পাহাড়কণিকা কণাহিমালয় (ভূতলস্বর্গের কানাচ আর মরুপাহাড়ের আলসে থেকে)

৫
গত চার বছর ধরে ২৬ জুন দিনটা এলেই কেমন কেঁপে কেঁপে উঠি। এই দিনটির রাত-দুটোর সময় একটা ফোনে আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। চাকরির জন্য বোলপুর থাকতাম তখন। বহরমপুরের বাড়িতে স্ত্রী আর ছেলে। দুদিন ধরে স্ত্রী অসুস্থ ছিলো। কিন্তু যেতে পারিনি চাকরির আবশ্যিকতায়, এবং কিছুটা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায়। ২৬ জুন রাতে খুবই অসুস্থ বোধ করায় বহরমপুর হাসপাতালে আনা হয় গভীর রাতে। কিন্তু ম্যাসিভ হার্ট-আটাকে বেডে দিতে না দিতেই তার জীবনাবসান ঘটে। রাত আড়াইটায় গাড়িতে বোলপুর থেকে রওনা হয়ে ২৭ জুন খুব ভোরে আমি তার মরা মুখটা দেখি। সে শুধু আমার স্ত্রী-ই ছিলো না, ছিলো বন্ধু, ছিলো আমার ভালোবাসার মানুষ, আমার লেখালিখি জীবনের আশ্রয়স্থল। গত তিন বছরে এই দিন দুটিতে ঘরেই থেকেছি ছেলে আর আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে। এবারে হিমাচল প্রদেশের পুহ-তে আমার দিন শুরু। আমার সঙ্গী দুই বন্ধু। যেতে হবে। পৃথিবীতো থেমে থাকতে পারে না। আমরাই বা থেমে থাকি কিভাবে, এই ভ্রমণে এসে! বুঝতে পারছি, আমি মন লাগাতে পারছি না অন্য ক’দিনের মতো। বুঝতে পারছি সঙ্গীরা আমার আনমনায় কিছুটা বিহ্বল। সমব্যথী। আমিও বুঝতে চেষ্টা করছি নাগরিক জীবনের মধ্যে থেকে এই দিনটি পালন আর যাপনের সঙ্গে আজকের প্রকৃতির কোলে বসে যাপনের পার্থক্যগুলো ঠিক কী কী। জীবন তো শেষ হয় না। সে এক এন্ডলেস জার্নি। আমাকেও এই জার্নি উপভোগের পরামর্শ দিলো প্রনবদা আর ধীমান। এখান থেকে রওনা হয়ে ‘নামগিয়া’ আর ‘লিও’ হয়ে যেতে হবে ‘নাকো’। সেখানেই রাত্রিবাস। সেই রাত। টেলিফোনের রাত। গাড়িতে উঠে বসতে গিয়ে আমি যেন হোঁচট খেলাম। আর কে যেন বলে উঠলো— ‘সাবধানে যেও’। কে? কে? না, বাইরে থেকে শোনা নয়। একদম ভেতর থেকে শোনা সেই কন্ঠস্বর। আমি কি একটু একটু ভিজে উঠছি? আপাতত থাক তাহলে এই কয়েকদিনের কথা। আমরা চলে যাই তৃপ্তির পরের স্টেজে। পরে আবার এখানে ফেরা যাবে।
চন্দ্রতাল হয়ে গেলে আমাদের নিয়ে আজকের মতো তৃপ্ত প্রনবদাকে আগে আর দেখিনি। সেই ১৭ তারিখ থেকে প্রায় সবকিছুতেই তার অস্থিরতা আর অতৃপ্তি আমরা লক্ষ্য করেছি। আর বার বার জিজ্ঞাসা, ‘কি রে তোদের উচ্ছাস কই?’ উচ্ছাসের কম বেশি প্রকাশেও তার মন ভরত না। আজ একদম রিল্যাক্সড। এই হচ্ছে লিডার। যে এচিভ করার জন্য থামতে দিতে চায় না। এচিভ না করা পর্যন্ত তৃপ্ত হতে পারে না। আজ ১ জুলাই। আজ আমাদের ছুটতে হবে সবচেয়ে বেশি। চন্দ্রতাল থেকে ট্রেক করে যখন গাড়ির কাছে এসে পৌঁছলাম তখন ১০-৩০ বাজে। সকাল থেকে একটাও সিগারেট না খাওয়া আমরা দুটি টান দিলাম চরম। তারপর ছুটলো গাড়ি। জুগনুও আজ পেল্লাই মজা করেছে। এখন শান্ত, স্টিয়ারিং-এ শক্ত হাতের পলকা ছোঁয়া। খুব ভিজিল থাকতে হবে এই সংকীর্ণ রাস্তায়। রাস্তা তো ঠিক নয়। বোল্ডার সাজিয়ে সাজিয়ে তাতে পাথরের গুড়ো ফেলে যতটা সম্ভব সমান করে দেওয়া। চাকা যখন খুব ধার দিয়ে যাচ্ছে, হতেই পারে ধারের খাদ তাকে ভালোবেসে ফেললো। আর খুব কম হলেও এক-আধ বার যখন উঠে আসা গাড়িকে সাইড দিতে হচ্ছে তখন তিন-চার-পাঁচ মিনিট ধরে অপেক্ষা। খুবই লাফিয়ে উঠছে মাঝেমধ্যে, একটু বেশি কাৎ হয়েও পড়ছে কখনো-সখনো। তবু চলতে চলতে একসময় কিছুটা ভালো রাস্তা ও একসময় ‘বাটাল’।
চন্দ্রতাল থেকে নামতে নামতে আমাদের কথা হয়ে গিয়েছিলো যে আমরা মানালি থাকবো না। সেই ভিড়-ভাট্টা, চিৎকার চেঁচামিচি, শহর যাপনের গতি নয়। থাকবো নিরালা, শান্ত, আর প্রকৃত নিসর্গের কোলে। ঠিক হলো, এদিক থেকে রোটাং-পাস হয়ে মানালি যাওয়ার ৯-১০ কিমি আগে ‘সোলান-নালা’য় থাকবো আমরা। সেই মতো বন্ধুর মাধ্যমে প্রনবদা সোলান-নালায় একটা ঘরেরও ব্যবস্থা করে ফেললো। আর কী চাই? এবার শুধু ছোটা।
‘বাটাল’ আসলে কাজা-মানালি/মানালি-কাজা রুটে চা খাওয়ার সাময়িক বিরতিস্থল। এটা কুনজুম-লা এর ঠিক পাদদেশে। প্রায় ১০ কিমি। চন্দ্রতাল থেকে বাটাল আসার পথটা একদমই ভালো নয়। খানা-খন্দে ভরা। মাঝেমাঝেই রাস্তা বেয়ে জল যাচ্ছে। জলের মধ্যে অনেক সময় রাস্তা ভালো দেখাও যাচ্ছে না। এরই মধ্যে চলছে সরকারি বাস। হেলেদুলে, কিন্তু কর্তব্যে স্থির। চন্দ্রা নদীর ধার দিয়ে রাস্তা। সেই নদীতে মাঝেমধ্যেই এসে মিশছে কোনও ঝোড়া। কখনও সে পেরোচ্ছে রাস্তা। এটি ২১ নম্বর জাতীয় সড়ক। তা ধরেই আমাদের একটু একটু নেমে আসা। লাহুল-স্পিতি জেলার ছোট্ট জনপদ এই বাটাল। পথচারীদের চা খাওয়ানোতেই যার আনন্দ। রাস্তার ধারে সাময়িক ছাউনির টি-স্টল সব। তাও আবার সংখ্যায় খুব বেশি নয়। তাজা রোদ ওঠায় শীত ভাবটা আর নেইই। কিন্তু হাওয়া দিচ্ছে খুব। টুপি উড়িয়ে দেওয়ার মতো হাওয়া। রাস্তার ডানধারে খাড়াই পাহাড়, বাঁ-দিকে চলে চলা চন্দ্রা, তারই গা ঘেঁষে টি-স্টল। ঢুকে পড়লাম একটায়। চা-পান, সঙ্গে পাকোড়া, সঙ্গে সিগারেট, সঙ্গে খুনসুটি। ধীমানের ভোর চারটেয় উঠে পাঁচটায় বেরোনোর মধ্যে খোলসা হওয়ার প্রসঙ্গ, বা আমার দিনে ১৭টা ট্যাবলেট কমে ৮-১০ আসার ইতিহাস, বা প্রনবদার সান্ধ্য টেবিলে আমাদের যুৎসই সাড়া না দিতে পারার করুণ কাহিনী। একেকটি এপিসোডের পর হাসির হুল্লোড়, আর সঙ্গেসঙ্গেই আরেকজনের ধরতাই, আর প্রনবদার ‘সাবাশ, সাবাশ’। শীতও যেন পালাই পালাই। শুধু নদীতে ঝিলমিল করছে ১২টার সূর্য, বড্ড জানান দিয়ে।
আমরা এখন হিমাচল প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে রয়েছি। সাড়া রাস্তা ধরে কাজ হচ্ছে খুব। সারাই বা চওড়া করার কাজ। মনে হচ্ছে, একই সঙ্গে ওই যে নানারকম G আছে না, 2, 3, 4. মনে হচ্ছে এ তারও চক্কর। ডিজিটাল ইন্ডিয়া। মাঝেমধ্যেই আমাদের দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে রাস্তায়। একবার তো অনেকক্ষণ ধরে। কপালে ভাঁজ পড়ছে প্রনবদার। এভাবেই পথে চলার সৌন্দর্যের সঙ্গে চলার পথের তৈরি হওয়া অসহিষ্ণুতা মিশিয়ে আমরা কখন যেন ছত্রু পৌঁছে গেলাম। খিদে পাওয়ার সঙ্গে সমতা রেখে এই পৌঁছে যাওয়া। নদী সে রয়েছে পাশে পাশে। গতি এখানে সামান্য কম। বিস্তৃতি কিছুটা বেশি। অনেকটা সমতল মতো জায়গা। এ পথে দুপুরের খাওয়ার পসরা সাজিয়ে বসে থাকা অর্ধ-বৃত্তাকার ছাউনির টেন্টগুলো। অতএব, দাঁড়াও পথিকবর। গাড়ি থামলো। জুগনু চললো কী একটা সারতে। বেশ কয়েকটা বিশালাকৃতির টেন্ট আছে। খুঁজে-পিতে একটায় ঢুকে পড়তে হবে। দুপুরের খাওয়া সারতে হবে চটপট। খাওয়া শেষে কয়েক মিনিটই ছিলাম ছত্রুতে রাস্তার ধারে আবার নদীর পাশেও। যতদূর চোখ যায় সবুজ কমই মনে হলো। রাস্তার ধারের পাহাড়টা ভীষণই খাড়াই। তারই কোনও একটা অংশে বেরিয়ে আসছে ছোট্ট ক্ষীণ একটা জলের ধারা। গডিয়ে পড়ছে গা বেয়ে। নদী এবং এমন দু-একটা ক্ষীণ ধারা থাকা সত্তেও জায়গাটা কেমন ড্রাই মনে হলো। হতে পারে তখন দুপুর, তখন তীব্র রোদ, যদিও মাসটা জুলাই। আমরা ঐ রাস্তার ধারে খাওয়া ছাড়া ছত্রুর কোথাও যাইনি। শুনেছি এখানে সব্জীপাতির ভালো চাষ হয়। তাহলে তো সবুজ থাকবেই। শুনেছি এ অঞ্চলে পাহাড়ের ‘ওয়েসিস’ রয়েছে। মরুদ্যান দেখা হলো না। আরেকটা জিনিসও খেয়ালে এলো। প্রনবদা ধীমানের ছবি তোলার বহরটাও আগের থেকে অনেক কমেছে। জুগনু রেডি। অতএব ‘লেটস গো’।
চলা আর চলা। কথাবার্তা টুকটাক। একসময় রোটাং-পাস চলে এলো। কিন্তু এ কোন রোটাং-পাস? একদম অচেনা লাগছে অন্তত আমার কাছে। দশ বারো বছর আগে এসে একে দেখেছিলাম বরফাবৃত। সঙ্গে ইলশেগুড়ি বরফবৃষ্টি। আজ বরফজামা খুলে ফেলেছে। নাঙ্গা রোটাং দেখতে মোটেও ভালো লাগলো না। তবুও লোকজনের ভিড়। হামলে পড়া উৎসাহ। গাড়ি আর গাড়ি। বড্ড ঘিঞ্জি হয়ে পড়েছে। আগের দেখা বরফাবৃত বড় চত্বরটা এখন কেন জানি খুবই সংকীর্ণ মনে হলো। আমরা দাঁড়ালাম না। মন চলো নিজ নিকেতনে। নিজ নিকেতন আপাতত সোলান-নালা।
৬
হোটেল রুমের বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ধীমান বলে উঠলো—‘আরে এ তো সুইজারল্যান্ড রে।’ পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এক ঝলকেই বুঝলাম, সত্যিই অপূর্ব। সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, সবুজ ঘাসে মোড়া। বেশ কয়েকটা ঘোড়া, ঘাসে মুখ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা বাড়ি, একদম বিদেশী ইউরোপিয়ান স্টাইলের। ডানদিকে বয়ে যাচ্ছে প্রথমে একটা ঝোড়া, নাম সোলান নালা, তার পরপরই ‘বিয়াস’ বা বিপাশা নদী নিজস্ব ছন্দে ও গর্জনে। এখান থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তার একটানা নেশানো ধ্বনি। সামনের ফাঁকা মতন জায়গাটা শেষ হতে হতেই ধাপে ধাপে উঠে গেছে পাহাড়। গায়ে পাইনের ঘন জঙ্গল। উঁচুতে পাহাড়-শৃঙ্গে ইতস্ততঃ অলস বরফ, নজর করে দেখতে হচ্ছে। কেননা ঘন কালো মেঘ চরে বেরাচ্ছে সেখানে। বাঁ-দিকেও পাহাড়। আর তার গা বেয়ে রোপ-ওয়ের তার। মাঝেমধ্যে ঝুলছে বক্স । ডানদিকে নদীর পর থেকেই পাহাড়, তবে তেমন উঁচু নয়। গোটাটাই পাইনে মোড়া। বাসা বেঁধেছে খুচরো-উড়ো মেঘ। উড়েও যাচ্ছে বাসা থেকে। পাখিও আছে। উড়ছে, বসছে, ডাকছে। ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি নেমে এলো। সব জায়গায় একটা চলমানতার রেশ। অদ্ভুত রোমাঞ্চের মধ্যে নির্জনতাকে শাসন করছে পরিবেশ। সুইজারল্যান্ডই বটে। ব্যালকনিতে বসে একপ্রস্থ আড্ডা হলো খুব তিনজনে।
কষ্টে বাঁচিয়ে রাখা শেষ রেড-ওয়াইনের বোতলটা নিজেই নিজের ছিপি খুললো সন্ধ্যার পর। ব্যালকনির টেবিলে বসলো গ্লাস। টিপ-টিপ বৃষ্টির মধ্যে আজ পান, প্রায়ান্ধকার আলোয় আজ কবিতা। ধীমানের কবিতার বই-এর পান্ডুলিপি্ (‘ভুলে যাওয়ার খেলা’) প্রায় শেষ এ কদিনে। আজ বাকিগুলো। মোহিত হয়ে যাওয়া। ধীমানের কন্ঠস্বর আর আমাদের নিশ্বাসের শব্দে ঈশ্বরও যেন এসে বসেছেন আমাদের পাশে। এই তো স্বর্গ। আনন্দই এখানে ভূমাসুখের কারণ। আমারও কয়েকটা কবিতা, ‘ মা, যা বললে বিষদ খুলে যায়’ পড়ার অবকাশ ঘটে গেল। আমার কবিতা নয়, হয়তো ‘মা’ শব্দের যাদু ওদের বিমোহিত করে থাকবে। আর পাহাড়ের পাহাড়ু, কবিতা অন্ত প্রাণ, কবিতায় ডুবে যেতে যেতে শোনায় প্রতিক্রিয়া। এমন নিবিড় শ্রবণ আর প্রতিবর্ত ভাব তুলে আনা, আরেকটা কবিতা এই উঠে এলো বলে।
সুইজারল্যান্ডে সকাল হলো দেরিতে। ব্রেকফাস্টের পর গাড়ি ছুটলো নাগর, মানালি পেরিয়ে। বিপাশা নদীকে ডানে রেখে ২১ নং জাতীয় সড়ক ধরে এই চলা। চলতে চলতে একসময় বিপাশার ওপারে দেখা দিলো মানালি। ডানে চোখ ঘুরিয়ে দেখেই চলেছি। শহর আর ফুরায় না। এত্ত বড় হয়েছে মানালি? ভাবতে একটু কি কষ্ট হচ্ছে? ১০-১২ বছর আগে, সপরিবারে এসেছিলাম মানালি। খুব বড় ছিলো না তার পরিসর। আজ দৈর্ঘে বহরে তার এই রূপ দেখে, শুধু কলমুখরতার কথা ভাবছিলাম। নাগর থেকে ফেরার পথে মানালি ম্যাল-এ কিছুক্ষণ। আমার ভাবনার সঙ্গে এত যে মিল হবে, ভাবতে পারিনি। গিজগিজ করছে মানুষ। গড়িয়ার মোড় যেন। চলুক হুজ্জোত আর ব্যস্ততা, আমরা ব্যস্ত হবো না। প্রনবদা গেলো বন্ধু মুলাকাতে। আমরা চা সিঙারা সিগারেট আর সামান্য উলেন। এলোমেলো, উদ্দেশ্যহীন। সবসময় উদ্দেশ্য থাকতে হবে তার কোনো মানে নেই। সবসময় উদ্দেশ্য থাকাও ভালো না। টানটান ভাবটাকে কখনো সখনো এলিয়ে পড়তে দিলে নিজেকে অনেক খোলামেলা লাগে। আর খোলামেলা মনে এই বয়সেও এসে ভিড় করে নানা দুষ্টুমি। তাল মিলিয়ে সে দুষ্টুমি করতে না পারায় নিজে নিজেই হেসে উঠতে হয়। এরকম এক হাসির টুকরোয় কোনো এক রঙিন মহিলা আকৃষ্ট হতে হতেও অবাকই হয়ে গেলো। প্রত্যুত্তর কিনা জানিনা, একটা হাসির ঝিলিক উঠেও ঘাড় ঘোরানোয় মিলিয়ে গেলো, ফিরল যখন তখন অবাক চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছে পাশের মহিলাটিকে নিশ্চয়ই তিনি জিজ্ঞাসা করে ফেলেছেন—‘কী রে, পাগল নাকি?’ আমিও ধীমানকে একটা ঠোনা মেরে জানান দিতে গিয়ে দেখলাম, সে তাকিয়ে আছে দূরে আর অকারণেই হয়ত ওর একটা হাত উঠে এসেছে একমুখ দাড়ির প্রান্তসীমায়। না, তাকে আর এসবে ঢোকালাম না, ভাঙলাম না তার ফিরে দেখা, হয়তবা।
চললো গাড়ি সোলান নালার দিকে। তবে যে রাস্তায় এসেছিলাম ফের সে রাস্তায় নয়। জুগনুকে বলেছিলাম—‘অনেক আপেল গাছ আর ছোটোখাটো আপেল বাগান দেখেছি। কিন্তু এক মহল্লা খুবসুরৎ আপেল বাগান দেখিও তো।’ তাই চললো গাড়ি ওল্ড মানালির দিকে। বাঁদিকে হিড়িম্বা টেম্পল যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে ঘুরলো গাড়ি। কিছুক্ষণ পর প্রনবদা দেখালো তার ক্লাইম্বিং ট্রেনিং স্পট। শোনালো অল্প বয়সের ক্যাম্পের কৃচ্ছতাসাধনের গল্প। সত্যি একজন ক্লাইম্বার হওয়া সোজা কথা নয়, বহু সাধনার ফল। রোমহর্ষক ব্যাপার-স্যাপার সব। পরিশ্রম, অধ্যাবসায় আর নিরন্তর ইচ্ছা। সমস্ত রকম প্রতিকূলতাকে পরাস্থ করার মানসিকতা গঠন। অবশ্য শুধু রক-ক্লাইম্বিং কেন যে কোনো আরোহনের এই তো মূলমন্ত্র। প্রনবদার গল্প শেষ হতে না হতেই শুরু হলো আপেল বাগান। দুপাশে, সারে-সারে। কচি কাচা সবুজ আর সামান্য ছোপ ধরা। দু-পাশে এত গাছ, এত ফল, আর মাঝে আঁকাবাঁকা পথ, চেঁচিয়ে গান ধরতে ইচ্ছে করছিল, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়…’, কিন্তু সঙ্গে কোনো সূচিত্রা সেন না থাকায় ‘তবে কেমন হতো!’ কাকে আর জিজ্ঞাসা করব ভেবে গাইলামই না। অসাধারণ সে চল-দৃশ্য ধরে রাখলাম মোবাইল ক্যামেরার ভিডিওতে। এই ইচ্ছেটাও পূর্ণ হয়ে গেলো।
মানালির পর থেকে নাগর যাওয়ার পথটা ছবি আঁকা। মসৃণ পিচ রাস্তা যেমন, দুপাশে পাইন সিডারের সারি। দু-পাশের তাদের মাথামাথিতে রাস্তাটা যেন এক বড় সুড়ঙ্গ। আর গাছের কাণ্ডের খেলা। অনেকদূর উঠে যাওয়া কান্ডগুলিই দেখা যাচ্ছে শুধু গাডির জানালা দিয়ে। তার সঙ্গে মিশেছে গাড়ির গতি। এক সিনেম্যাটিক যাত্রা আমাদের। জুগনু বেরসিক নয়। কিন্তু তার বেগড়বাই করা পেট ব্যথার জেরে গাড়ি দাঁড়ালো। ছুটলো সে জল ও ত্যাগের সন্ধানে। ওষুধ কিনতে হলো তার জন্য। বেচারার গণ্ডগোল, আর আমার মন বলে উঠল—‘বাবা, শুধু আমিই নই। এখানকার তরতাজা ছেলে। সে ও।’ আসলে আমার চল্লিশ বছরের গৃহপালিত রোগ গ্যাসট্রাইটিস গোটা ট্রিপ ধরে প্রায় মাতলামিই করে চলেছে।
নাগরের মূল আকর্ষণ ‘ইনটারন্যাশনাল রোয়েরিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ পরিচালিত নিকোলাস রোয়েরিক- এর ভারতীয় কর্মকান্ডের মিউজিয়ামটি। একটি গাছপালা পরিবেষ্টিত দোতলা বাড়িতে এই মিউজিয়াম। যেমন ঘরে ঢোকার সিঁড়ির পাশেই যে ম্যাগনেলিয়ার দোতলা সম গাছটি তা আপনাকে অভিবাদন জানাবে। এত বড় ম্যাগনেলিয়া ফুলের গাছ আমি আগে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। আরও আছে কত রকমের ফুল আর গাছ। অধিকাংশেরই নাম জানি না। ঘরগুলোতে তাঁর আঁকা পেইন্টিংস। অধিকাংশই নিসর্গের। কিছু স্থানীয় মানুষের। আর কিছু পোর্ট্রেট। নানা রং, নানা প্রকৃতির ও মিডিয়ার। কিন্তু খুব ভালো করে দেখার উপায় নেই। ঘরে ঢোকা বন্ধ। বাইরের অপ্রশস্ত জানালা দিয়ে চোখ নিচুতে নামিয়ে ওপরে উঠিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে চুরিয়ে যে দেখা, তাতে আরাম বা আনন্দ কোনওটাই নেই। ঘরের আলোও অপ্রতুল মনে হলো। তবুও দেখা, যতটা পারা যায় খুঁটিয়ে। প্রনবদা বলছিলো কিছুদিন আগেও এমনতর ব্যবস্থা ছিলো না। তখন সরাসরি দেখা যেত। এবং ছবির সংখ্যাও আরও বেশি ছিলো। হবে, হয়তো বাধ্যতামূলক এই ব্যবস্থা। মন্দির প্রদক্ষিণের মতো আমরা বারান্দা দিয়ে ঘুরে ঘুরে একবার জানালায় চোখ, একবার বাইরের চারপাশে দৃষ্টি। আর ভালো লাগলেই শেয়ার করার জন্য এ ওর দৃষ্টি আকর্ষণ। রোয়েরিকের পেইন্টিংসের সিডি বিক্রীর ব্যবস্থা করেছে ট্রাস্ট কতৃপক্ষ। দুটো সিডি সংগ্রহ করে প্রনবদা আমাদের জানিয়ে দিল উত্তরাখন্ডের কোনও এক স্কুলে গিফট্ করবে এই কাজ। তার আগে কপি করে নেওয়ার সুযোগ দেবে আমাদের। বুঝতেই পারিনি কখন এতটা সময় পেরিয়ে গেছে। লাঞ্চ-টাইম এসে হাজির হয়েছে। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে পাশের খাওয়ার জাগয়ায় ঢুকতে ঢুকতে আর অর্ডার দিয়ে বসে থাকার সময় ভাবছিলাম এই মহিমময় ব্যক্তিত্বটির কথা। এক বিশাল কর্মময় জীবন ও চিন্তাশীল যাপন এই মানুষটির। একাধারে তিনি পরিব্রাজক, চিত্রশিল্পী, কবি, ভাবুক, শিক্ষক, শিল্প-কলায় নিবেদিত প্রাণ, বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের স্থাপনাকারি, বিভিন্ন ধর্মীয় ভাব-ভাবনা রীতি-নীতি আর সংস্কৃতির অন্বেষক, সর্বোপরী মানবতাবাদী। খুবই আগ্রহ সৃষ্টি করলো মানুষটি, আমার মধ্যে। যার রেশে পরে আরেকটু জানার চেষ্টায় যা জানলাম তা শুধু বিচিত্রই নয়, বর্ণময়ও। আর ভাবলাম বা প্রশ্ন উঠল মনে এই চেতনসমৃদ্ধ প্রাজ্ঞ প্রচল থেকে অনেকটা এগিয়ে থাকা মানুষটি কুলুর কাছে প্রায় অজ্ঞাত অখ্যাত এই গ্রামে ৬৫০০ ফুট এলটিচুডে এসে কেন কাটিয়ে গেলেন জীবনের শেষভাগের বেশ কয়েকটি বছর? সে কি নিসর্গের টানে, বুদ্ধ ধর্মের টানে, সাদাসিধে পাহাড়ী মানুষগুলোর টানে, না কিসের প্রেরণায়? রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গে ১৮৭৪ সালে শিক্ষিত উচ্চ-মধ্যবিত্ত এক পরিবারে জন্ম তাঁর। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সেখানেই। বিচিত্র কর্মকান্ড সহ কলা ও আঁকায় পারদর্শিতার সঙ্গে চলে শিক্ষাদীক্ষাও। ১৯ বছর বয়সে পিটার্সবুর্গ ইউনিভার্সিটির ‘আকাদেমি অফ আর্ট’এ ভর্তি হন এবং একজন আঁকিয়ে হয়ে ওঠার ব্রত নেন। আসেন তাবড় শিল্পী সাহিত্যিক সমালোচক চিন্তাশীল মানুষদের সংস্পর্শে। ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা শেষে গবেষণামূলক প্রবন্ধ জমা দিয়ে ইউরোপের প্যারিস ও বার্লিন শহরে যান সেখানকার যাদুঘর, প্রদর্শনী, স্টুডিও, স্যালন্গুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে। দেশে স্থাপনা করেন এমন এক ইনস্টিটিউট, যেখানে কলা বিভাগের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন, অঙ্কন, মিউসিক, গান, নাচ, থিয়েটার, ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ববর্তী ধ্যান ধারনার বাইরে গিয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হতো। জড়িয়ে পড়েন রাশিয়ান থিয়েটারের সঙ্গেও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে অনেক ছবি আঁকেন। কোনও একসময় কবিতাও লেখেন। ইউরোপে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়। পরে আমারিকাতেও। পরবর্তীকালে স্ত্রী হেলেনার সঙ্গে মিলিতভাবে আমেরিকায় গঠন করেন ‘অগ্নি যোগ সোসাইটি’, যেখানে দর্শন আর ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ক চিন্তা-ভাবনা আর কাজকর্মের পরিসর ছিল। পিটার্সবুর্গের মতো আমেরিকাতেও গঠন করেন ‘Master Institute of United Arts’। বিশ্বের নানা দেশ ঘোরার পর আসেন ভারতে, ১৯২৩ সালে। একজন পরিব্রাজকের মতো ঘুরে ঘুরে ১৪০০০ ফুট থেকে ২১০০০ ফুট এলটিচুডের প্রায় ৩৫ টি গিরিখাত তিনি অতিক্রম করেন হিমালয় রেঞ্জে। এইসব অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় চেতনা ও সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হন আর আঁকেন অনেক যুগান্তকারি ছবি। ভ্রমণ শেষে পরিবার নিয়ে ঘর বাঁধেন কুলুর কাছে, ১৯২৮ সালে। গঠন করেন ‘Urusvati Himalayan Institute, Research’. চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১৯৪৭ সালে কুলুতেই তিনি মারা যান। তাঁর দেহ পোড়ানো হয়, আর চিতাভস্ম ছড়িয়ে দেওয়া হয় পাহাড়ের ঢালে প্রকৃতির মধ্যে, যে পাহা্ড়, নিসর্গ, পাহাড়ি রমণী তিনি বার বার এঁকেছেন তাঁর প্রায় সাত হাজার ছবির মধ্যে এক বৃহদংশ হিসেবে। অবাক লাগলেও ভাবতে ভালো লাগে এই কর্মবীর পরিব্রাজক অভিযান-প্রিয় মানুষটি নিশ্চয়ই এমন মনের খোরাক, আনন্দ ও ভালোবাসার সন্ধান পেয়েছিলেন এ অঞ্চলে যে জীবনের একটা মূল্যবান অংশ তিনি এখানে কাটিয়েছেন ও কাজ করেছেন। এই বোধহয় হিমালয়ের মাহাত্ম।
পরদিন আমাদের ফেরা। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া। মানালি কুলু মান্ডি হয়ে চন্ডীগড়। হয়ে দিল্লী। এতদিন থাকার পরেও জার্নিতে মনখারাপ মিশে যাচ্ছে বারবার। সে বিষাদ বর্ণনা ফেলে আমরা বরং ফিরে যাই সেই মাঝখানের দিনগুলিতে আপার কিন্নৌর এর মহিমা কীর্তনে।
৭
২৬ জুন সকালে আমাদের নিয়ে গাড়ি ছুটছিলো পুহ থেকে নামগিয়ার পথে। ম্রিয়মান আমি অবশ্য আর বেশিক্ষণ ম্রিয়মান থাকতে পারলাম না। প্রকৃতি আমাদের অনেক দেয়। অনেক ক্ষতে তার নিজস্ব মলমের প্রলেপ দিয়ে দেয়। শুশ্রুষা আর আশ্রয় দেয়। আপনি তার কোলে হারিয়ে যাবেনই। আপনাকে ভুলিয়ে দেবে অতীত। শুধু বর্তমান আর ভবিষ্যতের কথায় আর সম্ভাবনায় মজিয়ে দেবে সে আপনাকে। এমনই রহস্য আর মায়াজাল তার। বিষণ্নতাকে চ্যালেঞ্জ জানাবার প্রকৃত ক্ষমতা যে প্রকৃতি ধরে তা আমি বুঝে গেলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। যেতে যেতে গাড়ির জানালা দিয়ে দূরের পাহাড় শৃঙ্গে বরফের ওপর সূর্যের কিরণ ঝলকে উঠলে আমাকে বলে উঠতেই হয় ‘আহা’ বা ‘অসাধারণ’। পাশে পাশে চলা নদীর গা থেকে প্রতিফলিত রশ্মি গাড়ির বনেটে এসে আছড়ে পড়লে ‘ওহো’ করে উঠতে হয়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবিন্যস্ত সরলবর্গীয় গাছের কান্ড মাঝেমাঝেই বিন্যাসের রূপরেখা জাগিয়ে তুললে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে যেতে হয় তার সুষমা যতক্ষণ দেখা যায়। আর পাশের কাউকে ‘দ্যাখ, দ্যাখ’ বলে দেখাতেও হয়। নাম-না-জানা ফুলের অ-সাধারণ রঙবাহার আর নাম-জানা অথচ সেই মুহূর্তে কিছুতেই মনে না করতে পারা ফুলের ভিন্নতা, এবং নির্জনতা ভাঙা পাখীর ডাক শুধু চোখ আর কানের আরামকেই স্থৈর্য দেয়না, মনের বিষাদভঞ্জনেও যারপরনাই সহায়তা করে। এভাবেই আমি অতীতের নিজস্ব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমান জগতের চলমানতা ও ভবিষ্বত স্বপ্ন জগতের আনন্দে মিশে ভ্রমণসর্বস্ব হয়ে উঠি। সিডিতে বেজে চলা গানের সঙ্গে জুগনুর গলা মেলানোকে উপভোগ করি।
পুহ থেকে নামগিয়ার দূরত্ব খুব বেশি নয়। ডাবলিং পেরিয়ে আসতে হয়। একসময় রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। সোজা গেলে নাকো হয়ে সুমডো আর ডানে গেলে নামগিয়া হয়ে সিপকিলা। এই টার্ন থেকে নামগিয়া ৫ কিলোমিটার। এখান থেকেই লক্ষ্য করা গেল কমবেশি মিলিটারি তৎপরতা। এবং বোঝা গেল এই সীমান্তে মিলিটারি কার্যকরণ হিমাচল প্রদেশে আমাদের দেখা অন্যান সীমান্তের চেয়ে একটু বেশিই। এর কারণ আমার জানা নেই। হতে পারে এ অঞ্চল একটু বেশিই স্পর্শকাতর। একসময় গাড়ি এসে দাঁড়ালো এমন একটা ছোট্ট চত্বরে, যেখান থেকে সাধারণ দর্শনার্থীর আর প্রবেশাধিকার নেই। নামতে হলো। অসাধারণ এই জায়গাটা। চত্বরের ডানদিকে চোখ তুললেই বরফাবৃত বেশ কয়েকটি গিরিশৃঙ্গ। তার মধ্যে উচ্চতায় বড়টি ‘পুরগিল’ শৃঙ্গ (Reo Purgyil)। হিমাচল প্রদেশ থেকে দেখা যায় এমন শৃঙ্গগুলির মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। উচ্চতা ৬৮১৬ মিটার বা প্রায় ২২৫০০ ফুট। আর আমরা যে নামগিয়ায় দাঁড়িয়ে তার উচ্চতা ২৭৩০ মিটার, মানে প্রায় ৯২০০ ফুট। সামান্যক্ষণ দেখেই এই অপূর্ব দৃশ্যাবলী ক্যামেরাবন্দী করার উদ্দেশ্যে প্রনবদা যেই ক্যামেরা বার করে তাক করেছে তখনই দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারি কর্তাদের দুজন এসে জানালো এখানে ক্লিক করা বারণ। থতমত খেয়ে প্রনরদা জানতে চাইলো কারণটা। সীমান্তই বাধা, তারা জানালে, প্রনবদা বলল হিমাচলে এ অভিজ্ঞতা আমাদের কোথাও হয়নি, আর আমরা তো অন্য কিছুর ছবি তুলছি না, তুলছি পিকের ছবি। কোথাও তো কোনও নির্দেশনামাও লেখা নেই। তবু তারা অনড়। কিছু কথাবার্তা ও বাক-বিতণ্ডার পরেও ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞাই জারি থাকলো। প্রনবদা কিছুটা হতাশ, কিছুটা রাগ গজগজ। গতিক দেখে লালশালু মোড়া থেকে তার ক্যামেরা আর বেরই করলো না ধীমান। আমিও তাই। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই অস্বাভাবিক লেগেছিলো আমার কাছে, কেননা কী যে হয় ছবি তুললে কে জানে? অগত্যা দাঁড়িয়ে থেকেই চোখের ক্যামেরায় বন্দী করা গেল গিরিশৃঙ্গের শোভা। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে নিশ্চয়ই ভালো লাগছিলো না কিছুটা আহত প্রনবদার। তাই ফেরা। নামগিয়ার খুব কাছেই ‘তাসিগাঙ্গ’। প্রনবদার ট্রেক করে যাওয়া জায়গা। আমরা অবশ্য গেলাম না তাসিগাঙ্গ। বরং ফেরার পথে কোনও একটা জায়গা থেকে পিক পুরগিলের (পারগিলও বলা হয়) ছবি তোলার চেষ্টা করা হলো। আংশিকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো, যাকে বলে দুধের স্বাদ ঘোলে। এই রাস্তা থেকেই দেখা যাওয়ার কথা আরেকটি পিক। নাম, গ্যাংচুয়া। উচ্চতা ৬২৮৮ মিটার। কিন্তু আমরা দেখতে ফেলাম না। হয়ত সঠিক স্পটটি না জানায়। আবার হতেও পারে, দেখেছি চিনতে পারিনি নামের সঙ্গে। এত সময়ও আমরা দিতে পারিনি। এসময়ই মনটা কেমন হয়ে যায়। কাছে এসেও অভিপ্রেতর সন্ধান মেলে না।
নাকোর রাস্তা ধরলো গাড়ি। ‘লিও’ কে রাস্তায় ফেলে আমরা রাস্তার ধারেরই এক টি-স্টলে দাঁড়ালাম ব্রেকফাস্ট আর চায়ের জন্য। আলু-পরোটার সঙ্গে জায়গাটাকেও যেন চেটেপুটে খেলাম আমরা। শুধু বসা নয়, একটু চারপাশটা দেখে নিলাম কফি পানের অবসরে। অনেক এঙ্গেল থেকে সামনেই ফুটে থাকা পাহাড়ী ফুলের ছবি তুললাম আমি আর ধীমান। সত্যি এই উদারতা ভাবা যায় না। এমন রং যার বর্ণনা চলে না, এমন দৃশ্য যার পুনর্গঠন অসম্ভব, এমন নির্জনতা আর প্রশান্তি সহজে যাকে ভাঙা যায় না। এরই মধ্যে হুস-হাস করে আসছে যাচ্ছে গাড়ি। মানুষ না এলেও তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত এর বৈভব। মনে হলো।
এক সময় এন-এইচ ২২ ছেড়ে একটা শাখা রাস্তা ধরলো গাড়ি। এখান থেকে নাকো ৭ কিলোমিটার। যখন পৌঁছুলাম তখন সবে বারো। আজ জার্নিটা বহুৎ কম। রাস্তাতেই প্রনবদা বলেছিলো নাকো তে গত বছর তারা তাসির হোম-স্টে তে ছিলো। নতুন হয়েছিলো তখন। ভালো। তাসি যুবকটিও খুব ভালো। ওখানেই থাকতে পারি আমরা। কিন্তু নাকো ঢোকার মুখেই একটা হোটেলের কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিলো জুগনু। ‘আগে এখানে দেখুন, না হলে পরে ওখানে যাওয়া যাবে।’—বাবু জুগনু। এতদিনে যে আমাদের ভালো-মন্দের সঙ্গে মিশে গেছে। প্রনবদাও দেখলাম কিছু না বলে এগিয়ে গেল। ব্যাপারটা বুঝলাম না। আসলে আমরা দুজন এসব বোঝার খুব একটা চেষ্টাও করিনি কখনো। আমরা নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত, আমাদের ভালোর জন্যই এইসব। কিছুক্ষণ পর প্রনবদা ঘুরে এসে জানালো এখানেই থাকা। বিনা প্রশ্নে অনুগমন আমাদের লটবহর সহ। আর হোটেলে ঢুকে দোতালায় উঠে আমাদের নির্ধারিত ঘরের ব্যালকনিতে এসে বিমোহিত হয়ে যাওয়ার মধ্যে প্রনবদা খুব শান্ত গলায় শুধু এটুকুই বললো—‘এই ভিউটা ওখানে পেতিস না।’ ব্যালকনির এক কোণায় এসে দাঁড়ালে প্রায় ২২৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে দেখা যাচ্ছে সমস্ত কিছু। সামনে তাকালে কিছুটা দূর থেকে একটা বিশাল পাহাড়ের রেঞ্জ আর মাঝেমধ্যে শৃঙ্গ, যার অনেকগুলোর মাথা আংশিক বরফে ঢাকা। ডান দিকেও বহুদূরে পাহাড়মালা, তবে উচ্চতায় অনেক কম। ওপরের দিকে তেমন সবুজ নেই, গাছপালা নেই, কিছুটা ধূসর কিছু ন্যাড়া। আর সামনের ও ডানদিকের নীচে তাকালে সবুজে সবুজ। চাষ হচ্ছে। অনেকটা মালভূমির সমতলের মত জায়গাটা। বেশ বড়ই। মূলত ধান চাষ হচ্ছে বলে মনে হলো। কিছু মটরশুটিও আছে। জমির মাঝ বরাবর একটা ছোট্ট জলাশয়। মনে হয় সেচের কাজে লাগানো হয়। এই অপরূপ ল্যান্ডস্কেপ দেখে ধীমানের লালশালুর মোড়ক খুলে গেল। সে খচাখচ অনেকগুলো। নীচে খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম নাকো লেকের উদ্দেশ্যে।
সামান্য রাস্তা। কেননা শর্টকাট ধরেছে প্রনবদা। রাস্তা থেকে দু-একটা বাড়িঘরের ফাঁক দিয়ে কিছুটা গিয়েই সামান্য চড়াই। কিন্তু বেশ বন্ধুর। ঝুরোমাটি আর পাথর। তারই মধ্যে মাঝেমধ্যে গাছ। কিছুটা গিয়ে শুরু হলো উৎরাই। এবারে সাবধান। নামার সময় পা দাঁড়াতে চাইছে না। পাতা পড়ে আরও খানিকটা দুর্গম করেছে। কিছু কিছু জায়গা ভেজা, জলের নালি নেমেছে। তবু সন্তর্পণে নামা গেলো। এবারে একদম লেকের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রায় গোল। বেশ বড়ই। চারপাশ হাঁটার মতো বাঁধানো। পাড়ে উইলো আর পপলার গাছের সারি। নেমে গিয়ে একবার জল স্পর্শ করে দেখলাম। স্বচ্ছ জল। সূর্য সামান্যই হেলানো। ফলে উইলোর ছায়া সামান্যই নেমে এসেছে জলে। আর তাদেরই শাখা-প্রশাখা গলে সূর্যকিরণ ঝলক দিচ্ছে জলে। আশেপাশে উইলো গাছের সঙ্গে পপলার ছাড়াও অন্য গাছেরা আছে। তাই একটা জঙ্গলের পরিবেশ। দু দিকে পাহাড়ের কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু অন্য দু-দিকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়। বিশেষত একদিকে গিরিশৃঙ্গও দৃশ্যমান। সব মিলিয়ে এই হ্রদ এক প্রানবন্ত উপস্থিতি। আরও কয়েকজন দর্শনার্থী এসেছে। এসেছে কাপল, এসেছে পরিবার। দু-তিনটে বাচ্চা মা-বাবার সঙ্গে হুজ্জোত করছে প্রায় জলে নামার জন্য। তাদের আবদার আর শাসনের মধ্যে আমরা হ্রদ প্রদক্ষিণে এগোলাম। ছবি হতে থাকলো ছবি হয়ে থাকা নাকো লেক। পাড় ঘেঁষে চলায় উইলো গাছ আমাদের মাথায় ছাতা ধরলো। আমরা প্রীত। যেখানে প্রথমে এসে দাঁড়িয়েছিলাম তার বিপরীতে এসে বোঝা গেল জায়গাটা বিস্তৃত আর গাছ-গাছালিতে ভরা। ছায়াও বেশি। ছায়ায় প্রেমিক-প্রেমিকা কয়েক জোড়া। লোকাল না বাইরের বোঝা গেলো না। চয়েস আছে বলতে হবে। তিনটি কিশোর মাছ ধরছিলো। ছিপ নেই, ফাৎনা নেই। শুধু সুতোর মাথায় বর্শি বেঁধে টোপ লাগিয়ে ফেলে দেওয়া, আর মাছ লেগে গেলে টেনে তোলা। লক্ষ্য করলাম কয়েকটা তুলেছেও। ছোট মাছ। নাম জানি না। আগে দেখেছি বলেও মনে হলো না। মনে পড়ে গেলো আমার এক সময়ের মাছ ধরার নেশার কথা। কী প্রচেষ্টা আর উন্মাদনা! এদেরও কি সেরকম কিছু হচ্ছে, যা বাইরে থেকে বুঝতে পারছি না! ঘুরতে ঘুরতে যেদিকটায় গাছ কম, সেদিকে গেলাম। এদিকে পাড়ের একটু দূরেই বাড়ি-ঘর-দুয়ার। রোদও বেশি। একটা মরা গাছের কাণ্ড কিছু ডালপালা সহ ঝুঁকে আছে জলের ওপর। তার ছায়াও পড়েছে জলে। এদিকে এসে বোঝা গেল মাথার আকাশ ঘোরতর নীল, কেননা জলে তার ছায়া স্পষ্ট। অসম্ভব ভালো লেগে গেলো। ছবি হোলো খুব। মানুষ কাটেনি, সেভাবে পাড় উঁচু করে দেয়নি, তবু এই উচ্চতায় জলাশয়। যেখানে জল গড়িয়ে নেমে যাওয়াই চল, সেখানে জল জমা হয়েও থাকছে। এই-ই প্রকৃতির অপার মহিমা। পূর্ণ প্রদক্ষিণ শেষে ফেরা গেলো। ফেরার পথে একটা গলির কাছে এসে প্রনবদা বললো ‘তোরা যা। আমি একটু তাসির বাড়ি ঘুরে আসি’। আর আধ ঘন্টার মধ্যেই হোটেলে ফিরে এসে জানালো আজ রাতে তাসির বাড়িতে আমাদের ডিনারের নেমন্তন্ন। আরে বাঃ। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে এসেও নেমন্তন্ন! প্রনবদার সঙ্গেও বেশিদিনের আলাপ নয়। বন্ধু নয়, পরিচিতজন। তার এমনতর আতিথেয়তা? আচ্ছা প্রনবদার কথা না হয় বাদই দিলাম, তাই বলে আমাদেরও। চেনা নেই, জানা নেই, মিনিমাম আলাপটুকুও নেই, তবু আমাদের! সম্ভবত এমনই এরা। সাদাসিধে আর অতিথিবৎসল। আর এভাবেই মানুষ পরিচিতজন থেকে বন্ধু হয়ে যায়। শুধু প্রনবদার মাধ্যমে বলে পাঠানোই নয়, সে নিজে আমাদের হোটেলে আসবে নেমন্তন্ন করতে। আমাদের দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর এলোও। হাসিখুশি পাতলা-সাতলা চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক। কর্মঠ, খেত-খামারে কাজ করে আবার হোম-স্টেও চালায়। স্ত্রী আর দুটো বাচ্চা। পড়াশুনা করে। ওর সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগে গেলো আমাদের। তাই তার নেমন্তন্ন করার আন্তরিকতায় আমাদের আর না করার উপায় ছিলো না। তাসির হোম-স্টে তে না ওঠার জন্য কি আমাদের মধ্যে এক দ্বিধা সংশয় আর অপরাধবোধ কাজ করতে লাগলো? তাসিকে দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। জয় তাসির জয়।
বিকেলে নাকো বুদ্ধ মনস্টারি। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে। মনস্টারিটাও বেশ বড়। বেশ কয়েকটা বিল্ডিং ও হল। আমরা ঢুকলামও কয়েকটাতে। বোঝা গেলো বেশ পুরোনো এর জন্মকাল। জানলাম ১১শ শতাব্দীর। একটা হলে (মেইন হল) পাঁচটি ধ্যানী বুদ্ধের স্কাল্পচার। মাটির তৈরি। বাইরেও বেশ কয়েকটি মূর্তি বসানো। আর বুদ্ধস্তুপের মত একটা গঠন। রোদ ঝলমলে বিকেল। সন্ধ্যা হয় অনেক দেরিতে। মনস্টারির ভেতরে মন টিকছিলো না। বাইরে বেরিয়ে আসার টান ছিলো দারুণ। এমন বিস্তৃত প্রায় সমতল জায়গা। চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। দূরে পাহাড়ের গায়ে রাস্তা, গাড়ি চলে যাচ্ছে। আবার পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা। দূরে নীচে বয়ে যাচ্ছে নদী। এখান থেকেও দেখা যাচ্ছে ‘লিও পারগিল’ (রিও পুরগিয়েল কে এই নামেও ডাকা হয়)। তবে ধূসর মেঘ থাকায় অধিকাংশ সময়েই তার চূড়া ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই খুলে যাচ্ছে শির। আর তখনই শেষ বেলাকার সূর্য এসে চুমু খাচ্ছে তাকে। লজ্জায় সে সোনালি থেকে লাল এ বদলে যাচ্ছে। হায় হায় করে উঠছে মন। সব কিছু শূন্য, চরাচরে কেউ নেই, শুধু আমি আর এই পরিবেশ, এমনই একাত্মতা। কিন্তু আমি জানি ধীমান আর প্রনবদা অনেক অনেক কিল্ক-কিল্কে ভরে ফেলেছে ক্যামেরা আর শান্ত অসম্ভব শান্ত হয়ে এসেছে ওদের মন। অনেকক্ষণ এভাবে থাকার পর আমরা এলাম খাড়াই এর বিপরীতে, যেদিকে অতলান্ত খাদ। খাদের দিকে অন্ধকার জমেছে। পাহাড়ের ছায়া এখানে শান্তিতে ঘুমায়। দূরে একটা ঝোরা এসে মিশেছে সেই খাদে বয়ে চলা নদীতে। নাকো নদী। গাছগুলোতে উড়ে এসে বসছে শেষবেলাকার পাখি, খুব নজর করে দেখতে হচ্ছে। ক্রমে চরাচর আরও শান্ত হয়ে আসছে যেন। সূর্যের পাটে যাওয়া দেখতে দেখতে এক ধরণের বিমর্ষতা যেন আমায় জড়িয়ে ধরছিলো, ডিফিউসড্ আলোয় আমি কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। কী, কী-যেন! তথাগতর কথা ভাবছিলাম কি? “ দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, আবার দুঃখ থেকে নিবৃত্তিও আছে।” স্থির চোখে দূরের দিকে তাকিয়ে, কিছুই না দেখে কিছু একটা ভাবছিলাম। সম্বিত ফিরলো প্রনবদার ডাকে, ‘নে চল, এবারে ফিরতে হবে।‘ আমরা ফিরে চল্লাম হোটেলের দিকে।
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ তাসির বাড়ি। আসলে এটি নাকো ভ্রমণার্থীদের হোম-স্টে। নাম “Tashi Home Stay. VPO Nako. Dist Kinnaur”। দরজায় তাসিই আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ওপরে নিয়ে গেল। বসতে দিলো তিব্বতী রুচিতে গড়া ডাইনিং হলে। তাসির বাচ্চাদের জন্য আনা আমাদের সামান্য উপহার হাতে তুলে দিলে হাসিতে ভরে উঠলো ওদের মুখ। বড় নির্মল সে হাসি। আমরা বসলাম ফরাসে সামনে নিচু ডেস্ক মত। ওটাই আহার করার স্থান। গোটা ঘরে অনেকটা জায়গা জুড়ে এই ব্যবস্থা। একদিকে কয়েকজন বিদেশি তরুণ-তরুণী। লম্বা-চওড়া সুঠাম দেহের অধিকারী। এরা ইস্রায়েলের যুবক যুবতী। গোটা ট্যুর জুড়ে বারবারই এদের উপস্থিতি আমরা পাচ্ছি। আজ এদের নাকোয় তাসির হোম-স্টেতে রাত্রিযাপন। তাসির সঙ্গে গল্প শুরু হলো মূলত এদেরকে নিয়েই। ওদের নিয়ে কথা, কিন্তু ওরা তা বুঝতে পারছে না বলেই মনে হলো। গল্প হলো তাসির চাষবাস, আপেল ফলন, বেচা-কেনা, ছেলেদের পড়াশুনা, স্ত্রীর ধর্মাচরণ ইত্যাদি নিয়েও। খুব পরিশ্রম করতে হয় দুজনকেই। কিছু পরে তাসির স্ত্রী খাবার-দাবার নিয়ে ওপরে উঠে এলো। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসলো। মুখে হাসি আর আলাপ করার ইচ্ছে। পরিচয়ের পালায় হাতজোড় করে নমস্কার জানালো। কথায় কথায় জানা গেলো প্রতিদিন সে বুদ্ধ মনস্টারি যায়। সেখানে তার খুবই ভালো লাগে। শিশুদুটোকে মানুষ করা, জমিতে কাজকর্ম করা, বাড়িতে হোম-স্টের রান্নাবান্না সামলেও ক্লান্ত হয় না সে। যায় বুদ্ধের ছায়ায়। হয়ত ক্লান্তি অপনোদনের জন্যই। কিংবা ভাবে এক আশ্রয়স্থল। পরম যত্নভরে সে তারই রান্না পরিবেশন করলো আমাদের। টানা হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবার খেতে খেতে বিস্বাদমুখে আমরা বাড়ির খাবার খেলাম পরম তৃপ্তিভরে। তাসির স্ত্রী যে খুব স্বাস্থবতী, তা কিন্তু নয়, বরং রোগা-পাতলাই। অসম্ভব তার জীবনীশক্তি আর মুখের হাসি। একটা অনন্যসুন্দর ডিনারসন্ধ্যা কাটালাম আজ। ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, এ কোন মায়ার বন্ধনে বাঁধলো আমাদের তাসি আর তার স্ত্রী! আর কেনই বা! কোনও স্বার্থ নেই, পাওয়ার বাসনা নেই, কোনওদিন হয়ত আর দেখাও হবে না। তবু আতিথেতয়তায় তারা আমাদের ঋণী করে রাখলো। এই হচ্ছে মানুষ, যে ভালোবাসতে জানে। আপনমনে প্রণাম করতে ইচ্ছে করলো, যা সেখানে সামনাসামনি করা সম্ভব হয়নি। ভাবছিলাম, সকালে আমার যে দিনটা শুরু হয়েছিলো এক বিষণ্নতার বাতাবরণে সারাদিনের এই দর্শন আর রাতের এই আপ্যায়ণ সব কিছু ভুলিয়ে এক আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো আমায়। আমি কৃতজ্ঞ।
পরদিন সকালে আমরা ইন্দো-চীন সীমান্তের কাছে ‘হাংরাং ভ্যালি’র সবচেয়ে বড় গ্রাম এই নাকো ছেড়ে চললাম লাহুল-স্পিতি জেলার ডানকারে। যেখানে আমাদের রাত্রিবাস নির্ধারিত। আর পথে পড়বে ছাঙ্গো, সুমডো আর টাবো। ছাঙ্গো সুমডো তে না দাঁড়ালেও টাবো তে দাঁড়াতেই হবে। থাকতেও হবে অনেকক্ষণ। দেখতে হবে ঘুরে ঘুরে। পাহাড়ের ‘অজন্তা’ আমাদের ডাকছে। আমাদের রাতে কোথাও না কোথাও থাকতে হয়। ফাঁকা মাঠে বা রাস্তায় থাকা যায় না। নয়ত রাস্তাতে কোথাও থেকে গেলেও নয়নাভিরাম হতো না এমনটা নয়। এই হিমাচল প্রদেশে রাস্তা-চলায় সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা স্থানিক অবস্থানের চেয়ে কিছু কম মনে হলো না আমার। চলাতে সম্ভবত ক্লান্তি আসে না তাই। সবসময়ই একটা আগ্রহ জারি থাকে কিছু একটা ভেসে উঠবে চোখের পর্দায় যা অভাবনীয় ও অপূর্ব। আবার চলতে চলতে একটা আশঙ্কাও কাজ করতে থাকে— কিছু কি মিস করে গেলাম এই পথে! যা শুনেছিলাম,বা পড়েছিলাম তা কি পেরিয়ে গেল? প্রত্যাশিত অনেক কিছুর যেমন হদিস পাওয়া যায় না, তেমনি অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু এসে ধরা দেয়। নিজেকে ধন্য মনে হয়। ছাঙ্গো, হাংরাং ভ্যালিরই এক বড় জনপদ। স্পিতি নদীর ধারে। রাস্তা থেকেই দেখলাম তার রূপ। যেন পটে আঁকা। সামান্য দাঁড়ানো গেলো। এও এক দেখার তরিকা, দূর ও বাইরে থেকে পাহাড়ের গায়ে প্রায় ঝুলে থাকা জনপদ। নিজে শান্ত সমাহিত ও সুন্দর। কিন্তু যে দেখছে সে উল্লসিত। চঞ্চল হয়ে ওঠে তার মন। সুমডো এসে রাস্তার ধারে বোর্ডে লেখা দেখলাম— ‘Welcome to Spiti’। এটাই হচ্ছে কিন্নৌর আর লাহুল-স্পিতি ভ্যালির পলিটিকাল বর্ডার। রাস্তায় পাহাড় কাটা এক সুড়ঙ্গপথ দিয়ে আমাদের স্পিতি জেলায় ঢুকে পড়া। সুমডো থেকে ডানে গেলে কৌরিক, বাঁয়ে টাবো। আমরা টাবোর পথ ধরলাম।
সুমডো বা সামডো থেকে টাবো প্রায় ১৮ কিলোমিটার। এই পথের অনেকটা জায়গা প্রায় সমতল। স্পিতি নদী এবার আমাদের পাশে পাশে। টাবো একটা ছোট্ট শহর। প্রায় ১০৮০০ ফুট উচ্চতায়। স্পিতি নদীর ধারে। রেকংপিও-কাজা রাস্তার ওপর। আমাদের গাড়ি এসে থামল একদম বুদ্ধ মনস্টারি কমপ্লেক্সের সামনে। অসাধারণ এই জায়গাটি। খোলা চত্বর যতটুকু তার প্রায় সবটা জুড়েই এই মনস্টারি। আর মনস্টারির একদম গা ঘেঁষেই উঠে গেছে পাহাড়। প্রায় ন্যাড়া এই পাহাড়। একটা রেঞ্জ। আর অনেক চূড়া বরফে পাথরে মেশামিশি। চারপাশেই পাহাড়, আর শৃঙ্গমালা। হাজার বছরের পুরোনো এই মনস্টারি। বেশ কয়েকটি বাড়ি। খুব উঁচু নয়। কতৃপক্ষের কাছে অনুমতি নিয়ে জুতো খুলে আমরা প্রবেশ করলাম একেকটি হলঘরে। প্রায়ান্ধকার ঘর। দেওয়াল জুড়ে শুধুই পেন্টিংস। মধ্যমনি বুদ্ধ। বেশ কিছু জায়গায় পেন্টিংস ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অধিকাংশই এখনও উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত। হাজার বছর আগের আঁকা আজও অটুট এবং রঙবাহারি। ভেষজ ও হাতে তৈরি রঙের এমনই জাদু। বুদ্ধের নানান ভঙ্গির ছবি। কিছু আঁকায় যেমন ঘটনা-তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, কিছু আঁকায় তুলে ধরা হয়েছে ভাব। বুদ্ধের জীবনী প্রকাশের সদিচ্ছাও রয়েছে। শিল্পীর হাতের কারিগরী, মননের ভাবগভীরতা আর সমর্পণ ধরা আছে এর প্রতিটি আঁকায়। বাঃ বলে উঠতে হয়। সত্যি মনে পড়ে যায় আরও আগে আঁকা অজন্তার সেই গুহাচিত্রের কথা। কোনও তুলনাতে না গিয়েও বলা যায় দুইই মনের ক্ষুধা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট। টাবো কে পাহাড়ের অজন্তা বলতে আমার কোনও বাধো বাধো ঠেকে না। টর্চের আলো ফেলে ফেলে প্রনবদাই মূলত পেন্টিংসগুলো আমাদের দেখাচ্ছিল। এই দেয়াল-আঁকা কার না ক্যামেরায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে! আমাদেরও করছিলো। নিশ্চিত, প্রনবদার আরও বেশি। কিন্তু রঙের ক্ষতির কথা চিন্তা করে ফ্ল্যাসযুক্ত ক্যামেরায় বা মোবাইলে তোলা হল না সেই সব অসামান্য চিত্রশিল্প। অবশ্য ফোটো তোলা বারণও ছিল। আর ছিল পায়ে পায়ে বিনয়ী প্রহরী। সম্ভবত একবার, শুধুই একবার, লোভ সামলাতে না পেরে প্রনবদা…। আমিও কি নই?
টাবো মনস্টারির ইতিহাস বেশ পুরোনো। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বুদ্ধ রাজ-রাজন্যের ইতিহাস। সে সবের মধ্যে না ঢুকে এটুকুই বলা যায় এটি ইন্দো-তিব্বতী সংস্কৃতির একটি ভালো উদাহরণ। মন্দির নির্মাণ কৌশলে তিব্বতী ঘরানার ছাপ। সমতল ছাতের ঘর। আর মন্দিরের ভেতরগাত্রের প্রাচীর চিত্রে ভারতীয় সংস্কৃতির ছাপ। ১৯৭৫ সালের ভূমিকম্পে মূল মনস্টারি ক্ষতিগ্রস্থ হলে তা পুনর্নির্মিত হয় এবং ১৯৮৩ সালে নতুন একটি এসেমব্লি হল তৈরি করা হয়। ১৪ তম দালাই লামা আসেন এবং শুরু হয় ‘কলাচক্র’ উৎসব। ১৯৯৬ সালে আবার তিনি আসেন এর হাজার বছরের উৎসবে। বর্তমানে এটি একটি ঐতিহাসিক জাতীয় সৌধ হিসেবে ASI (Archaeological Survey of India ) দ্বারা সংরক্ষিত।
প্রাচীর চিত্র (Fresco), চুনবালির কাজ় (Stucco), মাটির মুর্তি (Images) দিয়ে পরিপূর্ণ মন্দিরের ভেতরের ছবি তুলতে না পারার বেদনা আমরা মিটিয়ে নিলাম বাইরে এসে। বাইরে মনস্টারি চত্বরে বেশ কয়েকটি স্তুপ রয়েছে। নীলাকাশ আর পাহাড় ও পাহাড়শৃঙ্গকে ক্যানভাস করে স্তুপ আর মনস্টারির পাঁচ ছটি পুরোনো ও নতুন বিল্ডিং-এর ছবি তোলা হলো অনেক। প্রত্যেকটি হলের একটি করে নাম আছে আর তাতে বুদ্ধের বিভিন্ন দেবত্ব মহিমার অবস্থান। পুরাণ, ইতিহাস, স্থাপত্য, চিত্রকলা, মূর্তিশিল্প আর নিসর্গ সব মিলিয়ে টাবো এক অনন্য অসাধারন অভিজ্ঞতা। না দেখলে, না অনুভব করলে অপূর্ণ থেকে যেতাম।
প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে ভেতর বাইরে দেখে ছবি তুলে পরিতৃপ্তি ঘিরে ধরেছিলো আমাদের। মনস্টারির পাশের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়া খেতে অবশ্য ভুল হয়নি। তারপরেই আবার চরৈবেতি। ‘ডানকার’ না ‘ধনকার’ তা নিয়ে এখানেও সমস্যা। আমরা ধনকার নামেই চিহ্নিত করব, যদিও ইংরেজি স্পেলিং-এ ডানকার। এটি টাবো ও কাজা শহরের মাঝে বুদ্ধ গোম্ফা সহ একটি গ্রাম। যে পথে আমাদের যাত্রা, তার বিস্ময় আমার কাছে অতুলনীয়। কেননা এমনটি আমি আগে কখনও দেখিনি। হিমালয়ের এই রূপ আমার কাছে অজানা আর অচেনা। পাহাড়ে পুরো মরুভূমি। স্পিতি নদী রাস্তার ধারে একটু নীচেই বয়ে চলেছে। তবু মরুভূমি। পাহাড় শুধু ন্যাড়াই নয়, আকৃতি প্রকৃতিতেও আলাদা। উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে মাঝে মধ্যেই লম্বা উইঢিবির মত কিছু একটা সারে সারে দাঁড়ানো। এরা যে কিসে তৈরি, বোঝা দায়। রকি না শক্ত মাটির? রং একদম ঝুরো মাটির মত। এবড়ো-খেবড়ো। সম্ভবত বাতাস কেটেছে এদের। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয় একগাদা মানুষ মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবিন্যস্তভাবে। এমনকি নদীর একদম ধারে পাহাড়ের গায়ে এরা সারে সারে। বোঝা যাচ্ছে এদেরকে শুধু বাতাসই নয়, কেটেছে নদীর স্রোতও। সব মিলিয়ে অদ্ভুত দর্শন। চলার পথে এরাই আমার সব নজর কেড়ে নিলো। রাস্তাটাও ভারি সুন্দর পাহাড় কাটা, নদী বহমান, শুধু সবুজের সাড়া নেই, কিন্তু কোনও অজ্ঞাত শিল্পীর গড়া মাটির ভাস্কর্য রয়েছে হাজারে হাজারে। যেন এইমাত্র তিনি তাঁর শিল্পকর্মটি শেষ করেছেন আর সৌভাগ্যবশত আমরাই তার প্রথম দর্শক। প্রনবদা বলছিলো এগুলোকে ‘মুন ফেস’ বলা হয়। চাঁদের আলোয় এদের দেখতে দারুণ লাগে বা এদের বিভূতি প্রকাশ পায়। দেখতে হয় তাহলে। কিন্তু আজ চাঁদ কী দশায় থাকবে। প্রতুল না অপ্রতুল? ক্যালকুলেশন। ২০ জুন ছিলো পূর্নিমা, আমরা ছিলাম শিমলায়। স্পষ্ট মনে আছে। আজ ২৭ জুন।খুব সম্ভবত সপ্তমী হবে। চাঁদ উঠবে দেরিতে। আলোও থাকবে অপেক্ষাকৃত কম। তবু দেখতে হবে, সেই সল্পালোকে এদের শারীরীক ভাষা।
ধনকার-এ আসার জন্য আমরা মেন রাস্তা থেকে যে শাখা রাস্তায় ঢুকেছিলাম তা ৮-৯ কিলোমিটারের হবে, এবং প্রায় গোটা রাস্তাটাই এই বিস্ময় জাগিয়ে আর মনে অনেক প্রশ্ন তুলে নিয়ে এলো ধনকার-এ। বুদ্ধ মনস্টারির লাগোয়া একটা গেস্টহাউস পছন্দ হয়ে গেলো প্রনবদার। সেখানেই উঠে পড়লাম আমরা। গেস্টহাউস কর্তা একটু নেশা টলমলানো হলেও ঘর দিলো আমাদের সুপার্ব। ঘর লাগোয়া ব্যালকনিতে দাঁডিয়ে প্রথমেই চোখ পড়ল বিপরীতের ধনকার গোম্ফার দিকে। অনেকটা উঁচুতে একটা খাড়া পাহাড়ে। তবে দূরত্ব বেশি নয় এখান থেকে। অর্ধচন্দ্রাকৃতি পথে এক দেড় কিলোমিটার হবে। ডানে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। দাঁড়িয়ে আছে মানুষগুলো সারে সারে। এরা একটু প্রবীণ, লম্বা-চওড়াতেও বড়। গায়ের চামড়ায় ভাঁজ বেশি। ও হো হো। রাস্তার ধারেই। গোম্ফায় যাওয়ার পথেই পড়বে। তখন সামনে থেকে দেখা যাবে, কথা বলাও যাবে। আর রাতে চাঁদ উঠলে তখন বেসুরে গান শোনাবো ওদের। তার পাশে আরেকটু দূরে এই শক্ত মাটির পাহাড়েই বেশ কয়েকটি পুরোনো বাড়ি, তিব্বতী স্টাইলের। ও-মা, এ-রকম পাহাড়ে বাড়ি বানিয়েও থাকা যায় তাহলে! মানে যতটা ভঙ্গুর ভেবেছিলাম, ততটা নয়! এই আপাত ভঙ্গুর মেটে রঙের কল্পিত মানুষ পাহাড়ের গায়ে বাড়িগুলোর বয়স নেহাৎ কম মনে হলো না। দূরে শৈল-চূড়া। মন ভরে গেলো। ধন্য ধন্য।
‘ঘন্টা খানেক গড়িয়ে নে। তারপর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বেরোবো। যাবো গোম্ফায়।’ বলে প্রনবদা গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। আমরাও দেখাদেখি। শুয়ে শুয়ে ধনকার-এর কথাই ভাবছিলাম। ধং মানে উঁচু খাড়াই পাহাড় বা ক্লিফ। কার বা খার অর্থে দুর্গ বা ফোর্ট। দাঁড়ালো ক্লিফে ফোর্ট। তা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যতদূর দেখা যায় কোনও ফোর্টের চিহ্ন তো দেখা গেলো না। দেখা গেলো দূরে একটা উঁচু পাহাড়ে একটা বিশালাকৃতির পরিত্যক্ত বাড়ি। তবে কি সেটাই? একসময় (১৭শ শতাব্দীতে) ধনকার ছিলো স্পিতির রাজধানী। পরে যা কাজায় সরে যায়। সুতরাং বসত এখানে বেশ পুরোনো। সম্ভবত ১২শ শতাব্দী থেকে। আমরা যেখানে আছি সেটা নতুন বুদ্ধ মনস্টারি। পুরোনোটি হলো ঐ গোম্ফা। পুরোনো গোম্ফাটি স্পিতি ও পিন নদীর সঙ্গমস্থলে, নদী থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উচ্চতায় এক খাড়া পাহাড়ে। বিশ্বে এরকম একটি দর্শনীয় প্রাকৃতিক জায়গায় গোম্ফা খুব কমই আছে। সুতরাং জায়গাটা স্পিতির সঙ্গে সঙ্গে পিন ভ্যালিরও অংশবিশেষ। প্রায় ১২৮০০ ফুট উঁচুতে এই গ্রামটি বেশ বড়ই। প্রায় চারশো মানুষের বাস। তার মধ্যে প্রায় একশ দেড়শ মঙ্ক বা বৌদ্ধ মঠ সন্ন্যাসী। চোখ লেগে এসেছিলো কি? মেলতেই দেখি প্রনবদা রেডি। ধীমান আড়মোড়া ভর করে উঠে বসলো।
বেরিয়ে পড়া গেলো। মেটে-মানুষ-পাহাড়ের কাছে এসে দু-দণ্ড দাঁড়ানো। সামনে থেকে দেখে, তাদের মানুষাকৃতি বদলে অন্যরকম। যেটা চামড়ায় ভাঁজ মনে হচ্ছিলো তা এবড়ো-খেবড়ো মাটির তাল। মাটি নয় মোটেও। তার চেয়ে হার্ড প্রায় পাথর। বেশ খাড়াই দাঁড়ানো। ফোটো উঠলো অনেক। কথাও বলে নিলাম আমি বেশকিছু। কিছু নিবেদন রেখে গেলাম পাহাড় সমীপে। আজ আর সে কথা মনে নেই। তাৎক্ষণিক সব। বে-আক্কেলে, বোকা-বোকা। আরও হাফ কিলোমিটার মতো হেঁটে গোম্ফার দ্বারপ্রান্ত। উঁচু ধাপের সিঁড়ি। প্রায় ছ-সাতটি টায়ারে গোম্ফাটি। প্রতিটি ধাপে কিছু প্রকোষ্ঠ। নিচু। কোথাও বুদ্ধ ও অন্যান্য মূর্তি, কোথাও স্টোর-রুম, কোনওটা বা সন্যাসী বা ভ্রমনকারীদের থাকার যায়গা। একটি বড় প্রকোষ্ঠে একটা ছোট্ট মিউজিয়ামও আছে। এখানে দেখলাম ছবি তোলায় কোনও নিষেধ নাই। বেশকিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ এসেছেন, কথাবার্তা বলছেন সন্যাসীদের সঙ্গে, নিবেদন করছেন অর্থ। বুঝলাম, এই গোম্ফা শুধু পুরোনোই নয়, বেশ জাগ্রতও। ঘুরেফিরে প্রায় সবকটি টায়ারেই আমরা গেলাম। কোথাও নীচু হয়ে কোথাও উঠতে বেশ খানিকটা বেগ পেয়ে। সর্বোচ্চ চত্বরে উঠে এর বিউটি যেন সহসা উন্মোচিত হয়ে গেলো। এতক্ষণ ধরে সিঁড়ি, আঁকাবাঁকা সরুগলি, আর প্রকোষ্ঠের মধ্যে যে চাপা ও বদ্ধ ভাবটা ছিলো তা অন্তর্হিত হয়ে এক বিরাট আকাশ সমৃদ্ধ মুক্তাঞ্চল যেন। লহমায় এত ভালো লেগে গেল যে ক্যামেরার দরকার পড়লো না চটজলদি। মনের ফিল্ম-এ চুঁইয়ে চুঁইয়ে আলো ঢুকে পড়তে লাগলো, আর সেখানেই সে বন্দী হয়ে পড়লো অনেকদিনের জন্য। আজ যখন লিখছি তখনও সে মলিন হয়নি। গোম্ফার নীচে অদূরেই ছোট্ট গ্রাম সিচিলিং। ওখানেই নতুন বুদ্ধ-মনস্টারি, যার পাশের গেস্টহাউসে আমরা আছি। দূরে চারপাশেই গিরিশৃঙ্গ, হালকা বরফাবৃত। যদিও সবুজ নেই, তবু বিকেলের মরে আসা আলো এই মরুপাহাড় পরিমণ্ডলটিকে যেন আলাদা এক মাত্রা দিয়েছে। কাছেই হয়ত সেই নদী দুটির সঙ্গমস্থল, কিন্তু দেখতে পেলাম না। শব্দও শোনা যাচ্ছে না। আসলে আমরা সেখান থেকে প্রায় হাজার ফুট উঁচুতে আছি। ওপরে নীল শামিয়ানার আকাশ। মাঝেমধ্যে কেউ শাদা রঙের ব্রাশ-এর পোঁছ মেরেছে। আর নীল মানে, নীল, অপার নীল। মুগ্ধতা বোধহয় একেই বলে, যার সঙ্গে আমার জান-পরিচয় হলো সবকিছু মিলিয়ে। ডুবু ডুবু সূর্যের চেহারা ক্যামেরাবন্দী করার নেশায় থাকা হলো আরও কিছুক্ষণ। এই গোম্ফার দক্ষিণ থেকে তিব্বতের সীমান্ত পর্যন্ত লাহুল-স্পিতি জেলায় ১৯৮৭ সালে গঠিত হয়েছে ‘ন্যাশানাল পার্ক’। স্পিতি ভ্যালির মরুপাহাড় অঞ্চলে এই পার্কের এলিভেশন রেঞ্জ প্রায় ৩৫০০মিটার (১১৫০০ ফুট) থেকে ৬০০০মিটার(২০০০০ ফুট)। উঁচু অঞ্চলে বরফ চিতা (Snow Leopard) সাইবেরিয়ান আইবেক্স (Siberian Ibex) দেখতে পাওয়া যায়। দেখা যায় আরও কিছু প্রাণী। এখন বরফ নেই। তাই এসব প্রানীর প্রশ্ন আসে না। প্রায় অন্ধকার নেমে আসছে যখন তখন আবার সেই মেটে-পাহাড়-মানুষদের গা ঘেঁষে ফিরে আসা হলো গেস্টহাউসে। রাত সাড়ে নটা নাগাদ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সেই ‘মুন ফেস’ দের দেখলাম। বর্ণনা করা সহজ কাজ নয়। একটি বাক্যে এটুকু বলা যায়, মায়াময় বিষণ্ন আলোয় স্নান করতে করতে ওরা বিষণ্নতা অপনোদিত করছে দুর্বল অথচ দৃঢ় প্রতিফলনে। রাতের ঘুমে তারা এসে ফের আমার স্বপ্নে তাঁবু ফেলেছিলো। অথবা আমিই তাদের তাঁবুতে রাত কাটিয়ে ফিরে এলাম ভোরে।
৮
পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় নিজস্ব পদ্ধতির ব্রেকফাস্টে উজ্জীবীত আমরা গাড়ির চাকা গড়িয়ে দিলাম মুড (মুধ) এর পথে ভায়া কুংরি আর সাগনাম। পিন ভ্যালিতে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। কোনও একসময় আমরা স্পিতি নদী অতিক্রম করে গেলাম। এবার আমাদের পাশে চলবে পিন নদী। যেতে যেতে রাস্তার ধারে এবারে অন্য পাহাড় তার গড়ন আর সৌন্দর্য দেখাচ্ছে আমাদের। ন্যাড়া, বিভিন্ন হালকা রঙ, ঢাল বেয়ে উঠে যাওয়া উঁচুতে। আর সেই উঁচু জায়গায় খাঁজ কেটে কেটে যেন দুর্গ গড়েছে কেউ। নানা রকমের প্রাকার আর প্রকোষ্ঠ। এ অঞ্চলে প্রবল হাওয়া বয়। তারই দাক্ষিণ্যে এই বিচিত্র গড়ন। মাঝেমধ্যে যেন ছেনি-হাতুড়িতে কাটা কোনও শক্তিধর শিল্পীর নিপুন ভাস্কর্য। তারিফ না করে পারা যায় না সেই অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্পীর অনবদ্য কাজকে। কয়েকবার দাঁড়াতেও হলো সেই অলৌকিককে ক্যামেরায় ধরে রাখার জন্য। বিচিত্র এই রূপসজ্জায় চোখকে বিশ্বাস করাতে হয়— ‘হ্যাঁ, এই তোমার নিজে গড়ে ওঠা পৃথিবী। এর কোনো বিকল্প নেই।’ আমরা যা গড়তে পারি আর যা গড়ে ওঠে তার ফারাকটা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না এতটুকু। তখন বিরাটের কাছে অতি ক্ষুদ্রই মনে হয় নিজেদের। দিন ছিলো সূর্যকরোজ্জ্বল আর সামান্য ঠাণ্ডার মেলবন্ধনে। কুংরি বুদ্ধ মনস্টারিতে পৌঁছুতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগলো না। পিন নদীর ডান তীরে এই কুংরি মনস্টারি। মন্দির দ্বারে কয়েকটি ধাপ উঠে এ্ক প্রশস্ত চত্বর। তিনটি আলাদা আয়তকার ব্লক। সবকটিতেই সকালের সূর্যালোক এসে পড়েছে। মানে এরা পূর্বমুখী। মাঝখানের ব্লকটি বড় মনে হলো। আবারও কয়েকটি ধাপ উঠতে উঠতে খেয়াল করলাম কাজ চলছে পুরোদমে, পাথর কাটার কাজ। সম্ভবত সারাই বা পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এই মনস্টারিও বেশ পুরোনো। ১৩৩০ সালে তৈরি। তবে দেখে তা মনে হচ্ছে না। নতুনই লাগছে। জানা গেল, বিদেশি অনুদানে এর রিনোভেশন প্রায় সম্পূর্ণ। ভেতরে ঢুকে বেশ থ মেরে গেলাম। মনে হলো প্রাচুর্য এখানে যথেষ্টই বেশি। অন্তত দেখে আসা অন্য মনস্টারির তুলনায়। দেয়ালে নানা রঙের সিল্ক পেইন্টিং ঝুলছে। আঁকা আছে বুদ্ধ ও বৌদ্ধ দেবতা। প্রচুর স্ট্যাচু। সোনালি রঙের ধাতুনির্মিত প্রমাণ সাইজের বুদ্ধমূর্তি। এত চকচকে যে সামনের প্রদীপের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে গা থেকে। আলমারিতে প্রচুর বই। জানা গেলো, এগুলো মূলত ‘টিবেটিয়ান টেক্সট্’। অনেকক্ষণ থেকে বিভিন্ন কৌণিক অবস্থান থেকে পেইন্টিংস স্ট্যাচুর ছবি তুলে বেরোবার পথে বাঁদিকে করিডরে দেখলাম পাঠ চলছে শিশু কিশোর বৌদ্ধ শিক্ষার্থীর। শিক্ষক, দু-তিনজন প্রবীণ সন্ন্যাসী। আমাদের উপস্থিতি তাদের পাঠে খুব ব্যাঘাত না ঘটালেও ফিরে দেখা ঐ শিশুমুখগুলির হাসি আমাদের পরিতৃপ্তির কারণ হয়েছিলো। পাশের দুটো ব্লকে আর গেলাম না। বাইরে থেকেই তাদের দেখা হলো।
রাস্তার ধারেই পড়ল সাগনাম গ্রাম। ছবির মতো। এক কথায় ল্যান্ডস্কেপটা ছিলো অভূতপূর্ব এবং আউটস্ট্যান্ডিং। রাস্তার ধারেই দেখা গেল সাগনাম পি-ডব্লিউ-ডি গেস্টহাউস। সাগনামে আমরা আর দাঁড়ালাম না। গাড়ি থেকেই দেখে গেলাম আর কখনো স্লো করে স্ন্যাপ ক্লিক। মাইলস্টোনের দৌলতে জেনে গেলাম এখান থেকে মুধ ষোলো কিলোমিটার। তারপরেই আমাদের অভিপ্রেত মুধ, যেখানে আমাদের আজকের রাত্রিযাপন নির্দিষ্ট। দুপাশের ছবিগুলো কোলাজ তৈরি করতে করতে আমাদের নিয়ে এলো মুধ-এ। মন্ত্রমুগ্ধের মত জুগনুর টেপ-এ গান শুনতে শুনতে চোখের চঞ্চলতায় এ যাত্রাপথটিও অদ্ভুত সুন্দর কেটে গেলো।
কয়েকটি মাত্র হোটেল বা গেস্টহাউস। ছোট্ট গ্রাম। রাস্তার দুধারে কয়েকটি মাত্র বাড়িঘর। প্রায় শুনশান জায়গাটা। এরই মধ্যে ‘পিন-পার্বতী হোটেল’ প্রনবদার পছন্দ হয়ে গেলো। অতএব সেখানেই। এখানেই যে হোটেল বয় আমাদের তত্ত্বাবধানে, সে এক বাঙালী যুবক। বাড়ি জলপাইগুড়ির কাছাকাছি এক গ্রামে। এইরকম একটা জায়গায় এক বাঙালী যুবকের থাকা, কাজ করা বেশ চমকপ্রদ। এটা ওটা যোগান দেওয়ার ফাঁক-ফোকরে তার সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেলো তাতে বেশ ভালোই আছে। মালিক বেশ ভালো। সিজন টাইমে, যেমন এখন, কাজের চাপ খুব বেশি। কিন্তু অন্যসময় বেশ হালকা। বরফ ঢাকার সময়টা চলে যায় বাড়ি। আবার ফিরে আসে। এভাবেই চলছে কয়েক বছর। টানা সরু বারান্দার লাগোয়া ঘর। বড়ই। হোটেলেরই ডাইনিং হলের সামনে একটা ফাঁকা স্পেস, একতলায়। সেখানে চেয়ার পাতা। চেয়ারে বসে চা-পান পর্ব মিটতেই প্রনবদা জুগনুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল আমরা যেখানে বসে আছি তার ঠিক বিপরীতে এক পাহাড়ের পাদদেশের উদ্দেশ্যে। এখান থেকে খুব ছোট আকৃতির দু-চারজন মানুষকে দেখা যাচ্ছে শ্লথ চলাচলে। কিছু গবাদি পশুও। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু ঘুরপথে প্রায় দু কিলোমিটার হবে। আর হাফ-সার্কেল এই রাস্তাটি শুধু ভাঙাচোরাই নয়, কিছুটা দূরেই দেখা যাচ্ছে পাহাড় ভেঙে পড়ে রাস্তাকে প্রায় গতিরুদ্ধ করেছে, আর তারই মধ্যে একটি পাহাড়ি ঝোরা রাস্তা অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে নীচে। অগত্যা জুগনু আর প্রনবদাই। কত আশ যে মেটে না! চার বছর আগের মোটর-বাইক এক্সিডেন্টের জেরে জখম হাঁটু্র দুর্বলতা আজও সম্পূর্ণ কাটেনি। ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই আমি আর ধীমান বেরোলাম একই দিকে, যতদূর যাওয়া যায়। পাহাড়ের রং এখানে দেখবার মত। মভ কালারের একটা বিরাট বাঁকানো স্ট্রাইপ নেমে এসেছে তো তারপাশেই সবজে আভাযুক্ত শরীর। কোথাও বেশ কালো গ্রানাইট পাথরের মত রং তো পাশের পাহাড়টাই হয়ত বা ধূসর বর্ণের। ভীষণই সুন্দর। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সেই ঝোরার পথ অতিক্রম করে যাওয়ার জায়গা্টায়। অনেকটা জায়গা জুড়ে এই পেরোনোর তোড়জোর। পেরোতে চেষ্টাও করলাম। কিন্তু দুজনেই বুঝলাম রিস্ক হয়ে যাবে। স্রোত যে খুব একটা বেশি তা নয়, কিন্তু ভীষণ উঁচুনীচু আর উপলখণ্ড ছড়ানো। কোথাও জল গোড়ালি হাঁটুর মাঝামাঝি। উদ্যোগ ছেড়ে এবারে ঝোরার গতিপথটিকে নজর করতে লাগলাম। দুটো পাহাড়ের মাঝখানের জায়গাটা বেয়ে এর নেমে আসা। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে অনেকটা উঁচু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এতটাই উঁচু পর্যন্ত যে শেষের দিকের হালকা বরফখণ্ডও নজরে। বাঁকানো হলেও প্রায় সরলরেখার কাছাকাছি তার চলন। হেলানো হলেও গড়িয়ে নামার গতিপথটি স্পষ্ট। একটা সাদা রেখা যেন শ্লেটপাহাড় দুটোর সন্ধিঢালে। অনেক ছবি তুললো ধীমান। আমিও কিছু। জল স্পর্শ করে ঠান্ডা নিলাম চোখেমুখে, তারপর সিগারেট। ভাগাভাগি। কয়েকদিনে বেশ লক্ষ্য করেছি একটা ভালোলাগার পরই আমাদের সিগারেট ভাব ও দশা। সমতলের চেয়ে এখানে অবশ্য সিগারেট খাচ্ছিও অনেক কম। সামান্য দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ফিরে আসা হোটেলে। দুপুরের খাওয়ার অর্ডার।
প্রনবদা ফিরে এলে তার দেখাকে এক প্রস্থ শেয়ার করে নেওয়া আমাদের। ওপেন টেরাসে পরিচয় আরেকটি বাঙালী গ্রুপের সঙ্গে। চার পাঁচজনের দলটি এসেছে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র তরফে এ অঞ্চলে কোনও জরিপের কাজে। তাই তাদের রথ এবং কলা। দেখা গেলো এদের মধ্যে একজন ধীমানের পূর্ব পরিচিত। স্বাভাবিক জমে উঠল আলাপ। এদের কাছ থেকে জানা গেল বেশ কিছু তথ্য। খাওয়ার টেবিলে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথাবার্তায় জানা গেলো শীতের সময় এখানকার অবস্থা আর মানুষজনের টানাপোড়েনের গল্প। গা শিউড়ে ওঠে। আমরা সমতলের মানুষরা ভাবতেই পারি না। কী অমানুষিক কষ্টের মধ্যে এদের শীত-যাপন। দুপুরের বিশ্রাম শেষে একটু আগে আগেই এসে চেয়ার দখল করে ওপেন টেরাসে বসলাম। সামনের দিকে দূরে তাকাতেই দেখলাম বিন্দু বিন্দু সাদা কিছুর সরণ। চলেছে। একটু নজর করতেই বুঝলাম, তিন চারটে দলে গরু-বাছুর আর ভেড়া-ছাগলের দল। দলগুলির পেছনে দু-তিনজন করে মানুষ। মানে রাখাল বা গো-পালক। ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠল তাদের ফেরা। এরা ফিরছে সেদিক থেকেই, যেদিকে জুগনু আর প্রনবদা গিয়েছিল, আমরা যেতে পারিনি। তবে এরা হাফ-সার্কেলের রাস্তা বেয়ে আসছে না। আসছে মাঝখানের মাঠ পেরিয়ে। মাঠ তো নয়। বন্ধুর, পাথুরে, মালভূমি এলাকার মতো। ওই ওরা উঠছে নামছে কিছুটা লাফিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে। ফেরার তাড়া ওদের গতিতে আর শর্টকাট মারায় স্পষ্ট। দূর থেকে ওদের চলন দেখতে দারুন লাগছিল। বুঝতে পারছিলাম না রাখালেরা গরু ভেড়াকে গাইড করে ফিরিয়ে আনছে না গরু-ভেড়ারাই অভ্যাসে ফিরছে, বরং ওদের দেখিয়ে দিচ্ছে সহজতম পথ। এই মরুপাহাড়ে এমন পশুপালন খুব সহজ কথা নয়। দেড়-দু কিলোমিটার আমি দেখতে পাচ্ছি, সেখান থেকেও আরও কতটা দূরে ওদের যেতে হয়েছে শুধু একটু সবুজ ঘাসের জন্য। তবে এটা নিশ্চিত ওখানে কোনও বিস্তৃত গোচারণ ভূমি আছে। সকালের দিকে যাওয়া, বেলা ফুরিয়ে এলে গ্রামে ফেরা। ওরা যখন দল বেঁধে প্রায় সামনে, এবারে রাস্তায় উঠে এসেছে, তখনই মোবাইলের ভিডিও দিলাম চালিয়ে। এবার ওদের উল্লাস, খুনসুটির শব্দও শোনা যাচ্ছে। একসময় পেরিয়ে গেল আমার দাঁড়িয়ে থাকা। একটু ওপর থেকে যতটা পারা যায় ভিডিও। লাল শেষ সূর্যের আভা, খুরে উড়তে থাকা ধুলো, মিলিয়ে গোধূলী। মুধ-গোধূলী।
এই সায়াহ্নে আমরা এবার বেরোলাম সেদিকে যেদিক থেকে আমরা গাড়ি নিয়ে সকালে এসেছিলাম, বা সকালে যেদিকে গিয়েছিলাম, তার বিপরীতে। কিছুটা যেতেই ছোট্ট গ্রামটা শেষ হয়ে এলো। পেরোতেই একটা বাঁক। বাঁকের অন্তিমে এসে খাড়াই এক পাহাড়ের মুখোমুখি। সূর্য নেমে যাচ্ছে তার শরীর বেয়ে। ডানদিকে দূরে গিরিশৃঙ্গ, অংশত বরফ ঢাকা। এক অপার্থিব নিসর্গ। নেমে আসা অন্ধকারে পাহাড়ের শরীরে হাওয়ার তরঙ্গে গড়ে ওঠা দূর্গ প্রাকার প্রকোষ্ঠ আর ভাস্কর্য যেন অন্য এক মাত্রা পেয়েছে। পরিবেশের মৌনতা আমরা কেউ ভাঙছিলাম না। ভালোলাগাকে উপভোগ করছিলাম নিজের মত করে। বিভিন্ন রঙের পাহাড়ের শরীরে দিনশেষের মায়াবী আলো-চুম্বন কী এক ভালোবাসার কথায় আমাদের দাঁড় করিয়ে রাখছিল মাম করে। দাঁড়িয়ে, সামান্য হেঁটে, অন্তর্হিত আলোর খেয়া এসে যখন অন্ধকারের ঘাটে ভিড়ল, যখন পাহাড় তার শরীরের বিভিন্ন রঙের ওপর শুধুই মেখে নিল কালো, আমরা ফিরে এলাম হোটেলে, চা-এ।
রাতে খাওয়ার আগে উঠলাম হোটেলের ছাতে। আহা হা অপূর্ণ রয়ে যেতাম এখানে এভাবে না এলে। চাঁদের (অষ্টমীর) প্রচ্ছন্ন আলোয় চাপা উদ্ভাসিত মরুপাহাড়। যেদিকে চোখ যাচ্ছে শুধুই পাহাড়, হোটেলের একদম গায়ে লাগানো পাহাড়টা উচ্চতায় কম, কিন্তু দেখনদারিতে নজরকাড়া। আর তিনদিকে উঁচু আরও উঁচু পাহাড়। সকাল-দুপুরের রং এখন আর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট হলেও দেখা যাচ্ছে তাদের অবয়ব। পাহাড়ি ঝোরাটার নেমে আসা জলের রেখায় প্রতিফলিত চন্দ্রালোক চকচক করছে। আর মাথার ওপর অজস্র তারা ভরা রাতের আকাশ। দূষনমুক্ত বাতাসে এত ঝকঝকে তাদের আলো স্ফুরণ, দেখে মনে হচ্ছে কোনও পার্লারে রীতিমত রূপচর্চা শেষে প্রকাশ্যে এসেছে আমাদের সামনে, বিমোহিত করে দেবে বলে। আর চাঁদ, সেও বলে আমাকে দেখো, দেখো তো চিনতে পারো কিনা? সত্যিই এক অচেনা অদেখা জগৎ। পাহাড়, নদী, তারা, চাঁদ, আর রাত— সবই দেখা, বারবার দেখা। তবু আজ সব মিলিয়ে এদের কেমন অচেনা লাগছে, অদেখাও মনে হচ্ছে। মনে হয় একেই বলে স্থানমাহাত্ম। মুধ, আহা মুধ। পরপর দুটো রাত, ধনকার আর মুধ, আমাদের প্লুত করে ছাড়লো।
পরদিন সকাল ৯টায় আমরা মুধ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম কাজার উদ্দেশ্যে। প্রোগ্রামটা এমন দাঁড়ালো, কাজায় কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে, দুপুরের আহারাদি শেষ করে বেরিয়ে পড়ব লানজা আর কমিক-এর পথে। কমিক ঘুরে এসে লানজায় রাত্রিবাস। লানজা নামটা শুনেই সেখানে রাত্রিবাসের ইচ্ছে প্রবল হতে থাকে। আর কমিক তো গোটা হিমাচলের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে এক গ্রাম। মুধ থেকে কাজার দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। টানাই চললাম আমরা, উদ্দেশ্য লানজা কমিক যাওয়ার আগে যতটা বেশি সময় কাজায় কাটিয়ে যাওয়া। অধিকাংশ রাস্তা একইরকম ফিরে, সাগনাম এর কিছুটা পর থেকে মনে হলো আর আসার রাস্তায় ফিরছি না। জুগনু জানিয়ে রাখলো কাজায় তেল নিতে হবে গাড়িতে, তবেই পরবর্তী যাওয়া। ঘন্টা দেড়-দুই এর মধ্যেই কাজা ঢুকতে শুরু করলাম। বাসস্ট্যান্ডের কাছে বেশ বড় এক বাজার। তারই কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রনবদা গেলো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। মূলত লানজায় কোথাও থাকার বিষয়ে যোগাযোগ করতে। মিলেও গেলো ঠিকানা। হোম-স্টের মালিকের সঙ্গে কথা হয়ে গেলো। ব্যস আর কি চাই! এবারে তেল এর জন্য এগিয়ে যাওয়া। আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেটা লোয়ার কাজা বা ওল্ড কাজা। আমাদের যেতে হবে আপার কাজা বা নিউ কাজায়। প্রায় দেড়-দু কিলোমিটার পথে অনেকটা উঠে সেই তেল-পাম্প। দেখা গেলো রাস্তা থেকেই খুব ভিড় জমে আছে। পাম্পের ভেতরে গাড়ি ঢোকাতেই পারছে না জুগনু। আর মুখে মুখে রটে যাওয়া বার্তায় জানা গেলো, তেল নেই। তেল নেই? হায় হায় করে উঠলো প্রনবদা। কোনওমতে গাড়িটা একটু পাশে রেখে, নেমে গেলো জুগনু, অফিসে গেলো, অচিরেই ফিরে এসে জানালো, তেল শেষ, না আসা পর্যন্ত আর পাওয়া যাবে না। ব্যস, হয়ে গেলো প্রোগ্রামের দফারফা। ক্যালকুলেশনে বোঝা গেলো যা তেল আছে গাড়িতে তাতে কমিক লানজা ঘুরে কাজায় ফেরা যাবে না। একটাই তেল-পাম্প ইন্ডিয়ান অয়েলের। কাজা সাবডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার, তবুও। তেল কখন আসবে তাও বোঝা যাচ্ছে না। প্রনবদা নেমে গিয়ে তেল-কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে হতাশ হয়েই ফিরলো। অগত্যা আরও চেষ্টা, প্রনবদার বন্ধুকে ফোন, কোনওভাবে অন্তত ১০-১৫ লিটার তেল মিলে কিনা। কিন্তু কোনও চেষ্টাই কোনও কাজে এলো না। প্রনবদার এক বন্ধুর সহযোগিতায়, বিফল আমাদের স্থান হলো কাজার এক হোটেলে। আপারও নয় লোয়ারও নয়, মাঝামাঝি এক জায়গায়। ভালো হোটেল, বড় ঘর, সুন্দর পরিবেশ। আপাতত বিশ্রাম। খুবই দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমে সান্ত্বনা শুধু প্রনবদার কথাগুলো – ‘পাহাড়ে এসব হয়। আরও কত কী হয়!’
কাজা কিন্তু খুব একটা ঘোরা হলো না। এ কদিন ক্রমাগত চলতে চলতে এই বিশ্রাম বুঝি বা দরকারই ছিল। হোটেলের বাইরের বারান্দা থেকে দূরের পাহাড় শৃঙ্গের রূপবদল তারিয়ে তারিয়ে, কাছেই ঘুরপথের লাগোয়া নতুন বুদ্ধ মনস্টারির অলিন্দে দু-চারজন মানুষের আনাগোনা, আর বাঁদিকে একটু দূরেই আবছা দেখতে পাওয়া নদীর নিরন্তর, নীচে বাঁধানো নালায় কোনও ঝোরার নদীগমনের উল্লাস, এসব দেখতে দেখতে বা শুনতে শুনতে প্রহর যাপন। কাজা হলো ওই যে আবছা দেখা স্পিতি নদীর ধারে স্পিতি ভ্যালির সবচেয়ে বড় জনবহুল ব্যবসা-বানিজ্যের স্থান। স্পিতি ও লাহুল জেলার সাবডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার। ১২৮০০ ফুট উচ্চতার এই শহরটি শুনেছি ভারতের ঠাণ্ডাতম জায়গাগুলোর মধ্যে একটা। জানুয়ারিতে নাকি এর তাপমাত্রা -৩৭ ডিগ্রি পর্যন্ত নামে। জুনের এই শেষ দু-দিনে মধ্য দুপুরের তাপমাত্রা ১২-১৩ ডিগ্রির বেশি হবে না। পার্শবর্তী তিব্বত ও লাদাখ অঞ্চলের সঙ্গে যথেষ্ট মিল থাকা এই শহরে এসে আমাদের কাজ হলো হোটেলের লাগোয়া এক পথ-রেস্তোরায় চা-পান, শুকনো আলুপরোটা, রুটি সবজি, এসব মাঝেমধ্যে খাওয়া আর তেলের খোঁজে আকুল হয়ে ওঠা। আর ঘুম, আর গ্যাজানো, খুনসুটি, কিঞ্চিৎ পি-এন-পি-সি, আর তেল পাওয়ার সঙ্গে আগামী প্রোগ্রামের রদবদল। সেদিন আর তিনি এলেনই না। পরদিন তিনি কখন আসবেন সঠিক জানা গেলো না তাও। শুধু বাতাস বলছে, আসছেন, তিনি আসছেন। রওনা হয়েছেন।
পরদিন হোটেলে চেক-আউট মিটিয়ে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমরা বসে গেলাম রাস্তার ধারের সেই রেস্তোরায়। সঙ্গে আরেকটি ফ্যামিলি। গুজরাট থেকে আসা। মা-বাবা আর দুই ছেলে। ভদ্রলোক নিজেই ড্রাইভ করছেন। এখন ছেলেকে পাম্পে পাঠিয়েছেন লাইন বজায় রাখতে। স্নান-দান সেরে জুগনুও গাড়ি সমেত বেড়িয়ে গেছে সাড়ে নটায়। এবার প্রতীক্ষা। শোনা যাচ্ছে অনেক রকম। যথা, এইতো চলে এলো বলে। না না এখনও অনেক দূর। না তাও নয়, ট্যাঙ্কার টাবো পেরিয়ে এসেছে। চা কয়েকবার, দুপুরের খাওয়া, হয়ে গেলো। কিন্তু তাঁর দেখা নেই। আমাদের সামনের এই রাস্তা দিয়েই যাবেন তিনি। ‘কুহেলি’ সিনেমার গান তখন গুঞ্জরিত মনে—‘শুনেছো কি তার পায়ের আওয়াজ! আসছে সে আসছে…’। অবশেষে ঠিক পৌনে দুটো, গাঁক গাঁক করে ‘যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ’ করে দুজন তিনি ওরফে পেট্রোল ও ডিজেল ট্যাঙ্কার আমাদের রাস্তার সামনেটা পেরিয়ে পাম্পগামী হলো। জুগনুকে ফোন, আরেকবার চায়ের অর্ডার, একটু পথ-প্রাকৃতিক, চলতে লাগলো। প্রনবদা একমনে ক্যালকুলেশন।
আমাদের সঙ্গে বসে থাকা ফ্যামিলির ভদ্রলোক তেল নিয়ে ফিরলেন। আমাদের অস্থিরতা পারদ ছাড়াচ্ছে। তিনটে পাঁচ। জুগনু, হাসিমুখ। লেটস্ গো…। মালপত্তর তুলতে তুলতে প্রনবদা জুগনু একান্তে। প্রনবদার ঘোষণা – ‘আমাদের যেতে হবে লোসার। সেখানে রাত্রিবাস। লানজা কমিক বেশ কিছুটা দূরে। বাতিল। যাওয়া হবে না। কী, কিব্বের হয়ে লোসার। তাতেই সন্ধে পেরিয়ে যাবে।’ মৌহূর্তিক সিদ্ধান্ত। আর মুহূর্তে লানজা কমিক মুছে গেলো প্রোগ্রাম থেকে, যেখানে প্রনবদা রাত কাটাবে বলে স্থির করেছিলো, যেখান থেকে চাঁদের আলোয় দেখবে ‘চাও চাও ক্যাং নিলডা’ পিক। হলো না। পাহাড় এমনই, দেবে তো ছাপ্পড় ফাড়কে, না দেবে তো দেবেই না।
৯
তিনটে পনেরো। গাড়ি চললো কী আর কিব্বের এর উদ্দেশ্যে। আটাশ ঘন্টা পূর্ণ বিশ্রামের পর আবার চলা। আবার পথ। আবার দৃশ্যাবলীতে চোখ রেখে টুকরো জমানো মণিকোঠায়। কোলাজ নির্মাণ। কাজা থেকে ‘কী’ খুব দূর নয়। এগারো কিলোমিটার মতো। সহজেই চলে এলাম। ওই যে রাস্তার ডান ধারে একটা না-উচ্চ পাহাড়ে ঝুলে আছে কী-গোম্ফা। হ্যাঁ, ঝুলেই আছে যেন পাহাড়ের কন্ঠার কাছে। ছবি হলো খুব। নেমে, দাঁড়িয়ে। কিন্তু গোম্ফা যাওয়ার রাস্তা ধরলো না গাড়ি। আগে কিব্বের, ফেরার পথে কী। আর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। কিব্বের জনপদ। ৪২৭০ মিটার বা ১৪২০০ ফুট উঁচুর এই গ্রাম স্পিতি ভ্যালিতে। আমাদের উচ্চতা সমস্যা হচ্ছে না কিছু। যাকে বলে এক্লামাটাইজড হয়ে গেছি। কিব্বের জনপদটি একটা সংকীর্ণ উপত্যকায় চুনাপাথরের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। পরিবেশ পরিমণ্ডল একটু আলাদা। বিশেষত এই প্রথম বিকেলের উজ্জ্বল রৌদ্রালোকে, প্রবল হাওয়ায়, ছড়ানো ছেটানো বড় বড় উপলখন্ডে, খুব সামান্য হলেও টিবেটান স্টাইলের বাড়িঘরে, আর নীল মহানীল আকাশে। এখানে মনস্টারিতে আমরা খুব কম সময় দিলাম। সময়টা কাটালাম বাইরে বাইরে, কিছুটা ঘুরে, ঢিপিতে বসে ছবি তুলে, আর একটা উঁচু মতন জায়গায় উঠে প্রায় ৩৬০ ডিগ্রির দিগন্ত দেখে। যেখানে নীল এসে চুমু খাচ্ছে পাহাড়চূড়াগুলোকে। অদ্ভুত শান্ততা ভাঙছে শনশন বাতাস। আর আমাদের চুল কিছুতেই ঠিক থাকছে না, বিশেষত ধীমানের। স্মৃতি ঘেটে যে জানালো আরেকবার এখানে এরকমই একটা জায়গায় কবিতা পাঠের আসর বসেছিলো কবি বন্ধুদের। জেনেছিলাম ১৯৯২ সালে এখানে তৈরি হয়েছে ‘কিব্বের ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচারি’। প্রায় ২২০০ বর্গকিমির ও ৩৬০০-৬৭০০ মিটার রেঞ্জের এই স্যাংচারিতে দেখতে পাওয়া যায় ভেড়া-ছাগল, টিবেটান নেকড়ে, স্নো-লেপার্ড, আর লাল শেয়াল। হয়তো আরও কিছু। কিন্তু মনস্টারি ও জনপদটুকু দেখা ছাড়া আমাদের যাওয়া হলো না স্যাংচারি। অথবা গোটাটাই স্যাংচারি। ফেরার পথে রাস্তায় হঠাৎই পেরিয়ে গেলো হরিণ সদৃশ্য জন্তু। শিংওয়ালা। গাড়ি থামানো হলো। রাস্তা পেরিয়ে তারা তখন পাশের পাহাড়ের কোমরের কাছে। ছবি তুললো প্রনবদা জ্যান্ত। ভালো করে খেয়াল করে বোঝা গেলো হরিণ নয় ওরা। ছাগল প্রজাতির কিছু।
কী গোম্ফাতে আমরা কিন্তু বেশ খানিকটা সময় কাটালাম। কেননা স্পিতি ভ্যালির এটাই সবচেয়ে বড় মনস্টারি, পুরোনোও। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গোম্ফাতে লামাদের ধর্মীয় শিক্ষারও ব্যবস্থা আছে। একটা জায়গা পর্যন্ত গাড়ি গেলো। তারপর হেঁটে হেঁটে চূড়ায় ওঠা, যদিও পিচ রাস্তা এবং বেশ চওড়াও। প্রনবদা আগে আগে আমরা দুই মক্কেল পেছনে। মাঝেমধ্যেই দেখছি নানা বয়সী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, মুখে হাসিটি ছড়িয়ে, যা তখন চড়াই ভেঙে উঠতে উঠতে বিশেষত প্রনবদার গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে আমাদের মুখে ছিলো না। জল পিপাসাও পেয়েছিলো, যা গাড়িতে ফেলে এসেছিলাম। হাফ ধরে যাওয়াটা অবশ্য সাময়িক, কেননা রাস্তা থেকেই দেখতে পাচ্ছি গোম্ফার একটা দিক, সিঁড়ি উঠে যাচ্ছে, গোড়ায় জুতো-মোজা খুলে সটান এক প্রশস্ত ঘরের মধ্যে। অনেকটা এসেমব্লি হলের মত। বুদ্ধদেবের ইমেজ-এ ভর্তি। দেয়ালে পেইন্টিংস্, মুর্যালস্, চি্ত্র-বিচিত্র, চোদ্দশ শতাব্দীর কাজ, যাতে চীনা সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। এখানে রয়েছে অনেক প্রকোষ্ঠ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের জন্য। ঘুরে দেখা আর ছবি তোলায় কোনও মানা নেই। নেমে ঘুরপথে কিছুটা গিয়ে আরেকটু উঁচুতে আবার একদফা সিঁড়ি ও হলঘর মত। এরও দেয়াল মুর্যালের সাহায্যে আঁকা। বুদ্ধ মুর্তি। আর লামাদের হাসি বিনিময়ের চেষ্টা। আরেকটি ধাপও দেখা গেল, জানা গেল ওটি স্টোর রুম, আন্ডারগ্রাউন্ডে। বোঝা গেলো এই কী-গোম্ফা তিনটি ধাপে বিস্তৃত, যার দুটো ধাপ বা তলা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আর দেখলাম এর চত্বরটি। কী গোম্ফার ইতিহাসটি বেশ আক্রমন সহ্য করে টিকে থাকার। চোদ্দশ, সতেরশ- আঠারোশ শতাব্দীতে শাক্য মোগল দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ, পরে লাদাখ-কুলু যুদ্ধে বিধ্বস্ত, উনিশশ শতাব্দীতে শিখ সেনানী এবং আগুনে আর সবশেষে ১৯৭৫ এর ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ। তবু টিকে আছে মূলত ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ আর রাজ্য ওয়ার্কস্ ডিপারমেন্টের সৌজন্যে। সর্বত্র একটা পরিচ্ছন্নতার চিহ্ন। শান্ত সন্ন্যাসীরা, অথচ কাজে চঞ্চলতার ছাপ। সব মিলিয়ে এক অনাস্বাদিত পরিবেশ। ভালো লেগে গেল খুব। লামাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শীতের সময়ও বেশ কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই সাড়ে তের হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড়টিতে পবিত্র মঠের দেয়ালের আড়ালে থেকে যান। আমরা ভাবতে না পারলেও এটাই তাঁদের অভ্যাস। শুনতে শুনতে শরীর কি একটু বেশিই শীতল হয়ে পড়েছিলো? মানে কল্পনায় মাইনাস সাঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ ডিগ্রি। না, আসলে গমনোন্মুখ সূর্যের প্রেক্ষাপটে বাতাসের হিমেল পরশ তখন আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিলো।
স্পিতি নদীটির ধার ধরে এবার লোসারের পথ। কাজার দু কিলোমিটার আগেই যা ঘুরে গিয়েছে লোসারের দিকে। এবার দূরত্ব অনেকটাই, প্রায় ৫৪ কিলোমিটার। যতক্ষণ কী কিব্বের-এ মত্ত ছিলাম, লানজা কমিকের কথা একবারও মনে পড়েনি। যেই কাজার কাছ ঘেঁষে লোসার যাত্রার শুরুতে আবার সেই দুটো গ্রাম আশ্চর্যজনকভাবে গ্রাস করে ফেললো আমাকে। সেই এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত দুটি ছোট্ট গ্রাম তার সমস্ত প্রাকৃতিক ঐশর্য আর বিচিত্রতা নিয়ে অপেক্ষা করে থাকবে আমাদের জন্য, আমরা যেতে পারবো না। সেই হোম-স্টের মালিক হয়ত আমাদের অপেক্ষায় থেকে থেকে ধরেই নিয়েছে আমরা আর যাবো না। সত্যিই আমরা যাচ্ছি না। কমিক, বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চতায় বুদ্ধ মনস্টারি (৪৫৮৭ মিটার) ‘কমিক লান ডুপ ছেমু’ আমাদের জন্য দ্বার খুলে রেখে রেখে এই বন্ধ করেছে এখন। আমাদের যাওয়া হলো না। আরেকটু নীচে ৪৪০০ মিটার উচ্চতায় লানজায় পশ্চিম হিমালয়ান রেঞ্জের প্যানোরমিক ল্যান্ডস্কেপ ভিউ আমরা আর আবিষ্কার করতে পারলাম না। শিলা ভ্যালির এই ছোট্ট জনপদে আজও রাতের দিকে চাঁদ উঠবে, জ্যোৎস্না ভাসাবে দিকবিদিক, ‘চাও চাও ক্যাং নীলডা’ বা শিলা পিকে সেই জ্যোৎস্না স্বপ্নের মায়া ছড়াবে। ৬৩৮০ মিটার উচ্চতার সেই চূড়ার বরফে চলকে যাওয়া ম্লান জ্যোৎস্না আমি নিশ্চিত আজ ম্লানতর হয়ে যাবে শুধুমাত্র আমাদের অনুপস্থিতির কারণে। নিজেকে বঞ্চিত মনে হলেও বেশি খারাপ লাগছিলো প্রনবদার জন্য। মানুষটা অনেকবার এদিকে এলেও, এবারই লানজা যাবে, রাত কাটাবে বলে ঠিক করেছিলো। কিন্তু সাধ মিটলো না তার। একটু বোধহয় বেশিই স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিলাম। বেরিয়ে আসতে সহায়তা নিয়েছিলাম গীতার। যা তুমি ফেলে এসেছো, তার জন্য শোক কোরো না, সামনে তাকাও, যা তোমার জন্য প্রতীক্ষা করে আছে সেও কম কিছু বিস্ময় আনন্দ আর বেদনার নয়। আনন্দ যেমন থাকতে পারে আবার এরচেয়েও বেদনাদায়ক হতে পারে। সুতরাং মন কে প্রস্তুত করাই ভালো। সামনে তাকালাম, ডোবা সূর্যে সিল্যুয়েট পাহাড়মালা। মন ভালো হয়ে গেলো।
এই রাস্তা চলাটা ক্রমশ বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠছিলো। প্রথমত আমরা এতাবধি কোনও দিনই পড়ন্ত বিকেলে সন্ধ্যায় রাত ছুঁই-ছুঁই-এ এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাইনি। দ্বিতীয়ত এর রাস্তার চলন, চারপাশ, যাওয়ার তাড়া, আর খুব সামান্য গাড়ি-ঘোড়ার চলাচল। পশ্চিম দিকটা পড়েছে আমাদের গাড়ির সামনে। ফলে দিনশেষের সূর্যগমনের প্রতিটি মুহূর্ত বিশেষত এই গিরি শৃঙ্গের দেশে তার অপরূপ পসরা আমাদের রিলে করতে করতে চললো। এক জায়গায় নদী পাড়ের পাহাড়টির বেশভূষা দেখে বেশ অবাকই হলাম। পাড় থেকে বেশ কিছুটা উঁচু সমতল, তারপর শুরু উঠে যাওয়া, অনেক অনেক, ম্লান সূর্যের মায়াময় আলোর ছায়া পড়েছে কোথাও, কোথাও আলোটাই ছায়ার মতন। আর গোটা পাহাড় তৎসংলগ্ন সমস্ত অঞ্চলটা মনে হচ্ছে বালি ঢিবির মত। আমি জানি না এখানে এই অলটিচুডে আদৌ বালিপাহাড় থাকতে পারে কিনা? নাকি এ আলোরই খেলা এক মায়া বিভ্রম! চলেছি, পথ বিস্তর। দেখে চলেছি পাহাড়ের মাথায় মাথায় অস্তরাগের খেলা। সিঁদুর নিয়ে খেলছে ওরা। আর আমরা সিঁদুরে মেঘ দেখে না ডরিয়ে ছবি তুলে যাচ্ছি পটাপট। কী তার রং কী তার বিভূতি! এ অঞ্চলের রাস্তাটা প্রায় সমতল। মাইলের পর মাইল সমতল। ডানপাশে বেশ কিছুটা সমতল ভূমির পর হয়ত খাদ, দেখা যাচ্ছে না। বাঁপাশে অনেকটা সমতলের পর চুনাপাথরের খাড়া পাহাড়। এত সমতলেও কিন্তু একটাও বাড়িঘর নেই। নেই কোনও জনপদ। এরকম একটা অঞ্চলে মানুষজন থাকে না কেন কে জানে! সম্ভবত কাছে পিঠে কোনও নদী নেই। জল নেই, চাষাবাদ নেই, মানুষজনও নেই। এই সমতল রাস্তাতেই এগিয়ে যেতে গিয়ে সম্মুখীন হতে হলো এক পাল গরু ছাগল ভেড়ার পালের সামনে। মাত্র কয়েকজন মানুষের দেখভালে এরা চলেছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। না গোধূলী লগনে এরা ঘরে ফিরছে না। এরা বানিজ্যের রসদ হয়ে হয়ত লোসার থেকে যাচ্ছে কাজার দিকে। শয়ে শয়ে। ওদের চলা ছিল আমাদের গাড়ির বিপরীতে। পাশ না পেয়ে এক সময় জুগনু একদম ওদের মাঝখানে। চারপাশে গরু ছাগল ভেড়ার চলমান স্রোত, আমরা বসে, দাঁড়ানো গাড়িতে। বিপরীতে ওই একটা ট্রাকও দাঁড়িয়ে পড়েছে। নির্বিকার ওরা ক্রমে পেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের। গাড়ির গা ঘেঁষে বা লাগিয়ে ওদের এই চলে যাওয়ায় আমরা হয়ত উত্তেজিত, কিছুটা বিরক্তও, আবার এমন একটা জায়গায় এই অদ্ভুত যাত্রাকে মোবাইলে ভিডিও করে রাখছি, ওদের কিন্তু কোনও হেলদোল নেই। বিরামহীন যাওয়া। যেন কতই বা অভ্যস্ত। মিছিল শেষ হতে না হতে প্রায় অন্ধকার হয়ে এলো। আরও অনেকটা গিয়ে সমতল ভাবটা কমে এলো। এক জায়গায় দাঁড়াতেই হলো। সামনের দিকে দূরে এক খাড়া পাহাড়। রং তার কুচকুচে কালো। আর পুরো রেঞ্জটা খাঁজকাটা। শৃঙ্গের দিকটা খাড়া করা ছুরির মত। যেন হাজার হাজার ছুরি পাশাপাশি রাখা আছে, অবশ্যই পাথরের ছুরি। হলো না ঠিক। যেন খাড়া করা একটা স্লাইস পাউরুটি, যার এখানে ওখানে কেউ একটু কামড়ে নিয়েছে। না, এটাও হলো না। থাক তাহলে। কী অসহায়। বোঝাতেই পারছি না। হয়ত বোঝানো যায়ও না। তো এমনই এক কালো পাহাড়ি রেঞ্জ-এ বরফ মেঘ আর আজকের সূর্যের শেষটুকু। অসাধারণ।
লোসারের উপকন্ঠে যখন, তখন আঁধার। আর বিশেষ কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কোথায় থাকব, ঠিক নেই। চলা শেষের ক্লান্তিও কিছুটা। জুগনু প্রনবদার কথা। প্রনবদার পূর্ব অভিজ্ঞতা। গাড়ি এসে দাঁড়ালো একটা হোম-স্টের কাছে। প্রনবদার যাওয়া ও ফিরে আসা। পছন্দ হয়নি নিশ্চয়ই। সামনেই আরেকটায়। এবারে আমাদেরও গাড়ি থেকে নামা আর লটবহর সহ ঘরে প্রবেশ। রাত পৌনে-ন টা । লোসার আমাদের সেভাবে দেখা হবে না। ঢোকার সময়ের দেখা আবছা। মাঝেমধ্যে বিজলী বাতি, তাতেই যতটুকু, বাকিটা অস্পষ্ট অন্ধকার। ছোট্ট জনপদ। রাস্তার ধারে বাঁ পাশে কয়েকটা বাড়ি। এগুলোই হোম-স্টে। দূরে ডানদিকে বিজলী বাতিতে দেখা যাচ্ছে একটা মোটামুটি বড় বাড়ি। হয়ত সরকারি কোনও বাংলো হবে। স্পিতি ভ্যালির একদম উপান্তে ৪০৮৫ মিটার উচ্চতার ভারত চীন সীমান্ত ঘেঁষা এই জনপদ বড় শান্ত নির্মল। উঁচু পাহাড়ঘেরা এ অঞ্চলেই বয়ে চলেছে লোসার এবং পিনোর মত ঝোরা বা নদী। যতদূর বোঝা গেল, প্রশান্তি এখানে মিশে আছে নিসর্গের সৌন্দর্যের সঙ্গে।
খুব ভোর ভোর, মানে ৫ টায় রওনা হয়ে যেতে হবে এখান থেকে। কুনজাম-লা হয়ে চন্দ্রতাল বা মুনলেক। তাই যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব খাওয়া ও শুয়ে পড়া। খাওয়ার ওখানে গিয়ে দেখি সেই ইস্রায়েলি যুবক যুবতীদের দল। চাতালে বসে গিটার আরও সামান্য কিছু মিউসিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে গান গেয়ে চলেছে। সংখ্যায় ১০-১২। অদ্ভুত এদের প্রাণশক্তি। স্বাভাবিকও। গোটা ভ্রমণে বারবার এদের দেখা পেলাম। নিরিবিলিটা এরা ভাঙছিলো ঠিকই, কিন্তু মাত্রাছাড়া নয়। খাওয়া শেষে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের সঙ্গে ঠাণ্ডাটাও ধোঁয়া ওড়ানোর মত। যতদূর মালুম তাতে ৯-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হবে। ভোরে তাপমাত্রা আরও নামবে, সেভাবে জামাকাপড়, আর হাঁটার জন্য পিঠের ব্যাগ সাজিয়ে শুয়ে পড়া। ঘুম ঠিকমত হোক আর নাই হোক। ধীমান কি একটু টেনসড্, ভোরের খোলসা নিয়ে? আমি কি খুব চিন্তিত, বাঁ-হাঁটুটা পরীক্ষা পাস করতে পারবে কিনা? প্রনবদা কি নীরবতা দিয়েই প্রকাশ করে ফেলছে না তার চাপা টেনশন, কি যেন বাবা এই দুই হাফ রুগিকে নিয়ে ট্রেক করে চন্দ্রতাল ঘুরে আসতে পারবো তো নির্বিঘ্নে?
ঘড়ির কাঁটা ধরে পাঁচটাতেই রওনা হলাম আমরা। আজ জুগনু বড় পারটিকুলার। ঠান্ডা বেশ। জ্যাকেট উলেন-এ ঢাকাঢাকির সঙ্গে গাড়ির কাচ বন্ধ। ক্রমে এই জনপদ ছাড়িয়ে কুনজুম-লা র পথে। খুব বেশি দূরত্বও নয়। মাত্র ১৯ কিলোমিটার। এত ভোর সকালে যাওয়া এবারে এই প্রথম। কাচে জমা বিন্দু বিন্দু জলকণা এখনও শুকিয়ে যায়নি। একটু ঝাপসা দেখাচ্ছে চারপাশ। এরও একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। যেন ভোরের কোনও রাগ। যেন চোখে আরাম, কানে খাদে নামা আলাপ, আর মনে বলতে না পারা প্রশান্তি। রাস্তা ভালো, যদিও জোরে চলছে না গাড়ি। সবাই কেমন চুপ মেরে আছি, ওই পাহাড়চূড়ার মতই।
কুনজুম-লা। গিরিখাত যাকে বলে। একটা ভ্যালি থেকে আরেকটা ভ্যালিতে পারাপারের বৈতরণী। জলহীন। কখনও বরফ ঢাকা। এখন শুনশান রাস্তা। বড়জোর কয়েকটা গাড়ি। আমরা দাঁড়ালাম। গাড়ি পার্ক করার পর নেমে এলাম। মাথা ঢাকা টুপি মাফলার জড়ানো গলা আর খোলা চোখে ক্যামেরার লেন্স। উঠি উঠি সূর্য, আর বেগে বয়ে যাওয়া বাতাস। চারপাশে কাছে দূরে গিরিশৃঙ্গমালা তখনও সেভাবে জেগে ওঠেনি। তখনও ঘুমকাতুরে। হালকা মেঘের চলাচলে কোথাও কিছুটা খোলা, কিছুটা বন্ধ। নানা রঙের কাপড়ের বহু নিশান উড়ছে পতপত, তখনও আর্দ্র। একটা স্তুপ মত কিছু। সাদা রঙ। ঠাকুর কল্পনা। কুনজুম মাতার মন্দির। বরা-সিগ্রি কোনটা? পৃথিবীর ২য় দীর্ঘ গ্লেসিয়ার। এখান থেকে দেখা যাওয়ার কথা। ঠিক বোঝা গেল না। সব দিকেই একটা গ্লেসিয়ার মত ভাব। খুব সকাল বলেই কি? কুয়াশা মেঘ সবই আছে। কিন্তু চন্দ্রভাগা পাহাড়টিকে দেখিয়ে দিল প্রনবদা। আর এক পাশে এসে দেখা গেল ছবির মত স্পিতি ভ্যালিটি। ছবি, চারপাশের গিরিশৃঙ্গের, আমাদের, নিজের। সেলফি। বিদায় স্পিতি ভ্যালি। বিদায়। স্বাগত জানাচ্ছে লাহুল আর কুলু ভ্যালি। এদেরকে জুড়ে দেওয়ার তাগিদেই ৪৫৯০ মিটার বা ১৫০৯০ ফুট উচ্চতায় এই গিরিপথ তার বুক পেতে রেখেছে। সাবাস।
কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আমরা ডানদিকে একটা রাস্তা ধরলাম। চন্দ্রতাল যেতে এই রাস্তাই আমাদের অনেকটা অগ্রসর করে দেবে, বাকি দুই-আড়াই কিলোমিটার যেতে হবে পায়ে হেঁটে। কিছুদিন আগে এখানে কোনও রাস্তা ছিলো না। গোটাটাই পায়ে হেঁটে যেতে হত। এখন সাত-আট কিলোমিটারের এই রাস্তা। না এতক্ষণ আমরা যে ধরণের রাস্তা ব্যবহার করেছি এ রাস্তা সেরকম নয়। বোল্ডার সাজিয়ে পাথরের গুড়ো ফেলে তৈরি রাস্তা, যার বর্ণনা আগেই কিছুটা দিয়েছি, ফেরার পথের। সন্ত্রস্ত থাকলেও উপভোগও করছিলাম। তাছাড়া জুগনু নিয়ন্ত্রিত হাতে চালাচ্ছিলোও খুব সাবধানে। শুধু যখন খুব ধারে চলে যাচ্ছিলো চাকা, বা হঠাৎই বোল্ডার সরে যাচ্ছিলো চাকার নীচ থেকে তখনই কিছুটা আঁৎকে ওঠা। আমাদের গাড়ি ছাড়া আরও খুব যে একটা গাড়ি চলছিলো তা নয়। পেছনে যে কয়েকটা আসছে তা বুঝতে পারছিলাম। আর ফিরে আসছিলো কয়েকটা, যাদের সঙ্গে আমাদের ক্রশিং হচ্ছিলো। স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগলো অনেকটা। যখন নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি পার্ক করানো হলো, তখন নটা। আরও বেশ কিছু গাড়ি এসে জুটেছে। এবার হাঁটা। ব্যাগ আর ক্যামেরা কাঁধে প্রনবদা আর জুগনু আগে আগে ধীমান আর আমি পেছনে। প্রনবদা বলেই দিয়েছিলো, তাড়া নেই, সাবধানে আসিস। আমি বাঁপায়ে নি-ক্যাপ সকালেই পড়ে নিয়েছিলাম। অসুবিধা হচ্ছিলো না। খুব যে বন্ধুর পথা তা নয়। পায়ে হাঁটা রাস্তাটা বরং স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছিলো। মাঝেমধ্যে সে ছাপ মুছেও যাচ্ছিলো। তখন নিজেদের বিচার বিবেচনা অনুসারে চলা। অধিকাংশটাই চড়াই। তবে তেমন স্টিফ নয় কোথাওই। মাত্র দু-চার জায়গায় খাড়াই বেশি, যেটা পেরিয়ে সামান্য হাফ ধরার সঙ্গে সামান্যই দাঁড়ানো, আবার চলা। হাঁটাপথ থেকে বাঁ-পাশের এক জায়গায় দেখলাম সার সার অনেকগুলো তাঁবু। অনেকটা নীচে। প্রায় সাতশ সাড়েসাতশ ফুট নীচে হবে। কিছু মানুষজন এবং দু-চারটে গাড়িও। বোঝা গেল অনেক ট্রেকার এখানে থাকে। রেন্টেড তাঁবু। এরা নিশ্চয়ই রাতের চন্দ্রতাল দেখে, আর উল্লসিত হয়। আহা আমরাও যদি…। আপাতত সামনের দিকে পা, চোখ আর মনন। আসলে আমরা যে ডানদিকের রাস্তা ধরেছিলাম তার কারণ হচ্ছে আমরা কুনজুম লা পেরিয়ে আবার লাহুল-স্পিতি জেলার স্পিতি ভাগের দিকেই এসেছিলাম। কেননা চন্দ্রতাল স্পিতি ভাগের দিকে। ৪৩০০ মিটার বা ১৪১০০ ফুট উচ্চতায় এই হ্রদ। নামটি এসেছে এর অর্ধাচন্দ্রাকৃতি থেকে। যে অধিত্যকায় (Plateau) এটির অবস্থান তার নাম ‘সমুদ্র তাপু’। প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশ মিনিট হাঁটার পর সেই মুহূর্তটি, যখন প্রনবদা বলে উঠলো –‘ওই দ্যাখ চন্দ্রতাল’।
খাড়াই বেয়ে নেমে গিয়ে জল স্পর্শ করতে খুব ইচ্ছে করেছিলো। হাঁটু স্মরণে আসায় বিরত থেকেছিলাম। শুধু দেখে যাওয়া, আপ্রাণ দেখে যাওয়া, এ দৃশ্য আগে কখনও দেখিনি। এই এলটিচুডে এমন একটি হ্রদ। তার পান্না সবুজ জল। জলে পাহাড়ের স্পষ্ট ছায়া। চারপাশে যতদূর দেখা যায় শুধুই পাহাড় পাহাড় আর পাহাড়। আর গিরিশৃঙ্গমালা। বাঁ-পাশে হ্রদের সমতলে চন্দ্রানদীর উৎসস্থল। একটি জলের রেখার স্পষ্ট নিষ্ক্রমণ। মাঝখানে এই একশ মিটার মত জায়গার উঁচু পাড়। সব, সব আমাদের সামনে উন্মোচিত তার আপন ক্যারিশমা নিয়ে। নিসর্গ এখানে অপার। ঐশর্যের ডালি খোলা। আনন্দ এখানে পরিবৃত অথচ মুক্তির ছোঁয়া লাগা। কোনও পরম ঈশ্বরের হাতের পরশ যত্রতত্র, যেন স্বর্গ রচিত হয়েই আছে। স্বর্গ আর কাকে বলে! আর এরই মাঝখানে আমরা, আমাদের মত আরও কিছু মানুষ, বিস্ময় বিহ্বলতায় আবেশিত। কোত্থেকে আসছে ঠিকানা নেই, কোথায় ফিরে যাবে নেই সেই হদিশ। সব ঠিকানা যেন এসে মিশেছে এই পরিবেশে এই পরিমণ্ডলে। উচ্ছল হয়ে পড়ায় কোনও বাধা নেই। আবার শান্ত হয়ে মেডিটেশনে বসে পড়ারও সমস্ত রসদ মজুত। জুগনু আজ একটু বেশিই আত্মভোলা হয়ে পড়েছে। ক্যামেরার সামনে নানা ভঙ্গিমায় পোজ দিয়ে যাচ্ছে। নাচছে, হাসছে, দুবাহু প্রসারিত করে গান গেয়ে উঠছে। প্রনবদা, চঞ্চল, কিছুটা অস্থির, সমস্ত জায়গাটা খুব কাছ থেকে ঢুঁরে ফেলছে, আর ক্যামেরাবন্দী করছে সসীম কে, বুঝিবা অসীমকেও সে নিয়ে আসবে কোনও এক ফ্রেমে। আমি আর ধীমান যতটা পারলাম জায়গাটাকে চষে ফেললাম। আর পরস্পরকে ডেকে ডেকে দেখালাম, এটা দেখ, ওটা দেখ। বহু বহুদিন পর অনেকক্ষণ শিশু হয়ে রইলাম। বিস্ময়, মুগ্ধতা নিয়ে শিশু হয়েই থাকতে ভালো লাগছিল যেন।
১০
চন্দ্রতাল দিয়ে শুরু করেছিলাম। চন্দ্রতাল দিয়ে শেষ করে আনতে চাই। এ জীবন স্বপ্নময়। কোনও কোনও স্বপ্ন কখনও বাস্তবে এসে রূপ পায় বা ধরা দেয়। এ ভ্রমণ আমাকে আরেকবার তাই জানালো।
একটু কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। আমাদের এই ভ্রমণে কত পথ আমাদের বহন করেছে, মূলত এন-এইচ ২২ ও এন-এইচ ২১ এবং আরও আরও যোগাযোগকারি রাস্তা, তোমাদের সেলাম। কত নদী, ছোট নদী, ঝোরা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে অগ্রসর করে দিয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। সেই শাতলেজ বা শতদ্রু, বাস্পা, তাইতি, রোপা, পিন, পার্বতী, স্পিতি, চন্দ্রা, বিয়াস বা বিপাশা তোমাদের প্রণাম। কত কত গিরিশৃঙ্গ তার অতুল দৃঢ়তায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। সেই র্যালডাং, কিন্নর-কৈলাশ, জোরকানদেন, শিবলিঙ, রিও পুরগিল, মণিরঙ, চন্দ্রভাগা আর না-দেখা চাও চাও ক্যাং নিলডা, গ্যাংচুয়া, আরও আরও নাম না জানা, তোমাদের বরফ সাদায় আমাদের হৃদয়ের উষ্ণতা। কয়েকটা লেক আমাদের শান্ত স্তিতধী করেছে। মূলত নাকো লেক আর চন্দ্রতাল, তোমাদের শান্ত জলে আমাদের কৃতজ্ঞতা মেশাই। কত গাছ নাম জানার মধ্যে পাইন সিডার চিলগোজা আখরোট আর নাম না জানা শত শত, তোমাদের শ্রান্তি ভোলানো ছায়া, অধিক অম্লজান যোগানো বাতাস আর চোখের আরাম নানা শেডের সবু্জ, বন্ধু তোমাদের আলিঙ্গণ। কত ফুল ফল শস্য, কৃতজ্ঞতা কৃতজ্ঞতা। আর মানুষ, বন্ধু, পরিচিতজন, সল্প পরিচিত, অপরিচি্ত, সুন্দরী কিন্নরী থেকে হোটেল বয়, গ্রামের অশক্ত বুড়িটি থেকে খেতমজুর, রাস্তা বলে দেওয়া আলাভোলা গ্রামের মানুষ থেকে নমস্তে সম্বোধনে শহরের হাসিমুখ রমণী, মনস্টারি গোম্ফায় বৌদ্ধ লামা থেকে স্কুলে পড়তে যাওয়া অমল শিশুরা, রেস্টুরেন্টের কুক থেকে স্টিয়ারিং সামলানো জুগনু তোমাদের সবাইকে প্রণাম। কোনও আফশোস নয়। না দেখা সারাহান বা লানজা কমিক, না দেখা চাও চাও ক্যাং নিলডা, গ্যাংচুয়া, কোনও আফশোস নয়। কতকিছুই তো বাকি রয়ে গেলো। কত গ্রাম, কত জনপদ, কত শহর, কত কত অজানা। এই বিশালের কতটুকুই বা আমরা দেখলাম। সামান্যই। তৃপ্তির মধ্যেও এই অতৃপ্তিই হয়তো আবার কখনও নিয়ে আসবে আমাদের। প্রতীক্ষা, শুধুই প্রতীক্ষা।
এই ভ্রমণ গদ্যের পর্ব ১ ও ২ পড়তে ক্লিক করুন
এই ভ্রমণ গদ্যের পর্ব ৩ ও ৪ পড়তে ক্লিক করুন



























Comments