জোড়াচুয়া’র দিনগুলি

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

বন্ধুত্বের রকমফের বিভিন্ন। ভাগাভাগিও। সব জায়গায় সমানভাবে সকলের সাথে খাপ না খাওয়াটাই স্বাভাবিক আবার কার সাথে যে কোথায় খাপ খাবে তা আপনিও জানেন না! তেমনি পান্ডের (সুরজিত) এর সাথে হাজার একটা বিষয়ে মিল না থাকলেও, সেকেন্ডে সেকেন্ডে প্রচণ্ড ঝামেলা হলেও, বেড়ানোর দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি এক না হলেও, আমরা দুজন একে অপরের বেড়ানোর খুব ভালো সঙ্গী। আর একজন ছিল পার্থ, তবে সে এখন নিদ্রামগ্ন।

আমরা শেষ একসাথে গেছিলাম পুরুলিয়া প্রায় বছর তিনেক আগে। তার পর থেকে আলাদা আলাদা ঘুরলেও একসাথে হয়নি। কারনটা অবশ্যই আমার, আমি সংসারী। যাইহোক অনেক টাল বাহানা পেরিয়ে, ২০১৮ এর ডিসেম্বরের মাস কয়েক আগে ঠিক করা কয়েকটা স্পটের ভিতর বেছে নেওয়া জোড়াচুয়া। এর জন্য আমরা ঋণী একটি ফেসবুক গ্রুপের কাছে। সেখানে একটি পোস্টে পড়েছিলাম একটা লাইন, কিছুটা এইরকম- ‘...একরাত জোড়াচুয়া বনবাংলোর ছাদে রাত্রে মাল খেয়ে দেখিস’। এই লাইনে ও সেই পোস্টের ছবিতে ফিদা হয়ে খোঁজ খবর, সেখানে থেকে কুলডিহার ট্রাভেল এজেন্ট মনোরঞ্জন দাশ এর ফোন নাম্বার পাওয়া, ফোন করা, দরদাম, প্রাথমিক তারিখ ফাইনাল, এবং মানসিক প্রস্তুতি শুরু ও জটিলতার প্রবেশ।

উড়িষ্যার কুলডিয়া অরণ্যে থাকার বর্তমান ব্যবস্থা সরকারী ভাবে আছে। টেন্ট লাগিয়ে তার শহুরে ব্যবস্থা। সেসব আমাদের না পসন্দ। জঙ্গলের মাঝে আরো দুটো জায়গা আছে, একটা কুলডিহা বিট আর একটা জোড়াচুয়া বিট, যেখানে এখন সরকারি ভাবে থাকা যায় না। বনদপ্তরের কর্মীরা থাকেন এবং সাথে ইন্সপেকশন বাংলো রয়েছে। এই বাংলো বুক করার সহজ উপায় মনোরঞ্জন দাশের ফুল প্যাকেজ। বালাসোর টু বালাসোর। কস্টলি। প্রাথমিক ভাবে ঠিক ছিল আমরা তিনজনেই যাব। সবার অফিস ছুটি-ছাটা নিয়ে ডেট ঠিক হল ডিসেম্বরের বারো। কিন্তু এরপরেই বেঁকে বসল পার্থ। ওর নানান অজানা অসুবিধে! আমরা দোটানায়। শেষমেশ প্রস্তুতি নিলাম, একবার যখন ঠিক হয়েছে তখন না হয় দুজনেতেই  যাব।

বছর এগারো আগে আমরা তিনজনেই গেছিলাম সিমলিপাল। সেখানে জঙ্গলের ভিতরে একরাত কাটানোর অভিজ্ঞতার জন্যেই কুলডিহার থেকেও জোড়াচুয়াই আমাদের বেশি আকর্ষণ করেছিল, একদম গভীর অরণ্যের মধ্যে হটাত করে বসে যাওয়া কয়েকটা ঘরের সমাহার এই বিট। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু সবুজের হাতছানি, বন্যপ্রাণীদের অবাধ চারণভূমি। সন্ধ্যায় টিমটিমে জ্বলে ওঠে কয়েকটা সোলারের বাল্ব, রাত বাড়লেই তাদের আয়ু ফুরিয়ে আসে। মনোভাইকে অ্যাডভান্সের টাকা পাঠানো হয়ে গেল, কাটা হল সকাল সাড়ে সাতটায় ফলকনুমা এক্সপ্রেসের টিকিটও। শেষ মুহূর্তে ব্যক্তিগত কিছু অসুবিধে কাটিয়ে আমিও রেডি। গোছগাছ একবারেই নগণ্য। আদিম বন্যতায় শহুরে বস্তু যতটা এড়ানো যায়!

ট্যাক্সিটা লেকটাউনের ক্রসিং পেরিয়ে ছুটছে হুহু। আমার মনের গুমোট ভাবটা কাটিয়ে দিচ্ছে ভোরের মিঠে ঠান্ডা বাতাস। শহরে শীত পড়ছে। মানুষজন ঘুমিয়ে আছে ছ’মাস! ভালো লাগছিল, ভোরের ব্যস্ততা, চা গুমটির ধোঁয়া, ফাঁকা ক্রসিং এ আলোর বিরামহীন খেলা। যখন হাওড়া এসে পৌঁছলাম, তখনও হাতে ঘণ্টা খানেকের উপর সময়। চা খেয়ে সিগারেট নিয়ে, স্টেশনে গিয়ে বসে ঘুরে ফিরে ট্রেনে উঠে আরামে পা ছড়িয়ে দিয়েও পান্ডের দেখা মেলে না! ওর লোকাল ট্রেন তখনও স্টেশন ঢোকেনি। হালকা টেনশন! শেষমেশ ট্রেন ছাড়ার কয়েক মিনিট আগে ওর আগমন। এবং জানালার ধারের সাইড সিটে দুজনের একে অপরকে খিল্লী শুরু। এদিক ওদিক ছোঁকছোঁক মন। হেলতে দুলতে খড়গপুর ঢুকতেই এগারো বছরের পুরাতন স্মৃতি মারে উঁকি...সেই সেবার সিমলিপাল যাওয়ার সময় এই স্টেশনে এক অখাদ্য বা কুখাদ্য আলুরদম কেনা হয়েছিল...সেসব রোমন্থন সেড়ে নিয়ে নামলাম স্টেশনে, পাণ্ডে সকাল থেকে সামোসা-সামোসা করছিল, কিন্তু পেট রোগা দুই ভাই আমরা, তাই একটু সাউথ ইন্ডিয়ানে রুচি চালাতে গিয়ে আবারো সেই ভয়ংকর এক প্লেট ‘বড়া’র পাল্লায় পড়লুম! কয়েকটি ছেলে জেনারেলের টিকিট কেটে তাতে রিজার্ভেশনের ফাইন লাগিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের সামনে, আমাদের কম্পার্টমেন্টের আর একটি বেশ বড় ফ্যামিলিও নামবে বালাসোর। ট্রেনটা বেশ ঝোলাচ্ছে। ওদিকে মাঠঘাট, লাল মাটির রাস্তা, কুড়ে ঘরের গায়ের লেখার হরফ বদলে গেছে। উশখুশ করতে করতে শেষমেশ ট্রেনটা আমাদের প্রায় এগারোটা নাগাদ বালাসোর নামিয়ে দিয়ে ভাগলবা।

পাণ্ডে ফোন লাগাতেই এসে হাজির আমাদের ড্রাইভার বাবুলি। হাট্টাগাট্টা চেহাড়ার বছর তিরিশ পার করা জোয়ান (যদিও সে একবার বলেছিল তার বয়স নাকি মাত্র তেইশ, একটু বেশি বেশি খেয়ে দেয়ে ভুঁড়ি হয়ে গেছে! ঝুটমুট কা বাত...কিন্তু উড়িয়াদেরও ভুঁড়ি হয় জেনে, আমার টোপা ভুঁড়িটা কিছুটা টেনশন ফ্রি! )। কথায় কথায় জানা গেল তার বাড়ি কুলডিহা জঙ্গলের ভিতরেই, এমনকি জোড়াচুয়া’র কাছে। সে জঙ্গলেরই ছেলে!  আমরা খুশি। এরকম লোকই তো চাই। পাণ্ডে তাকে বুকে টেনে টুনে আমাদের গভীর আবদার গুলো জানান দিয়ে দিল- রাত্রে নাইট সাফারি আর দেশি মুরগার ব্যবস্থা কিন্তু করা চাই। দেশি মুরগার ব্যবস্থা না করতে পারলেও নাইট এর চেস্টা বাবুলি করবে- জানাল। অনেকটা সময় আমাদের বয়ে গেল, ফেরার ট্রেনের রিজার্ভেশন এর বৃথা চেস্টায়, এটিএম এর চক্করে এবং আমাদের রাত্রের পার্সোনাল সামান তুলতে আর সেখানে কয়েকটি স্থানীয় লোকের সাথে মিনিট পাঁচেক মোদি-মমতা-নবীন পট্টনায়েক খেলতে!  গাড়িটি ভালো এবং অনেকটাই জায়গা। শুধু আমরা দুজন। বালাসোরের টাউন ছাড়িয়ে কিছুটা এসে দাঁড়ালাম একটি জলখাবারের দোকানে। আমাদের প্যাকেজ চালু হো গ্যায়া- বাবুলি জানিয়ে দিল একটু পেট পুরে খেয়ে নিতে,  আজ ভাত খেতে খেতে বিকেল চারটে তো বাজবেই, কারন এখান থেকে জোরাচুয়া প্রায় পঞ্চাশ কিমি। আমি উড়িয়া লুচি মিস্টি, পাণ্ডে দইবড়া এবং বাবুলি কিছুই না (সে জানাল সকালেই হোটেল থেকে পান্তা ভাত খেয়ে বেড়িয়েছে) দিয়ে ব্রেক ফাস্ট সাঙ্গ করলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। ফাঁকা সুন্দর রাস্তা। দূরে ডানদিকে দেখা যাচ্ছে নীলাগিরি পাহাড়। আপাতত নীলাগিরির পাদদেশ আমাদের গন্তব্য। পুরাণের ‘নীলমাধব’ এই নীলাগিরি তেই অধিষ্ঠান করতেন কিনা জানা নেই। তবে নীলাগিরি’র যে ছোট্ট বাজার সেখানে রাজবাড়ি ছাড়াও রয়েছে জগন্নাথ মন্দির ও তার মাসির বাড়ি (গুন্ডিচা মন্দির)। এখানে পান কিনতে অনেকটা সময় গেল, এবং এখান থেকেই গাড়িয়ে উঠল কিছু আনাজ পাতি এবং আমাদের এই যাত্রার সঙ্গী এবং কুক বছর পচিশের কিশোর ভাই, কিশোর বারিক।

দুর্দান্ত মসৃণ রাস্তা দিয়ে সাঁ সাঁ গাড়ি ছুটছে, বাঁ পাশে কুলডিহা রেঞ্জ সহ হরেক নাম না জানা পাহাড়ের সারি আমাদের সাথ দিচ্ছে আলো-কুয়াশায়। প্রায় ঘণ্টা খানেক পর আমরা মূল রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে ঢুকে পড়লাম গ্রাম্য জঙ্গুলে মাটির রাস্তায়। এবার সেই দূরের পাহাড় গুলো যেন হাতের নাগালে। পেরিয়ে যাচ্ছি ছোট ছোট কয়েকটি ঘরের জনপদ- পাহাড়ের কোলে নিঝুম বসে থাকা প্রাইমারি স্কুল, মাঠের মাঝখানের একলা টিউবওয়েল, জ্বালানি মাথায় বাড়ির পথ ধরা আদিবাসী রমণী...ঠিক কুলডিহা’র চেক পোষ্টের আগে দাঁড়াল গাড়িটা। এখানে একটা গোটা আদিবাসী গ্রাম বা পাড়াও বলা যায় তাকে। গাড়ির হর্নে ছুটে এলো বনদফতরের কর্মী। বাবুলি তার চেনা। কাগজ পত্র দেখাচ্ছে সে। আমরা ছবি তুলতে ব্যস্ত। দুপাশে ঘন অরণ্য চিড়ে বেড়িয়ে গেছে লাল মাটির রাস্তা। আসার পথে বাবুলির সাথে কথা হয়েছে, আমরা পৌঁছে, ব্যাগ পত্র রেখে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যাব সোজা রিশিয়া ড্যাম, সেখানেই পানাহার ও স্নান পর্ব চলবে।

গাড়ি আবার ছুটল। আমরা ঢুকে পড়লাম গহীন অরণ্যে। দুপাশে শুধুই অনন্ত সবুজ, শালের আধিক্য, নিস্তব্ধতা। একসময় এলো তিনমাথার মোড়, একটা রাস্তা কুলডিহা’র দিকে ,একটা নেচার ক্যাম্পের দিকে আর তৃতীয় রাস্তা ধরে আমরা জোড়াচুয়ার দিকে এগোলাম। মোবাইলের টাওয়ার পালিয়ে গেছে অনেক্ষন, যা দরকারি ফোন সেসব সেরে নেওয়া হয়েছে। আপাতত দুদিন আর ফোনের উৎপাত নেই। কুলডিহা তে পাখির মেলা। বাবুলি কয়েকটার নাম বলে বলে দেখাচ্ছিল। এরপর এক জায়গায় একটা ওয়াচ টাওয়ারের কাছে এসে গাড়ি দাঁড় করাল, হালকা জলের কুলকুল প্রবাহের শব্দ আসছে। গড়শিমুলিয়া ঝরনা। আসলে এটা ঝরনা মানে পাথরের উপর বয়ে যাওয়া জলের স্রোত, জন্তুদের জলপানের প্রিয় স্থান। অনেকটা সময় কাটানো হল এখানে, অসাধারণ নিসর্গ। গোটা এই গহীন বনে আমরা কয়েকজন ছাড়া এখানকার স্থায়ী বাসিন্দারা, যাদের আমরা না দেখতে পেলেও তারা আমাদের ঠিক দেখছে। এই ঝরনা’র ধারে মনে হয় যেন বসে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু ড্রাইভার তাড়া লাগালো, আমরা ওয়াচ টাওয়ারে একবার চড়ে আবার চললাম। প্রায় আরো বিশ পচিশ মিনিট যাওয়ার পর রাস্তাটা গিয়ে মিশে গেল জোড়াচুয়া বাংলোর পরিখায়। এই রাস্তার বর্ণনা দেওয়া যায় না, যারা জঙ্গলে গেছেন তারাই জানেন। দুদিকে ঘন বনানী, মাঝে মাঝেই রাস্তা কেটে ছোট জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে, জঙ্গলের ভিতরের বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি ঝরনার জল, একদিকে অনেকটা দূরে ঘিরে আছে পাহাড়, কোত্থাও কেউ নেই, শুধু নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে এগোচ্ছে আমাদের গাড়ি। রাস্তাটিতে মোরাম ফেলা হয়েছে, কোথাও কোথাও টানেল বানানো, মূল রাস্তা থেকে মাঝে মাঝেই জঙ্গলের গভীরে ঢুকে আছে খাঁড়ি রাস্তা। এবং মূল রাস্তাটি যেখানে শেষ হচ্ছে সেটিই জোড়াচুয়া।

জোড়াচুয়া কে দেখলে মনে হবে, এই বিস্তীর্ণ শালের জঙ্গলের মধ্যে হটাৎ করে কেউ বসিয়ে গেছে তিনটি বিল্ডিং। একটি ইন্সপেকশন বাংলো, বাকি দুটি ফরেস্টের কর্মী দের আবাস। চারদিকে পরিখা কাটা। ইন্সপেকশন বাংলোর দুটো রুম, অ্যাটাচ বাথরুম, মাঝখানে ডাইনিং, পিছনে গাড়ি বারান্দা। দরজা, জানলা যাই খুলুন চারদিকে শুধুই নিবিড় জঙ্গল। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে। পিছনের দিকে পরিখার কিছুটা দূরে সল্ট পিট। এখানে কোন আহামরি আতিথিয়তা নেই, শহুরে সুবিধে নেই। একটি জেনারেটর রয়েছে জল তোলার জন্য। আর সোলারের ছোট্ট লাইট কয়েক ঘণ্টা যার আয়ু। পৌঁছে আমরা একটি ঘর পেলাম, বাবুলি ও তার এক আত্মীয় যে ওখানেই কাজ করে, দুজনে মিলে বিছানা রেডি করে দিলে আমরা ব্যাগ রেখে বেরিয়ে এসে শুনলাম একটি দুঃসংবাদ, বা তাকে সুসংবাদ ও বলা যেতে পারে - এখানে যে গ্যাস ওভেন টি আছে, তার পাইপ ফুটো! তার মানে আমাদের সাথে গাড়িতে এসেছিল যে গ্যাস সিলিন্ডার, এখন সেটি অকাজের বস্তু হয়ে পড়ল। তবে কিশোর ভাই জানালো যে চিন্তার কিছু নেই, এখানে থাকা একটি মাটির উনোন ঘরে কাঠের উনোনেই সে রান্না চাপাতে রেডি। মেনু একটু ছোট হবে-  বেগুন ভাজা, ভাত এবং আলু ফুলকপির মাছের ঝোল- আমরা খুশ। বেড়িয়ে পড়লাম বাবুলির সাথে রিশিয়ার উদ্দেশ্যে সময় নষ্ট না করে, কারন তখনি প্রায় আড়াইটে বাজে।  

রিশিয়া ড্যাম জোড়াচুয়া বা কুলডিহা’র একটা প্রান্ত। পাহাড়ের পাদদেশে বিপুল জলাধার। তার পাশ দিয়ে ড্যামের পাকা রাস্তা চলে গেছে কিলোমিটার দুই দূরে বাবুলিদের গ্রামে। জোড়াচুয়া থেকে এর দূরত্ব প্রায় দশ কিমি। পুরোটাই যথেষ্ট গহীন জঙ্গল। চলতে চলতে মনে হচ্ছিল এই বুঝি জঙ্গল ভেদ করে মহাকাল এসে পথ আটকে দাঁড়াল। আমাদের সাথে এসেছিল বাবুলির সেই আত্মীয় যে জোরাচুয়াতে কাজ করে, তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল গ্রামে, একটু পিওর মহুয়ার খোঁজ করতে। এখানে এখন আমরা তিনজন ছাড়া দূরে একটি জেলে ডিঙি নৌকো নিয়ে আর আমাদের চারপাশে হাতির পায়ের ছাপ ও শুকিয়ে আসা পটি। আমরা কিছুটা জলপান সেরে রেডি হলাম স্নানের জন্য। দু’জন। শীত খুব একটা করছিল না, কিন্তু বেলা বেশ হয়েছে তা বুঝিয়ে দিল ড্যামের কনকনে ঠান্ডা জল। সময় টা ভালোই কাটল, মন ফুরফুরে, পেটেও খিদে। ফিরতি পথে, গেলাম আর একটি জায়গায় যেখানে বাবুলির দাদা চাকরি করে, সেটি একটি বিট অফিস- দুর্দান্ত-ওই গভীর অরণ্যে দুটি ঘর আর কয়েকটি মানুষ, ওয়াকিটকি ছাড়া বাইরের দুনিয়ার সাথে ছিন্ন সব সম্পর্ক। আমি জিজ্ঞাসা করছিলাম বারবার যে কেমন লাগে আপনাদের এখানে থাকতে? রিশিয়া ড্যাম আমাকে মুগ্ধ করেছে। এবং ফেরার সময় প্ল্যান হল যে রাত্রে এখানে নাইট সাফারিতে আসা হবে। কারন এখানে চিতা বেরোয় মাঝে মাঝে (সত্যি মিথ্যে জানিনে)। গাড়িতে অবোধ্য উড়িয়া গান চালাতে চালাতে আমাদের নিয়ে ফিরল বাবুলি জোড়াচুয়ায়, তখন রান্না কমপ্লিট। ডাইনিং এ বসে খাওয়া দাওয়া শেষ করতে না করতেই আলো কমে আসছে,  ঠান্ডার প্রকোপ বাড়ছে, আমরা ক্লান্ত, পাণ্ডে একটু বেশিই, সে শুয়ে পড়েছে, আমি পায়চারি দিচ্ছি পরিখার ভিতরেই, ধরতে চাইছি গোধুলির আলো কিভাবে ম্লান হয়ে অন্ধকার প্রবেশ করে এই আদিমতায়। আমাদের রান্না ঘরের পাশে আরো দুটি মাটির উনোনে তখন রান্না বসিয়েছে কিছু আদিবাসী মহিলা- এরা ওই রিশিয়া ড্যামের পাশের গ্রামে থাকে। এখানে এসেছে কাজ করতে। কাজ বলতে জঙ্গলের ভিতরে একটি রাস্তায় মোরাম বা লাল মাটি ফেলা হচ্ছে- সেই কাজ করতে এসেছে , আর দিন পাঁচেক থাকবে। তারা একসাথে গোল হয়ে বসেছে আগুনের পাশে, নিজেদের মধ্যে গল্পগুজোব চলছে, তারা বাংলা বোঝেনা আমি না বুঝি উড়িয়া খুব ভালো ভাবে, ফলে আলাপ জমানো যাচ্ছে না। কিশোর ভাইয়ের সাথে কথা বলছি হিন্দী তে। এমন সময় বাবুলি এসে জানতে চাইল দেশি মুরগা লাগবে কিনা, সে ফরেস্টের স্যার কে রাজি করিয়েছে, যদি লাগে এখুনি টাকা দিতে হবে, সাড়ে তিনশ টাকা কেজি। সত্যি বললে হয়ত পাণ্ডে এই লেখা পড়ে রাগ করবে, কিন্তু আমি মোটেও এই ব্যাপারে রাজি ছিলাম না,দেশিমুরগা পাণ্ডের একটি স্বভাব দোষ, সে তখন অসুস্থ, তাও আমি জিজ্ঞাসা করে নিমরাজি হয়ে টাকা দিয়ে দিলাম বাবুলি কে। এবার বাবুলি গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে গেল। আমরা জঙ্গলের নিয়মকে ব্রেক করলাম, এবং এর ফল কখনোই ভালো হতে পারে না । আমার অনুরোধ আপনাদের কাছে আমি যদিও এই অপরাধ করেছি, তবুও অনুরোধ, আপনারা যখন জঙ্গলে যাবেন, সেখানে চেস্টা করবেন জঙ্গলের নূন্যতম নিয়ম গুলো মেনে চলতে। পাণ্ডে ঘুমোচ্ছে, কিশোর বাঁধাকপির পকোড়া বানাতে বসল, পাশেই সেই মহিলারা রান্না করছেন ,বাকী দুএকজন তাদের কাজে ব্যস্ত। আমি কি করি! আমি আকাশ দেখছি, কিভাবে অন্ধকারে বদলে যাচ্ছে, দেখছি, গোটা জোড়াচুয়া কিভাবে ডুবে যাচ্ছে নিশিথে, দেখছি ছটা বাজলে জ্বলে উঠল দু একটা সৌরবাতি। একবার পরিখা পেরোতে গেলাম, কিন্তু প্রচণ্ড ভয় লাগল, কারন আমি অতিথি এই জঙ্গলের বাসিন্দাদের এবং এখন তাদের বিচরণের সময়, তাই ফিরে এলাম। এসে গল্প জুড়লাম কিশোরের সাথে, কিশোরের মাধ্যমে ঐ মহিলাদের সাথে। কিশোর ছেলেটি খুবই ভালো ছেলে, এরকম ছেলে আজকাল মেলা ভার, হয়ত জঙ্গলের ছেলে, মাটির কাছাকাছি বসবাস বলেই মনটা এখনো এত পরিষ্কার রয়েছে। কিশোরের বাড়ি পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে কিছুটা দূরে জঙ্গলের গায়ে। সে কিছুদিন আগেও কাজ করত হায়দ্রাবাদে হোটেলে, বিভিন্ন অফিসের ক্যান্টিনে, অ্যাসিস্ট্যান্ট কুক হিসেবে। পরে মালিকের অপমানজনক কথায় কাজ ছেড়ে পালিয়ে আসে এবং এখন সে মনোরঞ্জন দাশ এর পঞ্চলিঙ্গেশ্বর এর হোটেলে কাজ করে (মানে করত, কারন কদিন আগে কথা হল, ও বলল ওখানেও বাকিদের সাথে ঝামেলায় কাজ ছেড়ে দিয়েছে)। কিশোর এই ট্যুরের অন্যতম আবিস্কার, মনে থাকবে চিরদিন তাকে। কিশোরের কাছে বেশিক্ষণ বসা যাচ্ছে না, কারন ছোট্ট মাটির রান্নাঘরটায় কাঠের এত ধোঁয়া হচ্ছে যে চোখ জ্বালা করছে। অন্ধকারে ঠান্ডা গা’য় মেখে ঘুরছি, অপেক্ষা করছি বাবুলির , কখন আসবে, আমরা বেরুব নাইট সাফারিতে। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। কিশোর পকোরা বানিয়ে ফেলল। বাকিদের জন্য রেখে আমি কয়েকটা নিয়ে ছাদে গিয়ে বসলাম। তার আগে কয়েকবার দেখে এলাম পাণ্ডে কে। ঘুমোক একটু। চারপাশের অন্ধকারকে পাল্লা দিতে পারছে না কয়েকটা সৌর বাল্ব। আমি মিশে যাচ্ছি অন্ধকারে। বসে থাকলাম ছাদে কিছুক্ষণ। আকাশ পরিষ্কার। ঝকঝকে তারায় ভর্তি। এমন আকাশ কোলকাতায় স্বপ্ন। নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু, ঐ মহিলা দের টুকরো কথা, জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ আর ওয়াকিটকির তে ঝিরঝির শব্দ ভেসে আসছে। আবার কিশোরের সাথে আড্ডা, ওর বাড়ির কথা, নিজের কথা, কত কথা। ভাত হয়ে গেছে। মাংসের মশলা করছে। কিন্তু বাবুলির দেখা নেই। বিরক্তি গ্রাস করছে। প্রচন্ড। মনে হচ্ছে ক্যানো এলাম। বুঝতে পারছি আজকের দিন শেষ হয়ে আসছে। আর মাত্র কাল দিন টা হাতে। অপেক্ষা করতে করতে প্রায় ন’টার সময় ঢুকল বাবুলির গাড়ি। সাথে বিট অফিসার ও বাবুলির সেই আত্মীয়, সকলেই প্রচন্ডভাবে নেশাগ্রস্থ। আমি রাগে চলে এসে পাণ্ডে কে তুললাম। বোঝা গেল আজ আর হচ্ছে না নাইট সাফারি। গান চালিয়ে উন্মত্ত নাচ চলছে। গাড়িতে থাকা আমাদের পানীয় ও আনুষঙ্গিক খাবার হাফিস। একটু একা হয়ে চলে এলাম ছাদে, বেঁচে থাকা মহুয়া টুকু নিয়ে। এরপর একে একে বাকিরা এল। সহজ হওয়ার চেস্টা করলাম। মিশে যেতে চাইলাম। পরিস্থিতি এখন কন্ট্রোলে। পাণ্ডে অনেকটাই সুস্থ, আমরা গল্প করছি অফিসারের সাথে, পাণ্ডে ফুল মেজাজে। বাবুলি বলে যাচ্ছে যে, যাব যাব নাইট সাফারিতে যাব। বিট অফিসার বলছেন, আমি নিয়ে যাব আপনাদের, কিন্তু আমাদের মনে হল বাবুলির পক্ষে সম্ভব নয়। সেটাই হল, এর মধ্যে আলো নিভে গেছে অনেকবার। টর্চ , মোবাইল জ্বালিয়ে রান্না বা বাদবাকি কাজ। মাঝে একবার জেনারেটর চালানো হল, খাবার সময়ে। খেতে খেতে এগারোটা। তারপর তদারকি করে কম্বল জোগাড় করা, এবং আমরাও ক্লান্তিতে বিছানায়। পুরো অন্ধকার। ঠান্ডার প্রকোপে, সোয়েটার, টুপি পড়েই শুলাম। মনটা তেতো হয়ে গেলেও আশায় আছি কালকের দিনটায় পুষিয়ে নেব। রাত বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ঠান্ডা বাড়ছে। ভেসে আসছে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ, ঘ্রাণ...

নতুন জায়গায় ঘুমটা আমার তাড়াতাড়িই ভেঙ্গে যায়। তবুও দেরি হল। উঠে বেরিয়ে এলাম নতুন উদ্যোম নিয়ে। তখনও সকলে ওঠেনি। একজন ফরেস্টের কর্মী জানাল কাল ভোর রাত্রে হাতী এসেছিল সল্টপিট এ। আমাদের নাকি তারা ডেকেও ছিল ভোর তিনটেয়, কিন্তু তখন তো আমাদের মাঝরাত! সকলেই উঠেছে ধীরে ধীরে। একবার সল্টপিট টার কাছে গেলাম, কিন্তু এখন পুরো ফাঁকা। পাণ্ডে এখন পুরো ফিট। আমরা রেডি। বাবুলি বলছিল যে সে নাকি রাত্রে আমাদের ডেকেছিল, তার এই অযথা মিথ্যের জন্য আরো বেশি বিতৃষ্ণা জন্মে গেল ওর উপর। সকালে চা খেয়েই আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম, কুলডিহা’র উদ্দেশ্যে। সাথে বিট অফিসার।

কুলডিহা’ও পরিখা দিয়ে ঘেরা। পিছনে উঠে গেছে খাড়াই পাহাড়। সামনে সল্টপিট। এখানে সল্টপিট গুলোতে এবং জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে লাগানো আছে ক্যামেরা। আমরা দুজনে সল্টপিট টায় গেলাম, এবং সেখানে একটি গাছে পান্ডেই প্রথম আবিস্কার করল, অসংখ্য জায়েন্ট স্কুইরেল। কুলডিহা তে প্রচুর দেখা মিলবে এদের। আমরা কিছুটা জঙ্গলের অচেনা পথে ঢুকলাম। প্রতিপদে প্রচন্ড ভয় লাগছিল। এবং অনেকটা যাওয়ার পর হটাত কোন এক জন্তুর আওয়াজে, ভয় পেয়ে দ্রুত ফিরে আসি। এই অনুভূতি গুলো ভয়ংকর, অসাধারণ। কুলডিহায় চা খেয়ে আবার ফিরতি পথে দু একটি হরিণ পালিয়ে গেল, বন মুরগী উড়ে বেড়াচ্ছে, অনেক। গাড়ি দাঁড়াল। বিট অফিসার আমায় নিয়ে চললেন মূল রাস্তা থেকে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে যাওয়া একটি সুঁড়িপথে। নিশ্চুপ থাকার ইঙ্গিত। পা টিপে চলা। যে পথে পা ফেলছি সেখানে অসংখ্য প্রাণীর পায়ের চিহ্ন কাদায়, শুখনো মাটিয়ে শুখিয়ে আছে। আমি আর অফিসার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, পাণ্ডে আর বাবুলি পিছনে আসছে। চারদিকে নানান শব্দ। তার মধ্যে একটি বিশেষ শব্দকে ইঙ্গিত করে উনি জানালেন এটি বাইসনের বাচ্চার শব্দ। সাবধানে এগোচ্ছি, ভয় লাগছে, কোন মুহূর্তে না জানি জঙ্গল থেকে কি বেরিয়ে আসে, এবং সে পরিস্থিতির মুখে পড়লে, কী যে করব কে জানে! কয়েক পা এগিয়ে পৌঁছলাম একটি পুকুরের পাড়ে। এরকম পুকুর এখানে জঙ্গলের ভিতরে করা হয়েছে, পশুদের জল পানের জন্য। এবং প্রতিটি পুকুরের সামনে গেলে আপনার ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে না। মনে হবে সময় এখানে কী অদ্ভূত ভাবে থেমে আছে। গহীন বনরাশির মধ্যে, পিছনে অনেকটা দূরে উঠে গেছে পাহাড়, পুকুরের চারপাশে বন্যপ্রাণীদের আনাগোনার প্রমাণ। অল্প কিছুক্ষণ থেকে আমরা আবার ফিরে এলাম, ফেরার পথে আবার গেলাম গড়শিমুলিয়ায় সেই ঝরনার কাছে। ঝরনার খাত ধরে ধরে বেশ অনেকটা নেমে গেছিলাম দুজনে। ইচ্ছে ছিল আরো কিছুটা যাওয়ার। কিন্তু বোকা বোকা সাহস দেখিয়ে লাভ নেই। এত সুন্দর নির্জন স্থান ছেড়ে আস্তে ইচ্ছে করার কথা নয়। যেন বারবার মনে হয়েছে বন্য আদিমতায় পৌঁছে গেছি। বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম জোড়াচুয়ায়। ফেরার পথে বারংবার বলাতে ড্রাইভার বলল যে সে নিয়ে যাবে এক যায়গায় যেখানে গেলেই নাকি বন্যপ্রাণী দেখা যাবে বা ভয় লাগবে, কোর এরিয়া আর রাত্রেও বেরুবে। কিন্তু পানীয় তাকে দিতে হবে। যদিও সে অলরেডি সকাল থেকেই চাপিয়ে আছে।

ফিরে এসে টিফিন করা হল। কাল রাত্রের বেঁচে যাওয়া মাংস ও গরম গরম রুটি। দেখি বাবুলি আরো কিছুটা মেরে দিয়ে শুয়ে পড়েছে। আমরা আর কি করি, দুজনে হাঁটতে বেরুলাম। কিশোর জানাল যে, সামনের রাস্তায় একটু খানি ডান দিকে গেলেই একটা পুকুর পড়বে সেখানে নাকি টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে। ভাবলাম যাই একবার ট্রাই করি। কিছুটা হেঁটে যখন ডানদিকের জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকছি, তখনই আমাদের পিলে চমকে গেছে। পা ফেলছি প্রায় টাটকা হরিণ কিমবা বাইসনের খুরের ছাপের উপর। পাণ্ডে পিছনে কিছুটা দূরে, আমি সাহস করে এগোচ্ছি। শেষমেশ সাহসে ভর করে পৌঁছলাম পুকুরটির পাড়ে। এবং এখনো পর্যন্ত এখানে দেখা সেরা জায়গায় পৌঁছলাম বলে মনে হল। পুকুরের চারপাশ অরণ্যে চাওয়া, এবং পিছনে উঠে গেছে ঘন সবুজ পাহাড়। অসাধারণ। মনে হল এখানেই থেকে যাই। কিন্তু নির্জনতা এবং পুকুরের আশেপাশের পায়ের ছাপ গুলো আমাদের মতো নয় বলে আর থাকলুম না। ফিরতি পথে পাণ্ডে রুমে ফিরে যাওয়ায় আমি একা বসে রইলাম জোড়াচুয়া পরিখা র আগে মূল রাস্তার উপর তৈরী এক কালভার্টে। সেখান থেকে উঁচুতে উঠে যাওয়া জোড়াচুয়া কে হালকা দেখা যাচ্ছে। জঙ্গলের মধ্যে আপাতত আমি একা। বেশ ভালোই লাগছিল। অনেকটা সময় পর উঠে গেলাম, বসলাম কিশোর এর সাথে গল্প করতে। সে তখন রান্না চাপিয়েছে। আজকের মেনুতেও সেই বেগুন ভাজা, ভাত আর মাছের ঝোল। অনেক কথা হল, আমি বললাম বাবুলিকে নিয়ে বিরক্তির কথা, সেও জানালো যে এর আগে বাবুলি এত বাজে করেনি, তবে ছেলেটা খুব একটা ভালো নয়। আমি এবং পাণ্ডে তখন দুটো চেয়ার নিয়ে বসলাম সল্টপিট টার সামনে। এখন পুরো ফাঁকা। ঠিক হল আজ রাত্রেও আমরা এখানে বসব, এবং খুব ভোরেও উঠব। এসব কথা হতে হতেই বাবুলি ঘুম থেকে উঠে ডাকল, বলল, সেই জায়গায় নিয়ে যাবে। আমরা রেডি।

জায়গাটির নাম ভাই-বহেন ঘাটি। কেউ জানাল যে, এই পাহাড় থেকে এক ভাই ও বোন আত্মহত্যা করাতে এরকম নাম। এর বেশি কিছুই জানা নেই। পাহাড়ের উপরে জন্তুদের মূল বাসস্থান। এবং এখানে চিতাবাঘ ও নাকি রয়েছে। যাইহোক, চলা হল, এবং সাথে চলল কিশোর, কারন ততক্ষণে রান্না কমপ্লিট। জঙ্গলের মূল রাস্তা ছেড়ে আমরা ঢুকলাম। সেই রাস্তায় মোরাম বিছানোর কাজ করছে সেই মহিলারা। রাস্তায় ঢোকবার আগে, বাবুলি অনেকবার প্রণাম করে নিল। তারপর চলা শুরু। পাহাড়ে উঠছে। একটা ট্রাক্টর যাতায়াত করছে, মোরাম ফেলছে, কিছুদূর গিয়ে দেখালাম অফিসার বসে আছে, কাজের তদারকি, সেখানেই থেকে গেল গাড়ি। এরপর রাস্তা খাঁড়াই। আমরা হেঁটে উঠতে থাকলাম। অনেকটা যাওয়ার পর বাবুলি জানাল এর পরে আর যাওয়া যাবে না রিস্ক আছে, এরপরে ভিতরে জঙ্গলে কোথাও ঠাকুরের থান আছে। পাহাড়ের পাশ দিয়ে একটি ঝরনা নামছে। বাবুলিকে বাদ দিয়ে আমরা তিনজন ঠিক করলাম এগোব। তিনজনে তিনটে লাঠি ভেঙ্গে নিয়ে কিছুটা এগিয়েছি চারপাশে প্রচন্ড ঘন জঙ্গল, ওমনি একটু চমকে উঠলাম একটা এরোপ্লেন শব্দ করে বেরিয়ে গেল, এবং আবার যেই এগোতে যাব হটাত গুলি চলার মতো  বা ছোট বিস্ফোরণ ঘটার এর মতো পর পর দুবার শব্দ হল, এবং আমরা সেটার উৎপত্তিস্থল ও কারন কোনটাই বুঝতে পারলাম না, তখন পাণ্ডে বলল আর এগোনো ঠিক হবে না, আমরা ফিরে চললাম। এখানে টাওয়ার আসায় প্রয়োজনীয় কল করা হল, এবং আমরা পাহাড়ের পাশের সেই ঝরনার দিকে এগোলাম, জঙ্গল ভেঙ্গে। অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেরা হল।

আমি খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে সল্টপিটের কাছে বসলাম চেয়ার নিয়ে। বসে আছি হটাত একটা গাড়ি ঢুকল, নতুন একদল টুরিস্ট, ডে ট্যুর করছে। আমি আমার মতো বসে আছি, তাদের একজন আমার কাছে বলল, আপ ইহাকে অফিসার? আমি বললুম, আপনি কোথা থেকে? তিনি কিছুটা চমকে বললেন, আসলে আপনার প্যান্টের কালার দেখে ভাবলাম, আপনি বুঝি...আমি বললাম ট্যুরিস্ট। পরিচয় হল, এনারা একই অফিসের অনেকজন এসেছেন হাওড়া থেকে, থাকছেন পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে, সেখান থেকে আজ কুলডিহা এসেছেন। তাদের দেখানো গেল, একটি জায়েন্ট স্কুইরেলের বাসা বাধার দৃশ্য, এবং আমি, পাণ্ডে আর কিশোর তাদের নিয়ে গেলাম সেই পুকুরটির পাড়ে। কিছুটা গাইডের কাজের অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় হল!

তারা চলে যাওয়ার পর আমরা ক্রমাগত বাবুলি কে ধরছি যে , আমরা তো বসেই আছি, এবার চলো অন্য কোথাও যাই বা নাইট সাফারির কি প্ল্যান, সে কিছুই সেভাবে জবাব দেয় না, এড়িয়ে যায়। কি আর করা যাবে! দেখলাম অফিসার আর একজন কর্মী জঙ্গলে চলেছেন ক্যামেরা খুলতে, নিলাম তাদের সাথ। এই অভিজ্ঞতাও হয়ে রইল। এবং একদম সল্টপিটের ভিতরেও যাওয়া গেল, আমাদের দেখে দৌড়ে পালাল কিছু হরিণ, আমরা তাদের নাগাল পাইনি, পেলাম কিছু টাটকা বাইসনের পটি এবং কিছু শুখনো হাতির। ফিরে এসেছি তখন প্রায় বিকেল পেরোচ্ছে সন্ধ্যা। তিনজনে গিয়ে বসলাম তিনটে চেয়ার নিয়ে সল্টপিটের সামনে। কিশোরের নানান কথা, আমাদের এই ট্যুর, আরো কত কথা উঠে এলো আলোচনায়। আমরা তখনও ভাবছি হয়ত রাত্রে বেরোনো হবে। কিন্তু তার একটু পরেই বাবুলি এসে জানাল যে সে একবার বাড়িতে যাবে, তার মাকে দেখতে, চলে আসবে, আমরা বুঝতে পারছি মিথ্যে, কিন্তু নিরুপায়, জাস্ট কাল সকাল হলে বেরুতে চাই, আর বাকি সময়টুকু নিজেরাই উপভোগ করতে চাই। অবশ্য নিজেরা যে একটু আনন্দ করব সে ব্যবস্থাও আমাদের তখন শেষ করে দিয়েছে সে । কিশোর গেল আলুর পকোরা করতে। আজ রাত্রে আন্ডা কারি আর ভাত। আমি , পাণ্ডে বসলাম কিছুক্ষন অন্ধকারে, তারপর গল্প গুজোব, সেই মহিলারাও দুংখ করলেন যে আমাদের বেড়ানো টা মাটি করল বাবুলি, এবং তারা এটাও বলেছিল, কালকের দিনটা থেকে গেলে তারা নিজেরাই হেঁটে হেঁটে ঘুরিয়ে চেনাবে জঙ্গল। সে ভাগ্য আমাদের হবে না! পকোরা হয়ে গেলে, দুজনে ছাদে গিয়ে বসলাম, সেই পরিষ্কার আকাশ, গান, মনখারাপ, চারপাশের নিবিড় অন্ধকার।

এরপর একটা টর্চ জোগাড় করে গিয়ে বসলাম, আবার সল্টপিটের সামনে। সামনে টর্চ মারতেই দেখি সেখানে কিছু চোখ জ্বলছে। যদিও অনেকটা দূর তবুও ঠাওর করা যাচ্ছে। কয়েকবার আলো মেরে পরিষ্কার বোঝা গেল একটা দুটো নয়, একপাল বাইসন। সাথে একটা বাচ্চাও। মনটা একটু চনমনে হল। বেশ অনেকক্ষণ ছিল তারা। কিন্তু আমাদের অতিউৎসাহে একসময় বিদায় নিল। তখন এদিক ওদিক লাইট মারতে গিয়ে দেখি, সামনের গাছে একজোড়া চখ জ্বলছে। কী ওটা? ও বাবা দেখি একটা জায়েন্ট স্ক্যুইরেল, রাত্রের আস্তানা নিয়েছে। কিছুক্ষণ পর কিশোর এসে যোগ দিল। সময় বয়ে যাচ্ছে, বাবুলি নাই। আমরা ওখানে থেকে উঠে রুমে আসছিলাম, মাঝে মাঝেই টর্চ বাঁ মোবাইল জ্বালাতে হচ্ছে। প্রথম চোখে পড়ল পান্ডের , ওর মোবাইলের আলোয় দেখা গেল, সামনে কি একটা কালো ব্যান্ড সড়সড় করে এগোচ্ছে। সবাই মিলে লাইট মেরে দেখে গেল সেটি একটি শাঁখামুটির বাচ্চা। বাকী লোকেরাও উৎসাহে এলো। এর এক ছোবলেই ছবি।

সোলারের ক্ষমতা শেষ। চারপাশ অন্ধকার। বাবুলিও ফেরেনি। ওর গাড়িতেই রয়েছে জেনারেটর চালানোর তেল। ফলে আমরা অথৈ অন্ধকারে। তার মধ্যেই মোবাইল আর টর্চ জ্বালিয়ে খাওয়ার পর্বটা মিটিয়ে ফেলা গেল। আবার গিয়ে বসলাম সেই চেয়ারে। এবার সল্টপিট ফাঁকা। ঠান্ডা বাড়ছে। রাত বাড়ছে। বাবুলি এলো প্রায় সাড়ে দশটা। এখানে সূর্য নিভলেই মনে হচ্ছে গভীর রাত। আমরা ভোর ভোর উঠব ঠিক করে শুতে গেলাম। ইচ্ছে থাকলেও নাইট সাফারির কথা বললাম না, বাবুলির  নিজের দাড়ানোর ক্ষমতা পর্যন্ত নেই, এমন অবস্থা। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে বিছানায় গা এলালাম। নিজেদের মধ্যে তর্ক হল খানিক।

প্রায় চারটের সময় উঠলাম আমি। বাইরে তখন অন্ধকার। আরো অনেকটা সময় পর হালকা আলো ফুটলে বাইরে বেরুলাম। দাঁতন করলাম, শাল গাছের ডাল দিয়ে। ঘুরে বেড়ালাম পরিখার ভিতরেই নিজের মতো। উঠে গেছে পাণ্ডে আর কিশোর। তিনজনে রান্নাঘরে গিয়ে উনোনে আগুন জ্বালানো হল, আগুন না পোওয়ালে এই ঠান্ডা থেকে বাঁচার উপায় নেই। উঠে গেছেন সেই মহিলারাও। তারা চাপিয়ে দিয়েছে ভাত। কিশোর চা বানাচ্ছে। আমরা গতকাল রাত্রেই গুছিয়ে রেখেছিলাম ব্যাগ। চা খেয়ে, আলো আর একটু ভালো করে ফুটলে, তিনজনে বেরুলাম বাইরে, একবার আবার ঘুরে এলাম প্রাণীদের সেই জলপান করার পুকুরটি। এই শিশির ভেজা ভোরে তার রূপ অনন্য। ফিরতে সত্যিই ইচ্ছে করছিল না।

বাবুলি গাড়িতে উঠে গেছে , রেডি। আমাদের কোন বাক্যালাপ হয়নি।  গাড়িতে ওঠার আগে একবার গেলাম সল্টপিটের সামনে। তারপর অফিসার ও অন্যান্য দের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ি ছাড়লাম। গোটা রাস্তা আমরা যে যার মতো। বালাসোর ফিরে ফোন মনোরঞ্জন দাশকে। টাকা মিটিয়ে, হালকা টিফিন, টিকিট কেটে অপেক্ষা, হটাৎ জনশতাব্দী...টিটির সাথে ফাইনের রফা করে সিট নিয়ে সোজা হাওড়া।

জোড়াচুয়া আমায় নেশা দিয়েছে অদ্ভূত...

[তবে হ্যাঁ যেটা বলতে ভুলে গেলাম, কুলডিহা আমাদের দুজনকেই এক ভয়ংকর উপহার দিয়েছে। পাণ্ডে কে চোখের মধ্যে আর মাথায় আর আমাকে কানের লতির ভাঁজে। তা হল এক রক্তচোষা পোকা। দেখতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। যতক্ষণ না রক্ত খাচ্ছে ভালো ভাবে আপনি বুঝতেই পারবেন না, কারন ব্যথা শুরু হবে না। এবং ব্যথা শুরু হলে আর থাকতে পারবেন না। আমরা বুঝেছি ফিরে আসার দুই থেকে চারদিন পর। সেটা প্রথম পান্ডের চোখ থেকে বের করে ডাক্তার এবং পরে একদিন মাথা থেকে নিজে বার করে এবং সেদিন আমি কান থেকে...এবং সেই ক্ষত এবং ব্যথা কয়েকদিন বহন করেছি...কিছুটা আনন্দে কিছুটা দুঃখে !!!]

কুলডিহা যাওয়ার উপায়: হাওড়া থেকে ট্রেনে বালাসোর নেমে সেখান থেকে ভাড়া গাড়ি।

থাকা খাওয়ার উপায়: কুলডিহা তে থাকার জন্য উড়িষ্যা সরকারের টেন্ট আছে। https://www.ecotourodisha.com এই সাইটে রিসিয়া ন্যাচার ক্যাম্প নামে রয়েছে। অনলাইন বুকিং হয়। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।   

 

About Author
&
Photographer

লেখক : সুপ্রিয় সাহা

শূন্য দশকের গল্পকার ও ভ্রমণপিপাসু।

আলোকচিত্রী: সুপ্রিয় সাহা

শূন্য দশকের গল্পকার ও ভ্রমণপিপাসু।

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget