ে গেলে তো আরো সরেস।
তো এই মন খারাপ আর স্মৃতি রোমন্থনকেই যখন ভবিতব্য বলে ধরে নিয়ে সময় কাটাচ্ছি, এলবাম- কম্পিউটারে পুরোনো ছবি দেখছি আর বসে বসে এস এল আর-এ হাত বোলাচ্ছি, তখনই হঠাৎ একদিন রাতে ঠেকে এসে ভিকি বলল- চল ঘুরে আসি। শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম।
কি ভাবে সম্ভব, বাড়ির এই পরিস্থিতি-
আরে সে তো আমারও, তার মধ্যেই বেরুতে হবে-
সেগুলো গল্পে হয়, যদি হঠাৎ করে বাড়িতে কোন দরকার পড়ে তখন কি করবি?-
সঙ্গে সঙ্গে ফেরা স্টার্ট করে দেবো-
আর তখনই যদি কোন ট্রেন না থাকে, কি করবি?-
ট্রেনে তো যাবোই না-
তাহলে?-
গাড়িতে যাব-
মানে লং ড্রাইভ? উরিব্বাস-
হ্যাঁ-
ঠিক আছে, তাহলে ভেবে দেখি-
জানাস-
রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে শুধু ভাবি হবে কি সম্ভব এই স্বপ্ন সত্যি আমার জন্য? পারব কি পাড়ি দিতে মেঘের ভেলায় চেপে সেই মায়াকাজলের দেশে? বাড়িতে কোন অসুবিধা হবে না তো? হঠাৎ করে যদি দরকার পড়ে যায় তাহলে সবাই মিলে একসাথে রওনা দেবে তো? মুখ কালো হয়ে যাবে না তো সবার? না কি তখন আমাকেই একা ফেরার গাড়ি ধরতে হবে? এতসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে। সকাল হতেই- যা হবে দেখা যাবে, ভেবে ভিকিকে ফোন করি-
হ্যাঁ, যাব-
বেশ, তাহলে আরো দুজনের খোঁজ কর, গাড়ি নিয়ে গেলে কমপক্ষে চার পাঁচ জনের দরকার, না হলে কিন্তু খরচ অনেকটা বেশি পড়ে যাবে-
তাই তো, এই বিষয়টা তো এতক্ষণ মাথাতেই ছিল না।
কিন্তু আমরা যাবোটা কোথায় আর কেমনই বা খরচ হতে পারে?-
যাব আসামের দিকের কোন জঙ্গলে…সে একটা হতে পারে বা একাধিকও হতে পারে। পুরোটাই পকেটের ওপর…
খরচ যেটা ভিকি বললো তা যে খুব বেশি তা নয়, কিন্তু খুব কমও নয়। তবে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন লোকের কাছে শিখতে শিখতে এটুকু বুঝেছি যে এ জিনিসের খুব বেশি মায়া করে লাভ নেই। যতক্ষণ আছে, সামলে সুমলে আনন্দ করে নিতে হবে।
আরো কথায় কথায় জানা গেল ভিকির রিসেন্ট ইন্টারেস্ট জঙ্গল। ভারতবর্ষের বেশ কিছু নাম করা জঙ্গল ইতিমধ্যেই ওর দেখা হয়ে গিয়েছে। আর যেহেতু নর্থ ইস্টের দিকে প্রচুর জঙ্গল আর অন্য কোন দিকে যাবার থেকে এদিকটায় চট করে গিয়ে ঘুরে আসা যায় তাই ওর প্রথম পছন্দ নর্থ ইস্ট। আমার তো বাড়ির পাশের জঙ্গলে যেতেও মন নেচে ওঠে। সেখানে আমার প্রায় কোন জঙ্গলেই না যাওয়া এবং সেক্ষেত্রে ভারতের ইত্তরপূর্বের জঙ্গল এক রহস্যে ঘেরা গা ছমছমে দুনিয়া তো বটেই। তার ওপর লং ড্রাইভ।
অধীর আগ্রহে দিন কাটে। দুরুদুরু বুকে বাড়ির পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখি। চলবে তো সব ঠিকঠাক? আমি না থাকলে অসুবিধা তো হবেই, কিন্তু পারবে তো লোকজন সেটুকু সামাল দিয়ে দিতে? আসলে এসবের নামই মায়া, সংসার থাকলে যাতে জড়িয়ে পড়া অনিবার্য। তাহলে কি উচিত ছিল এই সংসার বা মায়ার বাঁধনে না জড়ানো? যখন বাইরের টান এত প্রবল, তখন এই পিছুটানের সৃষ্টি না করাটাই মনে হয় ভালো ছিল। কিন্তু একবার যখন তা হয়ে গিয়েছে তাকে তো মেনে নিয়েই চলতে হবে। যতই সারাক্ষণ মন বাইরে বাইরে করুক, এডজাস্ট করে নিতেই হবে। আর এই সংগ্রামের নামই তো জীবন।
আগুন জ্বালো…আগুন জ্বালো…
এমন নিকষ কালো অন্ধকার যে গাড়ির আলো ঠিক সামনে যতটা এলাকা জুড়ে পড়ছে তার বাইরে মানে গাড়ির দুপাশে বা পেছনে কি আছে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। আর যে রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছি তা খুব বড় জোর হলে দশ ফুট মতো চওড়া হবে। তাই কোন কারণে যদি গাড়ি ঘোরানোর বা পেছনোর দরকার পড়ে, কে নেমে দেখবে তা হবে প্রথম সমস্যা, পেছনো তো পরের কথা।
এমনটা কিন্তু হবার কথা ছিল না। কিন্তু ঐ যা হয়, বন্ধু বান্ধব এক হলে এক কথার জায়গায় দশ কথা হয়। প্রচুর গল্প হয়। আর থামা যাবে না বলে ছোট বাইরেতে নেমে চা সিগারেট খেতে খেতে সময় গড়ায়। আসলে এই হচ্ছে এককথায় গাড়ি থাকার এডভান্টেজ এবং ডিসএডভান্টেজ। গত কদিন ধরে ভিকির সাথে কথার পরে ওর পড়াশোনা অনুযায়ী ঠিক হয়েছে যে আমরা প্রথম যাব ওরাং।
নর্থ ইস্টের জঙ্গলে তো প্রথমেই নাম আসে কাজিরাঙা আর তারপর মানসের। তাহলে ওরাং কেন যাব? ভিকিকে এই প্রশ্ন করতেই ও বলল যে কয়েক বছর আগের একটা রিপোর্টে ঘনত্ব অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ভারতে সব থেকে বেশী ছিল ওরাং এ। যদিও এই রিপোর্ট এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না। আর এখন এই কৃতিত্ব কাজিরাঙার। আমাদের যেহেতু কখন ফেরার ডাক পড়ে সেটা যেহেতু জানা নেই তাই প্রথমেই ওরাং করে নেওয়াটাই বেটার। সেখানে ব্যাঘ্র দর্শন হলে ভালো। না হলে কিছু তো দেখা যাবেই। তারপর যদি ফিরতে হয় তো ফিরলাম আর ফেরার ডাক না পড়লে অন্য কোথাও চলে গেলাম।
গতকাল ছিল বড়দিন। ছুটির দিন মানেই শুধু কাজ আর কাজ। সব করার পরেও দেখা গেল প্রচুর না করা কাজ থেকে গেল। সন্ধে নাগাদ সপরিবার চার্চ থেকে ঘুরে আসবার পর দেখি কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে শরীরে। খানিকক্ষণ বসে থাকার পর বুঝলাম যে এর পুরো কারণটাই হচ্ছে উত্তেজনা। কাল সকালেই যে বেরুনো। ব্যাগ গুছোনো, টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনাকাটি, আড্ডা- ইত্যাদি হয়ে বাড়ি ঢুকে আরেকবার ব্যাগ গুছোনো- এসব করে খেয়েদেয়ে বিছানায় যাবার খানিকক্ষণ পর বুঝলাম উত্তেজনায় আজ আর ঘুম তাড়াতাড়ি আসবে না। এইটা যখন একবার হয়ে যায় তখন সেই ঐশ্বরিক বস্তুকে পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। লেডি ম্যাকবেথের কথা মনে পড়ে ভয় হয়।
আসলে ঘুমোনোটা খুব দরকার ছিল। কারণ কাল গাড়ি চালাতে হবে। ঝিমুনি এসে যাওয়া ড্রাইভিং এর জন্য ডেঞ্জারাস। আমরা যাচ্ছি মোট চারজন। তারমধ্যে তিনজন আছি ড্রাইভিং জানা। তাই পালা করে তিনজনকেই চালাতে হবে। গুগল বলেছে প্রথমদিনের ডেস্টিনেশনের জার্নি মোটামুটি দশ ঘন্টার। চারটেতে উঠে সব কাজকম্ম সেরেটেরে গাড়িতে ওঠার জন্য পাড়ার মোড়ে চলে যাবার কথা ছিল সাড়ে চারটেতে। ডিসেম্বরের যা জব্বর শীত। পারলামই না। আবার রাস্তার কুকুরেরও ভয়। কয়েক মিনিট পেরুতেই গাড়ির আওয়াজ আর ভিকির ফোন- আমি তোর বাড়ির নিচেই, নেমে আয়।
নেমে বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। প্রথমেই লেট করেছি। তাই স্পিকটি নট। বাকি দুজন আর দু তিন কিমি পরেই হাইওয়ে জংশন এ অপেক্ষা করবে। এমনটাই কথা। একটু এগোতে না এগোতেই দেখি ফোন। চলে এসেছে দুই পার্টনার। আমার কিন্তু তারা অচেনাই। ভিকির পরিচিত। ঐ ঠিক করেছে। আলাপ হবার পরে দেখা গেল যে তারা এমনই সরেস যে জমে যেতে দু মিনিটও লাগলো না। আর তারপর থেকে যত বেলা গড়াতে লাগলো আড্ডাও জমতে লাগলো আর সময়ের প্ল্যানিং-এরও দফারফা হয়ে গেল।
এরপর আমরা বঙ্গদেশ ছেড়ে বঙ্গাইগাঁও, রঙ্গিয়া পেরিয়ে গুয়াহাটির রাস্তা ছেড়ে যখন মঙ্গলদৈ এর রাস্তা ধরেছিলাম ততক্ষণে বিকেল সন্ধের দিকে ধীরে ধীরে গড়াতে শুরু করে দিয়েছে। যথারীতি দুপুরে জমিয়ে রাস্তার ধারের ধাবায় হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া হয়েছে আর তারপর থেকে কেউই একটানা গাড়ি চালাতে চাইছি না, কারণ ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। আর ফোরলেন ছাড়বার পর তো গাড়ি আর সেরকম জোরে টানাও যাচ্ছে না।
খানিকক্ষণ আগে পর্যন্তও টিমের একজন শুধু অভয় দিয়ে যাচ্ছিল যে এই এলাকা ওর চেনা। কোন অসুবিধা হবে না। আর সত্যিই খানিকটা চেনাও বটে। কারণ খারুপেটিয়া নামের একটি জায়গার পরে দলগাঁও, তার আশেপাশে কোথাও একটা হাট বসেছিল। সেখান থেকে হাঁস কিনে ওর এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাতে আমরা যেখানে থাকবো সেখানে রান্না করে নিয়ে আসবে। কিন্তু এখন এই অন্ধকারে গাড়ির ভেতরে তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সেও খানিক ভয় পেয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওমন জোরালো গাড়ির আলো দেখে মাঝেমধ্যে লোক এসে দাঁড়াচ্ছে রাস্তায়। তাদেরকে জিজ্ঞেস করে করে আমরা এগোচ্ছি।
ওরাং এর একটা নম্বর কিছুদিন আগে গুগল থেকে জোগাড় করে ফোন করেছিলাম। বলেছিল যে সরকারি লজ, যার নাম প্রশান্তি, সেখানে থাকবার ব্যবস্থা আছে। তারপর থেকে সে নম্বর আর ধরছে না। সেই নিকষ কালো অন্ধকারের রাস্তা পেরিয়ে আমরা ওরাং রিজার্ভ ফরেস্টের গেটে পৌঁছে তার সাইনবোর্ড দেখে ঢুকে গেলাম সে রাস্তায়। কিন্তু হাঁকডাক করার পর যিনি বেরিয়ে আসলেন তিনি জানালেন যে তার সাথেই ফোনে কথা হয়েছিল। আর লজ আছে বটে, কিন্তু রেনোভেশনের কাজ চলার জন্য সেখানে থাকা আপাতত বন্ধ।
এবারে অবধারিত প্রশ্ন আসে যে তাহলে আমরা থাকবো কোথায়? এবারে সেই ব্যাক্তিই বললেন যে পাশেই তার বাড়ি আর সেখানে হোমস্টেও আছে। কিছু একটা আঁচ করতে পারলেও ডিসেম্বরের ঐ রাতে ওরকম ঠান্ডার মধ্যে আমাদের ওর হোমস্টেতে যাওয়া ছাড়া আর কোন অপশন নেই। অগত্যা সেখানেই গিয়ে উঠলাম। গিয়ে দেখলাম ব্যবস্থা ভালোই। আর ঘোরাঘুরির ব্যাপারেও কথা বলে জানা গেল যে ঐ ভদ্রলোকই কাল সকালে সব ব্যবস্থা করে দেবেন। জিপসিও চলে আসবে। তাই কোন সমস্যা হবে না। ইতিমধ্যে হাঁসের মাংসও চলে এসেছে। তাই আর দেরি না করে আমরা বনফায়ারের আগুন জ্বালিয়ে দিলাম।
গঙ্গা আমার মা…
ভোরে ঘুম থেকে উঠে কটেজের দরজা খুলে দেখি চারিদিক কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে। গাছ থেকে টুপটুপ করে শিশির পড়ছে। মাটি ভিজে। বুঝলাম, সব দেখেশুনে ভিকি খুব একটা প্রসন্ন নয়। কারণ জানতে চাইলে বলল যে এই রকম ওয়েদার ওয়াইল্ডলাইফ সাইটিং এর জন্য একদমই ঠিক নয়। তাহলে ঠিক কোনটা? যখন সূর্যালোক প্রচুর পরিমাণে থাকবে অথচ তার তাপ হবে কম, ভিজিবিলিটি লেবেল হবে হাই আর গ্রাসল্যান্ডের গ্রাসের উচ্চতা থাকবে কম তখনই ওয়াইল্ডলাইফ দেখা যাবে ভালো। খুবই স্বাভাবিক। অথচ কোনদিন এতটা ভেবেই দেখেনি। আসলে আমার জঙ্গলে যাওয়াই সেই অর্থে খুব কম। তাই অনেক নতুন নতুন জিনিস জানছি। ভালো লাগছে।
যেই সরকারি লজটিতে আমাদের থাকা হল না তার নাম প্রশান্তি। গুগলে লিখলে দেখায়। আর আমরা আছি ঠিক তার উল্টোদিকেই। ছোট ছোট কটেজ। দুই বা তিনজনের থাকার মতো প্রতিটি। একদম জঙ্গলের গা ঘেঁসেই কটেজগুলো। তবে বেশ উঁচু দেওয়াল এবং তার ওপর ব্লেডতার দেওয়া আছে। তাই বন্যপ্রাণের এদিকে চলে আসার চাপ কম। অবশ্য সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে বাস্তবে আমাদের দিক থেকেই ওরা চাপে থাকে।
যাই হোক, কাল আসার সময় কিছুই বুঝতে পারিনি। এখন রেডি হয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি ছোট্ট একখানা গ্রাম, যা পেরিয়ে কাল এসেছি, এই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে যেন গুটিসুটি থেকে আড়মোড়া ভাঙছে। নাম তার শিলবড়ি। আর খুব একটা নামজাদা না হয়ে উঠলেও এই ওরাং কিন্তু স্যাংচুয়ারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল বহুদিন আগে, সেই ১৯৮৫ সালে। তারপর ১৯৯৯ সালে এটি ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পায়। তখন তার নাম হয় রাজীব গান্ধী ওরাং ন্যাশনাল পার্ক। আর ২০১৬ সালে এটি ভারতের ৪৯তম টাইগার রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। আনুমানিক ৮০ বর্গকিমি কোর এলাকা নিয়ে এই টাইগার রিজার্ভ আসামের চারটি টাইগার রিজার্ভের মধ্যে ক্ষুদ্রতম। টেলিগ্রাফ পত্রিকা অনুযায়ী ২০১৩ র টাইগার সেন্সাসে এখানে বাঘের সংখ্যা ছিল চারটি শাবকসহ ২৪ টি।
এমন নয় যে সকালে উঠে এসব পড়াশোনা করে তারপর বাঘ দেখতে ঢুকছি। সবই নেট আর কথায় কথায় ভিকির কাছ থেকে জানা। সেখান থেকেই চালিয়ে দিলাম। টিকিট, পারমিশন, জিপসি,গাইড- এসব করে জঙ্গলে ঢুকতে ঢুকতে সাড়ে সাতটা বেজেই গেল। তখনও কুয়াশা বেশ ভালোই। বাঘ দেখা যাবে কি যাবে না এই নিয়ে কারুর উদ্বেগ থাকলেও আমার মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পেলাম না। বরঞ্চ আমার মন বলছিল যে ওসব খতরনাক জিনিস না দেখতে পেলেই ভালো। হঠাৎ করে যদি গুরুগম্ভীর স্বরে সে চোখের সামনে বা কানের পেছন থেকে বলে ওঠে- এই যে আমি এখানে, তখন কি হবে? তার থেকে জঙ্গলের মধ্যে কতরকমের সুন্দর পাখি ডাকছে, এতেই তো মন ভালো হয়ে যায়।
যাই হোক শেষ অব্দি আমাদের ব্যাঘ্রদর্শন আর হল না। ভিকি দেখলাম একটু মুষড়ে পড়েছে। ওকে আর আমার মনোবাসনার কথাটা জানালাম না। বাঘমামাকে দেখতে না পেলেও একপাল হাতি আর বাচ্চা সহ একটা বড় গন্ডার রাস্তা পেরুনোর সময় আমাদের দেখে রেখেছে। কি যে হবে পরে কে জানে? যদি ওরা আমাদের কথা মনে রেখে দেয় যে সকাল সকাল এরা আমাদের বিরক্ত করতে এসেছিল। তাই একটা চাপা টেনশন থেকেই যাচ্ছে।
মোটামুটি দশটা নাগাদ জঙ্গল ঘোরা শেষ করে আমরা ফিরলাম। রুটি, তরকারি, ডিমসেদ্ধ- রিসর্টে আমাদের জন্য ব্রেকফাস্টে রেডি করাই ছিল। খাবার টেবিলে বসে সেসবের সদব্যবহার করতে করতে ভিকি বললো- আর এখানে থাকবো না। বাড়ি থেকেও যেহেতু ডাক আসেনি তাই চল আমরা কাজিরাঙ্গা দেখে আসি। মনটা যেন আনন্দে নেচে উঠলো। আহা...কি কথা।
ততক্ষণে রোদ উঠে পড়েছে। গতকাল সন্ধেবেলার সেই অন্ধকার শিলবড়ি গ্রামের রাস্তায় এখন শীতের সকালের কাজের ব্যস্ততা। মানুষজন ধান শুকোতে দিচ্ছে। পরিশ্রমের ফসল। লোকজন কেউ যাতায়াত না এমনটা ধরে নিয়েই তারা রাস্তার ওপর সোনা রঙের ধান মেলে দিয়েছে। এখন আমাদের যেতেও হবে তার ওপর দিয়েই। উপায় নেই। শিলবাড়ি বাজারে এসে লোকজন এবং গুগলের সাহায্যে রাস্তা ঠিক করে নিয়ে আমরা কাজিরাঙার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিলাম।
ঘড়িতে সময় দুপুর দুপুর। গাড়ি চলছে ভালোই। আমরা ইতিমধ্যে ঢেকিয়াজুলি, তেজপুর পেরিয়ে লাঞ্চ করে নিয়েছি। চমৎকার রাস্তাঘাট আসামের। ফালতু পুলিশের ঝামেলা নেই। একটু কিছু জানতে চাইলে অনেকটা বলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এল বিশাল বহ্মপুত্র নদ।
আহা... এই সেই ছোটবেলার ভূগোল বইয়ে পড়া ব্রহ্মপুত্র । যার তিব্বতে উৎপত্তি এবং সেখানে তার নাম সাংপো। তারপর অরুণাচল হয়ে আসামে ঢুকে বেশ খানিকপথ ব্রহ্মপুত্র নামে পাড়ি দিয়ে একসময় তিস্তাকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নিয়েছে। এরকমভাবেই হয়তো কোন একদিন এর ওপর দিয়ে যেতে যেতে বা পাড়ে দাঁড়িয়ে ভূপেন হাজারিকা গেয়ে উঠেছিলেন-
“গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা
আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা
মেঘনা যমুনা...”
সেই ব্রহ্মপুত্র পেরুচ্ছিলাম আর এসব কথা ভাবতে ভাবতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কোহরা বা কোহরা মোড়। সেটাই কাজিরাঙা জঙ্গলের নিকটবর্তী জনপদ। তার আগের মোটামুটি বড় জনপদ জাকলাবান্ধা। এখন আমরা তার কাছাকাছিই।
ঘুম ঘুম...
ঐ দেখ…
শুনেই ধড়মড় করে জেগে উঠলাম। জাকলাবান্ধা পেরুতে পেরুতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল কে জানে। দেখলাম শুধু আমি নই। যে গাড়ি চালাচ্ছিল সে ছাড়া বাকি দুজনও একইভাবে আমার মতোই অবাক হয়ে লাল চোখে বাইরে দেখছে। রোদের তেজ অনেকটাই পড়ে এসেছে এখন। আর খানিকক্ষণ পরই হয়তো সন্ধে নেমে যাবে। জাকলাবান্ধা থেকে কাজিরাঙ্গা বা কোহরা অভিমুখে আমাদের বামদিকে এখন বিস্তীর্ণ ঘাস এবং জলাজমি। আর সেখানেই চড়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি গন্ডার, ওয়াটার বাফেলো আর হরিণের পাল।
কাজিরাঙ্গা যাচ্ছি শুনে বন্ধুদের অনেকেই বলেছিল যে গরু ছাগলের মতো গন্ডার না কি দেখতে পাবো। তো সে গরু ছাগলের মতো না হলেও এইভাবে জঙ্গলে বা রিসর্টে ঢোকার আগেই যে ওয়াইল্ড লাইফ দেখতে পাবো ভাবতেও পারিনি। ওদিকে বন্যপ্রাণ দেখাও হল আর এদিকে রিসর্টে ঢুকতে ঢুকতে সন্ধেও পেরিয়ে গেল।
রিসর্টের নাম চিকুনি ভবন। ভিকি আগেই নেট দেখে বুক করে রেখেছিল। সুন্দর ছিমছাম একটা আভিজাত্য আছে রিসর্টটার মধ্যে। আমাদের থাকার জন্য যে ঘরটা দেওয়া হল তা বেশ বড়। একঘরে চারজনের আরামসে হয়ে যাবে। এমন ঘরই তো চাইছিলাম, তাহলে আনন্দ একটু বেশিই হয়। এই একজন আরেকজনের লেগপুল করলো। আরেকজন কিছু একটা বললো- সেটা নিয়ে খানিকক্ষণ হাহাহিহি হল, এই আর কি। শুধু সকালবেলাতেই যা একটু সমস্যা। যাইহোক, রিসর্টের সাথে কথা হয়ে গেল। কাল সকালে জিপসি চলে আসবে সাফারির জন্য। আমাদেরকে বলা হল সাড়ে সাতটা নাগাদ রেডি থাকতে। আটটা নাগাদ তাহলে জঙ্গলে আমাদের এন্ট্রি হবে। কুয়াশা থাকলেও ততক্ষণে তা আশা করা যায় কমে যাবে।
ওরাং ঘুরে কাজিরাঙা এসে মনে হচ্ছে যে এখানকার অধিবাসীরা খুব ভালোমতো বুঝতে পেরেছেন- বন্যপ্রাণ আর পর্যটক, এই দুইই এলাকার আর্থিক উন্নতি ঘটাতে সক্ষম। তাই এই দুইটি ফ্যাক্টরকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না। বন্যপ্রাণকে যেমন দিতে হবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। আবার পর্যটকের কমফোর্টের কথাও মাথায় রাখতে হবে। যদি পর্যটক একজনও থাকে এবং তিনি যদি রাজি হন গোটা সাফারির জিপসি এবং গাইডের খরচ বহন করতে তবে তাকে নিতে রিসর্টেই জিপসি চলে আসবে। তাতে টাকা হয়তো একটু বেশি লাগবে। কিন্তু ভোরবেলা গিয়ে লাইন দিয়ে ট্যুরিস্টকেই টিকিট কাটতে হবে- এই হ্যাপার থেকে সে বাঁচবে। এটিই আমাদের এদিকের জঙ্গল ঘোরার সাথে ওদিকের জঙ্গল ঘোরার মূল ফারাক।
যাই হোক, আবার ভিকির কাছ থেকে পাওয়া কিছু তথ্য শেয়ার করি। প্রিয় পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন যে এসবের আবার কি দরকার, নেট ঘাঁটলেই তো একদম সব হাতের সামনে। তা তো বটেই। কিন্তু ঐ, লেখাটা পড়তে পড়তে জানা হয়ে থাকলে ভালো, কখন কাজে লেগে যাবে কে জানে। তখন আপনিও কাউকে বলতে পারবেন।
স্বাধীনোত্তর ভারতে ১৯০৫ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে স্থাপিত হওয়া কাজিরাঙা ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল পার্কের তকমা পেয়ে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ২০০৬ সালে টাইগার রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের একশৃঙ্গ গন্ডারের দুই তৃতীয়াংশ এখানে বাস করে। তবে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বা অন্যান্য যে কোন বন্যপ্রাণের জন্যও এই জাতীয় উদ্যান কম বিখ্যাত নয়। বর্তমানে এর মোট পাঁচটি রেঞ্জ।
১) সেন্ট্রাল বা কোহরা রেঞ্জ
২) বাগোরি বা ওয়েস্টার্ন রেঞ্জ
৩) আগরতলি বা ইস্টার্ন রেঞ্জ
৪) বুরাপাহাড় বা টপ ইস্টার্ন রেঞ্জ এবং
৫) বিশ্বনাথ বা নর্দান রেঞ্জ
এদের মধ্যে বিশ্বনাথ বা নর্দার্ন রেঞ্জে পর্যটক একটু কমই যায়। পর্যটক সমাগম সবথেকে বেশি ঘটে প্রথমের চারটি রেঞ্জে আর তাদের মধ্যে আবার সবথেকে বেশি সেন্ট্রাল বা কোহরা রেঞ্জে। প্রথমবার এলে সবারই কাজিরাঙা ভ্রমণ শুরু হয় সেন্ট্রাল রেঞ্জ দিয়েই আর আমরাও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হব না।
সন্ধেবেলা ঘরে বসে থাকার কথা ভাবাই যায় না। এখানেও তার ব্যতিক্রম হল না। একটু ফ্রেশ হয়ে আর একটু রেস্ট নিয়েই আমরা সদলবলে চললাম কোহরা বাজারে। বাজার কোহরা মোড়ের আশপাশ দিয়েই। বাস জাতীয় পাবলিক ভেহিকেলে কেউ যদি কাজিরাঙা আসতে চান তবে তাকে নামতে হবে এই কোহরা মোড়েই। আর টিকিট বা ঘোরার পারমিশন ইত্যাদি যাবতীয়র অফিসও এখানেই।
যস্মিনদেশে যদাচার। বাবু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কোন এলাকাকে বোঝার জন্য তার বাজারে বাজারে ঘুরতেন। তো কোহরা বাজার ছোট্ট গঞ্জের বাজার হলেও প্রচুর শুঁটকি মাছের দোকান আর সেখানে এতরকম ভ্যারাইটির শুঁটকি যে গুনে শেষ করা যাবে না। আর একইসাথে পান সুপুরির দোকানও অজস্র। একটা জমজমাট চায়ের দোকানে বসে আমরা স্থানীয় লোকজনের সাথেই চা-চপ-সিঙ্গারার সদগতি করলাম।
এসব করতে করতে ঘড়িও ঘুরেছে ভালোই আর দেখি দোকানও সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঝপাঝপ। আমাদের আবার রিসর্টে খাওয়া বলা হয়নি। অতএব খ্যাটন বাইরেই। তাড়াতাড়ি একখানা দোকান দেখে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে বসলাম। স্থানীয় একদুটি পদ সহযোগে খাবারও চলে এল গরম গরম। আমাদের ওদিককার মতোই সব। কেবলমাত্র ভাতটি ছাড়া। কারণ, পরে জেনেছি যে এদিকে বেশিরভাগ দোকানেই আতপচালের ভাত হয়। সব সেরে ঘরে ফিরে আমরা তাড়াতাড়িই বিছানায় চলে গেলাম আর সারাদিনের পরিশ্রমের পর নিদ্রা দেবীরও আমাদেরকে দেখা দিতে বেশি দেরি হল না।
ঐ উজ্জ্বল দিন…
পরদিন সকালে সাফারির লাইনে গিয়ে তো চক্ষু চড়কগাছ। কত কত যে জিপসি পর্যটক নিয়ে ঢোকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে গেটে তার ইয়ত্তা নেই। ঢুকে খানিকদূর এগোতেই বেশ কয়েকটি হাতি দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। কে যেন-এগুলো সব সাফারির হাতি, বলতেই কোনক্রমে নিজেকে সামলে নিলাম। গেটেই রঙ বেরঙের কয়েকটি পাখি আমাদের স্বাগত জানাল। কেউ বললো এরা কালিজ, কেউ আবার বললো যে এরা জাঙ্গল ফাউল। কে জানে তবে বেশ রংচং এ ছিল সবগুলোই।
চমৎকার সকাল। একফোঁটা কুয়াশা নেই। শীতের নরম রোদে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সবই। ঐ যে গন্ডার, ঐ যে হাতি, ঐ যে হরিণ, ঐ যে ময়াল রোদ মাখছে। কিন্তু মন ভরছিল না। কারণ সবই ঐ ঘাসজমির জন্য, তার মধ্যেই সব প্রাণীরা। এমনিই আমার বন্যপ্রাণী দেখার কপাল খুব খারাপ। এরকম বহুবার হয়েছে যে একই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একইদিনে যাতায়াত করা সবাই হয়তো কিছু দেখেছে, একমাত্র আমিই কিস্যু দেখিনি। এই ভাবতে ভাবতেই খানিক দূরে জঙ্গলের মধ্যে খুব ব্যস্ত এক গন্ডারকে দেখলাম। খুব তাড়া ছিল মনে হয় তার কারণ আমাদেরকে বেশি সময় না দিয়েই তিনি নিজের কাজে চলে গেলেন। তবে বেশিক্ষণ নিরাশ হতে হল না। এবারে একদম জিপসির সামনেই চলে এলেন আরেকজন। আহা…কি চেহারা। মনে একটু শান্তি পেলাম।
এরপর এদিক সেদিক ঘুরে আমরা এসে দাঁড়ালাম এমন এক জায়গায় যেখানে চারিদিকে অনেক বড় বড় জলাশয়। সেখানে বিশাল ঠোঁটওয়ালা কিছু পেলিকান মনের আনন্দে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। আরো কিছু পাখির ঝাঁক সেই জলার একজায়গা থেকে মাঝেমধ্যেই উড়ে ডাকতে ডাকতে আরেক জায়গায় বা আরেক জলায় গিয়ে বসছে। যেন এইরকমভাবে উড়ে ওরা খানিক ওড়া আর ডাকা প্র্যাকটিস করে নিচ্ছে। সেখান থেকে বেরিয়েই নরম জলা জমিতে দেখি কিছু ওয়াটার বাফেলো। সেখানে গা এলিয়ে দিয়ে মুখটা আকাশের দিকে করে মৌরি চিবোনোর মতো করে জাবর কাটতে কাটতে তারা আমাদের দিকে যেন খানিক দার্শনিক দৃষ্টিতে তাকালো। যেন ভাবটা এমন... কি দরকার এত উজিয়ে আমার দেখতে আসার...যাও না বাপু নিজের কাজে...
যাইহোক, জঙ্গল ঘুরে এসে যখন কোহরা মোড়ে নামলাম তখন মোটামুটি সকাল সাড়ে দশটা পৌনে এগারোটা বাজে। দুপুর দুটোয় আমাদের আবার সাফারি বাগোরি রেঞ্জে। মাঝে একটু হাতে সময় আছে। জিপসি আমাদের নিয়ে চলল স্থানীয় সংস্কৃতির একটি পার্কে। স্থানীয় মহিলারা –শাড়ি, ফুলদানি ইত্যাদি বিভিন্ন সুন্দর জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছেন। খাবারদাবারও আছে। আমরা ওখানেই লাঞ্চ সেরে নিলাম। তারপর ঘরে ফিরে স্নান সেরে একটু গড়িয়ে নিতে নিতেই দেখি ঘড়ির কাটা দুটোর আশেপাশে আর আমাদের জিপসিও পিকআপ করতে চলে এসেছে।
সকালে সেন্ট্রাল বা কোহরা রেঞ্জ ঘুরে তেমন ওয়াইল্ডলাইফ দেখতে না পেয়ে মনে যতটুকু খেদ জন্মেছিল সব যেন ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল বিকেলের বাগোরি রেঞ্জ। শীতের নরম রোদের হলুদ বিকেলে যেন ওয়াইল্ড লাইফগুলো সব আমাদের অপেক্ষাতেই ছিল। এক নয়, দুই নয়-গোটা চার পাঁচেক ইন্ডিয়ান ওয়ান হর্ণ রাইনো বাচ্চাসহ আমাদের একদম কাছে মনের সুখে ঘাস চিবিয়ে যাচ্ছে। আবার সামান্য একটু দূরেই দেখলাম মেল চেজিং ফিমেল রাইনো। এছাড়াও ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ, ওয়াটার বাফেলো এইসব তো আছেই। তারপর গিয়েছি এক ওয়াচটাওয়ার এ। এদিক ওদিক ঘুরছি দেখছি। হঠাৎ করে দেখি কাছেই গাছের ফাঁকে এক বিশাল ঐরাবত। আঁতকে উঠে যেই দৌড়তে গিয়েছি দেখি এক গাইড হাসছে- ও নাকি আশেপাশেই থাকে, কাউকে কিছু বলে না। কিন্তু কি দরকার বাবা আর ওখানে থেকে, আমাকে যদি কিছু বলে, তখন?
তবে সব থেকে অবাক লাগলো কি অদ্ভূত মিল সব বন্যপ্রাণের মধ্যে। যেখানে ফুলের মতো এক হরিণ তার আরো ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটিকে স্তন্যদান করছে সেখানে হাত কয়েকের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশাল ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার। যে চাইলেই নিমেষের মধ্যে তার আশেপাশের সব কিছুকে তছনছ করে দিতে পারে। অথচ সে কিন্তু তার এই বিশালত্বকে কখনোই হরিণের মতো দুর্বল প্রাণীর ওপর প্রয়োগ করছে না। বরঞ্চ মনে হচ্ছে তার যাবতীয় মনোযোগ তার সামনের ঘাসে। মনে মনে ভাবি আহা…এমন যদি মানুষের দুনিয়া হত… একই পৃথিবী…সেখানে কেউ বড় ছোট- শক্তিশালী দুর্বল নেই…সবাই মিলে একসাথে বাস করাতেই সকল আনন্দ…তাহলেই যেন কবির কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেত…
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
তবে ষোলকলা আমাদের পূর্ণ হল যখন ফিরছি তখন। আবার এক বিশাল জলাশয়। তাকে শীত বিকেলের অস্তগামী সূর্য নিজের সকল রং ঢেলে যেন রাঙিয়ে তুলেছে। আর তার ঠিক সামনেই একের পেছনে আরেক হয়ে সিল্যুয়েটে পরপর দাঁড়িয়ে আছে সব ওয়াটার বাফেলো। যেন বার্গম্যান স্বয়ং এসে এই জঙ্গলে এসব কারসাজি দেখাচ্ছেন। বলছেন দেখ কিভাবে স্বপ্ন সাজাতে হয়।
বেরুলাম যখন তখন রাত হয়ে গিয়েছে। ডিসেম্বর মাসের ভারতের উত্তর-পূর্বের শীত যে কেমন কাঁপুনি দিতে পারে তা একমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন। আর আমরা তো চলছি হুডখোলা সাফারি জিপে। হাওয়ায় যেন একদম জমে যাচ্ছি। কোনক্রমে রিসর্টে এসে চা খেয়ে সেই কাঁপুনি থামলো। আর তারপর সবাই যে যার বিছানায় লেপের নিচে সেঁধিয়ে গিয়ে শুরু হল মিটিং। বিষয়-অতঃকিম?
এখোনো বাড়ি থেকে ফোন আসেনি। আর ক্রিসমাসের ছুটিরও এক দুদিন এখোনো হাতে আছে। তাহলে কি আমরা আবার অন্য কোথাও পাড়ি জমাবো? মনের কোণে যেন একমুঠো রোদ এসে পড়ে। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে পকেটের রেস্ত। সে কি সাথ দিতে পারবে যদি আমরা এই ট্যুরকে আরো এক্সটেন্ড করি? তবে সবাই দেখা গেল একটা বিষয়ে একমত যে- হ্যাঁ, ট্যুর এক্সটেন্ড হোক, কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু পকেট গড়ের মাঠ হলে তো শুধু শুধু ট্যুর এক্সটেন্ড করে কোন লাভ হবে না। কারণ-
পথে এবার নামো সাথী
পথেই হবে পথ চলা-র -
দিন গিয়েছে। এখন কড়ি ফেলেই পথ চলতে হয়। সবার পকেটে যা ছিল বের করে দেখা গেল খুব বাজেটে চললে আমাদের আরো একখানা জঙ্গলের ট্যুর হয়ে যাবে। তবে, হ্যাঁ, কিছু কিছু কম্প্রোমাইস করতেই হবে। যেমন ঘর একখানাই নিতে হবে। তাও যতটা সস্তায় হয়। আর একদম অপ্রয়োজনীয় খরচ করাই যাবে না। আর গাড়িতে যা তেল আছে তাতে ফেরার পথে একখানা জঙ্গল হয়ে যাবে। শুধু উল্টোপথে যাওয়া চলবে না। তাহলে কি আমরা এবার মানস যাবো? কারণ ফেরার পথে তো ওটাই একমাত্র বড় জঙ্গল(তখনও আমরা রাইমনার নাম জানতাম না)। আহা… কি আনন্দ… এত সুন্দর একটা দিনের শেষে মনে একরাশ আশা নিয়ে বিছানায় গেলাম।
কান্ট্রি রোডস...
যাদের সকালে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যেস, তাদের ওঠার পর কাজকম্ম না থাকলে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আজ আমাদের সাফারি নেই। উঠে শুধু একটাই কাজ। বাড়ি অভিমুখে রওনা দেওয়া। তবে বাড়ি অভিমুখে রওনা দিলেও আমরা কিন্তু বাড়ি যাব না। যাব মানস ন্যাশনাল পার্ক। তাহলে সারাদিনে শুধু এটুকুই আজকের কাজ- মানসে পৌঁছনো। তাই যা হবার তাই হল। উঠে এই বের হচ্ছি, বের হচ্ছি করতে করতে সাড়ে নটা দশটা হয়ে গেল। তারপর ব্রেকফাস্ট করে চা খেয়ে ছুটলো আমাদের গাড়ি।
ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে তেজপুর হয়ে আমরা রাস্তা ধরলাম উদালগুড়ির। তবে যা হয়, আগেই বলেছি। নিজেদের বাহন থাকার এডভান্টেজ এবং একইসাথে ডিসএডভান্টেজ। যদিও গুগল দেখাচ্ছিল যে আজ আমাদের জার্নি মেরেকেটে খুব বেশি হলে তিনশো কিমির আশেপাশে আর সেটুকু পথ পেরুতে আমাদের লাগবে সাড়ে ছ থেকে সাত ঘন্টা। তাই খুব বেশি হলেও পাঁচটার জায়গায় ছটার মধ্যে হলেও আমাদের মানসে ঢুকে যাবার কথা। কিন্তু দেখা গেল ঐ সময় নাগাদ আমরা মানসের কাছাকাছি এসেছি বটে কিন্তু দিল্লী তখনও বেশ দূর। এসব হচ্ছে সারাদিন ধরে রাস্তায় নেমে গল্প, চা খাওয়া ইত্যাদির ফল।
ফল একদম হাতেহাতেই মিললো। বছর শেষের দিকে। সবাই সারা বছরের খাটাখাটনির পর নতুন বছরের জন্য অক্সিজেন নিতে বেরিয়ে পড়েছে। মানসও একদম গিজগিজ করছে ট্যুরিস্টে। আমরা যদিও আসার পথে নেটে ছবি দেখে একখানা লজের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখা গেল ঘরে গিজার নেই। আর এই শীতে সারাদিন পর ফ্রেশ হবার জন্য একটু গরম জল তো নিদেনপক্ষে লাগবেই। তাই সেখানে আমাদের থাকা হল না। অন্য সর্বত্র একদম ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা।
এবারে এদিক সেদিক। ঘড়ির কাটা ঘুরে যাচ্ছে অথচ আমাদের থাকার স্যুইটেবল জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। সব হচ্ছে তো বাজেটে হচ্ছে না। এইসব করতে করতে অবশেষে একখানা লজে আমাদের জায়গা হল। ঘর একটু ছোটই। তবে বিছানা, লেপ ইত্যাদিরও সমস্যা নেই। অতএব তাই সই। ঝটপট রাতের খাবার সেরে আমরা লেপের নিচে ঢুকে পড়লাম। কথা হয়ে গিয়েছে। কাল সকালে মানসে আমাদের সাফারি।
এবারে আবার মানস সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেওয়া যাক। ১৯২৮ সাল থেকে পথ চলতে শুরু করা এই স্যাংচুয়ারিটি ১৯৯০ সালে এসে ন্যাশনাল পার্কের তকমা পায়। এর একটি অংশ ভুটানের মধ্যে পড়ে যেটি রয়্যাল মানস নামে পরিচিত। কিন্তু ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষিত হওয়া মানস ন্যাশনাল পার্ককে ২০০৮ সালে পোচিং বা চোরা শিকারের এর জন্য এনডেঞ্জার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যদিও সংরক্ষণ ঠিকঠাক পথে এগোনোয় মানসকে পরে এই তকমা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। বন্যপ্রাণের সংখ্যাও বেড়েছে মানসে।
ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে আসামের বরপেটা জেলায় মানস নদীর পাশে অবস্থিত এই ন্যাশনাল পার্কের ফান্ডা কাজিরাঙ্গার মতো ওয়ান হর্ণ রাইনোর জন্য হলেও এর কিছু আলাদা কৃতিত্বও আছে। এখানে দেখা মেলে গোল্ডেন লাঙ্গুর বাঁদর এবং পিগমি হগ এর যাকে আমরা ছোট বুনো শুঁয়োর নামে সাধারণভাবে চিনি। পৃথিবীতে এটিই পিগমি হগের একমাত্র স্বীকৃত বাসস্থান। টাইগার রিজার্ভের পাশাপাশি ৩৯০০০ হেক্টরের এই মানস ন্যাশনাল পার্ক আবার এলিফ্যান্ট রিজার্ভ হিসেবেও পরিচিত। তিনটি জোনে বিভক্ত এই পার্কের জোনগুলি হল-
১) বাঁশবাড়ি
২)ভুঁইয়াপাড়া এবং
৩)পানবাড়ি
যার মধ্যে আমরা গিয়ে উঠেছি বাঁশবাড়ি জোনে। এটিই পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকে মানসের সব থেকে কাছের জোন।
সকালে উঠে মন ভরে গেলো। আহা…কি সুন্দর জায়গা। আমাদের লজটি একদম রাস্তার পাশে নয়, সরু গলি দিয়ে একটু ভেতরে। রাস্তায় এসে দেখি উল্টোদিকে বিস্তৃত সবুজ গালিচার মতো চা বাগান। আর একটু এগোলেই মানস ন্যাশনাল পার্কের গেট। তবে যদি বাঁশবাড়ি লজে বা যেখানে আমরা প্রথম ঢুকেছিলাম সেসব জায়গায় থাকতে পারতাম তবে আরো কাছাকাছি হত। যাই হোক, ওত রাতে যে জায়গা পাওয়া গিয়েছে তাই বা কম কি।
সকাল সকাল জিপসি চলে এসেছে। আমরাও রেডি। অতএব চালাও পানসি বেলঘরিয়া। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই মন ভরে গেল। শীতের সকালের সোনা রোদ কিছু বেশ বড় বড় গাছের মধ্যে দিয়ে গেটের বাঁদিকে একটা জায়গায় এসে পড়েছে। আর সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে অজস্র ময়ূর। রোদ পড়ে তাদের পেখমের বাহার যেন ঝলক দিয়ে যাচ্ছে। এই এত বড় বড় প্রাণীর জায়গায় এসে কেউ হয়তো ময়ূরের ছবি তোলার জন্য দাঁড়াচ্ছে না, কিন্তু তা বলে ভারতের জাতীয় পাখিটির চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া সৌন্দর্যে কিন্তু কোন ঘাটতি নেই।
দেখা মিললো। তবে দেখা মিললো সেসবেরই যেগুলোর জন্য বিশেষত মানস বিখ্যাত। যেমন গাছের মগডালে বসে দেখা দিল সোনালী লাঙ্গুর ঠিক তেমনই দূর থেকে হলেও দেখলাম পিগমি হগ। এছাড়াও ওয়াটার বাফেলো ছিল একদম সামনে। হরিণও দেখা দিল অনেক। তারপর এপথে সেপথে ঘুরে একসময় আমরা পৌঁছলাম মাথানগুড়ি বনবাংলোয়।
জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে মানস নদীর পাশে অবস্থিত এই বাংলোটিতে পর্যটকদের থাকতে দেওয়া হয়। বহুদিন আগে আমাদের এক বন্ধু সপরিবার গাড়ি নিয়ে এই বাংলোতে থাকতে এসেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে যায় আর সাথে শুরু হয় বজ্রপাতসহ মুষলধারায় বৃষ্টি। সেই বজ্রপাত আর বৃষ্টির মধ্যে সেই বন্ধুর মাথানগুড়ি বাংলোয় পৌঁছনোর গল্প মনে পড়ে গেল। বাজ পড়ছে আর তার আলোয় দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ওয়াইল্ডলাইফ দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ঠিক পাশেই। আর যে গার্ড দিয়েছে গেট থেকে সে গাড়িতে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
চমৎকার ব্রেকফাস্ট মিললো লজে ফিরে। প্রচুর পরিমাণে তা দিয়ে উদরপূর্তি করে আমরা রওনা দিয়ে দিলাম বাড়ির দিকে। এখনো অব্দি ফিরে আসার জন্য কোন আর্জেন্ট কল আসেনি। আর হাইওয়েতে উঠে আসার পর গাড়িও চলতে শুরু করলো ভালোই। সামান্য এগোতেই আসাম সীমান্তের শ্রীরামপুর পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম পশ্চিমবঙ্গে। বারোটা নাগাদ মানস থেকে বেরিয়ে আনুমানিক সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা চলে এলাম বারোবিশায়। তারপর লাঞ্চ।
আর তারপরই শুরু হয়ে গেল সেই পুরোনো খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পের নতুন ভার্সন। আরে চলেই তো এসেছি, বাড়ি আর কতক্ষণ, এখানে একটু দাঁড়াই, ওখানে একটু চা খাই। এই করতে করতে যখন সেই হাইওয়ে জংশনে এসে পৌঁছলাম, ঠিক যেখান থেকে দুই পার্টনার যোগ দিয়েছিল, আজ তারা সেখান থেকে তাদের রাস্তায় চলে যাবে, তখন মোটামুটি রাত দশটা বেজে গিয়েছে।
এই তিন চারদিনের মজা খুনসুটি লেগপুল সব কিছুর পর এই একটা সময় এসে মন খারাপ হয়ে যায়। নদীর ঘাটের মতো এই জীবন। কত কত জায়গায় নৌকোর মতো কিছু লোক কয়েকটি দিন একসাথে কাটিয়ে যায়। আর হয়তো সারা জীবনে তাদের সাথে দেখা হবে না। শুধু মনে থেকে যাবে কয়েকটি দিনের এই স্মৃতি। কখনো একলা বসে সেই স্মৃতির এলবামের পাতা ওলটাতে ওলটাতে আরামসে ঘুরে আসা যাবে আসামের সেই জঙ্গলে কাটানো একসাথের দিনগুলোতে, যেখানে প্রকৃতির অপরূপ অফুরন্ত প্রাচুর্যের খুব সামান্যই দর্শন করার সুযোগ এসেছিল। আর শুধু মনে মনে ভাববো আর কি জীবনে এমন কোন দিন আসবে না যখন একটি মাত্র রাত হলেও কোথাও একসাথে কাটাতে পারবো আমরা?
১)প্রশান্তি লজ, ওরাং-০৯৮৫৪১৬৫৩৫১
২)চিকুনি ভবন, কাজিরাঙা-০৬০০০১৬৫৭৮১,০৯৪৩৫২৩৫৩৮১
৩)ভাগিরথী গেস্ট হাউস, মানস-০৬০০১৫২৮২২৫,০৯৯৫৭৯৯৪৩৯৪



















Comments