বনবাংলোয় সবুজ বৃষ্টিতে

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

সে ছিল এক অন্যরকম গল্প। বহু বহু দিন চলে গ্যাছে তারপর। তেলিপাড়া চা-বাগানের ভেতর, আরও ভেতর, তখন গভীর জঙ্গল, পায়ে চলা পথ। মাঝেমধ্যেই সেখানে চলে আসে বুনো হাতির দল, চলে আসে চিতা। একপাশে উদাসীন কাঁথার মতো এক টুকরো নদী। পাতাডোবা জল, জলে গভীর মনোযোগে মাছ ধরছে বাবা আর মেয়ে, পাড়ের ভিজে জমির গর্ত থেকে তুলে আনছে কাঁকড়া, বাবা। নদীর পাড়েই কাঠকুটো জ্বেলে রান্না। সাপ্তাহিক চড়ুইভাতি বাবা-মেয়ের। তখনও গল্পের রং সবুজ, তখনও রাস্তার রং সবুজ। ময়নাগুড়িকে বাইপাস করে চলে যাওয়ার রাস্তা তৈরি হয়নি তখনও। তিস্তাব্রিজ পার হলেই সারি বাঁধা প্রবীণ গাছের দল। প্রতি শনিবার দুপুরে সেই রাস্তায় আমরা, সবুজ টানেলে। ফরেস্টের সঙ্গে গোপন বন্ধুতার সেই শুরু।

ধুপগুড়ি পেরিয়ে লাটাগুড়ির জঙ্গল আসব আসব করতেই বাসের আওয়াজ ছাপিয়ে শুধু ঝিঁঝির ডাক। গরুমারা যাওয়ার রাস্তায় মহাকাল বাবার থান, নিবিড় ছায়াঘেরা, স্যাঁতসেঁতে, জুতো খুলে সে-মাটিতে আমাদের পা, ছমছম চারপাশ, ছমছম গা। হাতির বাইসন বা গৌড়ের অতর্কিত হানা, ভয়। সে যেন মহাকাল বাবার থান নয়, সেখানে বসত করেন তরাই-ডুয়ার্সের আত্মা।

বালকবেলা থেকেই ডুয়ার্স জঙ্গলের সঙ্গে কীভাবে কীভাবে যেন শুরু হয়ে গেল গোপন প্রেম। ওগো মধুর, হে ভয়ঙ্কর, ভালোবাসি তোমাকে, ভালোবাসি লুকোনো ঝরনা, নদী নয়, সমুদ্র নয়, গুঁড়ি মেরে চলে গ্যাছে পথ, ঝোরার দিকে, চলে গেছি আমিও।

জুতো উড়ে যাচ্ছে, খুলে যাচ্ছে বেভুল দরজা, উড়ে যাচ্ছে একটি শিশুর প্রিয় হলুদ জুতো। প্রথম হলং যাওয়া। সে-ও এক পিকনিক, দলবেঁধে। প্রথম হাতির পিঠে, শরবনের অন্তর ঢুঁড়ে প্রথম গণ্ডার দেখা। যেতে পথে ময়ূর, হরিণ। তখন বয়স চার/পাঁচ।

আয়োজন করে বনবাংলোয় থাকা সেই প্রথম। বিরাট দল, সাহিত্যিক দেবেশ রায়ও ছিলেন সেই দলে। রাতেরবেলা ঘুমঘুম চোখে রুটি মুরগির মাংস, ছোটোরা তড়িঘড়ি বিছানায়, ভোরে উঠতে হবে। মেয়েরা বাচ্চাদের নিয়ে এক ঘরে, অন্য ঘরে ছেলেরা। আমরা শুয়ে পড়েছি, এমন সময় পাশের ঘর থেকে বাঘের তুমুল গর্জন। ভয়ে দে-ছুট মায়েদের কাছে। পরে আবিষ্কার করা গেল সে ডাক তাতাদা আর রতনদার। তাতাদা এখন পৃথিবীখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক।

তারপর শুরু হল গান, কে আর শুতে যায়! আজও মনে আছে কাকলি রায়, দেবেশ রায়ের স্ত্রী, আমাদের ফুলটুমাসির গান। ওই রাত ওই গান আর হলং বাংলোর বিশাল জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি ছুটে যাচ্ছে হরিণের দল, গণ্ডার। আরও কতবার গিয়েছি, কিন্তু প্রথম তো প্রথমই।

তখন আঠেরো, তখন কলেজ, ইকনমিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে হই হই পিকনিক। এসব ব্যাপারে আমি সবার আগে নাচতে থাকি, বললাম, গরুমারা আর চাপড়ামারি, সবাই একবাক্যে রাজি। ভোরবেলা বাস ছাড়ল, বন্ধু মুন্নার বাবার মিনিবাস, ফ্রিতে, একশ টাকা চাঁদা, তখন একশো টাকা অনেক, কিন্তু ছাত্রসংখ্যা এতই কম, সে টাকায় বাস ভাড়া দিতে হলে সারাদিন হরিমটর। এন এন সি স্যার, ডিপ হেড আর এ কে ডি স্যার তরুণ অধ্যাপক, ওঁদের সঙ্গে আমরা ক’জন। বাসে উঠতেই শুরু অন্তাক্ষরি, ছেলেরা ভার্সেস মেয়েরা। লাটাগুড়ি আসতেই সবাই ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল, সেই যে ঝিঁঝির ডাক, শান্ত করে দিল দামাল ছেলেমেয়েগুলোকে।

গরুমারায় ঢোকার রাস্তাটাই অন্যরকম, চারিদিকে দীর্ঘ শাল গাছের উত্তুঙ্গ আহ্বান। জঙ্গলের পেট চিরে চলে গ্যাছে গেরুয়া রাস্তা, কাঁচা মাটির গন্ধ, শীতের শিশির আর সবুজের গন্ধ মিলেমিশে একটা অলৌকিক বিষণ্ণতা ঘিরে ফেলল আঠারো বছরকে। মাঝে মাঝে ময়ূরের ডাক, ঘোর ভেঙে দ্যায়, ঈষৎ নীলাভ সবুজ যেন চকিত দামিনির মতো ঝলক দেখিয়েই মিলিয়ে যায়। না, আমরা কেউ জঙ্গলের পশুপাখি বা গাছগাছালির হিসেব বা পরিচয় নিতে বসিনি, আমরা কেবল বিস্মিত হতে চেয়েছিলাম। কাঠের বাংলোর সামনে ঘাসের আচ্ছাদন, সেখানেই প্রাতরাশ। চিরকালীন বেপরোয়া আমি একালাই তরতরিয়ে উঠে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে, পেছনে দেখাদেখি অন্য সকলে। সামনেই সল্ট লিক। কুয়াশা ফাটিয়ে একটু একটু করে রোদ উঠছে… আমি চুপ তাকিয়ে আছি সামনের দিকে, ওখানে শরবন, অজানার দেশ। একটু দূরে তিরতির করে বয়ে চলেছে নাম-না-জানা ছোট্ট একটা নদী। আমাকে যেতে হবে ওর কাছে, যেতেই হবে। বন্ধুরা বেশিরভাগই দাঁড়িয়ে, যদি গণ্ডার বা বাইসন দেখা যায়, সেই আশায়। আমি শুধু সেই নদীটার কাছে যাব বলে নেমে এলাম ওয়াচ টাওয়ার থেকে। উৎরাইটা প্রায় সটান নেমে গ্যাছে সল্ট লিকের দিকে, আমি হাঁচোড়পাঁচড় নেমে গেলাম, নামার সেই গতি প্রায় ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নদী বা ঝোরার দিকে। ঠিক তখনই দুটো বাইসন, পরে জেনেছি ওখানে বাইসন নয় গৌড় পাওয়া যায়, হেলতে দুলতে সল্টলিকের দিকে। আমি পড়িমরি চড়াইয়ের পথে, ওপর থেকে এন এন সি স্যারের চিৎকার…

তখন কিছুরই খোঁজ করিনি। এখন জানি গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক জলদাপাড়া-চাপড়ামারি-গরুমারা রেঞ্জের ১৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি জাতীয় উদ্যান। 

গরুমারার বনবাংলো আমাকে তেমন টানেনি। যেমনটা চাপড়ামারি আজও আমার ভীষণ কাছের। সাড়ে দশ বা এগারো হবে, গরুমারা থেকে বেরিয়ে চাপড়ামারির পথে। এ-পথ আরও গহন সবুজ, গাছগুলো আরও ঘেঁষাঘেঁষি, কাছাকাছি। প্রায় পায়ে চলার মতন পথ। তারই মধ্যে দিয়ে কোনোমতে আমাদের মিনিবাস। চমকে গেলাম চাপড়ামারি বনবাংলো দেখে। লাল ইটের ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যে তৈরি একতলা, দোতলাটি সম্ভবত পরে তৈরি, কাঠের ওপরে ঢেউটিনের চাল। বাংলোর লবিই বলি বা বৈঠকখানাই বলি, দেখে চমৎকৃত। বিশাল একটি ফায়ারপ্লেস, পুরোনো দিনের আসবাব, দেয়ালে স্টাফড জন্তুদের মাথা, শিং, সব মিলিয়ে আহামরি। সেদিনই ঠিক করে ফেলি এখানে আসতে হবে আবারও, থাকতে হবে কমপক্ষে একটা রাত।

কিছুই দেখিনি আমরা চাপড়ামারিতে। আসলে এই যে ফরেস্টে বেড়াতে গিয়ে যাঁরা কত কী পশুপাখি দেখলেন বলে বড়াই করেন, তাঁদের আমার ভীষণ হাস্যকর লাগে। ফরেস্ট কি শুধুই পশুপাখির সমাহার! শুষে নিতে হবে সবুজের অন্তর্গত প্রাণ, সম্পৃক্ত হতে হবে সেই রঙে, সামান্য পোকার ডাকও তখন কোকিলের গানের চাইতেও বেশি করে ধাক্কা দেবে বুকে, সবুজের কত কত শেড, আলো বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ফরেস্টের চরিত্র, শুকনো পাতার সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে কত না-লেখা চিঠি!

এগিয়ে যাই আরও কয়েকটা বছর। স্নাতক হওয়ার বছরেই বিয়ে হয়ে গ্যাছে, তার দু-বছর বাদে কন্যা। এরও দু-বছর পর ‘আবার অরণ্যে’। এবার হলং বনবাংলো, সিপিয়া টোনের থেকে আড়মোড়া ভেঙে উঠে এল সেই হলুদ জুতো।

বেশ বড়ো দল। হঠাৎ করেই ঠিক হল, যেমন তখন হঠাৎ করেই আড্ডা বসত আমাদের ডক্টরস কোয়ার্টারের ছোট্ট ফ্ল্যাটে, গানে গানে ভেসে যেত রাত, তেমনই। চারটে পরিবার, উদয়নদা, বিশিষ্ট শল্যবিদ ও সুগায়ক অবশ্য একলাই থাকতেন, সেই হিসেবে সাড়ে তিন। চললাম। ডঃ মনোতোষ ব্যানার্জীর মারুতি ৮০০ তখন আমাদের একমাত্র ভরসা, সঙ্গে ভাড়া করা হল আরও একটা। কাচ্চাবাচ্চা মিলিয়ে মোট দশ। ছুটল, গাড়ি। যেতে পথেই উদয়নদার গান। জর্জ বিশ্বাসের মতো গভীর উদার কণ্ঠ। বলে রাখা ভালো, আমাদের দলে এক মৃণালদা, ডঃ মৃণাল আচার্য আর আমার কত্তা ছাড়া মোটামুটি সবাই গাইতে পারে, এমনকী বাচ্চাগুলোও, এমনকী আমার দু-বছরের মেয়ে হিয়ার গলায়ও বেশ সুর। আর মনোতোষ ব্যানার্জীর স্ত্রী জয়শ্রীদি তো রীতিমতো ঈর্ষণীয়রকমের ভালো গায়। পথেই শুরু হল অল্প অল্প পান। আমি অবশ্য তখনও কেবল পান খাই, করি না। দেখছিলাম লোকগুলোর কাণ্ডকীর্তি। দেখারও একটা মজা আছে।

হলং বাংলোতে পৌঁছতেই উলটে গেল সময়ঘড়ির কাঁটা। আমি কেবলই খুঁজছিলাম পুরোনো আমি-কে। কেবলই খুঁজছিলাম সেই হলুদ জুতো। আড্ডা জমে গেল, সঙ্গে পকোড়া, চা আর গান। এর মধ্যে আমার কন্যা বমি করতে শুরু করেছে, আর মাম আর বাবলার(মনোতোষদা আর মৃণালদার মেয়ে আর ছেলে) মধ্যে তুমুল ঝগড়া। ওরা তখন সাত আর দশ। রীতিমতো ঘোষণা করে দিল, তোদের ফ্যামিলির সঙ্গে আর কোত্থাও যাব না। ঝগড়ার কারণ অবশ্য কে আগে গান গাইবে সেই নিয়ে রেষারেষি। আমরা হেসে খুন।

গল্প এখানেই থামল না, অনভিজ্ঞ মা আমি বুঝতেই পারিনি কখন মেয়ের ঠান্ডা লেগে গ্যাছে। যেহেতু আগের থেকে বুক করে যাওয়া হয়নি(কোনোদিনই যেতাম না আমরা), মাত্র দুটো ঘর পাওয়া গ্যাছে। সেই আগের মতোই একঘরে ছেলেরা, একঘরে মেয়েরা বাচ্চাসহ। হিয়ার কান্নায় সারারাত ঘুম হল না, আমি জানলার কাছে বসে রইলাম সারারাত মেয়ে কোলে। সেও অবশ্য আরেক প্রাপ্তি। সারারাত জঙ্গলের সঙ্গে কথা বলা, সারারাত ফিসফিস, রাত শুধু রিফু কারবার। সামনে বয়ে চলেছে হলং নদী। নদী বলে ঠিকই, চওড়ায় মাত্র দশ/বারো হাত। নদীর ওপারেই সল্টলিক। ভাতের মাড়ের মতো জোছনায় সল্টলিকে গণ্ডারের আনাগোনা, হরিণের হালকা পায়ের দৌড়, দেখছিলাম।

কোথা দিয়ে তিনটে বেজে গেল। সব্বাই হুড়মুড় নেমে সোজা হাতির পিঠে চেপে বেড়াতে যাওয়ার জন্য তৈরি। দুটো হাতিও পিঠে হাওদা মাহুতসহ। একটায় আমরা, উদয়নদা, মৃণালদা, অন্যটায় মনোতোষদা, জয়শ্রীদি, অনুরাধাদি, মাম আর বাবলা। গল্প আছে, তাই বাখানি। ভিজে অন্ধকার, ভিজে আলোয় ডুবে আছে জঙ্গল। থেমে আছে কথা। ধীরে ধীরে গভীর জঙ্গলে আমরা। প্রশিক্ষিত হাতি মাহুতের ইশারায় নিয়ে গেল নির্দিষ্ট জায়গায়, দূর থেকে দেখছি চলেফিরে বেড়াচ্ছে গণ্ডার, একটা তো প্রায় আমাদের পাশ দিয়ে। আর কত যে ময়ূর, কত কত পাখির ডাক! গণ্ডারকে স্পট করার সবচাইতে সহজ উপায় তার নাদা অনুসরণ করা। গণ্ডার একই জায়গায় মলত্যাগ করে, যতদিন না তা উঁচু হয়ে তার মলদ্বার ছুঁয়ে ফেলে। এভাবেই খুব সহজে গণ্ডার দেখতে পাওয়া যায়। আবার এই মলত্যাগের অভ্যেস তার মৃত্যুর কারণও বটে। চোরাশিকারিরাও সহজেই তাকে স্পট করে ফেলে। মনে পড়ে বাবার কাছে শোনা গল্প—একসময় ওই অঞ্চলের আদিবাসীরা মলত্যাগের জায়গা অনুসরণ করে গণ্ডারকে চিহ্নিত করতেন এবং মলত্যাগের সময় শূল জাতীয় একরকম অস্ত্র গণ্ডারের পায়ু দিয়ে ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করতেন, কারণ গণ্ডারের মাংস ছিল তাঁদের অতি প্রিয়। কিন্তু সে তো খাদ্যশৃঙ্খলের বিষয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহবাসের বিষয়। আর এখন চোরাশিকারিরা যেটা করছে, তার মতো ঘৃণ্য আর কী! মন খারাপ হয়। মুখ তুলি, আকাশ দেখা যায় না এত দীর্ঘ গাছের জঙ্গলের ভেতরে আমরা।

বাংলোয় ফিরেই আরেক কাণ্ড। মাম ভীষণ কাঁদছে, ওর হাত-পা ছড়ে গ্যাছে। মনোতোষদা বললেন, ওঁদের হাতিটা নাকি কিছুদিন আগেই ধরা, ঠিকমতো ট্রেইন্ড নয়। কিছুদূর গিয়ে লাফাঝাপি শুরু করে, মাম আর মনোতোষদা হাতির পিঠ থেকে সোজা মাটিতে, মনোতোষদা পড়ে যাওয়ার পরই দেখেন একটা সাপ, সামনেই। ওঁদের ট্রমা তখনও কাটেনি।

সেই যে বলেছিলাম চাপড়ামারি বনবাংলোয় আবারও যাব, সেই যাওয়া শেষ অব্দি। ২০০৪, লক্ষ্মীপুজো। দলে যাব না ঠিকই ছিল। অরণ্যকে পেতে হবে মুখোমুখি, সরাসরি। সকাল সকাল আমরা চারজন- আমি গণনাথ মেয়ে আর ছেলে। আমাদের নীল মারুতি ৮০০ ছুটল। সকাল থেকেই ধুম বৃষ্টি। মাঝেমাঝে চারপাশের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ময়নাগুড়ি বাইপাস ধরতে বৃষ্টিও কিছুটা ধরে এল। তবুও ধন্দ থেকেই যায়, এ কোন ঋতু, শরৎ না বর্ষা, বর্ষা না শরৎ! জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি জলে ডোবা ধানখেত, গাছেরা ভিজছে, ভিজছি আমিও, ভেতরে ভেতরে।

লাটাগুড়ি গরুমারা পার করে বাঁ-দিকে চলে গ্যাছে পথ। এর মধ্যে আমরা লাটাগুড়িতে নেমে প্রাতরাশ আর বাজার। চাপড়ামারিতে তখন বাজার করে নিয়ে না গেলে খাবার জুটত না। বাংলো চত্বরের কাছে এসে হর্ন দিতেই চৌকিদার এসে গেট খুলে বাংলোঘেরা পরিখার পাটাতন পেতে দিল। বাইশ তেইশ বছরের একটা ছেলে, ওকে মনে থাকবে ওর রান্নার জন্য। একটাই দিন ছিলাম আমরা, কিন্তু প্রতিবেলায় ও যা খাইয়েছে, সে দ্রৌপদীতুল্য রান্না আজীবন মনে থেকে যাবে। তা ছাড়াও উত্তরবঙ্গের বনবাংলোর রান্নার একটা আলাদা ঐতিহ্য আছে সেই সাহেবসুবোদের আমল থেকেই।

কোথায় যেন একটা ময়ূর ডেকে উঠল, সেইসঙ্গে আকাশ ফালাফালা করে একটা আলোর রেখা ঝলসে উঠল যেন বাংলোর কাচের জানলা চিরে দেবে। বাজ পড়ার শব্দে কেঁপে উঠল বাংলো, দরজা জানলা। নিচের তলায় শুধু বৈঠকখানা নয়, ডাইনিং হলও। ওপরে অতিথিদের থাকার ঘর। বহুবছরের জমাট ইচ্ছে, তাই এবারে আর আনপ্ল্যানড কোনো ব্যাপারস্যাপার নয়। আগের থেকেই ঘর বুক করা ছিল। কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি ঘর, কাচের বিশাল বিশাল জানলা। সামনেই এলানো বারান্দা থেকে দ্যাখা যাচ্ছে সল্টলিক, তার চারিপাশে জলরঙে আঁকা সবুজ। বারান্দায় বেতের চেয়ার টেবিল, বসলাম। খোলা হল ভদকার বোতল, চিপস চানাচুরের প্যাকেট। এদিকে চৌকিদার ততক্ষণে বাজারের ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে। বৃষ্টি কিন্তু হয়েই চলেছে নাগাড়ে। প্যালেটের থেকে ধূসর ঢেলে দিয়েছে কে যেন সমস্ত জঙ্গলজুড়ে। কিন্তু এ-বৃষ্টি সেই সকালের মতো নয়, বরং কিছুটা পেলব, ছাতাড়ে পাখির ডানার মতো নরম। যতটা দুড়ুমদাড়ুম করেছিল মেঘবাবাবাজি, সম্ভবত তাতেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমের আয়োজন করছে। চৌকিদার এসে গেল ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের প্লেট নিয়ে। মৌতাত জমে উঠছে। হঠাৎ কোত্থেকে একঝাঁক টিয়াপাখি। তখনও স্মার্টফোন আসেনি, ভাগ্যিস। নইলে বারবার আমার ডাক্তার কত্তার ফোনের রিংটোন ঘোর ভেঙে দিত। ছবি তোলা হল সাবেক ক্যামেরাতেই। দূরে একটা গাছের ডালপালার ফাঁকে একটা ধনেশ পাখি দেখিয়ে চৌকিদার সেদিন এক আশ্চর্য কথা বলল, ধনেশ পাখি গাছের কোটরে ডিম পাড়ে, আর স্ত্রী ধনেশ পাখি যখন সেই ডিমে তা দিতে বসে, তখন পুরুষ পাখিটি সেই কোটর মাটি, মল ও কাঠকুটো দিয়ে প্রায় বন্ধ করে দ্যায়, আর স্ত্রী পাখিটির জন্য সে সেইসময় খাবার নিয়ে সে এসে খাইয়ে দ্যায়। মায়া…

পুজোর সময় সমস্ত ট্যুরিস্ট স্পটই মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করে। কিন্তু বহুদিন আগে কথা হয়েছিল এক আঠারোর কুমারীর সঙ্গে অরণ্যের, দেখা হবে আবারও। তাই বোধহয় সেদিন গোটা বাংলো শুনশান, আমরাই একমাত্র অতিথি। দুপুরের খাওয়া বেশ জোরদার, আমরা বেশ একখানা ভাতঘুম দিয়ে উঠতেই চৌকিদার পকোড়া আর চা নিয়ে হাজির। আস্তে আস্তে অন্ধকার নামছে, দূরে বনবস্তি থেকে ভেসে আসছে মাদলের আবছা আওয়াজ। বারান্দায় গিয়ে আমি হতচকিত। জোনাকির ফিনিক ফুটেছে। আমি কি জোনাকিঝাঁপিতে ডুব দেব, আমি কি থলেভরা ঝিঁঝিডাক ভরে নিয়ে যাব আমার ক্যাসেটে!

কী আশ্চর্য, ওই বৃষ্টির মধ্যেও ধীরে ধীরে জোছনা ফুটছে! এ কোন বাজিগর তার জাদুদণ্ড ছুঁইয়ে দিল চারপাশে, ছুঁইয়ে দিল আমার মগজে, সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারজুড়ে শুধু চাঁদের প্রলাপ, শুধু বৃষ্টিগমক।

কখন ডিনার করেছি, কতটা ডুবেছি আমি সুরে ও সুরায়, হুঁস নেই। অরণ্যের কাছে যেতে হলে বোধহয় ছেড়ে আসতে হয় সবটা পিছটান, সমস্ত মেকি আচ্ছাদন। সারারাত শুধু গাছেদের মনোলগ, সারারাত বারান্দাতে আমি। সঙ্গে একখানা সার্চলাইট, মাঝেমাঝে সল্টলিকে আলো ফেলে দেখি, মাঝেমাঝে সে-আলো প্যানোরমিক মোডে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি। বাকিরা সবাই ঘুমে। একা আমি। ক’টা বাজে, কতটা সময় কেটে গেল আমি তার হিসেব রাখিনি। একা নয়, একা নই, আমি আর শাদা পাতা কথা বলি, মাথার ভেতর বসে চাঁদখোর অক্ষরের সারি, মাথার ভেতর নড়ে বৃষ্টিখেকো বাক্যের দল, কথা বলে রাতচরা পাখি, দূর থেকে উড়ে আসে জলেভেজা পাতাদের কেকা, আমি শুধু চাঁদকে ছুঁয়ে দেখি, আমি শুধু সবটা শরীরে মাখি সবুজের প্যাস্টেল শেডস।

সেদিন কিন্তু কোনও জানোয়ার আসেনি লবণ খনিতে। হয়তো আমিও চাইনি। পূর্ণ কলস নিয়ে ঘরে ফেরে মেয়ে।

কেটে গ্যাছে আরও দু-চার বছর। এবার বিরাট দল, এবার হলং। সেটা পশুদের প্রজনন ঋতু। বৃষ্টিকাল। এসময় কাউকেই ফরেস্টে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দলের জনৈক ডাক্তারবাবুর আত্মীয় তখনকার বনমন্ত্রী। তাঁর সুপারিশে গোটা হলং বাংলো এক রাতের জন্য আমাদের দখলে।

শহর জলপাইগুড়ি থেকে রওনা দিল একদল গাড়ি। বর্ষার দিন হলেও সেদিন জল নামেনি একফোঁটাও। আমাদের নীল গাড়িটা তখনও আছে। সে-গাড়িতে আমি, আমার পানের বন্ধু(খাওয়ার ও করার) দেবজানী আর আমার ছেলে। আমাদের ড্রাইভার রবি, তুমুল মাস্তান, দুরন্ত চালায়, সবার আগে আগে।

জলদাপাড়া রেঞ্জে সবে ঢুকেছি, রবি হঠাৎ করেই গাড়ির এঞ্জিন বন্ধ করে জঙ্গলের দিকে আঙুল তুলে ইশারায় কী যেন দেখালো। দেখি, একটি মাদি হাতি তার একদম ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে শালের জঙ্গলের ভেতর। আমরা শিহরিত। জীবনে এমন দৃশ্য এই প্রথম। ক্যামেরা আমার কাছে ছিল না, নইলে… আরেকটু যেতেই দুটো ময়ূর পেখম খুলেছে, দেখলাম, মগজের লেনসে বন্দী করছিলাম সবটাই। তরাইয়ের মেয়ে আমি, ডুয়ার্স জঙ্গলের সঙ্গে পরিচিত সেই কোন শিশুবেলা থেকে, সেই আমিও স্তূতিমুখর, আমি বাক্যহারা। পেছনের গাড়ির লোকেরা কিন্তু এসব কিছুই দেখতে পায়নি। হ্যাটস অফ রবি, এই সিজনে ফরেস্টে যাওয়া এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ, তার ওপর প্রথম গাড়ি সবসময়ই ওদের টার্গেট। দোষ আমাদেরই। ওদের প্রাইভেট লাইফে(প্রাইভেট শব্দটাই ব্যবহার করলাম, সব শব্দের অনুবাদ হয় না, সেই ব্যঞ্জনাই তৈরি হয় না) এভাবে ঢুকে পড়া অন্যায় জেনেও আমরা ঢুকতে চেয়েছি, নিষিদ্ধ ফলে দাঁত বসানো মানুষের চিরকালীন প্রবণতা।

সারি সারি শাল, সেগুন, খয়ের, শিমুল, শিরিষের ঘননিবদ্ধ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ। গাছে গাছে ঝুলে আছে নানা প্রজাতির অর্কিড। বর্ষার অরণ্য বড়ো নিবিড়, কতবারই তো গিয়েছি, এমন রূপ এই প্রথম। আবারও এঞ্জিন বন্ধ করল রবি, সামনেই একটা গাছে ডালপালার সঙ্গে মিশে আছে একটা বিশাল অজগর। কত যে নাম-না-জানা পাখি, একটা গাছের থেকে ডানা ভাসিয়ে উড়ে গেল বেঙ্গল ফ্লোরিকান। এতদিন কেবল ছবিতেই দেখেছি এই বিলুপ্তপ্রায় পাখিটিকে। সত্যিই এবারের ট্রিপ একেবারেই অন্যরকম। আবারও একটা চিন্তা গ্রাস করে, জঙ্গল কি শুধুই পশুপাখির সমাহার, তরাইয়ের মানুষ হয়েও আমরা আজও মিশে যেতে পারিনি এর সামগ্রিকতার সঙ্গে, সম্পৃক্ত হতে পারিনি।

একসময় জলদাপাড়া রেঞ্জে বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে একশৃঙ্গ গণ্ডার, চিতা, সম্বর হরিণ, মায়া হরিণ, চিতল হরিণ, হগ ডিয়ার, বুনো শুয়োর, গৌর, গুঁইসাপ বা গোসাপ, বিভিন্ন প্রজাতির ইগল, বনমোরগ, ময়ূর, তোতা, বেঙ্গল ফ্লোরিক্যান, লেসার পেইড হর্নবিল এমন কত যে পশুপাখি ছিল, এবং মানুষের সঙ্গে তাদের একটা অলিখিত চুক্তি ছিল, প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিকার এই অঞ্চলের আদিবাসীরা কখনও করতেন না। এখনও এই অঞ্চলে মেচ, রাভা, জলদা প্রভৃতি আদিবাসীরা প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যেকার ভারসাম্য বজায় রেখে চলেন। পারি না আমরা, তথাকথিত সভ্য শিক্ষিত মানুষেরা। ফলসরূপ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা। শেষ হয়ে যাচ্ছে ডুয়ার্স জঙ্গল। মন খারাপ হয়ে যায়।

বাংলোতে পৌঁছেই শুরু হয়ে গেল এক প্রস্থ হইচই, দুপুরের খাওয়ার আগেই বোতল খুলে বসে পড়েছে ছেলেরা, আমরা মায়েরা বাচ্চাদের লাঞ্চ নিয়ে ব্যস্ত। দুপুরের খাওয়া মিটতে মিটতে প্রায় বিকেল ছুঁইছুঁই।  

বনবাংলোর সামনে হলং নদীর পাড়ে বাঁধানো ঘাট। আমরা দলবেঁধে ঘাটে। কুমারদা একটা মিনারাল ওয়াটারের বোতল এনে বললেন, কে কে ডাবের জল দিয়ে ভদকা খাবে হাত তোলো। সব্বাই এক কথায় রাজি। এক ঢোঁক খেতেই একটা অদ্ভুত কিক, ভেতরে। আর কুমারদার কী হাসি! বলো তো কী খাইলা? ততক্ষণে বুঝে গেছি…  কুমারদা, শেষ অব্দি আমাদের বাংলা খাইয়ে ছাড়লে! তবে সেই স্বাদ, সেই কিক, তুলনারহিত। জিভে লেগে আছে আজও।

সন্ধে নামছে অরণ্যে। তখনও বসে আছি। আমার মধ্যে একটা ক্ষমতা আছে, ভিড়ের মধ্যেও একা হয়ে যাওয়ার। শুনছি সবই, কিন্তু শুনছিও না, যেটুকু ইন্দ্রিয় চায়, সেটুকুই নেব।

চারদিকে হইচই, ঘরে ঘরে ভিডিও ক্যামেরা তখন সদ্য এসেছে। ডঃ প্রদীপ ভৌমিকের ছেলে আর ডঃ গোপ তাঁদের ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত। অন্যেরা স্টিল ক্যামেরায়। বেশ কটা সার্চ লাইটের ব্যবস্থা হয়েছে। হলং নদী পেরোলেই সল্টলিক। মানসিকভাবে তৈরিই ছিলাম, অনেক জন্তুজানোয়ারের দেখা মিলবে এই ট্রিপে। আচ্ছা, আমরা যেমন বিস্ময় নিয়ে ওদের দেখি, ওরাও কি…

ভেজা কাগজের ওপর রং ছড়িয়ে পড়ার মতো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে। ঢেকে দিচ্ছে বর্ষার সবুজ। আমরা তখনও ঘাটে। সাভানা ও এলিফ্যান্ট ঘাসের জঙ্গলের মাঝে বুক চিতিয়ে শাল, সেগুন, শিরিষ, খয়ের, মেহগিনি ও নাম-না-জানা গাছের দল। কেবল সল্টলিকের জায়গাটাই ফাঁকা ও আমার দেখা অন্যান্য ফরেস্টের সল্টলিকের তুলনায় অনেকটাই বড়ো। এক ঝাঁক চিতল হরিণ ছুটে গেল আমাদের সামনে দিয়ে। তারপরই কোথা থেকে যেন ভেসে এল বার্কিং ডিয়ারের দল, পা তাদের মাটি ছোঁয় না। এত কাছে, যেন থ্রি ডাইমেনশনাল সিনেমা দেখছি। রাত ঘনাচ্ছে। সবাই গল্পে আড্ডায় মত্ত। আমি শুধু চুপচাপ বসে আছি।

এই ফরেস্ট রেঞ্জ এত বিপুল সম্ভারে ধনী, যতবারই যাই না কেন সে নতুন নতুন রূপে ধরা দ্যায়। কয়েকটা বন্য শুয়োর ঘোঁত ঘোঁত তাদের পৃথুল শরীর নিয়ে হেলেদুলে চলে গেল। আর তারপরই সেই কাণ্ড, যা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলেই একমাত্র দেখেছি। জলদাপাড়া রেঞ্জের বিখ্যাত একশৃঙ্গ গণ্ডারের দল আচমকাই এসে হাজির সেই সল্টলিকে। দলে একটা মা গণ্ডার, সঙ্গে তার প্রায় সদ্যজাত সন্তান। এমন সময় আরেকটা গণ্ডার সেই মা গণ্ডারটাকে অতর্কিতে আক্রমণ করে বসল। ঠিক মানুষের সমাজের মতোই, বাকিরা সরে পড়ল যে যার মতন। এদিকে দুটো গণ্ডার ফুঁসে ফুঁসে উঠছে, কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে আবার তেড়ে আসছে, খড়্গ দিয়ে গুঁতো মারছে প্রবল, দুজনেই ক্ষতবিক্ষত, সার্চলাইটের ঐ তীব্র আলোকেও তারা পরোয়া করছে না, একসময় মনে হল ওরা যে কোনও মুহূর্তে নদী পেরিয়ে ধেয়ে আসতে পারে আমাদের দিকেও। সবাই দমবন্ধ করে দেখছে, এমনকী বাচ্চাগুলোও দুষ্টুমি ভুলে সব স্ট্যাচু হয়ে গ্যাছে। শেষে ওরা লড়াই করতে করতে যখন প্রায় নদীর জলের কাছে চলে এল, আমরা উঠে পড়তে বাধ্য হলাম। এবার ঘরের জানলায়, দেখছি। শেষ অব্দি কিন্তু মা গণ্ডার বিজয়ীর মতো দর্পিত ভঙ্গিতে বাচ্চা নিয়ে হেঁটে চলে গেল, অপর গণ্ডারটি আহত শরীর নিয়ে টলতে টলতে হেঁটে গেলে সবুজ অন্ধকারে। বৃষ্টি নামল বড়ো বড়ো ফোঁটায়, বৃষ্টি তখন আমার ভেতরেও।

ছোটো থেকেই জঙ্গল দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে ওঠা আমার ঝাঁপিতে আরও কত যে অভিজ্ঞতা। উত্তরবঙ্গের এমন কোনও ফরেস্ট নেই যেখানে যাইনি। সব লিখতে গেলে ধৈর্য্য হারাবেন পাঠক। সেসব গল্প পরে কখনও হবে। বক্সা টাইগার রিজার্ভ, ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্টে মাইলের পর মাইল ট্রেক করে ওঠা, নদীর বুকে ক্যাম্প করে থাকা, মাঝরাতে চিতার ডাক, বুনো হাতির বৃংহণ শুনে নিদারুণ ভয়ে কেঁপে ওঠা, এমন আরও আরও গল্প।

কিন্তু সবশেষে এক হনণ-প্রকল্পের গল্প বলি। একটি মেয়ে যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা তরাই-ডুয়ার্সের সবুজ মেখে, সবুজ ছুঁয়ে-ছেনে, তাকেও একসময় দৈনন্দিনতার প্রয়োজনে চলে আসতে হয় মহানগরে। তা বলে কি সে সম্পূর্ণ উপড়ে আনতে পারে নিজেকে! মগজের কোষে কোষে জমাট বেঁধে থাকে সবুজ। জঙ্গলের সুঁড়িপথ ডাক দ্যায় চই-চই, পুষ্করিণীপ্রবণ হাঁসের মতন সে-ও নেশাগ্রস্ত, ফিরে যেতে চায় তার ফেলে আসা জীবনের কাছে, ছেড়ে আসা সবুজের কাছে। সে ফিরে যায়, ফিরে ফিরে যায়। কিন্তু ফিরে গিয়ে দ্যাখে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে তরাইয়ের গহীন অরণ্য। কে যেন ডাস্টার দিয়ে মুছে দিচ্ছে তার জীবনের প্রথম পুরুষকে। কংক্রিটের জঙ্গলে ঢেকে যাচ্ছে সমস্ত সবুজ। যে ডুয়ার্সের রাস্তা একসময় ছিল প্রবীণ বৃক্ষঘেরা সবুজ টানেলের মধ্যে দিয়ে, সেখানে এখন দু-পা এগোলেই রিসর্ট। কাটা পড়ে যাচ্ছে সেইসব বনস্পতির দল, খাবারের অভাবে জন্তুজানোয়ারেরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে জনপদে আসতে বাধ্য হচ্ছে। চোরাশিকারিদের দাপটে সংখ্যায় ক্রমশই কমে যাচ্ছে, এবং ‘বিলুপ্তপ্রায়’ শব্দটি জুড়ে যাচ্ছে তাদের প্রজাতির সঙ্গে। বাণিজ্য ও ভোগবাদের হিংস্র ড্রাগন ঢুকে পড়েছে সবুজের সাম্রাজ্যে, জিভে তার আগুনের হলকা, চোরাগোপ্তা নয়, সরাসরি আক্রমণে ছিন্নভিন্ন করছে, পড়ে আছে জংধরা সবুজের শবদেহ।

About Author
&
Photographer

লেখক : সৌমনা দাশগুপ্ত

নব্বই দশকের কবি  ও ঔপন্যাসিক।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : বেদ পয়স্বিনী(২০০৬), খেলাহাট(২০০৮), দ্রাক্ষাফলের গান(২০০৮), ঢেউ এবং সংকেত(২০১৮), জিপার টানা থাকবে(২০১৯), অন্ধ আমার আলোপোকা(২০১৯), সাপ ও সিঁড়ির সংলাপ(২০২১), রৌদ্রগণিকার পথ(২০২২), নির্বাচিত কবিতা(২০২৩), ক্রাচে ভর দিয়ে গান(২০২৩), বিজন গুম্ফার দিকে(২০২৪).

প্রকাশিত উপন্যাস: মাশান রহস্য(২০২০)

আলোকচিত্রী: সব্যসাচী হাজরা

লেখালিখি :  শূন্য দশক

ভালোবাসা : কবিতাপাঠ, ভ্রমণ,  ছবি তোলা, গান গাওয়া , শ্রুতিনাটক

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget