মানস জঙ্গল ভ্রমণ (আসাম) ( সে এক অনিঃশেষ রোমাঞ্চ)

বিস্ময়পুর ভ্রমণ পত

পর্ব - ০

পথ টানে  অগণন , টানাট্যুর বি ভূ তি ভূ ষণ...

সরাইঘাট এক্সপ্রেস। রাই-এর সঙ্গে , আবার ঘাটের সঙ্গেও। ঘাট স্নানের, ঘাট পানের, ঘাট গানের... পরিবারের সঙ্গে যখন কোথাও যাই, তখন আর কায়দা ক'রে লাগেজ ক্যারি করছি বলি না, বলি, মাল বইছি। সেই মাল দেখে যে কেউ ভাববেন, আমরা গৃহ হতে উদ্বাস্তু। হাওড়া স্টেশন যাওয়ার রাস্তায় মিঠাই-এর কয়েকশোবার 'মিমি খিদে পেয়েছে' আর 'গরম লাগছে' শুনতে শুনতে ঘাটে এলাম, থুড়ি স্টেশনে এলাম।

'কেন গরম লাগছে মিঠাই?'

'বাবা, ওই যে রোদ'

'রোদ তোর গায়ে লাগছে?'

'না, রোদ দেখতে পাচ্ছি'

দূরে এক বাড়ির গায়ে রোদ পড়াতে মিঠাই-এর গরম লাগছে কেন - ভাবতে ভাবতে হাওড়া। বাবা, মা, দিদি ও মামমাম আগের গাড়িতে পৌঁছে গ্যাছে। অপেক্ষার অবসান। প্রায় ১০জন কুলি, প্রায় কেন ১০জনই(গুনেছি) আমাদের লাগেজ থুড়ি মাল দেখে ছুটে এলো। নির্বাচিত ২জন ঠ্যালাতে মাল বেঁধে চললো। মা-কে এই সময় দ্যাখার মতো... সংরক্ষিত আসনের জন্য কোচের দিকে যেতে যেতে মায়ের মুখ দেখে যে কারুর মনে হবে - ট্রেনটাকে যদি টেনে চেতলায় আমাদের বাড়ির মুখে নিয়ে যাওয়া যেত... পৃথিবীর বোঝা নামিয়ে কুলির দীর্ঘশ্বাস শুনে, ওকে দ্রুত টাকা দিয়ে হাল্কা করি।

ট্রেন, বিচিত্র মানুষ, বিচিত্র ইচ্ছে, বিচিত্র দাবি। একবার মনে আছে ৭২ বছরের হাঁটু'র সমস্যায় কাতর প্রভাতদাকে একটি মেয়ে তার নিজের পরিবারের লোকের জন্য, কনফার্মড লোয়ার বার্থ থেকে আপার বার্থে তোলার যে পরিশ্রম করেছিলো তাতে যে কোনো সরকারি পরীক্ষায় সে পাশ করতে পারে। এখানেও তাই, যদিও সে চাপ আমাদের উপর আসে নি, কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ সিট অ্যারেঞ্জমেন্ট এবার যাওয়ার সময়, সিনিয়র জুনিয়র সব সিটিজেনকে চমকে দিয়ে তিনটি কোচে ছটি সাইড আপার বার্থ পেয়ে ধন্য হয়েছি আমরা। ফলে এই প্রাপ্তিতে রেল কর্তৃপক্ষ-কে আমাদের ধন্যবাদ না জানিয়ে উপায় নেই, আর তার চেয়েও বড় কথা এই সিট অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে ও শুনে এই কোচের কো-প্যাসেঞ্জাদের কারুর আর নিজেদের সিট নিয়ে কোনো দুঃখ থাকে নি। যাই হোক, মুখ চলছে দুই কারণে ১। খাওয়ার শব্দে ২। কথার। মিঠাই এই দুটোতেই পারদর্শিতা দেখিয়ে চলেছে। সামনের কাকা, মাসি, পিসি, দিদি, বোনি কেউ বাদ নেই। সাড়ে দশটা নাগাদ কামরার লোকজনদের প্রায় গোটা ৩০বার গুডনাইট ব'লে সে ঘুমিয়েছে।কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা প্রত্যেক বিষয়ে অল্প অল্প ক'রে জ্ঞান রাখেন। সুযোগ লাগে না, তাকে তৈরি ক'রে নিয়েই বকতে থাকেন নিরন্তর। তেমন একজন আমার পাশেই ছিলো। এই সব কিছুর মধ্যেই 'গঙ্গাদর্শন', বই পড়ছি। গঙ্গা এখন গোমুখ, গঙ্গোত্রী পেরিয়ে উত্তরকাশী। রাতে হেডফোন লাগিয়ে একটি ভূতের গল্প, অডিও স্টোরি। ভোরে সত্যজিৎ রায় বললেন- আর্ট ফর আর্ট সেক নিয়ে তিনি কী ভাবেন। বললেন বলতে, ইন্টারভিউ। হ্যাঁ শুনছিলাম।তারপরই হাল্কা শব্দে বাজিয়ে দিলাম জোশীজি'র বিলাবল৷ এখন সকাল। আমরা নিউবঙাইগাঁও নামবো। নামি নি এখনো। ট্রেনের ইঞ্জিন না কি ফেল করেছে। এটাই বাকি ছিলো।

অবশেষে আরও তিনঘন্টা পর সরাইঘাট ঘাটে ভিড়লো। তখন সকাল সাড়ে ৯টা। ষ্টেশনে নামার প্রায় ২০মিনিট আগে থেকে আমার আর বাবার মুখ থমথমে, কুলি, কুলি, লিক করবে না তো? না লিক করে নি। নিউবঙাইগাঁও তে কুলি আছে, বিলকুল... অবশেষে দুকূল ছাপিয়ে মনে হচ্ছিলো কুলিদের আমিই মাথায় ক'রে নিয়ে যাই। ফিজিক্স যাই বলুক তাদের ওয়ার্কডান সবসময় সর্বোচ্চ। এ কথা মেনে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওদের পেছন পেছনে পুরো পরিবার৷ স্টেশন থেকে বেরোতে এত হাঁটতে হচ্ছে যে 'কতদূর আর কতদূর...' অবশেষে বেরিয়ে গাড়িতে মাল চাপিয়ে, কুলিদের পয়সা দিয়ে সটান চ'লে এলাম ব্রেকফাস্টের দোকানে। আটার পুরি, ডিমসেদ্ধ তাই অমৃত। মামমাম মোমো চাইলো, দেখি দোকানদার মুখ কুঁচকে এমন তাকালো, আমি মামমামকে পুরির গুণাগুণ বুঝিয়ে জোর করেই একটা মুখে ঠুঁসে দিলাম। যাই হোক পঙ্কজের ঠিক করা গাড়িতে উঠে সবুজের মাঝে হলুদ সর্ষে ক্ষেত দেখতে দেখতে সোজা মানস জঙ্গলের পাশে আমাদের কটেজে চ'লে এলাম। কটেজের নাম রাইনো কটেজ। দিদি বললো ভাই 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র গান চালা। গাড়ির সাথে দাড়ির সরি মোবাইলের ব্লুটুথ কানেকশনে টানাটানি ক'রে বেজে উঠলো 'কখন তোমার আসবে টেলিফোন'।  অবশেষে ফোন এলো। আমার ভাই-এর ছেলে হয়েছে আজ। সবাই খুব খুশি। রাইনো কটেজের ব্যবস্থা বেশ ভালো। সীসামারাতেও আমার প্রিয় কটেজ ছিলো রাইনো কটেজ। থাকা, খাওয়া দুই-এর ব্যবস্থাতেই যত্ন আছে। স্নান, খাওয়া সেরে ইন্টারনেটে বুকিং অনুযায়ী বেরিয়ে পড়লাম বাঁশবাড়ি রেঞ্জের উদ্দেশ্যে। হুড খোলা গাড়ি।

বাড়ির মহিলাদের কোথাও বেরোনোর আগে বারবার টয়লেটে যেতে হয়। বেশিরভাগ পুরুষদের এই যন্ত্রণা নিতে হয়। আপনাদের অনেকেরই সে অভিজ্ঞতা আছে, না বললেও আমি কনফার্মড।  শেষে সাফারির গাড়িকে এরোপ্লেনের মতো উড়িয়ে পঙ্কজ চ'লে এলো মানস ন্যাশনাল পার্কের গেটে। মিঠাই-এর মুখ বন্ধ রাখতে চকলেট দরকার। তাই চকলেটের প্লাস্টিক সাথে নিয়েই ঢোকার কথা। কিন্তু মানসের হুঁশ কম নয়, সিকিউরিটি গেটে মিঠাই-এর চকলেট প্লাস্টিক সহ বাজেয়াপ্ত করলো। মিঠাই-এর মুখ দ্যাখার মতো, কিন্তু সিকিউরিটির আন্টিদের মুখের গাম্ভীর্যের সামনে সে নিতান্তই ছোট্ট মিঠাই। ভালো লাগলো এটা দেখে যে ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে জলের বোতল ছাড়া সমস্ত প্লাস্টিক নিষিদ্ধ। আমাদের প্লাস্টিক প্রেমে তাদের কোনো আবেগ নেই। এটা শেখার।

পর্ব -১ 

যে মস্তিষ্কে বিস্ময় ফুরিয়েছে, সেই মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে , আমি বিশ্বাস করি। 


এই শীতকালে ময়ূর এত খুশি! বর্ষা যে হৃদয়ে যে কোনো সময়ে মিষ্টি দোলা দিতে পারে ময়ূর ভায়া আজ তা বুঝিয়ে ছেড়েছে, ভেতরে তার প্রেমের উড়ফুর... উষ্ণতার ধড়ফড়...  সে শোভা দেখে জঙ্গলের অনেকটা পেরিয়ে এলাম এক ওয়াচটাওয়ারের সামনে। 'কী দেখতে চান স্যার?'। সত্যিই পঙ্কজ করেছো কি! তাকিয়ে দেখি বাঁদিকে দাঁতাল, অন্যদিকে দুই গণ্ডার পড়ন্ত রোদ মেখে ঘাস খাচ্ছে। তার মধ্যেই নির্বিকার প্রেম করছে ময়ূর ময়ূরী, এই প্রেমের কাছে গণ্ডার, হাতি 'ডোন্ট কেয়ার'।  দূরে বুনো শুয়োর। একই দৃষ্টিক্ষেত্রে এত কিছু! 'এর জন্য তো সারাজীবন তপস্যা করা যায় পঙ্কজ'। বিভিন্ন রকম ছোটো পাখি তার মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তাদের ডাকে শেষ আলোর সমাচার। ওখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার সাফারির গাড়িতে উঠে বসলাম।

এবার জঙ্গলের অন্য দিক। এবার আরেকটি ওয়াচটাওয়ারের কাছে। বিস্তৃত ক্ষেত্রে দূরে গণ্ডার ,  সূর্য ক্রমশ নিজেকে লাল্টুস ক'রে তুলছে। ধীর কুয়াশার মায়াজাল জঙ্গলকে  দিচ্ছে অপর সম্ভাবনার প্রচ্ছদ। আঁকা হচ্ছে পৌষতুলির রঙটোলা... হাতির পিঠে মাহুত ছেলেটি গাইতে গাইতে কোন পৃথিবীতে হারিয়ে গ্যালো, সূর্যের পড়ন্ত আলো মুখে নিয়ে বাসায় ফিরছে অগণিত পাখি! ইতিমধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মিঠাইকে(আমাদের তিন বছরের মেয়ে) মূত্র ত্যাগ করাচ্ছে ঋতু ওয়াচটাওয়ারের সামনে। আমি বললাম ওই দ্যাখো - কিছু হাত দূরে গণ্ডার। এ কি গণ্ডারটা কি এগিয়ে আসছে? পঙ্কজ হুঙ্কার দিয়ে উঠলো - 'এখনই গাড়িতে উঠুন সবাই, এক মিনিট দেরি নয়'। মিঠাইকে হিসুরত অবস্থা থেকে তুলে কোনো রকমে বাচ্চাদুটোকে পঙ্কজের পাশের সিটে বসিয়ে কাচ তুলে দিলাম। আমরা ঝপাঝপ লাফিয়ে উঠলাম হুডখোলা সাফারি গাড়ির পেছনে।   ও দ্রুত গাড়ি ব্যাক করলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দেখলাম মিঠাই-এর যে মাটিতে প্রকৃতির টানে জল ঢালছিলো, গণ্ডারটা একদম সেখানে দাঁড়িয়ে,  ওয়াচটাওয়ারের সামনে,  যেন বলছে -'মিঠাই তোর এত সাহস!'।

যাই হোক সেই মুহূর্তে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। গাড়ি কিছুটা ব্যাক ক'রে আরেক দৃশ্য - দুটো গণ্ডার যেন যৌথ পারফর্মেন্স দ্যাখাবে বলেই ২০০মিটার দূরের রঙ্গমঞ্চে হাজির। তাদের সে খুনসুটি আমাদের দুই কন্যা মামমাম ও মিঠাইকে মনে করিয়ে দিতে পারে।  কারণ,  থাক,  সে গর্বের কথা না বলাই ভালো। ইতিমধ্যে জঙ্গলের কোল কালো ক'রে অন্ধকার নেমেছে। হাত পা ঠাণ্ডায় জমতে শুরু করেছে। গাড়ি এগিয়ে চললো জঙ্গলের সেই অন্ধকার ও রহস্যময় প্রাচীন এক বিস্ময়ের চিহ্ন মেখে। প্রকৃতির ঢেলে দেওয়া ঐশ্বর্য ক্রমশ হয়ে উঠছে রোমাঞ্চকর। ফেরার পথ। অন্ধকার আর অপর এক পৃথিবীর কথোপকথন। 'অপড়া অবাকপ্রতিমারা'-কাব্যগ্রন্থে কবি সমর চক্রবর্তী লিখেছিলেন - 'কোথাও কবিতা হচ্ছে   আমি তার পিপাসা পেয়েছি / আমার শরীর জুড়ে আমার শরীরহীনতায়' ।  এর মধ্যে ক্লান্ত মিঠাই মামমামের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোট্ট মামমাম ওর বোনিকে সমস্ত উষ্ণতা নিয়ে জড়িয়ে ধরেছে মায়ের মতোই। এই তো দিদি আর বোন। কী যে ভালো লাগলো দেখে। হ্যাঁ আরেকটা কথা, সিকিউরিটি আন্টিরা মিঠাই-এর মুখ ভোলে নি। ফেরার সময় ফিরিয়ে দিয়েছে চকলেটের প্যাকেট। 

দ্বিতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

About Author
&
Photographer

লেখক : সব্যসাচী হাজরা

লেখালিখি :  শূন্য দশক

ভালোবাসা : কবিতাপাঠ, ভ্রমণ,  ছবি তোলা, গান গাওয়া , শ্রুতিনাটক

আলোকচিত্রী: সব্যসাচী হাজরা

লেখালিখি :  শূন্য দশক

ভালোবাসা : কবিতাপাঠ, ভ্রমণ,  ছবি তোলা, গান গাওয়া , শ্রুতিনাটক

Subscribe

Find Us On

Comments

YOU MIGHT ALSO LIKE

Subscribe

Get the lastest news and updates from Bismoypur


সব্যসাচী হাজরা

Subscribe

Social widget