মুখোশ শিল্পের আঁতুড়ঘর ... চড়িদা গ্রাম ...

দেওয়াল জুড়ে সাজ সাজ রবে এক এক করে টাঙিয়ে রাখা রঙবেরঙের মুখোশের আজব সংসার। এখানে একের পর এক বাড়িতে সার দিয়ে সাজানো শুধুই মুখোশ। এই মুহুর্তে সমস্ত অবাক ভালোলাগা ছড়িয়ে দিয়েছি আশ্চর্য সেই মুখোশের দুনিয়ায়। কী নেই সেখানে ? আদিবাসী মূর্তি, বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবীর মুখাবয়ব, দুর্গাপ্রতিমা পরিবারের প্রতিটি বাহনদের মুখাবয়ব, কথাকলি নৃত্যমুখ, শিকারি, গৃহবধু, এমন কী পশুপাখিরও মুখের আদল। কত নিখুঁত, পরিপাটি। প্রতিটিতে শিল্পীর হাতের যত্নের ছাপ। পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির কাছে এক ছোট্ট জনপদ, ‘মুখোশ গ্রাম’ চড়িদা। এখানে প্রায় শ’দেড়েক পরিবারের বাস। কয়েক প্রজন্ম ধরে যাঁরা একটাই পেশায় আছেন, ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি করা। পুরুলিয়ার বিখ্যাত ‘ছৌ’ নাচের মুখোশ তৈরির জন্য খ্যাত চড়িদা। ছৌ নাচের বিভিন্ন সাজপোশাকও নির্মিত হয় এখানে। নিপুণ কৌশলে ছাঁচ থেকে সুক্ষ্ম স্পর্শে তৈরি হচ্ছে এক একটি অপূর্ব কারুকাজের মুখোশ। ছৌ নাচের মুখোশের সিংহভাগই তৈরী হয় চড়িদা গ্রামে। মুখোশ শিল্পীরা প্রায় সবাই সূত্রধর পরিবারের। বংশপরম্পরায় এখানে শিল্পীরা ছৌ নাচের মুখোশ নির্মাণশিল্পে ব্যাপ্ত।
ছৌ নাচের মুখোশের গল্প যখন হচ্ছে, তখন ছৌ নাচের কথাও প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসবে। এখানে বিভিন্ন মুখোশ শিল্পীর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তিব্বতি নাচ ‘ছাম’ থেকেই ‘ছৌ’ নাচের উদ্ভব। আবার অনেকের মতে কুড়মালি ভাষায় ‘ছুয়া’ মানে হল ছেলে। যেহেতু এই নাচে পুরুষদেরই প্রাধান্য তাই একে ‘ছু’ নাচ বা ‘ছৌ’ নাচ বলা হয়। ‘কিরিট-কিরিটি’ অবতাররূপী শিব-পার্বতীর মুখমন্ডল, ছৌ নাচের অনুপ্রেরণা। আবার অনেকে মনে করেন পুতুল নাচ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই ছৌ নাচ প্রথম শুরু হয়। একসময় সমাজের নিম্নবর্গীয়রা এই মুখোশ শিল্পে জড়িত ছিলেন। ইদানিং এই মুখোশ শিল্পের প্রভুত উন্নতি হওয়ায় এখন পুরুলিয়ার সব বর্ণের মানুষরাই এই শিল্প সাধনায় আসছেন। স্বাধীনতার আগে থেকেই পুরুলিয়ায় ছৌ নাচের সূচনা। যদিও তখন ঠিক মুখোশের চল ছিল না। তখনকার শিল্পীরা মুখে রঙচং মেখে উৎসবে বা পালাপার্বণে সারারাতব্যাপী নাচের অনুষ্ঠান করতেন। পরবর্তীতে অভিনীত চরিত্র অনুযায়ী মানানসই বিচিত্র মুখোশ ও পোশাক তৈরি হতে থাকে। ছৌ মূলত তিনটি আঙ্গিকে ভাগ করা হয়, ময়ূরভঞ্জ, সরাইকেলা এবং পুরুলিয়া। তবে ময়ূরভঞ্জ ছৌনাচে মুখোশ থাকে না। শরীরের অঙ্গভঙ্গি দিয়েই নাচের চলন দেখানো হয়। সাধারণত একটি ছৌ নাচের দলে ৩০ জন নৃত্যশিল্পী ও বাজনদার থাকেন। নাচের সময় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ধামসা, মাদল, ঢোল, মোহুরি, সানাই, করতাল, এমনকি ইদানিং কর্নাট, তাসা, ক্যাসিও বাজানো হয়। আর পায়ে অবশ্যই ঘুঙুরের ব্যাবহার।
চড়িদা গ্রামের প্রবেশপথেই রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ছৌ নৃত্যশিল্পী গম্ভীর সিং মুড়ার একটি আবক্ষমূর্তি। চড়িদা বিখ্যাত এখানকার ভূমিপুত্র ছৌ-নৃত্য শিল্পী, ১৯৮১ সালে পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত শ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার জন্য। অযোধ্যা পাহাড়ের পিটিদীরি গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে ১৮ ফাল্গুন ১৩৩২ বঙ্গাব্দে জন্ম। বাল্যকালে তিনি নাকি পাহাড়ে ছাগল চড়াতে যেতেন এবং ছাগল চড়ানোর ফাঁকে শিশুসুলভ লম্ফঝম্ফ করে নাচানাচি করতেন। তাঁর মনে উদয় হয় মুখোশ নিয়ে যদি নাচ করা যায়, তাহলে তো বেশ হয়। সেই থেকেই নাকি ছৌ-নৃত্যের শুরু। এই বিশেষ নৃত্যশৈলীকে বিশ্বজনীন করে তুলতে ১৯৭২ সালে তিনি উত্তর আমেরিকা, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, লস এঞ্জেলস পরিভ্রমণ করেন। ১৯৮৬ প্যারিস ও ১৯৯১ জাপানের ওশাকা ও টোকিও শহরে ঘুরে আসেন। শ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার কর্মসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে ২৮ মার্চে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি নিলম সঞ্জীব রেড্ডি তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেন। এর পরের বছর রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং তাঁকে সঙ্গীত-নাটক আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত করেন। তাঁর প্রয়াণের পরও তাঁর তিন সুযোগ্য পুত্র কার্তিক সিং মুড়া, গনেশ সিং মুড়া, পরশুরাম সিং মুড়া এই ছৌ নাচের ধারাকে স্বযত্নে বহন করে চলেছেন।
শ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার আবক্ষমূর্তির সামনের ফাঁকা জায়গায় গাড়ি রেখে এগিয়ে গেলাম। প্রথমেই বাঁদিকের রাস্তায় একটা তেলেভাজার দোকানে গরম আলুর চপ ও চা খেয়ে মূল রাস্তার দুই পাশের সার দেওয়া দোকানগুলিতে এক এক করে ঢুঁ মারতে থাকলাম। প্রতিটি দোকানের দাওয়ায় ও লাগোয়া ঘরগুলিতে শিল্পীরা বসে মুখোশ তৈরিতে ব্যাস্ত। দেওয়ালে টাঙানো প্রচুর মুখোশ। অল্পবয়সী ছেলেরাও নানান সরঞ্জাম প্রস্তুতিতে নিয়োজিত রয়েছে। শুধু মুখোশ নয়, পর্যটকরা ঘর সাজানোর জন্যও বিশাল আকারের মুখোশ কিনে নিয়ে যান। এঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মুখোশ মানেই যে সাবেকি সাঁওতাল-সাঁওতালি বা আদিবাসী মুখাবয়ব দেখা যায়, সেটি হল ‘কিরাত-কিরাতি’ তথা শিব-পার্বতীর শিকার মূর্তির মুখাবয়ব। সাধারণত গনেশ, দুর্গা, হাতি, রাক্ষস, নারী-পুরুষ শিকারী, কথাকলি, আদিবাসী বধু, সিংহ, ময়ুর ইত্যাদির মুখোশ প্রচুর তৈরি হয়। চড়িদা গ্রামের প্রায় ১৫০ পরিবারের মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মূলত সূত্রধর পরিবারই এই মুখোশ শিল্পের সঙ্গে একচেটিয়াভাবে যুক্ত। কথিত আছে অযোধ্যা বনিনাথ পতি মদনমোহন সিংদেও সরাইকুলা যান রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর প্রতিমা নির্মাণের জন্য। এবং তিনি বর্ধমান থেকে এই সূত্রধর পরিবারকে পুরুলিয়া জেলার চড়িদায় নিয়ে আসেন। প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি তারা মুখোশও বানাতেন। ক্রমে চাহিদা বাড়ে। মুখোশ সংক্রান্ত ব্যাবসা বাড়ে। মুখোশশিল্প এই অঞ্চলের আর্থিক সামাজিক ভিত্তির মূল উপজীবিকা হয়ে ওঠে।
এদের সঙ্গে কথায় কথায় আরও জানলাম, প্রথম দিকে লাউয়ের খোলা দিয়ে মুখোশ তৈরি হত। এই কারিগরির প্রথম স্রষ্টা ছিলেন উপেন্দ্র সূত্রধর। পরবর্তীকালে বাবুলাল সূত্রধরের উদ্ভাবনে কাগজ ও কাপড় দিয়ে মুখোশ বানানো শুরু হয়। একটি দোকানের ভেতর ঢুকে দেখছিলাম এঁদের কাজের শৈলী। এক তরুণ শিল্পীর কাছে মুখোশ তৈরির বর্ণনা শুনে শুনে, সঙ্গের নোট বইয়ে টুকে নিচ্ছিলাম। এক একটা মুখোশ গড়তে দুই থেকে পাঁচ দিন লাগে। প্রথমে কাছেপিঠের নদীখাত থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। তারপর তাকে মুখোশের গড়ন দেওয়া হয়। এরপরের পর্যায় খবরের কাগজের টুকরো আঠা দিয়ে পরতের পর পরত জুড়তে হয়। প্রায় ১২ থেকে ১৫ টি পরত দিতেই হয়। সারাদিন রোদে শুকিয়ে গেলে বেলেমাটির একটা পাতলা পরত চাপাতে হয়। একটি পাতলা কাপড় কাদামাটিতে চুবিয়ে মুখমণ্ডলের ওপর বসিয়ে দিতে হবে। কাঠের সূক্ষ্ম খোদাই-যন্ত্র দিয়ে চোখ, নাক, ঠোঁট ইত্যাদির আকার সুন্দর করা হয়। এটাই শেষ নয়, শুকিয়ে গেলে কাপড়টি সাবধানে তুলে ফেলে প্রথমে খড়িমাটির প্রলেপ দিয়ে, পরে আঠালো রঙ করা হয়। মুখোশে রাংতা, চুমকি, জরি, প্লাস্টিকের ফুল, পাতা, পাখির পালক, শোলা, ঝুটো গহনা, ঝুটো চুল, পুঁতি ইত্যাদি দিয়ে অলংকরণ করা হয়। মেঘলা আবহাওয়া মুখোশ নির্মাণের অন্তরায়। তাই রোদের আধিক্য থাকা অত্যন্ত জরুরী। তবে পুরো প্রক্রিয়াটা যতটা সহজে লিখে ফেলা গেল, ছৌ মুখোশ তৈরী অত সহজ নয়। এর জন্য লাগে অধ্যাবসায়, শ্রম, মেধা, দক্ষতা, নিপুণতা।
পুরুলিয়ায় রুখুসুখু লালমাটির আঁকাবাঁকা পথের সঙ্গী মাঠাবুরু, মুড়রাবুরু পেরিয়ে বাঘমুন্ডি ব্লকে অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে ছোট্ট চড়িদা গ্রাম। বাঘমুন্ডি শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে চড়িদা। গ্রামের ঢোকার মুখেই গম্ভীর সিং মুড়ার নামাঙ্কিত ছৌ নাচ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। স্থানীয় যুবকদের এখানে শারীরিক সক্ষমতা ও কসরতের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গম্ভীর সিং মুড়াকে এই অঞ্চলের ছৌ শিল্পীরা কাছে দেবতাজ্ঞানে স্মরণ করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে কত কিছুই যে জানলাম, পালাগানের মাধ্যমে হয় এই নাচ। মূলত গনেশ বন্দনা, মহিষাসুর বধ, রাম-রাবনের যুদ্ধ, মারীচ সংবাদ, সীতাহরণ ইত্যাদি কাহিনি অবলম্বনে হয় এই নাচ। এখানে ছৌ নাচের তিনটি ঘরানা আছে। ঝাড়খন্ডের সরাইকুলা ঘরানা, ওড়িশার ময়ুরভঞ্জ ঘরানা এবং পুরুলিয়ার নিজস্ব ঘরানা। তবে পুরুলিয়া ঘরানারও আবার দুটি ভাগ রয়েছে। বাঘমুন্ডি ঘরানা ও বান্দোয়ান ঘরানা। এই বান্দোয়ান ঘরানার নাচ কিছুটা ‘অদ্ভুত রস’ আর বাঘমুন্ডি ঘরানার ছৌ নাচ ‘বীর রস’। ছৌ মুখোশে চোখের ছিদ্র দিয়ে কেবল সামনের অংশটুকুই দেখা যায়। ছৌ শিল্পীদের শ্বাস নেওয়ার পথও ওইটাই। আরও একটা ব্যাপারের কথা জানলাম যে ছৌ নাচ প্রধানতঃ মঞ্চে দেখানো হয় না। গ্রামের মাঝে কোনও খোলা মাঠে বা ফাঁকা জমিতে ছৌ নাচের আসর বসে। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘আখাদাস’। মুখোশ ও ছৌ নাচ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
শহুরে যাপন ছেড়ে পুরুল্যের মাটিতে এসে, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা মুহুর্ত, সজীব করে রাখে।
কীভাবে যাবে -- কলকাতা থেকে রেলপথে বা সড়কপথে পুরুলিয়া। পুরুলিয়া স্টেশন চত্বর থেকে চরিদা গ্রামের দূরত্ব ৬১.২ কিলোমিটার। সময় লাগে পৌনে দুই ঘন্টার মতো।
কোথায় থাকবে – বেশিরভাগ পর্যটকই অযোধ্যা পাহাড় বা মুরগুমা বেড়াতে এসে গাড়িতে চড়িদা মুখোশ গ্রাম দেখে আসেন। পুরুলিয়া, অযোধ্যা পাহাড়, মরগুমাতে অনেক হোটেল, হোমস্টে, কটেজ রয়েছে। অগ্রিম বুকিংয়ের ব্যাবস্থা করে নিশ্চিন্তে চলে আসা যায়।
কখন যাবে – খুব গরমের সময়টুকু বাদ দিয়ে, বছরের যেকোনও সময়ই আসা যায়। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ সেরা সময়।
কী কিনবে – অবশ্যই স্থানীয় শিল্পীদের হাতে তৈরি ঘর সাজাবার মুখোশ।














Comments